📄 উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.
[সফর ৯৯ হিজরি—রজব ১০১ হিজরি] [সেপ্টেম্বর ৭১৭ খ্রিষ্টাব্দ—ফেব্রুয়ারি ৭২০ খ্রিষ্টাব্দ]
খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজ রহ.-এর জন্ম ৬১ হিজরি সনে মদিনায়। দায়িত্ব গ্রহণকালে তার বয়স ছিল আটত্রিশ বছর। তার পিতা আবদুল আজিজ ছিলেন মারওয়ান ইবনুল হাকামের পুত্র; অর্থাৎ খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজ ছিলেন তার পূর্বতন দুই খলিফা সুলায়মান ও ওয়ালিদের চাচাতো ভাই। অপরদিকে তার মাতা ছিলেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.-এর পুত্র আছিমের কন্যা।
উমর ইবনে আবদুল আজিজ পূর্বতন খলিফা সুলায়মান বিন আবদুল মালিকের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন। সুলায়মান উমরের গুণ-বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিলেন বলেই তাকে নির্বাচিত করেছিলেন।
একবার হজের সফরে উমর ইবনে আবদুল আজিজ খলিফা সুলায়মানের সঙ্গে ছিলেন। আরাফায় অবস্থানকালে সুলায়মান যখন বিশাল জনসমাবেশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তখন উমর তাকে বলেন, 'এরা আজ আপনার প্রজা; আগামীকাল আপনি তাদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবেন।' আরেক বর্ণনায় আছে, তিনি বলেন, 'এরা আজ আপনার প্রজা আর কিয়ামতের দিন তারা আপনার প্রতিপক্ষ হবে।' উমরের কথা শুনে সুলায়মান কাঁদতে থাকেন এবং বলেন, 'আল্লাহর কাছেই আমি সাহায্য প্রার্থনা করছি।'
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি ও বজ্রপাত হচ্ছিল। সুলায়মান তখন ভীত হয়ে পড়েন আর উমর ইবনে আবদুল আজিজ হাসছিলেন। সুলায়মান বললেন, 'তুমি
হাসছ?!' 'উমর বললেন, 'হ্যাঁ, এখন আমরা পৃথিবীতে আছি; আর এটি হলো "তাঁর” দয়ার বহিঃপ্রকাশ, তাহলে পরকালে যখন আমরা থাকব বিচারের কাঠগড়ায়, তখন তার ক্রোধ ও শাস্তির বহিঃপ্রকাশ কেমন হবে?'
ইমাম মালিক রহ. বর্ণনা করেন—একদিন সুলায়মান ও উমর ইবনে আবদুল আজিজ কোনো বিষয়ে কথা বলছিলেন। একপর্যায়ে সুলায়মান বলে বসলেন, 'তুমি মিথ্যা বলেছ।' উমর বললেন, 'আপনি বলছেন, আমি মিথ্যা বলেছি?! আল্লাহর শপথ! যেদিন আমি প্রথম জেনেছি যে, মিথ্যা বললে মিথ্যাবাদীর ক্ষতি হয়, সেদিন থেকে আমি কোনো মিথ্যা বলিনি।' এরপর ক্রুদ্ধ উমর সুলাইমানের সঙ্গ ত্যাগ করে মিশরে চলে যাওয়ার সংকল্প করলেন। কিন্তু সুলায়মান তাকে সে সুযোগ দিলেন না। তিনি তার কাছে লোক পাঠিয়ে তার সঙ্গে সন্ধি করে নিলেন এবং তাকে বললেন, 'যখনই আমি কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছি, (পরামর্শ করার জন্য) আমার মনে তোমার কথা উদিত হয়েছে।'
উমর ইবনে আবদুল আজিজের খলিফা হওয়া ছিল একটি ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়ন। বর্ণিত আছে, আবদুল্লাহ বিন উমর রাযি. বলেন, 'কী আশ্চর্য! মানুষ মনে করে যে, দুনিয়া ততদিন ধ্বংস হবে না, যতদিন না উমর-বংশের এক ব্যক্তি শাসনক্ষমতা লাভ করবে। সে উমরের ন্যায় শাসনকার্য পরিচালনা করবে আর তার চেহারায় একটি চিহ্ন থাকবে।'
মানুষ মনে করত যে, বিলাল বিন আবদুল্লাহ বিন উমরই হবেন সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি। তার চেহারায় ক্ষতচিহ্ন ছিল। কিন্তু তিনি সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি ছিলেন না; কাঙ্ক্ষিত সেই ব্যক্তিটি ছিলেন উমর ইবনে আবদুল আজিজ। উমর ইবনে আবদুল আজিজের মা ছিলেন খলিফা উমর রাযি.-এর পুত্র আছিমের কন্যা।
ইমাম বায়হাকি রহ. আপন সনদে উল্লেখ করেন—উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. বলেছেন, 'আমার বংশধরদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আসবে, যার চেহারায় ক্ষতচিহ্ন থাকবে; সে শাসনদায়িত্ব লাভ করবে এবং পৃথিবীকে ন্যায়ে পূর্ণ করে দেবে।'
ইমাম আবু দাউদ রহ. তার সুনান গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন—
«إِنَّ اللهَ يَبْعَثُ لِهَذِهِ الْأُمَّةِ عَلَى رَأْسِ كُلِّ مِئَةِ سَنَةٍ مَنْ يُجَدِّدُ لَهَا دِينَهَا»
আল্লাহ তাআলা এ উম্মতের জন্য প্রতি একশ বছরের মাথায় এমন কোনো মহান ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন, যিনি উম্মাহর দ্বীনি পরিস্থিতির সংস্কার করবেন।
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-সহ একদল উলামায়ে কেরামের মত হলো, উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. ছিলেন হিজরি প্রথম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ও সংস্কারক।
জনসাধারণের বায়আত গ্রহণ ও পূর্বতন খলিফা সুলায়মানের জানাজা শেষে উমর ইবনে আবদুল আজিজ যখন প্রত্যাবর্তন করছিলেন, তখন তাকে দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতায় ভারাক্রান্ত মনে হচ্ছিল। তখন তার ভৃত্য তাকে জিজ্ঞেস করে, 'আপনার কী হয়েছে? আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?' উমর ইবনে আবদুল আজিজ উত্তর দেন, 'কী বলছ তুমি? আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হব না? পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত সুবিশাল ইসলামি সাম্রাজ্যে বিদ্যমান মুসলিম উম্মাহর এমন কোনো সদস্য নেই, যে আমার কাছে তার প্রাপ্য অধিকার আদায় করে দেওয়ার দাবি করছে না; চাই সে আমাকে তা পত্রের মাধ্যমে অবহিত করুক কিংবা না করুক।'
খলিফা হওয়ার পর উমর ইবনে আবদুল আজিজ স্ত্রী ফাতেমাকে এই ইচ্ছাধিকার প্রদান করেন যে, তিনি চাইলে স্বামীর সঙ্গে থাকতে পারেন; সে ক্ষেত্রে তার সান্নিধ্যে সময় কাটানোর অবকাশ খলিফার থাকবে না, আবার চাইলে তিনি তার পিতৃগৃহেও চলে যেতে পারেন। তার এ কথা শুনে ফাতেমা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার কান্না দেখে দাসীরাও কাঁদতে থাকে। মহীয়সী এই নারী সর্বাবস্থায় স্বামীর সঙ্গে অবস্থান করাকেই পছন্দ করেন। আল্লাহ তাআলা তার প্রতি দয়ার আচরণ করুন।
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর উমর ইবনে আবদুল আজিজ উপস্থিত জনগণের সম্মুখে দণ্ডায়মান হন এবং প্রথমে আল্লাহ পাকের হামদ ও ছানা পাঠ করেন। এরপর তিনি বলেন,
হে লোকসকল, যারা আমাদের সাহচর্য কামনা করে, তারা যেন অবশ্যই পাঁচটি বিষয় অবলম্বন করে। যারা এসব বিষয় অবলম্বন করতে পারবে না, তারা যেন আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
• তারা যেন আমাদেরকে সেসব অসহায় মানুষের প্রয়োজনের কথা অবহিত করে, যারা নিজেরা তা অবহিত করতে পারে না।
• তারা যেন আমাদেরকে কল্যাণকাজে সহযোগিতা করতে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকে।
• যেসব কল্যাণক্ষেত্রের নির্দেশনা আমাদের কাছে নেই, তারা যেন সেসব বিষয়ে আমাদের পথনির্দেশ করে।
• তারা যেন আমাদের কাছে পরনিন্দা ও দোষচর্চা না করে।
• তারা যেন অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কোনো বিষয়ে প্রবৃত্ত না হয়।
তার এ ভাষণ শুনে কবি ও বক্তার দল তার কাছ থেকে সরে পড়ে আর ফকিহ ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তিগণ তার দরবার-সাহচর্য গ্রহণ করে।
খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. ইলম ও ফিকহ, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং নসিহত ও সদুপদেশের মাধ্যমে ইসলামি সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শাসক। জনসাধারণ তার সুশাসনে প্রভাবিত হয় এবং জনপরিস্থিতির আমূল সংস্কার সাধিত হয়। জীবনের শেষ ভাষণে তিনি আল্লাহ তাআলার হামদ ও ছানা পাঠের পর বলেন-
হামদ ও ছানার পর, নিঃসন্দেহে তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করা হয়নি আর তোমাদেরকে এমনিই ছেড়ে দেওয়াও হবে না। তোমাদের জন্য রয়েছে এক প্রত্যাবর্তনস্থল, যেখানে আল্লাহ তাআলা তোমাদের মাঝে বিচার ও ফয়সালা করার জন্য অবতরণ করবেন। সুতরাং যে আল্লাহর রহমত হতে বেরিয়ে গেছে এবং বঞ্চিত হয়েছে সেই জান্নাত থেকে, যার ব্যাপ্তি আসমান-জমিনের ন্যায়, নিঃসন্দেহে সে ব্যর্থ ও বিফল হয়েছে। তোমরা কি জানো না যে, ওই ব্যক্তি ছাড়া কেউ আগামী দিন নিরাপদ নয়, যে শেষ দিবস সম্পর্কে সতর্ক ও ভীত হয়েছে এবং অবিনশ্বরের বিনিময়ে নশ্বরকে, অনিঃশেষের বিনিময়ে নিঃশেষকে, অধিকের বিনিময়ে
স্বল্পকে ও নিরাপত্তার বিনিময়ে ভয়কে বিক্রি করেছে। তোমরা কি লক্ষ করছ না যে, তোমরা মৃতদের পরিত্যক্ত সম্পদই ভোগ করছ আর তোমাদের মৃত্যুর পর তা ভোগ করবে তোমাদের পরবর্তীগণ। এভাবে একসময় তা পৌঁছে যাবে চূড়ান্ত মালিকানা গ্রহণকারীর কাছে। তারপর দেখো, তোমরা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় কাউকে না কাউকে আল্লাহর পথে বিদায় জানাচ্ছ। সে আর কখনো ফিরে আসবে না। কারণ, সে তো তার 'আজাল' ও আয়ু পূর্ণ করে ফেলেছে। তোমরা তাকে বিছানা-বালিশ ছাড়া মাটির কোলে জমিনের এক ফাটলে অদৃশ্য করে দিচ্ছ। সে তার প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে; তার সামনে কেবল মাটি আর হিসাবের ঘাঁটি! সে তার আমলের সঙ্গে আবদ্ধ। পৃথিবীতে যা সে রেখে গেছে, তা তার কোনো প্রয়োজন নেই; তার প্রয়োজন কেবল তা-ই, যা সে অগ্রে প্রেরণ করেছে। সুতরাং চূড়ান্ত বিচারের পূর্বেই আল্লাহকে ভয় করো; মৃত্যুর পূর্বেই খোদাভীতি অর্জন করো। শুনে রাখো, আমি এ কথা বলছি।
বক্তব্য শেষ করে খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ আপন চাদরের প্রান্ত মুখের ওপর রেখে কাঁদতে থাকেন, উপস্থিত শ্রোতারাও কাঁদতে থাকে।
খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. তার অতি সংক্ষিপ্ত শাসনামলে ন্যায় প্রতিষ্ঠার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন; আপন কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে জুলুম ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করেছেন, প্রত্যেক হকদারকে তার হক ফিরিয়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন তার পক্ষ হতে ঘোষক ঘোষণা করত, ঋণগ্রস্তরা কোথায়? বিবাহ ইচ্ছুকরা কোথায়? দরিদ্ররা কোথায়? এতিমরা কোথায়? খলিফা তাদের সকলের প্রয়োজন পূরণ করতেন।
টিকাঃ
৩১. সূত্র: প্রাগুক্ত, ৯/১৮০।
৩২. সুনানে আবি দাউদ, হাদিস নং ৪২৯১।
📄 খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর কীর্তিময় জীবনের কয়েকটি খণ্ডচিত্র
[এক]
একদিন তিনি তার স্ত্রীর কাছে উপস্থিত হয়ে কিছু আঙুর কেনার জন্য এক দিরহাম চাইলেন। কিন্তু স্ত্রীর কাছে এক দিরহামও ছিল না। খলিফাপত্নী প্রশ্ন করলেন, 'আপনি আমিরুল মুমিনিন; আপনার কোষাগারে কিছু আঙুর কেনার অর্থও নেই?'
খলিফা উত্তর দিলেন, 'কাল (কিয়ামতের দিন) বেড়ি ও শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হওয়ার চেয়ে এই নিঃস্ব অবস্থাই আমার জন্য সহজ।'
[দুই]
খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের কাছে দুটি প্রদীপ ছিল। তিনি একটি প্রদীপ ব্যবহার করতেন ব্যক্তিগত লেখালেখির সময়, আরেকটি ব্যবহার করতেন রাষ্ট্রীয় নথিপত্র লেখার সময়। দ্বিতীয় প্রদীপটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের তেল ব্যবহার করে জ্বালানো হতো। সেই প্রদীপটির আলোয় তিনি ব্যক্তিগত একটি বর্ণও লিখতেন না।
[তিন]
তিনি রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি বলতেন, 'তাদের যদি সংসারের ব্যয় নির্বাহের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে, তাহলে তারা নিশ্চিন্তে উম্মাহর খেদমতে আত্মনিয়োগ করতে পারবে।'
[চার]
উজির রজা বিন হাইওয়া বলেন, একদিন রাতে আমি উমর ইবনে আবদুল আজিজের সঙ্গে কথা বলছিলাম। হঠাৎ প্রদীপ নিভে গেল। আমি বললাম-'আমিরুল মুমিনিন, ভৃত্যকে ডেকে দিই; সে বাতিটি ঠিক করে দিক।'
তিনি উত্তর দিলেন-'না, ওকে ঘুমোতে দিন। আমি তার ওপর একসঙ্গে দুটি কাজ চাপাতে চাই না।'
'তাহলে আমিই ঠিক করে দিই'।
'না, অতিথির সেবাগ্রহণ মানবিক শিষ্টাচারবিরোধী।' খলিফা উত্তর দিলেন। তিনি নিজেই উঠে প্রদীপটি ঠিক করলেন এবং তাতে তেল ভরলেন। এরপর এসে আমাকে বললেন, 'আমি যখন উঠেছি, তখন যেমন উমর ইবনে আবদুল আজিজ ছিলাম; এখন বসার সময়ও সেই উমর ইবনে আবদুল আজিজই আছি।'
[পাঁদ]
একবার তিনি সংবাদ পেলেন—তার জনৈক সঙ্গী মৃত্যুবরণ করেছে। তিনি মৃত ব্যক্তির পরিজনের কাছে গিয়ে তাদেরকে সান্ত্বনা জানালেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারস্থ লোকেরা তখন শোকে চিৎকার করে কাঁদছিল। তিনি তাদেরকে বললেন, 'থামো; তোমাদের এই আত্মীয় তোমাদেরকে রিজিক প্রদান করতেন না; তোমাদের যিনি রিজিক দান করেন, তিনি তো চিরঞ্জীব, তার মৃত্যু নেই। তোমাদের এই আত্মীয় তোমাদের কারও গর্ত পূরণ করেননি; তিনি কেবল নিজের গর্তই পূরণ করেছেন। মনে রেখো, তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আছে একটি করে গর্ত; আল্লাহর শপথ! সে অবশ্যই তা পূর্ণ করবে। সুতরাং কেউ যদি কাঁদতে চায়, সে যেন নিজের জন্য কাঁদে। কারণ, আজ তোমাদের সঙ্গী যে গন্তব্যে গমন করেছেন, আগামীকাল সবাই সেখানেই গমন করবে।'
[ছয়]
তিনি তার গভর্নরদের উদ্দেশে প্রেরিত পত্রে লিখতেন, নামাজের সময় হলে সব ধরনের ব্যস্ততা পরিহার করবে। কারণ, যে নামাজে অবহেলা করে, সে ইসলামের অন্যান্য বিধানে আরও বেশি অবহেলা করে তা বিনষ্ট করবে।
[সাত]
তিনি তার গভর্নরদের কাছে উপদেশমূলক বিভিন্ন পত্র প্রেরণ করতেন। কখনো এমনও হতো যে, পত্রপাঠ করে গভর্নর আপন দায়িত্ব হতে অব্যাহতি প্রদান করত। আবার কখনো তার প্রদত্ত উপদেশমালার প্রভাব-তীব্রতার কারণে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দায়িত্বে অব্যাহতি দিয়ে দূর পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে আসত। প্রকৃতপক্ষে এর রহস্য হলো—নসিহত ও
উপদেশ যখন বক্তার হৃদয়-গহীন থেকে নিষ্ঠাপূর্ণ আবেগে নিঃসৃত হয়, তখন তা শ্রোতার হৃদয়গভীরে প্রবেশ করে।
একবার তিনি জনৈক গভর্নরকে লিখলেন, আমি তোমাকে জাহান্নামে জাহান্নামিদের অনন্তকাল দীর্ঘ বিনিদ্র রজনীর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। নিজেকে নিয়ে তোমার ব্যস্ততা যেন তোমাকে আল্লাহ হতে বিমুখ না করে আর এরূপ উদাসীন অবস্থা যেন তোমার অন্তিম মুহূর্ত এবং আমাদের আশাভঙ্গের কারণ না হয়।
বর্ণনাকারীগণ বলেন, পত্র পাঠ করার পর সেই গভর্নর নিজেই দায়িত্বে অব্যাহতি প্রদান করে উমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট চলে এলেন। খলিফা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে?!'
'আমিরুল মুমিনিন! আপনি তো আপনার পত্র দ্বারা আমার হৃদয়দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহর শপথ! আমি আর কখনো কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করব না।' গভর্নর উত্তর দিলেন।
[আট]
একবার জনৈক ব্যক্তি তাকে বলল, 'আল্লাহ আপনাকে ইসলামের পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন।' উত্তরে তিনি বললেন, 'বরং আল্লাহ ইসলামকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন।'
📄 খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর মৃত্যু
ঐতিহাসিকগণ উমর ইবনে আবদুল আজিজের মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, তার জনৈক ক্রীতদাস বনু উমাইয়ার পক্ষ হতে ষড়যন্ত্র করে তার খাবার বা পানীয়তে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল। বনু উমাইয়ার প্রতি খলিফার কঠোর আচরণ এবং জনগণের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎকৃত সম্পদ তাদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করে জনগণকে ফেরত প্রদান ইত্যাদি বিষয় বনু উমাইয়াকে তার প্রতি বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।
উমর বিন আবদুল আজিজের বারোজন সন্তান ছিল। মৃত্যুর পূর্বে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনার সন্তানরা তো দরিদ্র ও নিঃস্ব। তাদের জন্য কিছু অসিয়ত করে যাবেন না?
উত্তরে তিনি বলেন,
(إِنَّ وَلِيَّ اللَّهُ الَّذِي نَزَّلَ الْكِتٰبَ وَهُوَ يَتَوَلَّى الصَّلِحِينَ )
আমার অভিভাবক তো আল্লাহ; যিনি কিতাব নাজিল করেছেন আর তিনি পুণ্যবানদের অভিভাবকত্ব করেন।
[সুরা আরাফ: ১৯৬]
আল্লাহর শপথ! আমি তাদেরকে অন্য কারও হক প্রদান করব না। তারা তো দুই অবস্থা হতে মুক্ত নয়। যদি তারা সৎ হয়, তাহলে চিন্তা কীসের! আল্লাহই তো সৎকর্মশীলদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর যদি তারা অসৎ হয়, তাহলে আমি তাদের পাপাচারে সহযোগিতা করতে পারি না। এরপর তিনি তার পুত্রদেরকে ডেকে এনে অন্তিম বিদায় জানান এবং তাদেরকে সান্ত্বনা দেন। সবশেষে তিনি তাদেরকে বলেন, 'যাও, আল্লাহই তোমাদের রক্ষা করবেন এবং তোমাদের উত্তম তত্ত্বাবধান করবেন।'
বর্ণনাকারীগণ উল্লেখ করেছেন, আমরা উমর ইবনে আবদুল আজিজের জনৈক পুত্রকে আল্লাহর রাস্তায় আশিটি ঘোড়ায় পূর্ণ যুদ্ধসরঞ্জাম দান করতে দেখেছি। বিপরীতে পূর্বতন খলিফা সুলায়মান বিন আবদুল মালিক তার সন্তানদের জন্য প্রচুর সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন। তার জনৈক পুত্রকে আমরা উমর ইবনে আবদুল আজিজের সন্তানদের কাছে হাত পাততে দেখেছি। এর রহস্য হলো—উমর ইবনে আবদুল আজিজ তার সন্তানদের মহান আল্লাহর হাওয়ালা করে গিয়েছিলেন; তাই আল্লাহ তাদেরকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছেন। আর সুলায়মান ও অন্যান্য শাসক তাদের সন্তানদের রেখে গিয়েছিল সম্পদের হাওয়ালা করে; সন্তানরা তাদের সম্পদ নষ্ট করেছে আর সম্পদ ধ্বংস হয়েছে সন্তানদের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে।
এরপর তিনি উপস্থিত পরিবারস্থ লোকদেরকে কামরা হতে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সকলে বের হয়ে গেলেও খলিফাপত্নী ফাতিমা ও তার ভাই মাসলামা বিন আবদুল মালিক দরজায় বসে থাকেন। এ সময় তারা খলিফাকে বলতে শোনেন, 'উজ্জ্বল অবয়ববিশিষ্টদের স্বাগতম! এগুলো তো কোনো মানুষ বা জিনের অবয়ব নয়'!
এরপর তিনি তেলাওয়াত করেন-
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ)
ওই পরকালীন নিবাস তো আমি সে সকল লোকের জন্যই নির্ধারণ করব, যারা পৃথিবীতে বড়ত্ব দেখাতে ও ফাসাদ সৃষ্টি করতে চায় না। শেষ পরিণাম তো মুত্তাকিদেরই অনুকূলে থাকবে। [সুরা কাসাস : ৮৩]
এরপর খলিফার কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে আসে। সকলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পায়-তার চক্ষুযুগল বন্ধ, তিনি কিবলামুখী হয়ে আছেন এবং ইন্তিকাল করেছেন।
খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. চল্লিশ বছর বয়সে ১০১ হিজরি সনের ২৫ রজব (৭২০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি) হিমসের দাইরে সিমআন এলাকায় ইন্তেকাল করেন।