📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সুলায়মান বিন আবদুল মালিক বিন মারওয়ান

📄 সুলায়মান বিন আবদুল মালিক বিন মারওয়ান


[জুমাদাল উখরা ৯৬ হিজরি— সফর ৯৯ হিজরি] [ফেব্রুয়ারি ৭১৫ খ্রিষ্টাব্দ— সেপ্টেম্বর ৭১৭ খ্রিষ্টাব্দ]
ভাই ওয়ালিদের মৃত্যুর পর তার স্থলাভিষিক্ত হন সুলায়মান বিন আবদুল মালিক। জনগণ নির্বিশেষে তার নামে বায়আত গ্রহণ করে। তবে বিশিষ্ট সেনাপতি কুতায়বা বিন মুসলিম তার ব্যাপারে শঙ্কিত হন এবং বায়আত গ্রহণ না করার সংকল্প করেন। তখন সুলায়মান তাকে বরখাস্ত করে তার পরিবর্তে ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাবকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন।
সংবাদ পেয়ে কুতায়বা সুলায়মানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং তাকে অপসারণের উদ্দেশ্যে সৈন্যসমাবেশের চেষ্টা চালান। তিনি বক্তৃতার মাধ্যমে ইরাকবাসীকে সুলায়মান-বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করলেও তারা তার আহ্বানে সাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তখন তিনি ইরাকবাসীর প্রতি তার অতীত অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে ইরাকের বিভিন্ন গোত্র ও গোষ্ঠীর নিন্দা ও সমালোচনা শুরু করেন। এতে ইরাকিরা ক্রুদ্ধ হয়ে তার বিরোধিতায় তৎপর হয় এবং তাকে হত্যার চেষ্টা চালায়। ৯৬
হিজরির জিলহজ মাসে বিরোধীরা সফল হয় এবং কুতায়বাকে তার এগারো ভাই ও ভ্রাতুষ্পুত্রসহ হত্যা করে।
ইবনে কাছির রহ. বলেন—
কুতায়বা বিন মুসলিম ছিলেন সে যুগের শ্রেষ্ঠতম ও নেতৃস্থানীয় এক গভর্নর। তিনি ছিলেন একজন মহান ও খ্যাতিমান সেনাপতি, সমরকুশলী যোদ্ধা এবং প্রশংসনীয় চিন্তা ও দূরদর্শিতার অধিকারী। গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন যুদ্ধে ও ইসলামি বিজয়াভিযানে তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। তার হাতে অগণিত মানুষ হিদায়াত লাভ করেছে এবং ইসলাম গ্রহণ করে দ্বীনের আনুগত্য করেছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার কীর্তি ও কর্মপ্রচেষ্টার মূল্যায়ন করবেন, তার সংগ্রাম ও কর্মসাধনা বিফল করবেন না।
কিন্তু পরিশেষে তিনি এমন এক স্খলনের শিকার হন, যা তার পতন ও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি খলিফার আনুগত্য বর্জন করেন আর মৃত্যু তাকে দ্রুত পাকড়াও করে নেয়। উম্মাহর ঐক্য ও সংঘবদ্ধতা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি জাহিলিয়াতের মৃত্যুর শিকার হন। কিন্তু তার অতীত আমল নিশ্চয়ই তার ত্রুটি-বিচ্যুতি মোচন করবে এবং পুণ্যসমূহ বহুগুণে সমৃদ্ধ করবে। আল্লাহ পাক তার যাবতীয় ত্রুটি উপেক্ষা করুন এবং তাকে ক্ষমা করে দিন।
খলিফা সুলায়মান হাজ্জাজের গভর্নর ও সেনাপতিদেরকেও বরখাস্ত করেন। সুলায়মানের লোকজন এসব গভর্নর ও সেনাপতিদের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের শিকার সেনানায়ক ও গভর্নরদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন— ভারতবর্ষে বিজয়াভিযানের মহান সেনাপতি মুহাম্মাদ বিন কাসিম, সুলায়মানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারী ও পরে নিহত মহান বীর কুতায়বা বিন মুসলিম, বন্দিত্বের শিকার মহান বীর সেনাপতি মুসা বিন নুসায়র এবং হত্যার শিকার মুসাপুত্র আবদুল আজিজ বিন মুসা বিন নুসায়র। শেষোক্ত দুজন ছিলেন মাগরিব, উত্তর আফ্রিকা ও আন্দালুসে পরিচালিত ইসলামি বিজয়াভিযানের দুই মহান সেনাপতি।

টিকাঃ
২৯. পূর্বতন খলিফা ওয়ালিদ তার ভাই সুলায়মানকে খিলাফত অধিকার হতে বঞ্চিত করে নিজ পুত্র আবদুল আজিজকে পরবর্তী খলিফা ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন। তখন হাজ্জাজ, কুতায়বা প্রমুখ গভর্নরগণও ওয়ালিদকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু ওয়ালিদ উক্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার পূর্বেই ইন্তেকাল করেন এবং সুলায়মানই খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হন। তখন কুতায়বা আশঙ্কা করেন যে, সুলায়মান নিশ্চয়ই এর প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন। দ্রষ্টব্য: প্রাগুক্ত, ৯/১৫৩।
৩০. প্রাগুক্ত, ৯/১৫৪-১৫৫।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সুলায়মান কর্তৃক উমর ইবনে আবদুল আজিজকে পরবর্তী খলিফা নির্বাচন

📄 সুলায়মান কর্তৃক উমর ইবনে আবদুল আজিজকে পরবর্তী খলিফা নির্বাচন


খলিফা সুলায়মানের শাসনামলে তার ভাই বিশিষ্ট সেনাপতি মাসলামা বিন আবদুল মালিকের নেতৃত্বে পুনরায় কনস্টান্টিনোপল জয়ের প্রচেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু দীর্ঘ এক বছর অবরোধ করে রাখার পরও শেষ পর্যন্ত মুসলিম বাহিনী কনস্টান্টিনোপল জয় করতে ব্যর্থ হয়। এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসবে।
ঐতিহাসিক ইবনে জারির তাবারি রহ. বনু উমাইয়ার নিষ্ঠাবান উজির রজা বিন হাইওয়ার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন—অসুস্থ অবস্থায় খলিফা সুলায়মান বিন আবদুল মালিক আমার সঙ্গে পরামর্শ করলেন যে, তিনি তার অপ্রাপ্তবয়স্ক এক পুত্রকে পরবর্তী খলিফা নির্ধারণ করতে চান। আমি তাকে বললাম, 'খলিফা যদি কোনো সৎ ও উপযুক্ত ব্যক্তিকে মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব দিয়ে যান, তাহলে তা মৃত্যুপরবর্তী জীবনে কল্যাণের কারণ হবে।'
এরপর তিনি তার পুত্র দাউদকে খলিফা নির্ধারণ করা যায় কি না, এ বিষয়ে আমার পরামর্শ চাইলেন। আমি বললাম, 'সে তো এখন আপনার কাছ থেকে অনেক দূরে কনস্টান্টিনোপলে যুদ্ধের ময়দানে আছে। এ তথ্যও তো জানা নেই যে, সে বেঁচে আছে, নাকি শহিদ হয়ে গেছে।' খলিফা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে আপনি কাকে ভালো মনে করেন?' আমি উত্তর দিলাম, 'আমিরুল মুমিনিন! আপনিই ভেবে দেখুন।' এরপর তিনি বললেন, 'উমর ইবনে আবদুল আজিজের বিষয়ে আপনার কী মত?' আমি বললাম, 'আল্লাহর শপথ! আমি তাকে ভালো জানি; তিনি গুণী মুসলমান; সততা ও সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। কিন্তু আমার আশঙ্কা হয় যে, তাকে মনোনীত করা হলে আপনার ভাইয়েরা তা মেনে নেবে না।' খলিফা বললেন, 'আল্লাহর শপথ! তাকেই নির্বাচন করা হবে।'
উজির রজা এরপর খলিফাকে পরামর্শ দেন—তিনি যেন উমর ইবনে আবদুল আজিজকে পরবর্তী খলিফা ঘোষণার পাশাপাশি পরবর্তী দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে তার ভাই ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের নামও ঘোষণা করেন। তখন মারওয়ান-পরিবার উমরের মনোনয়নে (আপত্তি না করে) সন্তুষ্ট থাকবে। উজিরের সঙ্গে পরামর্শ শেষে খলিফা সুলায়মান নিম্নোক্ত পত্র লিপিবদ্ধ করার নির্দেশ দেন—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
এটি আল্লাহর বান্দা সুলায়মান বিন আবদুল মালিকের পক্ষ হতে উমর ইবনে আবদুল আজিজের উদ্দেশে লিখিত পত্র। আমি তাকে আমার অবর্তমানে খিলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করলাম এবং তার মৃত্যুর পর পরবর্তী খলিফা হিসেবে ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিকের নাম ঘোষণা করলাম। সকলে তাকে খলিফা হিসেবে মেনে নাও এবং তার আনুগত্য করো। সকলে আল্লাহকে ভয় করো, পরস্পরে বিবাদবিসংবাদের শিকার হয়ো না। অন্যথায় তোমাদের শত্রুরা তোমাদের ওপর হামলা করার দুঃসাহস দেখাবে।
এরপর খলিফা এই শাহি ফরমান মোহরাঙ্কিত করে নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান কাব বিন হামিদ আবাসির কাছে পাঠিয়ে দেন। খলিফা তাকে নির্দেশ দেন যে, তিনি যেন উমাইয়া রাজপরিবারের সকলকে সমবেত করেন এবং সকলের কাছ থেকে উক্ত ফরমানের বিষয়বস্তু মেনে নেওয়ার বায়আত তলব করেন। কেউ বায়আত গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে খলিফা তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। নিরাপত্তাপ্রধান খলিফার নির্দেশ কার্যকর করেন।
খলিফার মৃত্যুর পর উজির রজা দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি সকলকে দাবিকের মসজিদে সমবেত হতে নির্দেশ দেন। খliফা সুলায়মানকে দাবিকের মসজিদের পাশেই দাফন করা হয়েছিল। রজা বিন হাইওয়া ফরমানের লিখিত বক্তব্য সকলকে পাঠ করে শোনালে মারওয়ান- পরিবারের সদস্যগণ একে একে উঠে বায়আত গ্রহণ করতে থাকে। উমর ইবনে আবদুল আজিজ মসজিদের পেছন দিকে বসে ছিলেন। তিনি যখন নিশ্চিত হন যে, তাকেই পরবর্তী খলিফা নির্ধারণ করা হয়েছে, তখন তিনি বলে ওঠেন, 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।' দায়িত্বভারে নতুন খলিফার পদযুগল যেন ভারী হয়ে গিয়েছিল। উপস্থিত লোকজন তাকে ধরে মিম্বরে বসিয়ে দেয়। এরপর তিনি সকলের উদ্দেশে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী এক ভাষণ প্রদান করেন। মসজিদ থেকে বের হওয়ার পর তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য শাহি বাহন উপস্থিত করা হলে তিনি তাতে আরোহণ করতে অস্বীকৃতি জানান এবং নিজের সাধারণ বাহনে চড়ে সকলের সঙ্গে দামেশকে প্রত্যাবর্তন করেন।
খলিফা সুলায়মান বিন আবদুল মালিক ৯৯ হিজরি সনের সফর মাসে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00