📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মৃত্যু

📄 হাজ্জাজ বিন ইউসুফের মৃত্যু


ওয়ালিদের খিলাফত আমলেই ৯৫ হিজরি সনে (৭১৪ খ্রিষ্টাব্দে) ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ছাকাফি ইন্তেকাল করেন।
ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. লিখেছেন—
মোটকথা, হাজ্জাজ ছিল ইরাকবাসীর অতীত অপরাধ, ইমামদের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহ ও অশালীন আচরণ, অবাধ্যতা ও স্বেচ্ছাচারী আচরণ ইত্যাদি পাপাচারের এক শাস্তি।
তিনি আরও লিখেছেন—
পূর্বেও নবীজির এই হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে যে, ছাকিফ গোত্রে একজন মিথ্যুক ও একজন দুর্ধর্ষ খুনির আবির্ভাব ঘটবে। হাজ্জাজ যখন আসমা রাযি.-এর পুত্র আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি.-কে হত্যা করার পর তার কাছে উপস্থিত হয়েছিল, তখন আসমা রাযি. উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, ‘মিথ্যুক হলো মুখতার আর দুর্ধর্ষ খুনি হলো হাজ্জাজ বিন ইউসুফ।’ হাজ্জাজ ছিল নাসিবিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত; সে আলি রাযি. ও তার অনুসারীদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত এবং বনু উমাইয়ার মারওয়ান বংশের প্রতি হৃদ্যতা রাখত। সে ছিল স্বেচ্ছাচারী ও জেদি। সামান্য সন্দেহের বশবর্তী হয়ে রক্তপাত ঘটানোয় সে ছিল অগ্রগামী। তার থেকে এমন সব কদর্য ও মারাত্মক কথা বর্ণিত হয়েছে, যার বাহ্যিক দাবি কুফরি ব্যতীত অন্য কিছু নয়। যদি সে সেসব কথা থেকে তাওবা করে থাকে এবং তা পরিহার করে থাকে, তাহলে তো ভালো; অন্যথায় তাকে এসব অন্যায়ে অভিযুক্ত হিসেবেই গণ্য করা হবে। তবে তার দোষ-ত্রুটি বর্ণনায় কিছু অতিরঞ্জনও হয়ে থাকতে পারে। কারণ, শিয়ারা বিভিন্ন কারণে তার প্রতি
অত্যন্ত বিদ্বেষ পোষণ করত। আর তাই তারা তার বিভিন্ন কথা বিকৃত করে প্রচার করত এবং তার থেকে বর্ণনা করার সময় বিভিন্ন নোংরা ও কদর্য বাক্য সংযোজন করত।
ইবনে কাছির রহ. আরও লিখেছেন-
হাজ্জাজের যেসব গর্হিত কর্মকাণ্ডের কথা আমাদের কাছে বিশুদ্ধ বর্ণনায় পৌঁছেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো তার নির্বিচারে রক্তপাত। মহান আল্লাহর দরবারে তার শাস্তি পাওয়ার জন্য এটিই যথেষ্ট। বাকি সে ইসলামি বিজয়াভিযানের প্রতি প্রবল অনুরাগী ছিল। কুরআন চর্চাকারীদের বিপুল অনুদান প্রদানের ক্ষেত্রেও তার সুখ্যাতি ছিল। এ খাতে সে প্রচুর ব্যয় করত। কথিত আছে, মৃত্যুর সময় হাজ্জাজ মাত্র তিনশ দিরহাম সম্পদ রেখে যায়। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. বলেন
আল্লাহর দুশমন হাজ্জাজের আর কোনো কর্মের প্রতি আমার ঈর্ষা হয় না, যেমন ঈর্ষা হয় তার কুরআনপ্রীতি ও কুরআনচর্চাকারীদের জন্য তার বিপুল অনুদানের প্রতি এবং তার মৃত্যুশয্যার এই উক্তির প্রতি-'হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করে দিন; মানুষ তো মনে করে যে, আপনি তা করবেন না।'
মৃত্যুশয্যায় হাজ্জাজ এই পঙ্ক্তিদ্বয় আবৃত্তি করছিলেন—
يَا رَبِّ قَدْ حَلَفَ الْأَعْدَاءُ وَاجْتَهَدُوا * بِأَنَّنِي رَجُلٌ مِنْ سَاكِنِي النَّارِ ا يَحْلِفُوْنَ عَلَى عَمْيَاءَ وَيْحَهُمْ * مَا عِلْمُهُمْ بِعَظِيمِ الْعَفْوِ غَفَّارِ
মালিক আমার, দুর্ভাগা ওরা শপথ করে বলে-আমি জাহান্নামি, আমি বদকার; অন্ধ ওরা জানে না আমার খোদা দয়ালু, ক্ষমাশীল-গাফফার!
বিখ্যাত তাবেয়ি হজরত হাসান বসরি রহ.-কে এ কথা অবহিত করা হলে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! সে যদি নাজাত লাভ করে, তাহলে এ পঙ্ক্তিদ্বয়ের কারণেই লাভ করবে।
ইমাম আহমাদ রহ. আপন সনদে যুবায়র বিন আদি রহ. হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, একদিন আমরা হজরত আনাস বিন মালিক রাযি.-এর কাছে উপস্থিত হয়ে হাজ্জাজের জুলুমের বিষয়ে অভিযোগ করলাম। তখন তিনি বললেন, 'তোমরা ধৈর্যধারণ কর। কারণ, তোমাদের জীবনে যে বছর, কাল বা দিন অতিবাহিত হয়, তার পরবর্তী সময় পূর্বের চেয়ে মন্দ হবে, যতক্ষণ না তোমরা আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবে। আমি এ কথা তোমাদের নবীজির কাছ থেকে শুনেছি।'
শা'বি রহ. বলেন, 'আল্লাহর শপথ! যদি তোমরা বেঁচে থাকো (এবং হাজ্জাজ-পরবর্তী কাল প্রত্যক্ষ করো), তখন হাজ্জাজের আকাঙ্ক্ষা করবে।'
আসমায়ি রহ. বলেন, হাসান বসরি রহ.-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'আপনি না বলেছিলেন, প্রত্যেক পরবর্তী পূর্ববর্তীর চেয়ে মন্দ হবে। তাহলে এই যে হাজ্জাজের পর এসেছেন উমর ইবনে আবদুল আজিজ?!' তিনি উত্তর দেন, 'মানুষের তো কিছু সময় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার প্রয়োজনও আছে।'
জনৈক ব্যক্তি সুফিয়ান সাওরি রহ.-কে জিজ্ঞেস করেছিল, 'আপনি কি হাজ্জাজ ও আবু মুসলিম খোরাসানি সম্পর্কে এ সাক্ষ্য দেবেন যে, তারা জাহান্নামি?' তিনি উত্তরে বলেন, 'যদি তারা তাওহিদের স্বীকারোক্তি প্রদান করে থাকে, তাহলে আমার উত্তর—না।'
৯৬ হিজরিতে (৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে) জামে দামেশকের নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। সে সময় পৃথিবীতে সৌন্দর্য, কুশলতা ও আভিজাত্যে উক্ত মসজিদের কোনো দৃষ্টান্ত ছিল না। ফিরাযদাক বলেন, 'দামেশকবাসী তাদের দেশে জান্নাতের একটি প্রাসাদে অবস্থান করছেন।' তার উদ্দেশ্য ছিল দামেশকের মসজিদ।
ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন, আব্বাসি খলিফা আমিরুল মুমিনিন আল-মাহদি যখন আল-কুদস জিয়ারতের উদ্দেশ্যে দামেশকে গমন করেন এবং জামে দামেশক প্রত্যক্ষ করেন, তখন তিনি তার সচিব আবু উবায়দ আশআরিকে বলেন, 'বনু উমাইয়া তিনটি বিষয়ে আমাদের চেয়ে অগ্রবর্তী।
হয়ে গেছে। এই মসজিদ, আমার জানামতে ভূপৃষ্ঠে এর কোনো দৃষ্টান্ত নেই; মাওয়ালিদের মহত্ত্ব ও আভিজাত্য এবং উমর ইবনে আবদুল আজিজ। আল্লাহর শপথ! আমাদের মাঝে কখনো তার সমতুল্য কেউ হবে না।' এরপর যখন আল-মাহদি বাইতুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে কুব্বাতুস সাখরা (The Dome of the Rock) অবলোকন করেন, তখন তার সচিবকে বলেন, আর এটি হলো চতুর্থটি। উল্লেখ্য, কুব্বাতুস সাখরা নির্মাণ করেছিলেন পঞ্চম উমাইয়া খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান।
খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক ৯৬ হিজরি সনে মৃত্যুবরণ করেন এবং ইন্তেকালের পূর্বেই পরবর্তী খলিফা হিসেবে আপন সহোদর সুলায়মান বিন আবদুল মালিককে মনোনীত করে যান।

টিকাঃ
২৬. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৯/১২৩।
২৭. প্রাগুক্ত, ৯/১২৪।
২৮. প্রাগুক্ত, ৯/১২৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00