📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দিরুল জামাজিমের যুদ্ধ

📄 দিরুল জামাজিমের যুদ্ধ


৮২ হিজরি সনের শাবান মাসে (৭০১ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) সংঘটিত হয়। হাজ্জাজ তার বাহিনী নিয়ে দিরে কুররায় অবস্থানরত ইবনুল আশআছের মোকাবিলার উদ্দেশ্যে রওনা হন। হাজ্জাজের
সহায়তায় শাম থেকেও প্রচুর সৈন্য এসেছিল। ইবনুল আশআছ দিরুল জামাজিমের কাছে বের হয়ে আসলে উভয় বাহিনীর মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধ দীর্ঘদিন স্থায়ী হওয়ায় খলিফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শে বসেন।
তারা তাকে পরামর্শ দেয় যে, হাজ্জাজকে অপসারণ করলে যদি ইরাকবাসী আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ও রক্তপাতের চেয়ে হাজ্জাজকে অপসারণ করাই শ্রেয়তর হবে। তখন আবদুল মালিক তার ভাই মুহাম্মাদ বিন মারওয়ান ও পুত্র আবদুল্লাহ বিন আবদুল মালিককে ডেকে আনেন এবং তাদের সঙ্গে বিরাট এক বাহিনীকে ইরাক অভিমুখে প্রেরণ করেন। তাদেরকে তিনি ইরাকবাসীর উদ্দেশে লিখিত একটি চিঠিও প্রদান করেন। চিঠিতে তিনি লেখেন, যদি তোমাদের গভর্নরের পদ হতে হাজ্জাজকে অপসারণ করলে তোমরা আমার প্রতি সন্তুষ্ট হও, তাহলে আমি তাকে বরখাস্ত করছি আর তোমাদের জন্য শামবাসীর পরিমাণ অনুদান প্রেরণ করছি। ইবনুল আশআছ নিজের পছন্দমতো যেকোনো নগরীর দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। যতদিন আমি ও সে জীবিত থাকবে, ততদিন সে সেখানকার গভর্নর থাকবে। আর ইরাকের দায়িত্ব থাকবে মুহাম্মাদ বিন মারওয়ানের কাছে।
খলিফা তার পত্রে আরও উল্লেখ করেছিলেন যে, ইরাকবাসী যদি তার আহ্বানে সাড়া না দেয়, তাহলে হাজ্জাজ আপন দায়িত্বে বহাল থাকবে এবং যুদ্ধের নেতৃত্বও তার কাছে থাকবে। মুহাম্মাদ বিন মারওয়ান ও আবদুল্লাহ বিন আবদুল মালিক হাজ্জাজের আনুগত্য করবে। যুদ্ধ বা অন্য কোনো বিষয়ে তারা দুজন হাজ্জাজের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবে না।
ইবনুল আশআছের কাছে সংবাদ পৌঁছার পর তিনি তার সেনাপতিদের সমবেত করেন এবং তাদেরকে উক্ত প্রস্তাব মেনে নিতে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু তারা চিৎকার করে বলে ওঠে, 'আল্লাহর শপথ! আমরা এ প্রস্তাব গ্রহণ করব না। আমরা সংখ্যায় অধিক; আর তারা আমাদের বশীভূত হয়ে পড়েছে। আল্লাহর শপথ! আমরা কিছুতেই এ প্রস্তাবে সাড়া দেবো না।'
যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠায় খলিফার নির্দেশনা মোতাবেক খলিফার প্রেরিত শামের বাহিনী হাজ্জাজ-বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। এরপর পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। দিনের পর দিন যুদ্ধ চলতে থাকে; যুদ্ধের মাঝেই সে বছর শেষ হয়। প্রতিদিন বা একদিন পরপরই উভয় বাহিনী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ত। অধিকাংশ দিনই যুদ্ধ-পরিস্থিতি শামের বাহিনীর প্রতিকূলে থাকত।
এরইমাঝে হাজ্জাজ একদিন প্রতিপক্ষের কারিদের (আলিমদের) অংশের ওপর হামলা চালানোর নির্দেশ দেন। কারণ, পুরো বাহিনী তাদেরই অনুসরণ করত এবং তারাই সকলকে যুদ্ধে দৃঢ়পদ রাখতেন।
এ হামলা সফল হলে বহু সংখ্যক আলিম নিহত হয়। ইবনুল আশআছের বাহিনী পরাজিত হয়ে বিভিন্ন দিকে পালিয়ে চলে যায়, অনেকেই বন্দি হয় হাজ্জাজের বাহিনীর হাতে। ইবনুল আশআছ নিজে তুর্কি শাসক রডবিলের রাজ্যে আশ্রয় নেন।
এ সময় হাজ্জাজ রডবিলের কাছে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি দেন যে, তিনি রডবিলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এমন বিশাল এক বাহিনী প্রেরণ করবেন, যার মোকাবিলা করার মতো শক্তি তার নেই। ভীত রডবিল আশ্রয়গ্রহণকারী ইবনুল আশআছকে হত্যা করে তার কর্তিত মস্তক হাজ্জাজের কাছে প্রেরণ করে। যুদ্ধবন্দিদেরকে হাজ্জাজের কাছে উপস্থিত করা হলে হাজ্জাজ তাদের অল্প কয়েকজনকে ক্ষমা করে দিয়ে অধিকাংশকে হত্যা করেন। বিশিষ্ট তাবেয়ি আলিম সাঈদ বিন জুবায়ের রহ.-কেও হত্যা করা হয়।
এ ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে শায়খ খিযরি বেক লিখেছেন— এভাবেই উম্মাহর জীবনে অতিবাহিত হয় প্রায় বিশটি বছর। এ সময় ইসলামি রাষ্ট্রের অধিকাংশ অঞ্চল ফিতনা ও অস্থিরতায় আক্রান্ত ছিল এবং পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও হত্যাযজ্ঞে মেতে ছিল। অব্যাহত ফিতনা এ সময় মুসলিম উম্মাহকে বিজয়াভিযান বিস্তৃত করার এবং শত্রুভূমি সংকুচিত করার সুযোগ দেয়নি। কারণ,
উম্মাহর অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও যুদ্ধই তখন চরমে। নিজেদের দখলে থাকা ভূখণ্ড রক্ষা করতে পারাই তখন যথেষ্ট বিবেচিত হচ্ছিল।
তৎকালীন ঘটনাপ্রবাহে শায়খ খিযরি বেকের পর্যবেক্ষণই প্রতিফলিত হচ্ছিল।
৭০ হিজরি সনে আবদুল মালিক বিন মারওয়ান বার্ষিক ট্যাক্স প্রদানের শর্তে রোমানদের সঙ্গে সন্ধি করতে বাধ্য হন।
৭১ হিজরি সনে মাগরিবে যুদ্ধরত মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী পিছু হটে এবং কায়রোয়ানের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়।
অনেক ঘটনার মাঝে এ দুটি দৃষ্টান্তমাত্র। তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো, এই ধরনের উপর্যুপরি দুর্যোগ, বিদ্রোহ ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও উমাইয়া সাম্রাজ্য অতি সীমিত সময় বাদে কখনোই সমকালীন অন্যান্য সাম্রাজ্যের সামনে দুর্বল প্রতিপন্ন হয়নি।
৮৪ হিজরি সনে হাজ্জাজ ইরাকের ঘাঁটি ওয়াসিত নগরীর নির্মাণ সমাপ্ত করেন।
৮৬ হিজরির শাওয়াল মাসে (৭০৫ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) আবদুল মালিক বিন মারওয়ান তার একুশ বছর দেড় মাসের খিলাফত আমল শেষে ইন্তেকাল করেন।

টিকাঃ
২৪. মুহাম্মাদ খিযরি বেক, আদ-দাওলাতুল উমাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৪৬৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00