📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি.-এর খিলাফত

📄 আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি.-এর খিলাফত


[মুহাররম ৬১ হিজরি—জমাদাল উখরা ৭৩ হিজরি] [অক্টোবর ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ—নভেম্বর ৬৯২ খ্রিষ্টাব্দ]
বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি.-এর জন্ম হিজরতের প্রথম বছর মদিনায়। তিনিই ছিলেন মদিনায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম মুহাজির-সন্তান। তার পিতা যুবায়র ইবনুল আওয়াম রাযি. ছিলেন নবীজির ফুফাতো ভাই।
৬৪ হিজরি সনে তৃতীয় উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়া বিন ইয়াযিদের ইন্তেকালের পর ইসলামি রাষ্ট্রের অধিকাংশ নগরীর গভর্নরগণ আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি.-এর আনুগত্য স্বীকার করে নিয়ে তার নামে বায়আত গ্রহণ করে। তবে পরিস্থিতি যে পুরোপুরি শান্ত ও বিশৃঙ্খলামুক্ত হয়ে গিয়েছিল, তা কিন্তু নয়। ৬৫ হিজরি সনে শামের মান্জ রাহিতের কাছে মারওয়ান ও আবদুল্লাহ বিন যুবায়রের অনুসারীদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং মারওয়ান শামে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। কিছুদিন পর মারওয়ান ইবনুল হাকামের মৃত্যু হলে শামবাসী তার পুত্র আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের হাতে বায়আত গ্রহণ করে। এরপর শামবাসী ও আবদুল্লাহ বিন যুবায়রের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাত চলতে থাকে। ৭১ হিজরি
=করেন এবং শামবাসী তাকেই খলিফা হিসেবে মেনে নেয়। মারওয়ানের মৃত্যুর পর শামবাসী তার পুত্র আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের হাতে বায়আত গ্রহণ করে। ৭৩ হিজরি সনে আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি.-এর শাহাদাতের পর আবদুল মালিক বিন মারওয়ান সমগ্র ইসলামি বিশ্বে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। উলামায়ে কেরামের মতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করার পর হতে যতদিন আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি. জীবিত ছিলেন, ততদিন তিনিই ছিলেন মুসলিম উম্মাহর স্বীকৃত ও বৈধ খলিফা।
সনে উমাইয়া নেতা আবদুল মালিক বিন মারওয়ান পুরো ইরাকভূমির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি.-এর নিয়ন্ত্রণে থাকে কেবল হিজাযভূমি। এরপর আবদুল মালিক ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সাকাফিকে তার সুবিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কায় আবদুল্লাহ বিন যুবায়রকে অবরোধ করার নির্দেশ দেন। হাজ্জাজ-বাহিনী মক্কা অবরোধ করে, মক্কায় বাইরে থেকে রসদসামগ্রী আগমনের পথ বন্ধ করে দেয় এবং মিনজানিক দিয়ে মক্কার অভ্যন্তরে গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে। হাজ্জাজ-বাহিনীর প্রবল আক্রমণে মক্কাবাসী ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইবনে যুবায়রের কাছ থেকে সরে পড়তে থাকে। ইবনে যুবায়রের সঙ্গে থাকেন কেবল তার মা আসমা রাযি। তিনি আপন পুত্রকে একাকী-সঙ্গীহীন হলেও হকের পথে অবিচল থাকার উপদেশ দিয়ে বিদায় জানান।
হাজ্জাজ-বাহিনীর গোলার আঘাতে কাবার দেয়াল তখন ভগ্নপ্রায় হয়ে পড়েছিল। তাই অবরোধের মধ্যেই আবদুল্লাহ বিন যুবায়র কাবাঘরের পুনর্নির্মাণ সমাপ্ত করেন এবং নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করেন। নবীজি আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাযি.-কে বলেছিলেন—
«لَوْلَا حَدَاثَةُ عَهْدِ قَوْمِكِ بِالْكُفْرِ لَنَقَضْتُ الْكَعْبَةَ ، وَلَجَعَلْتُهَا عَلَى أَسَاسِ إِبْرَاهِيمَ»
তোমার কওমের লোকদের কুফর পরিত্যাগের সময়কাল নিকটবর্তী না হলে আমি কাবাঘর ভেঙে তা ইবরাহিমের ভিত্তির ওপর পুনর্নির্মাণ করতাম।
শাহাদাতের কয়েকদিন পূর্বে আবদুল্লাহ বিন যুবায়র তার মায়ের কাছে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করেন, 'আম্মাজান, সকলে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। এমনকি আমার দুই পুত্র ও আত্মীয়রাও আজ আমার সঙ্গে নেই। সীমিত যে কয়েকজন এখনো আমার সঙ্গে আছে, তাদের নিয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সামান্য সময়ও টিকে থাকা সম্ভব নয়। আমি যদি পার্থিব কোনোকিছু প্রাপ্তির বিনিময়ে খিলাফত পরিত্যাগ করি, তাহলে
তারা আমাকে তা দিতে প্রস্তুত আছে। এখন বলুন, এ বিষয়ে আপনার কী মত?'
উত্তরে আসমা রাযি. বলেন, 'প্রিয় বৎস আমার, আল্লাহর শপথ! নিজের কর্তব্য ও করণীয় তো তুমি ভালো করেই জানো। তোমার যদি বিশ্বাস থাকে যে, তুমি হক ও ন্যায়ের পথে আছ এবং মানুষকে সত্যের পথে আহ্বান করছ, তাহলে এ পথেই অটল-অবিচল থাকো। এ ন্যায়ের পথেই তোমার সঙ্গীরা শহিদ হয়েছে। সুতরাং বনু উমাইয়ার দাসদেরকে তোমাকে কাবু করার এবং তোমাকে নিয়ে খেলা করার সুযোগ দিয়ো না। আর যদি তুমি পার্থিব সম্পদ কামনা করে থাকো, তাহলে তো তুমি অতি নিকৃষ্ট এক দাস! তুমি নিজেকে ধ্বংস করেছ, ধ্বংস করেছ তোমার নিহত সঙ্গীদেরকে। আর যদি তুমি বলো যে, আমি তো হকের পথেই ছিলাম; কিন্তু আমার সঙ্গীগণ হীনবল হয়ে পড়ায় আমার সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়েছে; তাহলে শোনো, এটি স্বাধীনচেতা বীরের ধর্ম নয়, ধার্মিক ব্যক্তির নীতি নয়। বলো, পৃথিবীতে কি তুমি চিরদিন বেঁচে থাকবে? তাহলে শাহাদাতের মৃত্যুই কি শ্রেয় নয়?'
'আমার আশঙ্কা হয় যে, শামের সৈন্যরা আমাকে হত্যা করার পর লাশ বিকৃত করে ফেলবে।'
'বৎস আমার, মেষকে জবাই করার পর তার চামড়া ছিলে ফেললে কোনো কষ্ট হয় না।' আসমা রাযি. উত্তর দেন।
এরপর ইবনে যুবায়র মায়ের কপালে চুমু খেয়ে বলেন, 'আল্লাহর শপথ! এটিই আমার সিদ্ধান্ত। আজকের দিন পর্যন্ত আমি সবসময় সত্যের পথেই আহ্বান করেছি, কখনো দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকিনি এবং পার্থিব জীবনকে ভালোবাসিনি। আমার জীবদ্দশায় আল্লাহর দ্বীনের মর্যাদা লঙ্ঘিত হচ্ছে, আমি কীকরে তা মেনে নিতে পারি?! একমাত্র এই ধর্মীয় ক্রোধের কারণেই আমি বিদ্রোহ করেছি। কিন্তু আমি আপনার মতামত জানতে চাচ্ছিলাম। আপনার কথা শুনে আমার উপলব্ধি আরও সুদৃঢ় হয়েছে। আম্মাজান, দেখুন, আজই আমি শহিদ হতে যাচ্ছি। এতে আপনার কষ্ট যেন বৃদ্ধি না পায়। আপনি আল্লাহ পাকের ফয়সালা মেনে নিন।'
মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি. প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং বীরের ন্যায় লড়াই করেন। তিনি তখন আবৃত্তি করছিলেন-
أَسْمَاءُ يَا أَسْمَاءُ لَا تَبْكِينِي * لَمْ يَبْقَ إِلَّا حَسَبِيْ وَدِينِي وَصَارِمُ لَانَتْ بِهِ يَمِينِي
আসমা, ওগো আসমা, কেঁদো নাকো শোকে আর! হাতের তৃপ্তি তরবারি ছাড়া, মানসম্মান ও ধর্ম ছাড়া কী আছে বলো আমার!
আবদুল্লাহ বিন যুবায়র শহিদ হলে শামের যোদ্ধারা খুশিতে তাকবির দিয়ে ওঠে। এ কথা শোনার পর আবদুল্লাহ বিন উমর রাযি. মন্তব্য করেন, তার জন্মগ্রহণের সংবাদ শুনে তাকবির প্রদানকারীরা তার মৃত্যুতে তাকবির প্রদানকারীদের চেয়ে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ ছিল। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ নিজের ক্ষোভ চরিতার্থ করতে আবদুল্লাহ বিন যুবায়রের মৃতদেহ শূলে চড়ান এবং বার্তাবাহক পাঠিয়ে আসমা রাযি.-কে ডেকে পাঠান। কিন্তু আসমা রাযি. হাজ্জাজের কাছে উপস্থিত হতে অস্বীকৃতি জানান। এরপর হাজ্জাজ নিজেই আসমা রাযি.-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলেন, 'দেখতে পাচ্ছেন-আল্লাহ কীভাবে সত্যকে বিজয়ী করলেন?' আসমা রাযি. উত্তর দেন, 'কখনো কখনো ন্যায় ও ন্যায়ের পথিকদের বিরুদ্ধে অন্যায়কে সাময়িক বিজয় দান করা হয়।' এরপর হাজ্জাজ বলেন, 'দেখেছেন-আমি আল্লাহর শত্রুদের
'কীভাবে পরাভূত করেছ?' আসমা রাযি। উত্তর দেন, 'আমি তো দেখতে পাচ্ছি—তুমি আমার ছেলের দুনিয়া শেষ করেছ আর সে তোমার আখিরাত শেষ করেছে।'
আবদুল মালিক বিন মারওয়ান আসমা রাযি.-এর সঙ্গে হাজ্জাজের অসদাচরণের কথা জানার পর পত্র পাঠিয়ে তাকে ভর্ৎসনা করেন এবং লেখেন, কোথায় তুমি আর কোথায় মহান বুজুর্গ ব্যক্তির কন্যা? তিনি হাজ্জাজকে আসমা রাযি.-এর সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেন। এরপর হাজ্জাজ আসমা রাযি.-এর কাছে উপস্থিত হয়ে বলেন, 'আম্মা, আমিরুল মুমিনিন আমাকে আপনার প্রতি খেয়াল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আপনার কোনো প্রয়োজন থাকলে আমাকে বলুন।' আসমা রাযি. উত্তর দেন, 'আমি তোমার মা নই; আমি কেবল পাহাড়ি পথে শূলে চড়ানো ওই ছেলেটির মা। আর আমার কোনো প্রয়োজন নেই।'
আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি. ৭৩ হিজরি সনের ১৭ জুমাদাল উখরা (৬৯২ খ্রিষ্টাব্দের ৩ নভেম্বর) ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের ক্ষমতা সুসংহত হয় এবং পুরো ইসলামি সাম্রাজ্যে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

টিকাঃ
২২. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৩৩৩।
২৩. মুসলমানদের মদিনায় হিজরতের পর মদিনার ইহুদিরা এ কথা প্রচার করেছিল যে, তারা মুসলমানদের জাদু করেছে। তাই মুসলমানরা কিছুতেই সন্তান জন্ম দিতে পারবে না। কিছুদিন পর হজরত আসমা রাযি.-এর সন্তান আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি. ভূমিষ্ঠ হন। তিনিই ছিলেন মদিনায় জন্মগ্রহণকারী প্রথম মুসলমান। তখন মদিনাবাসী মুসলমানগণ আনন্দে তাকবির-ধ্বনি প্রদান করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00