📄 ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান
[রজব ৬০ হিজরি রবিউল আউয়াল ৬৪ হিজরি] [এপ্রিল ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ-নভেম্বর ৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দ]
ইয়াযিদের (১ম ইয়াযিদ) জন্ম ২৬ হিজরি সনে। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণকালে তার বয়স ছিল ৩৪ বছর। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পরই ইয়াযিদ হিজাযের গভর্নরের কাছে বার্তা প্রেরণ করে নির্দেশ দেন- কোনোপ্রকার অবকাশ না দিয়ে প্রয়োজনে কঠোরতা অবলম্বন করে হলেও অনতিবিলম্বে যেন হুসাইন বিন আলি রাযি. ও আবদুল্লাহ বিন যুবায়রের কাছ থেকে তার বায়আতের স্বীকৃতি গ্রহণ করা হয়।
ঠিক একই সময় কুফাবাসী হুসাইন রাযি.-এর কাছে এই মর্মে বার্তা প্রেরণ করে যে, কুফায় আমরা সংঘবদ্ধ একটি শক্তি। আপনি নির্দ্বিধায় আমাদের কাছে চলে আসুন। তখন হুসাইন রাযি. তার চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকিলকে কুফার পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে কুফায় প্রেরণ করেন।
মুসলিম বিন আকিল বেশ কিছুদিন কুফায় অবস্থান করেন। এরপর তিনি কুফায় ইয়াযিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রচেষ্টা চালান এবং হুসাইনের বায়আতের পক্ষে ডাক দেন। চার হাজার লোক তার পক্ষে সমবেত হয়। কিন্তু কিছু সময় অতিবাহিত না হতেই তারা মুসলিমের সঙ্গ ত্যাগ করে। অল্প কয়েকদিন পরই নিঃসঙ্গ মুসলিম বন্দি হন এবং কুফার গভর্নর উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়।
মুসলিম বিন আকিল নিহত হওয়ার একদিন পূর্বে হজরত হুসাইন রাযি. মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশে রওনা হন। উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থের দাবিতে সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই তাকে মক্কা ত্যাগ না করার পরামর্শ দেন। কিন্তু হুসাইন রাযি. আপন ইজতিহাদ ও ব্যক্তি-সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
৬১ হিজরি সনের ১০ মুহাররম (৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ অক্টোবর) হুসাইন রাযি. কারবালার সন্নিকটে ইরাক থেকে আগত উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের বাহিনীর হাতে শহিদ হন। ইরাকি বাহিনী হুসাইন রাযি.-কে আপন মত পরিবর্তনের জন্য সামান্য সুযোগও দেয়নি। এরপর হুসাইন রাযি.-এর কর্তিত মস্তক খলিফা ইয়াযিদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ইয়াযিদের হুসাইন রাযি.-কে হত্যা করার ইচ্ছা ছিল না। হুসাইন হত্যাকাণ্ডের সংবাদ পেয়ে ইয়াযিদ ব্যথিত হয়ে অশ্রুপাত করেন এবং হুসাইনপরিবারের জীবিত সদস্যদের সঙ্গে সদাচরণ করেন।
শায়খ খিযরি বেক এই মর্মান্তিক ঘটনার পর্যালোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন—
এভাবে এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এই ঘটনাপ্রবাহের সমাপ্তি ঘটে। মূলত ধৈর্যহীনতা ও সিদ্ধান্তের পরিণতি সম্পর্কে গভীর পর্যবেক্ষণের অভাবই ঘটনাপ্রবাহকে এই মর্মান্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। হজরত হুসাইন রাযি. হিতাকাঙ্ক্ষীদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং ইরাকবাসীর প্রতি সুধারণা করেছিলেন। দুষ্ট ও চক্রান্তপ্রিয় কিছু লোকের চিঠি পেয়ে তিনি প্রভাবিত ও প্রবঞ্চিত হয়েছিলেন। তিনি তাদের কথা বিশ্বাস করে নিজ পরিবার-পরিজনসহ এমন এক জাতির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন, যাদের কাছে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারের কোনো মূল্যই ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় দেখুন— হজরত হুসাইন রাযি.-এর বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করেছিল, যারা তাকে হত্যা করেছিল, সেই বাহিনীটি কাদের দ্বারা গঠিত হয়েছিল? বাহিনীটি গঠিত হয়েছিলে ইরাকিদের সমন্বয়ে! দুদিন পূর্বে যারা শ্লোগান তুলেছিল—আমরা 'শীআনে আলি' ও আলির পক্ষাবলম্বী, তারাই শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল।
মোটকথা, হুসাইন রাযি.-এর কুফা অভিমুখে রওনা হওয়া ছিল একটি ইজতিহাদি ও সিদ্ধান্তগত ভুল, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য আজও পর্যন্ত বিদ্যমান এক বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতার দুর্যোগ টেনে এনেছে। যুগে যুগে অনেকেই এই বিষয়ে কেবল এ উদ্দেশ্যে কলম ধরেছে যে, হৃদয়ে সুপ্ত আগুন যেন আরও উসকে ওঠে এবং বিভেদ ও অনৈক্য যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়।
প্রকৃতপক্ষে হুসাইন রাযি. যা প্রত্যাশা করেছিলেন, তার জন্য না তিনি নিজে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, না বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। ফলে তার প্রত্যাশাও পূরণ হয়নি; বরং তাকে নির্মমভাবে শহিদ হতে হয়েছে।
মর্মান্তিক এই ঘটনায় বিভিন্নভাবে যারা শরিক ছিল, সকলেই এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। তাদের কৃতকর্মের হিসাব তো আল্লাহই নেবেন। তবে ইতিহাস এ ঘটনা থেকে আমাদের জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা সংরক্ষণ করেছে। আর তা হলো—গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ সম্পাদন করতে চাইলে উক্ত কাজের স্বাভাবিক প্রস্তুতি গ্রহণ না করে অগ্রসর হওয়া মোটেও সমীচীন নয়। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তখনই তরবারি উত্তোলন করতে হবে, যখন বিজয় অর্জনের জন্য যথেষ্ট বা কাছাকাছি শক্তি থাকবে। পাশাপাশি উক্ত কাজে জাতির বৃহত্তর স্বার্থ ও কল্যাণও নিহিত থাকতে হবে। যেমন সমাজে সীমাতিরিক্ত জুলুম-নিপীড়ন চলছে বা অন্যায় শাসনের কারণে জনসাধারণ সহ্যের শেষ সীমায় উপনীত হয়েছে। অপরদিকে হুসাইন রাযি. যখন ইয়াযিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, তখন সাধারণ জনগণ ইয়াযিদের হাতে বায়আত গ্রহণ করেছিল এবং তখন পর্যন্ত তার থেকে অত্যাচার ও জুলুম-আচরণ প্রকাশ পায়নি।
যারা হজরত হুসাইন রাযি.-কে কুফার উদ্দেশে রওনা হতে বারণ করেছিলেন, তাদের একজন হলেন বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি.। তিনি তাকে বলেছিলেন, 'ইরাকিরা প্রতারক জাতি। আপনি কিছুতেই তাদের কাছে যাবেন না। আপনি এখানেই অবস্থান করুন। কারণ, আপনি হলেন হিজাযবাসীর সর্দার। ইরাকবাসী যদি প্রকৃতই আপনাকে কামনা করে থাকে, যেমনটি তারা দাবি করছে, তাহলে তাদেরকে এ বার্তা পাঠান যে, তারা যেন তাদের শত্রুদের এলাকাছাড়া করে। এরপর আপনি রওনা হবেন। আর যদি একান্ত যেতেই চান, তাহলে (কুফায় না গিয়ে) ইয়ামেনে যান। কারণ, একদিকে ইয়ামেনভূমিতে অনেক দুর্গ ও গিরিপথ রয়েছে; অপরদিকে তা সুবিস্তৃত ও সুবিশাল।
এলাকা। আর সেখানে আপনার পিতার অনেক অনুসারীও আছে। আপনি সেখানে অবস্থান করে অন্যান্য অঞ্চলের জনগণের কাছে বার্তা ও দূত পাঠাতে পারবেন এবং আপনার আহ্বায়কদের দৃঢ়পদ রাখতে পারবেন। আমি মনে করি, তখন আপনি নিরাপদে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবেন।'
বিশিষ্ট তাবেয়ি আবদুল্লাহ বিন মুতি' তাকে বলেন, 'হে আল্লাহর রাসুলের দৌহিত্র! আমি আপনাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি! আপনি ইসলামের পবিত্রতা লঙ্ঘন করছেন! আল্লাহর দোহাই দিয়ে আপনাকে বলছি, আল্লাহর রাসুলের মর্যাদা রক্ষা করুন! আরব জাতির পবিত্রতা রক্ষা করুন। আল্লাহর শপথ! বনু উমাইয়ার হাতে যা আছে, আপনি যদি তা পেতে চান, তাহলে তারা আপনাকে হত্যা করবে। আর তারা যদি আপনাকে হত্যা করতে পারে, তাহলে এরপর আর কাউকে ভয় করবে না। আল্লাহর শপথ! এ তো ইসলামের মর্যাদা ও পবিত্রতা; আপনি তা নষ্ট করতে যাচ্ছেন। আপনি এ কাজ করবেন না; আপনি কুফায় যাবেন না।'
কিন্তু হজরত হুসাইন রাযি. আপন সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। জ্ঞানী-গুণী হিতাকাঙ্ক্ষীগণ তাকে অনুরোধ করতে থাকেন; কিন্তু তিনি তাদের ইজতিহাদের পরিবর্তে আপন ইজতিহাদকেই গ্রহণ করেন। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে এ বিষয়টিই প্রতিভাত হয় যে, তার হিতাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শই ঠিক ছিল আর তার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. 'মিনহাজুস সুন্নাহ' গ্রন্থে লিখেছেন—
হজরত হুসাইন রাযি.-এর কুফা অভিমুখে রওনা হওয়ার মধ্যে ধর্মীয় বা পার্থিব কোনো দৃষ্টিতেই কল্যাণ ছিল না। তার ইরাকে রওনা ও হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছিল, তিনি নিজ অঞ্চলেই অবস্থান করলে তা সংঘটিত হতো না। তিনি যে কল্যাণ অর্জন ও অকল্যাণ দমনের প্রত্যাশা করেছিলেন, তার
কিছুই অর্জিত হয়নি; বরং তার এই সফর ও হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে অকল্যাণই বৃদ্ধি পেয়েছে।
শায়খ মুহিব্বুদ্দিন আল-খাতিব রহ. লিখেছেন—
এ ঘটনা যদিও অত্যন্ত নির্মম ও বেদনাদায়ক; কিন্তু বনু উমাইয়া ও তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার পতনের পর এই দুর্যোগপূর্ণ ঘটনাকে এত বিশাল করে দেখার কোনো যৌক্তিক কারণ আমি দেখি না!
হজরত হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের ঘটনা নিঃসন্দেহে ইসলামি ইতিহাসের একটি দুঃখজনক অধ্যায়; কিন্তু খলিফা উমর রাযি., উসমান রাযি. ও আলি রাযি.-এর শাহাদাত-ঘটনার সঙ্গে তুলনা করলে তা মোটেও উল্লেখযোগ্য নয়। তাহলে প্রতিবছর আশুরার দিন যারা হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাতের স্মরণে বিলাপ ও আর্তনাদ করে এবং শোক ও মাতমের ‘আয়োজন’ করে, খলিফাত্রয়ের মৃত্যুদিবসে তারা কেন তেমনটি করে না?!
টিকাঃ
১৫. মুহাম্মাদ খিযরি বেক, আদ-দাওলাতুল উমাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৪৫৯-৪৬০।
১৬. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৪৫৭।
১৭. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৪৫৭।
১৮. ইবনে তাইমিয়া, মিনহাজুস সুন্নাহ, ৪/৫৩০।
১৯. শায়খ মুহিব্বুদ্দিন আল-খাতিব, আবু বকর ইবনুল আরাবি কৃত ‘আল-আওয়াসিম মিনাল কাওয়াসিম’-এর টীকা, পৃষ্ঠা: ১/২৪৪।
📄 বনু উমাইয়ার সঙ্গে আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি.-এর সংঘাতের সূচনা
নবী-দৌহিত্র হজরত হুসাইন রাযি.-এর হত্যাকাণ্ডের সংবাদ হজরত আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি.-এর কাছে পৌঁছতেই তিনি ইয়াযিদকে খিলাফতের দায়িত্ব হতে অপসারণের ঘোষণা করেন এবং আপন খিলাফতের স্বপক্ষে জনগণের বায়আত গ্রহণ করেন। সংবাদ পেয়ে ইয়াযিদ মদিনা অবরোধের উদ্দেশ্যে বাহিনী প্রেরণ করে। মদিনাবাসী আত্মসমর্পণ না করে প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেয়। ৬৩ হিজরির জিলহজ মাসে (৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে) উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ‘হাররা’ নামক এ যুদ্ধে মদিনার অধিকাংশ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নিহত হয়। আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি. তখন মক্কায় অবস্থান করছিলেন। এরপর ইয়াযিদের প্রেরিত বাহিনী মক্কা অবরোধের উদ্দেশ্যে রওনা করে। কিন্তু পথিমধ্যেই ইয়াযিদের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছলে তারা ফিরে যায়।
৬৪ হিজরি সনের ১৪ রবিউল আউয়াল (৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দের ১০ নভেম্বর) খলিফা ১ম ইয়াযিদের মৃত্যু হয়।