📄 সমাজে পুনরায় শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা
হজরত মুয়াবিয়া রাযি.-এর খিলাফতকালে জনগণ শান্তি-নিরাপত্তার সঙ্গে নিশ্চিন্তে বসবাস করে। এ সময় মুসলমানদের সামরিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং বিজয়াভিযানের ধারা বেগবান, গতিশীল ও বিস্তৃত হয়। অবশ্য কুফা, বসরা ও পাশ্ববর্তী অন্যান্য এলাকাসহ ইরাক অঞ্চল তখনও ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। ইরাকের অধিবাসীগণ বারবার বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা ও ফিতনা সৃষ্টি করে সমকালীন মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সম্প্রীতি বিনষ্ট করছিল। খলিফা কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে যখন কোনো কোমল স্বভাবের গভর্নর ইরাক অঞ্চলে আগমন করতেন, ইরাকি জনগণ তাকে তুচ্ছজ্ঞান করত এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ প্রচেষ্টা চালাত। আর কঠোর মেজাজের কোনো গভর্নর আগমন করলে তারা তাকে ভয় ও শ্রদ্ধা করত এবং নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও তার আনুগত্য করত। এ কারণেই হজরত মুগিরা বিন শুবা রাযি. এ অঞ্চলের গভর্নর থাকাকালে (৪১-৪৯ হিজরি) পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী আপন প্রজ্ঞা ও কৌশলের পাশাপাশি বিচক্ষণতা ও কঠোরতা ব্যবহার করেন এবং ইরাকবাসীকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন। তার মৃত্যুর পর খলিফা মুয়াবিয়া রাযি. ৫০ হিজরি সনে যিয়াদ বিন আবু সুফিয়ানকে ইরাকের গভর্নর নিযুক্ত করেন। যিয়াদ ছিলেন স্বভাব-কঠোর একজন প্রশাসক। ইরাকবাসীর স্বভাব-প্রকৃতি সম্বন্ধে তিনি সম্যক অবগত ছিলেন। তাই গভর্নরের দায়িত্ব লাভ করার পরই তিনি জনগণের সামনে দণ্ডায়মান হয়ে তার সেই বিখ্যাত ভাষণটি প্রদান করেন, ইতিহাসে যা 'আল-বাতরা' নামে খ্যাতি লাভ করেছে। সেই ঐতিহাসিক ভাষণের চুম্বকাংশ নিম্নে তুলে ধরা হলো-
আমার উপলব্ধি হলো তোমাদের এই পরিস্থিতির শেষাংশের সংশোধন সে পথেই হবে, যে পথে প্রথমাংশের সংশোধন হয়েছে; অর্থাৎ কোমলতা প্রদর্শন করা হবে; কিন্তু এমন কোমলতা নয়, যাতে দুর্বলতা প্রকাশ পায়, আবার কঠোরতাও করা হবে;
কিন্তু এমন কঠোরতা নয়, যাতে জুলুম ও সীমালঙ্ঘন থাকবে।
আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি মনিবের কাছ থেকে ভৃত্যের, মুকিমের কাছ থেকে মুসাফিরের এবং সুস্থ ব্যক্তি হতে অসুস্থ ব্যক্তির প্রতিশোধ গ্রহণ করব। এমনকি তোমাদের কেউ যখন বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন ভয়ে মুখ থেকে কেবল এই প্রবাদ বাক্যই বের হবে—
أُنْجُ يَا سَعْدُ، فَقَدْ هَلَكَ سَعِيدًا
হে সাদ, নিজের আত্মরক্ষার চিন্তা করো; সাইদের চিন্তা বাদ দাও। সে তো নিপাত গেছে!
অথবা পরিস্থিতি এমন হবে যে, তোমাদের বর্ষা আমার সামনে একেবারে সোজা হয়ে যাবে।
সাবধান! রাহাজানি-ডাকাতির কোনো সংবাদ যেন আমার কানে না আসে। কোনো ডাকাত গ্রেফতার হয়ে আমার সামনে এলে তার পরিণতি একটাই—দুনিয়া থেকে বিদায়। আমি তোমাদেরকে কেবল ততটুকু অবকাশ দেবো, যতটুকু সময়ের মধ্যে সংবাদ কুফায় পৌঁছায় এবং সেখান থেকে আবার বার্তাবাহক আমার কাছে ফিরে আসে। কারও মুখ থেকে যেন জাহিলি কোনো শ্লোগান বের না হয়। কেউ জাহিলি শ্লোগান দিলে আমি তার জিহ্বা কেটে ফেলব। তোমরা এমন সব আচরণ ও ঘটনার জন্ম দিচ্ছ, যা ইতিপূর্বে কেউ করেনি। আমিও প্রত্যেক অপরাধের জন্য যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করেছি। কেউ কাউকে ডুবিয়ে মারলে আমিও তাকে ডুবিয়ে মারব। কেউ অন্যের বাড়িতে আগুন দিলে আমি তাকে আগুনে জ্বালাব। কেউ অন্যের গৃহপ্রাচীর ছিদ্র করলে আমি তার হৃৎপিণ্ড ছিদ্র করে দেবো। কেউ অন্যের জন্য কবর খনন করলে সে কবরে আমি তাকে জীবন্ত দাফন করব। নিজেদের হাত ও বচন আমার দিকে প্রসারিত করো না, আমিও আমার হাত ও শান্তি প্রসারিত করব না। তোমাদের কারও আচরণে-উচ্চারণে সাধারণ জনগণের জীবনাচার-বিরোধী কোনও কিছু প্রকাশ পেলে আমি তার শিরশ্ছেদ করব।
লোকসকল, আমরা তোমাদের নেতা, তোমাদের নিরাপত্তারক্ষক। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যে নেতৃত্ব-ক্ষমতা প্রদান করেছেন, তার ভিত্তিতেই আমরা তোমাদের শাসন করব। আল্লাহ আমাদেরকে যে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ দান করেছেন, তা দিয়ে আমরা তোমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করব। তোমাদের প্রতি আমাদের এই অধিকার আছে যে, তোমরা আমাদের মর্জিমতো আমাদের আনুগত্য করবে। আমাদের প্রতিও তোমাদের এই অধিকার আছে যে, শাসনকার্যে আমরা তোমাদের প্রতি ন্যায়বিচার করব। সুতরাং আমাদের নিঃশর্ত আনুগত্য করে তোমরা নিজেদেরকে সম্পদ ও ন্যায়বিচারের অধিকারী বানাও।
আর শুনে রাখো, অন্যান্য বিষয়ে ছাড় দিলেও তিনটি বিষয়ে আমি কখনোই শিথিলতা করব না। গভীর রাতেও অভাবী বা বিপদগ্রস্ত কোনো ব্যক্তি আমার দরজায় কড়া নাড়লে আমি তাকে ফিরিয়ে দেবো না। কারও পাওনা অনুদান যথাসময়ে প্রাপ্তিতে আমি বাধা দেবো না। তোমাদের কোনো বাহিনীকে আমি শত্রুভূমিতে আটকে রাখব না। তোমাদের প্রতি দাবি হলো, তোমরা নিজেদের নেতৃবৃন্দের জন্য কল্যাণ ও সততার দোয়া করবে। তারা তোমাদের নেতা, তোমাদের শৃঙ্খলারক্ষক। তারা তোমাদের আশ্রয়স্থল; তাদের কাছেই তোমরা আশ্রয় নেবে। মনে রেখো, তোমরা ভালো মানুষ হয়ে গেলে তারাও তোমাদের সঙ্গে ভালো মানুষ হয়ে যাবেন। অন্তরে তাদের প্রতি বিদ্বেষ ধারণ করবে না, তাহলে সব সময় অস্থিরতা ও কষ্টেই নিপতিত থাকবে। তাদের কাছে এমন কিছু প্রত্যাশা করবে না, যা পূরণ করলে তোমাদের অকল্যাণ হবে।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের প্রত্যেককে প্রত্যেকের সহায়ক বানান। আমি তোমাদের মাঝে কোনো আইন জারি করলে তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে। আল্লাহর শপথ! তোমাদের মধ্যে অনেকেই আমার হাতে মারা পড়বে। সুতরাং প্রত্যেকে আত্মরক্ষা করো। প্রত্যেকে চেষ্টা করো—আমার শিকারের তালিকায় যেন নিজের নাম না ওঠে!
এই কঠোর প্রশাসননীতির মাধ্যমে এবং কখনো কখনো নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে যিয়াদ বসরা ও পুরো ইরাক অঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হন। জনগণ যিয়াদকে প্রচণ্ড ভয় করত। সমাজের কেউ কারও দ্বারা নিরাপত্তাহানির আশঙ্কা করত না। পথে কারও কোনো বস্তু পড়ে গেলে অন্যরা ভুলেও সেদিকে তাকাত না। মালিক যথাস্থানে তার বস্তু পেয়ে যেত। মহিলারা ঘরের দরজা বন্ধ না করেই নিশ্চিন্তে রাত্রিযাপন করতে পারত।
জাতির ঐক্য ও সম্প্রীতি এবং শাসকের ন্যায়পরায়ণতা ও প্রভাব-ক্ষমতা একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ভারসাম্য রক্ষায় এবং বহির্রাষ্ট্রে বিজয়াভিযানের সূচনায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
আর তাই রাষ্ট্রের শৃঙ্খলাবিধান ও ঐক্যবদ্ধতার প্রচেষ্টায় সফল হওয়ার পরই খলিফা মুয়াবিয়া রাযি. নতুন করে বিজয়াভিযানের ধারা চালু করেন। হজরত মুয়াবিয়া রাযি.-এর যুগে বিজয়াভিযান একইসঙ্গে বিভিন্ন দিকে অব্যাহত ছিল। ইফ্রিকিয়া ও মাগরিব অঞ্চলে চলছিল আন্দালুস বিজয়ের প্রচেষ্টা। সমুদ্রপথে ভূমধ্যসাগরের (তখন রোম সাগর নামে
পরিচিত ছিল) বিভিন্ন দ্বীপ ও উপকূলীয় অঞ্চল জয়ের চেষ্টা চলছিল আর পূর্বে ইরাক অঞ্চল হতে মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা জয়ের চেষ্টা চলছিল। ততদিনে যেহেতু পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল, তাই মুসলিম সাম্রাজ্যের মূল প্রতিপক্ষ ছিল রোমান সাম্রাজ্য। আর রোমান সাম্রাজ্য যেহেতু স্থলবাহিনীর পাশাপাশি সমৃদ্ধ নৌ-শক্তিরও অধিকারী ছিল, তাই মুয়াবিয়া রাযি. ইসলামি রাষ্ট্রের নৌ সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতেও জোর দেন।
মুয়াবিয়ার রাযি.-এর আমলে মুসলিম নৌবহরের রণতরীর সংখ্যা সতেরোশ-তে পৌঁছেছিল। প্রতিটি রণতরী ছিল পর্যাপ্ত সৈন্য ও যুদ্ধাস্ত্রে সমৃদ্ধ। তিনি প্রথমে আক্কায় একটি শিপইয়ার্ড নির্মাণ করেন, এরপর ৫৪ হিজরি সনে মিশরের রওজা দ্বীপে আরেকটি শিপইয়ার্ড নির্মাণ করেন।
মুয়াবিয়া রাযি.-এর শাসনামলে দুদুবার স্থল ও নৌবাহিনীর সমন্বয়ে কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের প্রচেষ্টা চালানো হয়। অবশ্য দু-বারই মুসলিম অভিযাত্রীদল কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। এসব অভিযানে প্রবীণ সাহাবিগণসহ বিশিষ্ট সাহাবিদের অনেকেই অংশগ্রহণ করেন।
ইমাম বুখারি রহ. বিশুদ্ধ সনদে হজরত উম্মে হারাম বিনতে মিলহান রাযি. হতে উল্লেখ করেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন--
أَوَّلُ جَيْشِ مِنْ أُمَّتِي يَغْزُوْنَ الْبَحْرَ قَدْ أَوْجَبُوا، ... أَوَّلُ جَيْشِ مِنْ أُمَّتِي يَغْزُوْنَ مَدِينَةَ قَيْصَرَ مَغْفُوْرٌ لَهُمْ
আমার উম্মতের প্রথম যে দলটি নৌযুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে, তারা যেন (জান্নাত) অনিবার্য করে ফেলল। ... আমার উম্মতের প্রথম যে দলটি (রোমান সম্রাট) কায়সারের নগরী আক্রমণ করবে, তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে।
হাদিসে কায়সারের নগরী দ্বারা বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল উদ্দেশ্য।
ইমাম আহমাদ রহ. আপন সনদে আবু যিবইয়ান রহ. হতে উল্লেখ করেছেন যে, হজরত আবু আইয়ুব আনসারি রাযি. ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়ার সঙ্গে (কনস্টান্টিনোপল) অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বলেছিলেন, আমি মারা গেলে তোমরা আমার লাশ নিয়ে শত্রুভূমির অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে এবং যেখানে শত্রুবাহিনীর মুখোমুখি হবে, সেখানেই তোমাদের পদতলে আমাকে দাফন করবে। এরপর তিনি বলেন, আমি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
«مَنْ مَاتَ لَا يُشْرِكْ بِاللَّهِ شَيْئًا ، دَخَلَ الْجَنَّةَ»
যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে যে, সে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করেনি, সে জান্নাতে যাবে।
মুয়াবিয়া রাযি.-এর শাসনামলে মুসলিম নৌবাহিনী সিসিলি, জারবা, রোডস ও ক্রিটসহ বেশ কয়েকটি দ্বীপ জয় করে।
খলিফা মুয়াবিয়া রাযি.-এর শাসনামলে পরিচালিত বিজয়াভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সামনে 'উমাইয়া খিলাফতকালে ইসলামি বিজয়াভিযান' শীর্ষক স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদে করা হবে।
মুয়াবিয়া রাযি. ইসলামি রাষ্ট্রে ডাকব্যবস্থাও চালু করেছিলেন। ডাকব্যবস্থাকে কার্যকর ও গতিশীল করে তুলতে সুদীর্ঘ পথের নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর একএকটি মনজিল নির্ধারণ করা হয়েছিল। খলিফার বার্তা বিভিন্ন নগরীতে পৌঁছানোর জন্য প্রতিটি মনজিলে বাহনজন্তু প্রস্তুত থাকত। রাজধানী হতে কোনো বার্তা প্রেরণ করা হলে ডাকবিভাগের প্রধান দ্রুত তা প্রথম মনজিলে পৌঁছিয়ে দিতেন। প্রথম মনজিলের দায়িত্বশীল দ্রুত তা পৌঁছে দিতেন পরবর্তী মনজিলে। এভাবে সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে বার্তাটি পৌঁছে যেত কাঙ্ক্ষিত গভর্নর বা কর্মকর্তার কাছে। প্রতি দুই মনজিলের মাঝে দূরত্ব ছিল বারো মাইল। এ পরিমাণ দূরত্বকে আরবিতে 'বারিদ' বলা হয়। আর এ কারণেই আরবিতে ডাকব্যবস্থাকেও বলা হয় বারিদ। ডাকব্যবস্থার এ চিন্তাধারা পারসিকদের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছিল।
মুয়াবিয়া রাযি.-এর ব্যক্তিগত সচিব ও লিপিকার ছিলেন (শামীয় খ্রিষ্টান) সারজুন রুমি। যেহেতু তার শাসনামলে শামের দাপ্তরিক কার্যক্রম রোমান
ভাষায় পরিচালিত হতো, তাই রোমান ভাষায় পারদর্শী সারজুনকেই এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। সম্ভবত সারজুন রুমি খারাজ বিষয়ক সচিব ছিলেন। তিনি হজরত মুয়াবিয়া রাযি.-এর উপদেষ্টা ও একান্ত সচিবও ছিলেন।
এভাবেই কেটে যায় মুয়াবিয়ার রাযি.-এর খিলাফত আমলের প্রায় বিশ বছর। একসময় মুয়াবিয়া রাযি. অনুভব করেন যে, তার বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে। দীর্ঘ কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি পুরো ইসলামি বিশ্বকে বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলামুক্ত একক শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন। মুয়াবিয়া রাযি. উপলব্ধি করেন যে, তিনি যদি পরবর্তী খলিফা নির্ধারণের বিষয়টি সমাধান করে না যান, তাহলে মুসলিম উম্মাহ আবারও এক দীর্ঘমেয়াদি ফিতনায় জড়িয়ে যেতে পারে।
তিনি চিন্তা করে দেখেন যে, সার্বিক বিবেচনায় পরবর্তী খলিফা শাম থেকেই নির্বাচন করা শ্রেয়তর হবে। কারণ, তৎকালীন ইরাক ছিল বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার কেন্দ্র। কঠোর শক্তিপ্রয়োগ ব্যতীত ইরাককে নিয়ন্ত্রণ করা যেত না। অপরদিকে ভৌগোলিক দিক থেকে মিশর এমন অবস্থায় ছিল যে, যে কেউ সেখানে গভর্নর হিসেবে একচ্ছত্র শাসন করতে পারত। আর মদিনা যদিও তখনও অনেক সাহাবায়ে কেরাম ও সাহাবা-পুত্রদের কেন্দ্রস্থল ছিল; কিন্তু মদিনাবাসী এক ও একক নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল না। ফলে সেখান থেকে পরবর্তী খলিফা নির্বাচন করতে গেলে নতুন করে ফিতনা সৃষ্টির আশঙ্কা ছিল। বিপরীতে পুরো শাম অঞ্চল মুয়াবিয়া রাযি.-এর একক নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল। শামের জনগণ ছিল সুশাসনপ্রিয়, দক্ষ প্রশাসননীতির অনুসারী। পাশাপাশি সামরিক দিক থেকে যথেষ্ট শক্তিশালী শাম অঞ্চল ইসলামি রাষ্ট্রের সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে দারুল খিলাফাহ হলে সেখান থেকে শত্রু অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাও ছিল তুলনামূলক সহজ।
সবদিক বিবেচনা করে মুয়াবিয়া রাযি. উপলব্ধি করেন যে, নিজ পুত্র ইয়াযিদকে পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত করা হলে পরিস্থিতি তুলনামূলক অধিক নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ইয়াযিদকে পরবর্তী খলিফা ঘোষণা করা হলে শামের দিক থেকে কোনো ধরনের বিদ্রোহের আশঙ্কা ছিল না; ইরাক ও মিশরের গভর্নরদের সমর্থনলাভও ছিল সহজ। মদিনাবাসী যাতে এই নির্বাচনে একাত্মতা পোষণ করে, এ উদ্দেশ্যে তিনি কনস্টান্টিনোপলে
মুসলিম বাহিনী প্রেরণের সময় সাহাবায়ে কেরাম ও সাহাবা-পুত্রদের সঙ্গে তার পুত্র ইয়াযিদকেও প্রেরণ করেন এবং তাঁকেই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করেন।
মুয়াবিয়া রাযি. ৫০ হিজরি সনে পুত্র ইয়াযিদকে ওলিয়ে আহদ (ভবিষ্যৎ খলিফা) নির্বাচিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। জনগণকে ইয়াযিদের স্বপক্ষে বায়আত গ্রহণের আহ্বান জানানো হলে জনগণ তাঁর নামে বায়আত গ্রহণ করে। মৃত্যুশয্যায় মুয়াবিয়া রাযি. ইয়াযিদকে চারজন ব্যক্তি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেন—হুসাইন বিন আলি রাযি., আবদুল্লাহ বিন উমর রাযি., আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি. ও আবদুর রহমান বিন আবু বকর রাযি.।
হজরত মুয়াবিয়া রাযি. ৬০ হিজরি সনের রজব মাসে (৬৮০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে) আটাত্তর বছর বয়সে দামেশকে ইন্তেকাল করেন। যাহহাক বিন কায়স রাযি. তাঁর জানাজা পড়ান।
মুয়াবিয়া রাযি.-এর জীবদ্দশায়ই সমকালীন মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে ইয়াযিদের পক্ষে বায়আত গ্রহণ সম্পন্ন হয়। কিন্তু মদিনার গভর্নর মারওয়ান ইবনুল হাকাম সেখানে বায়আত গ্রহণের উদ্যোগ নিলে কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি তাতে আপত্তি করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল—একইসঙ্গে দুই ব্যক্তির নামে বায়আত হতে পারে না আর মুয়াবিয়া রাযি. নিজ সন্তানের নামে খিলাফতের বায়আতের নির্দেশ দিতে পারেন না। এ কারণেই মুয়াবিয়া রাযি.-এর ইন্তেকালের পর জনগণ নতুন করে ইয়াযিদের নামে বায়আত গ্রহণ করে। কিন্তু উল্লিখিত চারজন সাহাবি বায়আত গ্রহণে বিরত থাকেন। পরবর্তী সময়ে আবদুল্লাহ বিন উমর রাযি.-ও বায়আত গ্রহণ করেন এবং সবাইকে ইয়াযিদের খিলাফতের বিষয়ে একমত হতে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন—
'তোমরা যুক্তি হিসেবে বলছ যে, ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়া তো উম্মতে মুহাম্মাদীর শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি নয়, সবচেয়ে প্রাজ্ঞ-ফকিহ।
ব্যক্তিও নয় এবং মহত্ত্ব ও মর্যাদায়ও সর্বশ্রেষ্ঠ নয়। আমিও তা-ই বলি। কিন্তু আল্লাহর শপথ! উম্মতে মুহাম্মাদির ঐক্য ও অবিচ্ছিন্নতা আমার কাছে বিভক্তি ও বিসংবাদের চেয়ে প্রিয়।'
ইয়াযিদের খিলাফতের বায়আত গ্রহণকালে ইবনে উমর রাযি. আরও বলেন—
'সে যদি কল্যাণকর হয়, তাহলে আমরা তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকব। আর যদি মন্দ হয়, তাহলে ধৈর্যধারণ করব।'
আবদুল্লাহ বিন উমর রাযি.-এর পাশাপাশি আবদুর রহমান বিন আবু বকরও ইয়াযিদের নামে বায়আত গ্রহণ করেন। বাকি থাকেন কেবল হুসাইন বিন আলি রাযি. ও আবদুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি.।
পাঠকমনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এভাবে আগাম খলিফা নির্বাচন করে এবং নিজ পুত্রকেই ভাবী খলিফা নির্ধারণ করে হজরত মুয়াবিয়া রাযি. কি সঠিক কাজ করেছেন? এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা দুজন প্রাজ্ঞ ঐতিহাসিকের পর্যালোচনা উল্লেখ করছি।
১. আধুনিক যুগের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শায়খ খিযরি বেক রহ. বলেন—
মুসলিম সমাজের শৃঙ্খলারক্ষা এবং বিভক্তি দূর করে পুরো জাতিকে এক সুতায় গাঁথার জন্য ইতিহাসের সেই যুগসন্ধিক্ষণে (মুয়াবিয়া রাযি. কর্তৃক গৃহীত) এই পদ্ধতিই ছিল অবশ্যম্ভাবী ও একমাত্র করণীয়। কেননা, এ সময় খিলাফতের দায়িত্বলাভে আগ্রহী ব্যক্তির সংখ্যা ছিল অনেক আর প্রত্যেকেই এর উপযুক্তও ছিল।
অধিকন্তু তখন একদিকে ইসলামি সাম্রাজ্যের পরিসর চতুর্দিকে বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরো রাষ্ট্রের সকল প্রান্তের মাঝে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছিল, অপরদিকে এমন কোনো নির্দিষ্ট জাতি-গোষ্ঠী ছিল না, খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব যাদেরকে
প্রদান করা যেতে পারে। ফলে বিষয়টি অমীমাংসিত রেখে যাওয়ার অবশ্যম্ভাবী পরিণতি ছিল বিবাদ ও বিসংবাদ। ইতিহাসের এই স্তরের প্রতি গভীর দৃষ্টিতে তাকালে আমরা লক্ষ করব যে, সংখ্যায় কম হলেও কুরাইশ-শাখা বনু আবদে মানাফ এ সময় পুরো কুরাইশ জাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিল এবং জনগণ তাদের এই শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিও দিত। কিন্তু তারা খিলাফত নিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছিল এবং এর ফলে মুসলিম উম্মাহ সমূহ ক্ষতি ও ধ্বংসের শিকার হতে যাচ্ছিল। এ জাতীয় পরিস্থিতিতে জনগণ যদি নির্দিষ্ট কোনো পরিবারের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তাদের আনুগত্য স্বীকার করে নেয় এবং তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও নেতৃত্ব-অধিকারের স্বীকৃতি প্রদান করে, তাহলে বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তা-ই সর্বশ্রেষ্ঠ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
আশ্চর্যের বিষয় দেখুন, হজরত মুয়াবিয়া রাযি. নিজ পুত্র ইয়াযিদকে খলিফা নির্বাচিত করায় তার সমালোচনায় সবচেয়ে মুখর হলো শিয়া সম্প্রদায়। অথচ শিয়াদের আকিদা ও বিশ্বাস হলো— খিলাফত আলি-পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং আলি-পরিবারের প্রত্যেক খলিফার মৃত্যুর পর তার পুত্র উত্তরাধিকার সূত্রে খিলাফতের অধিকার লাভ করবে। অপরদিকে (পরবর্তীকালে বনু উমাইয়ার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী) বনু আব্বাসও এ পদ্ধতি সাদরে গ্রহণ করে নিয়েছিল এবং খিলাফতকে নিজেদের পারিবারিক অধিকার গণ্য করে অন্যদের জন্য প্রকারান্তরে তা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। মোটকথা, মুয়াবিয়া রাযি. যা করেছেন, উম্মাহর চলমান পরিস্থিতিতে তা-ই ছিল অবশ্যকরণীয়।
২. হিজরি একাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন রহ. বলেন-
প্রকৃতপক্ষে সমকালীন মুসলিম উম্মাহর সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধতার কল্যাণ-চিন্তাই হজরত মুয়াবিয়া রাযি.-কে অন্য কারও পরিবর্তে নিজ পুত্র ইয়াযিদকে পরবর্তী খলিফা নির্বাচনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। বনু উমাইয়ার বিশিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ তখন ইয়াযিদের
মনোনয়নের বিষয়ে একমত ছিল। আর বনু উমাইয়াই ছিল তখনকার কুরাইশ গোত্রের মূল ও শক্তিশালী অংশ। এ কারনেই মুয়াবিয়া রাযি. যাদেরকে ইয়াযিদের চেয়েও অধিক উপযুক্ত মনে করতেন, তাদের পরিবর্তে ইয়াযিদকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন এবং শরিয়তের দৃষ্টিতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় 'উম্মাহর ঐক্য ও নিরবচ্ছিন্নতা' বজায় রাখার উদ্দেশ্যে শ্রেষ্ঠতরের পরিবর্তে অন্যকে বেছে নিয়েছিলেন। মুয়াবিয়া রাযি.-এর ধার্মিকতা ও ন্যায়পরায়ণতা এবং নবীসংস্পর্শের অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য আমাদেরকে এ ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে নিষেধ করে। অধিকন্তু বিশিষ্ট ও প্রবীণ সাহাবিগণ তখন বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও নীরব ছিলেন, যা এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সংশয় না থাকার অন্যতম দলিল। কারণ, সাহাবায়ে কেরামের মহান জামাত হক ও ন্যায়ের প্রশ্নে কখনোই আপস বা নমনীয়তা প্রদর্শন করতেন না।
টিকাঃ
৭. অবশ্য আমাদের ধারণা, এ ধরনের কঠোর প্রশাসননীতি জনসাধারণের হৃদয়জগৎকে সংশোধন করতে পারে না; সর্বোচ্চ সাময়িক সময়ের জন্য সমাজ ও জনগণ কিছু কষ্ট থেকে রেহাই পায়।
৮. ইফ্রিকিয়া : মধ্যযুগে আরবগণ ইফ্রিকিয়া (Ifriqiya) দ্বারা আফ্রিকা মহাদেশের বিস্তৃত একটি অঞ্চলকে বোঝাত। বর্তমান তিউনিসিয়ার উত্তরাঞ্চল, আলজেরিয়ার পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিম লিবিয়ার ত্রিপোলি অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুতরাং ইফ্রিকিয়া দ্বারা বর্তমানের বৃহত্তর আফ্রিকা মহাদেশকে উদ্দেশ্য গ্রহণ করা ঠিক হবে না।
মাগরিব : বর্তমানে আফ্রিকান রাষ্ট্র মরক্কোকে আরবিতে 'মাগরিব' বলা হলেও অতীতে মাগরিব বলে উত্তর আফ্রিকার বিস্তৃত একটি অঞ্চলকে বোঝানো হতো। বর্তমান মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার যেসব অংশ সুউচ্চ অ্যাটলাস পর্বতমালার উত্তরে ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত, সেগুলোকে বলা হতো 'মাগরিব'। ব্যাপকতর অর্থে কেউ কেউ লিবিয়া ও মৌরিতানিয়াকেও এর অন্তর্ভুক্ত ধরতেন। অ্যাটলাস পর্বতমালা ও সাহারা মরুভূমির কারণে মাগরিব অঞ্চলটি ছিল আফ্রিকার বাকি অংশ থেকে আংশিকভাবে বিচ্ছিন্ন। সুতরাং অতীত ইতিহাসের মাগরিবকে বর্তমান মরক্কোর পরিসরে সীমাবদ্ধ মনে করাও ঠিক হবে না।
৯. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৯২৪।
১০. মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ২৩৫৯৪।
১১. শাসনকর্তা কর্তৃক রাজপরিবারের কাউকে ভবিষ্যৎ শাসনকর্তা হিসেবে ঘোষণা করা হলে তাঁকে ওলিয়ে আহদ (ভাবী শাসক) বলা হয়। শাসনকর্তার মৃত্যু, মারাত্মক অসুস্থতা বা বরখাস্তের ঘটনা ঘটলে ঘোষিত ওলিয়ে আহদ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। রাজতন্ত্রে পরিচালিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানেও ওলিয়ে আহদ ঘোষণার রীতি প্রচলিত আছে।
১২. শায়খ খিযরি বেক মিশরের প্রখ্যাত আলিম, গবেষক, খতিব ও ইতিহাসবিদ। জন্ম কায়রোতে ১২৮৯ হিজরি সনে (১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে)। বিভিন্ন বিষয়ে তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা দশের অধিক। তিনি ১৩৪৫ হিজরি সনের ৮ শাওয়াল (১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দের ১১ এপ্রিল) কায়রোতেই ইন্তেকাল করেন।
১৩. মুহাম্মাদ খিযরি বেক, আদ-দাওলাতুল উমাবিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৪৪৮।
১৪. ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ১/২৬৩।