📄 দ্রষ্টব্য : সাহাবা-অন্তর্বিরোধ সম্পর্কে বিশুদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম কুরতুবি রহ. তার তাফসির গ্রন্থে সুরা হুজুরাত-এর ৯নং আয়াতের ব্যাখ্যায় সাহাবায়ে কেরামের অন্তর্বিরোধ সম্পর্কে বড় মনোজ্ঞ আলোচনা করেছেন। আমরা তা এখানে তুলে ধরা সমীচীন মনে করছি।
ইমাম কুরতুবি রহ. লিখেছেন-
ইবনুল আরাবি রহ. বলেন, এই আয়াতটি মুসলমানদের পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহের ক্ষেত্রে এক কুরআনি মূলনীতি এবং শরিয়তের কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যাগত ভুলের শিকার দলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে মূল নির্ভরনীতি। (সাহাবা অন্তর্বিরোধের ক্ষেত্রে) সাহাবায়ে কেরাম এ আয়াতের ওপরই নির্ভর করেছেন, মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিবর্গ এ আয়াতেরই আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত বাণীদ্বয়েও যেন উক্ত আয়াতের মর্মবাণী ফুটে উঠেছে।
নবীজি ইরশাদ করেছেন- তَقْتُلُ عَمَّارًا الْفِئَةُ الْبَاغِيَةُ» আম্মারকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে।
খারিজিদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন- يَخْرُجُوْنَ عَلَى خَيْرٍ فِرْقَةٍ» তারা উম্মাহর শ্রেষ্ঠ অংশের বিরুদ্ধাচরণ করবে।
অথবা নবীজি বলেছেন- يَخْرُجُوْنَ عَلَى حِيْنِ فُرْقَةٍ»
তারা লোকদের মধ্যে বিরোধকালে আত্মপ্রকাশ করবে।
প্রথম বর্ণনাটি তুলনামূলক অধিক বিশুদ্ধ। কারণ, অন্য এক হাদিসে নবীজি ইরশাদ করেছেন—
«يَقْتُلُهُمْ أَدْنَى الطَّائِفَتَيْنِ إِلَى الْحَقِّ»
তাদেরকে হত্যা করবে দু-দলের মধ্যে হকের অধিক নিকটবর্তী দলটি।
খারিজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন হজরত আলি রাযি. ও তার সঙ্গীরা। আর তাই শরয়ি দলিলের আলোকে উম্মাহর উলামায়ে কেরামের নিকট এ বিষয়টি স্বীকৃত ও সুপ্রমাণিত যে, হজরত আলি রাযি.-ই ছিলেন (সাহাবা অন্তর্বিরোধের সময়) মুসলিম উম্মাহর ইমাম আর যারা তার বিরুদ্ধাচরণ করেছে, তারা সকলে ছিল ইসলামি খিলাফতের বিরুদ্ধাচরণকারী। আর শরিয়তের বিধান হলো, বিদ্রোহীদের সঙ্গে ততক্ষণ লড়াই চালিয়ে যেতে হবে, যতক্ষণ না তারা সত্যের পথে ফিরে আসে এবং মীমাংসা মেনে নেয়।
উসমান রাযি.-এর হত্যাকাণ্ডে সাহাবায়ে কেরাম সকলে পূর্ণ দায়মুক্ত ছিলেন। কারণ, স্বয়ং খলিফা উসমান রাযি. বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে নিষেধ করে বলেছিলেন, (হত্যার ক্ষেত্রে) আমিই উম্মাহর মধ্যে নবীজির নির্দেশনা অমান্যকারী প্রথম ব্যক্তি হতে চাই না। এ কারণেই এই মজলুম সাহাবি দুর্যোগে সবর করেছেন, কষ্টকে বরণ করে নিয়েছেন এবং উম্মাহর কল্যাণে আত্মত্যাগের এক বেনজির দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নিজের জান কুরবানি করেছেন। কিন্তু এরপর জাতিকে নেতৃত্বহীন রাখাও তো সম্ভব নয়। তাই ইতিপূর্বে উমর রাযি. খলিফা নির্বাচনের জন্য যাদের নাম ঘোষণা করেছিলেন, তাদের অবশিষ্টদেরকে দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়। নিঃস্বার্থ এই জামাতের প্রত্যেকে নিজে পদ গ্রহণ না করে অন্যকে দায়িত্ব গ্রহণ করতে অনুরোধ করেন। হজরত আলি রাযি. ছিলেন তাদের মধ্যে সর্বাধিক উপযুক্ত। ফিতনা ও বিশৃঙ্খলার কারণে উম্মাহর মাঝে রক্তপাত ও ভয়াবহ দুর্যোগ সংঘটিত হবে এবং জাতি এক অনিঃশেষ বিভক্তির শিকার হবে—এই আশঙ্কায় সতর্কতার দাবিতে তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কারণ, খিলাফতশূন্যতার পরিণতি তো আরও ভয়াবহ। খিলাফত না থাকলে দ্বীনের মধ্যেই পরিবর্তন ও ইসলামের ভিত্তিমূলেই ভাঙনসৃষ্টির ভয় থাকে।
কিন্তু যখন তার নামে বায়আত গ্রহণ শুরু হলো, তখন শামবাসী বায়আত গ্রহণের জন্য উসমান-হত্যাকারীদের পাকড়াও করা এবং তাদের বিরুদ্ধে কিসাস-শান্তি কার্যকর করার শর্তারোপ করল। আলি রাযি. তাদেরকে বললেন, 'তোমরা প্রথমে বায়আত গ্রহণ করো, তারপর হক দাবি করো; তাহলেই তা লাভ করবে।' উত্তরে তারা বলল, 'উসমানের হত্যাকারীরা আপনার সঙ্গেই আছে, সকাল-সন্ধ্যা আপনি তাদেরকে দেখেন, এ অবস্থায় তো আপনি বায়আতের উপযুক্ত নন।' এ ক্ষেত্রে আলি রাযি. তুলনামূলক সঠিক কথা বলেছেন এবং সঠিকতর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। কারণ, হজরত আলি রাযি. যদি (সেই চরম সঙ্গিন মুহূর্তে) অপরাধীদের দণ্ড কার্যকর করতেন, তাহলে বিভিন্ন গোত্র তার বিরুদ্ধাচরণ করত এবং নতুন আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। তাই তিনি পরিস্থিতি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসার এবং বায়আত সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষা করছিলেন। তার ইচ্ছা ছিল, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে নিহত খলিফার নিকটাত্মীয়দের পক্ষ থেকে বিচার মজলিসে অভিযোগ উত্থাপিত হবে এবং তখন তিনি ন্যায়ানুগ বিচার কার্যকর করবেন। আর এটি উম্মাহর একটি সর্বসম্মত নীতি যে, ফিতনা বা বিভক্তির আশঙ্কা থাকলে শাসকের জন্য কিসাস কার্যকর করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করার বৈধতা আছে।
একই কথা প্রযোজ্য তালহা রাযি. ও যুবায়র রাযি.-এর ক্ষেত্রেও। কারণ, তারা হজরত আলি রাযি.-কে খলিফাপদ হতে অপসারণের দাবিও করেননি, তার ধার্মিকতা নিয়ে কোনো অভিযোগও করেননি। তাদের মত ছিল, প্রথমে উসমান-হত্যাকারীদের ওপর কিসাস কার্যকর করাই শ্রেয়তর।
(ইমাম কুরতুবি রহ. ইবনুল আরাবির উদ্ধৃতি শেষ করার পর বলেন,) আমার কথা হলো—এ তো গেল তাদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধের কারণ সম্পর্কে আলোচনা। উলামায়ে কেরামের বড় এক অংশের মত হলো, বসরায় সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তা মূলত তাদের পক্ষ থেকে যুদ্ধের দৃঢ় ইচ্ছা ব্যতিরেকে আকস্মিক ঘটে গেছে। কারণ, যুদ্ধের পূর্বেই তাদের মধ্যে সমঝোতা ও মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল। এর ফলে উসমান-হত্যাকারীরা ভয় পেয়ে যায় যে, এবার হয়তো তাদেরকে পাকড়াও করে শাস্তি প্রদান করা হবে। তাই তারা একত্র হয়ে পরামর্শ করে। প্রথমে তাদের মাঝে বাদানুবাদ হলেও শেষ পর্যন্ত তারা একমত হয় যে, তারা দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে দু-পক্ষের সঙ্গে মিশে যাবে এবং উভয় দলের সৈন্যদেরকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য নিজেরাই যুদ্ধের সূচনা করে পরস্পর তির ছুড়তে থাকবে। তখন আলি রাযি.-এর বাহিনীর সঙ্গে মিশে যাওয়া অংশ চিৎকার করে বলতে থাকবে, তালহা ও যুবায়র প্রতারণা করেছেন আর তালহা ও যুবায়রের বাহিনীর সঙ্গে মিশে যাওয়া অংশ চিৎকার করে বলতে থাকবে, আলি প্রতারণা করেছেন। তাদের এই কূটকৌশল সফল হয় এবং উভয় পক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। প্রত্যেক পক্ষই ছিল নিজেদের দৃষ্টিতে প্রতিপক্ষের ধোঁকা-প্রতিরোধকারী এবং প্রতিপক্ষের হত্যাপ্রচেষ্টায় বাধাপ্রদানকারী; ভিন্নভাবে বললে, উভয় পক্ষই আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিল। এ বিবেচনায় উভয় পক্ষের নীতিই ছিল সঠিক এবং আল্লাহর আনুগত্যই ছিল উভয় পক্ষের লক্ষ্য। উভয় পক্ষের যুদ্ধ-চেষ্টা ও প্রতিরোধ-প্রচেষ্টার সূচনা মূলত এভাবেই হয়েছিল। এটিই হলো উক্ত নাজুক ও সংবেদনশীল ঘটনার বিশুদ্ধ-সুপ্রসিদ্ধ ব্যাখ্যা। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
এরপর ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন—
সাহাবায়ে কেরামের মহান জামাতের কোনো সদস্য সম্পর্কে 'নিশ্চিত ভুল করেছেন' বলা বৈধ নয়। কারণ, তারা যা কিছু করেছেন, ইজতিহাদের আলোকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে করেছেন। তারা সকলে আমাদের মাননীয় ও অনুসরণীয়। আমাদের প্রতি শরিয়তের নিদের্শনা হলো, তাদের অন্তর্বিরোধ বিষয়ে কলম ও কালামকে সংযত রাখা এবং কেবল তাদের সদ্গুণসমূহ নিয়ে আলোচনা করা। কারণ, তারা নবীসংস্পর্শের অত্যুচ্চ মর্যাদার অধিকারী। নবীজি তাদের নিন্দা করতে নিষেধ করেছেন আর আল্লাহ তাআলা তাদের যাবতীয় ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে তাদের প্রতি আপন সন্তুষ্টি ঘোষণা করেছেন। অধিকন্তু নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বিভিন্ন সনদে বর্ণিত আছে যে, তালহা হলো ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী একজন শহিদ। সুতরাং তিনি যদি যুদ্ধে অবাধ্য অবস্থায় বের হতেন, তাহলে নিহত হওয়ার কারণে তিনি কিছুতেই শহিদ হতেন না। তদ্রূপ তিনি যদি ব্যাখ্যায় ভুল করে এবং আপন ওয়াজিব দায়িত্বে অবহেলা করে যুদ্ধে বের হতেন, তাহলেও তিনি শহিদ হতেন না। কারণ, শহিদ কেবল তাকেই গণ্য করা হয়, যে ন্যায়ের পথে নিহত হয়। সুতরাং সাহাবায়ে কেরামের এই অন্তর্বিরোধকে উল্লিখিত ব্যাখ্যায়ই প্রয়োগ করা উচিত।
আর এই যখন ঘটনার প্রকৃত বিশ্লেষণ, সুতরাং অন্তর্বিরোধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাহাবায়ে কেরামকে অভিসম্পাত করা, নিজেদেরকে সাহাবায়ে কেরাম হতে দায়মুক্ত ঘোষণা করা, তাদের ফাসেক ও অপরাধী গণ্য করা, তাদের কীর্তি ও অবদান এবং দ্বীনের জন্য তাদের ত্যাগ ও কুরবানিকে অস্বীকার করা কিছুতেই বৈধ হতে পারে না।
জনৈক প্রাজ্ঞ মনীষীকে সাহাবায়ে কেরামের অন্তর্বিরোধকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি শুধু এ আয়াত পড়ে শোনান-
তারা ছিল একটি সম্প্রদায়, যা গত হয়েছে। তারা যা কিছু অর্জন করেছে, তা তাদেরই আর তোমরা যা কিছু অর্জন করেছ, তা তোমাদেরই। তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে না যে, তারা কী কাজ করত।
একই প্রশ্নের জবাবে অন্য এক আলিম অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর প্রদান করেন। তিনি বলেন,
'আল্লাহ তাআলা আমার হাতকে সেই রক্ত হতে পবিত্র রেখেছেন। সুতরাং আমি তা দ্বারা আমার জবানকে রঞ্জিত করতে চাই না।'
বক্তার উদ্দেশ্য হলো—এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে হয়তো ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে; কারও প্রতি তিনি যা করেননি, তা আরোপ করা হতে পারে।
বিশিষ্ট তাবেয়ি হাসান বসরি রহ.-কে সাহাবায়ে কেরামের পারস্পরিক বিরোধ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেন—
'সেটি এমন একটি লড়াই, যাতে সাহাবায়ে কেরাম অংশ নিয়েছেন আর আমরা ছিলাম অনুপস্থিত। পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অবগতি ছিল, অথচ আমাদের তা নেই। সুতরাং তারা যে বিষয়ে একমত হয়েছেন, আমরা তার অনুসরণ করব, আর যে বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছেন, সে বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করব।'
ইমাম মুহাসিবি রহ. বলেন,
'হাসান যা বলেছেন, আমরাও তাই বলি। কেননা, এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে, তারা যে বিষয়ে বিরোধ করেছেন, তা সম্পর্কে আমাদের চেয়ে তারাই অধিক জ্ঞাত ছিলেন। সুতরাং তাদের সর্বসম্মত বিষয়ে অনুসরণ এবং দ্বিধাবিভক্ত বিষয়ে নীরবতা অবলম্বনই হলো আমাদের অবশ্য কর্তব্য। নিজেদের পক্ষ থেকে আমরা কোনো ব্যাখ্যা সৃষ্টি করব না। আমাদের নিষ্কম্প বিশ্বাস এই যে, তারা যা করেছেন, ইজতিহাদের ভিত্তিতে করেছেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় করেছেন। কারণ, দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে। আল্লাহর কাছেই তাওফিক প্রার্থনা করছি।'
টিকাঃ
১৫৪. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২৯১৬।
১৫৫. সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং-৮৫০৭।
১৫৬. সহিহ বুখারি, হাদিস নং-৩৬১০।
১৫৭. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-১০৬৪।
১৫৮. শামসুদ্দিন কুরতুবি, আল-জামে লি আহকামিল কুরআন (তাফসিরে কুরতুবি), সুরা হুজুরাত, আয়াত নং ০৯।
📄 সাহাবা অন্তর্বিরোধ বিষয়ে ইতিহাস অধ্যয়নের মূলনীতি
ইতিহাস মানে বিগত যুগের মানবসমাজের সুন্দর-অসুন্দর উভয় দিক তুলে ধরা এবং 'অনুপাত' বিচারে কাউকে নন্দিত, কাউকে নিন্দিত এবং কাউকে সাধু, কাউকে অসাধুরূপে চিহ্নিত করা। 'অনুপাত' বিচারের প্রয়োজন এজন্য যে, পৃথিবীতে নবী-রাসুলগণের পরে এমন বিশুদ্ধতম মানুষের অস্তিত্ব নেই, যার জীবন ও চরিত্রে সামান্যতম খুঁত নেই, অসুন্দরের ক্ষীণতম ছায়াপাত নেই। অদ্রূপ এমন নিকৃষ্টতম মানুষও নেই, যার জীবন ও চরিত্রে পুণ্যের কোনো স্পর্শ নেই, সুন্দরের কোনো ছাপ নেই। সুতরাং 'অনুপাত' বিচারই হবে ভালো মানুষ ও মন্দ মানুষ নির্ণয়ের মাপকাঠি। অর্থাৎ গোটা জীবন যার কেটেছে সুন্দর কর্ম ও উত্তম চিন্তার মাঝে, কল্যাণ ও পুণ্যের সুস্নিগ্ধ পরশে, যার সকল 'আচরণ ও উচ্চারণে' ঘটেছে ইখলাস ও আল্লাহপ্রেমের সাবলীল প্রকাশ, জীবনের দু-একটি পদস্খলন বা দুর্ঘটনা সত্ত্বেও অবশ্যই তিনি শামিল হবেন উম্মতের নেক ও সৎ লোকদের কাতারে। তদ্রূপ যার জীবনের সকাল-সন্ধ্যা কেটেছে পাপের অন্ধকারে, শরিয়তের আহকাম ও বিধান লঙ্ঘন করে করে, একটি বা দশটি পুণ্যকর্মের সুবাদে কিছুতেই সে পেতে পারে না ওলি-বুজুর্গের স্বীকৃতি।
তবে মনে রাখতে হবে যে, পূর্ণ বিশ্বস্ততার সঙ্গে ঘটনাবলির নিরপেক্ষ বিবরণ দিয়ে যাওয়াই হলো ইতিহাসের ইতিকর্তব্য। সেই ঘটনাবলির বিচারবিশ্লেষণ এবং লব্ধ ফলাফলের আলোকে ব্যক্তি ও শ্রেণির ধর্মীয় বা জাগতিক মর্যাদার স্তর নির্ধারণ কিন্তু ইতিহাসের দায়িত্ব নয়। এটা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি বিষয়; যাকে ইতিহাসতত্ত্ব বলা যেতে পারে, ইতিহাস নয়।
পৃথিবীর সাধারণ মানুষ বা সাধারণ শ্রেণির বেলায় অবশ্য ইতিহাসতত্ত্ব ইতিহাসের সাধারণ ঘটনাবিবরণীকে নির্ভর করেই গড়ে ওঠে। সে ক্ষেত্রে ইতিহাস জানেন-বোঝেন এমন যেকোনো ব্যক্তি নিজস্ব চিন্তা ও দৃষ্টিকোণ থেকে স্বাধীন ও মুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু উম্মতের সকল যুগের সকল মানুষের অখণ্ড শ্রদ্ধার পাত্র সাহাবায়ে কেরামের বিষয়টি পৃথিবীর অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতো নয়।
সাধারণ জীবনচরিত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ইতিহাসের বিচার গ্রহণযোগ্য হলেও সাহাবায়ে কেরামের স্থান ও মর্যাদার পরিমাপ কিন্তু ইতিহাসের দাঁড়িপাল্লায় করা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় নিছক ঐতিহাসিক ঘটনাবিবরণীর আলোকে সাহাবা-চরিত্রের রূপ ও স্বরূপ নির্ণয় করা। কেননা, সাহাবায়ে কেরাম হলেন আল্লাহর রাসুল ও তার সাধারণ উম্মতের মাঝে আল্লাহপ্রদত্ত এক মজবুত যোগসূত্র। এই যোগসূত্র ছাড়া কুরআনের 'শব্দ-পঠন' লাভ করা যেমন উম্মতের পক্ষে সম্ভব ছিল না, তেমনই সম্ভব ছিল না কুরআনের ব্যাখ্যা ও মর্মজ্ঞান অর্জন। তদ্রূপ 'রিসালাত' তথা রাসুলের বাণী ও শিক্ষার সম্পদভান্ডারও এই যোগসূত্র ছাড়া লাভ করা সম্ভব নয় কারও পক্ষে।
সাহাবায়ে কেরাম হলেন রাসুল-জীবনের সার্বক্ষণিক সহচর। স্বয়ং আল্লাহ তাদেরকে নির্বাচন করেছিলেন এই পবিত্র সাহচর্যের জন্য। তাদের কাছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, শিক্ষা ও আদর্শ ছিল স্ত্রী-পুত্র-পরিজন ও আপন প্রাণের চেয়েও প্রিয়। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদভান্ডারও ছিল তার তুলনায় তুচ্ছ। তাই তারা জানমাল কোরবান করে রাসুলের পয়গাম ছড়িয়ে দিয়েছেন পৃথিবীর প্রান্ত থেকে প্রান্তে। ফলে তাদের জীবনচরিত হয়ে উঠেছে নববি সিরাত ও জীবনচরিতেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং তাদের স্থান ও মর্যাদার নির্ভুল পরিচয় পেতে হলে কুরআন, সুন্নাহ ও সিরাতুন নবীর দর্পণেই তাদেরকে অবলোকন করতে হবে। ইতিহাসগ্রন্থের ছেঁড়া পাতায় পাওয়া যাবে না তাদের জীবন ও চরিত্রের আসল ছবি।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ নামে পরিচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ উম্মতের সাধারণ পরিচয়-বৈশিষ্ট্যই হলো সাহাবাপ্রেম ও সাহাবা-মর্যাদার অকুণ্ঠ স্বীকৃতি। তাদের দৃষ্টিতে সাহাবায়ে কেরামের আদব-ইহতেরাম রক্ষা করা যেমন অপরিহার্য, তেমনই তাদের সুমহান ব্যক্তিত্বের সামান্যতম সমালোচনাও অমার্জনীয়। এ বিষয়ে তাদের কলম ও কালাম আশ্চর্যরকম সংযত। অবশ্য বিভিন্ন বিষয়ে সাহাবিদের মতবিরোধের ক্ষেত্রে বলাই বাহুল্য যে, যুগপৎ দুটি পরস্পরবিরোধী মত অনুসরণ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সবার প্রতি সমান শ্রদ্ধা রেখে শরিয়তি ইজতিহাদের আলোকে একটি মত গ্রহণ আর কোনো না কোনো অজুহাতে সাহাবা-চরিত্রে কলঙ্কলেপন ও ছিদ্রান্বেষণ এক কথা নয়। প্রথমটি প্রশংসনীয় আর দ্বিতীয়টি অমার্জনীয়।
যেহেতু মহান সাহাবায়ে কেরাম রাসুল ও তার উম্মতের মাঝে অপরিহার্য যোগসূত্র হিসেবে কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে এক অত্যুচ্চ স্থান, অবস্থান ও মর্যাদার অধিকারী, সেহেতু তাদের সুমহান ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন বা অবমূল্যায়ন নিছক ইতিহাস বা ঐতিহাসিক বর্ণনার মাপকাঠিতে হতে পারে না। এমন বিচারকের মর্যাদা ইতিহাসের প্রাপ্য নয়। তবে এর অর্থ কিন্তু ইতিহাসশাস্ত্রের আস্থাযোগ্যতা অস্বীকার করা নয়। ইসলাম বরং বলিষ্ঠ কণ্ঠেই ইতিহাসের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে।
ইতিহাসশাস্ত্রের ইসলামি গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, অতীতের বিভিন্ন জাতির ঘটনাবলি কুরআনের প্রধান পাঁচটি আলোচ্য বিষয়ের অন্যতম। তবে আল-কুরআনের বর্ণনাভঙ্গি ও উপস্থাপনশৈলী অত্যন্ত অভিনব ও স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। যেমন কুরআনে অনেক ঘটনার ধারাবাহিক বিবরণের পরিবর্তে খণ্ড খণ্ড অংশ বিভিন্ন কুরআনি বক্তব্যের অনুবর্তীরূপে উপস্থাপিত হয়েছে। বস্তুত এই অভিনব উপস্থাপনশৈলীর মাধ্যমে কুরআন আমাদেরকে ইতিহাসের আসল গুরুত্ব ও সার্থকতা কী—তা বুঝিয়ে দিয়েছে। আল-কুরআন বলতে চায়—ইসলাম ও মানবজাতির কাছে নিছক কাহিনি হিসাবে বিগত জাতির ঘটনাবলির কোনোই আবেদন ও গুরুত্ব নেই; বরং চিন্তার মাধ্যমে পরিণাম ও পরিণতি থেকে শিক্ষাগ্রহণ ও উপদেশ লাভই হলো ইতিহাসের আসল উদ্দেশ্য ও মূল সার্থকতা।
বিগত জাতির সৎকর্মের শুভ পরিণাম দেখে মানুষ অনুপ্রাণিত হবে এবং মন্দের মন্দ পরিণাম দেখে সতর্ক হবে; সেই সঙ্গে যুগের আবর্তন-বিবর্তন এবং উত্থান-পতন দেখে মহাপ্রজ্ঞার অধিকারী আল্লাহর অসীম কুদরতে বিশ্বাসী হবে। তাহলেই সার্থক হবে ইতিহাসের উদ্দেশ্য।
ইতিহাস শাস্ত্রের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা যেমন একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা, ঠিক তেমনই আস্থা ও নির্ভরযোগ্যতার স্তর তারতম্যও একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা।
ইসলামি শরিয়তে কুরআনুল কারিম ও হাদিসে মুতাওয়াতির আস্থা ও নির্ভরযোগ্যতার যে শীর্ষ স্তরের অধিকারী, কোনোক্রমেই তা সাধারণ হাদিসের প্রাপ্য নয়। তদ্রূপ হাদিসে রাসুলের যে স্তর, তা সাহাবায়ে কেরামের বাণী ও বক্তব্যের প্রাপ্য নয়। একইভাবে ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলোও কুরআন, হাদিস ও বিশুদ্ধ সনদে সুপ্রমাণিত সাহাবা-বাণীর সমতুল্য ও নির্ভরযোগ্যতা দাবি করতে পারে না কোনো যুক্তিতেই। বরং কুরআনি আয়াতের দৃশ্যত বিপরীত বক্তব্যের সাধারণ হাদিসকে যেমন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সম্ভব না হলে কুরআনের মোকাবিলায় প্রত্যাহার করা আবশ্যক, তদ্রূপ কুরআন-সুন্নাহর সুপ্রমাণিত বক্তব্যের সঙ্গে ঐতিহাসিক বর্ণনার বিরোধ দেখা দিলে সরাসরি তা বর্জন করা কিংবা সমন্বয়মূলক ব্যাখ্যাসহ গ্রহণ করা অপরিহার্য। কোনো বর্ণনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রামাণ্যতা যত অকাট্যই হোক, কুরআন-সুন্নাহর মোকাবিলায় তার বিন্দুমাত্র ধর্মীয় মূল্য নেই। আস্থা ও নির্ভরযোগ্যতার এই যে স্তরবিন্যাস ও শ্রেণিক্রম, কোনো শাস্ত্রের জন্য তা কিন্তু মোটেও মর্যাদাহানিকর নয়। কেননা, এটাই যুক্তি, স্বভাব ও ফিতরতের দাবি।
এ প্রসঙ্গে হাদিস ও ইতিহাসশাস্ত্রের ব্যাপক গুণগত পার্থক্যও আলোচনার দাবি রাখে।
হাদিসে রাসুলকে প্রাণপ্রিয় সম্পদরূপে সংরক্ষণ ও প্রচারে উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরামের অভাবনীয় নবীপ্রেমই ছিল যথেষ্ট। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছিল এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নববি নির্দেশ। আর তাই লক্ষ সাহাবির ফিরেশতাতুল্য জামাআত 'একজনমাত্র মানবের' বাণী ও কর্ম সংরক্ষণ ও প্রচারকল্পে নজিরবিহীন ত্যাগ, সাধনা ও কোরবানি পেশ করেছিলেন। বলাই বাহুল্য যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া অন্য কোনো মানবসন্তানের জন্য—তিনি যত বিশাল প্রতিভা ও আদর্শ ব্যক্তিত্বের অধিকারীই হোন না কেন—এমন ব্যবস্থা কল্পনা করাই সম্ভব নয় যে, নিবেদিতপ্রাণ অনুসারীরা তার প্রতিটি আচরণ ও উচ্চারণ সুগভীর প্রেম ও ভক্তির সাথে গ্রহণ, সংরক্ষণ ও আগামী প্রজন্মের হাতে অর্পণের মহাসাধনায় জানমাল কোরবানি করে দেবে। জাতিবর্গের উত্থান-পতন, মহামানবদের জীবনচরিত এবং কালের দুর্যোগ মহা-দুর্যোগের ঘটনাগুলিতে মানুষের চিত্তাকর্ষণের খোরাক আছে সন্দেহ নেই। কিন্তু কার এত 'গরজ' হবে যে, তার সংরক্ষণ ও প্রচারকর্মে জীবন-যৌবন উৎসর্গ করে সকল স্বপ্ন-সাধ বিসর্জন দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে?! প্রেম ও পুণ্যের অনন্ত আকর্ষণ ছাড়া এমনটি অসম্ভব, অকল্পনীয়।
মোটকথা, যেহেতু আল্লাহর এটাই মঞ্জুর ছিল যে, আহকাম ও আকায়িদের ক্ষেত্রে হাদিসে রাসুল হবে শরিয়তের দলিল ও প্রমাণ এবং হাদিসে রাসুলই হবে কুরআনের বাস্তব রূপ, সেহেতু তা সংরক্ষণের প্রথম উপায় হিসাবে সাহাবায়ে কেরামের অন্তরে তিনি ঢেলে দিয়েছিলেন নবীপ্রেম ও নবী-আনুগত্যের অকল্পনীয় আবেগ ও জযবা; যা পৃথিবীর অপর কোনো ব্যক্তিত্বের প্রতি হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং ইতিহাস ও ঐতিহাসিক বর্ণনা কোনোক্রমেই হাদিস বর্ণনার সমতুল্য মর্যাদা ও অবস্থান দাবি করতে পারে না।
দ্বিতীয়ত সূক্ষ্মতম বিচারবিশ্লেষণের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হাদিস বর্ণনার সময়ও হাদিস সংকলকগণ ভয়ে কম্পমান হতেন। পরবর্তী যুগে অধ্যায় ও শিরোনামভিত্তিক হাদিস সংকলনকালে মুহাদ্দিসগণ লিপি ও স্মৃতিতে সংরক্ষিত লক্ষ লক্ষ হাদিস থেকে মাত্র কয়েক হাজার হাদিস নিজ নিজ সংকলনে স্থান দিয়েছিলেন। এমনই সুকঠিন ছিল তাদের বিচারবিশ্লেষণের মানদণ্ড। ইমাম বুখারি রহ. তার স্মৃতিস্থ দুই লক্ষ অশুদ্ধ ও এক লক্ষ বিশুদ্ধ হাদিস থেকে পুনরাবৃত্তি বাদ দিয়ে মাত্র চার হাজার হাদিস সহিহ বুখারিতে স্থান দিয়েছেন। ইমাম মুসলিম রহ. তার সংগৃহীত তিন লক্ষ হাদিস থেকে বাছাইপূর্বক চার হাজার হাদিস দিয়ে তার সহিহ সংকলন তৈরি করেছেন। ইমাম আবু দাউদ রহ. পাঁচ লক্ষ হাদিস সংগ্রহ করে যাচাইবাছাইয়ের পর মাত্র চার হাজার হাদিসের সুনান সংকলন তৈরি করেছেন। ইমাম আহমাদ রহ. পাঁচ লক্ষ হাদিস সংগ্রহ করে যাচাইবাছাইয়ের পর মাত্র চার হাজার হাদিসের সুনান সংকলন তৈরি করেছেন। ইমাম আহমাদ রহ. তার সুবিখ্যাত মুসনাদ সংকলন তৈরি করেছেন সাত লক্ষ পঞ্চাশ হাজার হাদিস থেকে বাছাই করে।
এভাবে কুদরতি ব্যবস্থা এবং প্রজ্ঞাপূর্ণ নববি ব্যবস্থার ছত্রছায়ায় অনন্যসাধারণ সতর্কতায় প্রস্তুত হাদিস সংকলন আল-কুরআনের পর শরিয়তের দ্বিতীয় হুজ্জত ও প্রমাণ-উৎসের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে।
পক্ষান্তরে পৃথিবীর সাধারণ ইতিহাসের ক্ষেত্রে মর্যাদার এ অত্যুচ্চ আসন কল্পনা করাও সম্ভব নয়। কেননা, প্রথমত সাধারণ ঘটনাবলি সংরক্ষণ ও প্রচারের সাধনায় উদ্বুদ্ধ করার মতো কোনো 'মহাউদ্দীপক' শক্তি বিদ্যমান নেই। দ্বিতীয়ত হাদিস সংকলনের সুকঠিন মানদণ্ড ইতিহাস সংকলনের ক্ষেত্রেও যদি গ্রহণ করা হতো, তাহলে হাদিস সংকলনের তিন লাখে চার হাজারের অনুপাত ইতিহাস সংকলনের ক্ষেত্রে নির্ঘাত তিন লাখে চারশ-তে নেমে আসত। এভাবে ইতিহাসের শতকরা নিরানব্বই ভাগ বর্ণনাই ধুয়ে-মুছে বিলীন হয়ে যেত এবং ইতিহাসের পূর্ব বর্ণিত কল্যাণ ও উপকারিতা থেকে মানবজাতি বঞ্চিত হতো।
এ কারণেই আমরা দেখি, হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে যে সকল বর্ণনাকারী দুর্বল ও মিথ্যাবাদী বলে হাদিসশাস্ত্রের ইমামদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন, ইতিহাস বর্ণনার ক্ষেত্রে তারাই আবার তাদের কাছে সাদরে গৃহীত হয়েছেন। হাদিসের ইমামগণ ওয়াকিদি, সাইফ বিন আমর প্রমুখের নাম শুনতে পর্যন্ত রাজি নন। অথচ গাযওয়া ও সিরাত বিষয়ক ইতিহাস বর্ণনার ক্ষেত্রে তারা নিঃসংকোচে তাদের বর্ণনা গ্রহণ করেছেন।
সারকথা এই যে, ইতিহাস যেহেতু আহকাম ও আকায়িদ জাতীয় শরিয়তসংক্রান্ত আলোচনার ক্ষেত্র নয়; সেহেতু নির্বিচারে রুগ্ন-দুর্বল ও সুস্থ-সবল সকল বর্ণনা গ্রহণ সেখানে দূষণীয় নয়। এ কথা সত্য যে, রিজালশাস্ত্রের বরেণ্য ইমামগণ ইতিহাস সংকলনের ক্ষেত্রে ইসলামপূর্ব যুগের ভিত্তিহীন গল্প-কাহিনির পরিবর্তে ইসলামি বর্ণনারীতির আলোকে 'সনদ ও সূত্র' অনুসরণ করে থাকেন। এর ফলে বিশুদ্ধতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার বিচারে বিশ্ব ইতিহাসের মাঝে ইসলামি ইতিহাস এক বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী। তবে এটাও বাস্তব সত্য যে, ইতিহাসের সনদের ক্ষেত্রে তারা হাদিসশাস্ত্রের ন্যায় কঠিন বিচারবিশ্লেষণ প্রয়োগ করেননি। কেননা, আগেই বলে এসেছি, এ ধরনের কঠিন বিচার পদ্ধতি প্রয়োগ করলে ইতিহাসের সিংহভাগই মুছে যেত দুনিয়ার বুক থেকে এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা, উপদেশ ও অভিজ্ঞতা আহরণের মূল্য উদ্দেশ্য থেকেই মানবসভ্যতা বঞ্চিত হতো। তা ছাড়া ইসলামি আহকাম ও আকায়িদের কোনো সম্পর্ক নেই বিধায় এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজনও ছিল না। ইতিহাস সংকলনে এসে হাদিস ও রিজালশাস্ত্রের বরেণ্য ইমামদের ব্যতিক্রমধর্মী উদারনীতি গ্রহণের এটাই হলো মূল রহস্য।
এখানে আল্লামা ইবনে কাছিরের উদাহরণ পেশ করা যেতে পারে। হাদিস ও তাফসিরশাস্ত্রের সুপ্রসিদ্ধ এই ইমাম রিজাল সমালোচক হিসাবেও সমান খ্যাতির অধিকারী। সনদের বিচার-পর্যালোচনা ও বাছাই-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এত নামডাক সত্ত্বেও জগদ্বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ 'আল-বিদায়া ওয়ান- নিহায়া'-এর সংকলনের ক্ষেত্রে তিনি কিন্তু তা ধরে রাখতে পারেননি। আল-বিদায়ার কোনো কোনো বর্ণনার ক্ষেত্রে তার নিজেরই মন্তব্য হলো-
'এ বর্ণনার বিশুদ্ধতায় আমি সন্দিহান; তবে আমার পূর্বসূরি ইবনে জারির ও অন্যান্যরা তা গ্রহণ করে আসছেন বলে আমিও গ্রহণ করলাম। তারা যদি এড়িয়ে যেতেন, তাহলে আমিও এড়িয়ে যেতাম।'
বলাই বাহুল্য যে, হাদিস সংকলনের ক্ষেত্রে কিন্তু 'অমুক পূর্ববর্তী বুজুর্গ গ্রহণ করেছেন বলে সন্দিহান অবস্থায়ও আমাকে গ্রহণ করতে হলো'-এ ধরনের উদার নীতি অনুসরণ করা তার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হতো না। ইতিহাসের নিজস্ব প্রকৃতি ও স্বভাবধারার কারনেই ইবনে কাছির এমন উদার নীতি গ্রহণ করতে পেরেছিরেন।
এটা কিন্তু 'একজন ইবনে কাছির'-এর অজানিত ভুল নয়; বরং সকল শাস্ত্রীয় ইমামের সচেতন ও সজ্ঞান আচরণ। দোষ বা গুণ যা-ই বলুন, নির্বিচারে সবল-দুর্বল সকল বর্ণনার অবাধ সংকলন ইতিহাসের অবকাঠামো রক্ষার জন্যই জরুরি ছিল। ইতিহাসের এটা বিকৃতি নয়; প্রকৃতি।
কেননা, তাদের ভালো করেই জানা ছিল যে, সাধারণ ইতিহাস শরিয়তের আহকাম ও আকায়িদ প্রমাণের জন্য নয়; বরং শিক্ষা, উপদেশ ও অভিজ্ঞতা লাভের জন্য। আর সেটা সনদের বিচারবিশ্লেষণ ও সমালোচনা-পর্যালোচনা ছাড়াই হতে পারে। তবে কেউ যদি আহকাম ও আকায়িদ সম্পর্কিত কোনো বিষয়ের অনুকূলে বা প্রতিকূলে ইতিহাসের বর্ণনাকে প্রমাণস্বরূপ ব্যবহার করতে চান, তাহলে নিজ দায়িত্বেই তাকে সেখানেও হাদিসশাস্ত্রের অনুসৃত 'বিচারপদ্ধতি' প্রয়োগ করতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ ইমাম শাফেয়িসহ ফিকহশাস্ত্রের বহু ইমাম চিকিৎসাশাস্ত্রেও বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। এমনকি চিকিৎসা বিষয়ক মূল্যবান রচনাকর্মও তাদের কারও কারও রয়েছে। এখন কোনো ভদ্রলোক যদি দাবি করে বসে যে, 'অমুক ইমামের মতে শরাব ও শূকর-মাংস হালাল। কেননা, অমুক চিকিৎসাগ্রন্থে তিনি শরাব ও শূকর-মাংসের কিছু গুণ ও উপকারিতার কথা আলোচনা করেছেন; নিষিদ্ধতা সম্পর্কে ঘুণাক্ষরেও কিছু বলেননি।' তাহলে ভদ্রলোকের এই অভিনব প্রমাণ-পদ্ধতি সম্পর্কে কী মন্তব্য করা চলে?!
এই দীর্ঘ ভূমিকার পর আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই যে, সাহাবিদের পারস্পরিক বিরোধ প্রসঙ্গকে যারা ইতিহাসের আলোকে বিচার করেছেন এবং ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকেই সিদ্ধান্ত আহরণ করেছেন, মূলত গোড়াতেই তারা গলদ করে বসে আছেন। তথ্যপ্রমাণগুলো হাদিস, তাফসির ও রিজালশাস্ত্রের সর্বজনমান্য ইমামদের ইতিহাস সংকলন থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে—এই আত্মতৃপ্তির কারণে তাদের ভেবে দেখার সুযোগ হয়নি যে, শরিয়তের আহকাম ও আকায়িদের আলোচনা নয়; বরং শুধু ইতিহাস সংকলনই ছিল ইমামদের উদ্দেশ্য। তাই ইতিহাস সংকলনের প্রচলিত রীতি অনুসারে তারা সনদের বিচার-বিশ্লেষণে না গিয়ে সবল-দুর্বল সকল বর্ণনার একত্র সমাবেশ ঘটিয়েছেন। কিন্তু সেগুলো দ্বারা আহকাম ও আকায়িদ বিষয়ক কোনো মাসআলা প্রমাণ করতে হলে সনদ বিশ্লেষণের রিজালশাস্ত্রীয় পদ্ধতি প্রয়োগ করে বর্ণনার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে।
সুতরাং এখন আমাদের ভেবে দেখতে হবে যে, সাহাবাবিরোধ কি সাধারণ ইতিহাসের বিষয়বস্তু, না আহকাম ও আকায়িদের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এ প্রসঙ্গে কথা হলো—ইসলামি উম্মাহর সর্বসম্মত ফয়সালা এই যে, সাহাবায়ে কেরামের পরিচয়, মর্যাদা ও অবস্থান নির্ধারণ এবং সাহাবাবিরোধের দুঃখজনক ঘটনার প্রকৃতি নিরূপণ সাধারণ ইতিহাসের বিষয়বস্তু নয়। ‘আল-ইসাবা’-এর ভূমিকায় হাফেজ ইবনে হাজার এবং ‘আল-ইসতিআব’-এর ভূমিকায় হাফেজ ইবনে আবদুল বার পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন যে, সাহাবায়ে কেরামের পরিচয়প্রসঙ্গ ইলমুল হাদিসের অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা। তদ্রূপ সাহাবায়ে কেরামের স্থান, অবস্থান ও মর্যাদাগত স্তর-তারতম্য এবং সাহাবাবিরোধ প্রসঙ্গকে উলামায়ে উম্মত সর্বসম্মতভাবে আকিদার অন্তর্ভুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছেন। এ কারণেই ইসলামি আকিদার সকল প্রামাণ্য গ্রন্থে স্বতন্ত্র অধ্যায়রূপে তা সংযোজিত হয়ে এসেছে।
বস্তুত সাহাবা ও সাহাবাবিরোধ প্রসঙ্গ এমন এক আকিদাভিত্তিক মাসআলা, যাকে কেন্দ্র করে বহু ফেরকার উদ্ভব ঘটেছে। সুতরাং বলাই বাহুল্য যে, এ প্রশ্নে মীমাংসা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমার অকাট্য প্রমাণ অপরিহার্য। হাদিস ও রিজালশাস্ত্রীয় মানদণ্ডে যাচাই না করে ইতিহাস-আশ্রয়ী কোনো বর্ণনা এ প্রশ্নে প্রমাণরূপে কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আকায়িদজাতীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে ইতিহাসনির্ভরতা চরম আত্মঘাতী ভুল। ইতিহাস যত নির্ভরযোগ্য হাদিসশাস্ত্র-বিশারদই সংকলন করুন, তাতে তার ইতিহাসধর্মিতা মোটেই বিলুপ্ত হয় না।
এ কারণেই সাহাবা-পরিচয় বিষয়ে ইবনে আবদুল বার রচিত 'আল- ইসতিআব ফি মারিফাতিল আসহাব' গ্রন্থটি প্রামাণিকতা ও তথ্যসমৃদ্ধির কারণে বিপুলভাবে সমাদৃত হলেও সাহাবাবিরোধ প্রসঙ্গে ইতিহাসনির্ভরতার কারণেই তা বিদগ্ধ শাস্ত্রবিদগণ কর্তৃক সমালোচিত হয়েছে।
কুরআনের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আয়াতে এবং বিভিন্ন হাদিসে সাহাবায়ে কেরামের প্রশংসা ও ফজিলত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতপ্রাপ্তির সুসংবাদের পাশাপাশি উম্মতকে তাদের অনুসৃত পথে চলার জোর তাকিদ দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়েছে কোনো সাহাবির সমালোচনার কঠিন পরিণতি সম্পর্কেও। সর্বোপরি সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ভালোবাসাকে আল্লাহর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা এবং তাদের প্রতি বিদ্বেষকে তার প্রতি বিদ্বেষের পরিচায়ক ঘোষণা করা হয়েছে। আর কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সাহাবায়ে কেরামের জন্য নির্ধারিত এই মর্যাদা সম্পর্কে সর্বযুগের উম্মতে মুহাম্মাদি ঐকমত্য পোষণ করে এসেছে। দু- একটি ভ্রষ্ট দল অবশ্য সর্বযুগেই ব্যতিক্রম ছিল।
এবার মূল প্রসঙ্গ। মজলুম খলিফা হজরত উসমান রাযি.-এর শাহাদাতের স্বাভাবিক পরিণতিতে সাহাবায়ে কেরামের মাঝে সৃষ্ট মতবিরোধ পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রবল স্রোতপ্রবাহে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের রূপ ধারণ করেছিল। কিন্তু উলামায়ে উম্মত আদবের খাতিরে সে যুদ্ধকে 'মুশাজারাত' নামে অভিহিত করেছেন। বাতাসের দোলায় গাছের শাখাপ্রশাখার পারস্পরিক সংঘর্ষকে আরবিতে মুশাজারাত বলে। আলিমগণ বোঝাতে চেয়েছেন যে, শাখাপ্রশাখার পরস্পর সংঘর্ষ যেমন সামগ্রিক বিচারে বৃক্ষের জন্য দূষণীয় নয়; বরং জীবন ও সজীবতার লক্ষণ, তদ্রূপ জটিল পরিস্থিতিতে বিপরীতমুখী ইজতিহাদের ফল হিসাবে সাহাবা অন্তর্বিরোধও সামগ্রিক বিচারে দোষের বা কলঙ্কের কিছু নয়; বরং সাহাবায়ে কেরামের আদর্শবাদিতা ও জানবাজিরই জ্বলন্ত প্রমাণ।
এখানে এসব প্রশ্ন আসতে পারে যে, সকল সাহাবির আদালত ও ন্যায়পরতা, ইখলাস ও নিঃস্বার্থতা এবং তাকওয়া ও ধার্মিকতা প্রশ্নাতীত। সুতরাং সকলেই তারা সমান শ্রদ্ধার পাত্র। এমতাবস্থায় কোনো বিষয়ে তাদের মতবিরোধের ক্ষেত্রে আমাদের নীতি ও অবস্থান কী হবে? দুটি বিপরীত মতামতকে যুগপৎ নির্ভুল মনে করা যেহেতু সম্ভব নয়, সেহেতু অবধারিতভাবেই গ্রহণ ও বর্জনের পথে আমাদের এগুতে হবে। কিন্তু এই গ্রহণ ও বর্জনের মাপকাঠি কী হবে? সর্বোপরি উভয় পক্ষের প্রতি সমান ভক্তি-শ্রদ্ধাই বা কীভাবে বজায় রাখা হবে?
এসব প্রশ্নের জবাবে আমাদের বক্তব্য এই যে, যুক্তির বিচারে কোনো পক্ষের নীতি ও অবস্থানকে ভুলরূপে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদের প্রতি অশ্রদ্ধা পোষণ মোটেই জরুরি নয়। এ বিষয়ে আমাদের পূর্বসূরিগণ যে বাস্তব আদর্শ রেখে গেছেন, তা অনুসরণের মাধ্যমেই আমরা এই নাজুক সমস্যার কাঙ্ক্ষিত সমাধান পেতে পারি। আমাদের পূর্বসূরি মনীষীগণ শরিয়তসম্মত ইজতিহাদের মাধ্যমে একপক্ষের মতামতকে হয়তো অগ্রাধিকার দিয়েছেন এবং সে অনুযায়ী আমল ও আকিদা গ্রহণ করেছেন; কিন্তু তাই বলে অপরপক্ষের শানে সামান্যতম অশ্রদ্ধামূলক শব্দ কখনো উচ্চারিত হয়নি তাদের মুখে। বিশেষত মুশাজারাতে সাহাবার ক্ষেত্রে উলামায়ে উম্মত একদিকে যেমন হজরত আলি রাযি.-এর পদক্ষেপকে নির্ভুল ও প্রতিপক্ষের অবস্থানকে ভুল বলে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন, তেমনই অন্যদিকে আলি রাযি.-এর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণকারী তালহা রাযি., যুবায়র রাযি. ও মুয়াবিয়া রাযি.-এর প্রতিও সমান আদব ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। কেননা, তাদের দৃষ্টিতে আলি রাযি.-এর পদক্ষেপ যেমন নির্ভুল ছিল, তেমনই তার প্রতিপক্ষের ভুল পদক্ষেপও অন্যায় স্বার্থপ্রসূত ছিল না; ছিল শরিয়তসম্মত ইজতিহাদপ্রসূত। আর উসুলশাস্ত্রের সাধারণ ছাত্রও এ কথা জানে যে, শরিয়তের দৃষ্টিতে ভুল ইজতিহাদ কোনো অপরাধ নয়। বরং সঠিক সিদ্ধান্ত লাভের শুভ উদ্দেশ্যে নির্ধারিত মূলনীতি অনুসারে ইজতিহাদ প্রয়োগের পরও ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হলে শরিয়তের দৃষ্টিতে অবশ্যই তিনি সাওয়াব ও পুরস্কারের হকদার হবেন।
সাহাবায়ে কেরামের রাজনৈতিক বিরোধকেও উলামায়ে উম্মত সর্বসম্মতিক্রমে ইজতিহাদপ্রসূত বিরোধ বলে স্বীকার করেছেন। সুতরাং কোনো পক্ষের ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাকেই খাটো করে দেখার উপায় নেই।
মোটকথা, মুশাজারাতে সাহাবার ক্ষেত্রে উলামায়ে উম্মত ভুল ও নির্ভুলের ফয়সালা যেমন করেছেন, তেমনই সকল সাহাবির শান ও মান পূর্ণমাত্রায় বজায় রেখে পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, এ বিষয়ে জবান সংযত রাখাই অধিক নিরাপদ। যুদ্ধকালীন সময়ের ঘটনা বর্ণনা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা মোটেই উচিত নয়।
মুশাজারাতে সাহাবার ঘটনার ক্ষেত্রে বস্তুত ঘটনা ও পরিস্থিতির মারাত্মক জটিলতা ও অস্পষ্টতাই ছিল সাহাবায়ে কেরামের অন্তর্বিরোধ ও সশস্ত্র সংঘর্ষের মূল কারণ। এর ফলে তাদের ইজতিহাদি সিদ্ধান্ত হয়ে পড়েছিল ত্রিমুখী। একদলের ইজতিহাদ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, অমুক ইমাম বৈধ। সুতরাং তার প্রতিপক্ষ বিদ্রোহের অপরাধে অপরাধী আর শরিয়তের বিধান মোতাবেক বৈধ ইমামের আনুগত্য গ্রহণ এবং বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ হলো অপরিহার্য কর্তব্য। ইজতিহাদকারী দ্বিতীয় পক্ষ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য। সংখ্যায় সাহাবায়ে কেরামের তৃতীয় পক্ষটিও কম বড় ছিল না। পরিস্থিতি এত জটিল ও গুরুতর ছিল যে, তাদের পক্ষে নির্দিধ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াই সম্ভবপর হয়নি।
শেষমুহূর্ত পর্যন্ত হক ও না-হক তাদের সামনে পরিষ্কার না হওয়ায় শরিয়তের নির্দেশ হিসেবেই পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করতে হয়েছিল তাদের। মোটকথা, গৃহীত পদক্ষেপের অনুকূলে ইজতিহাদের কৈফিয়ত ছিল বিধায় তারা প্রত্যেকেই আজর ও সাওয়াবের হকদার।
এ বাস্তবতাও এখানে অস্বীকার করা উচিত নয় যে, বিগত যুগের সাধারণ ঘটনাবলি এবং সাধারণ ব্যক্তিবর্গের আলোচনায় ইতিহাসের ওপর যতটা নির্ভর করা সম্ভব, সাহাবা-অন্তর্বিরোধ সংক্রান্ত আলোচনায় এসে ইতিহাসের ওপর সে পরিমাণ নির্ভরতাও বজায় রাখা সম্ভব নয়। কেননা, সাহাবা-অন্তর্বিরোধ যেভাবে যুদ্ধ ও রক্তপাত পর্যন্ত গড়িয়েছিল, তাতে মুনাফিক সাবায়ি চক্রের কুটিল চক্রান্তই ছিল মূলত দায়ী। এই সাবায়ি চক্রান্তের ফলে এমনকি সাহাবাযুগেই রাফিজি ও খারিজি ফিরকাদুটি আত্মপ্রকাশ করেছিল। বস্তুত সাহাবাবিদ্বেষই ছিল ফিরকাদুটির উৎপত্তির বুনিয়াদ।
নবীযুগে যেমন মুনাফিকরা সকল কাজে-কর্মে, আচরণ-উচ্চারণে ও সাজপোশাকে মুসলমানদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকত, তেমনই সাহাবাযুগেও সাহাবাবিদ্বেষী চক্র সাধারণ মুসলমানের মাঝেই মিলেমিশে থাকত। বর্তমান যুগে প্রত্যেক ফিরকার যেমন স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে এবং প্রতিটি কর্মে ও পর্বে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর সঙ্গে দৃশ্যমান পার্থক্য রয়েছে, যে যুগে অবস্থা তেমন ছিল না। মুসলিম উম্মাহর সকল শ্রেণি ও স্তরে তারা এমনভাবে মিশে ছিল যে, তাদের চিহ্নিত করার কোনো উপায় ছিল না। ফলে দৃশ্যত ধার্মিকতা ও আস্থাযোগ্যতার কারণে খুব সহজেই তাদের বর্ণনা সত্য বলে গ্রহণ করে নেওয়া হতো। এভাবে মুনাফিক, রাফিজি ও খারিজিদের বিভিন্ন জাল বর্ণনা বহু নির্ভরযোগ্য মুসলমানের মুখেও আস্থা ও নির্ভরতার সঙ্গে আলোচিত হতে শুরু করেছিল। যেহেতু ব্যাপার হাদিসে রাসুলের ছিল না, তাই কোনো বর্ণনা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন এবং সনদের চূড়ান্ত বিচারবিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করা হয়নি। ফলে রাফিজি-খারিজিদের বহু জাল বর্ণনা ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে এমনভাবে মিশে গেছে যে, সেগুলোকে চিহ্নিত করার এখন আর কোনোই উপায় নেই।
ফিতনা ও গোলযোগের নৈরাজ্যপূর্ণ সময়ে গুজব ও অপপ্রচার সম্পর্কে যাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে, তারা অবশ্যই জানেন যে, কোনো শহরে সৃষ্ট গোলযোগ সম্পর্কে খোদ শহরের নির্ভরযোগ্য লোকদের বর্ণনার ওপরও নির্ভর করার উপায় থাকে না। গুজব ও অপপ্রচারের ক্ষমতা তখন এমনই অপ্রতিহত হয়ে ওঠে, যা কল্পনা করাও কষ্টকর। ফলে এমনও হয় যে, কথিত নির্ভরযোগ্য লোকটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না; বরং কোনো লোককে নির্ভরযোগ্য মনে করে তার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন।
এভাবে বর্ণনা পরম্পরায় একটি ভিত্তিহীন ঘটনাও মজবুত ভিত্তি পেয়ে যায়। এটা হলো যেকোনো ফিতনা ও গোলযোগের নৈরাজ্যপূর্ণ পরিস্থিতির স্বাভাবিক চিত্র। সুতরাং সাহাবা-অন্তর্বিরোধের নৈরাজ্যপূর্ণ সময়খণ্ডটি উপরিউক্ত স্বভাবধারার ব্যতিক্রম কীভাবে হতে পারে! বিশেষত সাবায়ি চক্রের রাফিজি ও খারিজি সদস্যরা যেখানে ছিল অতিমাত্রায় তৎপর।
সাহাবাযুগের ইসলামি ইতিহাস যে সকল নেতৃস্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য আলিম-মুহাদ্দিস সংকলন করেছেন, তারা ইতিহাস সংকলনের স্বীকৃত রীতি মোতাবেক কোনো ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রাপ্ত সকল বর্ণনাই আনুপূর্বিক লিপিবদ্ধ করে গেছেন। সুতরাং বুঝে দেখুন, নির্ভরযোগ্য ইতিহাস সংকলকের গ্রন্থে স্থান পেয়েছে বলেই ইতিহাসের এই বর্ণনাসম্ভার কতটা নির্ভরযোগ্যতা দাবি করতে পারে? পৃথিবীর আর দশটা ক্ষেত্রে কোনো সাধারণ ঘটনা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে সংকলিত ইতিহাসের বেলায় সাধারণত এ ধরনের বিকৃতির আশঙ্কা থাকে না। কিন্তু সাহাবা-অন্তর্বিরোধের নৈরাজ্যপূর্ণ সময়ের ঘটনাবলির ক্ষেত্রে এ কথা মোটেই খাটে না।
বস্তুত বিখ্যাত তাবেয়ি হজরত হাসান বসরি রহ. এ সম্পর্কে যা বলেছেন, তা-ই হচ্ছে আলোচ্য প্রসঙ্গে শেষ কথা। তিনি বলেছেন, «قتال شهده أصحاب محمد صلى الله عليه وسلم وغبنا، وعلموا وجهلنا، واجتمعوا فاتبعنا، واختلفوا فوقفنا».
সেটি এমন একটি লড়াই, যাতে সাহাবায়ে কেরাম অংশ নিয়েছেন; আর আমরা ছিলাম অনুপস্থিত। পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের অবগতি ছিল, অথচ আমাদের তা নেই। সুতরাং তারা যে বিষয়ে একমত হয়েছেন, আমরা তার অনুসরণ করেছি, আর যে বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছেন, আমরা সে বিষয়ে নীরবতা অবলম্বন করেছি।
ইমাম চতুষ্টয়ের অন্যতম ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. কত কঠিন উক্তি করেছেন, «إذا رأيت أحدا يذكر أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم بسوء فاتهمه على الإسلام».
কাউকে যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিদের সমালোচনা করতে দেখো, তাহলে তার ঈমানকে সন্দেহের চোখে দেখবে।
।। প্রথম খণ্ড সমাপ্ত।।
টিকাঃ
১৫৯. 'সাহাবা অন্তর্বিরোধ বিষয়ে ইতিহাস অধ্যয়নের মূলনীতি' শিরোনামের লেখাটি (হজরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মাদ শফি রহ. রচিত) 'মাকামে সাহাবা' গ্রন্থের মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ দা. বা.-কৃত বাংলা অনুবাদ থেকে চয়ন করে অনুবাদক কর্তৃক সংযোজন করা হয়েছে। ইতিহাসঅনুরাগী প্রত্যেক পাঠকের 'মাকামে সাহাবা' গ্রন্থটি অধ্যয়ন করা উচিত।
১৬০. শামসুদ্দিন কুরতুবি, আল-জামে লি আহকামিল কুরআন [তাফসিরে কুরতুবি], সুরা হুজুরাত, আয়াত নং ০৯।
১৬১. ইমাম ইবনে তাইমিয়া, আস-সারিমুল মাসলুল, পৃষ্ঠা: ৫৬৮।