📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উটের যুদ্ধ

📄 উটের যুদ্ধ


অবশেষে ইসলামের শত্রু সাবায়ি চক্রের ষড়যন্ত্র সফল হয়। তারা দুদিক থেকে তির ছুড়তে থাকায় উভয় পক্ষই মনে করছিল যে, অপর পক্ষ সমঝোতার পরিবর্তে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। শুরু হয় উত্তেজিত দুপক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড লড়াই। আম্মাজান আয়েশা রাযি.-এর হাওদা বহনকারী উটের সামনে প্রচণ্ড লড়াই চলতে থাকে। সাবায়ি চক্র যেকোনো মূল্যে আম্মাজানকে বহনকারী উটটিকে হত্যা করার চেষ্টা করছিল। তাদের আক্রমণে সেখানেই নিহত হয় সত্তরজন ব্যক্তি, যারা প্রত্যেকে উটের রাশ (নাসিকা বন্ধনী) ধরে ছিল।

হজরত আলি রাযি. বিষয়টি অবগত হয়ে উটের পায়ে আঘাত করেন এবং আম্মাজান বিপদমুক্ত হন। তিনি তার সঙ্গীদেরকে আয়েশা রাযি.-কে পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দেন। অবশেষে আম্মাজান নিরাপদে মদিনায় ফিরে যান। এভাবে দুষ্ট সাবায়ি চক্রের ষড়যন্ত্রে সংঘটিত এ যুদ্ধে বসরায় গমনকারী বাহিনীর দশ হাজার এবং আলি রাযি.-এর বাহিনীর পাঁচ হাজার সৈন্য নিহত হয়।

যুদ্ধ শুরু হলে হজরত তালহা রাযি. চিৎকার করে উভয় পক্ষকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছিলেন। এরই মধ্যে তিনি তিরবিদ্ধ হয়ে ইন্তেকাল করেন। তালহা ও যুবায়র রাযি. ছিলেন আশারায়ে মুবাশশারার অন্তর্ভুক্ত দুই মহান সাহাবি। তারা দুজন খলিফা উমর রাযি.-এর নির্বাচিত শুরারও সদস্য ছিলেন। ইসলামের একেবারে সূচনালগ্ন থেকে নবীজির সঙ্গী হয়ে তারা দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য অনন্যসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন। হজরত আলি রাযি.-এর সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ ছিল না; বরং তালহা রাযি.-ই প্রথম আলি রাযি.-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। আলি রাযি. যেমন সমঝোতা ও শান্তি কামনা করছিলেন, তারা দুজনও তেমনই শান্তি ও সমঝোতার জন্যই চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু দুষ্ট সাবায়ি চক্রের ষড়যন্ত্রে উসমান রাযি.-এর পর এই দুই মহান সাহাবিও নিহত হন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সিফফিনের যুদ্ধ

📄 সিফফিনের যুদ্ধ


হজরত মুয়াবিয়া রাযি. খলিফা উমর রাযি.-এর শাসনামল হতেই শামের গভর্নর ছিলেন। তিনি যখন দেখতে পান যে, একদিকে উসমান-হত্যার বিচারের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হচ্ছে না, অপরদিকে বিচারের দাবিদার আন্দোলনকারীগণ বসরায় সমবেত হওয়ার পর উটের যুদ্ধের ন্যায় বেদনাদায়ক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, তখন তিনি বায়আতের বিষয়ে আরও বিলম্ব করার সিদ্ধান্ত নেন। অপরদিকে আলি রাযি.-এর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল—যেহেতু তিনি এখন ইসলামি রাষ্ট্রের বৈধ খলিফা এবং অন্যান্য অঞ্চলের প্রশাসন ও জনগণ ইতিমধ্যে তার খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করেছে, তাই ইসলামি খিলাফতের অধীনস্থ একটি অঞ্চলের গভর্নর হিসেবে মুয়াবিয়া রাযি.-এর কর্তব্য তার বায়আত গ্রহণ করা।

অবশেষে ৩৭ হিজরি সনের মুহাররম মাসে খলিফা আলি রাযি. শামের গভর্নর-পদ হতে মুয়াবিয়া রাযি.-কে অপসারণ করেন। কিন্তু মুয়াবিয়া রাযি. খলিফার নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করেন। বাধ্য হয়ে খliফা আলি রাযি. তার বাহিনী নিয়ে কুফা থেকে মুয়াবিয়া রাযি.-এর মোকাবিলায় রওনা হন। মুয়াবিয়া রাযি.-ও নিজ বাহিনী নিয়ে শাম থেকে বের হয়ে আসেন। ষড়যন্ত্রকারীদের একটি দলও তার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়।

যুদ্ধের পূর্বে আলি রাযি. নিজ অবস্থানের স্বপক্ষে যুক্তিসমূহ উল্লেখ করে মুয়াবিয়া রাযি.-এর কাছে বার্তাবাহক প্রেরণ করেন। কিন্তু মুয়াবিয়া রাযি. তা মেনে না নেওয়ায় সমঝোতার পথ বন্ধ হয়ে যায়। সিফফিনের কাছে উভয় বাহিনী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। বিশিষ্ট সাহাবি আম্মার বিন ইয়াসির রাযি. মুয়াবিয়া রাযি.-এর বাহিনীর হাতে নিহত হন। নবীজি আম্মার বিন ইয়াসির রাযি.-কে বলেছিলেন—
«تَقْتُلُكَ الْفِئَةُ الْبَاغِيَةُ» তোমাকে বিদ্রোহী দল হত্যা করবে।

একপর্যায়ে জয়ের পাল্লা আলি রাযি.-এর দিকে হেলে পড়ে এবং মুয়াবিয়া-বাহিনী পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। এ সময় মুয়াবিয়া রাযি.-এর বাহিনীতে থাকা আমর ইবনুল আস রাযি. যুদ্ধ বন্ধ করে সালিশ ও মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের দাবি তোলেন। তখন মুয়াবিয়া রাযি.-এর বাহিনীর সৈন্যরা কুরআন উঁচু করে ধরে এবং মধ্যস্থতার দাবি জানায়।

আলি রাযি. বুঝতে পারেন—প্রকৃতপক্ষে এটি পরাজয় এড়ানোর একটি কৌশলমাত্র। কিন্তু আলি রাযি.-এর বাহিনীর অধিকাংশ সাহাবিগণ মধ্যস্থতার প্রস্তাব মেনে নেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করলে তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও তা মেনে নিতে বাধ্য হন।

টিকাঃ
১৪৯. উটের যুদ্ধের পর হজরত আলি রাযি. বসরা থেকে কুফায় চলে যান এবং কুফাকেই দারুল খিলাফাহ নির্ধারণ করেন। এর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ হলো—১. ইসলামি রাষ্ট্র ততদিনে যথেষ্ট বিস্তৃত হয়ে গিয়েছিল। তাই ইসলামি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মূল কেন্দ্র এমন কোথাও হওয়া প্রয়োজন ছিল, যেখান থেকে রাষ্ট্রের যেকোনো প্রান্তে সহজে পৌঁছা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কৌশলগত দিক থেকে কুফাই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্র। ২. একমাত্র শাম অঞ্চলই আলি রাযি.-এর খিলাফত মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। যেহেতু কুফার অবস্থান ছিল শামের সন্নিকটে, তাই খলিফা আলি রাযি. শাম থেকে আগত সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য কুফায় অবস্থান করা শ্রেয়তর মনে করেছিলেন।
১৫০. সিফফিন: রোমান আমলে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রাচীন একটি জনপদ। আধুনিক সিরিয়ার রাক্কা নগরীতে ফোরাত নদীর পশ্চিম তীরে ছোট্ট এই জনপদটির অবস্থান।
১৫১. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৮০০।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সালিশ ও মধ্যস্থতা

📄 সালিশ ও মধ্যস্থতা


ইতিহাসের এই অংশটি অত্যন্ত জটিল। সালিশ ও সালিশের ফলাফল নিয়ে নানা ধরনের কথা প্রচলিত আছে। যেমন—আমর ইবনুল আস রাযি. আবু মুসা আশআরি রাযি.-কে ধোঁকা দিয়েছিলেন, তিনি আমিরুল মুমিনিন হজরত আলি রাযি.-এর বরখাস্তের ঘোষণা দিতে আবু মুসা আশআরিকে বাধ্য করেন, এরপর নিজে দাঁড়িয়ে আবু মুসার ঘোষণাকে সমর্থন করেন এবং উভয়ের সিদ্ধান্তের বিপরীতে মুয়াবিয়া রাযি.-এর নামে খিলাফতের ঘোষণা দেন ইত্যাদি।

প্রকৃতপক্ষে এগুলো সব মিথ্যা ও বানোয়াট বর্ণনা, যার একটিও প্রমাণিত নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো—প্রাচীন ও আধুনিক যেসব লেখক এসব বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, তারা সকলেই কিন্তু সুস্পষ্ট ভাষায় এ কথা স্বীকার করেন যে, মুয়াবিয়া রাযি. কখনোই আলি রাযি.-এর খিলাফত নিয়ে আপত্তি বা বিতর্ক করেননি এবং নিজে খলিফা হওয়ার দাবিও করেননি; তিনি কেবল উসমান-হত্যাকারীদের কিসাসের দাবি জানিয়েছেন। তার যুক্তি ছিল, নিহত ব্যক্তির শরয়ি অভিভাবক হিসেবে রক্তপণ দাবি করার অধিকার তার আছে। এটি ভিন্ন প্রসঙ্গ যে, তৎক্ষণাৎ কিসাস প্রয়োগের দাবির ক্ষেত্রে তিনি ইজতিহাদি ভুল করেছিলেন। কারণ, সকলেই এ কথা স্বীকার করে যে, আলি রাযি. কখনোই কিসাস কার্যকর করতে অস্বীকৃতি জানাননি, শিথিলতা বা অবহেলাও প্রদর্শন করেননি। আলি রাযি.-এর যুক্তি ছিল—
সমস্যা তো এখন আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। খোদ ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী মদিনাই এখন বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। এ কারণেই আমিরুল মুমিনিন আলি রাযি. তালহা রাযি. ও যুবায়র রাযি.-কে বলেছিলেন, 'আমরা এমন একদল লোকের বিরুদ্ধে কীভাবে (এখনই) পদক্ষেপ গ্রহণ করব, যারা আমাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে আছে; অথচ তাদের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই?' এরপর তিনি বলেন, 'এভাবে খুনের বদলার দাবিতে আন্দোলন করা একটি জাহিলি রীতি। আপনারা শান্ত হোন; ধীরে ধীরে সকলে শান্ত হয়ে যাবে এবং সবার হৃদয়-অবস্থান স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তখন হত্যার কিসাস গ্রহণ করা হবে।'

মূল বর্ণনায় ফিরে আসি। হজরত আমর ইবনুল আস রাযি. ও আবু মুসা আশআরি রাযি.-কে মধ্যস্থতাকারী নির্ণয় করা হয়। উভয়ে সিদ্ধান্ত জানান—আলি রাযি.-কে খিলাফতের দায়িত্ব হতে বরখাস্ত করে বিষয়টি মুসলিম উম্মাহর হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক; তারা যাকে ইচ্ছা, নিজেদের খলিফা নির্বাচন করবে। বাকি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক-ব্যবস্থাপনা পূর্বের ন্যায় উভয় নেতার হাতেই থাকবে। আলি রাযি. তার অধীনস্থ অঞ্চলের দেখাশোনা করবেন আর শামের দায়িত্ব থাকবে মুয়াবিয়া রাযি.-এর হাতে।

আলি রাযি. সালিশের ফয়সালা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি এ ফয়সালাকে মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তিদ্বয়ের অনধিকার চর্চা হিসেবে বিবেচনা করেন। কারণ, বিরোধ তো খলিফা নির্বাচন নিয়ে ছিল না; বিরোধ ছিল উসমান রাযি.-এর হত্যাকারীদের বিচার কার্যকর করা নিয়ে।

এরপর খলিফা আলি রাযি. তার অনুসারীদের নতুন করে মুয়াবিয়া রাযি.-এর বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু তারা তার আহ্বানে সাড়া দেওয়া দূরে থাক; এর পরিবর্তে ঘটে এক বিস্ময়কর বিভক্তি।

টিকাঃ
১৫২. সালিশ ও মধ্যস্থতার বিষয়সহ উসমান রাযি. ও আলি রাযি.-এর খিলাফত আমলের ফিতনা পরিস্থিতি সম্পর্কে ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার জন্য দেখুন: মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত ড. রাগিব সারজানির 'ফিতনার ইতিহাস'।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 খারিজি সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ

📄 খারিজি সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ


আলি রাযি.-এর বাহিনীর বারো হাজার সৈন্যের একটি দল মধ্যস্থতার মূল প্রক্রিয়াকেই প্রত্যাখ্যান করে বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অথচ ইতিপূর্বে তারাই আলি রাযি.-কে মধ্যস্থতার প্রস্তাব মেনে নিতে বাধ্য করেছিল। তারা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই ক্ষান্ত না হয়ে মধ্যস্থতার প্রস্তাব মেনে নেওয়ায় হজরত আলিকে কাফির সাব্যস্ত করে।

বিচ্ছিন্ন বাহিনী কুফায় পৌঁছে হারুরা নামক গ্রামে অবতরণ করে। এ কারণে বিচ্ছিন্নতাবাদী এ দলটিকে হারুরিয়া নামে অভিহিত করা হয়। তবে তাদের প্রসিদ্ধ নাম হলো খারিজি সম্প্রদায়।

হজরত আলি রাযি. ও অন্যান্য ফকিহ সাহাবিগণ তাদেরকে এ বিষয়ে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝানোর চেষ্টা করেন; কিন্তু তারা ছিল চরম নির্বোধ প্রকৃতির বেদুইন গোষ্ঠী। নিজেদের মাথায় যা ধরত, তারা কেবল তা-ই বুঝত; কোনো যুক্তিতর্ক মানার মনোভাব তাদের মধ্যে ছিল না। তারা মানুষকে সালিশের বিষয়ে জিজ্ঞেস করত; যে এর পক্ষে বলত, তাকেই তারা মুরতাদ ও কাফির গণ্য করে হত্যা করত।

দলিলপ্রমাণ ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে খারিজি সম্প্রদায়কে সুপথে আনার প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ প্রমাণিত হয়, তখন বাধ্য হয়ে হজরত আলি রাযি. ৩৮ হিজরি সনে তাদের দমনে যুদ্ধ শুরু করেন। বহু খারিজি নিহত হয়, অনেকে পালিয়ে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীকালে খারিজিরা বিভক্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন বিশটি উপদলে পরিণত হয়।

৩৯ হিজরি সনে আলি রাযি. ও মুয়াবিয়া রাযি. পরস্পর যুদ্ধবিরতির সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ হন। উভয়ের ঐকমত্যে সিদ্ধান্ত হয়, মুয়াবিয়া রাযি.-ই শামের গভর্নর থাকবেন, আমিরুল মুমিনিন শামে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করবেন না।

৪০ হিজরিতে খারিজিরা আমিরুল মুমিনিন আলি রাযি., শামের গভর্নর মুয়াবিয়া রাযি. ও (তাদের দৃষ্টিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অপরাধী) আমর ইবনুল আস রাযি.-কে হত্যা করে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা উল্লিখিত তিন মহান সাহাবিকে হত্যা করার জন্য তিনজন গুপ্তঘাতককে দায়িত্ব দেয়। আলি রাযি.-কে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হয় আবদুর রহমান বিন মুলজিমকে, মুয়াবিয়া রাযি.-কে হত্যা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় বুরাক বিন আবদুল্লাহকে আর আমর ইবনুল আস রাযি.-কে হত্যা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় আমর বিন বকর তামিমিকে। সিদ্ধান্ত হয়, তিন গুপ্তঘাতক ১৭ রমজান ফজর নামাজের সময় তাদেরকে হত্যা করবে। কিন্তু তিন গুপ্তঘাতকের মধ্যে কেবল একজনই তার দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়।

৪০ হিজরি সনের ১৭ রমজান (৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি)। প্রতিদিনের অভ্যাসমতো খলিফা আলি রাযি. ফজরের পূর্বে সকলকে জাগ্রত করতে ঘর থেকে বের হন। কুফার মসজিদের দরজায় ওত পেতে ছিল খারিজি গুপ্তঘাতক। আলি রাযি. মসজিদের কাছে পৌঁছতেই গুপ্তঘাতক তার ওপর হামলা চালায়। আহত খলিফা চিৎকার করে বলে ওঠেন, 'কাবার রবের শপথ! আমি তো সফলকাম!'

লোকজন দ্রুত ছুটে এসে ঘাতককে ধরে ফেলে। খলিফার তখন অন্তিম মুহূর্ত সন্নিকটে। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ঘাতককে কী করা হবে? আলি রাযি. উত্তর দেন, 'যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে করণীয় আমিই নির্ধারণ করব। আর যদি আমি মারা যাই, তাহলে করণীয় নির্ণয়ের অধিকার তোমাদের। তোমরা যদি কিসাস গ্রহণেরই সিদ্ধান্ত নাও, তাহলে এক আঘাতের পরিবর্তে এক আঘাতই করবে; আর যদি তাকে ক্ষমা করে দাও, তাহলে তা-ই তাকওয়ার নিকটতর দাবি।'

একই সময় শামে বুরাক বিন আবদুল্লাহ মুয়াবিয়া রাযি.-এর ওপর আক্রমণ চালায়। তার লক্ষ্যভ্রষ্ট আঘাতে মুয়াবিয়া রাযি. আহত হলেও পরে সুস্থ হয়ে যান। অপরদিকে আমর ইবনুল আস রাযি.-কে হত্যা করার জন্য ঘাতক আমর বিন বকর ওত পেতে থাকলেও তিনি সেদিন অসুস্থতার কারণে নিজে মসজিদে না গিয়ে খারিজা বিন হুযাফা রাযি.-কে ইমামতি করার জন্য পাঠান। ঘাতক তাকেই আমর মনে করে হত্যা করে।

ইসলামের চতুর্থ খলিফা হজরত আলি রাযি. তেষট্টি বছর বয়সে ৪০ হিজরির ২১ রমজান (৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি) কুফায় ইন্তেকাল করেন।

৪০ হিজরির শাওয়াল মাসে (৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে) মদিনাবাসী হজরত হাসান বিন আলি রাযি.-এর হাতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করে।

এর মাত্র ছয় মাস পর ৪১ হিজরি সনের ২৫ রবিউল আউয়াল (৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুলাই) হজরত হাসান রাযি. উম্মাহর ঐক্য ও সম্প্রীতির বৃহত্তর স্বার্থে হজরত মুয়াবিয়া রাযি.-এর হাতে খিলাফতের দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এ কারণেই ৪১ হিজরি সনকে ঐক্য ও সম্প্রীতির বছর বলে নামকরণ করা হয়। হাসান রাযি.-এর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হয় তার সম্পর্কে সত্যনবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কৃত এই ভবিষ্যদ্বাণী—
«إِنَّ ابْنِي هَذَا سَيِّدُ ، وَلَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يُصْلِحَ بِهِ بَيْنَ فِئَتَيْنِ عَظِيمَتَيْنِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ»
আমার এই দৌহিত্র একজন সর্দার। সম্ভবত আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে মুসলিম জাতির বড় দুটি দলের মাঝে মীমাংসা করবেন।

টিকাঃ
১৫৩. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৭০৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00