📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উসমান রাযি.-এর কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য

📄 উসমান রাযি.-এর কিছু গুণ-বৈশিষ্ট্য


উসমান রাযি. প্রথমে নবী-কন্যা রুকাইয়া রাযি.-কে বিয়ে করেন। বদর যুদ্ধের সময় রুকাইয়া রাযি. ইন্তেকাল করলে পরবর্তী সময়ে নবীজি তার কাছে আরেক কন্যা উম্মে কুলসুম রাযি.-কে বিয়ে দেন। উম্মে কুলসুম রাযি. নবম হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। উসমান রাযি. আশারায়ে মুবাশশারার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
ইমাম বুখারি রহ. আপন সনদে হজরত আনাস রাযি.-এর সূত্রে উল্লেখ করেন—নবীজি একদিন আবু বকর, উমর ও উসমানকে সঙ্গে নিয়ে উহুদ পাহাড়ে আরোহণ করলেন। (তাদেরকে পেয়ে আনন্দে) পাহাড়টি কেঁপে উঠল। নবীজি বললেন, হে উহুদ, শান্ত হও (আনাস রাযি. বলেন, আমার মনে হয়—নবীজি এ কথা বলার সময় পা দিয়ে পাহাড়ের গায়ে আঘাত করেছেন); তোমার ওপর তো একজন নবী, একজন সিদ্দিক ও দুজন শহিদ আছেন। (১৩৩)
ইমাম বুখারি রহ. হজরত আবু মুসা আশআরি রাযি.-এর সূত্রে উল্লেখ করেন যে, তিনি বলেন—নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি (প্রাচীরবেষ্টিত) বাগানে প্রবেশ করলেন এবং আমাকে বাগানের প্রাচীরদ্বারে পাহারা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এক ব্যক্তি এসে প্রবেশের অনুমতি চাইল। নবীজি বললেন, ‘তাকে অনুমতি দাও এবং জান্নাতের সুসংবাদ দাও।’ আমি (দরজা খুলে) দেখলাম, তিনি আবু বকর। এরপর আরেকজন এসে প্রবেশের অনুমতি চাইল। নবীজি বললেন, ‘তাকে অনুমতি দাও এবং জান্নাতের সুসংবাদ দাও।’ আমি (দরজা খুলে) দেখলাম যে, তিনি উমর। তারপর আরেকজন এসে প্রবেশের অনুমতি চাইল। নবীজি অল্প কিছুক্ষণ চুপ থেকে তারপর বললেন, ‘তাকেও প্রবেশের অনুমতি দাও এবং অচিরেই তার ওপর আরোপিত এক বিপদের আগমনের সঙ্গে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।’ আমি (দরজা খুলে) দেখলাম, তিনি উসমান। (১৩৪)
ইমাম মুসলিম রহ. আপন সনদে আম্মাজান আয়েশা রাযি.-এর সূত্রে উল্লেখ করেন যে, তিনি বলেন—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘরে শোয়া ছিলেন; তখন তার ঊরু বা পায়ের গোছা উন্মুক্ত ছিল। আবু বকর এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে ওই অবস্থায়ই তিনি প্রবেশের অনুমতি দিলেন এবং কথাবার্তা বললেন। এরপর উমর এসে অনুমতি চাইলে তাঁকেও ওই অবস্থায়ই প্রবেশের অনুমতি দিলেন এবং কথাবার্তা বললেন। এরপর উসমান অনুমতি চাইলেন। নবীজি উঠে বসলেন এবং কাপড় ঠিক করলেন। উসমান কথাবার্তা বলে চলে যাওয়ার পর আয়েশা বললেন, 'আবু বকর এলেন; আপনি পরিবর্তিত হলেন না এবং বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। এরপর উমর এলেন; তখনও আপনি পরিবর্তিত হলেন না এবং বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। উসমান আসতেই আপনি উঠে বসলেন এবং কাপড় ঠিক করলেন!' নবীজি বললেন, 'আমি কি এমন ব্যক্তির উপস্থিতিতে লজ্জা করব না, ফিরেশতারা যাকে লজ্জা করে থাকেন?' (১৩৫)
হজরত উসমান রাযি. নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একশ ছেচল্লিশটি হাদিস বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
১৩০. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৬৯৯।
১৩৫. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৪০১।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দায়িত্বগ্রহণের পর খলিফা উসমান রাযি.-এর প্রথম ভাষণ

📄 দায়িত্বগ্রহণের পর খলিফা উসমান রাযি.-এর প্রথম ভাষণ


উসমান রাযি. তার খিলাফতকাল শুরু করেন মুসলমানদের উদ্দেশে প্রদত্ত এক ভাষণের মাধ্যমে। হামদ ও ছানার পর তিনি বলেন,
লোকসকল, নিঃসন্দেহে প্রতিটি আরোহণের সূচনা কঠিন হয়ে থাকে। আজকের পর আরও দিন আছে। আমি যদি বেঁচে থাকি, তাহলে তোমাদের সামনে যথাযথভাবে আরও ভাষণ আসবে। আমি তো বাগ্মী নই (তিনি স্বভাববক্তা ছিলেন না); শীঘ্রই আল্লাহ তাআলা আমাকে তা শিখিয়ে দেবেন। আর একজন বাগ্মী শাসকের তুলনায় একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক তোমাদের বেশি প্রয়োজন।
দায়িত্বগ্রহণের পর খলিফা উসমান রাযি. চারটি পত্র লেখেন। প্রথমটি গভর্নরদের উদ্দেশে, দ্বিতীয়টি খারাজ-সদকা উসুলকারীদের উদ্দেশে, তৃতীয়টি সাধারণ জনগণের উদ্দেশে এবং চতুর্থটি যুদ্ধরত বিভিন্ন বাহিনীর সেনাপতিদের উদ্দেশে। প্রতিটি পত্রে তিনি তার স্বরাষ্ট্রনীতি ও প্রশাসননীতি সুনির্ধারিতভাবে উল্লেখ করেন এবং এ বিষয়টি সুস্পষ্ট করে দেন যে, হক ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তিনি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার পূর্ববর্তী খলিফাদ্বয়ের অনুসৃত পথেই চলবেন।
উসমান রাযি. তার পূর্বসূরি উমর রাযি.-এর ন্যায় কঠোর ছিলেন না। আর এতে আপত্তিরও কিছু নেই। প্রত্যেকেরই আছে স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব ও নীতি। খলিফা উসমান রাযি.-এর দস্তরখানে পরিবেশিত হতো কচি মেষশাবকের গোশত ও চালনি দিয়ে ছাঁকা সাদা ময়দার রুটি। তাকে যখন বলা হয়, (আপনার পূর্বতন খলিফা) উমর তো শুধু বয়স্ক মেষের গোশতই খেতেন, তখন তিনি উত্তরে বলেন, 'আল্লাহ তাআলা উমরের প্রতি রহম করুন; উমরের মতো সংযম ও সহন-ক্ষমতা কার আছে?'
খলিফা হওয়ার পর উসমান রাযি. জনসাধারণের জীবনধারায় ব্যাপকতা আনতে সচেষ্ট হন। আর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও অন্যান্য সম্পদের প্রাচুর্যের বিবেচনায় এটিই ছিল স্বাভাবিক বিষয়।
ইমাম বুখারি রহ. তার ইতিহাসগ্রন্থে হজরত হাসান সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন—
মানুষ যেসব বিষয়ে উসমানকে অভিযুক্ত করে; তা আমার জানা আছে। আরে! জনসাধারণের অবস্থা তো এই ছিল যে, তারা সম্পদ-প্রাচুর্যে ডুবে ছিল। প্রায়ই ঘোষণা করা হতো—হে মুসলমানগণ, প্রত্যুষে তোমরা তোমাদের ভাতা ও অনুদান নিয়ে যাও। সকলে তা পরিপূর্ণ নিয়ে নিত। একটু পরেই ঘোষণা করা হতো—তোমাদের জীবিকানির্বাহের জিনিসপত্র নিয়ে যাও। মানুষ তা-ও পরিপূর্ণ নিয়ে নিত। এরপর বলা হতো—ঘি ও মধু নিয়ে যাও। মোটকথা দান-অনুদান ছিল অবারিত, রুজি ও জীবিকা ছিল বহমান আর শত্রুরা ছিল আত্মরক্ষার চিন্তায় হয়রান। মুসলমানদের পারস্পরিক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। কল্যাণ ও কল্যাণকামিতার প্রাচুর্য ছিল। মুমিন মুমিনের সাক্ষাতে সন্ত্রস্ত হতো না; বরং পরিচয়ে একে অপরের ভাইয়ে পরিণত হতো। হৃদ্যতা ও ভালোবাসার দাবিতেই এই নসিহত করা হতো যে, অচিরেই হয়তো তোমরা স্বার্থপরতা দেখবে। এরূপ দেখলে তোমরা অবশ্যই ধৈর্য অবলম্বন করবে।
বাস্তবেই সেই পরিস্থিতি যখন এসে গেল, তখন মানুষ যদি ধৈর্যধারণ করত, তাহলে দান-অনুদানের ধারা আরও ব্যাপক ও অবারিত হতো। কিন্তু মানুষ শপথ করে বলা শুরু করল, আমরা ধৈর্য ধরতে রাজি নই। আর তাই আল্লাহর শপথ! তারা দান-অনুদান সবই হারাল, আরও হারাল শান্তি ও নিরাপত্তা। এতদিন নিজেদের মধ্যে তরবারি ছিল কোষবদ্ধ। এখন সেই তরবারি উন্মুক্ত হয়ে গেছে। আল্লাহর শপথ! কিয়ামত পর্যন্ত এই তরবারি আর কোষবদ্ধ হবে না।
মূল আলোচনায় ফিরে আসি। খলিফা উমরের নিহত হওয়ার সংবাদ জানামাত্র রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যে আলোড়ন শুরু হয়ে যায়। পারস্যের যেসব অঞ্চল মুসলিম বাহিনী জয় করেছিল, অধিকাংশ অঞ্চলে চুক্তিভঙ্গ পূর্বক বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। ওদিকে রোমান শক্তি তাদের অধিকৃত অঞ্চল থেকে মুসলিম বাহিনীকে বিতাড়িত করার চেষ্টা চালায়। তারা শামে হামলা চালায়, মিশর পুনরুদ্ধার করতে চেষ্টা করে। দায়িত্ব গ্রহণ করেই খলিফা উসমান এমন এক কঠিন দুর্যোগ-পরীক্ষার সম্মুখীন হন, যাকে তুলনা করা যেতে পারে প্রথম খলিফা আবু বকর রাযি.-এর আমলের ধর্মত্যাগ-ফিতনার সঙ্গে। কিন্তু উসমান রাযি. বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট হন। পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যে অবস্থানরত মুসলিম অভিযাত্রীগণ শত্রুদের দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা দিতে সক্ষম হয়। মুসলমানরা পুনরায় পারস্যের প্রদেশগুলোতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তারা সেখানকার অধিবাসীদের প্রতি প্রতিশোধমূলক আচরণের পরিবর্তে উদার দৃষ্টিতে সবকিছু উপেক্ষা করে। ফলে এসব অঞ্চলের অধিবাসীরা পুনরায় ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে নিরাপদে-নিশ্চিন্তে বসবাস করতে শুরু করে। পাশাপাশি মুসলিম বাহিনী রোমান বাহিনীকে পরাজিত করে শামের অধিকৃত অঞ্চলসমূহ পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 প্রথম ইসলামি নৌবহর প্রতিষ্ঠা

📄 প্রথম ইসলামি নৌবহর প্রতিষ্ঠা


খলিফা উসমান রাযি.-এর আমলে শামে নিযুক্ত গভর্নর বিশিষ্ট সাহাবি মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান রাযি. মুসলমানদের জন্য প্রথম নৌবহর প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তিনি ইতিপূর্বে দ্বিতীয় খলিফা উমর রাযি.-এর কাছেও নৌবহরের পরিকল্পনা পেশ করেছিলেন; কিন্তু খলিফা উমর মুসলমানদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর তিনি খলিফা উসমান রাযি.-এর কাছে একই পরিকল্পনা তুলে ধরেন এবং বারবার তাকে এ বিষয়ে অনুরোধ জানান। অবশেষে ২৮ হিজরিতে খলিফা উসমান রাযি. পরিকল্পনায় সম্মতি দান করেন। নবগঠিত নৌবহর নিয়ে মুয়াবিয়া রাযি. সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সাইপ্রাসে অভিযান পরিচালনা করেন। পরাজিত সাইপ্রাসবাসী মুসলমানদের জিজিয়া প্রদানের শর্তে সন্ধিচুক্তি করে। এ অভিযানে বিশিষ্ট সাহাবি উবাদা বিন ছামিত রাযি.-এর সহধর্মিণী উম্মে হারাম রাযি.-ও অংশগ্রহণ করেন। ফলে নবীজির সেই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয় যে, উম্মে হারাম সমুদ্রপথে অভিযান পরিচালনাকারী প্রথম মুসলিম বাহিনীর সদস্য হবেন। উম্মে হারাম রাযি. সাইপ্রাস-অভিযানেই ইন্তেকাল করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সাইপ্রাস বিজয়

📄 সাইপ্রাস বিজয়


ইমাম বুখারি রহ. বুখারি শরিফের জিহাদ অধ্যায়ে হজরত আনাস রাযি.-সূত্রে বর্ণনা করেন—
ন নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মে হারাম রাযি.-এর ঘরে দুপুরে কিছুক্ষণ ঘুমান। এরপর নবীজি হাস্যোজ্জ্বল অবস্থায় জাগ্রত হন। উম্মে হারাম হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে নবীজি উত্তর দেন, তিনি স্বপ্নে তাঁর উম্মতের একটি দলকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত অবস্থায় দেখেছেন। বাদশা যেভাবে আপন সিংহাসনে আরোহণ করে, তারা সেভাবে সমুদ্রে আরোহী ছিল। এরপর রেখে ঘুমিয়ে পড়েন এবং (কিছুক্ষণ পর) জেগে ওঠেন। এবারও তিনি প্রথমবারের মতো স্বপ্ন দেখেন। উম্মে হারাম নবীজিকে বলেন, আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন, যেন তিনি আমাকে উক্ত বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করেন। নবীজি বলেন, তুমি তো প্রথম দলের মধ্যে আছ। (অর্থাৎ প্রথম যে বাহিনী সমুদ্রপথে অভিযান পরিচালনা করবে, তুমি সে বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হবে।) (১৩৬)
খলিফা উসমান রাযি.-এর খিলাফতকালে মুয়াবিয়া রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন সাইপ্রাস-অভিযানে অংশগ্রহণকারী নৌবাহিনীই ছিল সেই প্রতিশ্রুত বাহিনী। মুয়াবিয়া রাযি. ২৮ হিজরিতে সাইপ্রাস জয় করেন। এই অভিযানে উম্মে হারাম রাযি. তাঁর স্বামী উবাদা বিন ছামিত রাযি.-এর সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন এবং (অশ্বপৃষ্ঠ হতে পড়ে গিয়ে) শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর কবর আজও সাইপ্রাসে আছে।
ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. বলেন,
(নবীজির স্বপ্নে দেখা) দ্বিতীয় বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন ইয়াযিদ বিন মুয়াবিয়া। তিনি নৌপথে কনস্টান্টিনোপলে অভিযান পরিচালনা করেন। উক্ত অভিযানে উম্মে হারাম রাযি. শরিক হতে পারেননি। ...এটি নবুওয়তের সত্যতার অন্যতম মহান দলিল। (১৩৭)
৩১ হিজরিতে (৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে) মুসলিম বাহিনী আবদুল্লাহ বিন আবুস সারহ (১৩৮)-এর নেতৃত্বে বর্তমান সুদানের অন্তর্ভুক্ত নুবিয়া অঞ্চল জয় করে। এটি ছিল সে যুগের অন্যতম কঠিন অভিযান। অভিযানে মুসলিম বাহিনী এমন এক অভিনব আক্রমণের মুখোমুখি হয়, যা মোকাবিলা করে তারা অভ্যস্ত ছিল না। প্রতিপক্ষের সৈন্যরা মুসলিম সৈন্যদের চোখ লক্ষ্য করে অনবরত তির নিক্ষেপ করতে থাকে। এর ফলে যুদ্ধের সূচনাতেই মুসলিম বাহিনীর একশ পঞ্চাশজন সৈন্য দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলে।
আবদুল্লাহ বিন আবুস সারহ নুবিয়াবাসীর সঙ্গে 'বাকত-চুক্তি' নামক একটি চুক্তি সম্পাদন করেন, যা প্রায় ছয়শ বছর কার্যকর ছিল। চুক্তিপত্রে উল্লেখ ছিল— (মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত) মিশরের সঙ্গে নুবিয়া পরস্পর রাজস্ব বিনিময় করবে এবং উভয়ের মাঝে সব ধরনের সংঘাত-যুদ্ধ বন্ধ থাকবে। ততদিনে নবগঠিত মুসলিম নৌবাহিনী (গ্রিসের) রোডস (Rhodes) হতে (লিবিয়ার) বারকা (১৩৯) পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরের সুবিস্তৃত উপকূলীয় অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং রোমান উপকূলীয় অঞ্চলেও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে শুরু করেছে। ফলে রোমান শক্তি উপলব্ধি করে যে, নবীন মুসলিম নৌবাহিনীকে এখনই ধ্বংস করতে না পারলে পরিণতি মোটেও ভালো হবে না। তাই রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের পুত্র তৃতীয় কনস্টান্টাইন (Constantine III) মুসলিম নৌবাহিনীকে চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্য এক হাজার নৌযান নিয়ে অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেন। এটি ৩৫ হিজরি সনের (৬৫৫ খ্রিষ্টাব্দের) কথা।
রোমান নৌবহরের মোকাবিলা করতে মুসলিম বাহিনীর শাম-নৌবহর বুছর বিন আরতাত-এর নেতৃত্বে এবং মিশরীয় নৌবহর আবদুল্লাহ বিন আবুস সারহ-এর নেতৃত্বে রওনা হয়। সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব অর্পিত হয় বুছর রাযি.-এর এর কাঁধে। মুসলিম বাহিনীর নৌযানের সংখ্যা ছিল দুইশ।
এ যুদ্ধের নাম যাতুস সাওয়ারির যুদ্ধ (Battle of the Masts)। যদ্দূর মনে হয়, আলেকজান্দ্রিয়ার পশ্চিমে মারসা-মাতরুহ (Mersa Matruh) নগরীর কাছে একটি নৌবন্দরের সন্নিকটে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
মুসলিম বাহিনী প্রথমে কৌশলে রোমান বাহিনীকে স্থলযুদ্ধে টেনে আনার চেষ্টা চালায়। কিন্তু রোমান বাহিনী সমুদ্রেই মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলায় অটল থাকে। অবশেষে আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দকে নৌযুদ্ধকে স্থলযুদ্ধে রূপান্তর করার পথনির্দেশ দান করেন। আবদুল্লাহ বিন আবু সারহ তার সৈন্যদের নির্দেশ দেন—তারা যেন শত্রুযানগুলোর কাছে চলে যায়। সেনাপতির নির্দেশে তারা তাদের নৌযানগুলো নিয়ে এত কাছে চলে যায় যে, উভয় পক্ষের নৌযানগুলো পরস্পর গা ছুঁয়ে যাচ্ছিল। তখন একদল মুসলিম সৈন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পানিতে নেমে মজবুত রশি দিয়ে রোমান জাহাজগুলোর সঙ্গে মুসলিম বাহিনীর জাহাজগুলো বেঁধে ফেলে। ফলে সমুদ্রবক্ষে বিদ্যমান বারোশ জাহাজ প্রতি দশ-বিশটি একটি অপরটির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যায়। যেন সমুদ্রবুকে একখণ্ড মাটি, যেখানে সংঘটিত হচ্ছে প্রাণপণ লড়াই!
মুসলিম বাহিনী আল্লাহর শত্রুদের মোকাবিলায় অসাধারণ দৃঢ়তা ও অবিচলতার পরিচয় দেয়। এমন প্রচণ্ড ও দীর্ঘ লড়াই হয় যে, ঐতিহাসিক তাবারি রহ. লিখেছেন, এ যুদ্ধে (হতাহতদের রক্তে) পানি রক্তবর্ণ ধারণ করেছিল। অবশেষে আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করেন। কনস্টান্টাইন পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান। এই বিজয়ের ফলে ভূমধ্যসাগরে (রোম সাগরে) মুসলিম বাহিনীর কর্তৃত্ব আরও সুদৃঢ় হয়।

টিকাঃ
১৩৬. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৭৮৮।
১৩৭. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৮/২২২।
১৩৮. আবদুল্লাহ বিন আবুস সার্হ ইসলামগ্রহণ করেন হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে। এরপর মুরতাদ হয়ে গেলেও মক্কাবিজয়ের পর তিনি পুনরায় ইসলামে দীক্ষিত হন এবং ইসলামের নিবেদিতপ্রাণ সৈনিকে পরিণত হন। তিনি দোয়া করেছিলেন, 'হে আল্লাহ, নামাজকেই আমার জীবনের শেষ আমল বানিয়ে দিয়ো।' ভোরে ফজর নামাজ পড়া অবস্থায় দুই সালামের মাঝে তিনি ইন্তেকাল করেন। আমরা তার জীবনীর সামান্য অংশ এজন্য উল্লেখ করলাম যে, হজরত উসমান রাযি.-এর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়, তার মধ্যে একটি হলো, এই তাওবাকারী সাহাবিকে তিনি মিশরের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। [মূল গ্রন্থের টীকা]
এ তথ্যটিও এখানে প্রাসঙ্গিক যে, উসমান রাযি.-এর পূর্বেই দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযি. আবদুল্লাহ বিন আবুস সারহ রাযি.-কে মিশরের একটি অঞ্চলের (সাইদে মিশর) প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন।
১৩৯. বারকা: বর্তমান লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলকে বারকা বলা হতো। ইংরেজিতে অঞ্চলটির নাম Cyrenaica ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00