📄 খলিফাতুল মুসলিমিন উমর রাযি.-এর শাহাদাত
যেহেতু ইসলামের আগমনের মাধ্যমেই সমকালীন ইহুদিদের বিকৃত ধর্মের অসারতা সকলের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যায় এবং ধর্ম নিয়ে তাদের লুকোচুরি ও প্রতারণার বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়, তাই প্রথম থেকেই ইহুদিজাতি ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু কালক্রমে প্রথমে আরব উপদ্বীপজুড়ে এবং তারপর আরব সীমানার বাইরেও ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতে থাকলে ইহুদিরা অনুভব করে যে, এখন আর তাদের পক্ষে সম্মুখ সমরে মুসলমানদের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তখন কতক ইহুদি অন্তরের সুপ্ত বিদ্বেষ গোপন রেখে বাহ্যিকভাবে ইসলামে দাখিল হয়ে যায় এবং মুসলমানদের সঙ্গে মিশে গিয়ে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ইসলামের ক্ষতিসাধনের কর্মনীতি অবলম্বন করে।
অপরদিকে মুসলমানদের হাতে পারসিক সাসানি সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে জরথুস্ত্রবাদে বিশ্বাসী পারস্যের মূর্তিপূজারি সম্প্রদায়ের অনেকে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং মুসলমানদের কাতারে মিশে গিয়ে ইসলামের ক্ষতি করার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা করতে থাকে। এভাবে ইসলামের ক্ষতি করার প্রশ্নে ইহুদি চক্রান্ত ও জরথুস্ত্রবাদী পরিকল্পনা এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। যেহেতু ইসলামের প্রচার-প্রসার ও পারস্য ভূমিতে ইসলামের বিজয়াভিযানে খলিফা হজরত উমর রাযি.-এর অগ্রবর্তী ভূমিকা ছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই তিনি উভয় পক্ষের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
গভীর দূরদৃষ্টি ও বিস্তৃত চিন্তাশক্তির অধিকারী খলিফা উমর রাযি. এ সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণ অবগত ছিলেন। এ কারণেই তিনি ইসলামি সমাজে বহিরাগতদের সংমিশ্রণ নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। তার আশঙ্কা ছিল— মদিনার বাইরে থেকে আগত জরথুস্ত্রবাদী ও যুদ্ধবন্দি কাফিরদের সহাবস্থানে মদিনার মুসলমানদের দ্বীনি চিন্তাচেতনা আক্রান্ত হতে পারে এবং তারা ইসলামি কাঠামোকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালাতে পারে। এ কারণে তিনি পারসিকদের মদিনায় বসবাসে বাধা প্রদান করতেন। কিন্তু এরপরও বাহ্যিকভাবে ইসলাম প্রকাশ করে কিছু পারসিক নাগরিক মদিনায় অবস্থান করতে সক্ষম হয় এবং নিজেদের গোপন অভিপ্রায় বাস্তবায়নের সুযোগ খুঁজতে থাকে।
কুফার গভর্নর হজরত মুগিরা বিন শুবা রাযি.-এর ফিরুয নামক একটি ক্রীতদাস ছিল। আবু লু'লুআ উপনামধারী ফিরুয লোহা ও কাঠের কাজসহ বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে দক্ষ ছিল। মুগিরা রাযি. খলিফা উমর রাযি.-কে অনুরোধ করেন যে, ফিরুযকে মদিনায় বসবাসের অনুমতি দেওয়া হলে তার দ্বারা মদিনার মুসলিম সমাজ উপকৃত হবে। ফলে খলিফা তাকে মদিনায় বসবাসের অনুমতি প্রদান করেন।
ফিরুয ছিল অত্যন্ত ধূর্ত ও মন্দ প্রকৃতির লোক। সে অন্তরে ইসলামের প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করত। মদিনায় কাফির শিশুবন্দিদের দেখলে সে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁদতে শুরু করত এবং বলত, 'উমর আমার কলিজা ছিঁড়ে ফেলেছে।' ফিরুয খলিফা উমর রাযি.-এর চলাফেরা ও কর্মকাণ্ডের প্রতি নজর রেখে উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষা করছিল।
অবশেষে সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, নামাজের সময়ই হলো খলিফাতুল মুসলিমিনকে হত্যা করার সবচেয়ে সহজ ও উপযুক্ত সময়।
ইমাম বুখারি রহ. খলিফা উমর রাযি.-এর শাহাদাতের ঘটনা বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। তিনি সহিহ সনদে হজরত আমর বিন মায়মুন রাযি. হতে বর্ণনা করেন যে, আমর বিন মায়মুন বলেন-
যেদিন ভোরে তিনি (খলিফাতুল মুসলিমিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি.) আহত হলেন, আমি তার কাছেই দাঁড়ানো ছিলাম। আমার ও তার মাঝে আবদুল্লাহ বিন আব্বাস ব্যতীত অন্য কেউ ছিল না। উমর রাযি. (নামাজ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে) দু-কাতারের মধ্য দিয়ে চলার সময় বলতেন, কাতার সোজা করে নাও। যখন দেখতেন-কাতারে কোনো ত্রুটি নেই, তখন সামনে (ইমামের স্থানে) অগ্রসর হয়ে তাকবির বলতেন। তিনি সাধারণত (ফজরের) প্রথম রাকাতে সুরা ইউসুফ, সুরা নাহল বা এ জাতীয় দীর্ঘ সুরা তেলাওয়াত করতেন, যেন (অনুপস্থিত) লোকেরা জামাতে শরিক হতে পারে। সেদিন তাকবির বলার পরই (যখন তাকে আঘাত করা হলো) আমি তাকে বলতে শুনলাম, কুকুরটি আমাকে হত্যা করেছে (অথবা বলেছেন, আঘাত করেছে)। ঘাতক কাফির গোলামটি পলায়নের সময় ডানে-বামে যাকেই অতিক্রম করছিল, তাকেই তার হাতের দুধারি খঞ্জরটি দিয়ে আঘাত করছিল। এভাবে সে তেরোজনকে আহত করল, যাদের মধ্যে সাতজনই পরে শহিদ হয়। এ অবস্থা দেখে জনৈক মুসল্লি নিজের চাদর ঘাতকের শরীরে নিক্ষেপ করল। ঘাতক যখন বুঝতে পারল যে, সে ধরা পড়ে যাচ্ছে, তখন সে আত্মহত্যা করল।
উমর রাযি. আবদুর রহমান বিন আওফের হাত ধরে তাকে (ইমামতির জন্য) এগিয়ে দিলেন। যারা খুব কাছে ছিল, কেবল তারাই বিষয়টি দেখতে পেল। আর মসজিদের অন্যান্য প্রান্তে যারা ছিল, তারা কেবল এতটুকু উপলব্ধি করতে পারল যে, উমরের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে না, তাই তারা 'সুবহানাল্লাহ' বলতে লাগল। আবদুর রহমান বিন আওফ সংক্ষেপে নামাজ শেষ করলেন। যখন সকলে চলে গেল, তখন খলিফা ইবনে আব্বাসকে বললেন, 'দেখো তো, আমাকে কে আঘাত করল?' তিনি কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করার পর এসে বললেন, 'মুগিরার গোলাম।' উমর জিজ্ঞেস করলেন, 'সেই কারিগর গোলামটি?' ইবনে আব্বাস উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ।'
উমর বললেন, 'আল্লাহ তার সর্বনাশ করুন। আমি তো তাকে ভালো কাজের কথাই বলেছিলাম। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমার মৃত্যু ইসলামের দাবিদার কোনো ব্যক্তির হাতে ঘটাননি। তুমি ও তোমার পিতা (আব্বাস রাযি.) তো মদিনায় অনারবি-অমুসলিম গোলামের সংখ্যাবৃদ্ধি কামনা করতে।' (উল্লেখ্য) আব্বাসের কাছে অনেক কাফির গোলাম ছিল। ইবনে আব্বাস বললেন, 'আপনি চাইলে আমি কাজ সেরে ফেলি (তাদেরকে হত্যা করে ফেলি)।' উমর বললেন, 'ভুল বলছ। তারা তো তোমাদের ভাষায় কথা বলে, তোমাদের কেবলার দিকে ফিরে ইবাদত করে এবং তোমাদের ন্যায় হজব্রত পালন করে।'
এরপর তাকে তার ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরাও তার সঙ্গে চললাম। মানুষের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, ইতিপূর্বে এরূপ মুসিবত আর কখনো আসেনি। কেউ বলছিল, ভয়ের কিছু নেই। আবার কেউ বলছিল, তার প্রাণনাশের আশঙ্কা হচ্ছে। তার জন্য নাবিয (খেজুর ভেজানো পানি) আনা হলে তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তার পেট থেকে বেরিয়ে গেল। এরপর দুধ নিয়ে আসা হলে তিনি তা পান করলেন। তা-ও তার ক্ষতস্থান দিয়ে বেরিয়ে গেল। তখন সকলে বুঝতে পারল যে, তার মৃত্যু অত্যাসন্ন। আমরা তার কাছে উপস্থিত হলাম। লোকজন এসে তার প্রশংসা করতে লাগল।
এক যুবক এসে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন! আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আপনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য লাভ করেছেন, প্রাথমিক যুগেই ইসলামগ্রহণ করেছেন, যা আপনিও অবগত আছেন, এরপর খলিফা হয়ে ন্যায়-ইনসাফের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর আপনি শাহাদাতের (মর্যাদা) লাভ করেছেন।' উমর বললেন, 'আমি কামনা করি যে, তা আমার জন্য ক্ষতিকর বা কল্যাণকর না হয়ে বরং সমান সমান হয়ে যাক।'
যুবকটি যখন চলে যেতে উদ্যত হলো, তখন তার পরিধেয় লুঙ্গি মাটি স্পর্শ করছিল। তা দেখে উমর বললেন, 'যুবকটিকে আমার কাছে ডেকে আনো।' (যুবকটি আসার পর) তিনি বললেন, 'ভ্রাতুষ্পুত্র! তোমার কাপড় উঠিয়ে নাও; এতে তোমার কাপড়ও অধিক পরিচ্ছন্ন থাকবে আর তোমার রবের নিকটও অধিক তাকওয়ার কারণ হবে।' এরপর তিনি তার পুত্র আবদুল্লাহকে বললেন, 'আবদুল্লাহ, দেখো, আমার জিম্মায় ঋণের পরিমাণ কত।' হিসাব করে জানানো হলো—ঋণের পরিমাণ ছিয়াশি হাজার দিরহাম বা তার কাছাকাছি।
এরপর তিনি বললেন, 'যদি উমর-পরিবারের অর্থ দিয়েই এই ঋণ আদায় হয়ে যায়, তাহলে তা দিয়েই এ ঋণ পরিশোধ করে দেবে। অন্যথায় আদি বিন কাবের বংশধরদের সাহায্য গ্রহণ করবে। তাতেও না হলে কুরাইশ গোত্রের সাহায্য নেবে। এর বাইরে অন্য কারও সাহায্য নেবে না। আমার পক্ষ থেকে তাড়াতাড়ি ঋণ আদায় করে দেবে। আর তুমি উম্মুল মুমিনিন আয়েশার কাছে যাও। তাকে বলো, উমর আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন। আমিরুল মুমিনিন বলবে না। কারণ, এখন আর আমি মুমিনগণের আমির নই। তাকে বলবে, উমর ইবনুল খাত্তাব তার সঙ্গীদ্বয়ের পাশে সমাধিস্থ হওয়ার অনুমতি চাচ্ছেন।'
এরপর ইবনে উমর আয়েশা রাযি.-এর কাছে উপস্থিত হয়ে সালাম করলেন এবং অনুমতি প্রার্থনা করলেন। (অনুমতি পাওয়ার পর) ভেতরে প্রবেশ করে তিনি দেখলেন, আয়েশা কাঁদছেন। ইবনে উমর বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তার সঙ্গীদ্বয়ের পাশে সমাধিস্থ হওয়ার অনুমতি চাচ্ছেন।'
আয়েশা রাযি. বললেন, 'জায়গাটুকু আমি নিজের জন্য কামনা করতাম; কিন্তু আজ আমি এ বিষয়ে তাকে আমার ওপর অগ্রাধিকার দিচ্ছি।'
আবদুল্লাহ বিন উমর যখন ফিরে এলেন, তখন উমর রাযি.-কে বলা হলো, 'এই যে আবদুল্লাহ বিন উমর চলে এসেছেন।' তিনি বললেন, 'আমাকে উঠিয়ে বসাও।' এক ব্যক্তি তাকে ঠেস দিয়ে বসাল। তিনি বললেন, 'বলো, কী সংবাদ নিয়ে এসেছ?' ইবনে উমর বললেন, 'আমিরুল মুমিনিন! আপনি যা আকাঙ্ক্ষা করেছেন, তা-ই হয়েছে; তিনি অনুমতি দিয়েছেন।' উমর রাযি. বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ! আর কোনো বিষয় আমার কাছে এরচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আমার মৃত্যুর পর তোমরা আমাকে উঠিয়ে নেবে আর তুমি আবার তাকে (আয়েশা রাযি.-কে) সালাম করে বলবে, উমর ইবনুল খাত্তাব অনুমতি চাচ্ছেন। (তিনি আশঙ্কা করছিলেন, এমনও হতে পারে যে, আম্মাজান উমরের জীবদ্দশায় লজ্জা ও সংকোচবশত অনুমতি দিয়েছেন)। তিনি অনুমতি দিলে তোমরা আমাকে প্রবেশ করাবে। আর যদি অনুমতি না দেন, তাহলে আমাকে মুসলমানদের কবরস্থানে নিয়ে যাবে।'
এমন সময় উম্মুল মুমিনিন হাফসা রাযি. কয়েকজন মহিলাসহ উপস্থিত হলেন। তাদেরকে দেখে আমরা উঠে এলাম। হাফসা তার (পিতার) কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। কিছুক্ষণ পর পুরুষরা এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে হাফসা রাযি. ভেতরে চলে গেলেন। আমরা ভেতর থেকেও তার কান্নার ধ্বনি শুনতে পেলাম। উপস্থিত লোকেরা খলিফাকে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন! অসিয়ত করুন এবং পরবর্তী খলিফা মনোনীত করুন।'
তিনি বললেন, 'আমি খিলাফতের জন্য এই কজনের চাইতে যোগ্যতর কাউকে পাচ্ছি না; এদের প্রতি নবীজি ইন্তেকালের সময় সন্তুষ্ট ছিলেন।' এ কথা বলে তিনি আলি রাযি., উসমান রাযি., যুবায়র রাযি., তালহা রাযি., সাদ রাযি. ও আবদুর রহমান বিন আওফ রাযি.-এর নাম নিলেন। তিনি বললেন, 'আবদুল্লাহ বিন উমরও তোমাদের সঙ্গে থাকবে; তবে সে খিলাফত লাভ করতে পারবে না। (বর্ণনাকারী বলেন, আবদুল্লাহ বিন উমরের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল শুধু সান্ত্বনা হিসেবে।) যদি খিলাফতের দায়িত্ব সাদের ওপর ন্যস্ত করা হয়, তবে তিনি তো এর যোগ্যতম ব্যক্তি। আর যদি তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ খলিফা নির্ধারিত হয়, তাহলে সে যেন সাদের পরামর্শ গ্রহণ করে। আমি কিন্তু তাকে (কুফার গভর্নরের পদ থেকে) অযোগ্যতা বা কোনো ধরনের বিশ্বাসভঙ্গের কারণে বরখাস্ত করিনি।'
এরপর উমর রাযি. বললেন—আমার পরবর্তী খলিফাকে আমি অসিয়ত করছি, তিনি যেন প্রবীণ মুহাজিরদের হক সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং তাদের মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। আমি তাকে আনসারি সাহাবিগণের প্রতিও সদ্ব্যবহারের অসিয়ত করছি; যারা পূর্ব থেকেই এ নগরীতে বসবাস করছেন এবং মুহাজিরদের পূর্বে ঈমান এনেছেন। তাদের কল্যাণকর্ম যেন গ্রহণ করা হয় এবং তাদের ত্রুটি যেন মার্জনা করা হয়।
আমি তাকে আরও অসিয়ত করছি, তিনি যেন বিভিন্ন নগরীর অধিবাসীদের সঙ্গে কোমল আচরণ করেন। কারণ, তারাই ইসলামের হেফাজতকারী, অর্থের জোগানদাতা ও শত্রুর চোখের কাঁটা (আধিক্য ও প্রভাবের মাধ্যমে তারা শত্রুদেরকে ক্রোধান্বিত করে)। তাদের কাছ থেকে যেন কেবল তাদের সন্তুষ্টচিত্তে সম্পদের অতিরিক্ত অংশের জাকাত গ্রহণ করা হয়।
আমি তাকে আরও অসিয়ত করছি, তিনি যেন বেদুইনদের সঙ্গেও সদাচরণ করেন। কারণ, তারাই আরবজাতির ভিত্তি ও ইসলামের মূল শক্তি। তাদের সম্পদের অতিরিক্ত অংশ গ্রহণ করে যেন তাদের দরিদ্রদের মাঝেই ফেরত দেওয়া হয়। আমি তাকে আরও অসিয়ত করছি, জিম্মিদের সঙ্গে আল্লাহ ও তার রাসুলের কৃত অঙ্গীকার যেন পূরণ করা হয়, (তারা শত্রু-কর্তৃক আক্রান্ত হলে) যেন তাদের প্রতিরক্ষায় যুদ্ধ করা হয় এবং তাদের ওপর যেন সাধ্যাতীত জিজিয়া আরোপ করা না হয়।
উমরের ইন্তেকাল হলে আমরা তার লাশ নিয়ে পায়ে হেঁটে চললাম। আবদুল্লাহ বিন উমর আয়েশাকে সালাম করলেন এবং বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব অনুমতি চাচ্ছেন।'
আয়েশা বললেন, 'তাকে প্রবেশ করাও।' এরপর তাকে প্রবেশ করানো হলো এবং তার সঙ্গীদ্বয়ের পাশে দাফন করা হলো। দাফনকার্য সম্পন্ন হওয়ার পর উল্লিখিত ব্যক্তিবর্গ একত্রিত হলো। আবদুর রহমান বিন আওফ বললেন, 'তোমরা বিষয়টি তিনজনের ওপর ছেড়ে দাও (যেন নির্বাচন সহজ হয়ে যায়)।'
যুবায়র বললেন, 'আমি আমার অধিকার আলিকে অর্পণ করলাম।' তালহা বললেন, 'আমি আমার অধিকার উসমানের কাছে ন্যস্ত করলাম।' সাদ বললেন, 'আমি আমার অধিকার আবদুর রহমান বিন আওফকে অর্পণ করলাম।'
তখন আবদুর রহমান বিন আওফ উসমান ও আলিকে বললেন, 'আপনাদের দুজনের মধ্য হতে কেউ কি এ দায়িত্ব হতে অব্যাহতি পেতে ইচ্ছা করেন? তাহলে আমরা অপরজনকে নির্বাচিত করব। তার ওপর আল্লাহ ও ইসলামের হক আদায় করার দায়িত্ব বর্তাবে। অধিকতর যোগ্য নির্বাচনে উভয়ে চিন্তা করুন।' তখন উভয়ে (উসমান ও আলি) চুপ থাকলেন।
এরপর আবদুর রহমান বললেন, 'আপনারা কি নির্বাচনের দায়িত্বটি আমাকে ন্যস্ত করবেন? আল্লাহর শপথ! যোগ্যতম ব্যক্তিকে নির্ণয়ে আমি সামান্য ত্রুটি করব না।'
উভয়ে সম্মতি জানালে তিনি তাদের একজনের হাত ধরে বললেন, 'আল্লাহর রাসুলের সঙ্গে আপনার যে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এবং ইসলামগ্রহণে আপনার যে অগ্রগামিতা রয়েছে, তা আপনি জানেন। আল্লাহর শপথ! আমি যদি আপনাকে খলিফা মনোনীত করি, তাহলে আপনার কর্তব্য হলো, আপনি অবশ্যই ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন; আর যদি উসমানকে মনোনীত করি, তাহলে আপনি তার আনুগত্য করবেন।' এরপর তিনি অপরজনের সঙ্গেও একান্তে অনুরূপ কথা বললেন। উভয়ের কাছ থেকে অঙ্গীকার নেওয়ার পর তিনি বললেন, 'হে উসমান, আপনার হাত বাড়িয়ে দিন।' এরপর প্রথমে তিনি ও তারপর আলি রাযি. উসমান রাযি.-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করলেন। এরপর সকলে তার হাতে বায়আত গ্রহণ করল। (১৩২)
অন্যান্য বিভিন্ন বর্ণনায় আছে, খলিফা উমর রাযি. পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য পরামর্শ করতে তিন দিনের বেশি সময় না নেওয়ার কথা বলে দিয়েছিলেন। আবদুর রহমান বিন আওফ রাযি. সেই তিন দিন ঘুরে ঘুরে সাহাবায়ে কেরাম ও মদিনার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মতামত নিয়েছিলেন। তিনি যাদের কাছেই গিয়েছেন, সকলেই উসমানের নাম প্রস্তাব করেছে।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযি. ২৩ হিজরি সনের ২৬ জিলহজ (৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩ নভেম্বর) তেষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। হজরত সুহায়ব রাযি. তার জানাজা পড়ান। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবীজির পাশেই তাকে দাফন করা হয়।
টিকাঃ
১৩২. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৭০০।