📄 আপনার পালনকর্তার বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন!
যুদ্ধ চলাকালে বিশিষ্ট যোদ্ধা সাহাবি কা'কা' বিন আমর রাযি. পারসিক সেনাপতি ফিরযানের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পান যে, ফিরযান পালাতে চেষ্টা করছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ও নুআইম বিন মুকাররিন রাযি. ফিরযানের পিছু নেন এবং হামদান উপত্যকার এক সংকীর্ণ গিরিপথে তার নাগাল পেয়ে যান। গিরিপথটি ধরে অপরদিক থেকে তখন পারস্য-সম্রাট ইয়াযদিগারদের জন্য মধুবোঝাই খচ্চর ও গাধার এক বিরাট কাফেলা আসছিল। খচ্চর ও গাধার কাফেলার কারণে ফিরযানের পালানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। কা'কা' রাযি. তাকে ধরে ফেলেন এবং হত্যা করেন। এখান থেকেই এই ঐতিহাসিক উক্তি প্রসিদ্ধি লাভ করে— 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার মধুবাহী সৈন্যদলও আছে!' মুসলিম বীরদ্বয় মধুবোঝাই পশুগুলোকে হাঁকিয়ে মুসলিম সৈন্যদলের কাছে নিয়ে আসেন। হামদান উপত্যকার নাম হয় 'মধু-উপত্যকা'!
সমরবিশারদ জনৈক ইতিহাসবিদ লিখেছেন,
নিহাবন্দ যুদ্ধে তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদের উদ্ভাবিত এই পরিকল্পনাটি পরবর্তী সময়ে সামরিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে গৃহীত হয়। এরপর অনেক সেনাপতিই পদ্ধতিটি কাজে লাগিয়েছে। এটিই ছিল পুরো এশিয়া মহাদেশজুড়ে প্রভাব বিস্তারকারী মঙ্গোল-তাতার সেনাপতি চেঙ্গিস খানের সবচেয়ে কার্যকর ও বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। তিনি প্রথমে শত্রুর ওপর প্রবল আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে সচেষ্ট হতেন। এতে লক্ষ্য বাস্তবায়িত না হলে তিনি পরাজয়ের ভান করে কৌশলে পিছু হটতেন এবং প্রতিপক্ষকে পূর্বপ্রস্তুতকৃত গোপন ফাঁদের দিকে টেনে আনতেন। প্রতিপক্ষ ধীরে ধীরে এমন স্থানে চলে আসত, যেখানে তিনি হঠাৎ আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে পর্যুদস্ত করে ফেলতেন এবং কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করতেন। আইনে জালুতের প্রান্তরে তাতারদের ত্রাস সাইফুদ্দিন কুতুজ রহ.-ও এই একই পদ্ধতি কাজে লাগিয়েছিলেন। তাতারদের পদ্ধতি তাতারদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে তিনি তাদের প্রথমবারের মতো পরাজয় উপহার দিয়েছিলেন। তাতাররা কল্পনাও করতে পারেনি যে, অন্য কেউ তাদের বিরুদ্ধে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারে। সামরিক শাস্ত্রে এ পদ্ধতিটি অ্যামবুশ (Ambush) নামে পরিচিত।
ইসলামি ইতিহাসে নিহাবন্দের যুদ্ধ একটি মীমাংসাকর যুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আছে। এ যুদ্ধের মাধ্যমেই পারস্য সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। বরং এর পরপরই খলিফা উমর
📄 শেষ পারসিক সম্রাট ইয়াযদিগারদের পতন : আল্লাহর জমিনে খোদাদ্রোহীদের চূড়ান্ত লাঞ্ছনাবরণ
২২ হিজরি সনে আহনাফ বিন কায়স রাযি. খলিফাতুল মুসলিমিন উমর রাযি.-এর কাছে পারস্য-সম্রাট ইয়াযদিগার্দকে শায়েস্তা করার জন্য খোরাসান অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার অনুমতি প্রার্থনা করেন। খোরাসান ছিল তৎকালীন পারস্যের পূর্বাঞ্চলের একটি বড় অঞ্চল। খোরাসানে অবস্থান করে ইয়াযদিগার্দ পারসিক নাগরিক ও সৈন্যদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্ররোচিত করে যাচ্ছিলেন।
মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ জানতে পেরে ইয়াযদিগার্দ ছুগদ (Sughd)-এর শাসক, চীনের শাসক ও তুর্কিস্তানের শাসকের কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠান। কিন্তু তাদের কেউই রাজ্যহারা কিসরার বার্তাকে গুরুত্ব দেয়নি।
আহনাফ রাযি. খোরাসানে প্রবেশ করে একের পর এক নগরী জয় করতে থাকেন আর ইয়াযদিগার্দ এক নগরী থেকে আরেক নগরীতে পালাতে থাকেন। একপর্যায়ে নিরুপায় ইয়াযদিগার্দ খোরাসান ত্যাগ করে আমু দরিয়া পাড়ি দিয়ে মাওয়ারাউন নাহার (১৩০) অঞ্চলে আশ্রয় নেন।
আহনাফ পুরো খোরাসানের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রতিটি নগরীতে একজন করে গভর্নর নিযুক্ত করেন এবং এ বিষয়ে বার্তার মাধ্যমে খলিফা উমর রাযি.-কে অবহিত করেন। খলিফা আহনাফকে নদী পাড়ি দিয়ে মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলে প্রবেশ করতে নিষেধ করে লেখেন, 'তোমার কর্তৃত্বে খোরাসানের যেসব অঞ্চল রয়েছে, সেগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ কর।'
ইতিপূর্বে ইয়াযদিগার্দ মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলের বিভিন্ন শাসকের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করলেও কেউ তাকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু এবার যখন তিনি তাদের দেশে আশ্রয় নেন, তখন রাজন্যবর্গের নীতি অনুসারে তাকে সাহায্য করা তাদের দায়িত্বে এসে যায়। এবার তুর্কি শাসক খাকানে আযম ইয়াযদিগার্দকে সহায়তা করতে সম্মত হন। ইয়াযদিগার্দ তুর্কি শাসকসহ বিশাল এক বাহিনী নিয়ে খোরাসান ফিরে আসেন এবং কিছু নগরী পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। এরপর তিনি আহনাফ বিন কায়সের অবস্থানস্থল অভিমুখে রওনা হন। আহনাফের সঙ্গে তখন ছিল সর্বসাকুল্যে বিশ হাজার সৈন্য। আহনাফ রাযি. তাদের উদ্দেশে বলেন, নিঃসন্দেহে তোমরা সংখ্যায় অল্প আর তোমাদের শত্রুরা অধিক। কিন্তু এর কারণে তোমরা ভীতসন্ত্রস্ত ও হীনবল হয়ো না। এমন কত ছোট দলই-না রয়েছে, যারা আল্লাহর হুকুমে বড় দলের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছে। আর আল্লাহ তো তাদের সঙ্গে আছেন, যারা সবর ও ধৈর্যের পরিচয় দেয়।
তুর্কিদের এক বিস্ময়কর যুদ্ধনীতি ছিল। তারা কোথাও যুদ্ধ করতে গেলে ততক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের গোপন ঘাঁটি থেকে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে বের হতো না, যতক্ষণ না তাদের মধ্য হতে প্রবীণ তিনজন ব্যক্তি সামনে অগ্রসর হতো। তাদের নীতি ছিল—প্রথমজন বের হয়ে সঙ্গে থাকা তবলায় আঘাত করবে। তার আওয়াজ শুনে দ্বিতীয়জন বের হয়ে আসবে। দ্বিতীয়জনের তবলার আওয়াজ শুনলে তৃতীয়জন বের হয়ে আসবে। আর তৃতীয়জনের তবলার আওয়াজ শুনলে পুরো বাহিনী যুদ্ধ করতে বের হয়ে আসবে।
শত্রুপক্ষ কোথায় রাত্রিযাপন করছে, তা অবলোকন করার জন্য মুসলিম সেনাপতি আহনাফ বিন কায়স রাযি. রাতের আঁধারে কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে বের হন। ভোরের সামান্য পূর্বে তুর্কি শিবির থেকে তবলাধারী তিন ব্যক্তি বের হয়ে এলে আহনাফ একের পর এক তিনজনকেই হত্যা করেন। প্রত্যুষে তুর্কিরা বের হয়ে যখন তিনজনকেই নিহত অবস্থায় পায়, তখন তাদের শাসক একে অশুভ ও কুলক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে মন্তব্য করেন, এই জাতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের কোনো কল্যাণ নেই। সুতরাং সকলে চলো, ফিরে যাই।
এভাবে কিসরার এবারের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। যাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি বিজয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন, তারা তাকে ছেড়ে চলে যায়। তিনি হয়রান হয়ে ভাবতে থাকেন, কোথায় যাবেন? কার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবেন?
তার সঙ্গী কয়েকজন জ্ঞানী ব্যক্তি তাকে পরামর্শ দিয়ে বলে, আমাদের মত হলো, আমরা তাদের সঙ্গে (অর্থের বিনিময়ে) সন্ধিচুক্তি করব। কারণ, তারা দ্বীনের দাবি মেনে চলে এবং নিরাপত্তা দান করে। এর ফলে আমরা আমাদের দেশেই থাকতে পারব আর তারা হবে আমাদের প্রতিবেশী। অধিকন্তু তারা আমাদের জন্য অন্যদের তুলনায় কল্যাণকর প্রমাণিত হবে। কিন্তু কিসরা তাদের এই সুপরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেন।
এরপর ইয়াযদিগার্দ চীন-সম্রাটের কাছে সহায়তা প্রার্থনা করে দূত প্রেরণ করেন। চীন-সম্রাট ইয়াযদিগারদের দূতের কাছে মুসলিম অভিযাত্রীদের বিবরণ জানতে চান। দূত তাকে মুসলমানদের ইবাদতরীতি, যুদ্ধরীতি ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করে। এরপর চীন-সম্রাট ইয়াযদিগারদের কাছে ফিরতি বার্তায় লেখেন, আমি চাইলেই আপনার সাহায্যার্থে এত বিশাল এক বাহিনী প্রেরণ করতে পারি, যার শুরু অংশ থাকবে মার্ভে (Merv) আর শেষ অংশ থাকবে চীনে। আমার ওপর আপনার অধিকার কতটুকু, সে সম্পর্কে আমার অজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় নয়। কিন্তু আপনার দূত যাদের পরিচয়-বিবরণ আমাকে শোনাল, তারা তো এমন (দুর্জেয় ও অদম্য) যে, চেষ্টা করলে পাহাড়পর্বতকেও ধ্বংস করে ফেলতে পারে। সুতরাং (আপনার প্রতি আমার সুপরামর্শ হলো) আপনি তাদের সঙ্গে সমঝোতা করুন এবং সমঝোতার মাধ্যমে যা লাভ করেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকুন।
চীন-সম্রাটের কাছ থেকে নিরাশ হয়ে ইয়াযদিগার্দ এবার তার গুটিকয়েক সঙ্গীকে নিয়ে মার্ভে আশ্রয় নেন। মার্ভের কয়েকজন অধিবাসীর কাছে তিনি অর্থসাহায্য চাইলে তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে নিজেদের জন্য অনিষ্টকর বিবেচনা করে। তারা তুর্কিদের কাছে লোক পাঠিয়ে তাদেরকে তার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলে। তুর্কিরা এসে ইয়াযদিগারদের সঙ্গীদেরকে হত্যা করে। ইয়াযদিগার্দ কোনোমতে পালিয়ে নদীর তীরে জনৈক জাঁতাখোদাইকারীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি এক রাত অবস্থান করেন। রাতে ইয়াযদিগার্দ ঘুমিয়ে পড়লে আশ্রয়দাতা তাকে হত্যা করে এবং তার পোশাক ও মুকুট নিয়ে নেয়। এদিকে তুর্কিরা তাকে খুঁজতে খুঁজতে জাঁতাখোদাইকারীর বাড়িতে পৌঁছে তাকে মৃত অবস্থায় পায়। তুর্কিরা এবার লোকটিকে তার পরিবার-পরিজনসহ হত্যা করে এবং কিসরার সব সম্পদ নিয়ে নেয়। এরপর তারা কিসরার মৃতদেহ একটি কফিনে ভরে ইসতাখর (Istakhr) নিয়ে যায়। ইয়াযদিগার্দই ছিলেন পৃথিবীর বুকে শেষ পারস্য-শাসক 'কিসরা'। প্রিয় নবীজি ইরশাদ করেছেন-
إِذَا هَلَكَ قَيْصَرُ فَلَا قَيْصَرَ بَعْدَه، وَإِذَا هَلَكَ كِسْرَى فَلَا كِسْرَى بَعْدَه ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، لَتُنْفَقَنَّ كُنُوْرُهُمَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ»
কায়সারের (রোমান সম্রাট) পতনের পর আর কোনো কায়সার আসবে না আর কিসরার (পারস্য সম্রাট) পতনের পর আর কোনো কিসরা আসবে না। ওই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন! অবশ্যই তাদের সম্পদরাজি আল্লাহর পথে ব্যয় হবে। (১৩১)
টিকাঃ
১৩০. মাওয়ারাউন নাহার : মধ্য এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলের নাম মাওয়ারাউন নাহার বা ট্রান্সঅক্সিয়ানা (Transoxiana)। এর বিস্তৃতি পশ্চিমে মধ্য এশিয়ার বৃহত্তম ও বিখ্যাত নদী আমু দরিয়া হতে পূর্বে মধ্য এশিয়ার আরেক বিখ্যাত নদী সির দরিয়া পর্যন্ত। আধুনিক রাষ্ট্রসীমার উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ ও কিরগিজস্তানের দক্ষিণ অংশজুড়ে ছিল অঞ্চলটির বিস্তৃতি। মুসলিম অভিযাত্রীগণ খোরাসান থেকে আমু দরিয়া পাড়ি দিয়ে এ অঞ্চল জয় করেন এবং অঞ্চলটিকে মাওয়ারাউন নাহার «بلاد ما وراء النهر» বা 'নদীর ওপারের অঞ্চল' নামে অভিহিত করেন।
প্রথম হিজরি শতকের শেষ দিকে ষষ্ঠ উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের আমলে বিখ্যাত মুসলিম বীর সেনাপতি কুতায়বা বিন মুসলিম বাহিলি রহ.-এর হাতে অঞ্চলটি বিজিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। বুখারা, সমরকন্দ, বায়কান্দ, ফারাব, ফারগানা, শাশ, তিরমিজ, কাসান, খোয়ারিজম, কাশগর, দাবুসিয়াসহ বিভিন্ন সুবিখ্যাত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র এ অঞ্চলের অন্তর্গত ছিল।
১৩১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৬২৯।
📄 খলিফা উমর রাযি.-এর স্মরণীয় দুটি ঘটনা
হজরত উমর রাযি.-এর খাদেম আসলাম বলেন, একরাতে আমি উমরের সঙ্গে বের হলাম এবং মদিনা থেকে দূরে চলে এলাম। আমরা দূরবর্তী বাড়িঘরের অধিবাসীদের খোঁজখবর নিচ্ছিলাম। হঠাৎ আমরা দূরে আগুন দেখতে পেলাম। উমর বললেন, 'আসলাম! মনে হয়, সেখানে কোনো কাফেলা আছে, রাত ও শীতের কারণে তারা সেখানে আটকে গেছে। চলো, আমরা সেখানে যাই।' আমরা দ্রুতপদে সেখানে পৌঁছে দেখতে পেলাম, একজন নারী কয়েকজন শিশুসহ অবস্থান করছে। আগুনের ওপর একটি ডেকচিও বসানো আছে। উমর তাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনাদের কী অবস্থা?' মহিলাটি উত্তর দিলো, 'আমরা রাত ও শীতের কারণে আটকে গেছি।'
'বাচ্চাদের কী হয়েছে? ওরা কাঁদছে কেন?' 'ক্ষুধায়।' মহিলার সংক্ষিপ্ত উত্তর।
'ডেকচিতে কী রান্না হচ্ছে?' খলিফা জিজ্ঞেস করলেন।
'বাচ্চাদের শান্ত করতে শুধু পানি বসিয়ে রেখেছি, যেন ওরা কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে।' দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মহিলাটি উত্তর দিলো, 'কিয়ামতের দিন উমর ও আমাদের মাঝে মহান আল্লাহ ইনসাফ করবেন।'
'আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন। আরে! উমর কীকরে আপনাদের দুরবস্থার কথা জানবে?'
'তিনি তো আমাদের দায়িত্ব পালন করছেন,' ক্ষোভভরা কণ্ঠে মহিলাটি উত্তর দিলো, 'তাহলে আমাদের খোঁজখবর রাখবেন না কেন?'
এরপর খলিফা আমার কাছে এসে বললেন, 'আমাকে নিয়ে চলো।' আমরা দ্রুতপদে পথ চলে (বায়তুল মালের) আটার গুদামঘরের কাছে এলাম। তিনি সেখান থেকে এক বস্তা আটা ও এক পাত্র চর্বি-তেল বের করে আমাকে বললেন, 'এগুলো আমার পিঠে তুলে দাও।'
'আমিই আপনার পক্ষ থেকে বহন করছি।' আমি বললাম।
'আরে হতচ্ছাড়া! তুমি কি কিয়ামতের দিন আমার বোঝা বহন করবে?!' খলিফা অসন্তোষকণ্ঠে বললেন।
এরপর আমি বস্তা ও পাত্রটি তার পিঠে উঠিয়ে দিলাম। আমরা দ্রুত পথ চলে পূর্বের স্থানে পৌঁছলে তিনি মহিলার কাছে বোঝাগুলো নামিয়ে রাখলেন। এরপর বস্তা থেকে কিছু আটা বের করে মহিলাটিকে বললেন, 'আটাগুলো ডেকচিতে ঢালুন; আমি নাড়ছি।' খলিফা ছিলেন ঘন ও দীর্ঘ শ্মশ্রুবিশিষ্ট। তিনি যখন ডেকচির নিচে আগুনে ফুঁ দিচ্ছিলেন, আমি দেখলাম, তার দাড়ির ফাঁক দিয়ে ধোঁয়া বের হচ্ছে। রান্না শেষ করে তিনি আগুনের ওপর থেকে ডেকচি নামালেন এবং মহিলাকে বললেন, 'কিছু নিয়ে আসুন।' মহিলাটি একটি বাসন নিয়ে এলে তিনি তাতে সবটুকু খাবার ঢেলে দিলেন। এরপর তিনি মহিলাকে বললেন, 'আমি খাবার (ঠান্ডা করার জন্য) ছড়িয়ে দিচ্ছি; আপনি ওদেরকে খাইয়ে দিন।' বাচ্চারা যখন খেয়ে পরিতৃপ্ত হলো, তখন তিনি বাকি খাবারটুকু মহিলার কাছে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠলাম। মহিলা বলল, 'আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন। আপনি তো সদাচরণে আমিরুল মুমিনিনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ!' খলিফা বললেন, 'তার সম্পর্কে কল্যাণ কামনাই করুন। আর আপনি যখন আমিরুল মুমিনিনের কাছে যাবেন, তখন ইনশাআল্লাহ আমাকে সেখানে পাবেন।'
এরপর খলিফা সেখান থেকে উঠে একটু দূরে গিয়ে বসে রইলেন। আমি তাকে বললাম, 'আপনাকে কেমন যেন মনে হচ্ছে!' তিনি আমার কথার কোনো উত্তর দিলেন না। দূরে তাকিয়ে দেখলাম—মহিলার ছোট ছোট সন্তানগুলো আনন্দে পরস্পর দুষ্টুমি করছে। কিছুক্ষণ পর তারা তৃপ্তির সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ল।
তখন খলিফা উঠে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর হামদ পাঠ করলেন। এরপর আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, 'আসলাম! প্রচণ্ড ক্ষুধার কারণেই বাচ্চাগুলো কাঁদছিল এবং নির্ঘুম ছিল। তাই তাদেরকে হাস্যমুখর ও ঘুমন্ত না দেখে আমি এখান থেকে যেতে চাচ্ছিলাম না।'
[দুই]
আরেক রাতে খলিফা উমর বেরিয়েছেন। হঠাৎ শুনতে পেলেন, একটি ঘর থেকে এক নারীকণ্ঠের রোদনধ্বনি ভেসে আসছে আর ঘরের দরজায় এক ব্যক্তি বসে আছে। উমর রাযি. লোকটিকে সালাম দিয়ে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি জানাল, সে একজন বেদুইন; আমিরুল মুমিনিনের অনুগ্রহ প্রত্যাশায় মদিনায় এসেছে। উমর জিজ্ঞেস করলেন, 'ঘরের ভেতর থেকে কীসের আওয়াজ ভেসে আসছে?'
লোকটি তখনও উমর রাযি.-কে চিনতে পারেনি। সে উত্তর দিলো, 'আল্লাহ আপনার প্রতি অনুগ্রহ করুন। আপনি দয়া করে নিজের কাজে যান, যা জানা আপনার প্রয়োজন নেই, সে বিষয়ে প্রশ্ন করবেন না।' উমর রাযি. বারবার পীড়াপীড়ি করায় সে উত্তর দিলো, 'একজন নারী আসন্ন প্রসববেদনায় কাঁদছে; কিন্তু তার কাছে (সহায়তা করার মতো) কেউ নেই।' উমর রাযি. তৎক্ষণাৎ দ্রুত বাড়িতে ফিরে এলেন এবং তার স্ত্রী (আলি রাযি.-এর কন্যা) উম্মে কুলসুমকে বললেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমার কাছে সাওয়াব অর্জনের এক সুযোগ এনে দিয়েছেন। তুমি কি তা অর্জনে আগ্রহী?' স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, 'তা কী?'
উমর রাযি. তাকে বিস্তারিত অবহিত করলেন এবং সদ্যপ্রসূত শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় কাপড়চোপড় এবং প্রসূতি মায়ের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে বললেন। এ ছাড়াও তিনি সঙ্গে একটি ডেকচি এবং কিছু আটা ও ঘি নিতে নির্দেশ দিলেন। উমর রাযি. ডেকচিটি নিলেন আর তার স্ত্রী তার পেছন পেছন চললেন। নির্দিষ্ট বাড়ির কাছে পৌঁছে উমর রাযি. তার স্ত্রীকে বললেন, 'তুমি ভেতরে মহিলার কাছে যাও।' খলিফা নিজে বসলেন বাইরে অপেক্ষমান লোকটির কাছে। এরপর তিনি আগুন জ্বালিয়ে সাথে আনা খাবার রান্না করলেন। লোকটি পাশে বসে সব দেখছিল। তার জানা নেই যে, পাশে বসা ব্যক্তিটিই ...।
প্রসূতি নারীটি সন্তান প্রসব করার পর ভেতর থেকে উমর রাযি.-এর স্ত্রী বললেন, 'আমিরুল মুমিনিন! আপনার সঙ্গীকে পুত্রসন্তানের পিতৃত্বের সুসংবাদ দিন।' বেদুইন ব্যক্তিটি আমিরুল মুমিনিনের পরিচয় পেয়ে হতবিহ্বল হয়ে পড়ল এবং ভয়ে ও শ্রদ্ধায় উঠে খলিফার কাছ থেকে দূরে সরতে লাগল। উমর রাযি. তাকে বললেন, 'যেভাবে ছিলে, নির্দ্বিধায় সেভাবেই বসে থাক।' এরপর খলিফা ডেকচিটি নিয়ে অসুস্থ মহিলাটিকে খাওয়ানোর জন্য তার স্ত্রীর কাছে দিলেন। সবশেষে উম্মে কুলসুম যখন বেরিয়ে এলেন, তখন খলিফা উমর রাযি. বেদুইন লোকটিকে বললেন, 'আগামীকাল আমার কাছে আসবে; আমি (বায়তুল মাল থেকে) তোমার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রদান করতে বলে দেবো।'
📄 আবু মুসা আশআরি রাযি.-এর উদ্দেশে উমর রাযি.-এর একটি পত্র
খলিফাতুল মুসলিমিন উমর রাযি. কুফা, বসরা, শাম, মিশরসহ ইসলামি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য কাজি নিযুক্ত করেছিলেন। তাদের কেউ কেউ কেবল বিচারকার্যই আঞ্জাম দিতেন, যেমন কুফার কাজি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাযি.; আবার কেউ কেউ গভর্নর ও বিচারক—উভয় দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করতেন, যেমন বসরার গভর্নর আবু মুসা আশআরি রাযি.। খলিফা উমর রাযি. বসরার গভর্নর ও কাজি আবু মুসা আশআরি রাযি.-এর কাছে একটি উপদেশসমৃদ্ধ বার্তা পাঠিয়েছিলেন, যা পাঠ করলে আমাদের সামনে খলিফা উমর রাযি.-এর বিচারব্যবস্থা ও গৃহীত নীতি সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা অর্জিত হবে। নিম্নে পত্রটির ভাষ্য উল্লেখ করা হলো—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আল্লাহর বান্দা উমর (আমিরুল মুমিনিন)-এর পক্ষ থেকে আবদুল্লাহ বিন কায়সের প্রতি। আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। পরকথা, বিচারকার্যের ভিত্তি দুটি – অকাট্য ফরজ বিধান ও অনুসরণীয় সুন্নাত। সুতরাং যখন আপনার কাছে কোনো মোকদ্দমা দায়ের করা হয়, প্রথমে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করুন। কারণ, যে হক কথা বাস্তবায়ন করা হয় না, তার দ্বারা কোনো লাভ নেই।
আচরণ-উচ্চারণ, দৃষ্টিদান ও স্থানদান—সকল ক্ষেত্রে সকলের প্রতি সমান সহমর্মিতা প্রদর্শন করবেন, যেন কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি আপনার প্রতি অন্যায় আচরণের সাহস না করে এবং কোনো দুর্বল ব্যক্তি আপনার ন্যায়-আচরণ হতে নিরাশ হয়ে না পড়ে। সাক্ষ্য’প্রমাণ উপস্থাপন করা বাদীর কর্তব্য, আর শপথের দায়িত্ব বিবাদীর।
মুসলমানদের মাঝে (বিবাদগত) কোনো বিষয়ে মীমাংসা ও সমঝোতা করা বৈধ; তবে এমন সমঝোতা নয়, যা হারামকে বৈধতা দান করে কিংবা হালালকে অবৈধ করে দেয়।
গতকাল কোনো ফয়সালা করার পর আজ যদি আপনি পুনরায় নিজের সিদ্ধান্ত বিবেচনা করেন, এরপর আপনার সুবোধের কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত উপলব্ধি করতে পারেন, তাহলে পূর্বের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে সত্যকে সাব্যস্ত করতে দ্বিধা করবেন না। কারণ, হক ও সত্য হলো চিরন্তন আর অন্যায় ও গোমরাহির ওপর অটল থাকার চেয়ে ন্যায় ও সত্যকে পুনর্বিবেচনা করাই শ্রেয়।
যে বিষয় কুরআন-সুন্নাহর মাঝে (সুস্পষ্ট উল্লেখ) নেই এবং তার বিধান বিষয়ে আপনার অন্তরে দ্বিধা আছে, তা নিয়ে প্রচুর চিন্তাভাবনা করে বোঝার চেষ্টা করবেন। এরপর উক্ত বিষয়টির সমজাতীয় বিষয় খুঁজে বের করে উদ্দিষ্ট মাসআলার সমাধান অনুমান করবেন এবং যে সমাধানটি আল্লাহর অধিক নিকটবর্তী ও হকের অধিক সদৃশ বলে মনে হয় তাই গ্রহণ করবেন।
যদি কোনো বিচারপ্রার্থী অদৃশ্য কোনো হক দাবি করে, তাহলে তাকে প্রমাণ প্রদানের সময় নির্দিষ্ট করে দেবেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সে সাক্ষ্যপ্রমাণ পেশ করতে পারলে তার পক্ষে ফয়সালা করবেন, অন্যথায় মোকাদ্দমা বাতিল হয়ে যাবে। এর মধ্যেই সন্দেহ হতে নিষ্কৃতি রয়েছে।
ইতিপূর্বে যে ব্যক্তি হদের শিকার হয়েছে বা মিথ্যা সাক্ষ্যপ্রদানের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে অথবা মিত্রতা বা বংশপরিচয়ের দাবির ক্ষেত্রে অভিযুক্ত হয়েছে, তারা ব্যতীত সকল মুসলমানগণ পরস্পর সাক্ষ্যদানে ন্যায়পরায়ণ। কারণ, আল্লাহ তাআলা আমাদের গোপন দোষত্রুটি উপেক্ষা করেন এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ ও শপথের মাধ্যমে সন্দেহ দূরীভূত করেন।
অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতা, বিরক্তি ও ক্রোধ, কোনো পক্ষের প্রতি বিরাগভাব, তর্কবিতর্কের সময় বিরক্তি ও অবজ্ঞাভাব ইত্যাদি পরিহার করবেন। কেননা, হকের স্থানে হকের আচরণের কারণে আল্লাহ তাআলা মহা আজর প্রদান করেন। আর যার নিয়ত বিশুদ্ধ হয় এবং প্রয়োজনে সে নিজের বিরুদ্ধে যায়, মানুষের সঙ্গে তার লেনদেনের ক্ষেত্রে আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। বিপরীতে যে মানুষের সামনে প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কৃত্রিম ভাব করে, অথচ আল্লাহ জানেন যে, এটি তার প্রকৃত আচরণ নয়, আল্লাহ তাকে অপদস্থ করেন। আর আল্লাহর কাছে যে অপরিসীম রিজিক ও দয়ার ভান্ডারের প্রতিদান রয়েছে, তা সম্পর্কে আপনার কী ধারণা! ওয়াসসালাম।