📄 কুফার গভর্নর-পদ হতে সাদ রাযি.-কে অব্যাহতিদান
কিন্তু খলিফা উমর রাযি. আপন নীতি অনুসারে হজরত সাদ রাযি.-কে কুফার গভর্নর-পদ হতে অব্যাহতিদান এবং তাকে মদিনায় নিজের কাছে উপদেষ্টা হিসেবে রাখাকেই শ্রেয় মনে করেন। খলিফা তার পরিবর্তে আবদুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ বিন ইতবান রাযি.-কে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেন।
কিছুদিন পর গভর্নর ইবনে ইতবান রাযি. খলিফার কাছে বার্তা পাঠিয়ে নিহাবন্দে অভিযান পরিচালনার অনুমতি প্রার্থনা করেন। নিহাবন্দে পারস্য- কিসরার তত্ত্বাবধানে বিরাট সৈন্যসমাবেশ ঘটেছিল। ইবনে ইতবান বার্তায় লেখেন, সেখানে দেড় লক্ষ পারসিক যোদ্ধা সমবেত হয়েছে। আমাদের পূর্বে তারাই যদি অভিযানে অগ্রসর হয়, তাহলে তাদের সাহস ও মনোবল বেড়ে যাবে। বিপরীতে আমরা যদি দ্রুত অগ্রসর হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে পারি, তাহলে আমরাই সাহস ও মনোবলে এগিয়ে থাকব।
📄 নিহাবন্দের যুদ্ধ
সর্বদিক বিবেচনা করে খলিফা উমর রাযি. নিহাবন্দে অভিযানের অনুমতি প্রদান করেন। তবে অভিযানের জন্য তিনি নতুন একজন সেনাপতি নির্বাচনের মনস্থ করেন এবং এ বিষয়ে বিশিষ্ট সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। পরামর্শে নিহাবন্দ অভিযানে নেতৃত্বদানের জন্য বিশিষ্ট সাহাবি নুমান বিন মুকাররিন মুযানি রাযি.-এর নাম গৃহীত হয়। তাকে নির্বাচনের সময় খলিফা মন্তব্য করেন, আল্লাহর শপথ! আমি এ বাহিনীর নেতৃত্ব এমন এক ব্যক্তিকে প্রদান করব, আগামীর শত্রুমোকাবিলায় যিনি প্রথম বর্শাধারণকারী হবেন। তিনি হলেন যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্যে পৌঁছতে অটল- অবিচল ও ধীরস্থির নুমান বিন মুকাররিন।
দায়িত্ব লাভের পর সেনাপতি নুমান রাযি. পারসিক বাহিনীর বর্তমান অবস্থান সম্বন্ধে খোঁজখবর নিতে শুরু করেন। তিনি জানতে পারেন— প্রতিরক্ষার জন্য পারসিকরা নতুন এক কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। নিহাবন্দ নগরী তো পূর্ব থেকেই পরিখা ও সুদৃঢ় নগরপ্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। এর পাশাপাশি মুসলিম বাহিনীর অভিযানের সংবাদ পেয়ে পারসিকরা নিহাবন্দ নগরীর চারপাশে (মাইনের ন্যায়) প্রচুর পরিমাণ লোহার কাঁটা (পেরেক) ছড়িয়ে রেখেছে। ছড়ানো পেরেকের মাঝ দিয়ে চলাচলের জন্য কিছু পথ ছিল, যা কেবল তাদেরই জানা ছিল। ফলে মুসলিম বাহিনীর জন্য নগরীতে প্রবেশ করা শুধু কঠিনই নয়; অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
এমতাবস্থায় সেনাপতি নুমান রাযি. বাহিনীর প্রবীণ ও অভিজ্ঞ যোদ্ধাদের সঙ্গে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ করেন। পরামর্শে জনৈক সদস্য (১২৯) পারসিক বাহিনীকে কৌশলে পরাভূত করার জন্য নিম্নোক্ত প্রস্তাবসমূহ পেশ করেন—
• মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশ পারসিক বাহিনীকে উত্তেজিত করতে এবং তাদেরকে যুদ্ধে প্ররোচিত করতে দ্রুত আঘাত করেই পালানোর কৌশল (Hit-and-Run) প্রয়োগ করবে।
• যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া সেই অংশটি পারসিক বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে পরাজয়ের ভান করে পিছু হটবে।
• পারসিক বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার জন্য মুসলিম বাহিনীর মূল অংশও পিছু হটতে শুরু করবে এবং বিভিন্ন স্থানে ওত পেতে থাকবে।
• ক্ষুদ্র অংশটি পিছু হটতে হটতে এমন স্থানে পৌঁছে যাবে, যেখানে পারসিক বাহিনীকে টেনে নিতে পারলে মুসলিম বাহিনী তাদের ওপর একযোগে হামলা চালাতে পারবে।
বাস্তবেও এ পরিকল্পনা সফল হয়। পারসিক বাহিনী যখন দেখতে পায় যে, তাদের প্রতি-আক্রমণে প্রতিপক্ষের আক্রমণরত অংশটি পিছু হটছে, এরপর পিছু হটছে মূল মুসলিম বাহিনীও, তখন তারা চিৎকার করে বলতে থাকে, এই তো মুসলিম বাহিনী পরাজিত হয়ে পালাচ্ছে। তারা দ্রুত মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করে এবং বিছিয়ে রাখা পেরেকগুলো সরিয়ে ফেলে। পারসিক বাহিনী মুসলিম বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাতে দুর্গ ও পরিখার বাইরে চলে আসে। তখন ছিল দিবসের প্রথমভাগ। সেনাপতি নুমান রাযি.। মূল বাহিনীর সৈন্যদেরকে আপন আপন স্থানে স্থির থাকার নির্দেশ দেন এবং তিনি অনুমতি দেওয়ার পূর্বে যুদ্ধ শুরু করতে নিষেধ করেন। মুসলিম বাহিনী সেনাপতির নির্দেশনা মোতাবেক নিজেদের স্থানে অবস্থান করে ঢাল ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের নিক্ষিপ্ত তির হতে আত্মরক্ষা করতে থাকে। পারসিকরা আরও অগ্রসর হয়ে মুসলিম বাহিনীর ওপর তিরবর্ষণ অব্যাহত রাখে; ফলে অনেক মুসলিম সৈন্য আহত হয়। তারা সেনাপতি নুমানকে বলে, আপনি দেখছেন না, আমরা কী পরিস্থিতিতে আছি?! এখনো কীসের অপেক্ষা করছেন? উত্তরে নুমান রাযি. বলেন, ধীরে! এখনো সময় হয়নি!
দ্বিপ্রহরের (জোহর নামাজের নির্ধারিত) সময় ঘনিয়ে এলে নুমান রাযি. তার ঘোড়ায় চড়ে আপন সৈন্যদের মাঝে ঘুরে ঘুরে বলতে থাকেন, আমি নবীজির একটি আমল স্বচক্ষে দেখেছি বলেই তোমাদেরকে এতক্ষণ যুদ্ধ করতে নিষেধ করেছি। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো অভিযানে গেলে দিবসের প্রথম প্রহরে যুদ্ধ করতেন না। যতক্ষণ না (জোহরের) নামাজের সময় হতো, বাতাস প্রবাহিত হতো এবং যুদ্ধ-উপযোগী পরিবেশ তৈরি হতো, ততক্ষণ তিনি তাড়াহুড়া করতেন না। মূলত এ কারণেই আমি তোমাদেরকে আক্রমণের অনুমতি দিইনি।
এরপর তিনি বলেন, নামাজ শেষ করেই তোমরা প্রস্তুত হয়ে যাবে। নামাজের পর আমি তিনটি তাকবির বলব। প্রথম তাকবিরের সঙ্গে সঙ্গে যারা অপ্রস্তুত থাকবে, তারা যেন প্রস্তুত হয়ে যায়; জুতার ফিতা বেঁধে নেয় এবং যুদ্ধাস্ত্র ঠিক করে নেয়। দ্বিতীয় তাকবিরের সঙ্গে সঙ্গে সবাই যেন পরিধেয় বস্ত্র মজবুত করে বেঁধে নেয়, হামলার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যায়। এরপর তৃতীয় তাকবির বলেই ইনশাআল্লাহ আমি হামলা করব, তোমরাও সঙ্গে সঙ্গে হামলা করবে। যুদ্ধে যদি আমি নিহত হই, তাহলে আমার অবর্তমানে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করবে হুযায়ফা। সেও নিহত হলে অমুক, সেও নিহত হলে ...। এভাবে তিনি একে একে সাতজনের নাম ঘোষণা করেন, যাদের মধ্যে শেষজন হলেন মুগিরা বিন শুবা রাযি.।
সেনাপতি নুমান রাযি. সকলকে নিয়ে নামাজ আদায় করেন। এরপর একে একে দুই তাকবির বলেন। দ্বিতীয় তাকবিরের পর তিনি দোয়া করেন, হে আল্লাহ, তোমার দ্বীনকে মর্যাদাশীল করো, তোমার বান্দাদের সাহায্য করো আর তোমার দ্বীনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এবং তোমার বান্দাদের সহায়তা প্রতিষ্ঠায় নুমানকে আজকের প্রথম শহিদ হিসেবে কবুল করো। হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে প্রার্থনা করছি—আজ এমন এক বিজয় দ্বারা আমার চক্ষুযুগলকে শীতল করো, যার মধ্যে ইসলামের মর্যাদা ও সম্মান নিহিত আছে।
দোয়া শেষ করে তৃতীয় তাকবির বলতেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। শুরু হয় উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড লড়াই। মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি নুমান রাযি. আহত হয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে তার ভাই নুআইম বিন মুকাররিন রাযি. ঝান্ডা তুলে নেন এবং হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযি.-এর হাতে তুলে দেন। দিন শেষ হওয়ার পূর্বেই মুসলিম বাহিনী নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।
যুদ্ধশেষে হজরত মা'কাল বিন ইয়াসার রাযি. সেনাপতি নুমান রাযি.-এর কাছে যান। নুমান রাযি.-এর ঘোড়া যুদ্ধক্ষেত্রের রক্তে পিছলে যাওয়ায় তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। তার তিরাধার তার পাশেই পড়ে ছিল। মা'কাল রাযি. নুমান রাযি.-এর মুখমণ্ডল থেকে ধুলাবালি মুছে দিতে শুরু করেন। নুমান রাযি. অপলক নেত্রে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনি কে?'
'মা'কাল বিন ইয়াসার।'
'বাহিনীর কী অবস্থা?' নুমান রাযি. ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন।
'আল্লাহ আমাদের বিজয় দান করেছেন।'
'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। বিজয়ের বার্তা খলিফাতুল মুসলিমিনের কাছে পাঠিয়ে দেবেন।'
এতটুকু বলতেই সেনাপতি নুমান রাযি.-এর প্রাণবায়ু উড়ে যায় আপন গন্তব্যপানে। রাযিয়াল্লাহু আনহু ওয়া আনহুম আজমাঈন।
টিকাঃ
১২৯. পরামর্শটি প্রদান করেছিলেন তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদ। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ধর্মত্যাগ ফিতনার সময় তিনি মুরতাদ হয়ে যান এবং পরবর্তীকালে পুনরায় ইসলামগ্রহণ করেন। দ্বিতীয়বার ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর তিনি ইরাক অভিযানে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং কাদিসিয়া ও নিহাবন্দের যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি নিহাবন্দের যুদ্ধেই শহিদ হন।
📄 আপনার পালনকর্তার বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন!
যুদ্ধ চলাকালে বিশিষ্ট যোদ্ধা সাহাবি কা'কা' বিন আমর রাযি. পারসিক সেনাপতি ফিরযানের প্রতি তীক্ষ্ণ নজর রাখছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখতে পান যে, ফিরযান পালাতে চেষ্টা করছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ও নুআইম বিন মুকাররিন রাযি. ফিরযানের পিছু নেন এবং হামদান উপত্যকার এক সংকীর্ণ গিরিপথে তার নাগাল পেয়ে যান। গিরিপথটি ধরে অপরদিক থেকে তখন পারস্য-সম্রাট ইয়াযদিগারদের জন্য মধুবোঝাই খচ্চর ও গাধার এক বিরাট কাফেলা আসছিল। খচ্চর ও গাধার কাফেলার কারণে ফিরযানের পালানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়। কা'কা' রাযি. তাকে ধরে ফেলেন এবং হত্যা করেন। এখান থেকেই এই ঐতিহাসিক উক্তি প্রসিদ্ধি লাভ করে— 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলার মধুবাহী সৈন্যদলও আছে!' মুসলিম বীরদ্বয় মধুবোঝাই পশুগুলোকে হাঁকিয়ে মুসলিম সৈন্যদলের কাছে নিয়ে আসেন। হামদান উপত্যকার নাম হয় 'মধু-উপত্যকা'!
সমরবিশারদ জনৈক ইতিহাসবিদ লিখেছেন,
নিহাবন্দ যুদ্ধে তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদের উদ্ভাবিত এই পরিকল্পনাটি পরবর্তী সময়ে সামরিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে গৃহীত হয়। এরপর অনেক সেনাপতিই পদ্ধতিটি কাজে লাগিয়েছে। এটিই ছিল পুরো এশিয়া মহাদেশজুড়ে প্রভাব বিস্তারকারী মঙ্গোল-তাতার সেনাপতি চেঙ্গিস খানের সবচেয়ে কার্যকর ও বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। তিনি প্রথমে শত্রুর ওপর প্রবল আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে সচেষ্ট হতেন। এতে লক্ষ্য বাস্তবায়িত না হলে তিনি পরাজয়ের ভান করে কৌশলে পিছু হটতেন এবং প্রতিপক্ষকে পূর্বপ্রস্তুতকৃত গোপন ফাঁদের দিকে টেনে আনতেন। প্রতিপক্ষ ধীরে ধীরে এমন স্থানে চলে আসত, যেখানে তিনি হঠাৎ আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে পর্যুদস্ত করে ফেলতেন এবং কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করতেন। আইনে জালুতের প্রান্তরে তাতারদের ত্রাস সাইফুদ্দিন কুতুজ রহ.-ও এই একই পদ্ধতি কাজে লাগিয়েছিলেন। তাতারদের পদ্ধতি তাতারদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে তিনি তাদের প্রথমবারের মতো পরাজয় উপহার দিয়েছিলেন। তাতাররা কল্পনাও করতে পারেনি যে, অন্য কেউ তাদের বিরুদ্ধে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারে। সামরিক শাস্ত্রে এ পদ্ধতিটি অ্যামবুশ (Ambush) নামে পরিচিত।
ইসলামি ইতিহাসে নিহাবন্দের যুদ্ধ একটি মীমাংসাকর যুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আছে। এ যুদ্ধের মাধ্যমেই পারস্য সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। বরং এর পরপরই খলিফা উমর
📄 শেষ পারসিক সম্রাট ইয়াযদিগারদের পতন : আল্লাহর জমিনে খোদাদ্রোহীদের চূড়ান্ত লাঞ্ছনাবরণ
২২ হিজরি সনে আহনাফ বিন কায়স রাযি. খলিফাতুল মুসলিমিন উমর রাযি.-এর কাছে পারস্য-সম্রাট ইয়াযদিগার্দকে শায়েস্তা করার জন্য খোরাসান অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার অনুমতি প্রার্থনা করেন। খোরাসান ছিল তৎকালীন পারস্যের পূর্বাঞ্চলের একটি বড় অঞ্চল। খোরাসানে অবস্থান করে ইয়াযদিগার্দ পারসিক নাগরিক ও সৈন্যদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্ররোচিত করে যাচ্ছিলেন।
মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ জানতে পেরে ইয়াযদিগার্দ ছুগদ (Sughd)-এর শাসক, চীনের শাসক ও তুর্কিস্তানের শাসকের কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠান। কিন্তু তাদের কেউই রাজ্যহারা কিসরার বার্তাকে গুরুত্ব দেয়নি।
আহনাফ রাযি. খোরাসানে প্রবেশ করে একের পর এক নগরী জয় করতে থাকেন আর ইয়াযদিগার্দ এক নগরী থেকে আরেক নগরীতে পালাতে থাকেন। একপর্যায়ে নিরুপায় ইয়াযদিগার্দ খোরাসান ত্যাগ করে আমু দরিয়া পাড়ি দিয়ে মাওয়ারাউন নাহার (১৩০) অঞ্চলে আশ্রয় নেন।
আহনাফ পুরো খোরাসানের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রতিটি নগরীতে একজন করে গভর্নর নিযুক্ত করেন এবং এ বিষয়ে বার্তার মাধ্যমে খলিফা উমর রাযি.-কে অবহিত করেন। খলিফা আহনাফকে নদী পাড়ি দিয়ে মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলে প্রবেশ করতে নিষেধ করে লেখেন, 'তোমার কর্তৃত্বে খোরাসানের যেসব অঞ্চল রয়েছে, সেগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ কর।'
ইতিপূর্বে ইয়াযদিগার্দ মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলের বিভিন্ন শাসকের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করলেও কেউ তাকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু এবার যখন তিনি তাদের দেশে আশ্রয় নেন, তখন রাজন্যবর্গের নীতি অনুসারে তাকে সাহায্য করা তাদের দায়িত্বে এসে যায়। এবার তুর্কি শাসক খাকানে আযম ইয়াযদিগার্দকে সহায়তা করতে সম্মত হন। ইয়াযদিগার্দ তুর্কি শাসকসহ বিশাল এক বাহিনী নিয়ে খোরাসান ফিরে আসেন এবং কিছু নগরী পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। এরপর তিনি আহনাফ বিন কায়সের অবস্থানস্থল অভিমুখে রওনা হন। আহনাফের সঙ্গে তখন ছিল সর্বসাকুল্যে বিশ হাজার সৈন্য। আহনাফ রাযি. তাদের উদ্দেশে বলেন, নিঃসন্দেহে তোমরা সংখ্যায় অল্প আর তোমাদের শত্রুরা অধিক। কিন্তু এর কারণে তোমরা ভীতসন্ত্রস্ত ও হীনবল হয়ো না। এমন কত ছোট দলই-না রয়েছে, যারা আল্লাহর হুকুমে বড় দলের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছে। আর আল্লাহ তো তাদের সঙ্গে আছেন, যারা সবর ও ধৈর্যের পরিচয় দেয়।
তুর্কিদের এক বিস্ময়কর যুদ্ধনীতি ছিল। তারা কোথাও যুদ্ধ করতে গেলে ততক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের গোপন ঘাঁটি থেকে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে বের হতো না, যতক্ষণ না তাদের মধ্য হতে প্রবীণ তিনজন ব্যক্তি সামনে অগ্রসর হতো। তাদের নীতি ছিল—প্রথমজন বের হয়ে সঙ্গে থাকা তবলায় আঘাত করবে। তার আওয়াজ শুনে দ্বিতীয়জন বের হয়ে আসবে। দ্বিতীয়জনের তবলার আওয়াজ শুনলে তৃতীয়জন বের হয়ে আসবে। আর তৃতীয়জনের তবলার আওয়াজ শুনলে পুরো বাহিনী যুদ্ধ করতে বের হয়ে আসবে।
শত্রুপক্ষ কোথায় রাত্রিযাপন করছে, তা অবলোকন করার জন্য মুসলিম সেনাপতি আহনাফ বিন কায়স রাযি. রাতের আঁধারে কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে বের হন। ভোরের সামান্য পূর্বে তুর্কি শিবির থেকে তবলাধারী তিন ব্যক্তি বের হয়ে এলে আহনাফ একের পর এক তিনজনকেই হত্যা করেন। প্রত্যুষে তুর্কিরা বের হয়ে যখন তিনজনকেই নিহত অবস্থায় পায়, তখন তাদের শাসক একে অশুভ ও কুলক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে মন্তব্য করেন, এই জাতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের কোনো কল্যাণ নেই। সুতরাং সকলে চলো, ফিরে যাই।
এভাবে কিসরার এবারের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়। যাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি বিজয়ের স্বপ্ন দেখছিলেন, তারা তাকে ছেড়ে চলে যায়। তিনি হয়রান হয়ে ভাবতে থাকেন, কোথায় যাবেন? কার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবেন?
তার সঙ্গী কয়েকজন জ্ঞানী ব্যক্তি তাকে পরামর্শ দিয়ে বলে, আমাদের মত হলো, আমরা তাদের সঙ্গে (অর্থের বিনিময়ে) সন্ধিচুক্তি করব। কারণ, তারা দ্বীনের দাবি মেনে চলে এবং নিরাপত্তা দান করে। এর ফলে আমরা আমাদের দেশেই থাকতে পারব আর তারা হবে আমাদের প্রতিবেশী। অধিকন্তু তারা আমাদের জন্য অন্যদের তুলনায় কল্যাণকর প্রমাণিত হবে। কিন্তু কিসরা তাদের এই সুপরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেন।
এরপর ইয়াযদিগার্দ চীন-সম্রাটের কাছে সহায়তা প্রার্থনা করে দূত প্রেরণ করেন। চীন-সম্রাট ইয়াযদিগারদের দূতের কাছে মুসলিম অভিযাত্রীদের বিবরণ জানতে চান। দূত তাকে মুসলমানদের ইবাদতরীতি, যুদ্ধরীতি ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করে। এরপর চীন-সম্রাট ইয়াযদিগারদের কাছে ফিরতি বার্তায় লেখেন, আমি চাইলেই আপনার সাহায্যার্থে এত বিশাল এক বাহিনী প্রেরণ করতে পারি, যার শুরু অংশ থাকবে মার্ভে (Merv) আর শেষ অংশ থাকবে চীনে। আমার ওপর আপনার অধিকার কতটুকু, সে সম্পর্কে আমার অজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় নয়। কিন্তু আপনার দূত যাদের পরিচয়-বিবরণ আমাকে শোনাল, তারা তো এমন (দুর্জেয় ও অদম্য) যে, চেষ্টা করলে পাহাড়পর্বতকেও ধ্বংস করে ফেলতে পারে। সুতরাং (আপনার প্রতি আমার সুপরামর্শ হলো) আপনি তাদের সঙ্গে সমঝোতা করুন এবং সমঝোতার মাধ্যমে যা লাভ করেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকুন।
চীন-সম্রাটের কাছ থেকে নিরাশ হয়ে ইয়াযদিগার্দ এবার তার গুটিকয়েক সঙ্গীকে নিয়ে মার্ভে আশ্রয় নেন। মার্ভের কয়েকজন অধিবাসীর কাছে তিনি অর্থসাহায্য চাইলে তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে নিজেদের জন্য অনিষ্টকর বিবেচনা করে। তারা তুর্কিদের কাছে লোক পাঠিয়ে তাদেরকে তার বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলে। তুর্কিরা এসে ইয়াযদিগারদের সঙ্গীদেরকে হত্যা করে। ইয়াযদিগার্দ কোনোমতে পালিয়ে নদীর তীরে জনৈক জাঁতাখোদাইকারীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি এক রাত অবস্থান করেন। রাতে ইয়াযদিগার্দ ঘুমিয়ে পড়লে আশ্রয়দাতা তাকে হত্যা করে এবং তার পোশাক ও মুকুট নিয়ে নেয়। এদিকে তুর্কিরা তাকে খুঁজতে খুঁজতে জাঁতাখোদাইকারীর বাড়িতে পৌঁছে তাকে মৃত অবস্থায় পায়। তুর্কিরা এবার লোকটিকে তার পরিবার-পরিজনসহ হত্যা করে এবং কিসরার সব সম্পদ নিয়ে নেয়। এরপর তারা কিসরার মৃতদেহ একটি কফিনে ভরে ইসতাখর (Istakhr) নিয়ে যায়। ইয়াযদিগার্দই ছিলেন পৃথিবীর বুকে শেষ পারস্য-শাসক 'কিসরা'। প্রিয় নবীজি ইরশাদ করেছেন-
إِذَا هَلَكَ قَيْصَرُ فَلَا قَيْصَرَ بَعْدَه، وَإِذَا هَلَكَ كِسْرَى فَلَا كِسْرَى بَعْدَه ، وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ، لَتُنْفَقَنَّ كُنُوْرُهُمَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ»
কায়সারের (রোমান সম্রাট) পতনের পর আর কোনো কায়সার আসবে না আর কিসরার (পারস্য সম্রাট) পতনের পর আর কোনো কিসরা আসবে না। ওই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন! অবশ্যই তাদের সম্পদরাজি আল্লাহর পথে ব্যয় হবে। (১৩১)
টিকাঃ
১৩০. মাওয়ারাউন নাহার : মধ্য এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলের নাম মাওয়ারাউন নাহার বা ট্রান্সঅক্সিয়ানা (Transoxiana)। এর বিস্তৃতি পশ্চিমে মধ্য এশিয়ার বৃহত্তম ও বিখ্যাত নদী আমু দরিয়া হতে পূর্বে মধ্য এশিয়ার আরেক বিখ্যাত নদী সির দরিয়া পর্যন্ত। আধুনিক রাষ্ট্রসীমার উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, কাজাখস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ ও কিরগিজস্তানের দক্ষিণ অংশজুড়ে ছিল অঞ্চলটির বিস্তৃতি। মুসলিম অভিযাত্রীগণ খোরাসান থেকে আমু দরিয়া পাড়ি দিয়ে এ অঞ্চল জয় করেন এবং অঞ্চলটিকে মাওয়ারাউন নাহার «بلاد ما وراء النهر» বা 'নদীর ওপারের অঞ্চল' নামে অভিহিত করেন।
প্রথম হিজরি শতকের শেষ দিকে ষষ্ঠ উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের আমলে বিখ্যাত মুসলিম বীর সেনাপতি কুতায়বা বিন মুসলিম বাহিলি রহ.-এর হাতে অঞ্চলটি বিজিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ইসলামী জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। বুখারা, সমরকন্দ, বায়কান্দ, ফারাব, ফারগানা, শাশ, তিরমিজ, কাসান, খোয়ারিজম, কাশগর, দাবুসিয়াসহ বিভিন্ন সুবিখ্যাত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র এ অঞ্চলের অন্তর্গত ছিল।
১৩১. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৬২৯।