📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 এক ওয়াক্ত ফজর নামাজ!

📄 এক ওয়াক্ত ফজর নামাজ!


মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা সুবহে সাদিকের সময় সুসতার নগরীতে প্রবেশ করেছিল। এরপরই তারা প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর আশঙ্কা! চারিদিকে রক্ত, মৃত্যুর হাতছানি! চূড়ান্ত পর্যায়ের কঠিন পরিস্থিতি! বড় সঙ্গিন মুহূর্ত! যুদ্ধের প্রচণ্ডতার কারণে এমনকি ইশারায়ও তারা সেদিনের ফজর নামাজ আদায় করতে পারেনি। অবশেষে আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহে যখন মুসলিম বাহিনীর অনুকূলে বিজয়ের ইতিহাস রচিত হয়, ততক্ষণে ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে সূর্যোদয় হয়ে গেছে। এরপর সকলে সেদিনের ফজর নামাজ আদায় করে।
বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আনাস বিন মালিক রাযি.-ও সুসতার অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে যখনই তিনি সুসতারের বিজয়ের কথা স্মরণ করতেন, তখনই কাঁদতেন।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—দীর্ঘ দেড় বছরের অবরোধ ও প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের পর মহান আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহে অর্জিত এ বিজয় তো মুসলমানদের জন্য আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছিল। তাহলে হজরত আনাস রাযি. সুসতার বিজয়ের কথা স্মরণ হলেই কেন কাঁদতেন?!
হজরত আনাস রাযি.-এর জীবনে এই এক দিনই ফজরের নামাজ ছুটে গিয়েছিল। শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি সেদিন অপারগ ও ক্ষমাযোগ্য ছিলেন। মুসলিম বাহিনীর সকল সদস্য সেদিন অপারগ ছিল। সকলে ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু যা ছুটে গেছে, তা যে অনেক মহান! অনেক গুরুত্বপূর্ণ এক আমল!
সুসতার অভিযানের কথা স্মরণ হলেই হজরত আনাস রাযি. অশ্রুসিক্ত হতেন। তিনি বলতেন, 'সুসতার কী?! আমার তো ফজরের নামাজ ছুটে গেছে। আমি এই নামাজের বিনিময়ে আমার জন্য পুরো পৃথিবীকেও পছন্দ করব না।'
বস্তুত এখানেই নিহিত আছে আসমানি নুসরত ও গায়েবি সাহায্যপ্রাপ্তির গোপন রহস্য।
পবিত্র কুরআনের ভাষায়-
إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ
তোমরা যদি আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য করো, তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের কদম অবিচলিত রাখবেন। [সুরা মুহাম্মাদ: ০৭]

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্রষ্টব্য : মহত্ত্ব ও অঙ্গীকার রক্ষা ইসলামেরই বৈশিষ্ট্য

📄 দ্রষ্টব্য : মহত্ত্ব ও অঙ্গীকার রক্ষা ইসলামেরই বৈশিষ্ট্য


সুসতারের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেনাপতি আবু সাবরা রাযি. হজরত আনাস রাযি. ও আহনাফ বিন কায়স রাযি.-সহ একটি প্রতিনিধিদলকে খলিফা উমর রাযি.-এর কাছে প্রেরণ করেন এবং তাদের সঙ্গে ধৃত পারসিক সেনাপতি হরমুযানকে পাঠিয়ে দেন। হরমুযান ইতিপূর্বে তিন-তিনবার মুসলমানদের সঙ্গে অঙ্গীকার ও সন্ধি করলেও তিনবারই ভঙ্গ করেছিল।
খলিফার দরবারে হরমুযানকে উপস্থিত করা হলে কথোপকথনের একপর্যায়ে খliফা তাকে জিজ্ঞেস করেন—'হরমুযান, তুমি তো একের পর এক বারবার অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছ। এ বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করে তোমার কিছু বলার আছে?'
'আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, আপনি আমাকে এ বিষয়ে কিছু বলার পূর্বেই হত্যা করবেন।' হরমুযান উত্তর দেয়।
'তুমি নিশ্চিন্ত থাক; এমন কিছুর আশঙ্কা করো না।' খলিফা তাকে অভয় জোগান।
এরপর হরমুযান পানি পান করতে চাইলে তার জন্য পানি আনা হয়। পানির পাত্র হাতে নেওয়ার পর হরমুযানের হাত কাঁপছিল। সে বলে ওঠে—'আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, এই পানি পান করার আগেই আমাকে হত্যা করা হবে।' খলিফা তাকে নির্ভয় দিয়ে বলেন, 'পানি পান করা শেষ হওয়ার পূর্বে তোমাকে কিছু করা হবে না। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।'
এ কথা শুনতেই হরমুযান হাতের পানপাত্রটি ফেলে দেয় এবং সবটুকু পানি মাটিতে পড়ে যায়। খলিফা উমর রাযি. উপস্থিত লোকদেরকে পুনরায় তার জন্য পানি আনতে নির্দেশ দিয়ে বলেন, 'পানি পান করার পূর্বে তাকে হত্যা করো না।'
তখন হরমুযান বলে ওঠে—'আমার পানির প্রয়োজন নেই। আমার উদ্দেশ্য ছিল আপনার কাছ থেকে নিরাপত্তা আদায় করে নেওয়া আর আমি তা পেয়ে গেছি। আপনি আমাকে কীভাবে হত্যা করবেন? আপনি তো আমাকে নিরাপত্তা প্রদান করেছেন।'
'তুমি মিথ্যা বলছ!' খলিফা বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলেন।
তখন দরবারে উপস্থিত হজরত আনাস রাযি. বললেন, 'আমিরুল মুমিনিন! সে সত্য বলেছে। আপনি তাকে নিরাপত্তা প্রদান করেছেন।'
খলিফা অবাক বিস্ময়ে বলেন, 'আনাস! কী বলছ তুমি?! মাজযাআ বিন ছাওর ও বারা বিন মালিকের হত্যাকারীকে আমি নিরাপত্তা দেবো?'
উপস্থিত সকলে আনাস রাযি.-এর কথা সমর্থন করলে খliফা হরমুযানের সামনে এসে বলেন, 'তুমি আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছ। কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি তোমার সঙ্গে প্রতারণা করব না। তবে তুমি চাইলে ইসলামগ্রহণ করতে পার।'
এরপর হরমুযান ইসলামগ্রহণ করে এবং মদিনাতেই বসবাস করতে থাকে। খলিফা তার জন্য ভাতার ব্যবস্থা করে দেন। পরবর্তী সময়ে হরমুযানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনুমিত হয় যে, খলিফা হজরত উমর রাযি.-কে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে সে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সেনাপতি সাদ রাযি.-এর বিরুদ্ধে কুফাবাসীর অভিযোগ

📄 সেনাপতি সাদ রাযি.-এর বিরুদ্ধে কুফাবাসীর অভিযোগ


ঐতিহাসিকগণ এর বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছেন- সেনাপতি সাদ রাযি. কুফার ব্যস্ত এলাকায় একটি বাড়িতে বসবাস করতেন। বাড়িটি বাজারের মধ্যে হওয়ায় বাজারের হট্টগোলে তার কথা বলতে সমস্যা হতো। এ কারণে তিনি সাধারণত বাড়ির দরজা বন্ধ রাখতেন। উমর রাযি. বিষয়টি জানতে পারলেন। তিনি আরও জানতে পারলেন যে, জনগণ বাড়িটিকে 'গভর্নর সাদের প্রাসাদ' বলে। তিনি বিষয়টি অপছন্দ করলেন এবং মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। এরপর তিনি সাহাবি মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি.-কে তলব করে তাকে কুফায় প্রেরণ করলেন। তিনি তাকে বলে দিলেন, কুফার পৌঁছে সাদের প্রাসাদের দরজাটি জ্বালিয়ে দেবে। এরপর কালবিলম্ব না করে ফিরে আসবে।
মুহাম্মাদ বিন মাসলামা মদিনা থেকে রওনা হয়ে কুফায় পৌঁছলেন এবং সাদ রাযি.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ না করেই বাজার থেকে লাকড়ি কিনলেন। এরপর সাদের বাড়ির কাছে গিয়ে দরজায় আগুন লাগিয়ে দিলেন। সাদ রাযি.-কে জানানো হলো যে, খলিফার পক্ষ থেকে একজন দূত এ উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছেন এবং তিনিই এ কাজ করেছেন। সাদ রাযি. দূতের পরিচয় জানার জন্য লোক পাঠালেন। তারা জানাল যে, তিনি মুহাম্মাদ বিন মাসলামা। এবার সাদ তার কাছে লোক পাঠিয়ে তাকে বাড়িতে প্রবেশের অনুরোধ জানালেন; কিন্তু মুহাম্মাদ তাতে অস্বীকৃতি জানালেন। এরপর সাদ রাযি. নিজে বেরিয়ে এলেন এবং দূত মুহাম্মাদকে বিশ্রাম গ্রহণের অনুরোধ জানালেন। মুহাম্মাদ এবারও অস্বীকৃতি জানালেন। সাদ রাযি. তাকে রাহাখরচ প্রদান করলে তিনি তা-ও গ্রহণ করলেন না। এরপর মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. সাদ রাযি.-কে খলিফার পত্র প্রদান করলেন। পত্রে লেখা ছিল—
আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে, তুমি একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেছ এবং তাকে দুর্গের ন্যায় (দুর্ভেদ্য) করে রেখেছ। প্রাসাদটিকে সাদের প্রাসাদ বলা হয়। আবার তুমি তোমার ও জনসাধারণের মাঝে বাধা হিসেবে একটি দরজাও তাতে স্থাপন করেছ। প্রকৃতপক্ষে এটি তোমার প্রাসাদ নয়; বরং ফাসাদের প্রাসাদ। তুমি এটি ত্যাগ করে বায়তুল মালের কাছাকাছি কোনো জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করো এবং এই প্রাসাদটি বন্ধ করে দাও। আর তোমার বাসস্থানে এমন কোনো দরজা রেখো না, যার কারণে জনসাধারণের আগমন বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং তুমিও তাদের অধিকার আদায়ে বাধাপ্রাপ্ত হও। (মানুষের প্রবেশাধিকার অবারিত রাখবে) যেন তারা তোমার মজলিসে শরিক হতে পারে এবং তুমি যখন ঘর হতে বের হও, তখন তোমার সঙ্গে মিলিত হতে পারে।
সাদ তখন শপথ করে বললেন যে, মানুষ যা রটিয়েছে, তা সঠিক নয়। এরপর মুহাম্মাদ বিন মাসলামা তৎক্ষণাৎ মদিনা অভিমুখে রওনা হলেন। পথিমধ্যেই তার পাথেয় শেষ হয়ে গেলে তিনি বাধ্য হয়ে গাছের ছাল গলাধঃকরণ করলেন। মদিনায় পৌঁছে তিনি যখন খলিফার দরবারে উপস্থিত হলেন, তখন গাছের ছাল খাওয়ার কারণে তার কষ্ট হচ্ছিল। উমর রাযি. তার কাছ থেকে সবকিছু শোনার পর খুশি হয়ে বললেন, সে-ই অধিক জ্ঞানী, যে আপন সঙ্গীর পক্ষ থেকে কোনো অঙ্গীকার (এর বাধ্যবাধকতা) না থাকা অবস্থায় দূরদর্শিতার সঙ্গে কথা ও কাজ সম্পাদন করে। মুহাম্মাদ বিন মাসলামা খলিফাকে সাদের শপথের কথাও জানালেন। তখন উমর রাযি. সাদ রাযি.-কে সত্যায়ন করে বললেন, যারা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে এবং যারা আমাকে তা জানিয়েছে, তাদের তুলনায় সাদ অধিক সত্যবাদী। উল্লেখ্য, কুফাবাসীই সাদের বিরুদ্ধে খলিফা উমর রাযি.-এর কাছে অভিযোগ করেছিল।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 কুফার গভর্নর-পদ হতে সাদ রাযি.-কে অব্যাহতিদান

📄 কুফার গভর্নর-পদ হতে সাদ রাযি.-কে অব্যাহতিদান


কিন্তু খলিফা উমর রাযি. আপন নীতি অনুসারে হজরত সাদ রাযি.-কে কুফার গভর্নর-পদ হতে অব্যাহতিদান এবং তাকে মদিনায় নিজের কাছে উপদেষ্টা হিসেবে রাখাকেই শ্রেয় মনে করেন। খলিফা তার পরিবর্তে আবদুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ বিন ইতবান রাযি.-কে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেন।
কিছুদিন পর গভর্নর ইবনে ইতবান রাযি. খলিফার কাছে বার্তা পাঠিয়ে নিহাবন্দে অভিযান পরিচালনার অনুমতি প্রার্থনা করেন। নিহাবন্দে পারস্য- কিসরার তত্ত্বাবধানে বিরাট সৈন্যসমাবেশ ঘটেছিল। ইবনে ইতবান বার্তায় লেখেন, সেখানে দেড় লক্ষ পারসিক যোদ্ধা সমবেত হয়েছে। আমাদের পূর্বে তারাই যদি অভিযানে অগ্রসর হয়, তাহলে তাদের সাহস ও মনোবল বেড়ে যাবে। বিপরীতে আমরা যদি দ্রুত অগ্রসর হয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে পারি, তাহলে আমরাই সাহস ও মনোবলে এগিয়ে থাকব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00