📄 সুসতারের যুদ্ধ
মুসলিম বাহিনীর উভয় অংশ সুসতারে এসে মিলিত হয় এবং খলিফার নির্দেশমতো হজরত আবু সাবরা রাযি. পুরো বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। আবু সাবরা রাযি. খলিফার কাছে আরও সৈন্যপ্রেরণের আবেদন জানালে খলিফার নির্দেশে বসরার গভর্নর আবু মুসা আশআরি রাযি. আরও কিছু সৈন্য নিয়ে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় ত্রিশ হাজার। এরপর মুসলিম বাহিনী নগরীটি অবরোধ করে।
উচ্চভূমিতে অবস্থিত সুসতার ছিল তৎকালীন পারস্যের অন্যতম প্রাচীন, বৃহৎ, সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য নগরী। প্রায় দেড় লক্ষ পারসিক সৈন্য তখন সুসতারে অবস্থান করছিল। নগরীর চারপাশে ছিল সুউচ্চ নগরপ্রাচীর। নগরপ্রাচীর ছিল দু-স্তরবিশিষ্ট, দুই প্রাচীরের মাঝে বেশ প্রশস্ত খালি জায়গা ছিল। নগরপ্রাচীরের স্থানে স্থানে বুরুজ বা পর্যবেক্ষণ-চৌকি নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখান থেকে পারসিক সৈন্যরা সহজেই বাইরে অবস্থানরত মুসলিম সৈন্যদের লক্ষ করে তির নিক্ষেপ করতে পারত। কিন্তু মুসলিম সৈন্যরা তির নিক্ষেপ করলেও তা এত উঁচুতে পৌঁছত না। পারসিক রীতি অনুযায়ী নগরপ্রাচীরের চারপাশে ছিল সুগভীর পরিখা। তবে অন্যান্য পরিখার চেয়ে সুসতারের পরিখার ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, পরিখাটি পানিতে পূর্ণ ছিল। তাই মুসলিম সৈন্যদের পক্ষে তা পাড়ি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন বিবেচিত হচ্ছিল। নগরীর এক পাশে কিছু স্থানে পরিখা না থাকলেও সেখানে প্রচুর সৈন্যসমাবেশ করা হয়েছিল। সেদিক দিয়ে কেউ নগরীতে প্রবেশের চেষ্টা করলেই প্রতিপক্ষের তিরবৃষ্টির মুখে পড়তে হতো। নগরীর অভ্যন্তরে যথেষ্ট পরিমাণ আহারসামগ্রী ও অন্যান্য রসদসামগ্রীর ব্যবস্থা ছিল। এসব কারণে দীর্ঘ দিন অবরোধ করে রাখার পরও সুসতারে অবস্থানরত পারসিক সৈন্যদের মাঝে মোটেও দুর্বলতা পরিলক্ষিত হচ্ছিল না।
জালুলার মতো সুসতারেও পারসিক সৈন্যরা মাঝে-মধ্যেই বেরিয়ে এসে মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালাত এবং বিলম্ব না করে দ্রুত সরে পড়ত। এভাবে তারা আশিবার মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। প্রতিটি সংঘর্ষে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করলেও পারসিকরা দ্রুত সটকে পড়ার কারণে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে সুসতার অবরোধ প্রায় আঠারো মাস দীর্ঘায়িত হয়।
📄 বান্দা, বলো তোমার চাওয়া কী!
মুসলিম বাহিনীতে অন্যান্য অনেক সাহাবির সঙ্গে হজরত আনাস রাযি.-এর ভাই হজরত বারা বিন মালিক রাযি.-ও ছিলেন। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন— كَمْ مِنْ أَشْعَثَ أَغْبَرَ ذِي طِمْرَيْنِ لَا يُؤْبَهُ لَهُ؛ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ ... لأَبَرَّهُ. مِنْهُمُ الْبَرَاءُ بْنُ مَالِكِ».
আল্লাহর অনেক বান্দা এমন আছে, যাদের চুল এলোমেলো-ধূলিমলিন, পরনের পরিচ্ছদ জীর্ণশীর্ণ। তাদের প্রতি কারও গুরুত্ব নেই। কিন্তু (আল্লাহ তাআলার কাছে তারা এত প্রিয় যে,) তারা যদি আল্লাহর নাম নিয়ে কোনো শপথ করে, আল্লাহ অবশ্যই তা পূর্ণ করেন। বারা বিন মালিক তাদেরই একজন। (১২৮)
দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও সুসতার বিজিত না হওয়ায় মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ বারা বিন মালিক রাযি.-এর কাছে গিয়ে অনুরোধ করে যে, আপনি তো আমাদের অবস্থা দেখছেন। দীর্ঘদিন অবরোধের পরও প্রতিপক্ষ সামান্য বশীভূত হচ্ছে না। তারা মাঝেমধ্যেই হামলা করে সটকে পড়ছে আর আমরা আক্রমণ করতে গেলে তাদের তিরবৃষ্টির শিকার হচ্ছি। তাই আপনি শপথ করে আল্লাহকে কিছু বলুন। তখন বারা রাযি. দোয়া করেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমি আপনাকে শপথ দিয়ে বলছি—আপনি আমাদেরকে তাদের স্কন্ধমূল দান করুন, তাদের ওপর কর্তৃত্ব দান করুন এবং আমাকে আপনার নবীর সঙ্গে মিলিত করুন।'
এরপরই হঠাৎ মুসলিম বাহিনীর সদস্য আবু মুসা আশআরি রাযি.-এর পায়ের কাছে প্রতিপক্ষের নিক্ষিপ্ত একটি তির এসে পড়ে। তিরটির সঙ্গে একটি পত্র বাঁধা! পত্রটিতে জনৈক পারসিক যোদ্ধা তাকে জানমালের নিরাপত্তাদানের বিনিময়ে মুসলিম বাহিনীকে নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশের পথ জানিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। আবু মুসা আশআরি রাযি. মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি আবু সাবরা রাযি.-কে বিষয়টি জানালে তিনি উক্ত সৈনিককে নিরাপত্তাপ্রদান করেন। এরপর আবু মুসা আশআরি রাযি. একটি পত্রে নিরাপত্তাঘোষণার কথা লিখে যে স্থান থেকে তার কাছে তির নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তিরের মাধ্যমে পত্রটি সেখানে নিক্ষেপ করেন।
টিকাঃ
১২৮. সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩৮৫৪।
📄 অনন্যসাধারণ বীরত্ব
রাত গভীর হলে পারসিক সৈন্যটি নিরাপত্তাপত্র সঙ্গে নিয়ে মুসলিম সেনাপতি আবু সাবরা রাযি.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলে, 'আমার সঙ্গে আপনাদের একজন লোককে দিন, আমি তাকে পথটি চিনিয়ে দেবো। এরপর সে এসে আপনাদেরকে নিয়ে যাবে।' আবু সাবরা এ বিষয়ে হজরত মাজযাআ বিন ছাওর আস-সাদুসি রাযি.-এর সঙ্গে পরামর্শ করলে তিনি নিজের নাম পেশ করেন। পারসিক সৈন্যটি বলে, 'আমার সঙ্গে এমন ব্যক্তিকেই পাঠাতে হবে, যে ভালো সাঁতার জানে।' মাজযাআ রাযি. উত্তর দেন, 'আমি ভালো সাঁতার জানি।' আবু সাবরা রাযি. মাজযাআ রাযি.-কে তার সঙ্গে যাওয়ার অনুমতি দেন এবং বলে দেন যে, 'আপনি ভালো করে পথটি চিনে নিয়েই আমাদের কাছে ফিরে আসবেন; কোনো অবস্থাতেই প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াবেন না।'
মাজযাআ রাযি. পারসিক সৈন্যটিকে অনুসরণ করে পথ চলতে থাকেন। কিছুদূর যাওয়ার পর লোকটি পরিখার পানিতে নেমে পড়লে তিনিও তার অনুসরণ করেন। এরপর লোকটি পানিতে ডুব দিলে তিনিও ডুব দেন। পরক্ষণেই তিনি নিজেকে একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশমুখে আবিষ্কার করেন। সুড়ঙ্গটি নগরপ্রাচীরের নিচ দিয়ে নগরীর অভ্যন্তরে চলে গেছে।
লোকটির পিছু পিছু তিনি সুড়ঙ্গ ধরে অগ্রসর হতে থাকেন। সুড়ঙ্গটি বিভিন্ন স্থানে এত সংকীর্ণ ছিল যে, উভয়কে অত্যন্ত কষ্ট করে তা অতিক্রম করতে হচ্ছিল। কোথাও সুড়ঙ্গের ছাদ অত্যধিক নিচু হওয়ায় পানিতে ডুব দিয়ে অতিক্রম করতে হচ্ছিল। অবশেষে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উভয়ে অন্ধকার সুড়ঙ্গটির অপর প্রান্তে পৌঁছতে সক্ষম হন। এরপর পারসিক সৈন্যটি মাজযাআ রাযি.-কে পারসিক পোশাক এনে দিলে তিনি তা পরিধান করে নগরীর নিরাপত্তাব্যবস্থার খোঁজখবর নিতে থাকেন। মাজযাআ রাযি. সুসতার নগরীর মূল প্রবেশদ্বার, দুর্গের অবস্থান, প্রাসাদের অবস্থান ইত্যাদি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। প্রাসাদ পর্যবেক্ষণ করার সময় তিনি হঠাৎ করেই পারসিক সেনাপতি হরমুযানকে সেখান থেকে বের হতে দেখেন। কিন্তু সেনাপতি আবু সাবরা রাযি.-এর নির্দেশ স্মরণ করে তিনি নিজেকে নিবৃত্ত রাখেন।
এরপর মাজযাআ রাযি. পারসিক সৈন্যটিকে বিদায় জানিয়ে আবার সেই দুর্গম সুড়ঙ্গ অতিক্রম করে মুসলিম শিবিরে ফিরে আসেন। তিনি সেনাপতি আবু সাবরা রাযি.-কে বিস্তারিত অবহিত করে অনুরোধ করেন—'আমার সঙ্গে কয়েকজন সৈন্য দিন। আমি তাদেরকে নিয়ে যেকোনো মূল্যে আপনাদের জন্য নগরদ্বার খুলে দেবো।'
হজরত আবু সাবরা রাযি. এই সুকঠিন দায়িত্ব পালনের জন্য কাউকে বাধ্য করার পরিবর্তে সবাইকে স্বেচ্ছায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ দেন। তিনশ জানবাজ মুজাহিদ এই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। তাদের মধ্যে স্বয়ং সেনাপতি আবু সাবরা রাযি.-ও ছিলেন। আবু সাবরা রাযি. মাজযাআ রাযি.-কেই এই তিনশ জনের আমির নির্বাচিত করেন।
ততক্ষণে মধ্যরাত পেরিয়ে আরও দেড়-দুই ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেছে। সুবহে সাদিকের ঘণ্টা দুয়েক বাকি। তিনশ দুঃসাহসী বীর যোদ্ধা এক সুকঠিন মিশন বাস্তবায়নের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েন। অতিরিক্ত পরিচ্ছদ ও অস্ত্রশস্ত্র বাদ দিয়ে সকলে পাতলা চাদর গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিলেন; বুকের সঙ্গে একটি করে তরবারি বাঁধা। সুড়ঙ্গের অভ্যন্তরে নিকষ অন্ধকার হওয়ায় মাজযাআ রাযি. অনুচ্চকণ্ঠে সকলকে পথপ্রদর্শন করছিলেন। দুর্গম গিরি কান্তার মরু পাড়ি দিয়ে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে পৌঁছার পর মাজযাআ রাযি. দেখতে পান—তার সঙ্গে মাত্র আশিজন যোদ্ধা অবশিষ্ট আছে! বাকি দুইশ বিশজন মুসলিম যোদ্ধাই পথিমধ্যে অজানা পরিণতির শিকার হয়েছে।
ইতিমধ্যে প্রায় দুই ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেছে। অবশিষ্ট আশিজনকে নিয়েই মাজযাআ রাযি. সুসতার নগরীর প্রধান প্রবেশদ্বারের কাছে পৌঁছে যান। পারসিক বাহিনীর কল্পনাতেও ছিল না যে, রজনীর এই শেষ প্রহরে মুসলিম বাহিনী আক্রমণের চেষ্টা চালাতে পারে। তাই তারা সকলেই ছিল গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। অবশ্য মূল প্রবেশদ্বারের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সৈন্যরা নির্ঘুম পাহারা দিচ্ছিল। মাজযাআ রাযি.-এর নেতৃত্বে সকলে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ফটকের কাছে পৌঁছে যেতে সক্ষম হয়। এরপর তারা উচ্চৈঃস্বরে তাকবির দিয়ে ওঠে। তাকবির-ধ্বনি শুনতেই বাইরে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা বুঝতে পারে যে, নগরদ্বার মাজযাআ রাযি.-এর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।
তৎক্ষণাৎ মূল মুসলিম বাহিনী পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে প্রবেশদ্বারের কাছে চলে আসে। এরপর ভেতর থেকে দ্বার খুলে দিতেই মুসলিম বাহিনী স্রোতের ন্যায় সুসতার নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
শোরগোল শুনে পারসিক সৈন্যরা জেগে উঠলেও তারা ছিল কিংকর্তব্যবিমূঢ়। দ্রুত তারা মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলায় অগ্রসর হলেও তাদের এই অপ্রস্তুত অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে মুসলিম সৈন্যগণ তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা বস্তুপূজারি পারসিকদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করে দেন। মুসলিম যোদ্ধারা পারসিকদের কচুকাটা করতে থাকে।
যুদ্ধ চলাকালে হজরত বারা বিন মালিক রাযি. দূর থেকে হরমুযানকে দেখতে পেয়ে তার কাছে পৌঁছার মনস্থ করেন। তার সামনে তখন যুদ্ধরত উভয় পক্ষের সৈন্যদের এক বিশাল জনস্রোত। তিনি একে একে একশ পারসিক সৈন্যকে মল্লযুদ্ধে হত্যা করার পর অবশেষে হরমুযানের কাছে পৌঁছতে সক্ষম হন। উভয়ে পরস্পর মুখোমুখি হতেই একে অপরকে হত্যা করার জন্য আঘাত হানে। বারা রাযি.-এর আঘাত লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় আর হরমুযানের আঘাতে বারা রাযি. শহিদ হয়ে যান। প্রমাণিত হয় সত্যবাদী নবীজির ঘোষণার সত্যতা-'বারা বিন মালিক তাদেরই একজন।'
দূর থেকে হজরত মাজযাআ রাযি.-ও হরমুযানকে অনুসরণ করছিলেন। তিনিও একে একে একশ পারসিক সৈন্যকে হত্যা করে হরমুযানের কাছে পৌঁছে যান। উভয়ে মুখোমুখি হতেই একে অপরকে হত্যা করার জন্য তরবারি চালনা করে। মাজযাআ রাযি.-এর আঘাত লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় আর হরমুযানের আঘাতে মাজযাআ রাযি. শহিদ হয়ে যান।
এক রাতে তিন তিনবার দুর্গম সুড়ঙ্গ পাড়ি দিয়েছেন; এরপর প্রবেশদ্বারের কাছে প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রচণ্ড লড়াই করে মুসলিম বাহিনীর প্রবেশ নিশ্চিত করেছেন; তারপর একে একে একশ সৈন্যের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে লড়ে মাজযাআ রাযি.-এর দেহ-মন তখন বড় ক্লান্ত! এবার তিনি নিশ্চিন্তে ঘুমাবেন, 'প্রিয়তম' ও প্রিয়জনদের সঙ্গে!
মুসলিম সৈন্যদের প্রচণ্ড আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পারসিক সৈন্যরা পালাতে শুরু করে। সেনাপতি হরমুযান পালিয়ে তার দুর্গম প্রাসাদে আশ্রয় নেয় এবং প্রাসাদের দ্বার বন্ধ করে দেয়। এরপর সে প্রাসাদের ওপর থেকে মুসলিম বাহিনীর উদ্দেশে বলে—'আমার কাছে এখনো একশ তির আছে আর আমার নিক্ষিপ্ত তির কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না। এখন বলো, তোমরা কি তোমাদের একশ জন সঙ্গীকে হারিয়ে হলেও আমাকে পাকড়াও করতে চাও?' মুসলিম সৈন্যগণ তাকে জিজ্ঞেস করেন, 'তাহলে তুমি কী চাও?' হরমুযান উত্তর দেয়, 'আমি তোমাদের কাছে এই শর্তে আত্মসমর্পণ করতে চাই যে, তোমরা আমাকে হত্যা না করে খলিফা উমরের কাছে নিয়ে যাবে। তিনি আমার বিষয়ে যে ফয়সালা করবেন, আমি তা মেনে নেব।' পরামর্শের পর মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা হরমুযানের প্রস্তাব মেনে নিলে সে তিরগুলো ফেলে আত্মসমর্পণ করে।
এরপর মুসলিম বাহিনী দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে সুস ও গান্দিসাপুর নগরী জয় করতে সক্ষম হয়।
📄 এক ওয়াক্ত ফজর নামাজ!
মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা সুবহে সাদিকের সময় সুসতার নগরীতে প্রবেশ করেছিল। এরপরই তারা প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অত্যন্ত কঠিন। প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর আশঙ্কা! চারিদিকে রক্ত, মৃত্যুর হাতছানি! চূড়ান্ত পর্যায়ের কঠিন পরিস্থিতি! বড় সঙ্গিন মুহূর্ত! যুদ্ধের প্রচণ্ডতার কারণে এমনকি ইশারায়ও তারা সেদিনের ফজর নামাজ আদায় করতে পারেনি। অবশেষে আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহে যখন মুসলিম বাহিনীর অনুকূলে বিজয়ের ইতিহাস রচিত হয়, ততক্ষণে ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে সূর্যোদয় হয়ে গেছে। এরপর সকলে সেদিনের ফজর নামাজ আদায় করে।
বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আনাস বিন মালিক রাযি.-ও সুসতার অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে যখনই তিনি সুসতারের বিজয়ের কথা স্মরণ করতেন, তখনই কাঁদতেন।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—দীর্ঘ দেড় বছরের অবরোধ ও প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের পর মহান আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহে অর্জিত এ বিজয় তো মুসলমানদের জন্য আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছিল। তাহলে হজরত আনাস রাযি. সুসতার বিজয়ের কথা স্মরণ হলেই কেন কাঁদতেন?!
হজরত আনাস রাযি.-এর জীবনে এই এক দিনই ফজরের নামাজ ছুটে গিয়েছিল। শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি সেদিন অপারগ ও ক্ষমাযোগ্য ছিলেন। মুসলিম বাহিনীর সকল সদস্য সেদিন অপারগ ছিল। সকলে ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু যা ছুটে গেছে, তা যে অনেক মহান! অনেক গুরুত্বপূর্ণ এক আমল!
সুসতার অভিযানের কথা স্মরণ হলেই হজরত আনাস রাযি. অশ্রুসিক্ত হতেন। তিনি বলতেন, 'সুসতার কী?! আমার তো ফজরের নামাজ ছুটে গেছে। আমি এই নামাজের বিনিময়ে আমার জন্য পুরো পৃথিবীকেও পছন্দ করব না।'
বস্তুত এখানেই নিহিত আছে আসমানি নুসরত ও গায়েবি সাহায্যপ্রাপ্তির গোপন রহস্য।
পবিত্র কুরআনের ভাষায়-
إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ
তোমরা যদি আল্লাহর (দ্বীনের) সাহায্য করো, তিনিও তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের কদম অবিচলিত রাখবেন। [সুরা মুহাম্মাদ: ০৭]