📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 জালুলা ও হুলওয়ান বিজয়

📄 জালুলা ও হুলওয়ান বিজয়


পারস্য সম্রাট ইয়াযদিগার্দ ও পরাজিত পারসিক বাহিনীর অবশিষ্ট সৈন্যগণ মাদায়েন থেকে প্রায় একশ মাইল দূরে হুলওয়ানে আশ্রয় নেয়। এরপর সেখান থেকে পারসিক বাহিনীর একটি অংশ অগ্রসর হয়ে জালুলায় সমবেত হয়। জালুলা ছিল পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি দুর্গ। নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও দুর্ভেদ্য করে তোলার জন্য পারসিকরা পরিখার বাইরে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে মাইনের মতো করে লোহার পেরেক বিছিয়ে রেখেছিল।
সংবাদ জানতে পেরে মুসলিম সেনাপতি সাদ রাযি. খলিফা উমর রাযি.-কে বিস্তারিত অবহিত করেন। এরপর তিনি খলিফার নির্দেশনা অনুযায়ী হাশিম বিন উওবা রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশকে জালুলায় প্রেরণ করেন।
জালুলায় পৌঁছে মুসলিম বাহিনী পারসিকদের অবরোধ করে। অবরুদ্ধ অবস্থায় কেটে যায় প্রায় তিন মাস। এ সময় পারসিকরা মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে এসে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ চালাত। তিন মাসে প্রায় আশিব্বার উভয় বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং প্রতিবারই মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। এরইমধ্যে একদিন পারসিক বাহিনী যুদ্ধ করার জন্য বেরিয়ে এলে আল্লাহ পাকের কুদরতে প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু শুরু হয় এবং এর পুরো নগরী অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। গভীর অন্ধকারে পারসিক সেনারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং অনেকেই পরিখায় পড়ে যায়। বিষয়টি অবগত হয়ে মুসলিম সেনারা বজ্র নিনাদে পারসিক বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধের প্রচণ্ডতায় ওদিনের লড়াইকে কাদিসিয়া যুদ্ধের শেষ দিনের লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। অবশেষে হযরত কাকা বিন আমর রাযি. পরিখা অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশের পথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এরপর মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে পারসিক মুশরিকরা নিহত হতে থাকে এবং বিজয় মুসলিম বাহিনীর পদ চুম্বন করে। জালুলার যুদ্ধে পারসিক বাহিনীর প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিহত হয়। ষোড়শ হিজরির সনের জিলকদ মাসে (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) জালুলা বিজিত হয়। জালুলায় পারসিক বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে সম্রাট ইয়াযদিগার্দ হলওয়ান ছেড়ে রায় নগরীতে চলে যান।
এরপর কাকা রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ হলওয়ানে অভিযান পরিচালনা করে নগরীটি জয় করে নেয়।
মুসলিম বাহিনীর আরেকটি অংশ দজলার তীরে অবস্থিত তিকরিত, মসুল ও নিনাবেহ (Nineveh) নগরী জয় করে। আরেক অংশ জয় করে ফোরাত নদীর তীরে হীতো ও কারকিসিয়া (Circesium) নগরী। তৃতীয় আরেকটি দল জয় করে উবুল্লা, শা্ত আল আরব (Shatt al-Arab) ও আহওয়াজ (Ahvaz) নগরী। জালুলা যুদ্ধের চৌদ্দ মাস পর সতেরোশ হিজরিতে (৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে) মুসলিম বাহিনী কুফা নগরীতে শিবির স্থাপন করে এবং কুফাকে নিজেদের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি নির্ধারণ করে। বিজিত অন্যান্য অঞ্চলে কেবল প্রতিরক্ষা ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। এরপর আরবের প্রতিটি গোত্রের অধিবাসীরা কুফার বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন শুরু করে। খলিফা উমর রাযি. সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাযি.-কে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 রামাহুরমুয বিজয়

📄 রামাহুরমুয বিজয়


সম্রাট ইয়াযদিগার্দের প্রচেষ্টায় কিছুদিন পর পারসিকরা আরও একবার সংগঠিত হতে শুরু করে। এবার তারা হরমুযানের নেতৃত্বে রামাহুরমুয এলাকায় সমবেত হয়। রুস্তমের মৃত্যুর পর হরমুযান ছিল তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম সেনাপতি।
সংবাদ পেয়ে কুফার গভর্নর সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাযি. খলিফা উমর রাযি.-কে বিস্তারিত অবহিত করেন। খলিফা সাদ রাযি.-কে নুমান বিন মুকাররিন রাযি.-এর নেতৃত্বে কুফা থেকে একটি বাহিনী প্রেরণের নির্দেশ দেন আর বসরার গভর্নর আবু মুসা আশআরি রাযি.-কে সাহল বিন আদি রাযি.-এর নেতৃত্বে বসরা থেকে একটি বাহিনী প্রেরণের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি খলিফা নির্দেশ দেন যে, উভয় বাহিনী মিলিত হওয়ার পর সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব থাকবে আবু সাবরা বিন আবু রুহম রাযি.-এর হাতে।
নির্দেশমতো নুমান বিন মুকাররিন রাযি. কুফার বাহিনী নিয়ে রামাহুরমুয অভিমুখে রওনা হন। মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে হরমুযান রামাহুরমুয ছেড়ে বেরিয়ে এসে আরবাক অঞ্চলে উপস্থিত হয়। আরবাকে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। হরমুযান পালিয়ে আশ্রয় নেয় সুসতার (১২৭) নগরীতে। নুমান বিন মুকাররিনও হরমুযানকে পাকড়াও করতে সুসতার অভিমুখে রওনা হন।
অপরদিকে সাহল বিন আদি রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন বসরার বাহিনী রামাহুরমুয অভিমুখে রওনা হয়ে ততক্ষণে আহওয়াযে পৌঁছেছিল। তাদের কাছে যখন সংবাদ পৌঁছায় যে, হরমুযান এখন সুসতারে আশ্রয় নিয়েছে, তখন তারা গন্তব্য পরিবর্তন করে সুসতার অভিমুখে রওনা হয়।

টিকাঃ
১২৭. সুসতার: বর্তমান ইরানের খোজেস্তান প্রদেশের অন্তর্গত আহওয়ায নগরীর উত্তরে অবস্থিত একটি নগরীর নাম সুসতার (Shushtar)। ফার্সিতে নগরীটির নাম شوشتر (শুশতার), আর আরবিতে تُستر (তুসতার)।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সুসতারের যুদ্ধ

📄 সুসতারের যুদ্ধ


মুসলিম বাহিনীর উভয় অংশ সুসতারে এসে মিলিত হয় এবং খলিফার নির্দেশমতো হজরত আবু সাবরা রাযি. পুরো বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। আবু সাবরা রাযি. খলিফার কাছে আরও সৈন্যপ্রেরণের আবেদন জানালে খলিফার নির্দেশে বসরার গভর্নর আবু মুসা আশআরি রাযি. আরও কিছু সৈন্য নিয়ে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় ত্রিশ হাজার। এরপর মুসলিম বাহিনী নগরীটি অবরোধ করে।
উচ্চভূমিতে অবস্থিত সুসতার ছিল তৎকালীন পারস্যের অন্যতম প্রাচীন, বৃহৎ, সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য নগরী। প্রায় দেড় লক্ষ পারসিক সৈন্য তখন সুসতারে অবস্থান করছিল। নগরীর চারপাশে ছিল সুউচ্চ নগরপ্রাচীর। নগরপ্রাচীর ছিল দু-স্তরবিশিষ্ট, দুই প্রাচীরের মাঝে বেশ প্রশস্ত খালি জায়গা ছিল। নগরপ্রাচীরের স্থানে স্থানে বুরুজ বা পর্যবেক্ষণ-চৌকি নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখান থেকে পারসিক সৈন্যরা সহজেই বাইরে অবস্থানরত মুসলিম সৈন্যদের লক্ষ করে তির নিক্ষেপ করতে পারত। কিন্তু মুসলিম সৈন্যরা তির নিক্ষেপ করলেও তা এত উঁচুতে পৌঁছত না। পারসিক রীতি অনুযায়ী নগরপ্রাচীরের চারপাশে ছিল সুগভীর পরিখা। তবে অন্যান্য পরিখার চেয়ে সুসতারের পরিখার ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, পরিখাটি পানিতে পূর্ণ ছিল। তাই মুসলিম সৈন্যদের পক্ষে তা পাড়ি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন বিবেচিত হচ্ছিল। নগরীর এক পাশে কিছু স্থানে পরিখা না থাকলেও সেখানে প্রচুর সৈন্যসমাবেশ করা হয়েছিল। সেদিক দিয়ে কেউ নগরীতে প্রবেশের চেষ্টা করলেই প্রতিপক্ষের তিরবৃষ্টির মুখে পড়তে হতো। নগরীর অভ্যন্তরে যথেষ্ট পরিমাণ আহারসামগ্রী ও অন্যান্য রসদসামগ্রীর ব্যবস্থা ছিল। এসব কারণে দীর্ঘ দিন অবরোধ করে রাখার পরও সুসতারে অবস্থানরত পারসিক সৈন্যদের মাঝে মোটেও দুর্বলতা পরিলক্ষিত হচ্ছিল না।
জালুলার মতো সুসতারেও পারসিক সৈন্যরা মাঝে-মধ্যেই বেরিয়ে এসে মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালাত এবং বিলম্ব না করে দ্রুত সরে পড়ত। এভাবে তারা আশিবার মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। প্রতিটি সংঘর্ষে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করলেও পারসিকরা দ্রুত সটকে পড়ার কারণে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে সুসতার অবরোধ প্রায় আঠারো মাস দীর্ঘায়িত হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 বান্দা, বলো তোমার চাওয়া কী!

📄 বান্দা, বলো তোমার চাওয়া কী!


মুসলিম বাহিনীতে অন্যান্য অনেক সাহাবির সঙ্গে হজরত আনাস রাযি.-এর ভাই হজরত বারা বিন মালিক রাযি.-ও ছিলেন। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন— كَمْ مِنْ أَشْعَثَ أَغْبَرَ ذِي طِمْرَيْنِ لَا يُؤْبَهُ لَهُ؛ لَوْ أَقْسَمَ عَلَى اللَّهِ ... لأَبَرَّهُ. مِنْهُمُ الْبَرَاءُ بْنُ مَالِكِ».
আল্লাহর অনেক বান্দা এমন আছে, যাদের চুল এলোমেলো-ধূলিমলিন, পরনের পরিচ্ছদ জীর্ণশীর্ণ। তাদের প্রতি কারও গুরুত্ব নেই। কিন্তু (আল্লাহ তাআলার কাছে তারা এত প্রিয় যে,) তারা যদি আল্লাহর নাম নিয়ে কোনো শপথ করে, আল্লাহ অবশ্যই তা পূর্ণ করেন। বারা বিন মালিক তাদেরই একজন। (১২৮)
দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও সুসতার বিজিত না হওয়ায় মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ বারা বিন মালিক রাযি.-এর কাছে গিয়ে অনুরোধ করে যে, আপনি তো আমাদের অবস্থা দেখছেন। দীর্ঘদিন অবরোধের পরও প্রতিপক্ষ সামান্য বশীভূত হচ্ছে না। তারা মাঝেমধ্যেই হামলা করে সটকে পড়ছে আর আমরা আক্রমণ করতে গেলে তাদের তিরবৃষ্টির শিকার হচ্ছি। তাই আপনি শপথ করে আল্লাহকে কিছু বলুন। তখন বারা রাযি. দোয়া করেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমি আপনাকে শপথ দিয়ে বলছি—আপনি আমাদেরকে তাদের স্কন্ধমূল দান করুন, তাদের ওপর কর্তৃত্ব দান করুন এবং আমাকে আপনার নবীর সঙ্গে মিলিত করুন।'
এরপরই হঠাৎ মুসলিম বাহিনীর সদস্য আবু মুসা আশআরি রাযি.-এর পায়ের কাছে প্রতিপক্ষের নিক্ষিপ্ত একটি তির এসে পড়ে। তিরটির সঙ্গে একটি পত্র বাঁধা! পত্রটিতে জনৈক পারসিক যোদ্ধা তাকে জানমালের নিরাপত্তাদানের বিনিময়ে মুসলিম বাহিনীকে নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশের পথ জানিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। আবু মুসা আশআরি রাযি. মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি আবু সাবরা রাযি.-কে বিষয়টি জানালে তিনি উক্ত সৈনিককে নিরাপত্তাপ্রদান করেন। এরপর আবু মুসা আশআরি রাযি. একটি পত্রে নিরাপত্তাঘোষণার কথা লিখে যে স্থান থেকে তার কাছে তির নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তিরের মাধ্যমে পত্রটি সেখানে নিক্ষেপ করেন।

টিকাঃ
১২৮. সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩৮৫৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00