📄 অশ্বপৃষ্ঠে দজলা পাড়ি!
তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী মাদায়েনে পৌঁছতে মুসলিম বাহিনীর সামনে তখন বাধা কেবল দজলা নদী। দজলা ছিল ছয় মিটার গভীর একটি প্রশস্ত ও খরস্রোতা নদী। মুসলিম বাহিনীর সদস্যদের প্রবল উদ্দীপনা সত্ত্বেও সেনাপতি সাদ প্রথমে দজলা পাড়ি দিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। এ সময় নওমুসলিম একদল পারসিক নাগরিক এসে সাদ রাযি.-কে দজলার তুলনামূলক অগভীর একটি অংশ দেখিয়ে দেয়। কিন্তু এরপরও তিনি দ্বিধায় ভুগছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তার দ্বিধা দূর করে দেন এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেন, প্রথমে পুরো বাহিনীর পরিবর্তে ক্ষুদ্র একটি অংশ নদী পার হবে। তিনি ঘোষণা করেন, কারা আমাদের জন্য নদীর অপর তীরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমে নদী পাড়ি দিতে রাজি আছ? তখন কাকা' বিন আমর রাযি.-এর সহোদর আছিম রাযি. অগ্রসর হন। তার সঙ্গে এগিয়ে আসেন আরও ছয়শ জানবাজ দুঃসাহসী মুসলিম সৈন্য। আছিম ও তার সঙ্গীরা এক বিরল দুঃসাহসী উদ্যোগ নেন এবং ঘোড়ার পিঠে চড়েই নেমে পড়েন খরস্রোতা দজলার বুকে।
মুসলিম সৈন্যদেরকে অশ্বপিঠে চড়েই দজলায় নামতে দেখে পারসিকরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। তারা মুসলিম বাহিনীকে বাধা দিতে চাইলেও পরাজিত হয় এবং মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই নদীর পূর্ব তীরে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এরপর সেনাপতি সাদ রাযি. পুরো বাহিনীকে দজলা পাড়ি দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সকলকে এই দোয়া পাঠ করতে বলেন- نَسْتَعِيْنُ بِاللهِ وَنَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ ، حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ. আমরা আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তার প্রতিই ভরসা রাখছি। আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট আর তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক। মহান-মহীয়ান আল্লাহপ্রদত্ত শক্তিসামর্থ্য ব্যতিরেকে আমাদের কোনো শক্তিসামর্থ্য নেই। সেনাপতির আদেশে মুসলিম বাহিনীর সকলে নদীবক্ষে নেমে পড়ে। নদী পাড়ি দেওয়ার সময় সকলে নিশ্চিন্তে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। সাদ রাযি. সকলকে দুজন দুজন করে একসঙ্গে চলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। খরস্রোতা দজলা পাড়ি দেওয়ার সময় মুসলিম বাহিনীর কোনো সদস্য পানিতে ডুবেনি, তাদের কোনো সরঞ্জামও হারায়নি। (১২৫) এ দৃশ্য দেখে পারসিক সৈন্যরা পরস্পর বলাবলি করতে থাকে, আল্লাহর শপথ! তোমরা তো কোনো মানুষের বিরুদ্ধে লড়ছ না; তোমরা যে যুদ্ধ করছ একদল জিনের বিরুদ্ধে! নদী পাড়ি দেওয়ার সময় সেনাপতি সাদ রাযি.-এর পাশে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি সালমান ফারসি রাযি.। তারা দুজনও ঘোড়ার পিঠে চড়ে নদী পাড়ি দেওয়ার সময় পরস্পর কথা বলছিলেন। এ সময় সাদ বলেন, 'এ তো পরাক্রমশালী মহাজ্ঞানী আল্লাহ তাআলার ফয়সালা। আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক! আল্লাহর শপথ! যদি সৈন্যদলের মধ্যে কোনো সত্যদ্রোহী না থাকে এবং যদি পুণ্যের ওপর প্রাধান্য পায় এমন পাপ না থাকে, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তার বন্ধুদেরকে সাহায্য করবেন, তার দ্বীনকে বিজয়ী করবেন এবং অবশ্যই তার শত্রুদের পরাজিত করবেন।'
তখন সালমান রাযি. তাকে বলেন, 'ইসলাম চির-তরুণ ধর্ম। আল্লাহর শপথ! ইসলামের অনুসারীদের জন্য যেভাবে স্থলভাগ অনুগত হয়ে গেছে, অনুগত হয়ে গেছে জলভাগও। যে মহান সত্তার হাতে আমি সালমানের প্রাণ, তার শপথ করে বলছি—মুসলিম বাহিনী যেমন দলবদ্ধভাবে পানিতে নেমেছে, তেমন দলবদ্ধভাবেই তীরে উঠবে।'
মুসলিম বাহিনীর আগমন-সংবাদ পেয়ে কিসরাসহ পারস্য সাম্রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও মাদায়েনের অধিবাসীরা মাদায়েন ছেড়ে পালিয়ে যায়। মুসলিম বাহিনী মাদায়েনে প্রবেশ করে দেখতে পায়, পুরো নগরী জনশূন্য। কিসরার প্রাসাদের কাছে পৌঁছে হজরত সাদ রাযি. এই আয়াত তেলাওয়াত করেন— كَمْ تَرَكُوا مِنْ جَنَّتٍ وَّعُيُونٍ وَّ زُرُوعٍ وَّمَقَامٍ كَرِيمٍ وَّنَعْمَةٍ كَانُوا فِيهَا فَكِهِينَ كَذَلِكَ وَأَوْرَثْنَهَا قَوْمًا آخَرِيْنَ
তারা পশ্চাতে রেখে গিয়েছে কত উদ্যান ও ঝরনা! কত শস্যক্ষেত্র ও সুরম্য বসতবাড়ি! এবং কত বিলাসসামগ্রী, যা নিয়ে তারা আনন্দ-ফুর্তি করত। এরূপই হয়েছিল তাদের পরিণাম। আর আমি এই সমুদয়ের উত্তরাধিকারী করেছিলাম ভিন্ন এক সম্প্রদায়কে। [সুরা দুখান : ২৫-২৮]
ষোড়শ হিজরি সনের সফর মাসেই (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) মাদায়েন বিজিত হয়।
সাদ রাযি. ইসলামের দাওয়াত দিতে হজরত সালমান রাযি.-কে পারসিকদের কাছে প্রেরণ করেন। প্রত্যুত্তরে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ ইসলামগ্রহণের পরিবর্তে জিজিয়া প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মাদায়েনে মুসলিম বাহিনী প্রভূত গনিমত-সম্পদ লাভ করে। কিন্তু ইসলামের এই মহান সৈনিকগণের কেউ গনিমতের অবাধ প্রাচুর্য সত্ত্বেও তা থেকে এক দিরহাম পরিমাণ সম্পদও আত্মসাৎ করার চিন্তা করেননি। ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন, মুসলিম বাহিনী যখন মাদায়েন জয় করে এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ জমা করে, তখন জনৈক যোদ্ধা একটি বাক্স নিয়ে এসে দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে জমা দেন। বাক্সটি দেখে দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও তার সঙ্গীরা মন্তব্য করে, এত মূল্যবান বাক্স আমরা কখনো দেখিনি; এর সমমূল্যের বা কাছাকাছি মূল্যের কোনো সম্পদও এর পূর্বে আমাদের কাছে জমা হয়নি।
এরপর তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, আপনার পরিচয় কী? উত্তরে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদেরকে আমার পরিচয় দেবো না। আল্লাহর প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস না থাকলে আমি এ বাক্সটি তোমাদের কাছে নিয়ে আসতাম না। সকলে বুঝতে পারে যে, তিনি কোনো মহান ব্যক্তি হবেন। তারা পুনরায় তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেন, না, আল্লাহর শপথ! আমার প্রশংসা করবে বলে আমি তোমাদেরকে বা অন্য কাউকে আমার পরিচয় দেবো না। বরং আমি আল্লাহর প্রশংসা করব এবং আল্লাহপ্রদত্ত আজর ও সাওয়াবে সন্তুষ্ট থাকব। তিনি চলে গেলে লোকেরা তার অজান্তে তার অনুসরণ করে। তিনি যখন তার সঙ্গীদের কাছে পৌঁছান, তখন তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে যে, তিনি হলেন সাহাবি আমির বিন আবদে কায়স রাযি.।
বর্ণিত আছে, কাদিসিয়ার মহান সেনাপতি হজরত সাদ বিন আবু ওয়াককাস রাযি. কাদিসিয়ার অভিযাত্রীদের সম্বন্ধে বলতেন, আল্লাহর শপথ! নিঃসন্দেহে এ বাহিনী অত্যুচ্চ ঈমান ও আমানত এবং সততা ও বিশ্বস্ততার অধিকারী। যদি বদরের অভিযাত্রীদের মর্যাদা পূর্ব হতেই সুনির্ধারিত না হতো, তাহলে আমি বলতাম, আল্লাহর শপথ! এরা বদরিদের ন্যায় মর্যাদার অধিকারী। আমি অনেক সম্প্রদায়কে দেখেছি অর্জিত সম্পদ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদবিসংবাদে জড়িয়ে পড়তে; কিন্তু এদের (মাদায়েনে প্রবেশকারী কাদিসিয়ার যোদ্ধাদের) ক্ষেত্রে আমি কোনো ধরনের বিবাদবিসংবাদের কথা শুনিনি, ধারণাও করিনি।
পারস্য-কিসরার রাজপ্রাসাদ হতে মুসলিম বাহিনী যে সম্পদ লাভ করে, তা ছিল মানে ও পরিমাণে অবিশ্বাস্য। কিন্তু তারা সব সম্পদ বায়তুল মালে জমা করে দেয়।
আল্লাহর শপথ! নিঃসন্দেহে এ এক বিরল বিস্ময়কর ঘটনা! দজলা পাড়ি দেওয়ার চেতেও বিস্ময়কর ও অলৌকিক ঘটনা এটি! উন্মুক্ত পৃথিবী ও অবারিত পার্থিব সম্পদভান্ডার এ সকল অভিযাত্রীদের হৃদয়জগতে সামান্য স্পন্দনও সৃষ্টি করতে পারেনি। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, আল্লাহর কাছে যা আছে, তাই শ্রেয়তর ও স্থায়ী। সকল প্রশংসা ও অনুগ্রহ কেবল আল্লাহর তরে।
পারস্য অভিযানে প্রাপ্ত সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ যখন খলিফা উমর রাযি.-এর কাছে পৌঁছায় এবং বায়তুল মালে জমা হয়, তখন উমর রাযি. কাঁদতে থাকেন। খলিফাকে কাঁদতে দেখে হজরত আবদুর রহমান বিন আওফ রাযি. জিজ্ঞেস করেন, 'আমিরুল মুমিনিন! কাঁদছেন কেন?! আল্লাহর শপথ! এখন তো শোকর ও কৃতজ্ঞতার মুহূর্ত।'
উত্তরে উমর রাযি. বলেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি এজন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি এ কারণে যে, যাদেরকেই আল্লাহ তাআলা এসব বিলাস-সম্পদ দান করেছেন, তারাই পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়েছে। আর যারাই হিংসা-বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়েছে, আল্লাহ তাদেরকে পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে দিয়েছেন।' (১২৬)
টিকাঃ
১২৫. মালিক বিন আমির নামক জনৈক মুসলিম যোদ্ধার একটি বাটি দজলা পাড়ি দেওয়ার সময় নদীতে পড়ে গিয়েছিল। তিনি তখনই আল্লাহর কাছে দোয়া করেন-হে আল্লাহ, আমার সঙ্গীদের মধ্যে আমার পরিণতি যেন এমন না হয় যে, আমার সামানটি হারিয়ে যাবে। পরে বাটিটি নদীর ওপারে পাওয়া যায় এবং অন্যরা তা উঠিয়ে মালিক বিন আমিরকে ফেরত দেয়। দ্রষ্টব্য: ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৬৪।
১২৬. ইবনে জারির তাবারি, তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ৪/৩০ ও ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৬৯।
📄 জালুলা ও হুলওয়ান বিজয়
পারস্য সম্রাট ইয়াযদিগার্দ ও পরাজিত পারসিক বাহিনীর অবশিষ্ট সৈন্যগণ মাদায়েন থেকে প্রায় একশ মাইল দূরে হুলওয়ানে আশ্রয় নেয়। এরপর সেখান থেকে পারসিক বাহিনীর একটি অংশ অগ্রসর হয়ে জালুলায় সমবেত হয়। জালুলা ছিল পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি দুর্গ। নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও দুর্ভেদ্য করে তোলার জন্য পারসিকরা পরিখার বাইরে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে মাইনের মতো করে লোহার পেরেক বিছিয়ে রেখেছিল।
সংবাদ জানতে পেরে মুসলিম সেনাপতি সাদ রাযি. খলিফা উমর রাযি.-কে বিস্তারিত অবহিত করেন। এরপর তিনি খলিফার নির্দেশনা অনুযায়ী হাশিম বিন উওবা রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশকে জালুলায় প্রেরণ করেন।
জালুলায় পৌঁছে মুসলিম বাহিনী পারসিকদের অবরোধ করে। অবরুদ্ধ অবস্থায় কেটে যায় প্রায় তিন মাস। এ সময় পারসিকরা মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে এসে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ চালাত। তিন মাসে প্রায় আশিব্বার উভয় বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং প্রতিবারই মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। এরইমধ্যে একদিন পারসিক বাহিনী যুদ্ধ করার জন্য বেরিয়ে এলে আল্লাহ পাকের কুদরতে প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু শুরু হয় এবং এর পুরো নগরী অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। গভীর অন্ধকারে পারসিক সেনারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং অনেকেই পরিখায় পড়ে যায়। বিষয়টি অবগত হয়ে মুসলিম সেনারা বজ্র নিনাদে পারসিক বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধের প্রচণ্ডতায় ওদিনের লড়াইকে কাদিসিয়া যুদ্ধের শেষ দিনের লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। অবশেষে হযরত কাকা বিন আমর রাযি. পরিখা অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশের পথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এরপর মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে পারসিক মুশরিকরা নিহত হতে থাকে এবং বিজয় মুসলিম বাহিনীর পদ চুম্বন করে। জালুলার যুদ্ধে পারসিক বাহিনীর প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিহত হয়। ষোড়শ হিজরির সনের জিলকদ মাসে (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) জালুলা বিজিত হয়। জালুলায় পারসিক বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে সম্রাট ইয়াযদিগার্দ হলওয়ান ছেড়ে রায় নগরীতে চলে যান।
এরপর কাকা রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ হলওয়ানে অভিযান পরিচালনা করে নগরীটি জয় করে নেয়।
মুসলিম বাহিনীর আরেকটি অংশ দজলার তীরে অবস্থিত তিকরিত, মসুল ও নিনাবেহ (Nineveh) নগরী জয় করে। আরেক অংশ জয় করে ফোরাত নদীর তীরে হীতো ও কারকিসিয়া (Circesium) নগরী। তৃতীয় আরেকটি দল জয় করে উবুল্লা, শা্ত আল আরব (Shatt al-Arab) ও আহওয়াজ (Ahvaz) নগরী। জালুলা যুদ্ধের চৌদ্দ মাস পর সতেরোশ হিজরিতে (৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে) মুসলিম বাহিনী কুফা নগরীতে শিবির স্থাপন করে এবং কুফাকে নিজেদের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি নির্ধারণ করে। বিজিত অন্যান্য অঞ্চলে কেবল প্রতিরক্ষা ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। এরপর আরবের প্রতিটি গোত্রের অধিবাসীরা কুফার বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন শুরু করে। খলিফা উমর রাযি. সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাযি.-কে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেন।
📄 রামাহুরমুয বিজয়
সম্রাট ইয়াযদিগার্দের প্রচেষ্টায় কিছুদিন পর পারসিকরা আরও একবার সংগঠিত হতে শুরু করে। এবার তারা হরমুযানের নেতৃত্বে রামাহুরমুয এলাকায় সমবেত হয়। রুস্তমের মৃত্যুর পর হরমুযান ছিল তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠতম সেনাপতি।
সংবাদ পেয়ে কুফার গভর্নর সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাযি. খলিফা উমর রাযি.-কে বিস্তারিত অবহিত করেন। খলিফা সাদ রাযি.-কে নুমান বিন মুকাররিন রাযি.-এর নেতৃত্বে কুফা থেকে একটি বাহিনী প্রেরণের নির্দেশ দেন আর বসরার গভর্নর আবু মুসা আশআরি রাযি.-কে সাহল বিন আদি রাযি.-এর নেতৃত্বে বসরা থেকে একটি বাহিনী প্রেরণের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি খলিফা নির্দেশ দেন যে, উভয় বাহিনী মিলিত হওয়ার পর সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব থাকবে আবু সাবরা বিন আবু রুহম রাযি.-এর হাতে।
নির্দেশমতো নুমান বিন মুকাররিন রাযি. কুফার বাহিনী নিয়ে রামাহুরমুয অভিমুখে রওনা হন। মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে হরমুযান রামাহুরমুয ছেড়ে বেরিয়ে এসে আরবাক অঞ্চলে উপস্থিত হয়। আরবাকে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। হরমুযান পালিয়ে আশ্রয় নেয় সুসতার (১২৭) নগরীতে। নুমান বিন মুকাররিনও হরমুযানকে পাকড়াও করতে সুসতার অভিমুখে রওনা হন।
অপরদিকে সাহল বিন আদি রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন বসরার বাহিনী রামাহুরমুয অভিমুখে রওনা হয়ে ততক্ষণে আহওয়াযে পৌঁছেছিল। তাদের কাছে যখন সংবাদ পৌঁছায় যে, হরমুযান এখন সুসতারে আশ্রয় নিয়েছে, তখন তারা গন্তব্য পরিবর্তন করে সুসতার অভিমুখে রওনা হয়।
টিকাঃ
১২৭. সুসতার: বর্তমান ইরানের খোজেস্তান প্রদেশের অন্তর্গত আহওয়ায নগরীর উত্তরে অবস্থিত একটি নগরীর নাম সুসতার (Shushtar)। ফার্সিতে নগরীটির নাম شوشتر (শুশতার), আর আরবিতে تُستر (তুসতার)।
📄 সুসতারের যুদ্ধ
মুসলিম বাহিনীর উভয় অংশ সুসতারে এসে মিলিত হয় এবং খলিফার নির্দেশমতো হজরত আবু সাবরা রাযি. পুরো বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। আবু সাবরা রাযি. খলিফার কাছে আরও সৈন্যপ্রেরণের আবেদন জানালে খলিফার নির্দেশে বসরার গভর্নর আবু মুসা আশআরি রাযি. আরও কিছু সৈন্য নিয়ে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় ত্রিশ হাজার। এরপর মুসলিম বাহিনী নগরীটি অবরোধ করে।
উচ্চভূমিতে অবস্থিত সুসতার ছিল তৎকালীন পারস্যের অন্যতম প্রাচীন, বৃহৎ, সুরক্ষিত ও দুর্ভেদ্য নগরী। প্রায় দেড় লক্ষ পারসিক সৈন্য তখন সুসতারে অবস্থান করছিল। নগরীর চারপাশে ছিল সুউচ্চ নগরপ্রাচীর। নগরপ্রাচীর ছিল দু-স্তরবিশিষ্ট, দুই প্রাচীরের মাঝে বেশ প্রশস্ত খালি জায়গা ছিল। নগরপ্রাচীরের স্থানে স্থানে বুরুজ বা পর্যবেক্ষণ-চৌকি নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখান থেকে পারসিক সৈন্যরা সহজেই বাইরে অবস্থানরত মুসলিম সৈন্যদের লক্ষ করে তির নিক্ষেপ করতে পারত। কিন্তু মুসলিম সৈন্যরা তির নিক্ষেপ করলেও তা এত উঁচুতে পৌঁছত না। পারসিক রীতি অনুযায়ী নগরপ্রাচীরের চারপাশে ছিল সুগভীর পরিখা। তবে অন্যান্য পরিখার চেয়ে সুসতারের পরিখার ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, পরিখাটি পানিতে পূর্ণ ছিল। তাই মুসলিম সৈন্যদের পক্ষে তা পাড়ি দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা অত্যন্ত কঠিন বিবেচিত হচ্ছিল। নগরীর এক পাশে কিছু স্থানে পরিখা না থাকলেও সেখানে প্রচুর সৈন্যসমাবেশ করা হয়েছিল। সেদিক দিয়ে কেউ নগরীতে প্রবেশের চেষ্টা করলেই প্রতিপক্ষের তিরবৃষ্টির মুখে পড়তে হতো। নগরীর অভ্যন্তরে যথেষ্ট পরিমাণ আহারসামগ্রী ও অন্যান্য রসদসামগ্রীর ব্যবস্থা ছিল। এসব কারণে দীর্ঘ দিন অবরোধ করে রাখার পরও সুসতারে অবস্থানরত পারসিক সৈন্যদের মাঝে মোটেও দুর্বলতা পরিলক্ষিত হচ্ছিল না।
জালুলার মতো সুসতারেও পারসিক সৈন্যরা মাঝে-মধ্যেই বেরিয়ে এসে মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালাত এবং বিলম্ব না করে দ্রুত সরে পড়ত। এভাবে তারা আশিবার মুসলিম বাহিনীর ওপর হামলা চালায়। প্রতিটি সংঘর্ষে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করলেও পারসিকরা দ্রুত সটকে পড়ার কারণে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে সুসতার অবরোধ প্রায় আঠারো মাস দীর্ঘায়িত হয়।