📄 চতুর্থ দিন: কাদিসিয়া দিবস
মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দ এ সময় একটানা যুদ্ধ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কারণ, ইতিমধ্যে পারসিক-শক্তির মধ্যে ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। কা'কা' রাযি.-ও পূর্বের ন্যায় মুসলিম বাহিনীর উদ্যম বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট ছিলেন। এদিন কা'কা' ও তার সঙ্গীগণ পারসিক সেনাপতি রুস্তমকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন এবং সফল হন। রুস্তম নিহত হওয়ায় পারস্য-বাহিনীর মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে ঐতিহাসিক তাবারি রহ. আবাসি গোত্রের জনৈক ব্যক্তির বরাতে লিখেছেন-
কাদিসিয়ার দিন পরাজিত হওয়ার পর পারসিক বাহিনী এমন বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল, যা ইতিপূর্বে কোনো জাতি হয়নি। তারা নির্বিচারে নিহত হতে থাকে। এমনকি যখন কোনো মুসলিম' সৈন্য কোনো পারসিক সৈন্যকে আহ্বান করত, সে মুসলিম সৈন্যের সামনে দাঁড়িয়ে যেত এবং মুসলিম সৈন্য তাকে সহজেই হত্যা করত। এমনও হয়েছে যে, মুসলিম সৈন্য পারসিক সৈন্যের অস্ত্র নিয়ে তার অস্ত্র দিয়েই তাকে হত্যা করেছে। আবার এমনও হয়েছে যে, দুজন পারসিক সৈন্যকে আদেশ করা হয়েছে, তোমরা একে অপরকে হত্যা কর। তারা নির্দ্বিধায় নির্দেশ পালন করেছে। কয়েকজনকে একসঙ্গে একই নির্দেশ প্রদান করা হলে তারাও তা পালন করেছে। (১২৪)
কাদিসিয়া দিবসের আছরের সময় হওয়ার পূর্বেই বিজয় মুসলিম বাহিনীর পদচুম্বন করে। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সাড়ে আট হাজার সৈন্য শহিদ হয়। অপরদিকে পারসিক বাহিনীর নিহতের সংখ্যা ছিল গণনাতীত।
প্রধান সেনাপতি সাদ রাযি. বিজয়ের বিস্তারিত বিবরণসহ খলিফাতুল মুসলিমিন উমর রাযি.-এর কাছে বার্তা প্রেরণ করেন। তিনি লেখেন-
হামদ ও সালাতের পর, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পারসিকদের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছেন এবং দীর্ঘ যুদ্ধ ও প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতির পর তাদেরকে সেই পরিণতির মুখোমুখিই করেছেন, যার মুখোমুখি ইতিপূর্বে তাদের স্বধর্মীয়রা হয়েছিল।
তারা এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলায় এত বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়েছিল যে, ইতিপূর্বে কেউ তা দেখেনি। কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহে তা তাদের কোনো কাজে আসেনি। বরং তাদের সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মুসলমানদের দান করেছেন। যুদ্ধশেষে মুসলিম বাহিনী তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে বিভিন্ন নদীনালা, বন-প্রান্তর ও ঘাঁটিতে গিয়েছে। মুসলিম বাহিনীর সাঈদ বিন উবায়দ আল-কারি ও অমুক অমুক শাহাদাত বরণ করেছেন। এ ছাড়াও এমন অনেক মুসলিম মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেছেন, যাদের নাম-পরিচয় আমরা জানি না; কিন্তু আল্লাহ তাদের সকলের পরিচয় জানেন। রাতের আঁধারে তারা মধুমক্ষিকার গুঞ্জরনের ন্যায় গুনগুন করে কুরআন তেলাওয়াত করত। তারা ছিল মুসলিম বাহিনীর সিংহ। বনের সিংহও সাহস ও বীরত্বে তাদের সঙ্গে তুল্য নয়। মুসলিম বাহিনীর যারা শহিদ হয়েছে এবং যারা জীবিত রয়েছে, উভয় দলের মাঝে শাহাদাতের ফজিলত ব্যতীত কোনো স্তর-পার্থক্য নেই। একদলের ভাগ্যে (কাদিসিয়ার রণক্ষেত্রে) শাহাদাতের গৌরব লেখা ছিল, অপরদলের ভাগ্যে ছিল না।
যুদ্ধশেষে মুসলিম বাহিনীর সদস্যদের মাঝে গনিমত-সম্পদ বণ্টন করা হয়। প্রত্যেকেই প্রচুর সম্পদ লাভ করে।
এরপর খলিফার নির্দেশে মুসলিম বাহিনী উত্তর দিকে মাদায়েনের পথে অগ্রসর হয়। উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হওয়া ব্যতিরেকেই তারা কুফা নগরী জয় করে। অভিযান অব্যাহত রেখে একপর্যায়ে মুসলিম বাহিনী পৌঁছায় বাহুরাসীর নগরীতে। মাদায়েনের আগে এটিই ছিল শেষ দুর্গ এবং অতি সুরক্ষিত একটি নগরী। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস মুসলিম বাহিনী নগরীটি অবরোধ করে রাখে। এখানেই মুসলিম বাহিনী কাদিসিয়া যুদ্ধে লব্ধ পারসিকদের অস্ত্রশস্ত্র প্রথমবারের মতো ব্যবহার করে এবং দুর্গপ্রাচীর ধ্বংস করতে মিনজানিক ব্যবহার করে।
টিকাঃ
১২৪. ইবনে জারির তাবারি, তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ৩/৫৬৯।
📄 একটি চমকপ্রদ ঘটনা
ঐতিহাসিক তাবারি রহ. উনায়স বিন হুলায়স-সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন-
আমরা বাহুরাসীর নগরী অবরোধ করে রেখেছিলাম। একদিন অবরুদ্ধ পারসিকদের পক্ষ হতে জনৈক দূত আগমন করল। সে বলল, আমাদের শাসক তোমাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে রাজি আছেন এবং তোমাদেরকে বলেছেন, তোমরা কি এই শর্তে সন্ধিচুক্তি করতে রাজি আছ যে, আমাদের এখান থেকে দজলা পর্যন্ত ভূখণ্ড ও পাহাড় আমাদের অধিকারে থাকবে আর দজলা থেকে তোমাদের পাহাড়ি এলাকা পর্যন্ত বাকি পুরো এলাকা তোমাদের অধিকারে থাকবে? তোমরা কি এতেও তুষ্ট হবে না?! আল্লাহ তোমাদের উদর পূর্ণ না করুন!
দূতকে উত্তর প্রদানের জন্য আমাদের মধ্য হতে আবু মুফাজ্জার ইবনুল আসওয়াদ বিন কুতবা অগ্রসর হলেন। আল্লাহ তাআলা তার জবান হতে এমন এক উত্তর বের করে দিলেন, যা না আমরা জানি, না তিনি জানেন! দূত ফিরে গেল। কিছুক্ষণ পর আমরা দেখতে পেলাম, পারসিকরা নগরী ছেড়ে পালিয়ে নদীপথে মাদায়েনে চলে যাচ্ছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, 'আবু মুফাজ্জার! আপনি দূতকে কী বলেছেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি নিজেও জানি না যে, কী বলেছি। এতটুকু মনে আছে যে, আমার ওপর এক আশ্চর্য প্রশান্তি ও আত্মসমাহিতভাব বিরাজ করছিল। আর আমার বিশ্বাস-আমার মুখ থেকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এমন কোনো উত্তরই বের হয়েছে, যা কল্যাণকর ছিল।' তারপরও সকলে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করছিল—কীভাবে আবু মুফাজ্জারের একটিমাত্র কথায় বাহুরাসীর নগরীর প্রতিরক্ষা-বাহিনী নগরী ফেলে মাদায়েনে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলো?!
কিছুক্ষণ পর জনৈক দুর্গবাসী চিৎকার করে নিরাপত্তা প্রার্থনা করল। সে বলল, 'নগরঅভ্যন্তরে কেউ অবশিষ্ট নেই; তারপরও আপনারা কেন ভেতরে প্রবেশ করছেন না?!' লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল, 'পারসিকরা পালিয়ে গেল কেন?'
সে উত্তর দিলো, আমাদের শাসক আপনাদের কাছে একটি সন্ধিপ্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। আপনারা তাকে উত্তর দিয়েছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সন্ধি হবে না, যতক্ষণ না আমরা কুছা নগরীর জাম্বির (কাগজি লেবু) দিয়ে আফরিযিন ফুলের মধু পান করব। এ উত্তর শুনে আমাদের শাসক বলেছেন, হায়! হায়! আল্লাহর শপথ! তাদের মুখে তো ফিরেশতারা কথা বলছে! ফিরেশতারাই আরবদের পক্ষ থেকে আমাদেরকে উত্তর দিচ্ছে। আর এমনটি না হয়ে থাকলে এই লোকটির জবানে ইলহাম হচ্ছে, যেন আমরা এখান থেকে চলে যাই। এরপর সকলে পালিয়ে যায়!
বাহুরাসীর নগরী ষোড়শ হিজরি সনের সফর মাসে (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) বিজিত হয়।
📄 অশ্বপৃষ্ঠে দজলা পাড়ি!
তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী মাদায়েনে পৌঁছতে মুসলিম বাহিনীর সামনে তখন বাধা কেবল দজলা নদী। দজলা ছিল ছয় মিটার গভীর একটি প্রশস্ত ও খরস্রোতা নদী। মুসলিম বাহিনীর সদস্যদের প্রবল উদ্দীপনা সত্ত্বেও সেনাপতি সাদ প্রথমে দজলা পাড়ি দিতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। এ সময় নওমুসলিম একদল পারসিক নাগরিক এসে সাদ রাযি.-কে দজলার তুলনামূলক অগভীর একটি অংশ দেখিয়ে দেয়। কিন্তু এরপরও তিনি দ্বিধায় ভুগছিলেন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা তার দ্বিধা দূর করে দেন এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেন, প্রথমে পুরো বাহিনীর পরিবর্তে ক্ষুদ্র একটি অংশ নদী পার হবে। তিনি ঘোষণা করেন, কারা আমাদের জন্য নদীর অপর তীরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রথমে নদী পাড়ি দিতে রাজি আছ? তখন কাকা' বিন আমর রাযি.-এর সহোদর আছিম রাযি. অগ্রসর হন। তার সঙ্গে এগিয়ে আসেন আরও ছয়শ জানবাজ দুঃসাহসী মুসলিম সৈন্য। আছিম ও তার সঙ্গীরা এক বিরল দুঃসাহসী উদ্যোগ নেন এবং ঘোড়ার পিঠে চড়েই নেমে পড়েন খরস্রোতা দজলার বুকে।
মুসলিম সৈন্যদেরকে অশ্বপিঠে চড়েই দজলায় নামতে দেখে পারসিকরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। তারা মুসলিম বাহিনীকে বাধা দিতে চাইলেও পরাজিত হয় এবং মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই নদীর পূর্ব তীরে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এরপর সেনাপতি সাদ রাযি. পুরো বাহিনীকে দজলা পাড়ি দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সকলকে এই দোয়া পাঠ করতে বলেন- نَسْتَعِيْنُ بِاللهِ وَنَتَوَكَّلْ عَلَيْهِ ، حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ الْعَلِيُّ الْعَظِيمِ. আমরা আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করছি এবং তার প্রতিই ভরসা রাখছি। আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট আর তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক। মহান-মহীয়ান আল্লাহপ্রদত্ত শক্তিসামর্থ্য ব্যতিরেকে আমাদের কোনো শক্তিসামর্থ্য নেই। সেনাপতির আদেশে মুসলিম বাহিনীর সকলে নদীবক্ষে নেমে পড়ে। নদী পাড়ি দেওয়ার সময় সকলে নিশ্চিন্তে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। সাদ রাযি. সকলকে দুজন দুজন করে একসঙ্গে চলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। খরস্রোতা দজলা পাড়ি দেওয়ার সময় মুসলিম বাহিনীর কোনো সদস্য পানিতে ডুবেনি, তাদের কোনো সরঞ্জামও হারায়নি। (১২৫) এ দৃশ্য দেখে পারসিক সৈন্যরা পরস্পর বলাবলি করতে থাকে, আল্লাহর শপথ! তোমরা তো কোনো মানুষের বিরুদ্ধে লড়ছ না; তোমরা যে যুদ্ধ করছ একদল জিনের বিরুদ্ধে! নদী পাড়ি দেওয়ার সময় সেনাপতি সাদ রাযি.-এর পাশে ছিলেন বিখ্যাত সাহাবি সালমান ফারসি রাযি.। তারা দুজনও ঘোড়ার পিঠে চড়ে নদী পাড়ি দেওয়ার সময় পরস্পর কথা বলছিলেন। এ সময় সাদ বলেন, 'এ তো পরাক্রমশালী মহাজ্ঞানী আল্লাহ তাআলার ফয়সালা। আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট। তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক! আল্লাহর শপথ! যদি সৈন্যদলের মধ্যে কোনো সত্যদ্রোহী না থাকে এবং যদি পুণ্যের ওপর প্রাধান্য পায় এমন পাপ না থাকে, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ তার বন্ধুদেরকে সাহায্য করবেন, তার দ্বীনকে বিজয়ী করবেন এবং অবশ্যই তার শত্রুদের পরাজিত করবেন।'
তখন সালমান রাযি. তাকে বলেন, 'ইসলাম চির-তরুণ ধর্ম। আল্লাহর শপথ! ইসলামের অনুসারীদের জন্য যেভাবে স্থলভাগ অনুগত হয়ে গেছে, অনুগত হয়ে গেছে জলভাগও। যে মহান সত্তার হাতে আমি সালমানের প্রাণ, তার শপথ করে বলছি—মুসলিম বাহিনী যেমন দলবদ্ধভাবে পানিতে নেমেছে, তেমন দলবদ্ধভাবেই তীরে উঠবে।'
মুসলিম বাহিনীর আগমন-সংবাদ পেয়ে কিসরাসহ পারস্য সাম্রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও মাদায়েনের অধিবাসীরা মাদায়েন ছেড়ে পালিয়ে যায়। মুসলিম বাহিনী মাদায়েনে প্রবেশ করে দেখতে পায়, পুরো নগরী জনশূন্য। কিসরার প্রাসাদের কাছে পৌঁছে হজরত সাদ রাযি. এই আয়াত তেলাওয়াত করেন— كَمْ تَرَكُوا مِنْ جَنَّتٍ وَّعُيُونٍ وَّ زُرُوعٍ وَّمَقَامٍ كَرِيمٍ وَّنَعْمَةٍ كَانُوا فِيهَا فَكِهِينَ كَذَلِكَ وَأَوْرَثْنَهَا قَوْمًا آخَرِيْنَ
তারা পশ্চাতে রেখে গিয়েছে কত উদ্যান ও ঝরনা! কত শস্যক্ষেত্র ও সুরম্য বসতবাড়ি! এবং কত বিলাসসামগ্রী, যা নিয়ে তারা আনন্দ-ফুর্তি করত। এরূপই হয়েছিল তাদের পরিণাম। আর আমি এই সমুদয়ের উত্তরাধিকারী করেছিলাম ভিন্ন এক সম্প্রদায়কে। [সুরা দুখান : ২৫-২৮]
ষোড়শ হিজরি সনের সফর মাসেই (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) মাদায়েন বিজিত হয়।
সাদ রাযি. ইসলামের দাওয়াত দিতে হজরত সালমান রাযি.-কে পারসিকদের কাছে প্রেরণ করেন। প্রত্যুত্তরে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ ইসলামগ্রহণের পরিবর্তে জিজিয়া প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মাদায়েনে মুসলিম বাহিনী প্রভূত গনিমত-সম্পদ লাভ করে। কিন্তু ইসলামের এই মহান সৈনিকগণের কেউ গনিমতের অবাধ প্রাচুর্য সত্ত্বেও তা থেকে এক দিরহাম পরিমাণ সম্পদও আত্মসাৎ করার চিন্তা করেননি। ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন, মুসলিম বাহিনী যখন মাদায়েন জয় করে এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ জমা করে, তখন জনৈক যোদ্ধা একটি বাক্স নিয়ে এসে দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছে জমা দেন। বাক্সটি দেখে দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও তার সঙ্গীরা মন্তব্য করে, এত মূল্যবান বাক্স আমরা কখনো দেখিনি; এর সমমূল্যের বা কাছাকাছি মূল্যের কোনো সম্পদও এর পূর্বে আমাদের কাছে জমা হয়নি।
এরপর তারা তাকে জিজ্ঞেস করে, আপনার পরিচয় কী? উত্তরে তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদেরকে আমার পরিচয় দেবো না। আল্লাহর প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস না থাকলে আমি এ বাক্সটি তোমাদের কাছে নিয়ে আসতাম না। সকলে বুঝতে পারে যে, তিনি কোনো মহান ব্যক্তি হবেন। তারা পুনরায় তার পরিচয় জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেন, না, আল্লাহর শপথ! আমার প্রশংসা করবে বলে আমি তোমাদেরকে বা অন্য কাউকে আমার পরিচয় দেবো না। বরং আমি আল্লাহর প্রশংসা করব এবং আল্লাহপ্রদত্ত আজর ও সাওয়াবে সন্তুষ্ট থাকব। তিনি চলে গেলে লোকেরা তার অজান্তে তার অনুসরণ করে। তিনি যখন তার সঙ্গীদের কাছে পৌঁছান, তখন তারা তাদেরকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে যে, তিনি হলেন সাহাবি আমির বিন আবদে কায়স রাযি.।
বর্ণিত আছে, কাদিসিয়ার মহান সেনাপতি হজরত সাদ বিন আবু ওয়াককাস রাযি. কাদিসিয়ার অভিযাত্রীদের সম্বন্ধে বলতেন, আল্লাহর শপথ! নিঃসন্দেহে এ বাহিনী অত্যুচ্চ ঈমান ও আমানত এবং সততা ও বিশ্বস্ততার অধিকারী। যদি বদরের অভিযাত্রীদের মর্যাদা পূর্ব হতেই সুনির্ধারিত না হতো, তাহলে আমি বলতাম, আল্লাহর শপথ! এরা বদরিদের ন্যায় মর্যাদার অধিকারী। আমি অনেক সম্প্রদায়কে দেখেছি অর্জিত সম্পদ নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিবাদবিসংবাদে জড়িয়ে পড়তে; কিন্তু এদের (মাদায়েনে প্রবেশকারী কাদিসিয়ার যোদ্ধাদের) ক্ষেত্রে আমি কোনো ধরনের বিবাদবিসংবাদের কথা শুনিনি, ধারণাও করিনি।
পারস্য-কিসরার রাজপ্রাসাদ হতে মুসলিম বাহিনী যে সম্পদ লাভ করে, তা ছিল মানে ও পরিমাণে অবিশ্বাস্য। কিন্তু তারা সব সম্পদ বায়তুল মালে জমা করে দেয়।
আল্লাহর শপথ! নিঃসন্দেহে এ এক বিরল বিস্ময়কর ঘটনা! দজলা পাড়ি দেওয়ার চেতেও বিস্ময়কর ও অলৌকিক ঘটনা এটি! উন্মুক্ত পৃথিবী ও অবারিত পার্থিব সম্পদভান্ডার এ সকল অভিযাত্রীদের হৃদয়জগতে সামান্য স্পন্দনও সৃষ্টি করতে পারেনি। তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, আল্লাহর কাছে যা আছে, তাই শ্রেয়তর ও স্থায়ী। সকল প্রশংসা ও অনুগ্রহ কেবল আল্লাহর তরে।
পারস্য অভিযানে প্রাপ্ত সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ যখন খলিফা উমর রাযি.-এর কাছে পৌঁছায় এবং বায়তুল মালে জমা হয়, তখন উমর রাযি. কাঁদতে থাকেন। খলিফাকে কাঁদতে দেখে হজরত আবদুর রহমান বিন আওফ রাযি. জিজ্ঞেস করেন, 'আমিরুল মুমিনিন! কাঁদছেন কেন?! আল্লাহর শপথ! এখন তো শোকর ও কৃতজ্ঞতার মুহূর্ত।'
উত্তরে উমর রাযি. বলেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি এজন্য কাঁদছি না। আমি কাঁদছি এ কারণে যে, যাদেরকেই আল্লাহ তাআলা এসব বিলাস-সম্পদ দান করেছেন, তারাই পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়েছে। আর যারাই হিংসা-বিদ্বেষে জড়িয়ে পড়েছে, আল্লাহ তাদেরকে পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে দিয়েছেন।' (১২৬)
টিকাঃ
১২৫. মালিক বিন আমির নামক জনৈক মুসলিম যোদ্ধার একটি বাটি দজলা পাড়ি দেওয়ার সময় নদীতে পড়ে গিয়েছিল। তিনি তখনই আল্লাহর কাছে দোয়া করেন-হে আল্লাহ, আমার সঙ্গীদের মধ্যে আমার পরিণতি যেন এমন না হয় যে, আমার সামানটি হারিয়ে যাবে। পরে বাটিটি নদীর ওপারে পাওয়া যায় এবং অন্যরা তা উঠিয়ে মালিক বিন আমিরকে ফেরত দেয়। দ্রষ্টব্য: ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৬৪।
১২৬. ইবনে জারির তাবারি, তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ৪/৩০ ও ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৬৯।
📄 জালুলা ও হুলওয়ান বিজয়
পারস্য সম্রাট ইয়াযদিগার্দ ও পরাজিত পারসিক বাহিনীর অবশিষ্ট সৈন্যগণ মাদায়েন থেকে প্রায় একশ মাইল দূরে হুলওয়ানে আশ্রয় নেয়। এরপর সেখান থেকে পারসিক বাহিনীর একটি অংশ অগ্রসর হয়ে জালুলায় সমবেত হয়। জালুলা ছিল পরিখা দ্বারা পরিবেষ্টিত অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি দুর্গ। নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও দুর্ভেদ্য করে তোলার জন্য পারসিকরা পরিখার বাইরে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে মাইনের মতো করে লোহার পেরেক বিছিয়ে রেখেছিল।
সংবাদ জানতে পেরে মুসলিম সেনাপতি সাদ রাযি. খলিফা উমর রাযি.-কে বিস্তারিত অবহিত করেন। এরপর তিনি খলিফার নির্দেশনা অনুযায়ী হাশিম বিন উওবা রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশকে জালুলায় প্রেরণ করেন।
জালুলায় পৌঁছে মুসলিম বাহিনী পারসিকদের অবরোধ করে। অবরুদ্ধ অবস্থায় কেটে যায় প্রায় তিন মাস। এ সময় পারসিকরা মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে এসে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ চালাত। তিন মাসে প্রায় আশিব্বার উভয় বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং প্রতিবারই মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। এরইমধ্যে একদিন পারসিক বাহিনী যুদ্ধ করার জন্য বেরিয়ে এলে আল্লাহ পাকের কুদরতে প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু শুরু হয় এবং এর পুরো নগরী অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। গভীর অন্ধকারে পারসিক সেনারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং অনেকেই পরিখায় পড়ে যায়। বিষয়টি অবগত হয়ে মুসলিম সেনারা বজ্র নিনাদে পারসিক বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুদ্ধের প্রচণ্ডতায় ওদিনের লড়াইকে কাদিসিয়া যুদ্ধের শেষ দিনের লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করা হয়। অবশেষে হযরত কাকা বিন আমর রাযি. পরিখা অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশের পথে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এরপর মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে পারসিক মুশরিকরা নিহত হতে থাকে এবং বিজয় মুসলিম বাহিনীর পদ চুম্বন করে। জালুলার যুদ্ধে পারসিক বাহিনীর প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিহত হয়। ষোড়শ হিজরির সনের জিলকদ মাসে (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) জালুলা বিজিত হয়। জালুলায় পারসিক বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে সম্রাট ইয়াযদিগার্দ হলওয়ান ছেড়ে রায় নগরীতে চলে যান।
এরপর কাকা রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ হলওয়ানে অভিযান পরিচালনা করে নগরীটি জয় করে নেয়।
মুসলিম বাহিনীর আরেকটি অংশ দজলার তীরে অবস্থিত তিকরিত, মসুল ও নিনাবেহ (Nineveh) নগরী জয় করে। আরেক অংশ জয় করে ফোরাত নদীর তীরে হীতো ও কারকিসিয়া (Circesium) নগরী। তৃতীয় আরেকটি দল জয় করে উবুল্লা, শা্ত আল আরব (Shatt al-Arab) ও আহওয়াজ (Ahvaz) নগরী। জালুলা যুদ্ধের চৌদ্দ মাস পর সতেরোশ হিজরিতে (৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে) মুসলিম বাহিনী কুফা নগরীতে শিবির স্থাপন করে এবং কুফাকে নিজেদের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি নির্ধারণ করে। বিজিত অন্যান্য অঞ্চলে কেবল প্রতিরক্ষা ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। এরপর আরবের প্রতিটি গোত্রের অধিবাসীরা কুফার বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপন শুরু করে। খলিফা উমর রাযি. সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাযি.-কে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেন।