📄 শাম থেকে সহায়ক বাহিনীর আগমন
এ দিন শাম থেকে রওনা হওয়া সহায়ক বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশ কাদিসিয়ায় পৌঁছে যায়। অগ্রবর্তী অংশের নেতৃত্বে ছিলেন হজরত কা'কা' বিন আমর রাযি.। তার সঙ্গে ছিল এক হাজার অশ্বারোহী সৈন্য। আগওয়াছ দিবসের সূর্যোদয়ের সময় তারা যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছায়।
প্রতিপক্ষের অন্তরে ভীতি সঞ্চারের জন্য কা'কা' এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি তার সঙ্গী এক হাজার সৈন্যকে দশ-দশজন করে একশটি ভাগে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক অংশকে বলে দেন, যখন তারা মুসলিম শিবিরের দৃষ্টিপথে পৌঁছে যাবে, তখন একটি অংশ শিবিরে প্রবেশ করবে। প্রথম দশজন নির্ধারিত দূরত্ব অতিক্রম করার পর পরবর্তী দল তাদের অনুগামী হবে। এভাবে একের পর এক দলের আগমনে যে ধূলিঝড়ের সৃষ্টি হবে, তাতে সূর্যের আলো ঢেকে যাবে এবং শত্রুপক্ষের চোখে আগত মুসলিম বাহিনীকে অনেক বড় মনে হবে।
📄 তৃতীয় দিন : আম্মাস দিবস
কা'কা' রাযি.-এর সঙ্গে শাম থেকে রওনা হওয়া সহায়ক বাহিনীর বাকি সদস্যগণ তখনও যুদ্ধক্ষেত্রে এসে পৌঁছায়নি। এদিকে সারাদিনের প্রচণ্ড যুদ্ধের পরও বীর যোদ্ধা কা'কা'র চোখে ঘুম নেই। তিনি সেনাপতিদের সঙ্গে পরামর্শ করে মুসলিম বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধি ও শত্রুপক্ষের মাঝে ভীতি সঞ্চারের জন্য নতুন আরেকটি কৌশল গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। কা'কা' তার এক হাজার অশ্বারোহী সৈনিককে নির্দেশ দেন, তারা যেন অন্ধকারের মধ্যেই সবার অগোচরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে পড়ে এবং যেদিক থেকে সাহায্য আসার কথা, সেদিকে লুকিয়ে থাকে। তিনি এক হাজার সৈন্যকে একশজন করে দশটি ভাগে বিভক্ত করেন এবং নির্দেশ দেন যে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা একদল একদল করে ময়দানে উপস্থিত হবে। প্রত্যুষে অশ্বারোহী সৈন্যগণ নির্দেশনা মোতাবেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে। এরইমধ্যে হাশিম বিন উতবা বিন আবু ওয়াককাসের নেতৃত্বে শামের অবশিষ্ট সহায়ক বাহিনীও পৌঁছে যায়। হাশিম কা'কা'র কৌশলের কথা জানতে পেরে তার সঙ্গীদের নিয়ে একই কৌশল অবলম্বন করেন। পারসিক বাহিনীর সৈন্যদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টিতে এ কৌশল বিরাট ভূমিকা রাখে।
এদিন পারসিক বাহিনীর হাতিগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসে। হাতিগুলোর প্রতিরক্ষার জন্য তারা প্রতিটি হাতির পাশে একদল পদাতিক সৈন্য মোতায়েন করেছিল। হস্তিবাহিনীর প্রত্যাবর্তনে পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সাদ রাযি. নওমুসলিম কয়েকজন পারসিককে তলব করে জিজ্ঞেস করেন, হাতির শরীরে কি এমন কোনো স্থান আছে, যেখানে আঘাত করলে হাতিকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বের করে দেওয়া সম্ভব হবে?
তারা জানায়, হ্যাঁ, চোয়াল ও চোখে আঘাত করতে পারলে হাতিগুলো আর যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো কাজে লাগবে না। সাদ রাযি. তৎক্ষণাৎ কা'কা' ও তার ভাই আছিমকে বার্তা পাঠান, 'তোমরা দুজন হস্তি-বাহিনীর মূল কর্তা শ্বেত হস্তিটিকে শেষ করবে।' আর পদাতিক বাহিনীর প্রধান হামমাল বিন মালিক ও রাবিল বিন আমরকে বার্তা পাঠান, 'তোমরা উভয়ে হস্তিবাহিনীর আরেক প্রধান উট পাঁচড়াবিশিষ্ট উটটিকে শেষ করবে।'
নির্দেশ অনুযায়ী উভয় দল বর্শা নিক্ষেপ করে হাতিদুটির চোখ নষ্ট করতে এবং শুঁড় কেটে ফেলতে সক্ষম হন। ফলে হাতিদুটি বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং আরোহী সৈন্যদের ফেলে দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে। এই হাতিদুটি অন্যান্য হাতিগুলোকে পরিচালনা করত। ফলে সেগুলোও হতবুদ্ধি হয়ে নেতাদ্বয়ের অনুসরণ করে।
আম্মাছ দিবসে দিনরাত একটানা চব্বিশ ঘণ্টা যুদ্ধ চলে।
📄 চতুর্থ দিন: কাদিসিয়া দিবস
মুসলিম বাহিনীর নেতৃবৃন্দ এ সময় একটানা যুদ্ধ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। কারণ, ইতিমধ্যে পারসিক-শক্তির মধ্যে ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। কা'কা' রাযি.-ও পূর্বের ন্যায় মুসলিম বাহিনীর উদ্যম বৃদ্ধি করতে সচেষ্ট ছিলেন। এদিন কা'কা' ও তার সঙ্গীগণ পারসিক সেনাপতি রুস্তমকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন এবং সফল হন। রুস্তম নিহত হওয়ায় পারস্য-বাহিনীর মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতির বিবরণ দিতে গিয়ে ঐতিহাসিক তাবারি রহ. আবাসি গোত্রের জনৈক ব্যক্তির বরাতে লিখেছেন-
কাদিসিয়ার দিন পরাজিত হওয়ার পর পারসিক বাহিনী এমন বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিল, যা ইতিপূর্বে কোনো জাতি হয়নি। তারা নির্বিচারে নিহত হতে থাকে। এমনকি যখন কোনো মুসলিম' সৈন্য কোনো পারসিক সৈন্যকে আহ্বান করত, সে মুসলিম সৈন্যের সামনে দাঁড়িয়ে যেত এবং মুসলিম সৈন্য তাকে সহজেই হত্যা করত। এমনও হয়েছে যে, মুসলিম সৈন্য পারসিক সৈন্যের অস্ত্র নিয়ে তার অস্ত্র দিয়েই তাকে হত্যা করেছে। আবার এমনও হয়েছে যে, দুজন পারসিক সৈন্যকে আদেশ করা হয়েছে, তোমরা একে অপরকে হত্যা কর। তারা নির্দ্বিধায় নির্দেশ পালন করেছে। কয়েকজনকে একসঙ্গে একই নির্দেশ প্রদান করা হলে তারাও তা পালন করেছে। (১২৪)
কাদিসিয়া দিবসের আছরের সময় হওয়ার পূর্বেই বিজয় মুসলিম বাহিনীর পদচুম্বন করে। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সাড়ে আট হাজার সৈন্য শহিদ হয়। অপরদিকে পারসিক বাহিনীর নিহতের সংখ্যা ছিল গণনাতীত।
প্রধান সেনাপতি সাদ রাযি. বিজয়ের বিস্তারিত বিবরণসহ খলিফাতুল মুসলিমিন উমর রাযি.-এর কাছে বার্তা প্রেরণ করেন। তিনি লেখেন-
হামদ ও সালাতের পর, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পারসিকদের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছেন এবং দীর্ঘ যুদ্ধ ও প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতির পর তাদেরকে সেই পরিণতির মুখোমুখিই করেছেন, যার মুখোমুখি ইতিপূর্বে তাদের স্বধর্মীয়রা হয়েছিল।
তারা এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলায় এত বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়েছিল যে, ইতিপূর্বে কেউ তা দেখেনি। কিন্তু আল্লাহর অনুগ্রহে তা তাদের কোনো কাজে আসেনি। বরং তাদের সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে মুসলমানদের দান করেছেন। যুদ্ধশেষে মুসলিম বাহিনী তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে বিভিন্ন নদীনালা, বন-প্রান্তর ও ঘাঁটিতে গিয়েছে। মুসলিম বাহিনীর সাঈদ বিন উবায়দ আল-কারি ও অমুক অমুক শাহাদাত বরণ করেছেন। এ ছাড়াও এমন অনেক মুসলিম মুজাহিদ শাহাদাত বরণ করেছেন, যাদের নাম-পরিচয় আমরা জানি না; কিন্তু আল্লাহ তাদের সকলের পরিচয় জানেন। রাতের আঁধারে তারা মধুমক্ষিকার গুঞ্জরনের ন্যায় গুনগুন করে কুরআন তেলাওয়াত করত। তারা ছিল মুসলিম বাহিনীর সিংহ। বনের সিংহও সাহস ও বীরত্বে তাদের সঙ্গে তুল্য নয়। মুসলিম বাহিনীর যারা শহিদ হয়েছে এবং যারা জীবিত রয়েছে, উভয় দলের মাঝে শাহাদাতের ফজিলত ব্যতীত কোনো স্তর-পার্থক্য নেই। একদলের ভাগ্যে (কাদিসিয়ার রণক্ষেত্রে) শাহাদাতের গৌরব লেখা ছিল, অপরদলের ভাগ্যে ছিল না।
যুদ্ধশেষে মুসলিম বাহিনীর সদস্যদের মাঝে গনিমত-সম্পদ বণ্টন করা হয়। প্রত্যেকেই প্রচুর সম্পদ লাভ করে।
এরপর খলিফার নির্দেশে মুসলিম বাহিনী উত্তর দিকে মাদায়েনের পথে অগ্রসর হয়। উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হওয়া ব্যতিরেকেই তারা কুফা নগরী জয় করে। অভিযান অব্যাহত রেখে একপর্যায়ে মুসলিম বাহিনী পৌঁছায় বাহুরাসীর নগরীতে। মাদায়েনের আগে এটিই ছিল শেষ দুর্গ এবং অতি সুরক্ষিত একটি নগরী। দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস মুসলিম বাহিনী নগরীটি অবরোধ করে রাখে। এখানেই মুসলিম বাহিনী কাদিসিয়া যুদ্ধে লব্ধ পারসিকদের অস্ত্রশস্ত্র প্রথমবারের মতো ব্যবহার করে এবং দুর্গপ্রাচীর ধ্বংস করতে মিনজানিক ব্যবহার করে।
টিকাঃ
১২৪. ইবনে জারির তাবারি, তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ৩/৫৬৯।
📄 একটি চমকপ্রদ ঘটনা
ঐতিহাসিক তাবারি রহ. উনায়স বিন হুলায়স-সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন-
আমরা বাহুরাসীর নগরী অবরোধ করে রেখেছিলাম। একদিন অবরুদ্ধ পারসিকদের পক্ষ হতে জনৈক দূত আগমন করল। সে বলল, আমাদের শাসক তোমাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে রাজি আছেন এবং তোমাদেরকে বলেছেন, তোমরা কি এই শর্তে সন্ধিচুক্তি করতে রাজি আছ যে, আমাদের এখান থেকে দজলা পর্যন্ত ভূখণ্ড ও পাহাড় আমাদের অধিকারে থাকবে আর দজলা থেকে তোমাদের পাহাড়ি এলাকা পর্যন্ত বাকি পুরো এলাকা তোমাদের অধিকারে থাকবে? তোমরা কি এতেও তুষ্ট হবে না?! আল্লাহ তোমাদের উদর পূর্ণ না করুন!
দূতকে উত্তর প্রদানের জন্য আমাদের মধ্য হতে আবু মুফাজ্জার ইবনুল আসওয়াদ বিন কুতবা অগ্রসর হলেন। আল্লাহ তাআলা তার জবান হতে এমন এক উত্তর বের করে দিলেন, যা না আমরা জানি, না তিনি জানেন! দূত ফিরে গেল। কিছুক্ষণ পর আমরা দেখতে পেলাম, পারসিকরা নগরী ছেড়ে পালিয়ে নদীপথে মাদায়েনে চলে যাচ্ছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, 'আবু মুফাজ্জার! আপনি দূতকে কী বলেছেন?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি নিজেও জানি না যে, কী বলেছি। এতটুকু মনে আছে যে, আমার ওপর এক আশ্চর্য প্রশান্তি ও আত্মসমাহিতভাব বিরাজ করছিল। আর আমার বিশ্বাস-আমার মুখ থেকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এমন কোনো উত্তরই বের হয়েছে, যা কল্যাণকর ছিল।' তারপরও সকলে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করছিল—কীভাবে আবু মুফাজ্জারের একটিমাত্র কথায় বাহুরাসীর নগরীর প্রতিরক্ষা-বাহিনী নগরী ফেলে মাদায়েনে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলো?!
কিছুক্ষণ পর জনৈক দুর্গবাসী চিৎকার করে নিরাপত্তা প্রার্থনা করল। সে বলল, 'নগরঅভ্যন্তরে কেউ অবশিষ্ট নেই; তারপরও আপনারা কেন ভেতরে প্রবেশ করছেন না?!' লোকেরা তাকে জিজ্ঞেস করল, 'পারসিকরা পালিয়ে গেল কেন?'
সে উত্তর দিলো, আমাদের শাসক আপনাদের কাছে একটি সন্ধিপ্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। আপনারা তাকে উত্তর দিয়েছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সন্ধি হবে না, যতক্ষণ না আমরা কুছা নগরীর জাম্বির (কাগজি লেবু) দিয়ে আফরিযিন ফুলের মধু পান করব। এ উত্তর শুনে আমাদের শাসক বলেছেন, হায়! হায়! আল্লাহর শপথ! তাদের মুখে তো ফিরেশতারা কথা বলছে! ফিরেশতারাই আরবদের পক্ষ থেকে আমাদেরকে উত্তর দিচ্ছে। আর এমনটি না হয়ে থাকলে এই লোকটির জবানে ইলহাম হচ্ছে, যেন আমরা এখান থেকে চলে যাই। এরপর সকলে পালিয়ে যায়!
বাহুরাসীর নগরী ষোড়শ হিজরি সনের সফর মাসে (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) বিজিত হয়।