📄 খানাসা রাযি.-এর আপন পুত্রদেরকে কৃত অসিয়ত
আরমাছ দিবসের রাতে খানাসা রাযি. তার চার পুত্রকে একত্র করে বলেন—'তোমরা স্বেচ্ছায় ইসলামগ্রহণ করেছ এবং নিজ ইচ্ছায় লড়াই করছ। কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য যে অকল্পনীয় আজর রেখেছেন, তা তোমরা ভালো করেই জানো। মনে রেখো, এই নশ্বর জগতের চেয়ে চিরস্থায়ী জগৎ শ্রেয়। আল্লাহ চাহে তো তোমরা যদি আগামীকাল সকালে সুস্থ ও নিরাপদ অবস্থায় উপনীত হও, তাহলে তোমরা অভিনিবেশ সহকারে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রসর হবে এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। যখন দেখবে, যুদ্ধ প্রচণ্ড আকার ধারণ করেছে এবং জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের রূপ নিয়েছে, তখন যুদ্ধের একেবারে মূলকেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হবে এবং প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠ সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তাহলেই তোমরা পরকালের চিরস্থায়ী জগতের মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হবে।'
আল্লাহু আকবার! ঈমান মানুষের অন্তরে কী বিস্ময়কর পরিবর্তনই-না সৃষ্টি করে! এই খানাসা জাহিলি যুগে তার সাখর নামক এক ভাইয়ের বিচ্ছেদ-শোকে রচনা করেছিলেন এক বিরল শোকগাথা; ভাষা-সৌকর্য ও অত্যুচ্চ কাব্যমানের কারণে আরবি সাহিত্যে যা অনন্যসাধারণ স্থান লাভ করেছে। ইসলামগ্রহণ করার পর আজ সেই খানাসা রাযি. তার চার পুত্রের প্রত্যেককে আল্লাহর রাস্তায় আপন জান কুরবানি করতে আহ্বান জানাচ্ছেন!
📄 দ্বিতীয় দিন: আগওয়াছ দিবস
শাম থেকে সহায়ক বাহিনীর আগমন
এ দিন শাম থেকে রওনা হওয়া সহায়ক বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশ কাদিসিয়ায় পৌঁছে যায়। অগ্রবর্তী অংশের নেতৃত্বে ছিলেন হজরত কা'কা' বিন আমর রাযি.। তার সঙ্গে ছিল এক হাজার অশ্বারোহী সৈন্য। আগওয়াছ দিবসের সূর্যোদয়ের সময় তারা যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছায়।
প্রতিপক্ষের অন্তরে ভীতি সঞ্চারের জন্য কা'কা' এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি তার সঙ্গী এক হাজার সৈন্যকে দশ-দশজন করে একশটি ভাগে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক অংশকে বলে দেন, যখন তারা মুসলিম শিবিরের দৃষ্টিপথে পৌঁছে যাবে, তখন একটি অংশ শিবিরে প্রবেশ করবে। প্রথম দশজন নির্ধারিত দূরত্ব অতিক্রম করার পর পরবর্তী দল তাদের অনুগামী হবে। এভাবে একের পর এক দলের আগমনে যে ধূলিঝড়ের সৃষ্টি হবে, তাতে সূর্যের আলো ঢেকে যাবে এবং শত্রুপক্ষের চোখে আগত মুসলিম বাহিনীকে অনেক বড় মনে হবে।
দ্বিতীয় দিনের শুরুতে কা'কা' রাযি. সারি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিপক্ষকে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহ্বান জানান। পারসিক বাহিনীর সারি থেকে সেতু-যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বাহমান দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য অগ্রসর হয়। কা'কা' রাযি. প্রথমে তাকে চিনতে না পেরে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করেন। একটু পরেই তাকে চিনতে পেরে তিনি চিৎকার করে বলে ওঠেন, 'আবু উবায়দের ঘাতক, এখনই প্রতিশোধ নিচ্ছি!' এ কথা বলেই তিনি এক আঘাতে বাহমানকে শেষ করে দেন। এভাবে দ্বিতীয় দিনের সূচনা হয় মুসলিম বাহিনীর সফলতার মাধ্যমে। প্রকৃতপক্ষে এদিন মুসলিম বাহিনীর মাঝে তিনটি নতুন বৈশিষ্ট্য দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল।
• বাহিনীতে বিশিষ্ট সাহাবি কা'কা' রাযি.-এর উপস্থিতি। খলিফা উমর রাযি. তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, 'যে বাহিনীতে কা'কা' রয়েছে, সে বাহিনী পরাজিত হবে না।' তিনি আরও বলেছেন, 'যুদ্ধক্ষেত্রে কা'কা'র কণ্ঠস্বর এক হাজার অশ্বারোহী সৈনিকের কাজ দেয়।'
প্রথম দিন মুসলিম বাহিনী কর্তৃক হস্তিবাহিনীর বাক্সগুলো ধ্বংস করে ফেলায় যুদ্ধক্ষেত্রে হাতির অনুপস্থিতি। এ দিন পারসিকরা বাক্সগুলো মেরামত করছিল।
কা'কা' রাযি.-এর গৃহীত একটি কৌশল। তিনি ও তার জ্ঞাতি ভাইয়েরা এদিন মুসলিম বাহিনীর উটগুলোকে বোরকার মতো করে চাদর পরিয়ে দেন। ফলে উটগুলোকে দেখতে ভয়ানক লাগছিল।
ঐতিহাসিক তাবারি রহ. লিখেছেন-
উটগুলো শত্রুপক্ষের ছোট-বড় যে অংশের দিকেই অগ্রসর হতো, তাদের ঘোড়াগুলো ভয়ে পালাতে শুরু করত। মুসলিম বাহিনীর অন্যান্য অংশের সৈন্যগণ এ দৃশ্য দেখে একই পদ্ধতি অবলম্বন করল। ফলাফল এই দাঁড়াল যে, আরমাছ দিবসে প্রতিপক্ষের হাতির কারণে মুসলিম বাহিনী যে পরিমাণ ক্ষতির শিকার হয়েছিল, আগওয়াছ দিবসে পারসিক বাহিনী ঘোমটা পরিহিত উটের কারণে তার চেয়েও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো। (১২৩)
এদিন পারসিক বাহিনীর দশ হাজার সৈন্য নিহত হয়। মুসলিম বাহিনী হারায় দু-হাজার সৈন্য, যাদের মধ্যে খানাসার চার-পুত্রও ছিলেন। পুত্রদের শহিদ হওয়ার সংবাদ পেয়ে খানাসা রাযি. বলেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাকে তাদের শহিদি মৃত্যু দ্বারা মর্যাদাশীল করেছেন। আমি আমার রবের কাছে আশা করি যে, তিনি তাদেরকে আপন রহমতের ছায়াতলে স্থান দেবেন।'
টিকাঃ
১২০. ইবনে জারির তাবারি, তারিখুর-রুসুলি ওয়াল-মুলুক, ৩/৫৪৫।
📄 শাম থেকে সহায়ক বাহিনীর আগমন
এ দিন শাম থেকে রওনা হওয়া সহায়ক বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশ কাদিসিয়ায় পৌঁছে যায়। অগ্রবর্তী অংশের নেতৃত্বে ছিলেন হজরত কা'কা' বিন আমর রাযি.। তার সঙ্গে ছিল এক হাজার অশ্বারোহী সৈন্য। আগওয়াছ দিবসের সূর্যোদয়ের সময় তারা যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছায়।
প্রতিপক্ষের অন্তরে ভীতি সঞ্চারের জন্য কা'কা' এক অভিনব কৌশল গ্রহণ করেন। তিনি তার সঙ্গী এক হাজার সৈন্যকে দশ-দশজন করে একশটি ভাগে বিভক্ত করেন এবং প্রত্যেক অংশকে বলে দেন, যখন তারা মুসলিম শিবিরের দৃষ্টিপথে পৌঁছে যাবে, তখন একটি অংশ শিবিরে প্রবেশ করবে। প্রথম দশজন নির্ধারিত দূরত্ব অতিক্রম করার পর পরবর্তী দল তাদের অনুগামী হবে। এভাবে একের পর এক দলের আগমনে যে ধূলিঝড়ের সৃষ্টি হবে, তাতে সূর্যের আলো ঢেকে যাবে এবং শত্রুপক্ষের চোখে আগত মুসলিম বাহিনীকে অনেক বড় মনে হবে।
📄 তৃতীয় দিন : আম্মাস দিবস
কা'কা' রাযি.-এর সঙ্গে শাম থেকে রওনা হওয়া সহায়ক বাহিনীর বাকি সদস্যগণ তখনও যুদ্ধক্ষেত্রে এসে পৌঁছায়নি। এদিকে সারাদিনের প্রচণ্ড যুদ্ধের পরও বীর যোদ্ধা কা'কা'র চোখে ঘুম নেই। তিনি সেনাপতিদের সঙ্গে পরামর্শ করে মুসলিম বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধি ও শত্রুপক্ষের মাঝে ভীতি সঞ্চারের জন্য নতুন আরেকটি কৌশল গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। কা'কা' তার এক হাজার অশ্বারোহী সৈনিককে নির্দেশ দেন, তারা যেন অন্ধকারের মধ্যেই সবার অগোচরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে পড়ে এবং যেদিক থেকে সাহায্য আসার কথা, সেদিকে লুকিয়ে থাকে। তিনি এক হাজার সৈন্যকে একশজন করে দশটি ভাগে বিভক্ত করেন এবং নির্দেশ দেন যে, সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা একদল একদল করে ময়দানে উপস্থিত হবে। প্রত্যুষে অশ্বারোহী সৈন্যগণ নির্দেশনা মোতাবেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে। এরইমধ্যে হাশিম বিন উতবা বিন আবু ওয়াককাসের নেতৃত্বে শামের অবশিষ্ট সহায়ক বাহিনীও পৌঁছে যায়। হাশিম কা'কা'র কৌশলের কথা জানতে পেরে তার সঙ্গীদের নিয়ে একই কৌশল অবলম্বন করেন। পারসিক বাহিনীর সৈন্যদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টিতে এ কৌশল বিরাট ভূমিকা রাখে।
এদিন পারসিক বাহিনীর হাতিগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসে। হাতিগুলোর প্রতিরক্ষার জন্য তারা প্রতিটি হাতির পাশে একদল পদাতিক সৈন্য মোতায়েন করেছিল। হস্তিবাহিনীর প্রত্যাবর্তনে পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সাদ রাযি. নওমুসলিম কয়েকজন পারসিককে তলব করে জিজ্ঞেস করেন, হাতির শরীরে কি এমন কোনো স্থান আছে, যেখানে আঘাত করলে হাতিকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বের করে দেওয়া সম্ভব হবে?
তারা জানায়, হ্যাঁ, চোয়াল ও চোখে আঘাত করতে পারলে হাতিগুলো আর যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো কাজে লাগবে না। সাদ রাযি. তৎক্ষণাৎ কা'কা' ও তার ভাই আছিমকে বার্তা পাঠান, 'তোমরা দুজন হস্তি-বাহিনীর মূল কর্তা শ্বেত হস্তিটিকে শেষ করবে।' আর পদাতিক বাহিনীর প্রধান হামমাল বিন মালিক ও রাবিল বিন আমরকে বার্তা পাঠান, 'তোমরা উভয়ে হস্তিবাহিনীর আরেক প্রধান উট পাঁচড়াবিশিষ্ট উটটিকে শেষ করবে।'
নির্দেশ অনুযায়ী উভয় দল বর্শা নিক্ষেপ করে হাতিদুটির চোখ নষ্ট করতে এবং শুঁড় কেটে ফেলতে সক্ষম হন। ফলে হাতিদুটি বিক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং আরোহী সৈন্যদের ফেলে দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে। এই হাতিদুটি অন্যান্য হাতিগুলোকে পরিচালনা করত। ফলে সেগুলোও হতবুদ্ধি হয়ে নেতাদ্বয়ের অনুসরণ করে।
আম্মাছ দিবসে দিনরাত একটানা চব্বিশ ঘণ্টা যুদ্ধ চলে।