📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 রুস্তমের সামনে মুসলমানদের প্রথম প্রতিনিধি

📄 রুস্তমের সামনে মুসলমানদের প্রথম প্রতিনিধি


কাদিসিয়ায় পৌঁছে পারসিক সেনাপতি রুস্তম মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা-আলোচনা করার জন্য প্রতিনিধিদল পাঠাতে অনুরোধ করায় মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সাদ রাযি. শুধু রিবয়ি বিন আমির রাযি.-কে পাঠান। মুসলিম প্রতিনিধির আগমনের পূর্বে রুস্তম তার অনুচরদের অভ্যর্থনা-স্থান প্রস্তুত করতে নির্দেশ দেয়। প্রচুর সাজসজ্জা করা হয়, অতি মূল্যবান ফরাশ ও গালিচা বিছানো হয়, দামি দামি বালিশ ও কুশন-তাকিয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেনাপতি রুস্তম নিজেও তার পূর্ণ রাজকীয় সাজে সজ্জিত হয়। এর মাধ্যমে সে আগত প্রতিনিধিদলের মাঝে প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছিল। এরইমধ্যে হজরত রিবয়ি বিন আমির রাযি. তার বর্শায় ভর দিয়ে রুস্তমের দরবারে প্রবেশ করেন। তিনি হাতের বর্শা দিয়ে গালিচা ও কার্পেটে চাপ দিতে দিতে সামনে অগ্রসর হন। রুস্তমের কাছাকাছি পৌঁছতেই প্রহরী তাকে আটকে দিলে তিনি জমিনেই বসে পড়েন এবং হাতের বর্শাটি গালিচায় বিদ্ধ করেন। প্রহরীরা বিবয়ি রাযি.-কে জিজ্ঞেস করে, 'আপনি এরূপ আচরণ কেন করলেন?' তিনি উত্তর দেন, 'আমরা তোমাদের এই বিলাস-সজ্জার ওপর বসা পছন্দ করি না।'
এরপর সেনাপতি রুস্তম তাকে জিজ্ঞেস করে, 'আপনারা আমাদের দেশে কেন এসেছেন?' উত্তরে এই মহান সাহাবি দীপ্ত কণ্ঠে বলেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছেন যে, আল্লাহ যাদের তাকদিরে মঞ্জুর করেন, আমরা যেন তাদেরকে সৃষ্টির দাসত্ব-লাঞ্ছনা হতে উদ্ধার করে স্রষ্টার দাসত্ব-গৌরবের পথে নিয়ে আসি; পৃথিবীর সংকীর্ণতা থেকে উভয় জগতের প্রশস্ততার দিকে এবং ভ্রষ্ট ধর্মসমূহের অবিচার হতে ইসলামের ন্যায়-নীতির পথে নিয়ে আসি। আল্লাহ আমাদেরকে তার দ্বীনের নিয়ামত দান করে তার দ্বীনের পথে আহ্বান করার জন্য মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন। যারা এ দ্বীন গ্রহণ করবে, আমরা তাদেরকে আপন করে নেব, অভিযান প্রত্যাহার করে তাদের ভূখণ্ড তাদের হাতে রেখেই ফিরে যাব; আর যারা এ দ্বীনের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করবে, তাদের সঙ্গে আমরা লড়াই করে যাব; যতক্ষণ না আল্লাহর নির্ধারিত প্রতিশ্রুতি লাভ করি।'
'আল্লাহর নির্ধারিত প্রতিশ্রুতি কী?' রুস্তম জিজ্ঞেস করে।
রিবয়ি বিন আমির রাযি. উত্তর দেন-
'অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে শহিদ হলে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি জান্নাত আর জীবিত থাকলে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি 'বিজয়-সুবাস'।'
'আমি আপনার বক্তব্য শুনলাম। এখন এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা করার জন্য কি আপনারা কিছুদিনের জন্য সিদ্ধান্ত মুলতবি রাখতে পারবেন?'
'হ্যাঁ, আপনি কদিন সময় চান, বলুন; এক দিন, নাকি দুদিন?' রিবয়ি রাযি. জিজ্ঞেস করেন।
'না, বরং এতটুকু সময় দিন, যেন আমরা আমাদের নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে পত্রযোগাযোগ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারি।'
'আমাদের রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য যে আদর্শ রেখে গেছেন এবং আমাদের পূর্ববর্তীগণ যা অনুযায়ী আমল করেছেন, তা হলো—আমরা শত্রুপক্ষকে তিন দিনের বেশি অবকাশ দিই না। সুতরাং আমরা তিন দিন সিদ্ধান্তের বিষয়টি মুলতবি রাখব। এরমধ্যেই আপনি আপনার নিজের এবং আপনার জাতির বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চেষ্টা করুন। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর আপনাদের তিনটি বিষয়ের কোনো একটি বেছে নিতে হবে—হয় ইসলামগ্রহণ করবেন, তাহলে আমরা আপনাদের মাতৃভূমি ছেড়ে চলে যাব; কিংবা জিজিয়া প্রদান করবেন, তাহলে আমরা তা গ্রহণ করে আপনাদের ছাড় দেবো। যদি আপনাদের নিরাপত্তা-সাহায্য প্রয়োজন না হয়, আমরা এখান থেকে চলে যাব; আর যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে আমরা আপনাদেরকে নিরাপত্তা দেবো। আর এই দুই বিকল্পের একটিও গ্রহণ না করলে চতুর্থ দিন যুদ্ধের ঘোষণা দেওয়া হবে। মাঝের এই দিনগুলোতে আমরা যুদ্ধের সূচনা করব না; যদি না আপনারা আগে আমাদের ওপর আক্রমণ করেন। এ বিষয়ে আমি আপনাকে আমার সকল সঙ্গীর পক্ষ থেকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি।' রিবয়ি রাযি. চূড়ান্ত কথা বলে দেন।
এরপর রুস্তম জিজ্ঞেস করে, 'আপনি কি আপনার জাতির শাসক ও সর্দার?'
রিবয়ি রাযি. উত্তর দেন, 'না; কিন্তু মুসলমানরা পরস্পর এক দেহের মতো। মুসলমানদের সাধারণ সদস্যও সর্বোচ্চ সদস্যের প্রতিরক্ষায় সচেষ্ট থাকে।'
আলোচনা শেষে হজরত রিবয়ি রাযি. প্রস্থান করলে রুস্তম তার উপদেষ্টাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, 'তোমাদের কী মত? তোমরা কি এই ব্যক্তির কথার চেয়ে সুস্পষ্ট ও মূল্যবান কোনো কথা কখনো শুনেছ?' উপদেষ্টারা উত্তর দেয়, 'আল্লাহর পানাহ! আপনি কিছুতেই এসব কথায় প্রভাবিত হবেন না; এই কুকুরের কথায় আপনার দ্বীন পরিত্যাগ করবেন না। আপনি তার পরিচ্ছদ দেখেননি?'
উপদেষ্টাদের উত্তর শুনে সেনাপতি রুস্তম বিক্ষুব্ধ কণ্ঠে মন্তব্য করে—'ধিক তোমাদের! পোশাক-পরিচ্ছদ দিয়ে মানুষের মান বিচার করো না। তার কথা, মতামত ও চরিত্র দেখো। আরবরা পোশাক-পরিচ্ছদ ও আহারসামগ্রীকে তুচ্ছজ্ঞান করে এবং আত্মমর্যাদা রক্ষা করে চলে।'
অভিজ্ঞ সেনাপতি রুস্তম যদিও বুঝতে পারছিল যে, মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোর পরিণতি মোটেও কল্যাণকর হবে না; কিন্তু পারসিকরা তার দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করছিল না।
এরপর রুস্তম সংলাপের জন্য আরেকজন প্রতিনিধি পাঠাতে অনুরোধ করলে মুসলিম সেনাপতি সাদ রাযি। এবার হুযায়ফা বিন মিহছান রাযি.-কে পাঠান। তার সঙ্গেও রিবয়ি বিন আমরের ন্যায় একই ধরনের কথোপকথন হয়। তৃতীয়বার রুস্তম একই অনুরোধ করায় সাদ এবার পাঠান মুগিরা বিন শুবা রাযি.-কে। মুগিরা ছিলেন কুশলতা ও বিচক্ষণতা এবং বাগ্মিতা ও বাষ্পটুতায় সমকালীন আরবের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি। বিশালদেহী মুগিরা রাযি. পারসিকদের ভাষায়ও সমান পারদর্শী ছিলেন। রুস্তমের তাঁবুতে প্রবেশ করার পর মুগিরা সামনে অগ্রসর হয়ে রুস্তমের সুসজ্জিত আসনে তার পাশেই বসে পড়েন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে পারসিকরা হইচই শুরু করে এবং মুগিরা রাযি.-এর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে টানতে শুরু করে।
তখন হজরত মুগিরা রাযি. তাদেরকে বলেন-'থামো, হট্টগোল করো না। তোমাদের সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনেছি। কিন্তু আমি তোমাদের চেয়ে নির্বোধ কোনো সম্প্রদায় দেখিনি। আমরা আরবরা পরস্পর সমান; কেউ কারও দাসত্ব করি না। অবশ্য কেউ যুদ্ধে বন্দি হলে তার কথা ভিন্ন। আমি তো মনে করেছিলাম, আমরা যেমন পরস্পর সহমর্মিতা প্রদর্শন করি, তোমরাও তেমন কর। আমার সঙ্গে এমন আচরণ না করে আমাকে আগে জানালেই পারতে যে, তোমাদের মধ্যে প্রভুত্ব ও দাসত্বের স্তর রয়েছে এবং প্রভুর আসনে দাসরা বসতে পারে না। তাহলে আমি এখানে বসতাম না, তোমাদের কাছে আসতামও না। তোমরাই তো আমাকে ডেকেছ। আজ জানলাম যে, তোমাদের অবস্থা ক্ষয়িষ্ণুপ্রায় এবং তোমরা প্রকৃতপক্ষে পরাধীন ও পরাজিত এক জাতি। এ ধরনের মেধা ও মনোভাব নিয়ে কোনো রাজত্ব টিকে থাকতে পারে না।'
মুগিরা রাযি.-এর বক্তব্য শুনে উপস্থিত সাধারণ সৈন্যরা বলতে লাগল, 'আল্লাহর শপথ! আরবি ব্যক্তিটি বাস্তব সত্যই বলেছে।'
অপরদিকে উপস্থিত পারস্য সাম্রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল—'এই লোক তো এমন কথার তির ছুঁড়েছে যে, আমাদের ক্রীতদাসেরা সব তার প্রতি ধাবিত হয়ে যাবে।'
যুদ্ধ বিলম্বিত করার জন্য এই সংলাপ ছিল রুস্তমের পক্ষ থেকে শেষ প্রচেষ্টা। এ প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হওয়ায় তার সামনে আর কোনো বাহানার সুযোগ রইল না এবং মুসলমানদের সঙ্গে সামরিক মোকাবিলা অনিবার্য হয়ে দাঁড়াল।
মুসলিম বাহিনীর প্রধান সেনাপতি সাদ বিন আবু ওয়াককাস রাযি. তখন সায়াটিকা, ফোঁড়া ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এ কারণে তিনি বসতে বা কোনো বাহনজন্তুতে আরোহণ করতে পারতেন না। তাই তিনি কিদ্দিস নামক একটি দুর্গের চূড়ায় আরোহণ করে একটি বালিশে বুকে ভর দিয়ে অধোমুখ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতি নজর রাখছিলেন। ময়দানে যুদ্ধপরিচালক হিসেবে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছিল খালিদ বিন উরফাতাহ রাযি.-কে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 কাদিসিয়ার যুদ্ধের প্রাত্যহিক বিবরণ

📄 কাদিসিয়ার যুদ্ধের প্রাত্যহিক বিবরণ


প্রথম দিন: আরমাছ দিবস [১৩ শাবান, পঞ্চদশ হিজরি] [১৯ সেপ্টেম্বর, ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দ]
রীতি অনুযায়ী পারসিক সেনাপতি রুস্তম মুসলমানদের কাছে বার্তা পাঠায় যে, তোমরা নদী পাড়ি দিয়ে এপারে চলে এসো, নয়তো আমরা ওপারে চলে যাই। মুসলিম বাহিনীর পক্ষ থেকে উত্তর পাঠানো হয়, তোমরাই এপারে চলে এসো।
মুসলিম সেনাপতি সাদ রাযি. তার সৈন্যদেরকে আপন অবস্থানে অটল- অবিচল থাকার নির্দেশ দেন। তিনি ঘোষণা করেন, জোহর নামাজ পর্যন্ত কেউ সামান্য অগ্রসর হয়ো না। জোহর আদায় শেষ হলে আমি একটি তাকবির দেবো। তখন তোমরাও তাকবির দেবে এবং নিজেদের জুতার ফিতা বেঁধে নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। মনে রাখবে, তোমাদের পূর্বে কোনো জাতিকে তাকবির-নিয়ামত দান করা হয়নি; তোমাদের দৃঢ়পদ রাখতে ও শক্তি জোগাতে এই নিয়ামত দান করা হয়েছে। এরপর আমি যখন দ্বিতীয় তাকবির দেবো, তোমরাও তাকবির দেবে এবং যুদ্ধ শুরু করার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যাবে। তারপর আমি তৃতীয় তাকবির দিলে তোমরা দাঁতে দাঁত চেপে অস্ত্র নিয়ে একযোগে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে আর মুখে বলবে ‘লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’।
একের পর এক তাকবিরের ধ্বনিতে কাদেসিয়া প্রান্তরের দিগদিগন্ত মুখরিত হয়ে ওঠে। তৃতীয় তাকবিরের পর গালিব বিন আবদুল্লাহ আসাদি সামনে অগ্রসর হয়ে প্রতিপক্ষকে মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে পারসিক বাহিনীর হরমুজ নামক জনৈক সেনাপতি অগ্রসর হয়। গালিব তাকে সামান্য সুযোগ না দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাকে জড়িয়ে ধরে বন্দি করে মুসলিম বাহিনীর সারিতে নিয়ে আসেন।
মুসলিম বাহিনী চতুর্থ তাকবিরের প্রতিক্ষায় থাকতেই পারসিক বাহিনী মুসলিম বাহিনীর মূলকেন্দ্রে আক্রমণ চালায়। বাহিনীর এ অংশে ছিল মুসলিম বাহিনীর সবচেয়ে দক্ষ যোদ্ধা-গোষ্ঠী বনু বাজিলার সদস্যগণ। তাদের পাশেই ছিল বনু কিনদা। এই দুই গোত্রই মুসলিম বাহিনীর এক-চতুর্থাংশের (৫০০০) প্রতিনিধিত্ব করছিল।
পারসিক বাহিনী মুসলিম বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড হামলা চালায়। তাদের হাতিগুলোর কারণে মুসলিম বাহিনীর ঘোড়াগুলো ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে মুসলিম সৈন্যগণ ঘোড়া হতে নেমে যুদ্ধ করতে শুরু করে। সেনাপতি সাদ রাযি. তার অবস্থানস্থল থেকে বনু আসাদকে বাজিলার গোত্রের প্রতিরক্ষায় অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। তুলাইহা বিন খুওয়াইলিদের গোত্র বনু আসাদের অবস্থান ছিল বাজিলার গোত্রের ডান পার্শ্বে। তাদের সৈন্যসংখ্যা ছিল তিন হাজার। সেনাপতির আদেশে বনু আসাদ যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারণ আনুগত্যের পরিচয় দেয় এবং মুসলিম ভাইদের রক্ষা করার জন্য বীরত্বের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। শত্রুপক্ষকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে আরমাছ দিবসে কেবল বনু আসাদেরই পাঁচশ যোদ্ধা শহিদ হয়।
সেনাপতি সাদ রাযি.-এর নির্দেশনা অনুযায়ী তখনও মুসলিম বাহিনীর অন্যান্য অংশ আপন আপন স্থানে স্থির ছিল। এরপর সাদ রাযি. যখন চতুর্থ তাকবির উচ্চারণ করেন, আল্লাহর সৈনিকরা বজ্র নিনাদে তাদের মুসলিম ভাইদের রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ পারসিক বাহিনীর হাতিগুলোর পেটের সঙ্গে বাঁধা বাক্সগুলোর বন্ধনী কেটে ফেলতে সক্ষম হয়। ফলে বাক্সগুলো উল্টে পড়ে যায় এবং বাক্সের মধ্যে অবস্থানরত সৈনিকেরা নিহত হয়।
কাদিসিয়া যুদ্ধের প্রথম দিন যুদ্ধের পাল্লা উভয় দিকে দোদুল্যমান ছিল।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 প্রথম দিন: আরমাছ দিবস

📄 প্রথম দিন: আরমাছ দিবস


রীতি অনুযায়ী পারসিক সেনাপতি রুস্তম মুসলমানদের কাছে বার্তা পাঠায় যে, তোমরা নদী পাড়ি দিয়ে এপারে চলে এসো, নয়তো আমরা ওপারে চলে যাই। মুসলিম বাহিনীর পক্ষ থেকে উত্তর পাঠানো হয়, তোমরাই এপারে চলে এসো।
মুসলিম সেনাপতি সাদ রাযি. তার সৈন্যদেরকে আপন অবস্থানে অটল- অবিচল থাকার নির্দেশ দেন। তিনি ঘোষণা করেন, জোহর নামাজ পর্যন্ত কেউ সামান্য অগ্রসর হয়ো না। জোহর আদায় শেষ হলে আমি একটি তাকবির দেবো। তখন তোমরাও তাকবির দেবে এবং নিজেদের জুতার ফিতা বেঁধে নিয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করবে। মনে রাখবে, তোমাদের পূর্বে কোনো জাতিকে তাকবির-নিয়ামত দান করা হয়নি; তোমাদের দৃঢ়পদ রাখতে ও শক্তি জোগাতে এই নিয়ামত দান করা হয়েছে। এরপর আমি যখন দ্বিতীয় তাকবির দেবো, তোমরাও তাকবির দেবে এবং যুদ্ধ শুরু করার জন্য পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে যাবে। তারপর আমি তৃতীয় তাকবির দিলে তোমরা দাঁতে দাঁত চেপে অস্ত্র নিয়ে একযোগে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে আর মুখে বলবে ‘লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’।
একের পর এক তাকবিরের ধ্বনিতে কাদেসিয়া প্রান্তরের দিগদিগন্ত মুখরিত হয়ে ওঠে। তৃতীয় তাকবিরের পর গালিব বিন আবদুল্লাহ আসাদি সামনে অগ্রসর হয়ে প্রতিপক্ষকে মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানান। তাঁর আহ্বানে পারসিক বাহিনীর হরমুজ নামক জনৈক সেনাপতি অগ্রসর হয়। গালিব তাকে সামান্য সুযোগ না দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং তাকে জড়িয়ে ধরে বন্দি করে মুসলিম বাহিনীর সারিতে নিয়ে আসেন।
মুসলিম বাহিনী চতুর্থ তাকবিরের প্রতিক্ষায় থাকতেই পারসিক বাহিনী মুসলিম বাহিনীর মূলকেন্দ্রে আক্রমণ চালায়। বাহিনীর এ অংশে ছিল মুসলিম বাহিনীর সবচেয়ে দক্ষ যোদ্ধা-গোষ্ঠী বনু বাজিলার সদস্যগণ। তাদের পাশেই ছিল বনু কিনদা। এই দুই গোত্রই মুসলিম বাহিনীর এক-চতুর্থাংশের (৫০০০) প্রতিনিধিত্ব করছিল।
পারসিক বাহিনী মুসলিম বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড হামলা চালায়। তাদের হাতিগুলোর কারণে মুসলিম বাহিনীর ঘোড়াগুলো ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে মুসলিম সৈন্যগণ ঘোড়া হতে নেমে যুদ্ধ করতে শুরু করে। সেনাপতি সাদ রাযি. তার অবস্থানস্থল থেকে বনু আসাদকে বাজিলার গোত্রের প্রতিরক্ষায় অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। তুলাইহা বিন খুওয়াইলিদের গোত্র বনু আসাদের অবস্থান ছিল বাজিলার গোত্রের ডান পার্শ্বে। তাদের সৈন্যসংখ্যা ছিল তিন হাজার। সেনাপতির আদেশে বnu আসাদ যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারণ আনুগত্যের পরিচয় দেয় এবং মুসলিম ভাইদের রক্ষা করার জন্য বীরত্বের সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। শত্রুপক্ষকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে আরমাছ দিবসে কেবল বনু আসাদেরই পাঁচশ যোদ্ধা শহিদ হয়।
সেনাপতি সাদ রাযি.-এর নির্দেশনা অনুযায়ী তখনও মুসলিম বাহিনীর অন্যান্য অংশ আপন আপন স্থানে স্থির ছিল। এরপর সাদ রাযি. যখন চতুর্থ তাকবির উচ্চারণ করেন, আল্লাহর সৈনিকরা বজ্র নিনাদে তাদের মুসলিম ভাইদের রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ পারসিক বাহিনীর হাতিগুলোর পেটের সঙ্গে বাঁধা বাক্সগুলোর বন্ধনী কেটে ফেলতে সক্ষম হয়। ফলে বাক্সগুলো উল্টে পড়ে যায় এবং বাক্সের মধ্যে অবস্থানরত সৈনিকেরা নিহত হয়।
কাদিসিয়া যুদ্ধের প্রথম দিন যুদ্ধের পাল্লা উভয় দিকে দোদুল্যমান ছিল।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 খানাসা রাযি.-এর আপন পুত্রদেরকে কৃত অসিয়ত

📄 খানাসা রাযি.-এর আপন পুত্রদেরকে কৃত অসিয়ত


আরমাছ দিবসের রাতে খানাসা রাযি. তার চার পুত্রকে একত্র করে বলেন—'তোমরা স্বেচ্ছায় ইসলামগ্রহণ করেছ এবং নিজ ইচ্ছায় লড়াই করছ। কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের জন্য যে অকল্পনীয় আজর রেখেছেন, তা তোমরা ভালো করেই জানো। মনে রেখো, এই নশ্বর জগতের চেয়ে চিরস্থায়ী জগৎ শ্রেয়। আল্লাহ চাহে তো তোমরা যদি আগামীকাল সকালে সুস্থ ও নিরাপদ অবস্থায় উপনীত হও, তাহলে তোমরা অভিনিবেশ সহকারে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অগ্রসর হবে এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা করে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। যখন দেখবে, যুদ্ধ প্রচণ্ড আকার ধারণ করেছে এবং জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের রূপ নিয়েছে, তখন যুদ্ধের একেবারে মূলকেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হবে এবং প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠ সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। তাহলেই তোমরা পরকালের চিরস্থায়ী জগতের মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী হবে।'
আল্লাহু আকবার! ঈমান মানুষের অন্তরে কী বিস্ময়কর পরিবর্তনই-না সৃষ্টি করে! এই খানাসা জাহিলি যুগে তার সাখর নামক এক ভাইয়ের বিচ্ছেদ-শোকে রচনা করেছিলেন এক বিরল শোকগাথা; ভাষা-সৌকর্য ও অত্যুচ্চ কাব্যমানের কারণে আরবি সাহিত্যে যা অনন্যসাধারণ স্থান লাভ করেছে। ইসলামগ্রহণ করার পর আজ সেই খানাসা রাযি. তার চার পুত্রের প্রত্যেককে আল্লাহর রাস্তায় আপন জান কুরবানি করতে আহ্বান জানাচ্ছেন!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00