📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 বুওয়াইবের যুদ্ধ

📄 বুওয়াইবের যুদ্ধ


মুসান্না তখন সসৈন্য হিরায় অবস্থান করছিলেন। পারসিকদের বিশাল সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে তিনি সেখান থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ফোরাত নদীর পশ্চিম পাড়ে মরুভূমিঘেঁষা বুওয়াইব নামক স্থানে চলে যান। জায়গাটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও বিস্তীর্ণ। মুসান্না চাচ্ছিলেন, এবার তিনিই পারসিক বাহিনীর জন্য মোকাবিলার স্থান নির্ধারণ করে দেবেন। পাশাপাশি মুসান্না দ্রুত সাহায্য চেয়ে মদিনায় জরুরি বার্তা পাঠান এবং তিনি যে স্থান পরিবর্তন করেছেন, তা-ও জানিয়ে দেন। ইতিমধ্যে মদিনা হতে জারির বিন আবদুল্লাহ আল-বাজালি রাযি.-এর নেতৃত্বে রওনা হওয়া অতিরিক্ত ফৌজ পথিমধ্যে মুসান্নার বার্তা পেয়ে পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে সঙ্গে থাকা নারীদের রেখে যায় এবং নিরাপত্তার জন্য সঙ্গে থাকা ভারী সামানপত্রও রেখে যায়। তারা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই মুসান্নার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য দ্রুত পথ চলতে থাকে এবং সফলও হয়। ফলে মুসান্নার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় বারো হাজারে। পারসিক বাহিনী নদীর পূর্ব প্রান্তে অবস্থান গ্রহণ করে। তাদের সেনাপতি মিহরান মুসান্নার কাছে হুবহু সেই বার্তাই প্রেরণ করে, যা ইতিপূর্বে তার পূর্বসূরি বাহমান আবু উবায়দার কাছে প্রেরণ করেছিল।
মুসান্না প্রত্যুত্তরে বার্তা পাঠান, 'তোমরা পার হয়ে চলে এসো।'
বুওয়াইবের যুদ্ধ ত্রয়োদশ হিজরি সনের রমজান মাসে সংঘটিত হয়। মুসান্না তার বাহিনীর সদস্যদের সেদিন রোজা না রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরু হতেই পারসিক বাহিনী সোৎসাহে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা মুখে ও ঘণ্টাধ্বনির মাধ্যমে বিকট আওয়াজ সৃষ্টি করে মুসলিম বাহিনীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ অটল-অবিচল থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। সেনাপতি মুসান্না শত্রুপক্ষের মূল অংশে ঢুকে পড়েন এবং শত্রুসেনাপতি মিহরানকে হত্যা করতে সক্ষম হন। (১১৭) সেনাপতির পতনে পারসিক বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং পলায়নে উদ্যত হয়। মুসান্না পূর্বেই তার বাহিনীর একটি অংশকে উপযুক্ত সময়ে শত্রুপক্ষের প্রত্যাবর্তনের পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। তারা এবার সেতু কেটে দেয়। ফলে পারসিক বাহিনীর একজন সৈন্যও সেদিন নিষ্কৃতি পায়নি। হয় তারা মুসলিম সৈন্যদের তরবারির আঘাতে বা নদীতে ডুবে নিহত হয় অথবা মরুভূমিতে পালিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়।
বুওয়াইবের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও মুসান্না ইরাকের উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন বাজার-ঘাটে একের পর এক ঝটিকা হামলা অব্যাহত রেখে শত্রুপক্ষকে সন্ত্রস্ত করে রাখেন। এ যেন এক অনিঃশেষ গেরিলা যুদ্ধ! বাধ্য হয়ে পারসিকরা নতুন করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি বোলায় এবং নতুন যুবক সম্রাট ইয়াযদিগারদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। শুরু হয় মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নতুন করে সেনাসমাবেশের প্রস্তুতি।
আকস্মিক এই পট পরিবর্তনের সংবাদ (১১৮) মদিনায় খলিফাতুল মুসলিমিনের দরবারেও পৌঁছে যায়। তিনি মুসান্নাকে ইরাকের মূল ভূখণ্ড ছেড়ে ইরাক সীমান্তে সতর্ক অবস্থানের নির্দেশ দেন। উমর রাযি. চাচ্ছিলেন—এই ফাঁকে মুসলিম বাহিনীকে বিন্যস্ত করতে এবং পুরো শক্তি একত্র করে এমন এক চূড়ান্ত অভিযান শুরু করতে, যা সুপ্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের সমাপ্তিরেখা টেনে দেবে।
এ উদ্দেশ্যে উমর রাযি. মুসলিম ভূখণ্ডের শহর-গ্রাম সর্বত্র একটি বার্তা প্রেরণ করেন। বার্তায় উল্লেখ ছিল—যাদের যুদ্ধাস্ত্র, ঘোড়া কিংবা লড়াই-যোগ্যতা আছে, এমন কাউকে বাদ দিয়ো না। প্রত্যেককে বেছে নাও; এরপর আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। দ্রুত! অতি দ্রুত!
এই চূড়ান্ত অভিযানের সর্বাধিনায়ক নির্ধারণের জন্য খলিফা তার উপদেষ্টা-পর্ষদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তারা এ পদে সাদ বিন আবু ওয়াককাস রাযি.-এর নাম প্রস্তাব করলে উমর রাযি. তাতে সম্মতি জানান। নিঃসন্দেহে এ নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সঠিক। হজরত সাদ রাযি. হলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ-সাহাবির অন্যতম। যুদ্ধক্ষেত্রে তার সবিশেষ দক্ষতার কারণে তার উপাধি ছিল আসাদ বা সিংহ। তার জন্যই নবীজি দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি তার দোয়া কবুল করবেন এবং তার নিশানা নির্ভুল করে দেবেন।’ তিনি ছিলেন সপ্তম ইসলামগ্রহণকারী। ইসলামগ্রহণের সময় তার বয়স ছিল উনিশ বছর। সম্পর্কে তিনি ছিলেন নবীজির মামা। (১১৯)

টিকাঃ
১১৭. ইবনে কাছির এ ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছেন এবং মিহরানের হত্যাকারী হিসেবে ভিন্ন নাম উল্লেখ করেছেন। দেখুন: ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/২৯।
১১৮. একই সময় ইরাকের বিজিত বিভিন্ন নগরীর জনগণ মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করে অসদাচরণ শুরু করে এবং বিভিন্নভাবে মুসলিম প্রশাসক ও সাধারণ জনগণকে নিপীড়ন করতে থাকে। পরিবর্তিত অবস্থার কারণে খলিফা উমর ইরাকে অবস্থানরত মুসলিম সৈন্যদেরকে নির্দেশ দেন যে, তারা যেন মূল শহরগুলো থেকে সরে এসে সীমান্তে অবস্থান গ্রহণ করে। দেখুন: ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৩৫।
১১৯. ঐতিহাসিকগণ সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাযি.-এর গুণ-কীর্তি আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন—তিনি ইসলামের জন্য প্রথম তির নিক্ষেপকারী, ইসলামের জন্য প্রথম রক্তপ্রবাহিতকারী। তিনি নবীজির সঙ্গে সবগুলো গাযওয়ায় অংশগ্রহণ করেছেন। উহুদ যুদ্ধে তিনি অনন্যসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দেন। কথিত আছে, উহুদ যুদ্ধে তিনি এক হাজার তির নিক্ষেপ করেছিলেন। সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাযি. সমকালীন কুরাইশ বংশের শ্রেষ্ঠতম বীর-যোদ্ধা বিবেচিত হতেন। তিনি সফরে নবীজির প্রহরার দায়িত্ব পালন করতেন। আশারায়ে মুবাশশারা বা দুনিয়াতেই সুস্পষ্ট ভাষায় জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবির অন্যতম সাদ রাযি. সবশেষে মৃত্যুবরণকারী মুহাজির সাহাবি। তিনি হাতেগোনা সেসব সৌভাগ্যবান সাহাবির একজন, যাদের ক্ষেত্রে নবীজি 'আমার মাতা-পিতা তোমার জন্য কুরবান হোক' বাক্য উচ্চারণ করেছেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 নতুন পরিকল্পনা

📄 নতুন পরিকল্পনা


খলিফা উমর রাযি. সেনাপতি সা‘দের জন্য অতি সূক্ষ্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। মুসলিম বাহিনী কোথায় শিবির স্থাপন করবে, তিনি তাও নির্দিষ্ট করে দেন। খলিফা সা‘দকে কাদিসিয়ার ময়দানে (১২০) শিবির স্থাপন করতে বলেন। তিনি তাকে কাদিসিয়ার বৈশিষ্ট্যাবলি সম্পর্কেও অবগত করেন। খলিফা তাকে আদেশ করেন যে, শত্রুবাহিনী পৌঁছা পর্যন্ত মুসলিম বাহিনী যেন সেখানেই অবস্থান করে এবং পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, কিছুতেই যেন সে স্থান ত্যাগ না করে। এরপর খলিফা উমর তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে মুসলিম বাহিনীর জন্য মূল যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে শুরু করেন।
ইরাকে বিজয়াভিযান যখন শুরু করা হয়, তখন পরিকল্পনা ছিল, মুসলিম বাহিনী প্রথমে ফোরাতের পশ্চিম তীরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাবে, এরপর হীরা দখল করবে, তারপর ক্রমান্বয়ে তৎকালীন পারস্যের রাজধানী মাদায়েনের দিকে অগ্রসর হবে। কিন্তু কাদিসিয়াকে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচনের কারণে উপদেষ্টাগণ পরিকল্পনা পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করেন। এবার পরিকল্পনা করা হয়—শত্রুপক্ষকে ধীরে ধীরে কাদিসিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে টেনে নিয়ে আসা হবে। এর ফলে মুসলিম বাহিনীর পেছনে থাকবে আরবদের আজনা বিচরণভূমি সুবিশাল মরুভূমি আর উভয় পক্ষের মাঝে থাকবে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদনদী ও প্রাকৃতিক জলধারাবিশিষ্ট এক জটিল সমতলভূমি। পারসিক বাহিনী বাধ্য হয়েই এই দুর্গম সমতলভূমি পাড়ি দেবে। আর তখন মুসলিম বাহিনীর পেছন দিক অনুকূল হলেও পারসিক বাহিনীর পৃষ্ঠদেশ হবে দুর্গম ও জটিল। আল্লাহর অনুগ্রহে যদি মুসলিম বাহিনী কাদিসিয়ায় বিজয় লাভ করে, তাহলে এরপর তারা তাদের মূল লক্ষ্য মাদায়েনের দিকে অগ্রসর হবে। এ ক্ষেত্রে তারা ফোরাত ও দজলা নদীর মাঝে অবস্থিত ইরাকের শ্যামলতম গ্রামীণ অঞ্চল সাওয়াদ হয়ে মাদায়েনে পৌঁছতে চেষ্টা করবে।
পরিকল্পনা প্রণয়ন শেষ। এবার আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করে তা বাস্তবায়নের পালা। আল্লাহু আকবার তাকবির-ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে চতুর্দশ হিজরির ১৩ শাবান (৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর) মুসলিম বাহিনী কাদিসিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। তারা প্রতিজ্ঞা করে—পারস্য-কিসরা ইয়াযদিগার্দের রাজমুকুট ও ধনভান্ডার না নিয়ে তারা কিছুতেই প্রত্যাবর্তন করবে না।
আল্লাহর কী মহিমা! সা'দের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী মুসান্নার বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার অল্প কদিন পূর্বেই ইরাকে ইসলামি বিজয়াভিযান-ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম মহান সেনাপতি মুসান্না বিন হারিসা রহ. ইন্তেকাল করেন। সেতুর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সদস্যদেরকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি একাই বিশাল পারসিক বাহিনীর সম্মুখে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। অবশেষে সেই ক্ষতই তার শাহাদাতের কারণ হয়।

টিকাঃ
১২০. কাদিসিয়া : বর্তমান ইরাকের কুফা ও হিল্লা নগরী হতে দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক নগরীর নাম কাদিসিয়া। ফোরাত নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত কাদিসিয়া নগরী ইসলামি বিজয়াভিযানের পূর্বে ক্ষুদ্র একটি জনপদ ছিল।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 কাদিসিয়া-অভিযান: ইসলামি ইতিহাসের এক নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ

📄 কাদিসিয়া-অভিযান: ইসলামি ইতিহাসের এক নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ


নবীজির ইন্তেকালের পর ইসলামি ইতিহাসে অনেক যুদ্ধই সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসবোদ্ধাদের কাছে অন্য কোনো যুদ্ধই কাদিসিয়ার যুদ্ধের মতো অধিক গুরুত্ব লাভ করেনি। এর কারণও আছে। মূলত কাদিসিয়ার যুদ্ধের মাধ্যমেই পারস্যে মুসলিম বাহিনীর বিজয়াভিযান পূর্ণতা লাভ করে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রবল প্রতাপে সুবিশাল ভূখণ্ড শাসনকারী পারস্য সাম্রাজ্যের পতন নিশ্চিত হয়ে যায়। আর তাই ঐতিহাসিকগণ এ যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ যথেষ্ট বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন।
ঐতিহাসিক তাবারি র. বলেন—
আরব উপদ্বীপের প্রতিটি জনপদের সকল মানুষ এ যুদ্ধের ফলাফল জানার জন্য নিয়মিত যুদ্ধের সংবাদ জানতে সচেষ্ট ছিল। এমনকি তখন আরবের কেউ গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ সম্পাদনের প্রয়োজন হলেও এ কথা বলত, ‘কাদিসিয়ায় কী ঘটে, তা জানার আগে আমি এ বিষয়ে চিন্তাই করব না’।(১২১)
ঐতিহাসিকগণ কাদিসিয়া-যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ যতটা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, একই সময়ে শাম অঞ্চলে রোমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অভিযানের আলোচনা ততটা বিশদভাবে করেননি। কারণ, রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধাভিযান তখনও চূড়ান্ত ও নিষ্পত্তিমূলক পর্যায়ে উপনীত হয়নি। রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল এরপরও দীর্ঘ কয়েক শতক পর্যন্ত টিকে ছিল। অবশেষে ৮৫৭ হিজরি সনে (১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে) সপ্তম উসমানি খলিফা মহাবীর গাজি মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ-এর হাতে কনস্টান্টিনোপল ও রোমান সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে।
কাদিসিয়ায় পৌঁছার পর সেনাপতি সাদ রাযি. এক মাস সেখানেই অবস্থান করেন। কিন্তু পারসিকদের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার যুদ্ধতৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। তখন তিনি খলিফার কাছে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়ে দেন যে, তারা আমাদের বিরুদ্ধে কাউকে প্রেরণ করেনি এবং আমাদের জানামতে কাউকে যুদ্ধের দায়িত্বও দেয়নি।
সেনাপতি সাদ রাযি. দীর্ঘ এক বছর সেখানে অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন খণ্ডযুদ্ধ ও সংঘর্ষ যেমন হয়, তেমনই সমঝোতা-সংলাপ প্রচেষ্টা ও চলে। এই পুরোটা সময় খলিফা উমর রাযি. নিয়মিত সাদ ও তার বাহিনীর সংবাদ রাখছিলেন এবং সাদের উদ্দেশে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা ও নসিহত প্রেরণ করছিলেন। একবার তিনি সাদকে প্রেরিত পত্রে লেখেন-
হামদ ও সালাতের পর, তুমি মনোবল অটুট ও সুদৃঢ় রাখবে। সৈন্যদের নিয়মিত নসিহত করবে, নিষ্ঠাপূর্ণ নিয়ত ও সুধারণার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে। যারা এসব বিষয়ে গাফেল, তারাও যেন এসব বিষয়ে পরস্পর বারবার আলোচনা করে। সবসময় অটল-অবিচল থাকবে। কেননা, নিয়তের মান অনুসারে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসে এবং নিষ্ঠার পরিমাণ হিসেবে আজর ও সাওয়াব মিলে। আপন দায়িত্ব ও পথ সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। আল্লাহর কাছে আফিয়াত ও পূর্ণ সুস্থতা কামনা করবে এবং বেশি বেশি 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' পাঠ করবে। আর আমাকে লিখে জানাবে যে, শত্রুবাহিনী কত দূর পৌঁছেছে এবং তাদের নেতৃত্ব কে দিচ্ছে। কারণ, তোমরা যাদের বিরুদ্ধে লড়তে যাচ্ছ, তাদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি না থাকায় আমি (তোমাকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য) যা লিখতে চাচ্ছি, তা লিখতে পারছি না। আমাকে মুসলিম বাহিনীর মনজিলসমূহ সম্পর্কে অবগত করবে এবং তোমাদের অবস্থানস্থল ও মাদায়েনের মাঝে যেসব এলাকা আছে, সেগুলো সম্পর্কেও বিস্তারিত অবহিত করবে। পুরো বিবরণ এমন সুস্পষ্টভাবে লিখবে, যেন আমার চোখের সামনে সামগ্রিক পরিস্থিতি দৃশ্যমান হয়। আমাকে তোমাদের বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে অবহিত করবে। মহান আল্লাহর প্রতি যুগপৎ ভয় ও আশা পোষণ করবে। আর মনে রাখবে, আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহর প্রতিশ্রুতির প্রতি পূর্ণ ইয়াকিন ও বিশ্বাস রাখবে। তিনি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না। এমন যেন না হয় যে, তোমাদের অসতর্কতার কারণে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি তোমাদের কাছ থেকে সরে যায় এবং আল্লাহ তাআলা এ কাজের জন্য অন্য কাউকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করেন।
অন্য এক পত্রে খলিফা লেখেন-
হামদ ও সালাতের পর, আমি তোমাকে এবং তোমার সঙ্গী সৈনিকদেরকে সর্বাবস্থায় তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছি। কারণ, তাকওয়া হলো যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠতম উপকরণ। তোমাকে ও তোমার সঙ্গীদেরকে আরও নির্দেশ দিচ্ছি যে, তোমরা শত্রুপক্ষের তুলনায় গুনাহ থেকে আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে অধিক সচেষ্ট থাকবে। কারণ, শত্রুপক্ষের চেয়ে গুনাহ বেশি থাকা একটি বাহিনীর জন্য অনেক বড় ভয়ের কারণ। প্রতিপক্ষ আল্লাহর অবাধ্য বলেই মুসলমানরা যুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য লাভ করে। আর নয়তো তাদের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো শক্তিই থাকত না। জনশক্তি বা অস্ত্রশক্তি, যুদ্ধপ্রস্তুতি কিংবা যুদ্ধসরঞ্জাম, সর্বক্ষেত্রেই তো আমরা তাদের চেয়ে পিছিয়ে। এখন গুনাহের ক্ষেত্রে যদি আমরা তাদের সমান হয়ে যাই, তাহলে তো আমাদের ওপর তারা শ্রেষ্ঠত্ব পেয়ে যাবে।

টিকাঃ
১২১. ইবনে জারির তাবারি, তারিখুর-রুসুলি ওয়াল-মুলুক, ৩/৫৮২।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 মুসলমানদের মোকাবিলায় পারসিক সেনাপতি রুস্তমের শৈথিল্য ও অনাগ্রহ

📄 মুসলমানদের মোকাবিলায় পারসিক সেনাপতি রুস্তমের শৈথিল্য ও অনাগ্রহ


এভাবেই মুসলিম জাহানের খলিফা হজরত উমর রাযি. পরিস্থিতির প্রতি সার্বক্ষণিক নজরদারির পাশাপাশি সেনাপতি সাদ রাযি.-কে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছিলেন। অপরদিকে পারস্যে তখন চলছিল তরুণ কিসরা ইয়াযদিগার্দের শাসন। তার বয়স তখনও বিশ পেরোয়নি! ইয়াযদিগার্দ ছিলেন আত্মপ্রবঞ্চিত ও অভিজ্ঞতাহীন একজন শাসক। তিনি তার বাহিনীর প্রধান সেনাপতি পারস্য সাম্রাজ্যের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ যোদ্ধা রুস্তমকে(১২২) মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে হামলা চালানোর এবং সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংস করার নির্দেশ দেন।
রুস্তম পূর্ব থেকেই মুসলিম বাহিনীর খোঁজখবর নিচ্ছিল। সে বুঝতে পেরেছিল যে, মুসলমানদেরকে পরাজিত করা মোটেও সহজ হবে না; বরং বিরাজমান পরিস্থিতিতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সমূহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সে দীর্ঘ সময় ধরে কিসরার নির্দেশ পালনে বিলম্ব করতে থাকে। কিন্তু পরিস্থিতি তার অনুকূলে ছিল না। কারণ, মুসলিম বাহিনী কাদিসিয়ায় শিবির স্থাপন করেই বসে থাকেনি; বরং নিজেদের প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করতে এবং পারসিক বাহিনীকে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত আগমনে প্ররোচিত করতে তারা ইরাকের সবুজ-শ্যামল অঞ্চলগুলোতে ঝটিকা হামলা শুরু করে দিয়েছিল। ফলে কিসরার কাছে বারবার ব্যবসায়ী ও গ্রামীণ কৃষকসমাজের পক্ষ থেকে অভিযোগ আসতে থাকে। ইয়াযদিগার্দ তখন সেনাপতি রুস্তমকে দ্রুত বাহিনী প্রেরণের জন্য পীড়াপীড়ি করেন। নিরুপায় হয়ে রুস্তম এবার যুদ্ধপ্রস্তুতি শুরু করে।
মাদায়েনে যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণের সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি সাদ রাযি. খলিফাতুল মুসলিমিন উমর রাযি.-কে এ বিষয়ে অবগত করেন। ফিরতি বার্তায় খলিফা লেখেন—
তাদের পক্ষ থেকে যেমন প্রস্তুতিই গ্রহণ করা হোক না কেন, তুমি চিন্তিত হবে না। তুমি আল্লাহর কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করবে এবং আল্লাহর ওপরই ভরসা করবে। আর তাকে (পারসিক সম্রাট) ইসলামের দাওয়াত প্রদানের জন্য কয়েকজন বাগ্মী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও ধৈর্যশীল ব্যক্তিকে প্রেরণ করবে। আল্লাহ তাআলা এই দাওয়াতের মাধ্যমে পারসিকদের লাঞ্ছনা ও বিচ্ছিন্নতার শিকার করবেন। আর প্রতিদিনের অবস্থা আমাকে লিখে জানাবে।
খলিফার নির্দেশমতো সেনাপতি সাদ রাযি. মুসলিম বাহিনীর চৌদ্দ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে ইয়াযদিগারদের দরবারে প্রেরণ করেন। প্রতিনিধিদল মাদায়েনে ইয়াযদিগারদের রাজদরবারে পৌঁছলে তিনি প্রথমে তাদেরকে তুচ্ছজ্ঞান করেন; এরপর মুসলমানদের পারস্যে আগমনের কারণ জিজ্ঞেস করেন। প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে হজরত নুমান বিন মুকাররিন রাযি. উত্তরে বলেন-
আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন। তিনি আমাদের কল্যাণের পথ প্রদর্শন করেছেন এবং কল্যাণের নির্দেশ দিয়েছেন; অকল্যাণ ও মন্দের পরিচিতি দান করেছেন এবং অকল্যাণ হতে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যারা তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করবে, তারা ইহকাল ও পরকালে সমূহ কল্যাণ লাভ করবে। এরপর যাদেরকেই তাঁর আনীত দ্বীনের প্রতি আহ্বান করা হয়েছে, তারা দু-দলে পরিণত হয়েছে। একদল তাঁর নৈকট্য লাভ করেছে, অপরদল তার থেকে দূরে সরে গেছে। উচ্চ পর্যায়ের নিবেদিত ব্যক্তিরাই তাঁর অনুসরণ করেছে। যতদিন আল্লাহ তাআলা চেয়েছেন, ততদিন তিনি এভাবেই দাওয়াত দিয়ে গেছেন। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর বিরোধিতাকারী আরবদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালন করলে সকল আরব ক্রমান্বয়ে ইসলামে প্রবেশ করে দুভাবে-কিছু লোক ইসলামে প্রবেশ করেছিল একান্ত বাধ্য হয়ে; ফলে তারা ঈর্ষান্বিত হয় আর অনেকে ইসলামগ্রহণ করেছিল স্বেচ্ছাপ্রণোদিত।
হয়ে; তারা ঈমানি দৃঢ়তা লাভ করে। ইতিপূর্বে আমরা পরস্পর শত্রুতা ও সংকীর্ণতায় নিমজ্জিত ছিলাম। তিনি আমাদেরকে যে দ্বীনের সন্ধান দিয়েছেন, তার শ্রেষ্ঠত্ব ও কল্যাণকামিতা আমরা সকলে উপলব্ধি করি। এরপর নবীজি আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন আমাদের প্রতিবেশীদের নিকট যাই এবং তাদেরকে ন্যায় ও সুবিচারের প্রতি আহ্বান করি। (নবীজির নির্দেশনার ভিত্তিতে) আমরা আপনাদেরকে আমাদের দ্বীনের প্রতি আহ্বান করছি। আমাদের দ্বীন ভালোকে ভালোরূপে চিহ্নিত করে আর মন্দকে মন্দরূপে। আপনারা যদি আমাদের দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেন, তাহলে আপনাদের জন্য চরম অকল্যাণকর পরিণতি রয়েছে আর তা হলো জিজিয়া প্রদান। যদি জিজিয়া প্রদানেও আপনারা অস্বীকৃতি জানান, তাহলে যুদ্ধ সুনিশ্চিত। আর যদি আপনারা আমাদের দ্বীনকে পছন্দ করেন, তাহলে আমরা আল্লাহর কিতাব আপনাদের জন্য রেখে যাব; আপনারা আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী রাষ্ট্রপরিচালনা করবেন। আমরা ফিরে যাব; আপনারা আপনাদের নগরী নিয়ে থাকবেন। যদি আপনারা জিজিয়া প্রদানে সম্মত হন, তাহলে আমরা তা গ্রহণ করব এবং আপনাদের নিরাপত্তাবিধান করব। যদি তাতেও অস্বীকৃতি জানান, তাহলে যুদ্ধই ফয়সালা।
নুমান রাযি.-এর বক্তব্য শেষ হলে সম্রাট ইয়াযদিগার্দ বলেন-
আমি তো জানতাম যে, পৃথিবীতে তোমাদের চেয়ে হতভাগা, সংখ্যায় স্বল্প ও মন্দ কোনো জাতি নেই। আমরা তো তোমাদের দায়িত্ব আশেপাশের বিভিন্ন শহরতলির হাতে ছেড়ে দিতাম আর তারাই তোমাদের মোকাবিলায় যথেষ্ট হতো। তোমরা না পারসিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আর না তাদের সামনে দাঁড়ানোর সাহস করতে। এখন যদি তোমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে, তবে তাতে প্রবঞ্চিত হয়ো না। আর যদি ক্ষুধার তাড়নায় তোমরা এ পর্যন্ত এসে থাক, তাহলে তোমাদের সচ্ছলতা না আসা পর্যন্ত আমরা তোমাদের আহার্যের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আমরা তোমাদের মুখ উজ্জ্বল করব এবং তোমাদের পরিচ্ছদের ব্যবস্থাও করব। আর তোমাদের জন্য একজন সদয় প্রশাসক নিয়োগ করব, যে তোমাদের সঙ্গে সদাচরণ করবে।
ইয়াযদিগারদের কথা শুনে প্রতিনিধিদলের সকলে নিশ্চুপ বসে থাকে। অবশেষে মুগিরা বিন শু'বা রাযি. দাঁড়িয়ে বলেন—
সম্রাট, এরা আরবের নেতৃস্থানীয় ও সম্ভ্রান্ত লোকজন। আর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা সম্ভ্রান্তদের মুখে মুখে কথা বলতে লজ্জাবোধ করেন। সম্ভ্রান্তরা তো অন্য সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে কেবল সম্মান করতেই জানেন; সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির কদর ও মর্যাদা তো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরাই জানেন। তারা যে বার্তা নিয়ে এসেছে, তার সবটুকু আপনাকে বলা হয়নি আর আপনি যা বলেছেন, তার সবটুকু তারা গ্রহণও করেনি। তারা সদাচরণ করেছে আর তাদের মতো ব্যক্তিগণ এরূপ সদাচরণই করে থাকে। আপনি আমাকে সুযোগ দিলে আমি আপনাকে আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করব; তারা আমার কথাকে সঠিক বলে সাক্ষ্য দেবে। আপনি আমাদের বিষয়ে যে মন্তব্য করেছেন, প্রকৃত বাস্তবতা হলো সে বিষয়ে আপনার পূর্ণ জানাশোনা নেই। আপনি বলেছেন, আমরা অত্যন্ত মন্দ ছিলাম।
বাস্তবেই আমাদের চেয়ে মন্দ কেউ ছিল না। আপনি বলেছেন, আমরা ক্ষুধার্ত। হ্যাঁ, আমরা এত ক্ষুধার্ত ছিলাম, যার সঙ্গে কোনো ক্ষুধা তুল্য হতে পারে না। আমরা পোকামাকড়, সাপ-বিচ্ছু ভক্ষণ করতাম। এগুলোকেই আমরা খাদ্য বিবেচনা করতাম। আপনি আমাদের বাড়িঘরের কথা বলেছেন। হ্যাঁ, উন্মুক্ত ভূপৃষ্ঠই ছিল আমাদের ঘরবাড়ি। উট-বকরির পশম দিয়ে তৈরি পরিচ্ছদই ছিল আমাদের পোশাক। পরস্পর খুনোখুনি, অন্যায়-রাহাজানি ছিল আমাদের ধর্ম। খাবারে ভাগ বসাবে এই ভয়ে আমাদের অনেকে নিজ কন্যাকে জীবন্ত প্রোথিত করত। আমি এতক্ষণ আপনাকে যা বললাম, কদিন পূর্বেও তেমনই ছিল আমাদের অবস্থা। এরপর আল্লাহ তাআলা আমাদের কাছে এমন একজন ব্যক্তিকে প্রেরণ করলেন, যার বংশপরিচয় আমাদের জানা আছে। আমরা তাকে চিনি, তার জন্মস্থান সম্পর্কে জানি। তার জন্মভূমি সর্বোত্তম জন্মভূমি; তার বংশ আমাদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ বংশ। তার পরিবার আমাদের সবচেয়ে মহান পরিবার; তার গোত্র আমাদের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত গোত্র। তিনি নিজে আমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, সবচেয়ে সত্যবাদী, সবচেয়ে ধৈর্যশীল।
তিনি আমাদেরকে একটি পথে আহ্বান জানালেন। আমাদের কেউ তার আহ্বানে সাড়া দিলো না। প্রথম যিনি তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন, তিনিই পরবর্তী সময়ে তার প্রথম খলিফা হন। তিনি বললেন, আমরাও বললাম। তিনি সত্য বললেন, আমরা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করলাম। তিনি আমাদেরকে অগ্রসর করতে চাইলেন, আমরা কেবল পিছু হটলাম। তিনি যা বলছিলেন, তা-ই বাস্তবায়িত হচ্ছিল। এরপর আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরে তাকে সত্যবাদীরূপে মেনে নেওয়ার এবং তার অনুসরণ করার মানসিকতা তৈরি করে দিলেন। তিনি আমাদের ও জগৎসমূহের প্রতিপালকের মাঝে সেতুবন্ধন হলেন। তিনি আমাদের যা বলতেন, তা মূলত আল্লাহর বাণী। তিনি আমাদেরকে যে নির্দেশনা দিতেন, তা মূলত আল্লাহরই নির্দেশ।
তিনি আমাদেরকে বলেছেন, তোমাদের প্রতিপালক বলেন, আমিই আল্লাহ। আমি একক; আমার কোনো শরিক নেই। যখন কোনো কিছু ছিল না, তখনও আমি ছিলাম। আমি ব্যতীত অন্য সবকিছু একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। আমিই সবকিছু সৃষ্টি করেছি আর সবকিছু আমার দিকেই প্রত্যাবর্তন করবে। আমার দয়া ও করুণা তোমাদের ভাগ্যে জুটেছে। তাই আমি তোমাদের মাঝে এই ব্যক্তিকে প্রেরণ করেছি। তার মাধ্যমে আমি তোমাদেরকে সে পথের সন্ধান দেবো, যে পথে চললে আমি তোমাদের মৃত্যুর পর আমার আজাব থেকে নিষ্কৃতি দেবো এবং তোমাদেরকে আমার নির্মিত দারুস সালামে (জান্নাতে) স্থান দেবো। স্বয়ং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি মহান সত্তার পক্ষ থেকে সত্য বাণী নিয়ে আগমন করেছেন। তিনি বলেছেন, যারা এই দ্বীনের বিষয়ে তোমাদের অনুসরণ করবে, তারা তোমাদের সম-অধিকার ভোগ করবে, সমদায়িত্ব পালন করবে। আর যারা এই দ্বীনকে প্রত্যাখ্যান করবে, তাদেরকে জিজিয়া প্রদানের প্রস্তাব দেবে। তারা জিজিয়া প্রদান করলে তোমরা যেভাবে নিজেদের নিরাপত্তাবিধান করো, সেভাবে তাদেরও নিরাপত্তা প্রদান করবে। আর যারা জিজিয়া প্রদানেও অস্বীকৃতি জানাবে, তাদের বিরুদ্ধে তোমরা যুদ্ধ করবে। যুদ্ধে আমিই তোমাদের মাঝে ফয়সালা করব। তোমাদের যারা যুদ্ধে নিহত হবে, আমি তাদেরকে আমার জান্নাতে দাখিল করব, আর যারা জীবিত থাকবে, তাদেরকে শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য করব।
সুতরাং এখন আপনি চাইলে হীনবল হয়ে জিজিয়া প্রদানের শর্ত গ্রহণ করতে পারেন, চাইলে যুদ্ধও করতে পারেন; অথবা ইসলামগ্রহণ করে নিজেকে মুক্তও করতে পারেন।
মুগিরা রাযি.-এর বক্তব্য শেষ হলে ইয়াযদিগারদ বলেন, 'তুমি আমাকে সম্বোধন করে এসব কথা বললে?' উত্তরে মুগিরা রাযি. বলেন, 'যিনি আমার সঙ্গে কথা বলেছেন, আমি তার সঙ্গেই কথা বলেছি। যদি আপনি ছাড়া অন্য কেউ আমার সঙ্গে কথা বলত, তাহলে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতাম না।'
এরপর ইয়াযদিগার্দ বলেন, 'দূতদেরকে হত্যা করার রীতি নেই। অন্যথায় আমি তোমাদের সবাইকে হত্যা করতাম। আমার কাছে তোমাদের কিছুই পাওয়ার নেই.।'
এরপর ইয়াযদিগার্দ তার অনুচরদের বলেন, 'একটুকরি মাটি নিয়ে এসো।' মাটি নিয়ে আসা হলে তিনি বলেন, 'টুকরিটি তাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্তজনের মাথায় তুলে দাও। তারপর তাদেরকে তাড়িয়ে মাদায়েনের নগরদ্বার দিয়ে বের করে দাও।'
এরপর তিনি প্রতিনিধিদলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'তোমরা তোমাদের সেনাপতির কাছে ফিরে যাও। তাকে গিয়ে জানাও যে, আমি তোমাদের দফারফা করার জন্য রুস্তমকে পাঠাচ্ছি। সে তাকে-সহ তোমাদেরকে কাদিসিয়ার গর্তে দাফন করবে এবং তোমাদের সকলকে চূড়ান্ত লাঞ্ছিত করে ছাড়বে। এরপর আমি তাকে তোমাদের দেশেও পাঠাব। আমাদের সাবেক সেনাপতি সাবুর তোমাদেরকে অতীতে যে তিক্ত অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছিল, রুস্তম তোমাদেরকে তারচেয়েও বেশি কিছু উপহার দেবে।'
এরপর ইয়াযদিগার্দ প্রশ্ন করেন, 'তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত কে?' সকলে চুপ করে থাকলে হজরত আছিম বিন আমর রাযি. মাটির টুকরি নেওয়ার জন্য অগ্রসর হয়ে বলেন, 'আমি তাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত এবং তাদের সর্দার। আমার মাথায় টুকরিটি তুলে দিন।' ইয়াযদিগার্দ সকলকে জিজ্ঞেস করেন, 'তার দাবি কি সত্য?' সকলে সম্মতিসূচক ইঙ্গিত করলে সম্রাটের নির্দেশে টুকরিটি আছিম রাযি.-এর কাঁধে তুলে দেওয়া হয়। আছিম রাযি. টুকরিটি নিয়ে দ্রুত রাজপ্রাসাদ থেকে বের হয়ে যান এবং নিজের বাহনের কাছে পৌঁছে টুকরিটি বাহনে তুলে নেন। এরপর প্রতিনিধিদলের সকলে সেনাপতি সাদের কাছে ফিরে আসেন। আছিম বিন আমর রাযি. সবার আগে তার কাছে পৌঁছান এবং সাদ রাযি.-কে বলেন, 'মহান সেনাপতি! বিজয়ের সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আল্লাহ চাহে তো আমরাই বিজয়ী হব।' এরপর তিনি মাটিগুলো পাথরের ওপর ফেলে দেন এবং সাদের কাছে ফিরে এসে তাকে বিস্তারিত অবহিত করেন। সব শুনে সাদ রাযি. বলেন, 'সকলে সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহ আমাদের হাতে তাদের রাজত্বের চাবিকাঠি তুলে দিয়েছেন।'
এদিকে ইয়াযদিগাব্দের নির্দেশে সেনাপতি রুস্তম এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করে, যার অর্ধেকই ছিল অশ্বারোহী সৈনিক। মূল বাহিনীর সঙ্গে আরও ছিল এক লক্ষ বিশ হাজার ভৃত্য ও সেবক। বাহিনীর সঙ্গে বেশ কয়েকটি হাতিও নেওয়া হয়।
যুদ্ধসরঞ্জাম ও বিলাসসামগ্রীর এক বিশাল বহর নিয়ে রুস্তম মহা সমারোহে মাদায়েন হতে রওনা হয়। সাজসরঞ্জাম পরিমাণে এত বেশি ও ভারী ছিল যে, রাজধানী মাদায়েন থেকে কাদিসিয়া পর্যন্ত একশ ষাট কিলোমিটারের চেয়ে সামান্য বেশি পথ পাড়ি দিতে পারসিক বাহিনীর সময় লাগে প্রায় চার মাস! অর্থাৎ দৈনিক গড়ে মাত্র সোয়া এক কিলোমিটার!

টিকাঃ
১২২. ফার্সি কবি আবুল কাসিম ফিরদাউসি রচিত ইতিহাসনির্ভর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘শাহনামা’- তে এই রুস্তমকেই বীর যোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং তার পুত্র সোহরাবের সঙ্গে তার মোকাবিলার ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাভাষায়ও সুপ্রসিদ্ধ এ গল্পটি ‘সোহরাব-রুস্তম’ নামে সুপ্রসিদ্ধ। আমরা অনেকেই সোহরাব-রুস্তমের ট্রাজেডিক গল্পটি পড়ে কেঁদে বুক ভাসাই; কিন্তু জানিও না যে, এই রুস্তম মুসলমান ছিল না, ছিল ইসলামের ঘোরতর দুশমন!

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00