📄 উল্লায়সের খণ্ডযুদ্ধ: আহত সিংহের প্রতিশোধ
আহত মুসান্না কিন্তু মোটেও হতোদ্যম হননি। পারসিক বাহিনীর গতিবিধির পর্যবেক্ষণে তার চোখজোড়া ছিল নির্ঘুম, অশান্ত। তার সঙ্গী মুসলিম বাহিনীর সদস্যরাও ছিল শত আঘাতে অটল-অবিচল। সেতুর যুদ্ধের পরদিনই পারসিক বাহিনীর দুজন সেনাপতি একদল অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে ফোরাত নদীর পশ্চিম পাশে উল্লায়স নামক স্থানে মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবনে বের হলে মুসলিম বাহিনীর গোয়েন্দারা তাদের সংবাদ পেয়ে যায়। মুসান্না কয়েকজন সৈন্য নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালান এবং সেনাপতিদ্বয়কে বন্দি ও হত্যা করতে সক্ষম হন। এর ফলে পারসিকদের অন্তরে নতুন করে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
উল্লায়সের যুদ্ধ যদিও অতি সংক্ষিপ্ত ও স্বল্পস্থায়ী একটি যুদ্ধ ছিল; কিন্তু চলমান প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। পারসিকরা কল্পনাও করতে পারেনি যে, সেতুর যুদ্ধে এমন কঠিন দুর্যোগের সম্মুখীন হওয়ার পরও এত দ্রুত মুসলমানরা এভাবে তাদের ওপর হামলা চালাতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পারসিকদের মানসিক শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। বিপরীতে এই যুদ্ধে জয়লাভ করে মুসান্নার বাহিনী একদিকে মানসিকভাবে সবল হয়ে ওঠে, অপরদিকে প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দুজন সেনাপতিকে হত্যা করে কিছুটা হলেও সেতুর যুদ্ধের দুঃখ লাঘব করতে সক্ষম হয়।
এরপর পারস্য অঞ্চলে চলমান বিজয়াভিযানের জন্য খলিফা উমর রাযি. নতুন করে সেনাসংগ্রহ শুরু করেন। তিনি এ ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সেনাসংগ্রহ করেন, যেন ইরাকে যথেষ্ট পরিমাণ সহায়তা পাঠানো যায়।
পারস্যের রাজদরবারে এ সংবাদ পৌঁছলে তারা সহায়ক বাহিনী পৌঁছার পূর্বেই মুসান্নাকে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এ উদ্দেশ্যে মিহরান বিন বাযান নামক নতুন এক সেনাপতি নির্ধারণ করে তার নেতৃত্বে এক লক্ষ অশ্বারোহী সৈন্য ও পঞ্চাশ হাজার পদাতিক সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করে। শুরু হয় মুসান্না ও তার হাজার-তিনেক সঙ্গীকে চিরতরে শেষ করার চূড়ান্ত পারসিক মিশন।
📄 বুওয়াইবের যুদ্ধ
মুসান্না তখন সসৈন্য হিরায় অবস্থান করছিলেন। পারসিকদের বিশাল সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে তিনি সেখান থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ফোরাত নদীর পশ্চিম পাড়ে মরুভূমিঘেঁষা বুওয়াইব নামক স্থানে চলে যান। জায়গাটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও বিস্তীর্ণ। মুসান্না চাচ্ছিলেন, এবার তিনিই পারসিক বাহিনীর জন্য মোকাবিলার স্থান নির্ধারণ করে দেবেন। পাশাপাশি মুসান্না দ্রুত সাহায্য চেয়ে মদিনায় জরুরি বার্তা পাঠান এবং তিনি যে স্থান পরিবর্তন করেছেন, তা-ও জানিয়ে দেন। ইতিমধ্যে মদিনা হতে জারির বিন আবদুল্লাহ আল-বাজালি রাযি.-এর নেতৃত্বে রওনা হওয়া অতিরিক্ত ফৌজ পথিমধ্যে মুসান্নার বার্তা পেয়ে পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে সঙ্গে থাকা নারীদের রেখে যায় এবং নিরাপত্তার জন্য সঙ্গে থাকা ভারী সামানপত্রও রেখে যায়। তারা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই মুসান্নার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য দ্রুত পথ চলতে থাকে এবং সফলও হয়। ফলে মুসান্নার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় বারো হাজারে। পারসিক বাহিনী নদীর পূর্ব প্রান্তে অবস্থান গ্রহণ করে। তাদের সেনাপতি মিহরান মুসান্নার কাছে হুবহু সেই বার্তাই প্রেরণ করে, যা ইতিপূর্বে তার পূর্বসূরি বাহমান আবু উবায়দার কাছে প্রেরণ করেছিল।
মুসান্না প্রত্যুত্তরে বার্তা পাঠান, 'তোমরা পার হয়ে চলে এসো।'
বুওয়াইবের যুদ্ধ ত্রয়োদশ হিজরি সনের রমজান মাসে সংঘটিত হয়। মুসান্না তার বাহিনীর সদস্যদের সেদিন রোজা না রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরু হতেই পারসিক বাহিনী সোৎসাহে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা মুখে ও ঘণ্টাধ্বনির মাধ্যমে বিকট আওয়াজ সৃষ্টি করে মুসলিম বাহিনীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ অটল-অবিচল থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। সেনাপতি মুসান্না শত্রুপক্ষের মূল অংশে ঢুকে পড়েন এবং শত্রুসেনাপতি মিহরানকে হত্যা করতে সক্ষম হন। (১১৭) সেনাপতির পতনে পারসিক বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং পলায়নে উদ্যত হয়। মুসান্না পূর্বেই তার বাহিনীর একটি অংশকে উপযুক্ত সময়ে শত্রুপক্ষের প্রত্যাবর্তনের পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। তারা এবার সেতু কেটে দেয়। ফলে পারসিক বাহিনীর একজন সৈন্যও সেদিন নিষ্কৃতি পায়নি। হয় তারা মুসলিম সৈন্যদের তরবারির আঘাতে বা নদীতে ডুবে নিহত হয় অথবা মরুভূমিতে পালিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়।
বুওয়াইবের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও মুসান্না ইরাকের উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন বাজার-ঘাটে একের পর এক ঝটিকা হামলা অব্যাহত রেখে শত্রুপক্ষকে সন্ত্রস্ত করে রাখেন। এ যেন এক অনিঃশেষ গেরিলা যুদ্ধ! বাধ্য হয়ে পারসিকরা নতুন করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি বোলায় এবং নতুন যুবক সম্রাট ইয়াযদিগারদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। শুরু হয় মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নতুন করে সেনাসমাবেশের প্রস্তুতি।
আকস্মিক এই পট পরিবর্তনের সংবাদ (১১৮) মদিনায় খলিফাতুল মুসলিমিনের দরবারেও পৌঁছে যায়। তিনি মুসান্নাকে ইরাকের মূল ভূখণ্ড ছেড়ে ইরাক সীমান্তে সতর্ক অবস্থানের নির্দেশ দেন। উমর রাযি. চাচ্ছিলেন—এই ফাঁকে মুসলিম বাহিনীকে বিন্যস্ত করতে এবং পুরো শক্তি একত্র করে এমন এক চূড়ান্ত অভিযান শুরু করতে, যা সুপ্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের সমাপ্তিরেখা টেনে দেবে।
এ উদ্দেশ্যে উমর রাযি. মুসলিম ভূখণ্ডের শহর-গ্রাম সর্বত্র একটি বার্তা প্রেরণ করেন। বার্তায় উল্লেখ ছিল—যাদের যুদ্ধাস্ত্র, ঘোড়া কিংবা লড়াই-যোগ্যতা আছে, এমন কাউকে বাদ দিয়ো না। প্রত্যেককে বেছে নাও; এরপর আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। দ্রুত! অতি দ্রুত!
এই চূড়ান্ত অভিযানের সর্বাধিনায়ক নির্ধারণের জন্য খলিফা তার উপদেষ্টা-পর্ষদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তারা এ পদে সাদ বিন আবু ওয়াককাস রাযি.-এর নাম প্রস্তাব করলে উমর রাযি. তাতে সম্মতি জানান। নিঃসন্দেহে এ নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সঠিক। হজরত সাদ রাযি. হলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ-সাহাবির অন্যতম। যুদ্ধক্ষেত্রে তার সবিশেষ দক্ষতার কারণে তার উপাধি ছিল আসাদ বা সিংহ। তার জন্যই নবীজি দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি তার দোয়া কবুল করবেন এবং তার নিশানা নির্ভুল করে দেবেন।’ তিনি ছিলেন সপ্তম ইসলামগ্রহণকারী। ইসলামগ্রহণের সময় তার বয়স ছিল উনিশ বছর। সম্পর্কে তিনি ছিলেন নবীজির মামা। (১১৯)
টিকাঃ
১১৭. ইবনে কাছির এ ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছেন এবং মিহরানের হত্যাকারী হিসেবে ভিন্ন নাম উল্লেখ করেছেন। দেখুন: ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/২৯।
১১৮. একই সময় ইরাকের বিজিত বিভিন্ন নগরীর জনগণ মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করে অসদাচরণ শুরু করে এবং বিভিন্নভাবে মুসলিম প্রশাসক ও সাধারণ জনগণকে নিপীড়ন করতে থাকে। পরিবর্তিত অবস্থার কারণে খলিফা উমর ইরাকে অবস্থানরত মুসলিম সৈন্যদেরকে নির্দেশ দেন যে, তারা যেন মূল শহরগুলো থেকে সরে এসে সীমান্তে অবস্থান গ্রহণ করে। দেখুন: ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৩৫।
১১৯. ঐতিহাসিকগণ সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাযি.-এর গুণ-কীর্তি আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন—তিনি ইসলামের জন্য প্রথম তির নিক্ষেপকারী, ইসলামের জন্য প্রথম রক্তপ্রবাহিতকারী। তিনি নবীজির সঙ্গে সবগুলো গাযওয়ায় অংশগ্রহণ করেছেন। উহুদ যুদ্ধে তিনি অনন্যসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দেন। কথিত আছে, উহুদ যুদ্ধে তিনি এক হাজার তির নিক্ষেপ করেছিলেন। সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাযি. সমকালীন কুরাইশ বংশের শ্রেষ্ঠতম বীর-যোদ্ধা বিবেচিত হতেন। তিনি সফরে নবীজির প্রহরার দায়িত্ব পালন করতেন। আশারায়ে মুবাশশারা বা দুনিয়াতেই সুস্পষ্ট ভাষায় জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবির অন্যতম সাদ রাযি. সবশেষে মৃত্যুবরণকারী মুহাজির সাহাবি। তিনি হাতেগোনা সেসব সৌভাগ্যবান সাহাবির একজন, যাদের ক্ষেত্রে নবীজি 'আমার মাতা-পিতা তোমার জন্য কুরবান হোক' বাক্য উচ্চারণ করেছেন।
📄 নতুন পরিকল্পনা
খলিফা উমর রাযি. সেনাপতি সা‘দের জন্য অতি সূক্ষ্ম পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। মুসলিম বাহিনী কোথায় শিবির স্থাপন করবে, তিনি তাও নির্দিষ্ট করে দেন। খলিফা সা‘দকে কাদিসিয়ার ময়দানে (১২০) শিবির স্থাপন করতে বলেন। তিনি তাকে কাদিসিয়ার বৈশিষ্ট্যাবলি সম্পর্কেও অবগত করেন। খলিফা তাকে আদেশ করেন যে, শত্রুবাহিনী পৌঁছা পর্যন্ত মুসলিম বাহিনী যেন সেখানেই অবস্থান করে এবং পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, কিছুতেই যেন সে স্থান ত্যাগ না করে। এরপর খলিফা উমর তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে নিয়ে মুসলিম বাহিনীর জন্য মূল যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে শুরু করেন।
ইরাকে বিজয়াভিযান যখন শুরু করা হয়, তখন পরিকল্পনা ছিল, মুসলিম বাহিনী প্রথমে ফোরাতের পশ্চিম তীরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাবে, এরপর হীরা দখল করবে, তারপর ক্রমান্বয়ে তৎকালীন পারস্যের রাজধানী মাদায়েনের দিকে অগ্রসর হবে। কিন্তু কাদিসিয়াকে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচনের কারণে উপদেষ্টাগণ পরিকল্পনা পরিবর্তনের প্রয়োজন অনুভব করেন। এবার পরিকল্পনা করা হয়—শত্রুপক্ষকে ধীরে ধীরে কাদিসিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে টেনে নিয়ে আসা হবে। এর ফলে মুসলিম বাহিনীর পেছনে থাকবে আরবদের আজনা বিচরণভূমি সুবিশাল মরুভূমি আর উভয় পক্ষের মাঝে থাকবে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নদনদী ও প্রাকৃতিক জলধারাবিশিষ্ট এক জটিল সমতলভূমি। পারসিক বাহিনী বাধ্য হয়েই এই দুর্গম সমতলভূমি পাড়ি দেবে। আর তখন মুসলিম বাহিনীর পেছন দিক অনুকূল হলেও পারসিক বাহিনীর পৃষ্ঠদেশ হবে দুর্গম ও জটিল। আল্লাহর অনুগ্রহে যদি মুসলিম বাহিনী কাদিসিয়ায় বিজয় লাভ করে, তাহলে এরপর তারা তাদের মূল লক্ষ্য মাদায়েনের দিকে অগ্রসর হবে। এ ক্ষেত্রে তারা ফোরাত ও দজলা নদীর মাঝে অবস্থিত ইরাকের শ্যামলতম গ্রামীণ অঞ্চল সাওয়াদ হয়ে মাদায়েনে পৌঁছতে চেষ্টা করবে।
পরিকল্পনা প্রণয়ন শেষ। এবার আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করে তা বাস্তবায়নের পালা। আল্লাহু আকবার তাকবির-ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে চতুর্দশ হিজরির ১৩ শাবান (৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর) মুসলিম বাহিনী কাদিসিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। তারা প্রতিজ্ঞা করে—পারস্য-কিসরা ইয়াযদিগার্দের রাজমুকুট ও ধনভান্ডার না নিয়ে তারা কিছুতেই প্রত্যাবর্তন করবে না।
আল্লাহর কী মহিমা! সা'দের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী মুসান্নার বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার অল্প কদিন পূর্বেই ইরাকে ইসলামি বিজয়াভিযান-ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম মহান সেনাপতি মুসান্না বিন হারিসা রহ. ইন্তেকাল করেন। সেতুর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সদস্যদেরকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি একাই বিশাল পারসিক বাহিনীর সম্মুখে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। অবশেষে সেই ক্ষতই তার শাহাদাতের কারণ হয়।
টিকাঃ
১২০. কাদিসিয়া : বর্তমান ইরাকের কুফা ও হিল্লা নগরী হতে দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক নগরীর নাম কাদিসিয়া। ফোরাত নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত কাদিসিয়া নগরী ইসলামি বিজয়াভিযানের পূর্বে ক্ষুদ্র একটি জনপদ ছিল।
📄 কাদিসিয়া-অভিযান: ইসলামি ইতিহাসের এক নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ
নবীজির ইন্তেকালের পর ইসলামি ইতিহাসে অনেক যুদ্ধই সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসবোদ্ধাদের কাছে অন্য কোনো যুদ্ধই কাদিসিয়ার যুদ্ধের মতো অধিক গুরুত্ব লাভ করেনি। এর কারণও আছে। মূলত কাদিসিয়ার যুদ্ধের মাধ্যমেই পারস্যে মুসলিম বাহিনীর বিজয়াভিযান পূর্ণতা লাভ করে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রবল প্রতাপে সুবিশাল ভূখণ্ড শাসনকারী পারস্য সাম্রাজ্যের পতন নিশ্চিত হয়ে যায়। আর তাই ঐতিহাসিকগণ এ যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ যথেষ্ট বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন।
ঐতিহাসিক তাবারি র. বলেন—
আরব উপদ্বীপের প্রতিটি জনপদের সকল মানুষ এ যুদ্ধের ফলাফল জানার জন্য নিয়মিত যুদ্ধের সংবাদ জানতে সচেষ্ট ছিল। এমনকি তখন আরবের কেউ গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ সম্পাদনের প্রয়োজন হলেও এ কথা বলত, ‘কাদিসিয়ায় কী ঘটে, তা জানার আগে আমি এ বিষয়ে চিন্তাই করব না’।(১২১)
ঐতিহাসিকগণ কাদিসিয়া-যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ যতটা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, একই সময়ে শাম অঞ্চলে রোমানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অভিযানের আলোচনা ততটা বিশদভাবে করেননি। কারণ, রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধাভিযান তখনও চূড়ান্ত ও নিষ্পত্তিমূলক পর্যায়ে উপনীত হয়নি। রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল এরপরও দীর্ঘ কয়েক শতক পর্যন্ত টিকে ছিল। অবশেষে ৮৫৭ হিজরি সনে (১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে) সপ্তম উসমানি খলিফা মহাবীর গাজি মুহাম্মাদ আল-ফাতিহ-এর হাতে কনস্টান্টিনোপল ও রোমান সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে।
কাদিসিয়ায় পৌঁছার পর সেনাপতি সাদ রাযি. এক মাস সেখানেই অবস্থান করেন। কিন্তু পারসিকদের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার যুদ্ধতৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছিল না। তখন তিনি খলিফার কাছে বার্তা পাঠিয়ে জানিয়ে দেন যে, তারা আমাদের বিরুদ্ধে কাউকে প্রেরণ করেনি এবং আমাদের জানামতে কাউকে যুদ্ধের দায়িত্বও দেয়নি।
সেনাপতি সাদ রাযি. দীর্ঘ এক বছর সেখানে অবস্থান করেন। এ সময়ের মধ্যে বিভিন্ন খণ্ডযুদ্ধ ও সংঘর্ষ যেমন হয়, তেমনই সমঝোতা-সংলাপ প্রচেষ্টা ও চলে। এই পুরোটা সময় খলিফা উমর রাযি. নিয়মিত সাদ ও তার বাহিনীর সংবাদ রাখছিলেন এবং সাদের উদ্দেশে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা ও নসিহত প্রেরণ করছিলেন। একবার তিনি সাদকে প্রেরিত পত্রে লেখেন-
হামদ ও সালাতের পর, তুমি মনোবল অটুট ও সুদৃঢ় রাখবে। সৈন্যদের নিয়মিত নসিহত করবে, নিষ্ঠাপূর্ণ নিয়ত ও সুধারণার প্রতি উদ্বুদ্ধ করবে। যারা এসব বিষয়ে গাফেল, তারাও যেন এসব বিষয়ে পরস্পর বারবার আলোচনা করে। সবসময় অটল-অবিচল থাকবে। কেননা, নিয়তের মান অনুসারে আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসে এবং নিষ্ঠার পরিমাণ হিসেবে আজর ও সাওয়াব মিলে। আপন দায়িত্ব ও পথ সম্পর্কে সতর্ক থাকবে। আল্লাহর কাছে আফিয়াত ও পূর্ণ সুস্থতা কামনা করবে এবং বেশি বেশি 'লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ' পাঠ করবে। আর আমাকে লিখে জানাবে যে, শত্রুবাহিনী কত দূর পৌঁছেছে এবং তাদের নেতৃত্ব কে দিচ্ছে। কারণ, তোমরা যাদের বিরুদ্ধে লড়তে যাচ্ছ, তাদের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণ অবগতি না থাকায় আমি (তোমাকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য) যা লিখতে চাচ্ছি, তা লিখতে পারছি না। আমাকে মুসলিম বাহিনীর মনজিলসমূহ সম্পর্কে অবগত করবে এবং তোমাদের অবস্থানস্থল ও মাদায়েনের মাঝে যেসব এলাকা আছে, সেগুলো সম্পর্কেও বিস্তারিত অবহিত করবে। পুরো বিবরণ এমন সুস্পষ্টভাবে লিখবে, যেন আমার চোখের সামনে সামগ্রিক পরিস্থিতি দৃশ্যমান হয়। আমাকে তোমাদের বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে অবহিত করবে। মহান আল্লাহর প্রতি যুগপৎ ভয় ও আশা পোষণ করবে। আর মনে রাখবে, আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহর প্রতিশ্রুতির প্রতি পূর্ণ ইয়াকিন ও বিশ্বাস রাখবে। তিনি প্রতিশ্রুতির ব্যতিক্রম করেন না। এমন যেন না হয় যে, তোমাদের অসতর্কতার কারণে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি তোমাদের কাছ থেকে সরে যায় এবং আল্লাহ তাআলা এ কাজের জন্য অন্য কাউকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করেন।
অন্য এক পত্রে খলিফা লেখেন-
হামদ ও সালাতের পর, আমি তোমাকে এবং তোমার সঙ্গী সৈনিকদেরকে সর্বাবস্থায় তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছি। কারণ, তাকওয়া হলো যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠতম উপকরণ। তোমাকে ও তোমার সঙ্গীদেরকে আরও নির্দেশ দিচ্ছি যে, তোমরা শত্রুপক্ষের তুলনায় গুনাহ থেকে আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে অধিক সচেষ্ট থাকবে। কারণ, শত্রুপক্ষের চেয়ে গুনাহ বেশি থাকা একটি বাহিনীর জন্য অনেক বড় ভয়ের কারণ। প্রতিপক্ষ আল্লাহর অবাধ্য বলেই মুসলমানরা যুদ্ধে আল্লাহর সাহায্য লাভ করে। আর নয়তো তাদের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো শক্তিই থাকত না। জনশক্তি বা অস্ত্রশক্তি, যুদ্ধপ্রস্তুতি কিংবা যুদ্ধসরঞ্জাম, সর্বক্ষেত্রেই তো আমরা তাদের চেয়ে পিছিয়ে। এখন গুনাহের ক্ষেত্রে যদি আমরা তাদের সমান হয়ে যাই, তাহলে তো আমাদের ওপর তারা শ্রেষ্ঠত্ব পেয়ে যাবে।
টিকাঃ
১২১. ইবনে জারির তাবারি, তারিখুর-রুসুলি ওয়াল-মুলুক, ৩/৫৮২।