📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 নামারিকের যুদ্ধ

📄 নামারিকের যুদ্ধ


আবু উবায়দের নেতৃত্বাধীন দশ হাজার সৈন্যবিশিষ্ট মুসলিম বাহিনী ইরাক অভিমুখে রওনা হয়। ত্রয়োদশ হিজরির ৮ শাবান মুসলিম বাহিনী ইরাকের নামারিক নামক স্থানে এক লক্ষ সৈন্যবিশিষ্ট পারসিক বাহিনীর মুখোমুখি হয় এবং তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। আবু উবায়দ পারসিক বাহিনীর পলায়নরত সৈন্যদের তাড়া করেন।
এরপর কাসকার অঞ্চলের সাকাতিয়্যা নামক এলাকায় আবারও মুসলিম বাহিনী পারসিক বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে তাদেরকে পরাজিত করে। এরপর বারুসমার যুদ্ধেও মুসলিম বাহিনী তাদেরকে পরাজিত করে। উভয় যুদ্ধই ত্রয়োদশ হিজরিতে সংঘটিত হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সেতুর যুদ্ধ: উহুদের পর মুসলমানদের প্রথম পরাজয়

📄 সেতুর যুদ্ধ: উহুদের পর মুসলমানদের প্রথম পরাজয়


বারুসমার যুদ্ধে জয়লাভ করার পর মুসলিম বাহিনী তাদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখে। ইতিমধ্যে পরাজিত পারসিক বাহিনী পুনরায় সংগঠিত হয়। বাহমান নামক জনৈক ধূর্ত ও সুদক্ষ সেনাপতিকে এবার পারসিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। বিশাল সেনাবাহিনী ও হাতির বহর নিয়ে পারসিক বাহিনী ফুরাত নদীর পূর্ব পার্শ্বে শিবির স্থাপন করে। মুসলিম বাহিনী শিবির স্থাপন করে নদীর পশ্চিম তীরে। পেছনে ছিল মরুভূমির বিস্তীর্ণ প্রান্তর, যেদিক দিয়ে আরব উপদ্বীপ হতে সহজেই যেকোনো ধরনের সামরিক সহায়তা পৌঁছা সম্ভব ছিল।
পারসিক সেনাপতি বাহমান মুসলিম সেনাপতি আবু উবায়দের কাছে বার্তা পাঠিয়ে প্রস্তাব দেয় যে, আপনারা নদী পার হয়ে এপারে চলে আসুন। সে ক্ষেত্রে আমরা আপনাদের নদী পাড়ি দেওয়ার সুযোগ দেবো এবং এপারে জায়গা খালি করে দেবো। অন্যথায় আমরা নদী পার হয়ে আপনাদের কাছে চলে আসি। আপনারা আমাদের পার হওয়ার সুযোগ দিন।
সেনাপতি আবু উবায়দ তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে এ বিষয়ে পরামর্শ করেন। সকলেই নদী পার না হওয়ার পরামর্শ দেন। তারা এ-ও বলেন যে, ‘আমরা তো এমন স্থানে শিবির স্থাপন করেছি, যেখানে কৌশলে পিছু হটা, নিরাপদ আশ্রয়গ্রহণ বা পশ্চাদপসরণ—সব সুযোগই আছে।’ কিন্তু সেনাপতি আবু উবায়দ এই বলে নদী পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন যে, ‘তারা আমাদের চেয়ে মৃত্যুর ব্যাপারে অধিক নির্ভীক নয়। সুতরাং আমরাই পার হয়ে ওপারে যাব।’
এরপর আবু উবায়দ তার বাহিনীকে পার করাতে সেতু তৈরির সিদ্ধান্ত নেন। মুসলিম বাহিনী নদী পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাহমান খুশি হয়। সে তো এমনটিই চেয়েছিল। এতটুকু কৌশলেই তুষ্ট না থেকে বাহমান এরপর যে স্থানটিতে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করতে চাচ্ছিল, তাও নির্দিষ্ট করে নেয় এবং নদীর পূর্ব তীরের অতি সংকীর্ণ একটি জায়গা খালি করে দেয়। ফুরাত নদীর বড় দুটি শাখা সংকীর্ণ জায়গাটিকে ইংরেজি ইউ (U) আকৃতির ন্যায় ঘিরে রেখেছিল। ফলে মুসলিম বাহিনী নদী পার হয়ে এমন এক স্থানে অবতরণ করে, যা তিনদিক থেকে পানিবেষ্টিত।
ত্রয়োদশ হিজরির ২৩ শাবান সেতুর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলিম বাহিনীর নদী পাড়ি দেওয়া শেষ হতেই পারসিক বাহিনী তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পারসিক বাহিনীর সঙ্গে থাকা হাতির পাল দেখে মুসলিম বাহিনীর অশ্বগুলো ভীত হয়ে পড়ে এবং অবাধ্য আচরণ শুরু করে। ফলে মুসলিম বাহিনীর অশ্বারোহী অংশ কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে অশ্বারোহী সৈনিকরা ঘোড়া হতে নেমে পায়ে হেঁটে যুদ্ধ শুরু করে।
মুসলিম সেনাপতি আবু উবায়দ যেকোনো মূল্যে শত্রুপক্ষের হাতিগুলোকে অকার্যকর করে ফেলতে চাচ্ছিলেন। তিনি মুসলিম সৈনিকদের হাতিগুলোকে ঘিরে ফেলার এবং হাতির পিঠে বেঁধে রাখা বাক্সগুলোর ফিতা কেটে ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি নিজে হাতির পালের মূল হাতিটিকে হত্যা করার জন্য অগ্রসর হন। কিন্তু হাতিটি তাকে পিষে ফেলে এবং তিনি শহিদ হন। পূর্বেই আবু উবায়দ রাযি. নিজ গোত্র বনু ছাকিফের সাতজন ব্যক্তিকে পর্যায়ক্রমে নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছিলেন। একে একে তারা প্রত্যেকেই বড় হাতিটিকে হত্যা করার চেষ্টা চালিয়ে সকলেই নিহত হয়। অবশেষে মুসলিম বাহিনীর ঝান্ডা গ্রহণ করেন মুসান্না বিন হারিসা।
প্রতিকূল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মুসান্না সকলকে সেতু পাড়ি দিয়ে পশ্চাদপসরণের নির্দেশ দেন। কেননা, মুসলিম বাহিনী ততক্ষণে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং সর্ববিচারেই পুনঃআক্রমণ ক্ষতির কারণ বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু ছাকিফ গোত্রের আবদুল্লাহ বিন মুরছাদ নামক জনৈক যোদ্ধার এ সিদ্ধান্ত পছন্দ হচ্ছিল না। আত্মমর্যাদা ও যুদ্ধস্পৃহায় উদ্দীপ্ত হয়ে সে সেতু কেটে দেয় এবং চিৎকার করে বলতে থাকে, মুসলিম সৈন্যরা!
তোমাদের সেনাপতিগণ যে লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে শহিদ হয়ে গেছেন, তোমরাও সে লক্ষ্যে শাহাদাতের মৃত্যু বরণ করে নাও অথবা সফলতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হও। সেতু কেটে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে যে কেউ বলবে, কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসলিম বাহিনী নিশ্চিত ধ্বংসের শিকার হতে যাচ্ছে। মুসলিম বাহিনীর অনেকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে; ডুবে মারা যায় প্রায় দু-হাজার সৈন্য। এদিকে সেনাপতি মুসান্না ও একদল সাহাবি মিলে সেতুটি মেরামত করে পুনরায় ব্যবহার-উপযোগী করতে সচেষ্ট হন।
মুসলিম বাহিনী যেন সেতু মেরামত করতে না পারে, এ উদ্দেশ্যে পারসিক বাহিনী বিশেষ করে সেতুর কাছে সমবেত হয়েছিল। তাই মুসলিম বাহিনীর একদল সৈন্য সেতু মেরামত করছিল, অন্যরা পারসিক বাহিনীকে বাধা দিয়ে রাখছিল, যেন প্রথম দল নিরাপদে সেতু মেরামত করতে পারে। পুনরায় সেতু নির্মাণে মুসলিম বাহিনী সফল হওয়ার পর সেনাপতি মুসান্না একদল সৈন্য নিয়ে সেতুর কাছে প্রতিরক্ষায় দাঁড়িয়ে যান এবং অবশিষ্ট সৈন্যদের নিরাপদে নদী পার হওয়ার পথ করে দেন। সবাই পার হওয়ার পর বাকি থাকেন কেবল মুসান্না বিন হারিসা। ততক্ষণে তিনি শত্রুপক্ষের আঘাতে আঘাতে মৃতপ্রায় অবস্থায় উপনীত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও নিরাপদে সেতু পাড়ি দিতে সক্ষম হন এবং অন্যদের সঙ্গে মিলিত হন। এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর শহিদানের সংখ্যা ছিল চার হাজার। অপরদিকে পারসিক বাহিনীর নিহত সৈন্যের সংখ্যা ছিল ছয় হাজার। এটি ছিল পারসিক বাহিনীর কাছে মুসলিম বাহিনীর প্রথম ও শেষ পরাজয়।
পরাজিত মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ মানসিকভাবেও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। ক্লান্ত-বিধ্বস্ত শরীরে তারা মদিনায় ফিরে আসে। মুসান্নার সঙ্গে রয়ে যায় মাত্র তিন হাজার সৈন্য; পরাজয় যাদেরকে প্রভাবিত করতে পারেনি। তারা এবার প্রতিশোধ গ্রহণের সংকল্প করে।
প্রত্যাবর্তনকারী সৈন্যরা মদিনায় পৌঁছলে মদিনাবাসী তাদেরকে পলাতক বলে ধিক্কার দিতে থাকে। কিন্তু খলিফা উমর রাযি. সকলকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আল্লাহর বান্দারা, অস্থির ও ধৈর্যহারা হয়ো না। হে আল্লাহ, প্রত্যেক মুসলমান আমার পক্ষ থেকে দায়মুক্ত। আমি প্রত্যেক মুসলমানের সহযোগী। শত্রুর মোকাবিলা করতে গিয়ে যারা প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে, আমি তাদের সহযোগী।'
এরপর তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা আবু উবায়দের প্রতি রহম করুন। যদি সে নদী পাড়ি না দিয়ে এপারেই অবস্থান করত কিংবা (শক্তিবৃদ্ধির জন্য) আমাদের কাছে চলে আসত, তাহলে তো আমরা তাকে সহযোগিতা করতে পারতাম।'
এটি আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহ যে, সেতুর যুদ্ধে জয়লাভ করার পর পারসিক বাহিনী মুসলিম বাহিনীকে সমূলে শেষ করার জন্য পশ্চাদ্ধাবনে আগ্রহী হয়নি। অথচ লক্ষণীয় মাত্রায় সৈন্যসংখ্যার পাল্লা ভারী হওয়ায় তাদের পক্ষে তা একেবারেই সহজ ছিল। মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বিজয়ের আনন্দেই তারা তুষ্ট ছিল। সম্ভবত তাদের কেবল এমন একটি বিজয় প্রয়োজন ছিল, যার মাধ্যমে নিজেদের নুয়ে পড়া মানসিকতাকে পুনরুজ্জীবিত করা যায়। (১১৬)

টিকাঃ
১১৬. অবশ্য ঐতিহাসিক ইবনুল আছিরের বর্ণনামতে পারসিক বাহিনীর প্রধান বাহমান পলায়নরত মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবনের মনস্থ করেছিল। কিন্তু এরইমধ্যে তার কাছে সংবাদ পৌঁছায় যে, মাদায়েনে পারস্য সাম্রাজ্যের ক্ষমতা নিয়ে ব্যাপক গোলযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাই বাধ্য হয়ে সে মাদায়েনে ফিরে যায়। দেখুন—আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারিখ, ২/২৭৮।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উল্লায়সের খণ্ডযুদ্ধ: আহত সিংহের প্রতিশোধ

📄 উল্লায়সের খণ্ডযুদ্ধ: আহত সিংহের প্রতিশোধ


আহত মুসান্না কিন্তু মোটেও হতোদ্যম হননি। পারসিক বাহিনীর গতিবিধির পর্যবেক্ষণে তার চোখজোড়া ছিল নির্ঘুম, অশান্ত। তার সঙ্গী মুসলিম বাহিনীর সদস্যরাও ছিল শত আঘাতে অটল-অবিচল। সেতুর যুদ্ধের পরদিনই পারসিক বাহিনীর দুজন সেনাপতি একদল অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে ফোরাত নদীর পশ্চিম পাশে উল্লায়স নামক স্থানে মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবনে বের হলে মুসলিম বাহিনীর গোয়েন্দারা তাদের সংবাদ পেয়ে যায়। মুসান্না কয়েকজন সৈন্য নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালান এবং সেনাপতিদ্বয়কে বন্দি ও হত্যা করতে সক্ষম হন। এর ফলে পারসিকদের অন্তরে নতুন করে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
উল্লায়সের যুদ্ধ যদিও অতি সংক্ষিপ্ত ও স্বল্পস্থায়ী একটি যুদ্ধ ছিল; কিন্তু চলমান প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। পারসিকরা কল্পনাও করতে পারেনি যে, সেতুর যুদ্ধে এমন কঠিন দুর্যোগের সম্মুখীন হওয়ার পরও এত দ্রুত মুসলমানরা এভাবে তাদের ওপর হামলা চালাতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই পারসিকদের মানসিক শক্তি দুর্বল হয়ে যায়। বিপরীতে এই যুদ্ধে জয়লাভ করে মুসান্নার বাহিনী একদিকে মানসিকভাবে সবল হয়ে ওঠে, অপরদিকে প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দুজন সেনাপতিকে হত্যা করে কিছুটা হলেও সেতুর যুদ্ধের দুঃখ লাঘব করতে সক্ষম হয়।
এরপর পারস্য অঞ্চলে চলমান বিজয়াভিযানের জন্য খলিফা উমর রাযি. নতুন করে সেনাসংগ্রহ শুরু করেন। তিনি এ ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক সেনাসংগ্রহ করেন, যেন ইরাকে যথেষ্ট পরিমাণ সহায়তা পাঠানো যায়।
পারস্যের রাজদরবারে এ সংবাদ পৌঁছলে তারা সহায়ক বাহিনী পৌঁছার পূর্বেই মুসান্নাকে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং এ উদ্দেশ্যে মিহরান বিন বাযান নামক নতুন এক সেনাপতি নির্ধারণ করে তার নেতৃত্বে এক লক্ষ অশ্বারোহী সৈন্য ও পঞ্চাশ হাজার পদাতিক সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গঠন করে। শুরু হয় মুসান্না ও তার হাজার-তিনেক সঙ্গীকে চিরতরে শেষ করার চূড়ান্ত পারসিক মিশন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 বুওয়াইবের যুদ্ধ

📄 বুওয়াইবের যুদ্ধ


মুসান্না তখন সসৈন্য হিরায় অবস্থান করছিলেন। পারসিকদের বিশাল সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে তিনি সেখান থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ফোরাত নদীর পশ্চিম পাড়ে মরুভূমিঘেঁষা বুওয়াইব নামক স্থানে চলে যান। জায়গাটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত ও বিস্তীর্ণ। মুসান্না চাচ্ছিলেন, এবার তিনিই পারসিক বাহিনীর জন্য মোকাবিলার স্থান নির্ধারণ করে দেবেন। পাশাপাশি মুসান্না দ্রুত সাহায্য চেয়ে মদিনায় জরুরি বার্তা পাঠান এবং তিনি যে স্থান পরিবর্তন করেছেন, তা-ও জানিয়ে দেন। ইতিমধ্যে মদিনা হতে জারির বিন আবদুল্লাহ আল-বাজালি রাযি.-এর নেতৃত্বে রওনা হওয়া অতিরিক্ত ফৌজ পথিমধ্যে মুসান্নার বার্তা পেয়ে পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে সঙ্গে থাকা নারীদের রেখে যায় এবং নিরাপত্তার জন্য সঙ্গে থাকা ভারী সামানপত্রও রেখে যায়। তারা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই মুসান্নার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য দ্রুত পথ চলতে থাকে এবং সফলও হয়। ফলে মুসান্নার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় বারো হাজারে। পারসিক বাহিনী নদীর পূর্ব প্রান্তে অবস্থান গ্রহণ করে। তাদের সেনাপতি মিহরান মুসান্নার কাছে হুবহু সেই বার্তাই প্রেরণ করে, যা ইতিপূর্বে তার পূর্বসূরি বাহমান আবু উবায়দার কাছে প্রেরণ করেছিল।
মুসান্না প্রত্যুত্তরে বার্তা পাঠান, 'তোমরা পার হয়ে চলে এসো।'
বুওয়াইবের যুদ্ধ ত্রয়োদশ হিজরি সনের রমজান মাসে সংঘটিত হয়। মুসান্না তার বাহিনীর সদস্যদের সেদিন রোজা না রাখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। যুদ্ধ শুরু হতেই পারসিক বাহিনী সোৎসাহে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা মুখে ও ঘণ্টাধ্বনির মাধ্যমে বিকট আওয়াজ সৃষ্টি করে মুসলিম বাহিনীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ অটল-অবিচল থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। সেনাপতি মুসান্না শত্রুপক্ষের মূল অংশে ঢুকে পড়েন এবং শত্রুসেনাপতি মিহরানকে হত্যা করতে সক্ষম হন। (১১৭) সেনাপতির পতনে পারসিক বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং পলায়নে উদ্যত হয়। মুসান্না পূর্বেই তার বাহিনীর একটি অংশকে উপযুক্ত সময়ে শত্রুপক্ষের প্রত্যাবর্তনের পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার দায়িত্ব দিয়ে রেখেছিলেন। তারা এবার সেতু কেটে দেয়। ফলে পারসিক বাহিনীর একজন সৈন্যও সেদিন নিষ্কৃতি পায়নি। হয় তারা মুসলিম সৈন্যদের তরবারির আঘাতে বা নদীতে ডুবে নিহত হয় অথবা মরুভূমিতে পালিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়।
বুওয়াইবের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও মুসান্না ইরাকের উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন বাজার-ঘাটে একের পর এক ঝটিকা হামলা অব্যাহত রেখে শত্রুপক্ষকে সন্ত্রস্ত করে রাখেন। এ যেন এক অনিঃশেষ গেরিলা যুদ্ধ! বাধ্য হয়ে পারসিকরা নতুন করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রতি দৃষ্টি বোলায় এবং নতুন যুবক সম্রাট ইয়াযদিগারদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়। শুরু হয় মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নতুন করে সেনাসমাবেশের প্রস্তুতি।
আকস্মিক এই পট পরিবর্তনের সংবাদ (১১৮) মদিনায় খলিফাতুল মুসলিমিনের দরবারেও পৌঁছে যায়। তিনি মুসান্নাকে ইরাকের মূল ভূখণ্ড ছেড়ে ইরাক সীমান্তে সতর্ক অবস্থানের নির্দেশ দেন। উমর রাযি. চাচ্ছিলেন—এই ফাঁকে মুসলিম বাহিনীকে বিন্যস্ত করতে এবং পুরো শক্তি একত্র করে এমন এক চূড়ান্ত অভিযান শুরু করতে, যা সুপ্রাচীন পারস্য সাম্রাজ্যের সমাপ্তিরেখা টেনে দেবে।
এ উদ্দেশ্যে উমর রাযি. মুসলিম ভূখণ্ডের শহর-গ্রাম সর্বত্র একটি বার্তা প্রেরণ করেন। বার্তায় উল্লেখ ছিল—যাদের যুদ্ধাস্ত্র, ঘোড়া কিংবা লড়াই-যোগ্যতা আছে, এমন কাউকে বাদ দিয়ো না। প্রত্যেককে বেছে নাও; এরপর আমার কাছে পাঠিয়ে দাও। দ্রুত! অতি দ্রুত!
এই চূড়ান্ত অভিযানের সর্বাধিনায়ক নির্ধারণের জন্য খলিফা তার উপদেষ্টা-পর্ষদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। তারা এ পদে সাদ বিন আবু ওয়াককাস রাযি.-এর নাম প্রস্তাব করলে উমর রাযি. তাতে সম্মতি জানান। নিঃসন্দেহে এ নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সঠিক। হজরত সাদ রাযি. হলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ-সাহাবির অন্যতম। যুদ্ধক্ষেত্রে তার সবিশেষ দক্ষতার কারণে তার উপাধি ছিল আসাদ বা সিংহ। তার জন্যই নবীজি দোয়া করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি তার দোয়া কবুল করবেন এবং তার নিশানা নির্ভুল করে দেবেন।’ তিনি ছিলেন সপ্তম ইসলামগ্রহণকারী। ইসলামগ্রহণের সময় তার বয়স ছিল উনিশ বছর। সম্পর্কে তিনি ছিলেন নবীজির মামা। (১১৯)

টিকাঃ
১১৭. ইবনে কাছির এ ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছেন এবং মিহরানের হত্যাকারী হিসেবে ভিন্ন নাম উল্লেখ করেছেন। দেখুন: ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/২৯।
১১৮. একই সময় ইরাকের বিজিত বিভিন্ন নগরীর জনগণ মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করে অসদাচরণ শুরু করে এবং বিভিন্নভাবে মুসলিম প্রশাসক ও সাধারণ জনগণকে নিপীড়ন করতে থাকে। পরিবর্তিত অবস্থার কারণে খলিফা উমর ইরাকে অবস্থানরত মুসলিম সৈন্যদেরকে নির্দেশ দেন যে, তারা যেন মূল শহরগুলো থেকে সরে এসে সীমান্তে অবস্থান গ্রহণ করে। দেখুন: ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৩৫।
১১৯. ঐতিহাসিকগণ সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাযি.-এর গুণ-কীর্তি আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন—তিনি ইসলামের জন্য প্রথম তির নিক্ষেপকারী, ইসলামের জন্য প্রথম রক্তপ্রবাহিতকারী। তিনি নবীজির সঙ্গে সবগুলো গাযওয়ায় অংশগ্রহণ করেছেন। উহুদ যুদ্ধে তিনি অনন্যসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দেন। কথিত আছে, উহুদ যুদ্ধে তিনি এক হাজার তির নিক্ষেপ করেছিলেন। সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস রাযি. সমকালীন কুরাইশ বংশের শ্রেষ্ঠতম বীর-যোদ্ধা বিবেচিত হতেন। তিনি সফরে নবীজির প্রহরার দায়িত্ব পালন করতেন। আশারায়ে মুবাশশারা বা দুনিয়াতেই সুস্পষ্ট ভাষায় জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবির অন্যতম সাদ রাযি. সবশেষে মৃত্যুবরণকারী মুহাজির সাহাবি। তিনি হাতেগোনা সেসব সৌভাগ্যবান সাহাবির একজন, যাদের ক্ষেত্রে নবীজি 'আমার মাতা-পিতা তোমার জন্য কুরবান হোক' বাক্য উচ্চারণ করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00