📄 একটি ঐতিহাসিক চুক্তিপত্র
এরপর নগরীর চাবি বুঝে নিতে খলিফা উমর রাযি. নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। খলিফা সেখানে সন্ধিচুক্তির শর্তসমূহ উল্লেখপূর্বক একটি চুক্তিপত্র লেখান। চুক্তিপত্রে লেখা ছিল—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
এটি আল্লাহর বান্দা আমিরুল মুমিনিন উমরের পক্ষ থেকে ইলিয়াবাসীকে প্রদত্ত নিরাপত্তা-অঙ্গীকারনামা। তাদেরকে তাদের জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করা হচ্ছে। সুস্থ-অসুস্থ ও সকল ধর্মের অনুসারী নাগরিক এই নিরাপত্তা লাভ করবে। তাদের গির্জা ও ক্রুশ প্রতীকও এই নিরাপত্তার অন্তর্ভুক্ত হবে। তাদের গির্জাগুলো কেউ (কোনো মুসলমান) বসবাসের জন্য ব্যবহার করতে পারবে না, ভাঙতেও পারবে না। তাদের নির্মিত ভবন ও জমিজমায় কোনোপ্রকার হস্তক্ষেপ করা হবে না। তাদের ক্রুশ প্রতীক ও সম্পদেও কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না। ধর্মীয় বিষয়ে তাদের ওপর কোনো প্রকার বলপ্রয়োগ করা হবে না এবং কারও কোনো ক্ষতি করা হবে না। ইলিয়াতে তাদের সঙ্গে কোনো ইহুদি বসবাস করতে পারবে না।
অন্যান্য নগরীর অধিবাসীদের মতো ইলিয়াবাসীরও জিজিয়া আদায় করতে হবে। তাদের আরও কর্তব্য হলো, তারা রোমানদেরকে এবং চোর-ডাকাতদেরকে নগরী থেকে বের করে দেবে। ইলিয়াবাসী কেউ এখান থেকে নিজের ধনসম্পদসহ চলে যেতে চাইলে সে নিজের কাঙ্ক্ষিত নিরাপদ স্থানে পৌঁছা পর্যন্ত তার নিরাপত্তা বহাল থাকবে। একইভাবে বাইরের কেউ যদি ইলিয়ায় বসবাস করতে চায়, তাহলে তাকেও নিরাপত্তা প্রদান করা হবে এবং তারও জিজিয়া প্রদান করতে হবে। ইলিয়াবাসী কেউ নিজের জানমাল, ক্রুশ ও অন্যান্য ধর্মীয় জিনিসপত্র নিয়ে রোমানদের কাছে চলে যেতে চাইলে তাকেও তার আসবাবপত্রসহ আপন স্থানে পৌঁছা পর্যন্ত নিরাপত্তা প্রদান করা হবে।
(অমুকের হত্যার) পূর্ব থেকেই যারা ইলিয়ায় কৃষিক্ষেতের মালিক, তারা চাইলে এখানে থেকে যেতে পারবে (সে ক্ষেত্রে তাদের ইলিয়াবাসীর সমপরিমাণ জিজিয়া প্রদান করতে হবে), চাইলে রোমানদের সঙ্গে চলে যেতেও পারবে, আবার চাইলে নিজ পরিজনের কাছেও ফিরে যেতে পারবে। ফসল কাটার পূর্ব পর্যন্ত তাদের কোনো কিছু প্রদান করতে হবে না।
এই অঙ্গীকারপত্রের প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহ, তার রাসুল, খলিফাগণ ও মুমিনগণ জিম্মাদার; শর্ত হলো ইলিয়াবাসী আরোপিত জিজিয়া ঠিকভাবে প্রদান করবে। - উমর ইবনুল খাত্তাব
সন্ধিপত্রটি লেখেন মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান রাযি. আর সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি., আমর ইবনুল আস রাযি. ও আবদুর রহমান বিন আওফ রাযি.। ষোড়শ হিজরি সন, মোতাবেক ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে চুক্তিপত্রটি লিখিত হয়।
ঐতিহাসিক এই চুক্তিপত্রটি আজও বায়তুল মুকাদ্দাসের আল-কিয়ামা গির্জায় (The Church of the Holy Sepulchre) সংরক্ষিত আছে। ইতিহাস সাক্ষী, তখন থেকে নিয়ে যতদিন বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের হাতে ছিল, সেই ষোড়শ হিজরি সন (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে নিয়ে ইংরেজদের হাতে ১৩৩৬ হিজরি সনে (১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে) উসমানি খিলাফতের নিয়ন্ত্রণাধীন আল-কুদসের পতনকাল পর্যন্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলমানরা চুক্তির প্রতিটি শর্ত অক্ষরে অক্ষরে রক্ষা করেছিল।
চুক্তিপত্র লেখা শেষ হওয়ার পূর্বেই নামাজের সময় হয়ে যায়। উপস্থিত খ্রিষ্টান ধর্মীয় নেতা উমর রাযি.-কে আল-কিয়ামা গির্জাতেই নামাজ আদায় করে নিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু খলিফা তাতে অসম্মতি প্রকাশ করে বলেন, আমার আশঙ্কা হয়, আমি যদি এখানে নামাজ আদায় করি, ভবিষ্যতে মুসলমানগণ এই যুক্তিতে গির্জাটির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে যে, আমিরুল মুমিনিন এখানে নামাজ আদায় করেছেন।
এরপর খলিফা উমর রাযি. খ্রিষ্টান যাজকদের জিজ্ঞেস করে মসজিদুল আকসা খুঁজে বের করেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে বিরান পড়ে থাকা মসজিদুল আকসা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। পরদিন খলিফার নির্দেশে হজরত বিলাল রাযি. সেখানে ফজরের আজান দেন এবং সকলে খলিফার ইমামতিতে ফজর নামাজ আদায় করেন।
এই সন্ধিচুক্তির ফলে আল-কুদসবাসী নিরাপত্তা লাভ করে। মুসলমানদের প্রদত্ত নিরাপত্তায় আল-কুদসবাসী আনন্দিত হয়। আরতাবুন ও সন্ধিবিরোধীরা সুযোগ পেয়ে নিরাপদে আল-কুদস থেকে বেরিয়ে যায় এবং মিশরে জড়ো হতে থাকা রোমান বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়।
এই সন্ধিচুক্তির ফলে আল-কুদস বা বায়তুল মুকাদ্দাস একটি ইসলামি প্রদেশে পরিণত হয় এবং মুসলিম গভর্নরদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতে থাকে। মুসলিম গভর্নরগণ পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতা ও মর্যাদা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতেন এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে অত্যন্ত উদার ও কোমল আচরণ করতেন। কালের পরিক্রমায় ৪৯২ হিজরি সনে (১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে) ক্রুসেড আগ্রাসনের পর ইউরোপের খ্রিষ্টান যোদ্ধারা বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করে এবং যিশুখ্রিষ্টের (নবী ঈসা আ.-এর) নাম নিয়ে নৃশংসভাবে মুসলমানদের পাইকারি হত্যা করে। দীর্ঘকাল বায়তুল মুকাদ্দাস খ্রিষ্টানদের দখলে থাকার পর ৫৮৩ হিজরি সনের ২৭ রজব (১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর) মহাবীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রহ. বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার করেন। যথাস্থানে আমরা এর বিস্তারিত বিবরণ পাঠ করব, ইনশাআল্লাহ।
📄 জাযিরা অঞ্চল বিজয়
সপ্তদশ হিজরি সনে জাযিরা অঞ্চলের (১০১) অধিবাসীরা রোমানদের সঙ্গে একজোট হয়ে হিমসে মুসলিম বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আবু উবায়দা রাযি. বিষয়টি জানতে পেরে নিকটবর্তী সকল মুসলিম রেজিমেন্টকে হিমসে সমবেত হতে নির্দেশ দেন। হিমসের উপকণ্ঠে মুসলিম বাহিনী শিবির স্থাপন করে। আবু উবায়দা রাযি. সকল সেনাপতির সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন যে, মুসলিম বাহিনী অগ্রসর হয়ে রোমানদের ওপর আক্রমণ করার পরিবর্তে হিমসেই সুরক্ষিত অবস্থান গ্রহণ করবে। এরপর তিনি খলিফা উমর রাযি.-এর কাছে বার্তা পাঠিয়ে রোমানদের সৈন্যসমাবেশ ও নিজেদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবগত করেন।
আবু উবায়দার বার্তা পেয়েই খলিফা উমর রাযি. কুফার গভর্নর সাদ বিন আবু ওয়াককাস রাযি.-এর কাছে বার্তা পাঠান যে, তুমি আমার এই বার্তা পাওয়া মাত্র কা'কা' বিন আমরের নেতৃত্বে একটি বাহিনী হিমসে প্রেরণ করবে। সেখানে আবু উবায়দা অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে যাচ্ছে। খলিফা সাদকে আরও লেখেন-
'সুহায়ল বিন আদিকে একটি বাহিনীসহ জাযিরা অঞ্চলের রাক্কায় পাঠাবে। কারণ, জাযিরাবাসীই রোমানদেরকে হিমসে আক্রমণ করতে প্ররোচিত করেছে। আর আবদুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ বিন ইতবানকে নুসায়বিনে পাঠাবে। কারণ, সেখানকার অধিবাসীদেরও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা আছে। তারা দুজন যেন রাক্কা ও নুসায়বিনে অভিযান শেষে হাররান ও এডেসা(১০২) এলাকায়ও অভিযান পরিচালনা করে। ওয়ালিদ বিন উকবাকে জাযিরা অঞ্চলে রাবিয়া ও তানুখ গোত্রের উদ্দেশে প্রেরণ করবে। আর ইয়ায বিন গুনমকেও পাঠাবে। যদি জাযিরা অঞ্চলে যুদ্ধপরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তাহলে ইয়াযই সকলের নেতৃত্ব দেবে।'
খলিফার বার্তা যেদিন কুফায় পৌঁছায়, সেদিনই কা'কা' বিন আমর রাযি. চার হাজার সৈন্য নিয়ে হিমস অভিমুখে রওনা হয়ে যান। ইয়ায বিন গুনম রাযি.-সহ অন্যান্য সেনাপতিগণও জাযিরার বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হন। স্বয়ং খলিফাও আবু উবায়দা রাযি.-কে সহায়তা করতে মদিনা হতে শাম অভিমুখে রওনা হন।
জাযিরা অঞ্চলের অধিবাসীরা কুফা থেকে মুসলিম বাহিনীর রওনা হওয়ার সংবাদ পেয়ে ভীত হয়ে পড়ে এবং রোমানদের সহায়তা করার পরিবর্তে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যায়। আবু উবায়দা রাযি. যখন জানতে পারেন যে, জাযিরাবাসী রোমান বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, তখন তিনি খালিদ রাযি.-এর সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং হিমসে অবস্থানের পরিবর্তে সামনে অগ্রসর হয়ে রোমানদের ওপর আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন। মুসলিম বাহিনী রোমানদের মুখোমুখি হলে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের বিজয় দান করেন।
কা'কা' বিন আমর রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন কুফার বাহিনী যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন দিন পর হিমসে পৌঁছায়। আবু উবায়দা রাযি. মুসলিম বাহিনীর বিজয় ও কুফার বাহিনীর পৌঁছার সংবাদ জানিয়ে আমিরুল মুমিনিন উমর রাযি.-এর কাছে বার্তা প্রেরণ করেন। খলিফা ততক্ষণে জাবিয়ায় পৌঁছেছিলেন। তিনি ফিরতি বার্তায় কুফার বাহিনীকেও গনিমতে শরিক করার জন্য আবু উবায়দা রাযি.-কে নির্দেশ দেন।
ওদিকে সুহায়ল বিন আদি রাযি.-এর বাহিনী রাক্কা অবরোধ করলে রাক্কাবাসী সন্ধি করে। আবদুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ বিন ইতবান রাযি. নুসায়বিন অবরোধ করলে নুসায়বিনবাসীও সন্ধি করে। এরপর ইয়ায বিন গুনম রাযি. তাদের দুজনের বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সামনে অগ্রসর হন এবং পথিমধ্যে বিভিন্ন এলাকা জয় করে হাররানে পৌঁছান। অবরুদ্ধ হাররানবাসীও আত্মসমর্পণ করে। এভাবে পুরো জাযিরা অঞ্চল যুদ্ধ ব্যতিরেকে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত হয়।
টিকাঃ
১০১. জাষিরা : 'আল-জাযিরাতুল ফুরাতিয়া' বা সংক্ষেপে 'জাযিরা' একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলের নাম। অঞ্চলটির সীমানা পূর্ব দিকে (পশ্চিম ইরানের) জাগ্রোস পর্বতমালা (The Zagros Mountains) পর্যন্ত, উত্তরে (দক্ষিণ তুরস্কের) তোরোস পর্বতমালা (The Taurus Mountains) এবং দক্ষিণে শামের সামাওয়া মরুভূমি (The Syrian Desert) ও (ইরাকের) থার্চার হ্রদ (Lake Tharthar) পর্যন্ত। বর্তমান সিরিয়ার উত্তর-পূর্ব অংশ, ইরাকের উত্তর-পশ্চিম অংশ এবং তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ইংরেজিতে অঞ্চলটিকে Upper Mesopotamia (মেসোপটেমিয়া উচ্চভূমি) বলা হয়।
১০২. এডেসা : আরবি নাম الرها (রুহা)। তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত এডেসা নগরী দেশটির উরফা প্রদেশ (Şanlıurfa Province)-এর রাজধানী। বর্তমানে নগরীটি উরফা (Urfa) নামে পরিচিত।
📄 মিশর-বিজয়
মহান আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে বায়তুল মুকাদ্দাসের বিজয়াভিযান সম্পন্ন হওয়ার পরই আমর ইবনুল আস রাযি. খলিফাতুল মুসলিমিন উমর রাযি.-এর কাছে মিশরে (১০০) বিজয়াভিযান পরিচালনার অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে উমর রাযি. তখন তাকে অনুমতি দেননি। পরবর্তী সময়ে খলিফা এ বিষয়ে আশ্বস্ত হন এবং আমর ইবনুল আস রাযি.-কে অভিযান শুরুর অনুমতি প্রদান করেন।
মিশর-বিজয় সম্পর্কিত নবীজির যে হাদিসটি উমর রাযি.-এর জানা ছিল, তা-ও তাকে এ অভিযানের অনুমতিদানে উদ্বুদ্ধ করেছিল। উমর রাযি. হতে বর্ণিত, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- إِذَا فَتَحَ اللهُ عَلَيْكُمْ مِصْرَ فَاتَّخِذُوا فِيهَا جُنْدًا كَثِيْفًا، فَذَلِكَ الْجُنْدُ خَيْرُ أَجْنَادِ الْأَرْضِ»
আল্লাহ যখন তোমাদের জন্য মিশরকে উন্মুক্ত করে দেবেন, তখন তোমরা সেখানে বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটাবে। কেননা, তারাই হবে ভূপৃষ্ঠের শ্রেষ্ঠতম সেনাদল।
এ কথা শুনে আবু বকর সিদ্দিক প্রশ্ন করেন, কেন, হে আল্লাহর রাসুল? নবীজি উত্তর দেন- لأَنَّهُمْ وَأَزْوَاجَهُمْ فِي رِبَاطٍ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ»
কারণ, তারা ও তাদের সহধর্মিণীগণ কিয়ামতের দিন পর্যন্ত (ইসলামের সীমান্ত) প্রহরায় থাকবে। (১০৪)
আরেক হাদিসে আছে, নবীজি ইরশাদ করেছেন—
«إِذَا افْتَتَحْتُمْ مِصْرَ فَاسْتَوْصُوا بِالْقِبْطِ خَيْرًا؛ فَإِنَّ لَهُمْ ذِمَّةً وَرَحِمًا»
যখন তোমরা মিশর জয় করবে, তখন কিবতিদের সঙ্গে সদাচরণ করবে। কেননা, তোমাদের সঙ্গে তাদের আত্মীয়তার বন্ধন ও অধিকার রয়েছে। (১০৫)
অধিকার দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে মিশর-অধিপতি মুকাওকিস কর্তৃক নবীজিকে প্রদত্ত হাদিয়া মারিয়া কিবতিয়া রাযি.-এর দিকে (কারণ, হাদিয়া প্রেরণের মাধ্যমে এক ধরনের অধিকার জন্মে)। (১০৬)
খলিফার অনুমতি পেয়ে আমর ইবনুল আস রাযি. চার হাজার সৈন্য নিয়ে মিশর অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। তিনি প্রথমে ফিলিস্তিন থেকে রাফাহ (Rafah) অঞ্চলে পৌঁছান। এরপর সেখান থেকে নিম্নভূমি ধরে পথ চলতে থাকেন এবং আরিশে পৌঁছান। আরিশ থেকে রওনা হয়ে আমর ইবনুল আস রাযি. পশ্চিম দিকে অগ্রসর হন এবং ফারামা (Pelusium) দুর্গে পৌঁছান। মিশরভূমিতে এই ফারামা দুর্গেই রোমানদের সঙ্গে মুসলমানদের প্রথম লড়াই হয়। এক মাস দীর্ঘ এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। দুর্গটিতে রোমানদের বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ ছিল। ভবিষ্যতে যেন রোমানরা সেগুলো মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে, এজন্য সেগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়।
এরপর মিশর অভিমুখে মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে এবং মুসলিম বাহিনী বিলবিস দুর্গে পৌঁছায়। এ দুর্গে রোমান সেনাপতি আরতাবুন বিশাল এক বাহিনী নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। মুসলিম বাহিনী এক মাস দুর্গটি অবরোধ করে রাখার পর আল্লাহর অনুগ্রহে দুর্গটি বিজিত হয় এবং দুর্ধর্ষ রোমান সেনাপতি আরতাবুন নিহত হয়।
এরপর মুসলিম বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে ব্যাবিলন দুর্গের উত্তরে অবস্থিত উম্মে দুনায়ন দুর্গে পৌঁছায়। এখানেও রোমান বাহিনী মুসলিম বাহিনীকে বাধা প্রদান করলে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং প্রচুর রোমান সৈন্য নিহত হয়।
উম্মে দুনায়নে অভিযান চলাকালে আমর রাযি.-এর আবেদনের প্রেক্ষিতে খলিফা উমর রাযি. আরও চার হাজার সৈন্য মিশরে প্রেরণ করেন। ফলে মিশরে অভিযান পরিচালনাকারী বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় আট হাজার।
রোমান নেতৃবৃন্দের ধারণা ছিল, এরপর আমর ইবনুল আস রাযি. সরাসরি ব্যাবিলন দুর্গের দিকে অগ্রসর হবেন। কিন্তু তাদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে তিনি তার বাহিনী নিয়ে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হন এবং নীল নদ পাড়ি দেন। হয়তো তিনি শত্রুপক্ষকে বোঝাতে চাচ্ছিলেন যে, তিনি তাদের বাদ দিয়ে অন্য কোনো প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করতে চাচ্ছেন। এরপর শত্রুপক্ষকে আরও বিভ্রান্ত করার জন্য তিনি দক্ষিণে ফাইয়ুমের দিকে অগ্রসর হন। ফাইয়ুমের দিকে পথ চলতেই আমর সংবাদ পান, সেখানে রোমানরা বিশাল সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে। তখন আমর তার বাহিনী নিয়ে মরুভূমিতেই অবস্থান করেন এবং সৈন্যদের কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ করে দেন। এর ফাঁকে তিনি অতিরিক্ত সৈন্য সরবরাহের জন্য খলিফার কাছে বার্তা প্রেরণ করেন।
খliফা উমর রাযি. আমর ইবনুল আস রাযি.-এর সাহায্যার্থে আরও চার হাজার সৈন্য প্রেরণ করেন এবং প্রেরিত বার্তায় তাকে লেখেন, 'আমি তোমার সহায়তার আরও চার হাজার সৈন্য পাঠালাম। প্রতি এক হাজারের নেতৃত্বে আছেন এমন একেকজন সেনাপতি, যারা প্রত্যেকে হাজারজনের সমতুল্য।'
হজরত উমরের প্রেরিত এই চার সেনাপতি হলেন-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ রাযি., উবাদা বিন ছামিত রাযি., যুবায়র ইবনুল আওয়াম রাযি. ও মাসলামা বিন মুখাল্লাদ আল-আনসারি রাযি.।
মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ হলেন সেই মহান সাহাবি, যিনি বদর যুদ্ধের দিন নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার প্রতিপালক আপনাকে যে আদেশ করেছেন, আপনি তার ওপর অবিচল থাকুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আল্লাহর শপথ! বনি ইসরাইল মুসা আ.-কে যেমন জবাব দিয়েছিল, আমরা আপনাকে সেরূপ জবাব দেবো না। তারা বলেছিল, মুসা, তুমি ও তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ করো। আমরা এখানেই বসে থাকব। বরং আমরা বলব, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি ও আপনার রব যুদ্ধ করুন; আমরাও আপনাদের সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করব। ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন-সহ প্রেরণ করেছেন! আপনি যদি আমাদেরকে নিয়ে বারকুল গিমাদ পর্যন্তও অগ্রসর হন, আমরা আপনার সঙ্গেই থাকব। নবীজি তার কথা শুনে অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন এবং তার জন্য দোয়া করেছিলেন।
উবাদা বিন ছামিত রাযি. হলেন সেসব সৌভাগ্যবান সাহাবিদের একজন, যারা নবীজির জীবদ্দশায় কুরআন সংকলন করেছিলেন।
যুবায়র ইবনুল আওয়াম রাযি. হলেন নবীজির নিকটাত্মীয় ও সার্বক্ষণিক সহচর।
আর মাসলামা বিন মুখাল্লাদ রাযি. হলেন সেই মহান সাহাবি, যার সম্পর্কে তার সমসাময়িক বিশিষ্ট তাবেয়ি ও ইমামুত তাফসির মুজাহিদ রহ. বলেছেন, আমি মনে করতাম যে, আমিই কুরআনের সবচেয়ে ভালো হাফেজ। (কিন্তু) একদিন আমি মাসলামা বিন মুখাল্লাদ রাযি.-এর পেছনে নামাজ পড়লাম। তিনি পুরো সুরা বাকারা তেলাওয়াত করলেন; কিন্তু কোথাও আলিফ-ওয়াও বা অন্য কিছুর ভুল করলেন না।
তারাই হলেন সেই বাহিনীর বিভিন্ন অংশের সেনাপতি, যারা মিশর জয় করতে যাচ্ছেন। প্রত্যেকেই পবিত্র কুরআনের বাহক, প্রত্যেকেই দ্বীনের বিভিন্ন অঙ্গনে অত্যুচ্চ কীর্তিগুণের অধিকারী। তারা কিন্তু তাদের মর্যাদা ও কুরআন-ধারণের বরকত সঙ্গে নিয়েই বসে থাকেননি, বসে থাকেননি নবীযুগে নবীজির সঙ্গী হয়ে দ্বীনের বিভিন্ন অঙ্গনে নানা কীর্তি আঞ্জাম দিয়ে; বরং জীবনের শেষ নিশ্বাসটি ত্যাগ করা পর্যন্ত অব্যাহত রেখেছেন কর্মধারা, অনাগত উম্মাহর জন্য রেখে গেছেন কীর্তি-অবদান। তারাই মহান মিশরবিজেতা। আমাদের প্রতি, মিশরবাসী ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি তাদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু আমাদের মাঝে কজন জানে তাদের নাম, কজন জানে তাদের কীর্তি ও অবদান?!
সুতরাং হে প্রিয় পাঠক, হৃদয়ের পাতায় গেঁথে নিন মিশরবিজেতা এই মহান সাহাবিদের নাম, অধ্যয়ন করুন ও জানুন তাদের কীর্তি ও কর্মের।
কথা: আপনার প্রতিবেশী ও সন্তানদের শোনান তাদের বিজয়ের গল্প। হয়তো তাদের মাঝ থেকেই বেরিয়ে আসবে এমন এক প্রজন্মা, যারা ফিরিয়ে আনবে দ্বীনের হারানো গৌরব, মুসলমানদের হৃত মর্যাদা। সহায়ক বাহিনী যোগ দেওয়ায় এবার মিশরে মুসলিম বাহিনীর সদস্যসংখ্যা বারো হাজারে পৌঁছায়।
পথিমধ্যে আইনে শামসে ঝটিকা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সহায়ক বাহিনী পৌঁছার পর আমর বিন আস রাযি. ব্যাবিলন অভিমুখে রওনা হন এবং ব্যাবিলনে পৌঁছে নগরী অবরোধ করেন। অবরোধ এক মাস দীর্ঘায়ত হলে অবরুদ্ধ কিবতিরা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে এবং (মিশর-অধিপতি) মুকাওকিস (১০৭) মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক আমর ইবনুল আসের কাছে নিম্নোক্ত বার্তা পাঠান-
আপনারা আমাদের দেশে প্রবেশ করেছেন এবং আমাদেরকে যুদ্ধ করতে পীড়াপীড়ি করছেন। আমাদের দেশে আপনাদের অবস্থান দীর্ঘদিন হয়ে গেছে। রোমানরা তো ইতিমধ্যে আপনাদের কাছে চলে এসেছে এবং আপনাদের বিরুদ্ধে সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়েছে। সংখ্যা ও সরঞ্জাম উভয় দিক থেকে তাদের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে।
এদিকে নীল নদ আপনাদের ঘিরে আছে। প্রকৃত অর্থে আপনারা আমাদের হাতে বন্দি। সুতরাং (নিষ্কৃতি পেতে চাইলে) আপনি আপনার বাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে আমাদের কাছে প্রেরণ করুন। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলব। হতে পারে এর মাধ্যমে এমন কোনো সমাধান বের হয়ে আসবে, যা উভয় পক্ষের কাছেই সন্তোষজনক মনে হবে এবং রোমান বাহিনী আপনাদেরকে ঘিরে ফেলার পূর্বেই আমাদের পরস্পরের যুদ্ধপরিস্থিতির (রক্তপাতহীন) সমাপ্তি ঘটবে। কিন্তু এর পূর্বেই যদি রোমান বাহিনী এসে পড়ে, তখন আলোচনা-সংলাপ কোনো কাজে আসবে না এবং আমরা তাদেরকে বাধাও দিতে পারব না। হয়তো পরিস্থিতি তখন আপনাদের প্রত্যাশা ও চাওয়ার বিপরীতে চলে যাবে আর আপনারা অনুতপ্ত ও লজ্জিত হবেন। তাই শীঘ্রই আপনার প্রতিনিধিদল আমাদের কাছে পাঠান। আমরা তাদের সঙ্গে এমন আচরণই করব, যা উভয় পক্ষের পছন্দ হবে।
মুকাওকিসের বার্তাবাহকগণ আমর ইবনুল আস রাযি.-এর কাছে উপস্থিত হলে তিনি তাদেরকে দুদিন নিজের কাছেই রাখেন। এরপর ফিরতি বার্তাসহ তাদেরকে মুকাওকিসের কাছে ফেরত পাঠান। বার্তায় লেখা ছিল-
আমাদের ও তোমাদের মাঝে কেবল তিনটি পথই খোলা আছে-১. তোমরা ইসলামগ্রহণ করবে; সে ক্ষেত্রে তোমরা আমাদের ভাইয়ে পরিণত হবে এবং আমরা যে অধিকার ভোগ করি, তোমরাও তা ভোগ করবে। ২. আর যদি তোমরা ইসলামগ্রহণে অস্বীকৃতি জানাও, তাহলে হীনবল হয়ে আমাদেরকে জিজিয়া প্রদান করবে। ৩. আর এ দুটির একটিও তোমরা গ্রহণ না করলে আমরা অটলতা ও অবিচলতার সঙ্গে তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যাব, যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা আমাদের উভয় পক্ষের মাঝে কোনো ফয়সালা করেন। তিনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ ফয়সালাকারী।
দূতগণের কাছ থেকে বার্তা নিয়ে পাঠ করার পর মুকাওকিস তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, তাদেরকে কেমন দেখলে? বার্তাবাহকগণ জানান-
আমাদের কাছে মনে হয়েছে যে, তারা এমন এক সম্প্রদায়, যারা জীবনের চেয়ে মৃত্যুকে অধিক ভালোবাসে। তাদের প্রত্যেকের কাছে অহংকারের চেয়ে বিনয় অধিক প্রিয়। দুনিয়ার প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ বা কামনাই নেই। তারা (কোনো কিছু না বিছিয়েই) মাটির ওপর বসে আর বাহনজন্তুর ওপরই আহার সেরে নেয়। (চালচলনে ও আচার-আচরণে) তাদের সেনাপতি যেন সাধারণ সৈন্যদেরই মতো।
এরপর মুকাওকিস পুনরায় সমঝোতা-সংলাপের উদ্দেশ্যে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করতে আমর ইবনুল আসকে পীড়াপীড়ি করেন। তখন আমর রাযি. উবাদা বিন ছামিত রাযি.-এর নেতৃত্বে তার বাহিনীর শ্রেষ্ঠতম দশজন সৈন্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন। উবাদা রাযি. ছিলেন অত্যন্ত দীর্ঘদেহী ও বাদামি বর্ণবিশিষ্ট। প্রতিনিধিদল মুকাওকিসের দরবারে প্রবেশ করার পর সবাইকে পেছনে রেখে উবাদা রাযি. সামনে অগ্রসর হন। উবাদার কৃষ্ণবর্ণ দেখে মুকাওকিস ভয় পেয়ে যান এবং বলেন, 'এই কালো লোকটাকে আমার সামনে থেকে সরাও।'
তখন প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যগণ বলেন, 'এই কৃষ্ণবর্ণ ব্যক্তিটিই আমাদের মাঝে সর্বাধিক জ্ঞানী ও সঞ্চালক। আমাদের সেনাপতি তাকেই প্রতিনিধিদলের প্রধান নির্বাচিত করেছেন এবং আমাদেরকে তার মতের বিরোধিতা না করতে আদেশ করেছেন।' মুকাওকিস জিজ্ঞেস করেন, 'এমন কালো একজন ব্যক্তিকে কীভাবে তোমরা নিজেদের প্রধান হিসেবে মেনে নিলে?' উত্তরে তারা বলে, 'বর্ণের কোনো ভেদাভেদ আমাদের মাঝে নেই। আমাদের সমাজে কৃষ্ণবর্ণকে কোনো প্রকার ঘৃণা করা হয় না।'
এরপর মুকাওকিস উবাদাকে বলেন, 'এই কালো! সামনে এসো আর আমার সঙ্গে কোমল স্বরে কথা বলো। তোমার দেহবর্ণ আমাকে ভীত করে তুলেছে। এখন তোমার কণ্ঠস্বরও যদি কঠোর হয়, তাহলে তো আমার ভয় আরও বেড়ে যাবে।'
উত্তরে উবাদা রাযি. বলেন, 'তোমার কথা তো শুনলাম; তবে কথা হলো—আমি আমার যেসব সঙ্গীকে রেখে এসেছি, তাদের মাঝে এক হাজার তো এমন আছে, যারা আমার চেয়েও কালো এবং দেখতে আমার চেয়েও ভয়ংকর। আমাকে দেখে তুমি যে পরিমাণ ভীত হয়েছ, তাদেরকে দেখলে তো আরও ভীত হয়ে পড়তে।'
এরপর মুকাওকিস ও উবাদা রাযি.-এর মাঝে মূল বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়। আলোচনা পূর্বের ন্যায় সুস্পষ্ট তিন-পথের কোনো একটি গ্রহণের শর্তে শেষ হয়। মুকাওকিস ও তার কওম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো সমাধান গ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
শত্রুপক্ষ মনে করেছিল, ব্যাবিলন দুর্গের অভ্যন্তরে তারা নিরাপদেই থাকবে। কারণ, দুর্গের প্রাচীরগুলো ছিল অনেক উঁচু আর পুরো দুর্গ পানির নালা দ্বারা বেষ্টিত ছিল। প্রাচীরদ্বারগুলোও ছিল যথেষ্ট মজবুত; দুর্গের অভ্যন্তরে যথেষ্ট পরিমাণ রসদ ও খাদ্যদ্রব্যেরও ব্যবস্থা ছিল।
কিন্তু মুসলিম বাহিনী সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করতে সক্ষম হয়। যুবায়র ইবনুল আওয়াম রাযি. কয়েকজন দুঃসাহসী সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে সাঁতরে পরিখা পার হন, এরপর প্রাচীর বেয়ে ভেতরে প্রবেশ করে প্রাচীরদ্বার খুলে ফেলতে সক্ষম হন। এবার মুসলিম বাহিনী দুর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এবং দীর্ঘ সাত মাসের অবরোধের পর ব্যাবিলন দুর্গ জয় করে।
মুকাওকিসের সামনে তখন একটাই পথ—আত্মসমর্পণ। তিনি সন্ধির আবেদন করায় আমর ইবনুল আস রাযি. তাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন। সন্ধিপত্রে লেখা হয়—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
এটি আমর ইবনুল আস কর্তৃক মিশরবাসীকে প্রদত্ত নিরাপত্তানামা। মিশরবাসীকে জলে-স্থলে সর্বত্র নিজেদের প্রাণের, ধনসম্পদের, গির্জা ও ক্রুশের এবং আপন ধর্ম পালনের নিরাপত্তা দেওয়া হলো। তাদের উল্লেখিত বিষয়সমূহে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করা হবে না, কোনো প্রকার সুযোগ-সুবিধা হ্রাসও করা হবে না। নুবিয়াবাসী (১০৮) তাদের সঙ্গে বসবাস করবে না। মিশরের বাসিন্দাগণ এ সন্ধিপত্রের ভিত্তিতে জিজিয়া প্রদান করবে। রোমান সাম্রাজ্যের (অন্যান্য অঞ্চলের) বা নুবিয়াবাসীদের কেউ যদি নতুন করে সন্ধিনামায় অন্তর্ভুক্ত হতে চায়, তাহলে অন্যরা যেরূপ জিজিয়া প্রদান করে, তাদেরও সেরূপ জিজিয়া প্রদান করতে হবে; অন্যরা যেরূপ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, তারাও তা ভোগ করবে। দুর্গবাসীদের মধ্য হতে কেউ যদি এই সন্ধিনামা মানতে অস্বীকার করে এবং অন্যত্র চলে যেতে চায়, তাহলে তাকে তার কাঙ্ক্ষিত নিরাপদ স্থানে পৌঁছা পর্যন্ত নিরাপত্তা দেওয়া হবে। এ চুক্তিপত্রে লিখিত বিষয়াদির ওপর আল্লাহ তাআলার অঙ্গীকার আছে, আছে তার রাসুলের অঙ্গীকার, আমিরুল মুমিনিনের দায়িত্ব এবং সকল মুমিনের দায়িত্ব।
সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর-শেষে মুকাওকিস মুসলিম সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযি.-কে বলেন, রোম-সম্রাট হিরাক্লিয়াস এই সন্ধিপত্র কিছুতেই মেনে নেবেন না। সুতরাং রোমানরা যা করবে, তার দায়ভার আমার ওপর বর্তাবে না। আমি ও আমার সঙ্গে যারা আছে, আমরা আপনার সঙ্গে কৃত চুক্তি বজায় রাখব। তবে রোমানদের বিষয়ে আমি দায়মুক্ত। আমর রাযি. তার কথায় সম্মতি প্রকাশ করেন। (১০৯)
টিকাঃ
১০০. মিশর পরিচিতি: মানবজাতির ইতিহাসে অন্যতম প্রাচীন সভ্যতা হচ্ছে মিশরকেন্দ্রিক সভ্যতা। মিশরের অবস্থান আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে। অবশ্য মিশরের সিনাই উপদ্বীপ অংশটুকু এশিয়া মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অধীনে থাকার পর ডিক্টেটর জুলিয়াস সিজারের আমলে (শাসনকাল: খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯-৪৪ সন) মিশর রোমানদের অধিকারে আসে। সুপ্রাচীন সভ্যতা ও জ্ঞানে-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ মিশর রোমানদের হাতে আসার পর তারা এর উন্নতিতে মোটেও নজর দেয়নি। রোমান রাজপরিবারের কাছে মিশর ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের চাহিদা পূরণে একটি শস্য-ঝুড়িমাত্র! রোমান সম্রাট তার একজন প্রতিনিধিকে গভর্নর হিসেবে মিশরে প্রেরণ করতেন আর উক্ত গভর্নর আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থান করে পুরো মিশরের আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয়াদি দেখাশোনা করত। গভর্নরকে সরাসরি রোমান সম্রাটের কাছে আর্থিক হিসাব প্রদান করতে হতো। গভর্নরদের মেয়াদ হতো অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। তাই তারা মিশরের উন্নতির চিন্তা বাদ দিয়ে নিজেদের আখের গোছানোতেই বেশি ব্যস্ত থাকত। মিশরের জনগণকেও নিজেদের অঞ্চলের উন্নয়নে কাজ করার বা ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো না। এসব কারণে জনগণ মাঝেমধ্যেই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠত এবং বিদ্রোহের চেষ্টা করত। তখন মিশরের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়োজিত রোমান বাহিনী তাদেরকে কঠোরভাবে দমন করত। রোমান শাসনে থাকা অবস্থায়ই মিশরে খ্রিষ্টধর্ম প্রসার লাভ করে।
১০৪. আলাউদ্দিন আল-মুত্তাকি আল-হিন্দি, কানজুল উম্মাল, হাদিস নং ৩৮২৬২।
১০৫. তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস নং ১১২।
১০৬. আত্মীয়তার বন্ধন দ্বারা মারিয়া কিবতিয়া রাযি.-এর বিষয়টিও উদ্দেশ্য হতে পারে, আবার ইবরাহিম আ.-এর স্ত্রী হাজেরা-এর দিকেও ইঙ্গিত হতে পারে।
১০৭. পূর্বেও বলা হয়েছে, মুকাওকিস বিশেষ কোনো ব্যক্তির নাম ছিল না; বরং তৎকালীন মিশর-প্রশাসকদেরকে এই সম্মানসূচক উপাধিতে আহ্বান করা হতো।
১০৮. নুবিয়া: মিশরের দক্ষিণাঞ্চল ও সুদানের উত্তরাঞ্চল তথা নীলনদের পূর্ব তীরে অবস্থিত মিশরের আসওয়ান নগরী হতে সুদানের দক্ষিণ খুরতুম পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলের নাম নুবিয়া। আধুনিক সুদানের অধিকাংশ এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১০৯. মুসলমানরা মিশর জয় করার পর সেখানকার অধিবাসীরা মুসলিম সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযি.-কে জানায় যে, প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট দিনে নীলনদে একজন যুবতী নারীকে উৎসর্গ করা না হলে নীলনদ শুষ্ক থাকে এবং পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। আমর ইবনুল আস রাযি. একে কুসংস্কার বলে আখ্যায়িত করে মন্তব্য করেন, ইসলাম পূর্বের সকল কুসংস্কার বাতিল ঘোষণা করেছে। এরপর তিনি খলিফা উমর রাযি.-কে পত্রের মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করেন। খলিফা ফিরতি পত্রে আমরকে বলেন, তুমি ঠিকই বলেছ। আমি পত্রের সঙ্গে আরেকটি পত্র পাঠালাম। তুমি এটি নীলনদে নিক্ষেপ করবে। খলিফার নির্দেশ মোতাবেক সেনাপতি আমর ইবনুল আস খলিফার প্রেরিত পত্র নীলনদে নিক্ষেপ করলে সে রাতেই নীলনদের স্রোতধারা ষোলো হাত উঁচু হয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। এরপর থেকে নীলনদ অদ্যাবধি বয়ে চলেছে এবং এই সত্যকেই উচ্চকিত কণ্ঠে ঘোষণা করে যাচ্ছে যে, ইসলাম সত্য আর যাবতীয় কুসংস্কার মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। উমর রাযি. পত্রে হামদ ও ছানার পর লিখেছিলেন,
হে নীলনদ, তুমি যদি নিজের পক্ষ থেকে নিজের ইচ্ছেমতো প্রবাহিত হয়ে থাক, তাহলে তোমার প্রতি আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। আর যদি তুমি একক ও মহাপরাক্রমশালী সত্তা আল্লাহর নির্দেশে প্রবাহিত হয়ে থাক, তাহলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি—তিনি যেন তোমাকে প্রবাহিত করে দেন। দ্রষ্টব্য: ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৯৭।
📄 আলেকজান্দ্রিয়া-বিজয়
এরপর আমর ইবনুল আস রাযি. আলেকজান্দ্রিয়া জয়ের জন্য অভিযান পরিচালনার মনস্থ করেন। খলিফাতুল মুসলিমিনের কাছে অনুমতি চেয়ে বার্তা পাঠালে তিনি তাকে অনুমতি প্রদান করেন। ব্যাবিলন হতে আলেকজান্দ্রিয়ার পথ কিন্তু মোটেও সহজ ছিল না। পুরো পথজুড়ে স্থানে স্থানে রোমানদের বিভিন্ন দুর্গ ছিল। কিন্তু আমর রাযি. ও তার সঙ্গীগণ সকল বাধা জয় করে এ পথ পাড়ি দেন এবং আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছে তিন মাস মতান্তরে চৌদ্দ মাস নগরীটি অবরোধ করে রাখেন। সংবাদ জানতে পেরে খলিফা উমর রাযি. অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন এবং আমর রাযি.-এর কাছে কড়া ভাষায় বার্তা পাঠান। পত্রে তিনি লেখেন, নিজেদের কৃত কোনো গুনাহের কারণেই তোমরা বিলম্বের শিকার হয়েছ। সুতরাং নিজেদের অবস্থা নিরীক্ষণ করো।
আলেকজান্দ্রিয়া ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। আর তাই মুসলিম বাহিনীর আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধের কথা জেনে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে ওঠেন, 'আলেকজান্দ্রিয়ার পতন হলে রোমান সাম্রাজ্যের আর কী থাকবে?!' এরপর তিনি বিশাল বাহিনী নিয়ে নিজে আলেকজান্দ্রিয়ায় উপস্থিত হয়ে যুদ্ধ করার মনস্থ করেন। কিন্তু সফরের প্রস্তুতি চলাকালেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এর ফলে আলেকজান্দ্রিয়ায় রোমান সম্রাটের পক্ষ থেকে সামরিক সাহায্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। আলেকজান্দ্রিয়ার প্রতিরক্ষাকারীদের প্রতিরোধস্পৃহাও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মুসলমানদের হাতে আলেকজান্দ্রিয়া বিজিত হয়।
আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের পর সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযি. খলিফার অনুমতি নিয়ে ব্যাবিলনের নিকটে ফুসতাত নগরী প্রতিষ্ঠা করেন।
মিশর ও আলেকজান্দ্রিয়া অভিযানে ত্যাগ ও কুরবানি এবং কীর্তি ও গৌরবের অনেক ঘটনাই ঘটে। উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
১. সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযি. তার মুক্ত ক্রীতদাস ওয়ারদানকে যুদ্ধের মূল ঝান্ডা প্রদান করেছিলেন আর নিজ পুত্র আবদুল্লাহ বিন আমর রাযি.-কে বাহিনীর সম্মুখ অংশে রেখেছিলেন। যুদ্ধ চলাকালে আবদুল্লাহ কঠিনভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং তার শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। ক্ষত যখন মারাত্মক আকার ধারণ করে, তখন তিনি ওয়ারদানকে বলেন, 'সামান্য পেছনে সরে যেতে পারলে আমি কিছুটা বিশ্রাম নিতে পারতাম।' ওয়ারদান তখন সামনে অগ্রসর হয়ে বলেন, 'বিশ্রাম খুঁজছ? বিশ্রাম তো পেছনে নয়, তোমার সামনে!'
ওয়ারদানের উত্তরে আবদুল্লাহ রাযি.-এর দেহ-মন আন্দোলিত হয়ে ওঠে। তিনি নবোদ্যমে শত্রুপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এদিকে সেনাপতি আমর ইবনুল আস পুত্রের আহত হওয়ার সংবাদ পেয়ে তার জখমের অবস্থা জানতে জনৈক সৈন্যকে পাঠান। উক্ত সৈনিক আবদুল্লাহর কাছে পৌঁছলে তিনি তাকে নিম্নের পঙ্ক্তিটি শুনিয়ে দেন— أَقُوْلُ لَهَا إِذَا جَشَأَتْ وَجَاشَتْ * رُوَيْدَكِ تُحْمَدِي أَوْ تَسْتَرِيحِي তার অস্থিরতায়-উদ্বেলতায় বেবাক আমি; বলি, একটুখানি থামবে তুমি! তনু-মনে স্বস্তি নিয়ে প্রশংসিত হবে তুমি।
বার্তাবাহক ফিরে এসে আমর রাযি.-কে পুত্রের উত্তর শোনালে তিনি আনন্দিত হয়ে বলেন, 'হ্যাঁ, প্রকৃতই সে আমার ছেলে।'
২. মহান আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে আলেকজান্দ্রিয়া বিজয় সমাপ্ত হওয়ার পর সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযি. খলিফার কাছে বিজয়বার্তা প্রেরণ করেন। বার্তাবাহক মুয়াবিয়া বিন খুদায়জ রাযি. এ সম্পর্কিত ঘটনার বিবরণীতে বলেন— দ্বিপ্রহরের সময় আমি মদিনায় পৌঁছলাম। মসজিদে নববির দরজার সঙ্গে বাহনজন্তু বেঁধে আমি মসজিদে বসলাম। এরইমধ্যে খলিফার ঘর থেকে একজন দাসী বেরিয়ে এলো। আমাকে সফরের ধূলিমলিন পোশাকে দেখে সে কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি কে?' আমি বললাম, 'আমি আমর ইবনুল আসের বার্তাবাহক মুয়াবিয়া বিন খুদায়জ।' আমার উত্তর শুনে সে ভেতরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর সে দ্রুতপদে আবার ফিরে এলো। আমি তার পায়ের সঙ্গে কাপড়ের ঘর্ষণের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার কাছে এসে সে বলল, 'উঠুন, আমিরুল মুমিনিন আপনাকে ডেকেছেন; তার আহ্বানে সাড়া দিন।' আমি তার পেছন পেছন চলতে লাগলাম। ভেতরে প্রবেশ করে আমি দেখলাম, উমর এক হাতে তার চাদর ধরে আছেন, অপর হাতে পরিধেয় লুঙ্গি ঠিক করছেন। তিনি আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী সংবাদ নিয়ে এসেছ?' আমি উত্তর দিলাম, 'আমিরুল মুমিনিন! সুসংবাদ নিয়ে এসেছি। আল্লাহ তাআলা আলেকজান্দ্রিয়ার বিজয় দান করেছেন।'
তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদে উপস্থিত হলেন। এরপর মুয়াজ্জিনকে বললেন, 'নামাজের সময় ঘনিয়ে এসেছে, আজান দাও।' আজান শুনে সকলে সমবেত হলো। এরপর তিনি আমাকে বললেন, 'দাঁড়াও, সকলকে সংবাদ শোনাও।' আমি দাঁড়িয়ে সকলকে আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের সংবাদ শোনালাম। নামাজ শেষে খলিফা আমাকে নিয়ে তার গৃহে গেলেন। এরপর কেবলামুখী হয়ে অনেকক্ষণ দোয়া করলেন। তারপর বসে দাসীকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কোনো খাবার আছে কি?' দাসী রুটি ও জায়তুন নিয়ে এলো। খলিফা আমাকে বললেন, 'নাও, খেয়ে নাও।' আমি কিছুটা লজ্জার সঙ্গে আহার করলাম। এরপর তিনি আমাকে বললেন, 'মুয়াবিয়া, মসজিদে আসার পর তুমি কী বলেছিলে?'
'আমি বলেছিলাম, আমিরুল মুমিনিন এখন দিবানিদ্রায় (দুপুরের আহারের পর ঘুমে) আছেন।' আমি উত্তর দিলাম।
'বড় মন্দ কথা বলেছ হে! আমি যদি দিনে ঘুমাই, তাহলে প্রজাদের হক নষ্ট করব আর যদি রাতে ঘুমাই, তাহলে নিজের হক নষ্ট করব। বলো, মুয়াবিয়া, প্রজাদের ও নিজের হকের কথা চিন্তা করে কীভাবে আমার ঘুম আসে?!'
৩. মুসলিম শাসন-কর্তৃত্বে আসার পর মিশরের কিবতি জাতি যে অপার স্বাধীনতা লাভ করেছিল, তার প্রমাণ হিসেবে ঐতিহাসিকগণের উল্লেখিত নিম্নের ঘটনাটি প্রণিধানযোগ্য।
হজরত আনাস রাযি. বর্ণনা করেন, আমরা খলিফা উমর রাযি.-এর দরবারে উপস্থিত ছিলাম। ইত্যবসরে মিশর থেকে জনৈক ব্যক্তি আগমন করল। দরবারে উপস্থিত হয়ে সে বলল, 'আমিরুল মুমিনিন! আমি আপনার আশ্রয়প্রার্থী।' খলিফা বললেন, 'বলো, কী হয়েছে?'
আমর ইবনুল আস মিশরে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন। আমি সেখানে প্রথম স্থান অধিকার করি। মানুষ যখন তা দেখতে পায়, তখন আমর ইবনুল আসের পুত্র মুহাম্মাদ দাঁড়িয়ে বলে ওঠেন, 'কাবার রবের শপথ! আমার ঘোড়া প্রথম হয়েছে।' তিনি আমার পিঠে চাবুক মারতে শুরু করেন এবং বলতে থাকেন, 'আমি ইবনুল আযরাম (অভিজাত)!'
উমর বললেন, 'আল্লাহর শপথ! তুমি যদি আমরকে প্রহার করতে, তাহলে যতক্ষণ না তুমি নিজে তাকে ছেড়ে দিতে, ততক্ষণ আমরা তোমাদের মাঝে অন্তরায় হতাম না।'
'আরে আমর! যাদেরকে তাদের মায়েরা স্বাধীন জন্ম দিয়েছেন, কবে থেকে তাদেরকে দাস বানানো শুরু করলে?!'
হজরত আমর ইবনুল আস বললেন, 'আমিরুল মুমিনিন, আমি বিষয়টি জানতাম না, আর সে আমার কাছে আসেওনি।' (১১০)
এরপর খলিফা উমর রাযি. মিশরীয় লোকটির দিকে ফিরে বললেন, 'তুমি নিশ্চিন্তে ফিরে যাও। ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের সমস্যা বোধ করলে আমাকে লিখে জানাবে।' (১১১)
ভেবে দেখুন, কীসের ভিত্তিতে মিশরীয় এই ব্যক্তিটি মিশর থেকে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মদিনায় এসে নিজের অধিকারের দাবি জানাতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। কদিন পূর্বেও তো সে ও তার স্বজাতি রোমানদের হাতে চরমভাবে নিগৃহীত হচ্ছিল; কিন্তু লাঞ্ছনা ভুলে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছিল না। নিঃসন্দেহে তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—খলিফা তার প্রতি ন্যায়বিচার করবেন এবং স্বাধীনতাই হলো মানবতা ও মানবজাতির প্রতি ইসলামের অনুপম দান।
ড. আবদুস সবুর শাহিন (১১২) রোমান সাম্রাজ্যের অধীনস্থ মিশরের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন—
মিশর রোমান সাম্রাজ্যের একটি করদরাজ্যে পরিণত হওয়ার পরবর্তী সময়ের দিকে দৃষ্টিপাত করলে আমরা দেখতে পাই— মিশরবাসী সে সময় কেবল জুলুম ও নিপীড়ন এবং দুর্ভাগ্য ও কষ্ট ভোগ করে গেছে। রোমান সম্রাটের কাছে মিশর ছিল একটি সম্পদ-ভান্ডারমাত্র, যা দিয়ে সে তার ফল-ফসলের চাহিদা পূরণ করত।
ড. হাসান ইবরাহিম (১১০) লিখেছেন—
এর (রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার) মাধ্যমেই মিশরে (আবহমান কাল থেকে চলে আসা) জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চায় পতন ঘটে, মিশরবাসীর সামনে সুউচ্চ মর্যাদা ও পদমর্যাদার দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায়। রোমান আমলেই ট্যাক্স ও করের পরিমাণ বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়। এমনকি কেউ মারা গেলেও নির্দিষ্ট অঙ্কের কর পরিশোধ করার পূর্বে মৃতদেহ সমাধিস্থ করার অনুমতি দেওয়া হতো না।
'হাজারাতুল আরব' গ্রন্থের লেখক প্রখ্যাত পশ্চিমা ঐতিহাসিক গোস্তাভ লি বোন (১১৪) মিশরীয় জনগণের ওপর মুসলিম অভিযাত্রীদের প্রভাবে মুগ্ধতা ও বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছেন,
ঐতিহাসিক যুগ-পরিস্থিতি অধ্যয়ন করতে গিয়ে আমরা যতই দূরে যাব, দেখতে পাব যে, মিশরীয়রা ছিল সুসমৃদ্ধ ঐতিহাসিক সভ্যতার অধিকারী। এ ধরনের সমৃদ্ধ সভ্যতা লালনকারী জাতির ওপর প্রভাব সৃষ্টি করা বিজেতা জাতির জন্য সহজ ছিল না। অতীতকাল থেকেই বিভিন্ন জাতি মিশরে আগ্রাসন চালালেও মিশর তা মোকাবিলা করে টিকে ছিল। পরবর্তীকালে গ্রিক ও রোমানরা মিশরে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেও মিশরীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। মিশরে টলেমি ও রোমান শাসকগণ কর্তৃক প্রাচীন মিশরীয় স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে নির্মিত ভবন, প্রাসাদ ও দুর্গসমূহ কয়েক শতাব্দীর পরিক্রমায়ও প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার স্বমহিমায় টিকে থাকার দলিল হিসেবে যথেষ্ট।
এরপর তিনি লিখেছেন—
বিশেষ করে এ বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয় যে, প্রাচীন মিশরের সন্তানেরা দৃঢ়তার সঙ্গে গ্রিক ও রোমান আগ্রাসনের মোকাবিলা করেছে। এরপর তারাই আরবদের দ্বীন ও ধর্ম, ভাষা ও উচ্চারণ এবং বিজেতা আরব জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছে এবং নির্ভেজাল আরব জাতিতে পরিণত হয়েছে। ইরান ও ভারতবর্ষে তো আরব সভ্যতা সেখানকার প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে গেছে। অপরদিকে মিশরে মুহাম্মাদের নতুন অনুসারীদের সভ্যতার সামনে প্রাচীন ফারাও সভ্যতা এবং গ্রিক ও রোমান সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
এভাবেই কোনোপ্রকার জবরদস্তি ও চাপপ্রয়োগ ব্যতিরেকে মিশর নির্ভেজাল ইসলামি অঞ্চলে পরিণত হয়। বিজেতা জাতির উদারতা ও মুসলিম প্রশাসকদের চারিত্রিক কুশলতা প্রত্যক্ষ করে মিশরের জনসাধারণ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। নিঃসন্দেহে অনুগ্রহ ও দয়া আল্লাহর পক্ষ থেকেই হয়।
টিকাঃ
১১০. আলাউদ্দিন আল-মুত্তাকি আল-হিন্দি, কানজুল উম্মাল, ১২/৬৬০-৬৬১, বর্ণনা নং ৩৬০১০।
১১১. গবেষক ঐতিহাসিকগণ আলোচ্য ঘটনাটির সত্যতা সম্পর্কে-সনদ 'ও'বর্ণনাধারা উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তি করেছেন। ঘটনাটি ইবনে ইসহাক 'জনৈক ব্যক্তি'-সূত্রে বর্ণনা করেছেন আর গবেষকদের মতে ইবনে ইসহাকের অখ্যাত ব্যক্তি হতে বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য। 'ফুতুহু মিসর' গ্রন্থে ঘটনাটি যে সূত্রে বর্ণিত আছে, তাতেও সুস্পষ্ট বিচ্ছিন্নতা আছে। অধিকন্তু সাহাবি-শানবিরোধী হওয়ায় ঘটনাটি (الانقطاع الباطن) মর্মগত বিচ্ছিন্নতার দোষেও দুষ্ট। সম্ভবত এ কারণেই তাবারি, ইবনে কাছির, ইবনে খালদুন প্রমুখ সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিকগণ কেউই ঘটনাটি উল্লেখ করেননি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখা যেতে পারে- https://bit.ly/2XoBQCx I
১১২. ড. আবদুস সবুর শাহিন (১৯২৯-২০১০ খ্রিষ্টাব্দ) মিশরের প্রখ্যাত আলিম, ইসলামি চিন্তাবিদ, দাঈ এবং মিশরের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ মসজিদে আমর ইবনুল আস-এর খতিব ছিলেন।
১১০. ড. হাসান ইবরাহিম হাসান (১৮৯২-১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দ) মিশরের প্রসিদ্ধ ইতিহাস-গবেষক, ইতিহাস-লেখক। ইতিহাস বিষয়ে তার দশের অধিক গ্রন্থ রয়েছে।
১১৪. গোস্তাভ লি বোন (Gustave Le Bon) (১৮৪১-১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দ) ফরাসি ঐতিহাসিক, চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও বহুবিদ্যাবিশারদ। কলম ধরেছেন নৃতত্ত্ব, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, প্রত্নবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে। প্রাচ্য সভ্যতা ছিল তার অন্যতম গবেষণার বিষয়। তার বিখ্যাত কয়েকটি গ্রন্থ হলো La Civilisation des Arabes (আরব সভ্যতা), Les Civilisations de l'Inde (ভারতীয় সভ্যতা), Psychologie du Socialisme (সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব) ইত্যাদি। তিনি সেই সব হাতেগোনা পশ্চিমা দার্শনিকদের একজন, যারা দ্বিধাহীন চিত্তে আরব জাতি ও ইসলামি সভ্যতার প্রশংসা করেছেন। তিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতি ইসলামের অপার অনুগ্রহের কথা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করতেন। গোস্তাভ লি বোন রচিত La Civilisation des Arabes নামক ফরাসি ভাষায় লিখিত গ্রন্থটিকে (حضارة العرب) (আরব সভ্যতা) নামে আরবিতে রূপান্তর করেছেন ফিলিস্তিনি লেখক আদিল যুআয়তির।