📄 আজনাদাইন-বিজয়
ইয়ারমুকের যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন অংশ শামের উপকূলীয় অঞ্চল বাদ দিয়ে মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে একের পর এক এলাকা যুদ্ধ বা সন্ধির মাধ্যমে জয় করতে থাকে। কিননাসরিন, আলেপ্পো, এন্টিয়ক, মানবিজ, লাতাকিয়াসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন নগরী এ সময় মুসলমানদের অধিকারে আসে।
এ পর্যায়ে খলিফা উমর রাযি. শাম অঞ্চলে অবস্থানরত অন্যতম সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযি.-এর কাছে বার্তা প্রেরণ করে তাকে আল-কুদস (১৮) অভিমুখে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন।
খলিফার নির্দেশ পেয়ে আমর ইবনুল আস রাযি. জর্ডান নদী পাড়ি দিয়ে একে একে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অঞ্চলের বিভিন্ন নগরী জয় করেন। এরপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। তিনি জানতে পারেন যে, বায়তুল মুকাদ্দাস নগরীর অভ্যন্তরে একটি এবং পাশ্ববর্তী আজনাদাইন নগরীর অভ্যন্তরে আরেকটি রোমান বাহিনী অবস্থান করছে। উভয় বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল আরতাবুন নামক জনৈক রোমান সেনাপতি। সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে আরতাবুনের বিশেষ মর্যাদা ছিল। আরতাবুন ছিল সমকালীন শ্রেষ্ঠতম ও নিষ্ঠুরতম রোমান সেনাপতি। আমর রাযি. আরও জানতে পারেন যে, রামলায়ও আরতাবুনের অধীনস্থ ছোট একটি বাহিনী অবস্থান করছে। আরতাবুন নিজে আজনাদাইনে রোমান বাহিনীর সঙ্গে অবস্থান করছিল।
সবকিছু জানার পর আমর ইবনুল আস রাযি. আলকামা বিন হাকিম ফিরাসি রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করার জন্য প্রেরণ করেন, আবু আইয়ুব মালিকি রাযি.-কে রামলার (৯৯) উদ্দেশে প্রেরণ করেন আর নিজে মূল বাহিনী নিয়ে আজনাদাইন অভিমুখে রওনা হন।
টিকাঃ
১৮. আল-কুদস: ঐতিহাসিকগণের মতে আল-কুদস পৃথিবীর প্রাচীনতম নগরী। কয়েক হাজার বছর ব্যাপ্ত কালের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় আল-কুদস বিভিন্ন ভাষা ও জাতির সংস্পর্শ লাভ করে এবং বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাম হলো ১. সালিম ২. মুরইয়া ৩. ইয়াবুস ৪. আরিয়েল ৫. ইলিয়া ৬. আল-কুদস ৭. বায়তুল মুকাদ্দাস ৮. বালাত ৯. রাবাত ১০. জেরুজালেম।
৯. রামলা ও রামাল্লা: দুটি ভিন্ন নগরীর নাম। রামলা (Ramla) বর্তমান অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নগরী, যা আল-কুদস হতে ৩৮ কিলোমিটার-উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। অপরদিকে রামাল্লা (Ramallah) (জর্ডান নদীর) পশ্চিম তীরে অবস্থিত ফিলিস্তিনের প্রধান প্রশাসনিক নগরী। এর অবস্থান আল-কুদস থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে।
📄 আমর ইবনুল আস রাযি.-এর চতুরতা ও বিচক্ষণতা
আমর ইবনুল আস রাযি. আজনাদাইন অবরোধ করলেও কোনোভাবেই আরতাবুনকে পরাভূত করতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি নিজে দূতবেশে ভেতরে প্রবেশ করে নগরীটির সৈন্যসমাবেশ, নিরাপত্তাব্যবস্থার সবল-দুর্বল দিক ইত্যাদি খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। ভেতরে প্রবেশ করে তিনি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে সফল হলেও আরতাবুন সন্দেহ করে যে, তিনি সেনাপতি আমর হবেন অথবা এমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি হবেন, আমরের বাহিনীতে যার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। আরতাবুন তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং একজন নিরাপত্তারক্ষীকে ডেকে নির্দিষ্ট স্থানে লুকিয়ে থাকতে এবং আমর চলে যাওয়ার সময় তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়।
প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আমর ইবনুল আস রাযি. আরতাবুনের চেহারার পরিবর্তনেই সবকিছু পড়ে ফেলেন। দূত হিসেবে আলোচনা শেষ করার পর তিনি আরতাবুনকে বলেন, 'আপনি আমার কথা শুনলেন, আমিও আপনার কথা শুনলাম। আপনার প্রস্তাব আমার পছন্দ হয়েছে। খলিফা উমর আমাকেসহ দশজন ব্যক্তিকে সেনাপতির কাজে সহায়তার জন্য পাঠিয়েছেন। আমি এখন ফিরে গিয়ে দশজনের সবাইকে নিয়ে আবার আপনার কাছে ফিরে আসব। তারাও যদি আমার মতো আপনার প্রস্তাব পছন্দ করেন, তাহলে আমাদের সেনাপতি সে অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নেবেন। আর যদি আপনার প্রস্তাব তাদের পছন্দ না হয়, তাহলে আমরা ফিরে যাব, আপনি আপনার করণীয় নির্ধারণ করবেন।'
আমর ইবনুল আস রাযি.-এর প্রস্তাব শুনে ধূর্ত আরতাবুন তখন খুশিতে আটখানা! তার সামনে তখন এক ঢিলে এক পাখি নয়, দশ পাখি শিকারের সুযোগ। এমন সুযোগ সে হেলায় হাতছাড়া করবে কেন?! আমর প্রত্যাবর্তনের পথ ধরতেই আরতাবুন তার এক অনুচরকে দ্রুত ওত পেতে থাকা গুপ্তঘাতককে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়। (১০০)
আরতাবুনের নাগাল থেকে বেরিয়ে এসে আমর ইবনুল আস রাযি. তার পর্যবেক্ষণকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে সহজেই পরাভূত করেন। রোমান সেনাপতি আরতাবুন পালিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে চলে যায় এবং সেখানকার সুরক্ষিত দুর্গে আশ্রয় নেয়। এরপর সে আমর ইবনুল আস রাযি.-এর কাছে এই চ্যালেঞ্জ-বার্তা পাঠায় যে, আপনি আজনাদাইনের পর ফিলিস্তিনের আর কোনো অংশেই বিজয় লাভ করতে পারবেন না।
টিকাঃ
১০০. ইবনে জারির তাবারি, তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ৩/৬০৫।
📄 ইলিয়া (বায়তুল মুকাদ্দাস) বিজয়
এরপর আমর ইবনুল আস বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের অবস্থান ফিলিস্তিনের দক্ষিণ অঞ্চলে পাহাড়ি এলাকায়। আল্লাহ্প্রদত্ত সুরক্ষিত অবস্থানের কারণে প্রাকৃতিকভাবেই বায়তুল মুকাদ্দাস ছিল একটি দুর্ভেদ্য দুর্গের ন্যায়। আমর ইবনুল আস রাযি. তার প্রখর সামরিক দৃষ্টিবলে উপলব্ধি করেন যে, তার ক্ষুদ্র বাহিনীর পক্ষে বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করা সম্ভব নয়। তাই তিনি অতিরিক্ত সৈন্য প্রেরণের জন্য শাম অঞ্চলের মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি.-এর কাছে বার্তা প্রেরণ করেন।
আবু উবায়দা রাযি. ততদিনে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে সঙ্গে নিয়ে শামের পুরো উত্তরাঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি এবার খালিদকে নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হন।
বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে আবু উবায়দা রাযি. সেখানকার অধিবাসীদের কাছে বার্তা প্রেরণ করে জানমালের নিরাপত্তার বিনিময়ে তাদেরকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেন। প্রথমে তারা তার প্রস্তাব মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। আবু উবায়দা রাযি. তখন আরও কঠিন অবরোধ আরোপ করেন এবং বাইরে থেকে রসদ সরবরাহের পথ বন্ধ করে দেন। অবরুদ্ধ বায়তুল মুকাদ্দাস বাইরের জগৎ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ইলিয়াবাসী মাঝেমধ্যেই নগরীর বাইরে বেরিয়ে এসে হামলা চালালেও খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. ও ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী তাদেরকে পরাভূত করে।
ধীরে ধীরে ইলিয়াবাসীর প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হতে থাকে। একসময় তারা উপলব্ধি করে যে, তাদের পক্ষে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা সম্ভব নয় আর আবু উবায়দাও ইলিয়া জয় না করে ফিরবেন না। তখন তারা আবু উবায়দা রাযি.-এর কাছে বার্তা পাঠায় যে, আমরা আপনাদের সঙ্গে সন্ধি করতে চাই। আপনি দয়া করে আপনাদের খলিফা উমরকে বার্তা পাঠান যে, তিনি যেন সশরীরে বায়তুল মুকাদ্দাসে উপস্থিত হয়ে আমাদের সঙ্গে চুক্তি করেন এবং আমাদেরকে নিরাপত্তানামা প্রদান করেন।
আবু উবায়দা রাযি. বিশিষ্ট ফকিহ সাহাবি মুআয রাযি.-এর সঙ্গে পরামর্শ না করে কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন না। মুআয রাযি.-কে কিছুদিন পূর্বেই তিনি জর্ডানে পাঠিয়েছিলেন। ইলিয়াবাসীর প্রস্তাব পাওয়ার পর তৎক্ষণাৎ তিনি মুআয রাযি.-কে তলব করেন। মুআয রাযি. তাকে বলেন, 'আপনার বার্তা পেয়ে হয়তো খলিফাতুল মুসলিমিন কষ্ট করে এত দূরের পথ পাড়ি দিয়ে এখানে উপস্থিত হবেন। কিন্তু এরপর যদি ইলিয়াবাসী সন্ধিচুক্তি করতে অস্বীকার করে বসে, তাহলে খলিফার এত কষ্টের সফর ফলদায়ক হবে না। সুতরাং আপনি আগে ইলিয়াবাসীকে দৃঢ়তার সঙ্গে শপথ করে বলতে বলুন যে, খলিফা উপস্থিত হয়ে তাদের জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করলে তারা অবশ্যই জিজিয়া প্রদানের শর্তে সন্ধিচুক্তি করবে।' মুআয রাযি.-এর পরামর্শমতো আবু উবায়দা রাযি. ইলিয়াবাসীর কাছ থেকে শপথ গ্রহণ করেন; এরপর বার্তা পাঠিয়ে খলিফাকে বিস্তারিত অবহিত করার পাশাপাশি বায়তুল মুকাদ্দাসে উপস্থিত হওয়ার অনুরোধ জানান।
আবু উবায়দা রাযি.-এর বার্তা পাওয়ার পর খলিফা উমর রাযি. তার উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং শেষ পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাস গমনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি একটি নির্দিষ্ট দিন উল্লেখ করে শামে যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনীর সেনাপতিদেরকে সেদিন জাবিয়ায় উপস্থিত থাকার নির্দেশ প্রদান করেন।
সেনাপতিগণ নির্দিষ্ট দিন নির্ধারিত স্থানে খলিফাতুল মুসলিমিনকে স্বাগত জানাতে সমবেত হয়। সেই মহান খলিফা, যার নাম ও খ্যাতি, প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছড়িয়ে পড়েছে আরব ভূখণ্ড ছাড়িয়ে রোমান সাম্রাজ্যে ও পারস্য ভূমিতে। মহান খলিফা একটি উটের পিঠে চড়ে জাবিয়ায় উপস্থিত হন। শামের মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ খলিফাকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে আসেন। খলিফা যখন কাছাকাছি চলে আসেন, তখন পথে ছোট একটি পানির নালা পড়ে। তিনি উট থেকে নেমে পড়েন এবং পাদুকাদ্বয় খুলে হাতে নিয়ে উটসহ পানিতে নেমে যান। এ সময় আবু উবায়দা রাযি. খliফাকে বলেন, 'নগরবাসীর সামনে তো আপনি বড় বেমানান কাজ করলেন!' খলিফা তখন আবু উবায়দার বুকে মৃদু আঘাত করে বলেন, 'আবু উবায়দা, আহ! তুমি ছাড়া অন্য কেউ যদি এ কথা বলত! আমরা ছিলাম সবচেয়ে লাঞ্ছিত, সবচেয়ে তুচ্ছ ও সংখ্যায় সবচেয়ে নগণ্য জাতি। অনন্তর আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইসলামের মাধ্যমে মর্যাদাশীল করেছেন। সুতরাং ইসলাম ব্যতীত যেখানেই আমরা মর্যাদা ও সম্মান খুঁজব, আল্লাহ আমাদের লাঞ্ছিত করবেন।'
সেনাপতিগণ খলিফার পরিধানের জন্য শুভ্র পরিচ্ছদ এবং আরোহণের জন্য একটি আকষর্ণীয় তুর্কি ঘোড়াও নিয়ে এসেছিল। কিন্তু উমর রাযি. সফরের ধূলিমলিন পোশাকে নিজ উটে চড়েই সকলের সঙ্গে বায়তুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হন।
খলিফার আগমনের সংবাদ পেয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসের বিশপ (গির্জাধ্যক্ষ) অন্যান্য সন্ন্যাসী ও ধর্মযাজকদের সঙ্গে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তারা আবু উবায়দা রাযি.-কে অনুরোধ করে যে, খলিফা যেন সবাইকে রেখে একা তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আবু উবায়দা রাযি. খলিফাকে গির্জাধ্যক্ষের দাবি জানালে তিনি তৎক্ষণাৎ একাই অগ্রসর হতে উদ্যত হন। তখন উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম তাকে বলেন, 'আমিরুল মুমিনিন! আপনি এভাবে একাকী যুদ্ধাস্ত্র ছাড়াই তাদের কাছে যাচ্ছেন! আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে যে, তারা আপনার সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে।' উত্তরে খলিফা উমর রাযি. বলেন—
﴿قُلْ لَنْ يُصِيبَنَا إِلَّا مَا كَتَبَ اللهُ لَنَا هُوَ مَوْلَانَا وَعَلَى اللهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ ﴾
বলে দাও, আল্লাহ আমাদের তাকদিরে যে কষ্ট লিখে রেখেছেন, তা ছাড়া অন্য কোনো কষ্ট কিছুতেই আমাদেরকে স্পর্শ করবে না। তিনিই আমাদের অভিভাবক। আর আল্লাহর ওপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত। [সুরা তাওবা: ৫১]
এরপর খলিফা আবু উবায়দাকে সঙ্গে নিয়ে খ্রিষ্টান নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। গির্জাধ্যক্ষ খলিফা উমর রাযি.-কে দেখেই বলে ওঠেন, 'পবিত্র গ্রন্থে এই নগরীর যে বিজেতার বিবরণ দেওয়া আছে, তিনিই সেই ব্যক্তি।' এরপর গির্জাধ্যক্ষ ইলিয়াবাসীকে আত্মসমর্পণ করার এবং সন্ধিচুক্তি করার নির্দেশ দেন।
📄 একটি ঐতিহাসিক চুক্তিপত্র
এরপর নগরীর চাবি বুঝে নিতে খলিফা উমর রাযি. নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। খলিফা সেখানে সন্ধিচুক্তির শর্তসমূহ উল্লেখপূর্বক একটি চুক্তিপত্র লেখান। চুক্তিপত্রে লেখা ছিল—
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
এটি আল্লাহর বান্দা আমিরুল মুমিনিন উমরের পক্ষ থেকে ইলিয়াবাসীকে প্রদত্ত নিরাপত্তা-অঙ্গীকারনামা। তাদেরকে তাদের জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করা হচ্ছে। সুস্থ-অসুস্থ ও সকল ধর্মের অনুসারী নাগরিক এই নিরাপত্তা লাভ করবে। তাদের গির্জা ও ক্রুশ প্রতীকও এই নিরাপত্তার অন্তর্ভুক্ত হবে। তাদের গির্জাগুলো কেউ (কোনো মুসলমান) বসবাসের জন্য ব্যবহার করতে পারবে না, ভাঙতেও পারবে না। তাদের নির্মিত ভবন ও জমিজমায় কোনোপ্রকার হস্তক্ষেপ করা হবে না। তাদের ক্রুশ প্রতীক ও সম্পদেও কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না। ধর্মীয় বিষয়ে তাদের ওপর কোনো প্রকার বলপ্রয়োগ করা হবে না এবং কারও কোনো ক্ষতি করা হবে না। ইলিয়াতে তাদের সঙ্গে কোনো ইহুদি বসবাস করতে পারবে না।
অন্যান্য নগরীর অধিবাসীদের মতো ইলিয়াবাসীরও জিজিয়া আদায় করতে হবে। তাদের আরও কর্তব্য হলো, তারা রোমানদেরকে এবং চোর-ডাকাতদেরকে নগরী থেকে বের করে দেবে। ইলিয়াবাসী কেউ এখান থেকে নিজের ধনসম্পদসহ চলে যেতে চাইলে সে নিজের কাঙ্ক্ষিত নিরাপদ স্থানে পৌঁছা পর্যন্ত তার নিরাপত্তা বহাল থাকবে। একইভাবে বাইরের কেউ যদি ইলিয়ায় বসবাস করতে চায়, তাহলে তাকেও নিরাপত্তা প্রদান করা হবে এবং তারও জিজিয়া প্রদান করতে হবে। ইলিয়াবাসী কেউ নিজের জানমাল, ক্রুশ ও অন্যান্য ধর্মীয় জিনিসপত্র নিয়ে রোমানদের কাছে চলে যেতে চাইলে তাকেও তার আসবাবপত্রসহ আপন স্থানে পৌঁছা পর্যন্ত নিরাপত্তা প্রদান করা হবে।
(অমুকের হত্যার) পূর্ব থেকেই যারা ইলিয়ায় কৃষিক্ষেতের মালিক, তারা চাইলে এখানে থেকে যেতে পারবে (সে ক্ষেত্রে তাদের ইলিয়াবাসীর সমপরিমাণ জিজিয়া প্রদান করতে হবে), চাইলে রোমানদের সঙ্গে চলে যেতেও পারবে, আবার চাইলে নিজ পরিজনের কাছেও ফিরে যেতে পারবে। ফসল কাটার পূর্ব পর্যন্ত তাদের কোনো কিছু প্রদান করতে হবে না।
এই অঙ্গীকারপত্রের প্রতিটি বিষয়ে আল্লাহ, তার রাসুল, খলিফাগণ ও মুমিনগণ জিম্মাদার; শর্ত হলো ইলিয়াবাসী আরোপিত জিজিয়া ঠিকভাবে প্রদান করবে। - উমর ইবনুল খাত্তাব
সন্ধিপত্রটি লেখেন মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান রাযি. আর সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি., আমর ইবনুল আস রাযি. ও আবদুর রহমান বিন আওফ রাযি.। ষোড়শ হিজরি সন, মোতাবেক ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে চুক্তিপত্রটি লিখিত হয়।
ঐতিহাসিক এই চুক্তিপত্রটি আজও বায়তুল মুকাদ্দাসের আল-কিয়ামা গির্জায় (The Church of the Holy Sepulchre) সংরক্ষিত আছে। ইতিহাস সাক্ষী, তখন থেকে নিয়ে যতদিন বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের হাতে ছিল, সেই ষোড়শ হিজরি সন (৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে নিয়ে ইংরেজদের হাতে ১৩৩৬ হিজরি সনে (১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে) উসমানি খিলাফতের নিয়ন্ত্রণাধীন আল-কুদসের পতনকাল পর্যন্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলমানরা চুক্তির প্রতিটি শর্ত অক্ষরে অক্ষরে রক্ষা করেছিল।
চুক্তিপত্র লেখা শেষ হওয়ার পূর্বেই নামাজের সময় হয়ে যায়। উপস্থিত খ্রিষ্টান ধর্মীয় নেতা উমর রাযি.-কে আল-কিয়ামা গির্জাতেই নামাজ আদায় করে নিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু খলিফা তাতে অসম্মতি প্রকাশ করে বলেন, আমার আশঙ্কা হয়, আমি যদি এখানে নামাজ আদায় করি, ভবিষ্যতে মুসলমানগণ এই যুক্তিতে গির্জাটির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে যে, আমিরুল মুমিনিন এখানে নামাজ আদায় করেছেন।
এরপর খলিফা উমর রাযি. খ্রিষ্টান যাজকদের জিজ্ঞেস করে মসজিদুল আকসা খুঁজে বের করেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে বিরান পড়ে থাকা মসজিদুল আকসা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন। পরদিন খলিফার নির্দেশে হজরত বিলাল রাযি. সেখানে ফজরের আজান দেন এবং সকলে খলিফার ইমামতিতে ফজর নামাজ আদায় করেন।
এই সন্ধিচুক্তির ফলে আল-কুদসবাসী নিরাপত্তা লাভ করে। মুসলমানদের প্রদত্ত নিরাপত্তায় আল-কুদসবাসী আনন্দিত হয়। আরতাবুন ও সন্ধিবিরোধীরা সুযোগ পেয়ে নিরাপদে আল-কুদস থেকে বেরিয়ে যায় এবং মিশরে জড়ো হতে থাকা রোমান বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়।
এই সন্ধিচুক্তির ফলে আল-কুদস বা বায়তুল মুকাদ্দাস একটি ইসলামি প্রদেশে পরিণত হয় এবং মুসলিম গভর্নরদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতে থাকে। মুসলিম গভর্নরগণ পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতা ও মর্যাদা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতেন এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে অত্যন্ত উদার ও কোমল আচরণ করতেন। কালের পরিক্রমায় ৪৯২ হিজরি সনে (১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে) ক্রুসেড আগ্রাসনের পর ইউরোপের খ্রিষ্টান যোদ্ধারা বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করে এবং যিশুখ্রিষ্টের (নবী ঈসা আ.-এর) নাম নিয়ে নৃশংসভাবে মুসলমানদের পাইকারি হত্যা করে। দীর্ঘকাল বায়তুল মুকাদ্দাস খ্রিষ্টানদের দখলে থাকার পর ৫৮৩ হিজরি সনের ২৭ রজব (১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর) মহাবীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবি রহ. বায়তুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার করেন। যথাস্থানে আমরা এর বিস্তারিত বিবরণ পাঠ করব, ইনশাআল্লাহ।