📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়ারমুকের যুদ্ধে বীরত্ব ও ত্যাগের কিছু খণ্ডচিত্র

📄 ইয়ারমুকের যুদ্ধে বীরত্ব ও ত্যাগের কিছু খণ্ডচিত্র


যুদ্ধের শুরুতে যখন রোমান বাহিনী প্রবল বেগে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর প্রধান হজরত মুআয বিন জাবাল রাযি. নিজ ঘোড়া থেকে নেমে পড়েন এবং চিৎকার করে বলেন, 'কেউ চাইলে আমার এই ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করতে পারে।' তৎক্ষণাৎ সদ্য কৈশোরে পা রাখা তার পুত্র আবদুর রহমান বিন মুআয এগিয়ে এসে বলেন, 'আব্বাজান, আমি এই ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করব। আমি আশা করি যে, আমি মুসলিম বাহিনীর পদাতিক সৈন্যদের চেয়ে অধিক ভূমিকা রাখব আর আপনি পদব্রজে যুদ্ধ করেও মুসলিম বাহিনীর অশ্বারোহী যোদ্ধাদের চেয়ে অধিক ভূমিকা রাখবেন। আপনাকে অটল-অবিচল দেখে অন্যরাও অটলতার পরিচয় দেবে, ইনশাআল্লাহ।' উত্তরে মুআয রাযি. বলেন, 'বৎস, আল্লাহ আমাকে ও তোমাকে তার সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন।' এরপর দুজনে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং অনন্যসাধারণ বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটান।
যুদ্ধ চলাকালে হজরত হারিস বিন হিশাম রাযি., ইকরিমা বিন আবু জাহল রাযি. ও আইয়াশ বিন আবি রাবিআ রাযি. গুরুতর আহত হয়ে ময়দানে পড়ে ছিলেন। এ সময় হারিস রাযি. পিপাসায় কাতর হয়ে পানি চাইলে তার জন্য পানি আনা হয়। ইকরিমা রাযি. পানির দিকে তাকালে হারিস রাযি. বলেন, এই পানি ইকরিমাকে দাও। ইকরিমা রাযি. যখন পানি হাতে নেন, তখন আইয়াশ রাযি. তার দিকে তাকান। আইয়াশ রাযি.-কে তাকাতে দেখে ইকরিমা পানিবাহককে বলেন, এই পানি আইয়াশকে দিয়ে দাও। পানি হজরত আইয়াশের হাতে পৌঁছার পূর্বেই তিনি ইন্তিকাল করেন। পুনরায় পানি ইকরিমা রাযি. ও হারিস রাযি.-এর কাছে পৌঁছার পূর্বে তারাও একে একে ইন্তেকাল করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্রষ্টব্য: রণাঙ্গনে মুসলমানদের বিজয়ের মূল কার্যকারণ

📄 দ্রষ্টব্য: রণাঙ্গনে মুসলমানদের বিজয়ের মূল কার্যকারণ


বর্ণিত আছে,
পরাজিত রোমান বাহিনীর সৈন্যরা যখন পালিয়ে এন্টিয়কে হিরাক্লিয়াসের কাছে উপস্থিত হলো, তখন তিনি তাদেরকে ভর্ৎসনা করে বললেন, 'ধিক তোমাদের! বলো তো, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তারা কি তোমাদের মতোই মানুষ নয়?' তারা উত্তর দিলো, 'অবশ্যই, তারা মানুষ।' হিরাক্লিয়াস জিজ্ঞেস করলেন, 'সংখ্যায় কারা বেশি ছিল? তোমরা, নাকি তারা?' তারা উত্তর দিলো, 'আমরাই বেশি ছিলাম। বরং যুদ্ধক্ষেত্রের অধিকাংশ স্থানে আমরা তাদের কয়েক গুণ ছিলাম।' হিরাক্লিয়াস এবার প্রশ্ন করলেন, 'তাহলে তোমরা পরাজিত হচ্ছ কেন?'
উপস্থিত প্রবীণ ও বিশিষ্ট জনৈক ব্যক্তি বললেন,
'তাদের বিজয় ও আমাদের পরাজয়ের কারণ হচ্ছে—তারা রাতভর ইবাদত করে, দিনে রোজা রাখে। তারা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে, সৎ কাজের আদেশ করে ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান করে। তারা নিজেদের মাঝে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। তাদের বিজয় ও আমাদের পরাজয় এ কারণে যে, আমরা মদপান করি, ব্যভিচারে লিপ্ত হই এবং হারাম কাজ করি। আমরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে জুলুম-নিপীড়ন করি, বিভিন্ন অন্যায় নির্দেশ প্রদান করি। আল্লাহ যে কাজে সন্তুষ্ট হবেন, আমরা তাতে বাধা দিই আর পৃথিবীতে ফাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি করি।'
হিরাক্লিয়াস বললেন, 'তুমি সত্যই বলেছ!'

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আজনাদাইন-বিজয়

📄 আজনাদাইন-বিজয়


ইয়ারমুকের যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন অংশ শামের উপকূলীয় অঞ্চল বাদ দিয়ে মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে একের পর এক এলাকা যুদ্ধ বা সন্ধির মাধ্যমে জয় করতে থাকে। কিননাসরিন, আলেপ্পো, এন্টিয়ক, মানবিজ, লাতাকিয়াসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন নগরী এ সময় মুসলমানদের অধিকারে আসে।
এ পর্যায়ে খলিফা উমর রাযি. শাম অঞ্চলে অবস্থানরত অন্যতম সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযি.-এর কাছে বার্তা প্রেরণ করে তাকে আল-কুদস (১৮) অভিমুখে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন।
খলিফার নির্দেশ পেয়ে আমর ইবনুল আস রাযি. জর্ডান নদী পাড়ি দিয়ে একে একে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অঞ্চলের বিভিন্ন নগরী জয় করেন। এরপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। তিনি জানতে পারেন যে, বায়তুল মুকাদ্দাস নগরীর অভ্যন্তরে একটি এবং পাশ্ববর্তী আজনাদাইন নগরীর অভ্যন্তরে আরেকটি রোমান বাহিনী অবস্থান করছে। উভয় বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল আরতাবুন নামক জনৈক রোমান সেনাপতি। সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে আরতাবুনের বিশেষ মর্যাদা ছিল। আরতাবুন ছিল সমকালীন শ্রেষ্ঠতম ও নিষ্ঠুরতম রোমান সেনাপতি। আমর রাযি. আরও জানতে পারেন যে, রামলায়ও আরতাবুনের অধীনস্থ ছোট একটি বাহিনী অবস্থান করছে। আরতাবুন নিজে আজনাদাইনে রোমান বাহিনীর সঙ্গে অবস্থান করছিল।
সবকিছু জানার পর আমর ইবনুল আস রাযি. আলকামা বিন হাকিম ফিরাসি রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করার জন্য প্রেরণ করেন, আবু আইয়ুব মালিকি রাযি.-কে রামলার (৯৯) উদ্দেশে প্রেরণ করেন আর নিজে মূল বাহিনী নিয়ে আজনাদাইন অভিমুখে রওনা হন।

টিকাঃ
১৮. আল-কুদস: ঐতিহাসিকগণের মতে আল-কুদস পৃথিবীর প্রাচীনতম নগরী। কয়েক হাজার বছর ব্যাপ্ত কালের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় আল-কুদস বিভিন্ন ভাষা ও জাতির সংস্পর্শ লাভ করে এবং বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাম হলো ১. সালিম ২. মুরইয়া ৩. ইয়াবুস ৪. আরিয়েল ৫. ইলিয়া ৬. আল-কুদস ৭. বায়তুল মুকাদ্দাস ৮. বালাত ৯. রাবাত ১০. জেরুজালেম।
৯. রামলা ও রামাল্লা: দুটি ভিন্ন নগরীর নাম। রামলা (Ramla) বর্তমান অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নগরী, যা আল-কুদস হতে ৩৮ কিলোমিটার-উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। অপরদিকে রামাল্লা (Ramallah) (জর্ডান নদীর) পশ্চিম তীরে অবস্থিত ফিলিস্তিনের প্রধান প্রশাসনিক নগরী। এর অবস্থান আল-কুদস থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আমর ইবনুল আস রাযি.-এর চতুরতা ও বিচক্ষণতা

📄 আমর ইবনুল আস রাযি.-এর চতুরতা ও বিচক্ষণতা


আমর ইবনুল আস রাযি. আজনাদাইন অবরোধ করলেও কোনোভাবেই আরতাবুনকে পরাভূত করতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি নিজে দূতবেশে ভেতরে প্রবেশ করে নগরীটির সৈন্যসমাবেশ, নিরাপত্তাব্যবস্থার সবল-দুর্বল দিক ইত্যাদি খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। ভেতরে প্রবেশ করে তিনি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে সফল হলেও আরতাবুন সন্দেহ করে যে, তিনি সেনাপতি আমর হবেন অথবা এমন গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি হবেন, আমরের বাহিনীতে যার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। আরতাবুন তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং একজন নিরাপত্তারক্ষীকে ডেকে নির্দিষ্ট স্থানে লুকিয়ে থাকতে এবং আমর চলে যাওয়ার সময় তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়।
প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন আমর ইবনুল আস রাযি. আরতাবুনের চেহারার পরিবর্তনেই সবকিছু পড়ে ফেলেন। দূত হিসেবে আলোচনা শেষ করার পর তিনি আরতাবুনকে বলেন, 'আপনি আমার কথা শুনলেন, আমিও আপনার কথা শুনলাম। আপনার প্রস্তাব আমার পছন্দ হয়েছে। খলিফা উমর আমাকেসহ দশজন ব্যক্তিকে সেনাপতির কাজে সহায়তার জন্য পাঠিয়েছেন। আমি এখন ফিরে গিয়ে দশজনের সবাইকে নিয়ে আবার আপনার কাছে ফিরে আসব। তারাও যদি আমার মতো আপনার প্রস্তাব পছন্দ করেন, তাহলে আমাদের সেনাপতি সে অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নেবেন। আর যদি আপনার প্রস্তাব তাদের পছন্দ না হয়, তাহলে আমরা ফিরে যাব, আপনি আপনার করণীয় নির্ধারণ করবেন।'
আমর ইবনুল আস রাযি.-এর প্রস্তাব শুনে ধূর্ত আরতাবুন তখন খুশিতে আটখানা! তার সামনে তখন এক ঢিলে এক পাখি নয়, দশ পাখি শিকারের সুযোগ। এমন সুযোগ সে হেলায় হাতছাড়া করবে কেন?! আমর প্রত্যাবর্তনের পথ ধরতেই আরতাবুন তার এক অনুচরকে দ্রুত ওত পেতে থাকা গুপ্তঘাতককে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়। (১০০)
আরতাবুনের নাগাল থেকে বেরিয়ে এসে আমর ইবনুল আস রাযি. তার পর্যবেক্ষণকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে সহজেই পরাভূত করেন। রোমান সেনাপতি আরতাবুন পালিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে চলে যায় এবং সেখানকার সুরক্ষিত দুর্গে আশ্রয় নেয়। এরপর সে আমর ইবনুল আস রাযি.-এর কাছে এই চ্যালেঞ্জ-বার্তা পাঠায় যে, আপনি আজনাদাইনের পর ফিলিস্তিনের আর কোনো অংশেই বিজয় লাভ করতে পারবেন না।

টিকাঃ
১০০. ইবনে জারির তাবারি, তারিখুর রুসুলি ওয়াল মুলুক, ৩/৬০৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00