📄 জনৈক রোমান সেনাপতির ইসলামগ্রহণ
যুদ্ধ চলাকালে জুরজা নামক জনৈক রোমান সেনাপতি নিজেদের সারি থেকে বেরিয়ে আসেন এবং মুসলিম সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদকে আহ্বান করেন। তার আহ্বানে খালিদ অগ্রসর হন। উভয়ের ঘোড়া যখন একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন জুরজা বলেন—‘হে খালিদ, আপনি আমাকে সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য দেবেন, মিথ্যা বলবেন না। স্বাধীন ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলতে পারে না। আপনি আমার সঙ্গে বিশ্বস্ততা রক্ষা করবেন, প্রতারণা করবেন না। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি কখনো প্রতারণা করে না। এটা কি সত্য যে, আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে আপনাদের নবীর কাছে একটি তরবারি প্রেরণ করেছেন, আর তিনি তা আপনাকে প্রদান করেছেন? আর এ কারণেই আপনি যার বিরুদ্ধেই তরবারি কোষমুক্ত করেন, তাকেই পরাজিত করেন!’
খালিদ উত্তর দেন, ‘না’।
‘তাহলে আপনাকে সাইফুল্লাহ (আল্লাহর তরবারি) ডাকা হয় কেন?’ জুরজা জিজ্ঞেস করেন।
খালিদ উত্তর দেন, ‘আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে তার নবীকে প্রেরণ করেছেন। তিনি আমাদেরকে সত্যের পথে আহ্বান করলে আমরা প্রথমে বিমুখ হয়েছি এবং তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছি। এরপর আমাদের অনেকে তাকে সত্যপ্রতিপন্ন করেছে আর বাকিরা তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে এবং তাকে দূরে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি ছিলাম মিথ্যাপ্রতিপন্নকারী ও বিতাড়িতকারীদের একজন। তারপর আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তর ও ললাটদেশ চেপে ধরেন এবং তার মাধ্যমে আমাদেরকে হেদায়েত দান করেন। আমরা তার হাতে বায়আত গ্রহণ করি। আমি ইসলামগ্রহণ করার পর তিনি আমাকে বলেন, তুমি হলে আল্লাহর এক তরবারি, যা আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। তিনি আল্লাহর কাছে আমাকে সাহায্য করার দোয়া করেন। এ কারণেই আমি আল্লাহর তরবারি নামে আখ্যায়িত হয়েছি। আর আমি মুশরিকদের বিপক্ষে সর্বাধিক কঠোর ব্যক্তি।'
এরপর জুরজা জিজ্ঞেস করেন, 'আপনারা মানুষকে কীসের প্রতি আহ্বান করেন?'
খালিদ উত্তর দেন, 'আমরা মানুষকে এই সাক্ষ্য প্রদানের আহ্বান জানাই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তার বান্দা ও রাসুল। আর আমরা মানুষকে এই স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানাই যে, আল্লাহর রাসুল আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছেন, তা সত্য।'
'কেউ যদি আপনাদের আহ্বানে সাড়া না দেয়?' জurজা জিজ্ঞেস করেন।
'তাহলে তারা জিজিয়া প্রদান করবে আর আমরা তাদেরকে নিরাপত্তা দেবো।'
'যদি জিজিয়া প্রদানেও রাজি না হয়?'
'আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব, এরপর যুদ্ধ করব।' খালিদ উত্তর দেন।
এরপর জুরজা জিজ্ঞেস করেন, 'আজ যদি কেউ আপনাদের আহ্বানে সাড়া দেয় এবং ইসলামে দীক্ষিত হয়, তাহলে তার মর্যাদা কীরূপ হবে?'
খালিদ উত্তর দেন, 'আল্লাহপ্রদত্ত বিধান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে ইসলামগ্রহণকারী অগ্রবর্তী-পশ্চাদ্বর্তী, সম্ভ্রান্ত-সাধারণ সকলেই সমমর্যাদাসম্পন্ন বিবেচিত হয়।'
'তাহলে (আপনি বলতে চাচ্ছেন) আজ যে আপনাদের দলভুক্ত হবে, সেও আপনাদের সমপরিমাণ আজর ও প্রতিদান লাভ করবে?!'
'হ্যাঁ, বরং আজর ও পুণ্যের বিবেচনায় তো সে আরও উত্তম বিবেচিত হবে।'
'আপনারা তার তুলনায় কত পূর্বে ইসলামগ্রহণ করেছেন। তারপরও সে কীভাবে আপনাদের সমমর্যাদাসম্পন্ন হবে?!' জুরজা অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেন।
খালিদ উত্তর দেন, 'আমরা যখন ইসলামগ্রহণ করেছি এবং নবীজির হাতে বায়আত গ্রহণ করেছি, তখন তিনি ছিলেন জীবিত, আমাদের মাঝেই বিদ্যমান। তার কাছে আসমানি বার্তা অবতীর্ণ হতো, তিনি কুরআনের আলোকে আমাদের বিভিন্ন বিষয় জানাতেন, আমাদেরকে বিভিন্ন নিদর্শন দেখাতেন। আমরা যা দেখেছি-শুনেছি, তা দেখলে ও শুনলে যে কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামগ্রহণে ও ইসলামের বিধান পালনে বাধ্য হয়ে পড়বে। বিপরীতে তোমরা সেসব বিস্ময়কর ও অলৌকিক প্রমাণাদি না দেখেছ, না শুনেছ। কাজেই তোমাদের কেউ যদি (আশ্চর্য বিষয়াদি প্রত্যক্ষ না করা সত্ত্বেও) খাঁটি নিয়ত ও স্বচ্ছ বিশ্বাসে ইসলামে দাখিল হয়, নিশ্চয়ই সে আমাদের চেয়ে শ্রেয়তর হবে।'
জুরজা তার শেষ প্রশ্ন করেন, 'আল্লাহর শপথ দিয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, আপনি আমাকে সত্য বলেছেন তো? কোনো ধরনের ধোঁকা দেননি তো?'
'আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে সত্য বলেছি। আর তোমার-আমার কথোপকথন সম্পর্কে মহান আল্লাহ অবগত আছেন।'
এ কথা শোনার পর জুরজা খালিদের সামনে তার ঢাল উল্টিয়ে ধরে তার প্রতি ঝুঁকে পড়েন; এরপর বলেন, আমাকে ইসলাম শিখিয়ে দিন। খালিদ জুরজাকে নিয়ে নিজ তাঁবুতে ফিরে আসেন, এক মশক পানি দিয়ে তাকে অজু করান এবং তাকে নিয়ে দু-রাকাত নামাজ পড়েন।
রোমান বাহিনী ভেবেছিল, জুরজা খালিদকে ধোঁকা দিতে চাচ্ছেন। জুরজাকে খালিদের সঙ্গে তাঁবুর দিকে যেতে দেখে রোমানরা মনে করে, জুরজার কৌশল সফল হয়েছে। খালিদ-বিহীন মুসলিম বাহিনীর ওপর তারা প্রবল উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রবল আক্রমণের মাধ্যমে তাদেরকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এরই মধ্যে খালিদ ও জুরজা তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসেন আর জুরজা মুসলিম কাতারে যোগ দিয়ে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকেন। মুসলিম সৈন্যরাও পরস্পরকে আহ্বান করে একতাবদ্ধ হয় এবং অটল-অবিচলতার সঙ্গে আক্রমণ শুরু করে। পাল্টা আক্রমণে দিশেহারা রোমান বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। খালিদ ও জুরজা আপন আপন তরবারি হাতে প্রবল বিক্রমে রোমান সৈন্যদের কাতারে প্রবেশ করে যুদ্ধ করতে থাকেন।
যুদ্ধ চলাকালে জুরজা নামক জনৈক রোমান সেনাপতি নিজেদের সারি থেকে বেরিয়ে আসেন এবং মুসলিম সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদকে আহ্বান করেন। তার আহ্বানে খালিদ অগ্রসর হন। উভয়ের ঘোড়া যখন একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন জুরজা বলেন—‘হে খালিদ, আপনি আমাকে সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য দেবেন, মিথ্যা বলবেন না। স্বাধীন ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলতে পারে না। আপনি আমার সঙ্গে বিশ্বস্ততা রক্ষা করবেন, প্রতারণা করবেন না। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি কখনো প্রতারণা করে না। এটা কি সত্য যে, আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে আপনাদের নবীর কাছে একটি তরবারি প্রেরণ করেছেন, আর তিনি তা আপনাকে প্রদান করেছেন? আর এ কারণেই আপনি যার বিরুদ্ধেই তরবারি কোষমুক্ত করেন, তাকেই পরাজিত করেন!’
খালিদ উত্তর দেন, ‘না’।
‘তাহলে আপনাকে সাইফুল্লাহ (আল্লাহর তরবারি) ডাকা হয় কেন?’ জুরজা জিজ্ঞেস করেন।
খালিদ উত্তর দেন, ‘আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে তার নবীকে প্রেরণ করেছেন। তিনি আমাদেরকে সত্যের পথে আহ্বান করলে আমরা প্রথমে বিমুখ হয়েছি এবং তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছি। এরপর আমাদের অনেকে তাকে সত্যপ্রতিপন্ন করেছে আর বাকিরা তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে এবং তাকে দূরে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি ছিলাম মিথ্যাপ্রতিপন্নকারী ও বিতাড়িতকারীদের একজন। তারপর আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তর ও ললাটদেশ চেপে ধরেন এবং তার মাধ্যমে আমাদেরকে হেদায়েত দান করেন। আমরা তার হাতে বায়আত গ্রহণ করি। আমি ইসলামগ্রহণ করার পর তিনি আমাকে বলেন, তুমি হলে আল্লাহর এক তরবারি, যা আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। তিনি আল্লাহর কাছে আমাকে সাহায্য করার দোয়া করেন। এ কারণেই আমি আল্লাহর তরবারি নামে আখ্যায়িত হয়েছি। আর আমি মুশরিকদের বিপক্ষে সর্বাধিক কঠোর ব্যক্তি।'
এরপর জুরজা জিজ্ঞেস করেন, 'আপনারা মানুষকে কীসের প্রতি আহ্বান করেন?'
খালিদ উত্তর দেন, 'আমরা মানুষকে এই সাক্ষ্য প্রদানের আহ্বান জানাই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তার বান্দা ও রাসুল। আর আমরা মানুষকে এই স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানাই যে, আল্লাহর রাসুল আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছেন, তা সত্য।'
'কেউ যদি আপনাদের আহ্বানে সাড়া না দেয়?' জurজা জিজ্ঞেস করেন।
'তাহলে তারা জিজিয়া প্রদান করবে আর আমরা তাদেরকে নিরাপত্তা দেবো।'
'যদি জিজিয়া প্রদানেও রাজি না হয়?'
'আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব, এরপর যুদ্ধ করব।' খালিদ উত্তর দেন।
এরপর জুরজা জিজ্ঞেস করেন, 'আজ যদি কেউ আপনাদের আহ্বানে সাড়া দেয় এবং ইসলামে দীক্ষিত হয়, তাহলে তার মর্যাদা কীরূপ হবে?'
খালিদ উত্তর দেন, 'আল্লাহপ্রদত্ত বিধান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে ইসলামগ্রহণকারী অগ্রবর্তী-পশ্চাদ্বর্তী, সম্ভ্রান্ত-সাধারণ সকলেই সমমর্যাদাসম্পন্ন বিবেচিত হয়।'
'তাহলে (আপনি বলতে চাচ্ছেন) আজ যে আপনাদের দলভুক্ত হবে, সেও আপনাদের সমপরিমাণ আজর ও প্রতিদান লাভ করবে?!'
'হ্যাঁ, বরং আজর ও পুণ্যের বিবেচনায় তো সে আরও উত্তম বিবেচিত হবে।'
'আপনারা তার তুলনায় কত পূর্বে ইসলামগ্রহণ করেছেন। তারপরও সে কীভাবে আপনাদের সমমর্যাদাসম্পন্ন হবে?!' জুরজা অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেন।
খালিদ উত্তর দেন, 'আমরা যখন ইসলামগ্রহণ করেছি এবং নবীজির হাতে বায়আত গ্রহণ করেছি, তখন তিনি ছিলেন জীবিত, আমাদের মাঝেই বিদ্যমান। তার কাছে আসমানি বার্তা অবতীর্ণ হতো, তিনি কুরআনের আলোকে আমাদের বিভিন্ন বিষয় জানাতেন, আমাদেরকে বিভিন্ন নিদর্শন দেখাতেন। আমরা যা দেখেছি-শুনেছি, তা দেখলে ও শুনলে যে কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামগ্রহণে ও ইসলামের বিধান পালনে বাধ্য হয়ে পড়বে। বিপরীতে তোমরা সেসব বিস্ময়কর ও অলৌকিক প্রমাণাদি না দেখেছ, না শুনেছ। কাজেই তোমাদের কেউ যদি (আশ্চর্য বিষয়াদি প্রত্যক্ষ না করা সত্ত্বেও) খাঁটি নিয়ত ও স্বচ্ছ বিশ্বাসে ইসলামে দাখিল হয়, নিশ্চয়ই সে আমাদের চেয়ে শ্রেয়তর হবে।'
জুরজা তার শেষ প্রশ্ন করেন, 'আল্লাহর শপথ দিয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, আপনি আমাকে সত্য বলেছেন তো? কোনো ধরনের ধোঁকা দেননি তো?'
'আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে সত্য বলেছি। আর তোমার-আমার কথোপকথন সম্পর্কে মহান আল্লাহ অবগত আছেন।'
এ কথা শোনার পর জুরজা খালিদের সামনে তার ঢাল উল্টিয়ে ধরে তার প্রতি ঝুঁকে পড়েন; এরপর বলেন, আমাকে ইসলাম শিখিয়ে দিন। খালিদ জুরজাকে নিয়ে নিজ তাঁবুতে ফিরে আসেন, এক মশক পানি দিয়ে তাকে অজু করান এবং তাকে নিয়ে দু-রাকাত নামাজ পড়েন।
রোমান বাহিনী ভেবেছিল, জুরজা খালিদকে ধোঁকা দিতে চাচ্ছেন। জুরজাকে খালিদের সঙ্গে তাঁবুর দিকে যেতে দেখে রোমানরা মনে করে, জুরজার কৌশল সফল হয়েছে। খালিদ-বিহীন মুসলিম বাহিনীর ওপর তারা প্রবল উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রবল আক্রমণের মাধ্যমে তাদেরকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এরই মধ্যে খালিদ ও জুরজা তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসেন আর জুরজা মুসলিম কাতারে যোগ দিয়ে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকেন। মুসলিম সৈন্যরাও পরস্পরকে আহ্বান করে একতাবদ্ধ হয় এবং অটল-অবিচলতার সঙ্গে আক্রমণ শুরু করে। পাল্টা আক্রমণে দিশেহারা রোমান বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। খালিদ ও জুরজা আপন আপন তরবারি হাতে প্রবল বিক্রমে রোমান সৈন্যদের কাতারে প্রবেশ করে যুদ্ধ করতে থাকেন।
📄 ইয়ারমুকের যুদ্ধে বীরত্ব ও ত্যাগের কিছু খণ্ডচিত্র
যুদ্ধের শুরুতে যখন রোমান বাহিনী প্রবল বেগে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর প্রধান হজরত মুআয বিন জাবাল রাযি. নিজ ঘোড়া থেকে নেমে পড়েন এবং চিৎকার করে বলেন, 'কেউ চাইলে আমার এই ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করতে পারে।' তৎক্ষণাৎ সদ্য কৈশোরে পা রাখা তার পুত্র আবদুর রহমান বিন মুআয এগিয়ে এসে বলেন, 'আব্বাজান, আমি এই ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ করব। আমি আশা করি যে, আমি মুসলিম বাহিনীর পদাতিক সৈন্যদের চেয়ে অধিক ভূমিকা রাখব আর আপনি পদব্রজে যুদ্ধ করেও মুসলিম বাহিনীর অশ্বারোহী যোদ্ধাদের চেয়ে অধিক ভূমিকা রাখবেন। আপনাকে অটল-অবিচল দেখে অন্যরাও অটলতার পরিচয় দেবে, ইনশাআল্লাহ।' উত্তরে মুআয রাযি. বলেন, 'বৎস, আল্লাহ আমাকে ও তোমাকে তার সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন।' এরপর দুজনে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং অনন্যসাধারণ বীরত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটান।
যুদ্ধ চলাকালে হজরত হারিস বিন হিশাম রাযি., ইকরিমা বিন আবু জাহল রাযি. ও আইয়াশ বিন আবি রাবিআ রাযি. গুরুতর আহত হয়ে ময়দানে পড়ে ছিলেন। এ সময় হারিস রাযি. পিপাসায় কাতর হয়ে পানি চাইলে তার জন্য পানি আনা হয়। ইকরিমা রাযি. পানির দিকে তাকালে হারিস রাযি. বলেন, এই পানি ইকরিমাকে দাও। ইকরিমা রাযি. যখন পানি হাতে নেন, তখন আইয়াশ রাযি. তার দিকে তাকান। আইয়াশ রাযি.-কে তাকাতে দেখে ইকরিমা পানিবাহককে বলেন, এই পানি আইয়াশকে দিয়ে দাও। পানি হজরত আইয়াশের হাতে পৌঁছার পূর্বেই তিনি ইন্তিকাল করেন। পুনরায় পানি ইকরিমা রাযি. ও হারিস রাযি.-এর কাছে পৌঁছার পূর্বে তারাও একে একে ইন্তেকাল করেন।
📄 দ্রষ্টব্য: রণাঙ্গনে মুসলমানদের বিজয়ের মূল কার্যকারণ
বর্ণিত আছে,
পরাজিত রোমান বাহিনীর সৈন্যরা যখন পালিয়ে এন্টিয়কে হিরাক্লিয়াসের কাছে উপস্থিত হলো, তখন তিনি তাদেরকে ভর্ৎসনা করে বললেন, 'ধিক তোমাদের! বলো তো, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তারা কি তোমাদের মতোই মানুষ নয়?' তারা উত্তর দিলো, 'অবশ্যই, তারা মানুষ।' হিরাক্লিয়াস জিজ্ঞেস করলেন, 'সংখ্যায় কারা বেশি ছিল? তোমরা, নাকি তারা?' তারা উত্তর দিলো, 'আমরাই বেশি ছিলাম। বরং যুদ্ধক্ষেত্রের অধিকাংশ স্থানে আমরা তাদের কয়েক গুণ ছিলাম।' হিরাক্লিয়াস এবার প্রশ্ন করলেন, 'তাহলে তোমরা পরাজিত হচ্ছ কেন?'
উপস্থিত প্রবীণ ও বিশিষ্ট জনৈক ব্যক্তি বললেন,
'তাদের বিজয় ও আমাদের পরাজয়ের কারণ হচ্ছে—তারা রাতভর ইবাদত করে, দিনে রোজা রাখে। তারা প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করে, সৎ কাজের আদেশ করে ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান করে। তারা নিজেদের মাঝে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। তাদের বিজয় ও আমাদের পরাজয় এ কারণে যে, আমরা মদপান করি, ব্যভিচারে লিপ্ত হই এবং হারাম কাজ করি। আমরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে জুলুম-নিপীড়ন করি, বিভিন্ন অন্যায় নির্দেশ প্রদান করি। আল্লাহ যে কাজে সন্তুষ্ট হবেন, আমরা তাতে বাধা দিই আর পৃথিবীতে ফাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি করি।'
হিরাক্লিয়াস বললেন, 'তুমি সত্যই বলেছ!'
📄 আজনাদাইন-বিজয়
ইয়ারমুকের যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন অংশ শামের উপকূলীয় অঞ্চল বাদ দিয়ে মূল ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে একের পর এক এলাকা যুদ্ধ বা সন্ধির মাধ্যমে জয় করতে থাকে। কিননাসরিন, আলেপ্পো, এন্টিয়ক, মানবিজ, লাতাকিয়াসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন নগরী এ সময় মুসলমানদের অধিকারে আসে।
এ পর্যায়ে খলিফা উমর রাযি. শাম অঞ্চলে অবস্থানরত অন্যতম সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযি.-এর কাছে বার্তা প্রেরণ করে তাকে আল-কুদস (১৮) অভিমুখে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন।
খলিফার নির্দেশ পেয়ে আমর ইবনুল আস রাযি. জর্ডান নদী পাড়ি দিয়ে একে একে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অঞ্চলের বিভিন্ন নগরী জয় করেন। এরপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। তিনি জানতে পারেন যে, বায়তুল মুকাদ্দাস নগরীর অভ্যন্তরে একটি এবং পাশ্ববর্তী আজনাদাইন নগরীর অভ্যন্তরে আরেকটি রোমান বাহিনী অবস্থান করছে। উভয় বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল আরতাবুন নামক জনৈক রোমান সেনাপতি। সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে আরতাবুনের বিশেষ মর্যাদা ছিল। আরতাবুন ছিল সমকালীন শ্রেষ্ঠতম ও নিষ্ঠুরতম রোমান সেনাপতি। আমর রাযি. আরও জানতে পারেন যে, রামলায়ও আরতাবুনের অধীনস্থ ছোট একটি বাহিনী অবস্থান করছে। আরতাবুন নিজে আজনাদাইনে রোমান বাহিনীর সঙ্গে অবস্থান করছিল।
সবকিছু জানার পর আমর ইবনুল আস রাযি. আলকামা বিন হাকিম ফিরাসি রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করার জন্য প্রেরণ করেন, আবু আইয়ুব মালিকি রাযি.-কে রামলার (৯৯) উদ্দেশে প্রেরণ করেন আর নিজে মূল বাহিনী নিয়ে আজনাদাইন অভিমুখে রওনা হন।
টিকাঃ
১৮. আল-কুদস: ঐতিহাসিকগণের মতে আল-কুদস পৃথিবীর প্রাচীনতম নগরী। কয়েক হাজার বছর ব্যাপ্ত কালের এই দীর্ঘ পরিক্রমায় আল-কুদস বিভিন্ন ভাষা ও জাতির সংস্পর্শ লাভ করে এবং বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নাম হলো ১. সালিম ২. মুরইয়া ৩. ইয়াবুস ৪. আরিয়েল ৫. ইলিয়া ৬. আল-কুদস ৭. বায়তুল মুকাদ্দাস ৮. বালাত ৯. রাবাত ১০. জেরুজালেম।
৯. রামলা ও রামাল্লা: দুটি ভিন্ন নগরীর নাম। রামলা (Ramla) বর্তমান অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক নগরী, যা আল-কুদস হতে ৩৮ কিলোমিটার-উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। অপরদিকে রামাল্লা (Ramallah) (জর্ডান নদীর) পশ্চিম তীরে অবস্থিত ফিলিস্তিনের প্রধান প্রশাসনিক নগরী। এর অবস্থান আল-কুদস থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে।