📄 দামেশক বিজয়
ফিহলের অভিযান শেষে মুসলিম বাহিনীর সবকটি অংশ একত্রে দামেশক অবরোধ করে (৯৪) এবং কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে দামেশকের বিভিন্ন প্রবেশদ্বারে অবস্থান গ্রহণ করে।
দামেশক ছিল সুউচ্চ প্রাচীর-বেষ্টিত সুরক্ষিত এক নগরী। প্রাচীরগুলোর উচ্চতা ছিল প্রায় ছয় মিটার, প্রন্থ ছিল সাড়ে চার মিটার। প্রাচীরের ওপর পনেরো মিটার দূরত্ব পরপর ছিল পর্যবেক্ষণ-চৌকি। প্রাচীরের গায়ে বিভিন্ন স্থানে ছিল বিশালাকার সাতটি ফটক। এসব ফটক ব্যতীত অন্য কোনো স্থান দিয়ে নগরীতে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। নগরীর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে নগরপ্রাচীরের চারপাশ ঘিরে খনন করা হয়েছিল পানিতে পরিপূর্ণ তিন মিটার প্রন্থের গভীর পরিখা। এর ফলে দামেশক নগরী দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত হয়েছিল। এ কারণে অবরোধ দীর্ঘ কয়েক মাস স্থায়ী হওয়ার পরও দামেশকবাসীর মাঝে নতি স্বীকারের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল না।
দামেশক অবরোধ করার সময় মুসলিম বাহিনী কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে নগরীর সাতটি প্রবেশদ্বারে অবস্থান গ্রহণ করে। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. অবস্থান গ্রহণ করেন আশ-শারকি প্রবেশদ্বারে (The Eastern Gate)। আবু উবায়দা রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ অবস্থান গ্রহণ করে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে দামেশকের পশ্চিম প্রান্তে আল-জাবিয়া প্রবেশদ্বারে (Bab al-Jabiya)। ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান নেয় দক্ষিণ প্রান্তের আস-সাগির দ্বার (Bab al-Saghir) ও কীসান দ্বারে (Bab Kisan)। শুরাহবিল বিন হাসানা রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান গ্রহণ করে উত্তর পাশে আল-ফারাদিস প্রবেশদ্বারে (Bab al-Faradis)। আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান নেয় টুমা প্রবেশদ্বারে (Bab Tuma)। শুধু আস-সালাম প্রবেশদ্বারের অবস্থান দুর্গম অঞ্চলে হওয়ায় সেখানে কোনো বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করেনি।
একপর্যায়ে প্রচণ্ড শীতের মৌসুম শুরু হয়। ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে দামেশকবাসীর মজুত খাদ্যসরবরাহ। মুসলিম বাহিনীর সদস্যদের চোখে কিন্তু নিদ্রা নেই। বিশেষত একটি ইউনিটের অধিনায়ক হিসেবে খালিদ রাযি.-এর ছিল বিশেষ সতর্ক-দৃষ্টি ও শক্তিশালী গোয়েন্দা-তৎপরতা। এক রাতে তিনি সংবাদ পান—জনৈক রোমান সেনাপতির সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া উপলক্ষ্যে নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে ভোজসভা ও পানসভার আয়োজন করা হয়েছে এবং মদের নেশায় মাতাল রোমানরা অসতর্ক ও অরক্ষিত অবস্থায় আছে। খালিদ তো এ ধরনের সুবর্ণ সুযোগ হেলায় নষ্ট করার লোক নন! তিনি তৎক্ষণাৎ মুসলিম বাহিনীর অশ্বারোহী রেজিমেন্টের সাহসী সৈনিকদের তলব করেন। সকলে সঙ্গে নেন কিছু রশি ও মই; যা এ ধরনের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল।
খালিদ ও তার সঙ্গীগণ মই সঙ্গে নিয়ে সাঁতরে পরিখা পার হন। তারা প্রাচীরের মাথায় মই আটকাতে সক্ষম হন এবং শত্রুপক্ষের প্রহরীদের অপ্রস্তুত রেখেই প্রাচীরে চড়েন। এরপর তারা দ্রুত দ্বার-প্রহরীদের হত্যা করে আশ-শারকি ফটক উন্মুক্ত করে দেন। তাদের তাকবির-ধ্বনিতে দামেশকের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
খালিদ তার সঙ্গীদের নিয়ে নগরীতে প্রবেশ করেন। পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, খালিদ তাদের দফারফা করেন।
খালিদ রাযি. দামেশকের পূর্ব দিক থেকে প্রবেশ করে ঝড়ের গতিতে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু অন্যান্য প্রবেশদ্বারে অবস্থানরত সেনাপতিগণ এ বিষয়ে কিছু জানতেন না। দামেশকের রোমান সেনাপতি যখন উপলব্ধি করে যে, খালিদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী দামেশকে প্রবেশ করে অনেকটা পথ অতিক্রম করে ফেলেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দামেশক জয় করতে যাচ্ছে, তখন সে এক বিস্ময়কর কৌশল গ্রহণ করে। সে নগরীর অন্যান্য দ্বারে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর সেনাপতিদের কাছে সংবাদ পাঠায় যে, আপনারা ইতিপূর্বে আমাদেরকে আত্মসমর্পণের যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আমরা সবদিক বিবেচনা করে তা গ্রহণ করে নিয়েছি এবং আপনাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয়েছি। সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা তখন রোমানদের প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং তাদের সঙ্গে নিরাপত্তাদানের চুক্তি করেন। এরপর মুসলিম বাহিনীর অন্যান্য অংশ পশ্চিম, দক্ষিণ ও উত্তর দিক থেকে বিজয়ী হিসেবে দামেশকে প্রবেশ করে। সকলে যখন নগরীর মধ্যপ্রান্তে সমবেত হয়, তখন অবাক বিস্ময়ে জানতে পারে যে, খালিদ রাযি. যুদ্ধের মাধ্যমে দামেশকে প্রবেশ করেছেন। খালিদ রাযি.-ও জানতে পারেন যে, আবু উবায়দা রাযি. দামেশকবাসীকে নিরাপত্তা প্রদান করেছেন।
অবশেষে সকলের পরামর্শে সিদ্ধান্ত হয় যে, দামেশককে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত নগরী হিসেবেই বিবেচনা করা হবে এবং দামেশকবাসীর সঙ্গে যুদ্ধে বিজিত জাতির পরিবর্তে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত জাতির নীতি কার্যকর হবে। নিঃসন্দেহে এটি ইসলাম ও মুসলমানদের ন্যায় ও উদারতার এক অনন্যসাধারণ বহিঃপ্রকাশ।
দামেশকের মধ্যভাগে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ গির্জা ছিল 'ইউহান্না গির্জা'। গির্জার অর্ধেক যুদ্ধের মাধ্যমে এবং অর্ধেক সন্ধির মাধ্যমে বিজিত হয়েছিল। যে অংশ যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত হয়েছিল, সেখানে মুসলমানরা শরিয়তপ্রদত্ত অধিকারের ভিত্তিতে একটি মসজিদ নির্মাণ করে। সন্ধির মাধ্যমে বিজিত অপর অংশ গির্জা হিসেবেই রেখে দেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে উমাইয়া আমলে মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদের পরিসর বৃদ্ধির প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক গির্জার দায়িত্বশীলদেরকে ডেকে তাদেরকে গির্জার বাকি অর্ধেক ভূমি মুসলমানদের দিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন এবং বিনিময়ে দামেশক ও আশেপাশের যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত অঞ্চলের চারটি গির্জা না ভেঙে তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। খ্রিষ্টান নেতৃবৃন্দ স্বেচ্ছায় রাজি হলে খলিফা ওয়ালিদ উভয় অংশকে একত্র করে জামে উমাবি নির্মাণ করেন।
টিকাঃ
১৪. ইবনে কাছির রহ. বলেন, ‘অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে ফিহলের যুদ্ধ দামেশক বিজয়ের পূর্বে সংঘটিত হয়। তবে ইমাম আবু জাফর ইবনে জারির বলেন, তা দামেশক বিজয়ের পর সংঘটিত হয়।’ (ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/২৫)। আমরা এখানে প্রথম মতটি গ্রহণ করেছি। ড. রাগিব সারজানি লিখেছেন, শামের মুসলিম বাহিনী মোট চারবার দামেশক অবরোধ করে। প্রথম তিনবারের প্রত্যেকবারই দক্ষিণে রোমান সম্রাট কর্তৃক বিশাল সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনী দামেশকের চিন্তা বাদ দিয়ে সেদিকে অগ্রসর হতে বাধ্য হয়। প্রথমবার খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. শামে আগমনের পর বুছরা বিজয়ের পূর্বে দামেশক অবরোধ করেন। এরপর তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করে বুছরায় অভিযান পরিচালনা করেন। বুছরা বিজয়ের পর দ্বিতীয়বার দামেশক অবরোধ করা হয়। এবারও অবরোধ প্রত্যাহার করা হয় এবং আজনাদাইনে অভিযান পরিচালনা করা হয়। আজনাদাইন বিজয়ের পর তৃতীয়বার অবরোধ করা হয়। এ সময় ত্রয়োদশ হিজরি সনের জিলকদ মাসে ফিহলে রোমান সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি. ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান রাযি.-কে দামেশকে রেখে বাকিদেরকে নিয়ে ফিহলে অভিযান পরিচালনা করেন। ফিহলের সফল অভিযান শেষে ফিরে এসে চতুর্দশ হিজরি সনে মুসলিম বাহিনী চতুর্থবার দামেশক অবরোধ করে এবং দামেশক জয় করে। দেখুন-https://bit.ly/345dgJu |
ফিহলের অভিযান শেষে মুসলিম বাহিনীর সবকটি অংশ একত্রে দামেশক অবরোধ করে (৯৪) এবং কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে দামেশকের বিভিন্ন প্রবেশদ্বারে অবস্থান গ্রহণ করে।
দামেশক ছিল সুউচ্চ প্রাচীর-বেষ্টিত সুরক্ষিত এক নগরী। প্রাচীরগুলোর উচ্চতা ছিল প্রায় ছয় মিটার, প্রন্থ ছিল সাড়ে চার মিটার। প্রাচীরের ওপর পনেরো মিটার দূরত্ব পরপর ছিল পর্যবেক্ষণ-চৌকি। প্রাচীরের গায়ে বিভিন্ন স্থানে ছিল বিশালাকার সাতটি ফটক। এসব ফটক ব্যতীত অন্য কোনো স্থান দিয়ে নগরীতে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। নগরীর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে নগরপ্রাচীরের চারপাশ ঘিরে খনন করা হয়েছিল পানিতে পরিপূর্ণ তিন মিটার প্রন্থের গভীর পরিখা। এর ফলে দামেশক নগরী দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত হয়েছিল। এ কারণে অবরোধ দীর্ঘ কয়েক মাস স্থায়ী হওয়ার পরও দামেশকবাসীর মাঝে নতি স্বীকারের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল না।
দামেশক অবরোধ করার সময় মুসলিম বাহিনী কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে নগরীর সাতটি প্রবেশদ্বারে অবস্থান গ্রহণ করে। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. অবস্থান গ্রহণ করেন আশ-শারকি প্রবেশদ্বারে (The Eastern Gate)। আবু উবায়দা রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ অবস্থান গ্রহণ করে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে দামেশকের পশ্চিম প্রান্তে আল-জাবিয়া প্রবেশদ্বারে (Bab al-Jabiya)। ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান নেয় দক্ষিণ প্রান্তের আস-সাগির দ্বার (Bab al-Saghir) ও কীসান দ্বারে (Bab Kisan)। শুরাহবিল বিন হাসানা রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান গ্রহণ করে উত্তর পাশে আল-ফারাদিস প্রবেশদ্বারে (Bab al-Faradis)। আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান নেয় টুমা প্রবেশদ্বারে (Bab Tuma)। শুধু আস-সালাম প্রবেশদ্বারের অবস্থান দুর্গম অঞ্চলে হওয়ায় সেখানে কোনো বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করেনি।
একপর্যায়ে প্রচণ্ড শীতের মৌসুম শুরু হয়। ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে দামেশকবাসীর মজুত খাদ্যসরবরাহ। মুসলিম বাহিনীর সদস্যদের চোখে কিন্তু নিদ্রা নেই। বিশেষত একটি ইউনিটের অধিনায়ক হিসেবে খালিদ রাযি.-এর ছিল বিশেষ সতর্ক-দৃষ্টি ও শক্তিশালী গোয়েন্দা-তৎপরতা। এক রাতে তিনি সংবাদ পান—জনৈক রোমান সেনাপতির সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া উপলক্ষ্যে নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে ভোজসভা ও পানসভার আয়োজন করা হয়েছে এবং মদের নেশায় মাতাল রোমানরা অসতর্ক ও অরক্ষিত অবস্থায় আছে। খালিদ তো এ ধরনের সুবর্ণ সুযোগ হেলায় নষ্ট করার লোক নন! তিনি তৎক্ষণাৎ মুসলিম বাহিনীর অশ্বারোহী রেজিমেন্টের সাহসী সৈনিকদের তলব করেন। সকলে সঙ্গে নেন কিছু রশি ও মই; যা এ ধরনের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল।
খালিদ ও তার সঙ্গীগণ মই সঙ্গে নিয়ে সাঁতরে পরিখা পার হন। তারা প্রাচীরের মাথায় মই আটকাতে সক্ষম হন এবং শত্রুপক্ষের প্রহরীদের অপ্রস্তুত রেখেই প্রাচীরে চড়েন। এরপর তারা দ্রুত দ্বার-প্রহরীদের হত্যা করে আশ-শারকি ফটক উন্মুক্ত করে দেন। তাদের তাকবির-ধ্বনিতে দামেশকের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
খালিদ তার সঙ্গীদের নিয়ে নগরীতে প্রবেশ করেন। পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, খালিদ তাদের দফারফা করেন।
খালিদ রাযি. দামেশকের পূর্ব দিক থেকে প্রবেশ করে ঝড়ের গতিতে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু অন্যান্য প্রবেশদ্বারে অবস্থানরত সেনাপতিগণ এ বিষয়ে কিছু জানতেন না। দামেশকের রোমান সেনাপতি যখন উপলব্ধি করে যে, খালিদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী দামেশকে প্রবেশ করে অনেকটা পথ অতিক্রম করে ফেলেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দামেশক জয় করতে যাচ্ছে, তখন সে এক বিস্ময়কর কৌশল গ্রহণ করে। সে নগরীর অন্যান্য দ্বারে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর সেনাপতিদের কাছে সংবাদ পাঠায় যে, আপনারা ইতিপূর্বে আমাদেরকে আত্মসমর্পণের যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আমরা সবদিক বিবেচনা করে তা গ্রহণ করে নিয়েছি এবং আপনাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয়েছি। সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা তখন রোমানদের প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং তাদের সঙ্গে নিরাপত্তাদানের চুক্তি করেন। এরপর মুসলিম বাহিনীর অন্যান্য অংশ পশ্চিম, দক্ষিণ ও উত্তর দিক থেকে বিজয়ী হিসেবে দামেশকে প্রবেশ করে। সকলে যখন নগরীর মধ্যপ্রান্তে সমবেত হয়, তখন অবাক বিস্ময়ে জানতে পারে যে, খালিদ রাযি. যুদ্ধের মাধ্যমে দামেশকে প্রবেশ করেছেন। খালিদ রাযি.-ও জানতে পারেন যে, আবু উবায়দা রাযি. দামেশকবাসীকে নিরাপত্তা প্রদান করেছেন।
অবশেষে সকলের পরামর্শে সিদ্ধান্ত হয় যে, দামেশককে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত নগরী হিসেবেই বিবেচনা করা হবে এবং দামেশকবাসীর সঙ্গে যুদ্ধে বিজিত জাতির পরিবর্তে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত জাতির নীতি কার্যকর হবে। নিঃসন্দেহে এটি ইসলাম ও মুসলমানদের ন্যায় ও উদারতার এক অনন্যসাধারণ বহিঃপ্রকাশ।
দামেশকের মধ্যভাগে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ গির্জা ছিল 'ইউহান্না গির্জা'। গির্জার অর্ধেক যুদ্ধের মাধ্যমে এবং অর্ধেক সন্ধির মাধ্যমে বিজিত হয়েছিল। যে অংশ যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত হয়েছিল, সেখানে মুসলমানরা শরিয়তপ্রদত্ত অধিকারের ভিত্তিতে একটি মসজিদ নির্মাণ করে। সন্ধির মাধ্যমে বিজিত অপর অংশ গির্জা হিসেবেই রেখে দেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে উমাইয়া আমলে মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদের পরিসর বৃদ্ধির প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক গির্জার দায়িত্বশীলদেরকে ডেকে তাদেরকে গির্জার বাকি অর্ধেক ভূমি মুসলমানদের দিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন এবং বিনিময়ে দামেশক ও আশেপাশের যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত অঞ্চলের চারটি গির্জা না ভেঙে তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। খ্রিষ্টান নেতৃবৃন্দ স্বেচ্ছায় রাজি হলে খলিফা ওয়ালিদ উভয় অংশকে একত্র করে জামে উমাবি নির্মাণ করেন।
টিকাঃ
১৪. ইবনে কাছির রহ. বলেন, ‘অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে ফিহলের যুদ্ধ দামেশক বিজয়ের পূর্বে সংঘটিত হয়। তবে ইমাম আবু জাফর ইবনে জারির বলেন, তা দামেশক বিজয়ের পর সংঘটিত হয়।’ (ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/২৫)। আমরা এখানে প্রথম মতটি গ্রহণ করেছি। ড. রাগিব সারজানি লিখেছেন, শামের মুসলিম বাহিনী মোট চারবার দামেশক অবরোধ করে। প্রথম তিনবারের প্রত্যেকবারই দক্ষিণে রোমান সম্রাট কর্তৃক বিশাল সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনী দামেশকের চিন্তা বাদ দিয়ে সেদিকে অগ্রসর হতে বাধ্য হয়। প্রথমবার খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. শামে আগমনের পর বুছরা বিজয়ের পূর্বে দামেশক অবরোধ করেন। এরপর তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করে বুছরায় অভিযান পরিচালনা করেন। বুছরা বিজয়ের পর দ্বিতীয়বার দামেশক অবরোধ করা হয়। এবারও অবরোধ প্রত্যাহার করা হয় এবং আজনাদাইনে অভিযান পরিচালনা করা হয়। আজনাদাইন বিজয়ের পর তৃতীয়বার অবরোধ করা হয়। এ সময় ত্রয়োদশ হিজরি সনের জিলকদ মাসে ফিহলে রোমান সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি. ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান রাযি.-কে দামেশকে রেখে বাকিদেরকে নিয়ে ফিহলে অভিযান পরিচালনা করেন। ফিহলের সফল অভিযান শেষে ফিরে এসে চতুর্দশ হিজরি সনে মুসলিম বাহিনী চতুর্থবার দামেশক অবরোধ করে এবং দামেশক জয় করে। দেখুন-https://bit.ly/345dgJu |
📄 ইয়ারমুকের যুদ্ধ
দামেশক বিজয়ের পর আবু উবায়দা রাযি. মুসলিম বাহিনীর কয়েকজন সেনাপতিকে দামেশক, ফিলিস্তিন ও জর্ডানের প্রশাসক নিযুক্ত করেন এবং নিজে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে সঙ্গে নিয়ে হিমস অভিমুখে রওনা হন। পথিমধ্যে খালিদ বিন ওয়ালিদ সন্ধির মাধ্যমে বালাবাক্কু নগরী জয় করেন। মুসলিম বাহিনী হিমসে পৌঁছে নগরীটি অবরোধ করলে মাত্র আঠারো দিন পরই হিমসবাসী নতি স্বীকার করে এবং মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয়। এভাবে পঞ্চদশ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে হিমস বিজিত হয়।
এদিকে প্রথমে দামেশক, তারপর হিমসের পতনে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস চূড়ান্ত পর্যায়ের উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এ সময় ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস ও কায়সারিয়া অঞ্চলের অধিবাসীরাও হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার আবেদন জানায়। অবশেষে হিরাক্লিয়াস শাম অঞ্চলে চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনার জন্য ব্যাপক সৈন্যসমাবেশ ঘটান। তিনি রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্যের আশ্রিত প্রত্যেক অঞ্চলের প্রশাসকদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে সকল যুদ্ধসক্ষম পুরুষকে বাহিনীতে যোগ দিতে নির্দেশ দেন। ফলে রুশ, স্লাভ, ইংরেজ, রোমান, গ্রিক, জর্জিয়ান, আর্মেনিয়ান ও আরব খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার সৈন্যের বিরাট এক বাহিনী (৯৫) প্রস্তুত হয়ে যায়। পুরো বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করা হয় আর্মেনিয়ান শাসক বাহানকে। হিরাক্লিয়াসের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার— বিজয়ী হলে শাম অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার ও সুদৃঢ় হবে আর পরাজিত হলে চিরতরে শামের মায়া ত্যাগ করতে হবে। খ্রিষ্টান ধর্মযাজকরাও বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় এবং যোদ্ধাদেরকে ধর্মীয় বাণী শুনিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে।
শাম অঞ্চলে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি. যথাসময়ে গোয়েন্দা মারফত রোমানদের এই বিশাল সৈন্যসমাবেশ সম্পর্কে সংবাদ পেয়ে যান। তৎক্ষণাৎ তিনি তার সঙ্গে অবস্থানরত অন্যান্য মুসলিম সেনাপতি ও নেতৃস্থানীয় সাহাবিদের সঙ্গে করণীয় নির্ধারণে পরামর্শ করেন। পরামর্শে সিদ্ধান্ত হয় যে, মুসলমানরা আপাতত হিমসের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য ফ্রন্টে অবস্থানরত মুসলিম সেনাপতিদের সঙ্গে মিলিত হবে এবং সকলে মিলে রোমান বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য উপযুক্ত কোনো স্থান নির্বাচন করবে।
হিমস ত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা খলিফা উমর রাযি.-কে জানানো হলে তিনি প্রথমে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অবশ্য যখন তাকে জানানো হয় যে, এটি সকলের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, তখন তিনি তাদের সফলতা কামনা করেন।
বার্তাবাহক খলিফার কাছে মদিনা থেকে অতিরিক্ত সামরিক সাহায্য প্রেরণের অনুরোধ করলে তিনি সাইদ বিন আমির বিন হিযয়াম রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণের প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তী সময়ে সাইদ বিন আমির রাযি.-এর নেতৃত্বে এক হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী শামে মূল বাহিনীর সঙ্গে যোগদান করে। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় ছত্রিশ হাজার। মুসলিম বাহিনীতে প্রায় এক হাজার সাহাবি ছিলেন, যাদের মাঝে মহান বদরি কাফেলার একশ সদস্যও ছিলেন।
খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর পরামর্শে সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী জাবিয়া হতে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কয়েক মাইল অগ্রসর হয়ে ইয়ারমুক নদীর তীরে অবস্থিত (বর্তমান গোলান মালভূমির অন্তর্গত) ইয়ারমুক প্রান্তরের পূর্বপাশে শিবির স্থাপন করে। অপরদিকে হিরাক্লিয়াসের নির্দেশে রোমান বাহিনী শিবির স্থাপন করে ইয়ারমুকের সমতল ভূমির পশ্চিম প্রান্তে ওয়াদিউর রাক্কাদে। যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকার জন্য রোমান বাহিনীর ডানবাহুর ত্রিশ হাজার সৈন্য প্রতি দশজন পায়ে শিকল বেঁধে ময়দানে উপস্থিত হয়েছিল।
যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বেই সৈন্যসংখ্যা ও যুদ্ধসরঞ্জাম উভয় দিক থেকে রোমান বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিভাত হচ্ছিল। প্রায় আঠারো মাইল বিস্তৃত রোমানদের শিবির দেখে বিহ্বল জনৈক মুসলিম সৈনিক মন্তব্য করে, 'রোমান বাহিনী কত বিশাল! আর মুসলিম বাহিনী কত ক্ষুদ্র!' তার মন্তব্য শুনে হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন এবং চিৎকার করে বলেন, 'বরং রোমান বাহিনী কত ক্ষুদ্র! আর মুসলিম বাহিনী কত বিশাল! আরে! আল্লাহর সাহায্য সঙ্গে থাকলে কম সংখ্যক সৈন্যও বেশি সংখ্যক সৈন্যে পরিণত হয় আর লাঞ্ছনা ও অবমাননা এসে গেলে বেশি সংখ্যক সৈন্যও কম সংখ্যায় পরিণত হয়। আল্লাহর শপথ! আমি তো বরং এই কামনা করি যে, আমার 'আশকার' ঘোড়াটি পায়ের ব্যথা-মুক্ত হতো আর বিপরীতে রোমান সৈন্য যা আছে, তার দ্বিগুণ হতো!' উল্লেখ্য, শামের বিস্তীর্ণ এলাকায় পথ চলে খালিদের ঘোড়ার খুর ছিলে গিয়েছিল।
আল্লাহু আকবার! এমনই ছিল সাহাবায়ে কেরামের চিন্তা ও চেতনা! এমনই ছিল মুসলিম সেনাপতিদের ভাব ও ভাবনা! খালিদ রাযি. জানতেন ও বিশ্বাস করতেন যে, সংখ্যাধিক্যে কিছু আসে-যায় না; একটি সৈন্যদলের বিজয় ও সফলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য লাভ করা; হোক তারা সংখ্যায় অতি অল্প। বরং তিনি তো বলছেন যে, এই যুদ্ধে যদি শত্রুপক্ষের সৈন্যসংখ্যা বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণও হয়, সমস্যা নেই; প্রিয় অশ্ব 'আশকার' তার সঙ্গে থাকলেই হলো!
খালিদ রাযি. যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে সকলকে সুরা আনফাল তিলাওয়াতের নির্দেশ দেন। আবু হুরায়রা রাযি., আবু সুফিয়ান রাযি. প্রমুখ সাহাবিগণ নসিহতের মাধ্যমে সকলের মনোবল সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট হন।
এরই মধ্যে মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি.-এর কাছে খলিফা উমর রাযি.-এর প্রেরিত বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় খলিফা সকলকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন—
উমর আপনাদেরকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন, হে মুসলমানগণ! আপনারা নিষ্ঠার সঙ্গে লড়াই করুন, সিংহের ন্যায় তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন এবং তরবারি দ্বারা শত্রুপক্ষের মাথায় আঘাত করুন। তারা যেন আপনাদের কাছে ধূলিকণার চেয়েও তুচ্ছ বিবেচিত হয়। আমি নিশ্চিত করেই জানি যে, তাদের মোকাবিলায় আপনারা নুসরত ও সাহায্য লাভ করবেন। সুতরাং তাদের সংখ্যাধিক্য যেন আপনাদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে না পারে।
আবু উবায়দা রাযি. সকলকে খলিফার পত্র পাঠ করে শোনালে মুসলিম বাহিনীর মনোবল আরও বৃদ্ধি পায়।
যদিও আবু উবায়দা রাযি. ছিলেন মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক; কিন্তু তার অনুমতিতে মহাবীর খালিদ রাযি.-ই মুসলিম বাহিনীর বিন্যাস-সহ সবকিছু পরিচালনা করছিলেন আর আবু উবায়দা রাযি. মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন অংশে গিয়ে সকলকে উদ্বুদ্ধ করছিলেন।
খালিদ রাযি. মুসলিম বাহিনীর পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্যদের ছত্রিশটি পদাতিক ও তিনটি অশ্বারোহী দলে বিভক্ত করেন আর চার হাজার বিশেষ অশ্বারোহী যোদ্ধার একটি বাহিনীকে দুই ভাগে বিভক্ত করে একভাগের নেতৃত্ব নিজের কাছে রাখেন; অপরভাগের নেতৃত্ব কায়স বিন হুবায়রা রাযি.-কে প্রদান করেন। বীরত্ব ও রণকুশলতায় কায়স রাযি. ছিলেন খালিদ রাযি.-এর পর মুসলিম বাহিনীর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। খালিদ রাযি. এই দুই অংশের একটিকে মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর পেছনে এবং অপরটিকে বামবাহুর পেছনে মোতায়েন করেন। সিদ্ধান্ত হয় রোমান বাহিনীর প্রাথমিক হামলার তীব্রতা শেষ হওয়ার পর যখন তারা মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে মিশে যাবে, তখন খালিদ ও কায়স অশ্বারোহী যোদ্ধাদের নিয়ে ডান দিক ও বাম দিক থেকে এগিয়ে এসে রোমানদের কচুকাটা করবেন।
শুরুতে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং যুদ্ধ নিশ্চিত হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর ইয়ারমুকের প্রান্তরে উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হয়। প্রথমে উভয় বাহিনীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের মধ্যে সম্মুখ লড়াই সংঘটিত হয় এবং প্রতিটি লড়াইয়ে মুসলিম বীর যোদ্ধাগণ প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। এরপর শুরু হয় প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এক লড়াই; ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ.-এর ভাষায়-
যেন বিশাল অগ্নিকুণ্ড দাউ দাউ করে জ্বলছে, আগুনের তেজ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, তরবারিগুলো প্রাণ কেড়ে নেওয়ার এক অনিঃশেষ খেলায় মেতে উঠেছে। তরবারির আঘাতে ঝরে পড়ছে খণ্ডিত মস্তক, খণ্ডবিখণ্ড মানবদেহ।
জুরজা ইয়ারমুকের যুদ্ধেই শহিদ হন। তিনি এমন এক সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর ওয়াস্তে জীবনে মাত্র দু-রাকাত নামাজ আদায় করার পরই শহিদি মৃত্যুর দেখা পেয়েছেন। (৯৬)
একটানা কয়েক দিন প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী লড়াই চলার পর ষষ্ঠ দিন রোমান বাহিনীর সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং তারা পলায়নের পথ ধরে। খালিদ রাযি. পূর্বেই গোপনে রোমান বাহিনীর পেছনের সংকীর্ণ গিরিপথে পাঁচশ অশ্বারোহী সৈন্যের একটি বাহিনীকে মোতায়েন করে রেখেছিলেন। ফলে পলাতক রোমান সৈন্যরা দু-দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং মুসলিম সৈন্যদের আঘাতের পাশাপাশি গিরিখাত থেকে নিচে পড়ে গিয়ে মারা যেতে থাকে। ষষ্ঠ দিনের সূর্যাস্তের পূর্বেই বিজয় মুসলিম বাহিনীর পদচুম্বন করে।
পরদিন সকালে খালিদ রাযি. একদল অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে দামেশকের পথ ধরে পলায়নরত রোমান সেনাপতি বাহানের খোঁজে অগ্রসর হন এবং তার নাগাল পেয়ে তাকে হত্যা করেন।
ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিন হাজার মুসলিম যোদ্ধা শহিদ হয়। অপরদিকে রোমান বাহিনীর সত্তর হাজার মতান্তরে এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য নিহত হয়। ইয়ারমুকে পরাজয়ের ফলে শামে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং সম্রাট হiraক্লিয়াস ভগ্ন হৃদয়ে এন্টিয়ক (৯৭) ত্যাগ করে কনস্টান্টিনোপলে চলে যান। শাম ত্যাগ করার সময় তিনি বলছিলেন, 'বিদায়, হে শাম! বিদায় চিরকালের জন্য! আর কখনো ফিরে আসব না তোমার বুকে। হায়! সবুজ-শ্যামল, উর্বর ও কল্যাণে ভরপুর এক ভূখণ্ড শত্রুর হাতে ছেড়ে যাচ্ছি!'
টিকাঃ
৯৫. ইয়ারমুকের যুদ্ধে রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। আবু উবায়দা রাযি. কর্তৃক খলিফা উমর রাযি.-এর কাছে প্রেরিত একটি পত্রের বিবরণ দ্বারা অনুমিত হয় যে, রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় চার লক্ষ। ঐতিহাসিক আযদি-ও বিভিন্ন সূত্রের বরাতে চার লক্ষের কথা উল্লেখ করেছেন।
৯৬. জুরজার ইসলামগ্রহণের ঘটনা বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থে ভিন্নভাবেও বর্ণিত আছে। কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় এখানে তা উল্লেখ করা হলো না।
৯৭. এন্টিয়ক: ভূমধ্যসাগরের উপকূল হতে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পূর্বে আছি নদী (Orontes river)-এর তীরে অবস্থিত অতি প্রাচীন একটি নগরী এন্টিয়ক (Antioch)। আধুনিক তুরস্কের হাতায় প্রদেশ (Hatay Province)-এর অন্তর্গত নগরীটির বর্তমান নাম এন্টাকিয়া (Antakya)। আরবিতে নগরীটির নাম أُنْطَاكِيَة (আনতাকিয়া)।
দামেশক বিজয়ের পর আবু উবায়দা রাযি. মুসলিম বাহিনীর কয়েকজন সেনাপতিকে দামেশক, ফিলিস্তিন ও জর্ডানের প্রশাসক নিযুক্ত করেন এবং নিজে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে সঙ্গে নিয়ে হিমস অভিমুখে রওনা হন। পথিমধ্যে খালিদ বিন ওয়ালিদ সন্ধির মাধ্যমে বালাবাক্কু নগরী জয় করেন। মুসলিম বাহিনী হিমসে পৌঁছে নগরীটি অবরোধ করলে মাত্র আঠারো দিন পরই হিমসবাসী নতি স্বীকার করে এবং মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয়। এভাবে পঞ্চদশ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে হিমস বিজিত হয়।
এদিকে প্রথমে দামেশক, তারপর হিমসের পতনে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস চূড়ান্ত পর্যায়ের উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এ সময় ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস ও কায়সারিয়া অঞ্চলের অধিবাসীরাও হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার আবেদন জানায়। অবশেষে হিরাক্লিয়াস শাম অঞ্চলে চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনার জন্য ব্যাপক সৈন্যসমাবেশ ঘটান। তিনি রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্যের আশ্রিত প্রত্যেক অঞ্চলের প্রশাসকদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে সকল যুদ্ধসক্ষম পুরুষকে বাহিনীতে যোগ দিতে নির্দেশ দেন। ফলে রুশ, স্লাভ, ইংরেজ, রোমান, গ্রিক, জর্জিয়ান, আর্মেনিয়ান ও আরব খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার সৈন্যের বিরাট এক বাহিনী (৯৫) প্রস্তুত হয়ে যায়। পুরো বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করা হয় আর্মেনিয়ান শাসক বাহানকে। হিরাক্লিয়াসের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার— বিজয়ী হলে শাম অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার ও সুদৃঢ় হবে আর পরাজিত হলে চিরতরে শামের মায়া ত্যাগ করতে হবে। খ্রিষ্টান ধর্মযাজকরাও বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় এবং যোদ্ধাদেরকে ধর্মীয় বাণী শুনিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে।
শাম অঞ্চলে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি. যথাসময়ে গোয়েন্দা মারফত রোমানদের এই বিশাল সৈন্যসমাবেশ সম্পর্কে সংবাদ পেয়ে যান। তৎক্ষণাৎ তিনি তার সঙ্গে অবস্থানরত অন্যান্য মুসলিম সেনাপতি ও নেতৃস্থানীয় সাহাবিদের সঙ্গে করণীয় নির্ধারণে পরামর্শ করেন। পরামর্শে সিদ্ধান্ত হয় যে, মুসলমানরা আপাতত হিমসের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য ফ্রন্টে অবস্থানরত মুসলিম সেনাপতিদের সঙ্গে মিলিত হবে এবং সকলে মিলে রোমান বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য উপযুক্ত কোনো স্থান নির্বাচন করবে।
হিমস ত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা খলিফা উমর রাযি.-কে জানানো হলে তিনি প্রথমে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অবশ্য যখন তাকে জানানো হয় যে, এটি সকলের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, তখন তিনি তাদের সফলতা কামনা করেন।
বার্তাবাহক খলিফার কাছে মদিনা থেকে অতিরিক্ত সামরিক সাহায্য প্রেরণের অনুরোধ করলে তিনি সাইদ বিন আমির বিন হিযয়াম রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণের প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তী সময়ে সাইদ বিন আমির রাযি.-এর নেতৃত্বে এক হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী শামে মূল বাহিনীর সঙ্গে যোগদান করে। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় ছত্রিশ হাজার। মুসলিম বাহিনীতে প্রায় এক হাজার সাহাবি ছিলেন, যাদের মাঝে মহান বদরি কাফেলার একশ সদস্যও ছিলেন।
খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর পরামর্শে সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী জাবিয়া হতে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কয়েক মাইল অগ্রসর হয়ে ইয়ারমুক নদীর তীরে অবস্থিত (বর্তমান গোলান মালভূমির অন্তর্গত) ইয়ারমুক প্রান্তরের পূর্বপাশে শিবির স্থাপন করে। অপরদিকে হিরাক্লিয়াসের নির্দেশে রোমান বাহিনী শিবির স্থাপন করে ইয়ারমুকের সমতল ভূমির পশ্চিম প্রান্তে ওয়াদিউর রাক্কাদে। যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকার জন্য রোমান বাহিনীর ডানবাহুর ত্রিশ হাজার সৈন্য প্রতি দশজন পায়ে শিকল বেঁধে ময়দানে উপস্থিত হয়েছিল।
যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বেই সৈন্যসংখ্যা ও যুদ্ধসরঞ্জাম উভয় দিক থেকে রোমান বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিভাত হচ্ছিল। প্রায় আঠারো মাইল বিস্তৃত রোমানদের শিবির দেখে বিহ্বল জনৈক মুসলিম সৈনিক মন্তব্য করে, 'রোমান বাহিনী কত বিশাল! আর মুসলিম বাহিনী কত ক্ষুদ্র!' তার মন্তব্য শুনে হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন এবং চিৎকার করে বলেন, 'বরং রোমান বাহিনী কত ক্ষুদ্র! আর মুসলিম বাহিনী কত বিশাল! আরে! আল্লাহর সাহায্য সঙ্গে থাকলে কম সংখ্যক সৈন্যও বেশি সংখ্যক সৈন্যে পরিণত হয় আর লাঞ্ছনা ও অবমাননা এসে গেলে বেশি সংখ্যক সৈন্যও কম সংখ্যায় পরিণত হয়। আল্লাহর শপথ! আমি তো বরং এই কামনা করি যে, আমার 'আশকার' ঘোড়াটি পায়ের ব্যথা-মুক্ত হতো আর বিপরীতে রোমান সৈন্য যা আছে, তার দ্বিগুণ হতো!' উল্লেখ্য, শামের বিস্তীর্ণ এলাকায় পথ চলে খালিদের ঘোড়ার খুর ছিলে গিয়েছিল।
আল্লাহু আকবার! এমনই ছিল সাহাবায়ে কেরামের চিন্তা ও চেতনা! এমনই ছিল মুসলিম সেনাপতিদের ভাব ও ভাবনা! খালিদ রাযি. জানতেন ও বিশ্বাস করতেন যে, সংখ্যাধিক্যে কিছু আসে-যায় না; একটি সৈন্যদলের বিজয় ও সফলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য লাভ করা; হোক তারা সংখ্যায় অতি অল্প। বরং তিনি তো বলছেন যে, এই যুদ্ধে যদি শত্রুপক্ষের সৈন্যসংখ্যা বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণও হয়, সমস্যা নেই; প্রিয় অশ্ব 'আশকার' তার সঙ্গে থাকলেই হলো!
খালিদ রাযি. যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে সকলকে সুরা আনফাল তিলাওয়াতের নির্দেশ দেন। আবু হুরায়রা রাযি., আবু সুফিয়ান রাযি. প্রমুখ সাহাবিগণ নসিহতের মাধ্যমে সকলের মনোবল সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট হন।
এরই মধ্যে মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি.-এর কাছে খলিফা উমর রাযি.-এর প্রেরিত বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় খলিফা সকলকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন—
উমর আপনাদেরকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন, হে মুসলমানগণ! আপনারা নিষ্ঠার সঙ্গে লড়াই করুন, সিংহের ন্যায় তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন এবং তরবারি দ্বারা শত্রুপক্ষের মাথায় আঘাত করুন। তারা যেন আপনাদের কাছে ধূলিকণার চেয়েও তুচ্ছ বিবেচিত হয়। আমি নিশ্চিত করেই জানি যে, তাদের মোকাবিলায় আপনারা নুসরত ও সাহায্য লাভ করবেন। সুতরাং তাদের সংখ্যাধিক্য যেন আপনাদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে না পারে।
আবু উবায়দা রাযি. সকলকে খলিফার পত্র পাঠ করে শোনালে মুসলিম বাহিনীর মনোবল আরও বৃদ্ধি পায়।
যদিও আবু উবায়দা রাযি. ছিলেন মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক; কিন্তু তার অনুমতিতে মহাবীর খালিদ রাযি.-ই মুসলিম বাহিনীর বিন্যাস-সহ সবকিছু পরিচালনা করছিলেন আর আবু উবায়দা রাযি. মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন অংশে গিয়ে সকলকে উদ্বুদ্ধ করছিলেন।
খালিদ রাযি. মুসলিম বাহিনীর পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্যদের ছত্রিশটি পদাতিক ও তিনটি অশ্বারোহী দলে বিভক্ত করেন আর চার হাজার বিশেষ অশ্বারোহী যোদ্ধার একটি বাহিনীকে দুই ভাগে বিভক্ত করে একভাগের নেতৃত্ব নিজের কাছে রাখেন; অপরভাগের নেতৃত্ব কায়স বিন হুবায়রা রাযি.-কে প্রদান করেন। বীরত্ব ও রণকুশলতায় কায়স রাযি. ছিলেন খালিদ রাযি.-এর পর মুসলিম বাহিনীর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। খালিদ রাযি. এই দুই অংশের একটিকে মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর পেছনে এবং অপরটিকে বামবাহুর পেছনে মোতায়েন করেন। সিদ্ধান্ত হয় রোমান বাহিনীর প্রাথমিক হামলার তীব্রতা শেষ হওয়ার পর যখন তারা মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে মিশে যাবে, তখন খালিদ ও কায়স অশ্বারোহী যোদ্ধাদের নিয়ে ডান দিক ও বাম দিক থেকে এগিয়ে এসে রোমানদের কচুকাটা করবেন।
শুরুতে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং যুদ্ধ নিশ্চিত হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর ইয়ারমুকের প্রান্তরে উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হয়। প্রথমে উভয় বাহিনীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের মধ্যে সম্মুখ লড়াই সংঘটিত হয় এবং প্রতিটি লড়াইয়ে মুসলিম বীর যোদ্ধাগণ প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। এরপর শুরু হয় প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এক লড়াই; ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ.-এর ভাষায়-
যেন বিশাল অগ্নিকুণ্ড দাউ দাউ করে জ্বলছে, আগুনের তেজ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, তরবারিগুলো প্রাণ কেড়ে নেওয়ার এক অনিঃশেষ খেলায় মেতে উঠেছে। তরবারির আঘাতে ঝরে পড়ছে খণ্ডিত মস্তক, খণ্ডবিখণ্ড মানবদেহ।
জুরজা ইয়ারমুকের যুদ্ধেই শহিদ হন। তিনি এমন এক সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর ওয়াস্তে জীবনে মাত্র দু-রাকাত নামাজ আদায় করার পরই শহিদি মৃত্যুর দেখা পেয়েছেন। (৯৬)
একটানা কয়েক দিন প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী লড়াই চলার পর ষষ্ঠ দিন রোমান বাহিনীর সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং তারা পলায়নের পথ ধরে। খালিদ রাযি. পূর্বেই গোপনে রোমান বাহিনীর পেছনের সংকীর্ণ গিরিপথে পাঁচশ অশ্বারোহী সৈন্যের একটি বাহিনীকে মোতায়েন করে রেখেছিলেন। ফলে পলাতক রোমান সৈন্যরা দু-দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং মুসলিম সৈন্যদের আঘাতের পাশাপাশি গিরিখাত থেকে নিচে পড়ে গিয়ে মারা যেতে থাকে। ষষ্ঠ দিনের সূর্যাস্তের পূর্বেই বিজয় মুসলিম বাহিনীর পদচুম্বন করে।
পরদিন সকালে খালিদ রাযি. একদল অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে দামেশকের পথ ধরে পলায়নরত রোমান সেনাপতি বাহানের খোঁজে অগ্রসর হন এবং তার নাগাল পেয়ে তাকে হত্যা করেন।
ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিন হাজার মুসলিম যোদ্ধা শহিদ হয়। অপরদিকে রোমান বাহিনীর সত্তর হাজার মতান্তরে এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য নিহত হয়। ইয়ারমুকে পরাজয়ের ফলে শামে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং সম্রাট হiraক্লিয়াস ভগ্ন হৃদয়ে এন্টিয়ক (৯৭) ত্যাগ করে কনস্টান্টিনোপলে চলে যান। শাম ত্যাগ করার সময় তিনি বলছিলেন, 'বিদায়, হে শাম! বিদায় চিরকালের জন্য! আর কখনো ফিরে আসব না তোমার বুকে। হায়! সবুজ-শ্যামল, উর্বর ও কল্যাণে ভরপুর এক ভূখণ্ড শত্রুর হাতে ছেড়ে যাচ্ছি!'
টিকাঃ
৯৫. ইয়ারমুকের যুদ্ধে রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। আবু উবায়দা রাযি. কর্তৃক খলিফা উমর রাযি.-এর কাছে প্রেরিত একটি পত্রের বিবরণ দ্বারা অনুমিত হয় যে, রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় চার লক্ষ। ঐতিহাসিক আযদি-ও বিভিন্ন সূত্রের বরাতে চার লক্ষের কথা উল্লেখ করেছেন।
৯৬. জুরজার ইসলামগ্রহণের ঘটনা বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থে ভিন্নভাবেও বর্ণিত আছে। কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় এখানে তা উল্লেখ করা হলো না।
৯৭. এন্টিয়ক: ভূমধ্যসাগরের উপকূল হতে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পূর্বে আছি নদী (Orontes river)-এর তীরে অবস্থিত অতি প্রাচীন একটি নগরী এন্টিয়ক (Antioch)। আধুনিক তুরস্কের হাতায় প্রদেশ (Hatay Province)-এর অন্তর্গত নগরীটির বর্তমান নাম এন্টাকিয়া (Antakya)। আরবিতে নগরীটির নাম أُنْطَاكِيَة (আনতাকিয়া)।
📄 দ্রষ্টব্য: সেনাপতি আবু উবায়দা রাযি.-এর অপূর্ব মহৎ আচরণ
হিমস ত্যাগ করে জাবিয়ায় গমনের প্রাক্কালে সেনাপতি আবু উবায়দা রাযি. স্থানীয় অধিবাসীদের ডেকে তাদের কাছ থেকে ইতিপূর্বে সংগৃহীত জিজিয়া অর্থ ফেরত প্রদান করে বলেন,
'যেহেতু আমরা আর এখন আপনাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করতে সক্ষম নই, তাই আপনাদের প্রদত্ত অর্থ ফেরত নিয়ে নিন।' উত্তরে হিমসবাসী বলে,
'আমরা যে নিপীড়ন ও শোষণের মাঝে বসবাস করি, তার তুলনায় আপনাদের সদাচরণ ও ন্যায়-নীতি আমাদের কাছে শতগুণ প্রিয়।'
নিঃসন্দেহে আবু উবায়দা রাযি.-এর এই আচরণ ছিল ইসলামের সুমহান আদর্শ ও নীতির এক প্রকৃষ্ট নমুনা। বিজয়ী জাতি কর্তৃক চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অর্থ গ্রহণের পর বিজিত জাতিকে তা ফেরত প্রদানের ইতিহাস পৃথিবীতে একমাত্র মুসলিম জাতিই রচনা করতে পেরেছে।
হিমস ত্যাগ করে জাবিয়ায় গমনের প্রাক্কালে সেনাপতি আবু উবায়দা রাযি. স্থানীয় অধিবাসীদের ডেকে তাদের কাছ থেকে ইতিপূর্বে সংগৃহীত জিজিয়া অর্থ ফেরত প্রদান করে বলেন,
'যেহেতু আমরা আর এখন আপনাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করতে সক্ষম নই, তাই আপনাদের প্রদত্ত অর্থ ফেরত নিয়ে নিন।' উত্তরে হিমসবাসী বলে,
'আমরা যে নিপীড়ন ও শোষণের মাঝে বসবাস করি, তার তুলনায় আপনাদের সদাচরণ ও ন্যায়-নীতি আমাদের কাছে শতগুণ প্রিয়।'
নিঃসন্দেহে আবু উবায়দা রাযি.-এর এই আচরণ ছিল ইসলামের সুমহান আদর্শ ও নীতির এক প্রকৃষ্ট নমুনা। বিজয়ী জাতি কর্তৃক চুক্তির শর্ত অনুযায়ী অর্থ গ্রহণের পর বিজিত জাতিকে তা ফেরত প্রদানের ইতিহাস পৃথিবীতে একমাত্র মুসলিম জাতিই রচনা করতে পেরেছে।
📄 জনৈক রোমান সেনাপতির ইসলামগ্রহণ
যুদ্ধ চলাকালে জুরজা নামক জনৈক রোমান সেনাপতি নিজেদের সারি থেকে বেরিয়ে আসেন এবং মুসলিম সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদকে আহ্বান করেন। তার আহ্বানে খালিদ অগ্রসর হন। উভয়ের ঘোড়া যখন একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন জুরজা বলেন—‘হে খালিদ, আপনি আমাকে সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য দেবেন, মিথ্যা বলবেন না। স্বাধীন ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলতে পারে না। আপনি আমার সঙ্গে বিশ্বস্ততা রক্ষা করবেন, প্রতারণা করবেন না। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি কখনো প্রতারণা করে না। এটা কি সত্য যে, আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে আপনাদের নবীর কাছে একটি তরবারি প্রেরণ করেছেন, আর তিনি তা আপনাকে প্রদান করেছেন? আর এ কারণেই আপনি যার বিরুদ্ধেই তরবারি কোষমুক্ত করেন, তাকেই পরাজিত করেন!’
খালিদ উত্তর দেন, ‘না’।
‘তাহলে আপনাকে সাইফুল্লাহ (আল্লাহর তরবারি) ডাকা হয় কেন?’ জুরজা জিজ্ঞেস করেন।
খালিদ উত্তর দেন, ‘আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে তার নবীকে প্রেরণ করেছেন। তিনি আমাদেরকে সত্যের পথে আহ্বান করলে আমরা প্রথমে বিমুখ হয়েছি এবং তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছি। এরপর আমাদের অনেকে তাকে সত্যপ্রতিপন্ন করেছে আর বাকিরা তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে এবং তাকে দূরে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি ছিলাম মিথ্যাপ্রতিপন্নকারী ও বিতাড়িতকারীদের একজন। তারপর আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তর ও ললাটদেশ চেপে ধরেন এবং তার মাধ্যমে আমাদেরকে হেদায়েত দান করেন। আমরা তার হাতে বায়আত গ্রহণ করি। আমি ইসলামগ্রহণ করার পর তিনি আমাকে বলেন, তুমি হলে আল্লাহর এক তরবারি, যা আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। তিনি আল্লাহর কাছে আমাকে সাহায্য করার দোয়া করেন। এ কারণেই আমি আল্লাহর তরবারি নামে আখ্যায়িত হয়েছি। আর আমি মুশরিকদের বিপক্ষে সর্বাধিক কঠোর ব্যক্তি।'
এরপর জুরজা জিজ্ঞেস করেন, 'আপনারা মানুষকে কীসের প্রতি আহ্বান করেন?'
খালিদ উত্তর দেন, 'আমরা মানুষকে এই সাক্ষ্য প্রদানের আহ্বান জানাই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তার বান্দা ও রাসুল। আর আমরা মানুষকে এই স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানাই যে, আল্লাহর রাসুল আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছেন, তা সত্য।'
'কেউ যদি আপনাদের আহ্বানে সাড়া না দেয়?' জurজা জিজ্ঞেস করেন।
'তাহলে তারা জিজিয়া প্রদান করবে আর আমরা তাদেরকে নিরাপত্তা দেবো।'
'যদি জিজিয়া প্রদানেও রাজি না হয়?'
'আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব, এরপর যুদ্ধ করব।' খালিদ উত্তর দেন।
এরপর জুরজা জিজ্ঞেস করেন, 'আজ যদি কেউ আপনাদের আহ্বানে সাড়া দেয় এবং ইসলামে দীক্ষিত হয়, তাহলে তার মর্যাদা কীরূপ হবে?'
খালিদ উত্তর দেন, 'আল্লাহপ্রদত্ত বিধান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে ইসলামগ্রহণকারী অগ্রবর্তী-পশ্চাদ্বর্তী, সম্ভ্রান্ত-সাধারণ সকলেই সমমর্যাদাসম্পন্ন বিবেচিত হয়।'
'তাহলে (আপনি বলতে চাচ্ছেন) আজ যে আপনাদের দলভুক্ত হবে, সেও আপনাদের সমপরিমাণ আজর ও প্রতিদান লাভ করবে?!'
'হ্যাঁ, বরং আজর ও পুণ্যের বিবেচনায় তো সে আরও উত্তম বিবেচিত হবে।'
'আপনারা তার তুলনায় কত পূর্বে ইসলামগ্রহণ করেছেন। তারপরও সে কীভাবে আপনাদের সমমর্যাদাসম্পন্ন হবে?!' জুরজা অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেন।
খালিদ উত্তর দেন, 'আমরা যখন ইসলামগ্রহণ করেছি এবং নবীজির হাতে বায়আত গ্রহণ করেছি, তখন তিনি ছিলেন জীবিত, আমাদের মাঝেই বিদ্যমান। তার কাছে আসমানি বার্তা অবতীর্ণ হতো, তিনি কুরআনের আলোকে আমাদের বিভিন্ন বিষয় জানাতেন, আমাদেরকে বিভিন্ন নিদর্শন দেখাতেন। আমরা যা দেখেছি-শুনেছি, তা দেখলে ও শুনলে যে কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামগ্রহণে ও ইসলামের বিধান পালনে বাধ্য হয়ে পড়বে। বিপরীতে তোমরা সেসব বিস্ময়কর ও অলৌকিক প্রমাণাদি না দেখেছ, না শুনেছ। কাজেই তোমাদের কেউ যদি (আশ্চর্য বিষয়াদি প্রত্যক্ষ না করা সত্ত্বেও) খাঁটি নিয়ত ও স্বচ্ছ বিশ্বাসে ইসলামে দাখিল হয়, নিশ্চয়ই সে আমাদের চেয়ে শ্রেয়তর হবে।'
জুরজা তার শেষ প্রশ্ন করেন, 'আল্লাহর শপথ দিয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, আপনি আমাকে সত্য বলেছেন তো? কোনো ধরনের ধোঁকা দেননি তো?'
'আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে সত্য বলেছি। আর তোমার-আমার কথোপকথন সম্পর্কে মহান আল্লাহ অবগত আছেন।'
এ কথা শোনার পর জুরজা খালিদের সামনে তার ঢাল উল্টিয়ে ধরে তার প্রতি ঝুঁকে পড়েন; এরপর বলেন, আমাকে ইসলাম শিখিয়ে দিন। খালিদ জুরজাকে নিয়ে নিজ তাঁবুতে ফিরে আসেন, এক মশক পানি দিয়ে তাকে অজু করান এবং তাকে নিয়ে দু-রাকাত নামাজ পড়েন।
রোমান বাহিনী ভেবেছিল, জুরজা খালিদকে ধোঁকা দিতে চাচ্ছেন। জুরজাকে খালিদের সঙ্গে তাঁবুর দিকে যেতে দেখে রোমানরা মনে করে, জুরজার কৌশল সফল হয়েছে। খালিদ-বিহীন মুসলিম বাহিনীর ওপর তারা প্রবল উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রবল আক্রমণের মাধ্যমে তাদেরকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এরই মধ্যে খালিদ ও জুরজা তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসেন আর জুরজা মুসলিম কাতারে যোগ দিয়ে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকেন। মুসলিম সৈন্যরাও পরস্পরকে আহ্বান করে একতাবদ্ধ হয় এবং অটল-অবিচলতার সঙ্গে আক্রমণ শুরু করে। পাল্টা আক্রমণে দিশেহারা রোমান বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। খালিদ ও জুরজা আপন আপন তরবারি হাতে প্রবল বিক্রমে রোমান সৈন্যদের কাতারে প্রবেশ করে যুদ্ধ করতে থাকেন।
যুদ্ধ চলাকালে জুরজা নামক জনৈক রোমান সেনাপতি নিজেদের সারি থেকে বেরিয়ে আসেন এবং মুসলিম সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদকে আহ্বান করেন। তার আহ্বানে খালিদ অগ্রসর হন। উভয়ের ঘোড়া যখন একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যায়, তখন জুরজা বলেন—‘হে খালিদ, আপনি আমাকে সম্পূর্ণ সঠিক তথ্য দেবেন, মিথ্যা বলবেন না। স্বাধীন ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলতে পারে না। আপনি আমার সঙ্গে বিশ্বস্ততা রক্ষা করবেন, প্রতারণা করবেন না। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি কখনো প্রতারণা করে না। এটা কি সত্য যে, আল্লাহ তাআলা আসমান থেকে আপনাদের নবীর কাছে একটি তরবারি প্রেরণ করেছেন, আর তিনি তা আপনাকে প্রদান করেছেন? আর এ কারণেই আপনি যার বিরুদ্ধেই তরবারি কোষমুক্ত করেন, তাকেই পরাজিত করেন!’
খালিদ উত্তর দেন, ‘না’।
‘তাহলে আপনাকে সাইফুল্লাহ (আল্লাহর তরবারি) ডাকা হয় কেন?’ জুরজা জিজ্ঞেস করেন।
খালিদ উত্তর দেন, ‘আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে তার নবীকে প্রেরণ করেছেন। তিনি আমাদেরকে সত্যের পথে আহ্বান করলে আমরা প্রথমে বিমুখ হয়েছি এবং তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছি। এরপর আমাদের অনেকে তাকে সত্যপ্রতিপন্ন করেছে আর বাকিরা তাকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে এবং তাকে দূরে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি ছিলাম মিথ্যাপ্রতিপন্নকারী ও বিতাড়িতকারীদের একজন। তারপর আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তর ও ললাটদেশ চেপে ধরেন এবং তার মাধ্যমে আমাদেরকে হেদায়েত দান করেন। আমরা তার হাতে বায়আত গ্রহণ করি। আমি ইসলামগ্রহণ করার পর তিনি আমাকে বলেন, তুমি হলে আল্লাহর এক তরবারি, যা আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের বিরুদ্ধে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। তিনি আল্লাহর কাছে আমাকে সাহায্য করার দোয়া করেন। এ কারণেই আমি আল্লাহর তরবারি নামে আখ্যায়িত হয়েছি। আর আমি মুশরিকদের বিপক্ষে সর্বাধিক কঠোর ব্যক্তি।'
এরপর জুরজা জিজ্ঞেস করেন, 'আপনারা মানুষকে কীসের প্রতি আহ্বান করেন?'
খালিদ উত্তর দেন, 'আমরা মানুষকে এই সাক্ষ্য প্রদানের আহ্বান জানাই যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তার বান্দা ও রাসুল। আর আমরা মানুষকে এই স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানাই যে, আল্লাহর রাসুল আল্লাহর পক্ষ থেকে যা নিয়ে এসেছেন, তা সত্য।'
'কেউ যদি আপনাদের আহ্বানে সাড়া না দেয়?' জurজা জিজ্ঞেস করেন।
'তাহলে তারা জিজিয়া প্রদান করবে আর আমরা তাদেরকে নিরাপত্তা দেবো।'
'যদি জিজিয়া প্রদানেও রাজি না হয়?'
'আমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব, এরপর যুদ্ধ করব।' খালিদ উত্তর দেন।
এরপর জুরজা জিজ্ঞেস করেন, 'আজ যদি কেউ আপনাদের আহ্বানে সাড়া দেয় এবং ইসলামে দীক্ষিত হয়, তাহলে তার মর্যাদা কীরূপ হবে?'
খালিদ উত্তর দেন, 'আল্লাহপ্রদত্ত বিধান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে ইসলামগ্রহণকারী অগ্রবর্তী-পশ্চাদ্বর্তী, সম্ভ্রান্ত-সাধারণ সকলেই সমমর্যাদাসম্পন্ন বিবেচিত হয়।'
'তাহলে (আপনি বলতে চাচ্ছেন) আজ যে আপনাদের দলভুক্ত হবে, সেও আপনাদের সমপরিমাণ আজর ও প্রতিদান লাভ করবে?!'
'হ্যাঁ, বরং আজর ও পুণ্যের বিবেচনায় তো সে আরও উত্তম বিবেচিত হবে।'
'আপনারা তার তুলনায় কত পূর্বে ইসলামগ্রহণ করেছেন। তারপরও সে কীভাবে আপনাদের সমমর্যাদাসম্পন্ন হবে?!' জুরজা অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেন।
খালিদ উত্তর দেন, 'আমরা যখন ইসলামগ্রহণ করেছি এবং নবীজির হাতে বায়আত গ্রহণ করেছি, তখন তিনি ছিলেন জীবিত, আমাদের মাঝেই বিদ্যমান। তার কাছে আসমানি বার্তা অবতীর্ণ হতো, তিনি কুরআনের আলোকে আমাদের বিভিন্ন বিষয় জানাতেন, আমাদেরকে বিভিন্ন নিদর্শন দেখাতেন। আমরা যা দেখেছি-শুনেছি, তা দেখলে ও শুনলে যে কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামগ্রহণে ও ইসলামের বিধান পালনে বাধ্য হয়ে পড়বে। বিপরীতে তোমরা সেসব বিস্ময়কর ও অলৌকিক প্রমাণাদি না দেখেছ, না শুনেছ। কাজেই তোমাদের কেউ যদি (আশ্চর্য বিষয়াদি প্রত্যক্ষ না করা সত্ত্বেও) খাঁটি নিয়ত ও স্বচ্ছ বিশ্বাসে ইসলামে দাখিল হয়, নিশ্চয়ই সে আমাদের চেয়ে শ্রেয়তর হবে।'
জুরজা তার শেষ প্রশ্ন করেন, 'আল্লাহর শপথ দিয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, আপনি আমাকে সত্য বলেছেন তো? কোনো ধরনের ধোঁকা দেননি তো?'
'আল্লাহর শপথ! আমি তোমাকে সত্য বলেছি। আর তোমার-আমার কথোপকথন সম্পর্কে মহান আল্লাহ অবগত আছেন।'
এ কথা শোনার পর জুরজা খালিদের সামনে তার ঢাল উল্টিয়ে ধরে তার প্রতি ঝুঁকে পড়েন; এরপর বলেন, আমাকে ইসলাম শিখিয়ে দিন। খালিদ জুরজাকে নিয়ে নিজ তাঁবুতে ফিরে আসেন, এক মশক পানি দিয়ে তাকে অজু করান এবং তাকে নিয়ে দু-রাকাত নামাজ পড়েন।
রোমান বাহিনী ভেবেছিল, জুরজা খালিদকে ধোঁকা দিতে চাচ্ছেন। জুরজাকে খালিদের সঙ্গে তাঁবুর দিকে যেতে দেখে রোমানরা মনে করে, জুরজার কৌশল সফল হয়েছে। খালিদ-বিহীন মুসলিম বাহিনীর ওপর তারা প্রবল উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রবল আক্রমণের মাধ্যমে তাদেরকে পিছু হটতে বাধ্য করে। এরই মধ্যে খালিদ ও জুরজা তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসেন আর জুরজা মুসলিম কাতারে যোগ দিয়ে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকেন। মুসলিম সৈন্যরাও পরস্পরকে আহ্বান করে একতাবদ্ধ হয় এবং অটল-অবিচলতার সঙ্গে আক্রমণ শুরু করে। পাল্টা আক্রমণে দিশেহারা রোমান বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। খালিদ ও জুরজা আপন আপন তরবারি হাতে প্রবল বিক্রমে রোমান সৈন্যদের কাতারে প্রবেশ করে যুদ্ধ করতে থাকেন।