📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব হতে অব্যাহতিদান

📄 খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব হতে অব্যাহতিদান


খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর খলিফা উমর রাযি. প্রথমেই যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তা হলো—শাম অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব হতে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে অপসারণ এবং আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.-কে শামের বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক নির্ধারণ। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, এ সময় খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর নেতৃত্বে শামের মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ (আবু উবায়দা রাযি.-ও তার বাহিনী নিয়ে খালিদের অধীনে ছিলেন) দামেশক নগরী অবরোধ করে রেখেছিল। (৮৭)
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এতগুলো মহান বিজয় খালিদ বিন ওয়ালিদের হাতে অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও কেন তাকে বরখাস্ত করা হয়?
বাস্তব কথা হলো—এ বিষয়টি নিয়ে যারাই নানারকম আলোচনা-সমালোচনা করে থাকে, তারা প্রকৃতপক্ষে বিষয়টিকে মহান সাহাবায়ে কেরামের শান ও মর্যাদা বিবেচনায় রেখে বিশ্লেষণ করে না; বরং যে বস্তুবাদী সমাজে তারা বসবাস করে, সেই বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করে থাকে।
হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদের অব্যাহতি প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে প্রফেসর আক্কাদ (৮৮) লিখেছেন,
(খলিফা উমর রাযি. কর্তৃক খালিদ রাযি.-কে অব্যাহতিদান সম্পর্কে) একদল লোকের ধারণা, এটি মূলত দুই সমকক্ষ ও সমশক্তির ব্যক্তির পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিণতি। আরেক দলের মত—তাকে বিনা কারণে বরখাস্ত করা হয়েছে। তৃতীয় একদল লোকের ধারণা, দুজনের মধ্যকার পুরোনো শত্রুতা ও সংঘাতের প্রতিক্রিয়া এটি। আর নয়তো নতুন করে এমন কোনো ত্রুটি খালিদ করেননি, যার কারণে তাকে বরখাস্ত করে মুসলিম উম্মাহকে তার শক্তি ও যুদ্ধদক্ষতা হতে বঞ্চিত করা যেতে পারে।
এ সম্পর্কে আমাদের কথা হলো, কেউ এ বিষয়ে বিরূপ ধারণা করতে চাইলে তার জন্য আশা করি এ তথ্যটিই যথেষ্ট হবে যে, খলিফা উমর রাযি. বরখাস্ত করার মতো উপযুক্ত কোনো ত্রুটি ছাড়াই খালিদকে বরখাস্ত করেছিলেন। স্বয়ং খলিফা উমর রাযি. তাকে বরখাস্ত করার পর প্রাথমিক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি শেষ হতেই সুস্পষ্টভাষায় জানিয়ে দেন যে, খালিদ আপন দায়িত্বে কোনো প্রকার অবহেলা করেননি; বরং তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। সুতরাং তার প্রতি কোনো প্রকার অপবাদ আরোপ করার বা সমালোচনা করার সুযোগ মোটেও নেই। খলিফা হজরত খালিদ রাযি.-কে খেয়ানত-অভিযোগ হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ঘোষণা করে ইসলামি রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বার্তা প্রেরণ করেন এবং সকলকে জানিয়ে দেন তিনি খালিদকে কোনো ক্রোধ-অসন্তোষ বা দায়িত্বে অবহেলার কারণে অব্যাহতিদান করেননি। বরং তাকে অব্যাহতিদানের কারণ হলো, মানুষ তার বিষয়ে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। খলিফা আরও লেখেন, আমি আশঙ্কা করেছি যে, মানুষ তার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। তাই আমি চেয়েছি—সকলে মনে-প্রাণে এ কথা বিশ্বাস করুক যে, আল্লাহই সবকিছুর কর্তা। আমি চেয়েছি, মানুষ যেন ফিতনার শিকার না হয়।
শুধু তাই নয়, স্বয়ং খালিদ যখন খলিফার কাছে তাকে অব্যাহতিদানের কারণ জিজ্ঞেস করেন, তখন তিনি তাকে বলেন, 'মানুষ তোমার বিষয়ে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তাই আমি আশঙ্কা করেছি যে, তুমি মানুষের ফিতনার কারণ হয়ে যাবে।' (৮৯)
প্রফেসর আক্কাদের মন্তব্য শেষ হলো। আমাদের কথা হলো—প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি এর চেয়েও সরল ও সাদামাটা। আমরা ঘটনার প্রাথমিক অবস্থায় কোনো ধরনের 'অস্বস্তিকর পরিস্থিতি' তৈরি হওয়ার কথাও শুনিনি। খালিদের সেনাবাহিনীর কেউ বিদ্রোহ করেনি, স্বয়ং খালিদ রাযি.-ও কোনো ধরনের বিরোধিতা করেননি। কেননা, খালিদ খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত উমর রাযি.-এর প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল ছিলেন। এটি প্রথম লক্ষণীয় বিষয়।
অধিকন্তু হজরত উমর ছিলেন সমকালীন মুসলিম উম্মাহর প্রধান দায়িত্বশীল। গুনাহ নয়-এমন যেকোনো নির্দেশ প্রদানের অধিকার তার ছিল এবং তার নির্দেশ সকলে মানতে বাধ্যও ছিল। এটি দ্বিতীয় লক্ষণীয় বিষয়।
তা ছাড়া উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম কাফেলার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হজরত খালিদ রাযি. দ্বীনের এই সুমহান অঙ্গনে কাজ করতেন পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। পদ ও পদমর্যাদা, নেতৃত্ব ও ক্ষমতালাভের জাগতিক চিন্তাধারা হতে 'তিনি' ও 'তারা' ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। খালিদ রাযি.-সহ প্রত্যেক সাহাবির মনোভাব তো এই ছিল যে, আমাকে বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশে নিযুক্ত করা হোক বা পেছনের অংশে, দ্বিধাহীন চিত্তে প্রস্তুত আছি। সুতরাং আজ তাকে সেনাপতির দায়িত্ব প্রদানের পর কাল যদি তাকে সাধারণ সৈন্য গণ্য করা হয়, কী আসে যায়! প্রকৃতপক্ষে এটিই হলো ইখলাস ও নিষ্ঠা এবং জুহদ ও দুনিয়াবিরাগের নিদর্শন। এ বিষয়ে কারও সন্দেহ নেই যে, সুমহান সাহাবি খালিদ রাযি.-এর হৃদয়জগৎ এসব গুণ ও চিন্তাকেই ধারণ করত। তাই তো নিজের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কথোপকথনের একপর্যায়ে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বিষয়ের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'যে রাতে আমার কাছে কোনো প্রিয়তমা নববধূর আগমন ঘটবে, কিংবা আমাকে প্রদান করা হবে পিতৃত্বের সুসংবাদ, তা আমার কাছে ওই হিমশীতল বিপৎসংকুল রাত হতে অধিক প্রিয় নয়, যে রাতে আমি অবস্থান করি মুহাজির যোদ্ধাদের কোনো বাহিনীর সঙ্গে; প্রত্যুষে শত্রুর মোকাবিলার প্রস্তুতিতে। সুতরাং তোমরা জিহাদের সংগ্রামী জীবনকেই আঁকড়ে ধরো। (৯০)
কথিত মতবিরোধের এই বিষয়টি তাদের দৃষ্টিতে কত সাধারণ ও তুচ্ছ ছিল, তা বুঝতে আবদুল মালিক বিন উমায়র-এর সূত্রে ইমাম আহমাদ রহ.-এর নিম্নোক্ত বর্ণনাটি পাঠ করুন।
খলিফা উমর আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে শামের বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করলেন এবং খালিদকে অব্যাহতি দিলেন। সংবাদ পেয়ে খালিদ সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এই উম্মাহর বিশ্বস্ততম ব্যক্তিকে তোমাদের উদ্দেশে প্রেরণ করা হয়েছে। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ কথা বলতে শুনেছি। তখন আবু উবায়দা রাযি. বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি-খালিদ হলো আল্লাহর একটি তরবারি এবং অতি উত্তম আত্মীয়-যুবক। (৯১)
ঐতিহাসিক ইবনে আসাকির রহ. বর্ণনা করেন-
হজরত আবু উবায়দা রাযি. আপন দায়িত্বলাভ ও খালিদ রাযি.-এর অব্যাহতি সংক্রান্ত পত্রটি হাতে পৌঁছার প্রায় বিশ দিন পর খালিদকে প্রদান করেন। খালিদ পত্র পাঠ করার পর (এত দিন দেরি করে তাকে পত্রটি দেওয়ায়) অবাক হন এবং আবু উবায়দার নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে বলেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, আপনার কাছে আমিরুল মুমিনিনের পত্র এসেছে অথচ আপনি আমাকে অবগত করেননি! দায়িত্ব ও নেতৃত্ব আপনার হওয়া সত্ত্বেও আপনি আমার পেছনেই নামাজ আদায় করে গেছেন! উত্তরে আবু উবায়দা বলেন, আল্লাহ আপনাকেও ক্ষমা করুন। যতক্ষণ না আপনি বিষয়টি অন্যের কাছ থেকে অবহিত হয়েছেন, ততক্ষণ তো আমি আপনাকে তা জানাতেই চাইনি। আমি চাইনি বিজয়াভিযানের এই অগ্রযাত্রা সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই আপনার যুদ্ধগতি ব্যাহত হোক। আমার ইচ্ছা ছিল, আল্লাহ চাহে তো বিজয়াভিযান সমাপ্ত হলে আপনাকে বিষয়টি অবহিত করব। আর পার্থিব ক্ষমতা ও পদ, খ্যাতি ও সুখ্যাতি তো আমি চাই না, পার্থিব প্রাপ্তির আশায় কোনো আমলও করি না। এই দৃশ্যমান পৃথিবী তো শীঘ্রই ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা পরস্পর ভাই-ভাই, আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে দায়িত্বশীল। ভাই পাশে থাকলে কোনো ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বরং দুজনের মধ্যে দায়িত্বশীল যিনি, তিনি জানেন যে, উভয়ের মধ্যে তিনিই হচ্ছেন ফিতনার অধিক নিকটবর্তী এবং ভুলের শিকার হওয়ার অধিক সম্ভাব্য ব্যক্তি। অবশ্য আল্লাহ যাকে ভুল হতে রক্ষা করেন, তার কথা ভিন্ন। আর এমন খুব কম ব্যক্তিই হয়ে থাকেন। (৯২)
আল্লাহু আকবার! অভিবাদন আপনায় হে খালিদ! আল্লাহু আকবার! অভিবাদন আপনায় হে আবু উবায়দা!
সমালোচনার তো প্রশ্নই আসে না, প্রকৃত পরিস্থিতি ও বাস্তবতা কারও সামনে থাকলে শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় হৃদয় সিক্ত হবে আর চক্ষু হবে অশ্রুসজল। এরাই তো উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম পুরুষ! এরাই তো আমাদের গৌরব! আমরা তো তাদেরই উত্তরসূরি!
আজ আল্লাহর দুশমন ও ইসলামের শত্রুরা চাচ্ছে তাদের প্রতি আমাদের বিশ্বাস ও আস্থার জায়গাটি নড়বড়ে করে দিতে। আফসোস ও পরিতাপের বিষয়, ইসলামি পরিচয়ধারী কিছু লেখকও এ ক্ষেত্রে তাদের সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এসব লেখকের ইলমের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। আর তাই তাদের রচিত ইতিহাসে উম্মাহর এমন কিছু পাওয়ার নেই, যার অনুসরণ তারা করতে পারে, যা নিয়ে তারা গর্ব করতে পারে।
মোটকথা, আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি যে, হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে অব্যাহতিদানের পেছনে উমর রাযি.-কে যে বিষয়টি উদ্বুদ্ধ করেছিল তা হচ্ছে—খলিফা আশঙ্কা করছিলেন যে, ঈমানের দৃঢ়তা সত্ত্বেও উম্মাহ ফিতনার শিকার হতে পারে। এক মুহূর্তের জন্য হলেও তারা ধারণা করতে পারে যে, মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে যদি খালিদ না থাকতেন, তাহলে এই ধারাবাহিক বিজয় অর্জিত হতো না। অথচ এ ধরনের ধারণা ও বিশ্বাস সঠিক ও বিশুদ্ধ ইসলামি আকিদার সম্পূর্ণ বিরোধী। স্বভাবগতভাবেই খলিফা উমর রাযি. ঈমান-সংহারক কোনো বিষয়ে সামান্য ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। আর তাই একেবারেই সরল ও সাদামাটাভাবে কোনো প্রকার সমস্যা সৃষ্টির আশঙ্কা ছাড়া তিনি খালিদকে অব্যাহতি দান করেন। খালিদের অব্যাহতির পরও অব্যাহত থাকে মুসলমানদের বিজয় ও বিজয়াভিযান। স্বয়ং খালিদ মুসলিম বাহিনীর একটি অংশের অধিনায়ক হিসেবে সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দার নেতৃত্বে আপন দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকেন। তিনি এ কারণে না কোনো নৈরাশ্যের শিকার হন, না বীরত্ব ও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। বরং পরবর্তী প্রতিটি অভিযানে তিনি যে অনুপম বীরত্ব ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন, তার বিবরণ সামনে আসছে।

টিকাঃ
৮৭. শাম অঞ্চলে বিভিন্ন নগরী জয়ের ধারাবাহিকতা নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কারও কারও মতে আজনাদাইন ও দামেশকের অভিযান ইয়ারমুক যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয়। বিপরীতে অন্য অনেক ঐতিহাসিকের মতে ইয়ারমুকের যুদ্ধ দামেশক বিজয়ের পরে সম্পন্ন হয়। এই গ্রন্থে আমরা দ্বিতীয় মতটি অগ্রগণ্য বিবেচনা অবলম্বন করেছি। মিশরীয় ঐতিহাসিক প্রফেসর আহমাদ আদিল কামাল এ বিষয়ে যথেষ্ট গবেষণার পর এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, আজনাদাইনের যুদ্ধের পর চতুর্দশ হিজরিতে দামেশক বিজিত হয়, আর ইয়ারমুকের যুদ্ধ পঞ্চদশ হিজরি সনে সংঘটিত হয়। যেহেতু খলিফা হওয়ার পর উমর রাযি.-এর প্রথম সিদ্ধান্তই ছিল খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে শাম অঞ্চলের বাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদ হতে অপসারণ, তাই অগ্রগণ্য মত এটিই যে, আজনাদাইন বিজয়ের পর দামেশক অবরোধকালেই এই সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়। দেখুন— https://bit.ly/2XHYwy5 |
৮. আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ প্রখ্যাত মিশরীয় সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও সাংবাদিক। জন্ম ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে মিশরের আসওয়ান প্রদেশে। তিনি মিশরের কায়রোর সুবিখ্যাত ভাষা গবেষণা ইনস্টিটিউট 'মুজাম্মাউল লুগালিত আরাবিয়া' (The Academy of the Arabic Language in Cairo) ও মিশরের বিধানসভা (The House of Representatives)-এর সদস্য ছিলেন। সমকালীন বিভিন্ন সাহিত্যিকদের সঙ্গে তার সাহিত্য-বিতর্ক আরবি সাহিত্যকে বহুগুণে সমৃদ্ধ করেছিল। শতাধিক গ্রন্থরচয়িতা আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মার্চ কায়রোতে ইন্তেকাল করেন।
৮৯. আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ, আবক্বারিয়্যাতু উমার, পৃষ্ঠা: ১৬৪-১৬৫।
৯০. খালিদ রাযি.-এর আরেকটি ঐতিহাসিক উক্তি হলো—ওই রাতের আমলের চেয়ে কোনো আমল আমার কাছে অধিক প্রিয় নয়, যে রাতে আমি যুদ্ধের ঢাল সংগ্রহে ব্যস্ত থাকি এবং শত্রুদের ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ পরিচালনা করি। আর সকাল পর্যন্ত আকাশ বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে আমাকে স্বাগত জানাতে থাকে।
৯১. আহমাদ বিন হাম্বল, ফাজায়িলুস সাহাবা, বর্ণনা নং ১২৭৮-১২৭৯।
*. আবুল কাসিম ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ২/১২৬।

খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর খলিফা উমর রাযি. প্রথমেই যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তা হলো—শাম অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব হতে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে অপসারণ এবং আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.-কে শামের বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক নির্ধারণ। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, এ সময় খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর নেতৃত্বে শামের মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ (আবু উবায়দা রাযি.-ও তার বাহিনী নিয়ে খালিদের অধীনে ছিলেন) দামেশক নগরী অবরোধ করে রেখেছিল। (৮৭)
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এতগুলো মহান বিজয় খালিদ বিন ওয়ালিদের হাতে অর্জিত হওয়া সত্ত্বেও কেন তাকে বরখাস্ত করা হয়?
বাস্তব কথা হলো—এ বিষয়টি নিয়ে যারাই নানারকম আলোচনা-সমালোচনা করে থাকে, তারা প্রকৃতপক্ষে বিষয়টিকে মহান সাহাবায়ে কেরামের শান ও মর্যাদা বিবেচনায় রেখে বিশ্লেষণ করে না; বরং যে বস্তুবাদী সমাজে তারা বসবাস করে, সেই বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করে থাকে।
হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদের অব্যাহতি প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে প্রফেসর আক্কাদ (৮৮) লিখেছেন,
(খলিফা উমর রাযি. কর্তৃক খালিদ রাযি.-কে অব্যাহতিদান সম্পর্কে) একদল লোকের ধারণা, এটি মূলত দুই সমকক্ষ ও সমশক্তির ব্যক্তির পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিণতি। আরেক দলের মত—তাকে বিনা কারণে বরখাস্ত করা হয়েছে। তৃতীয় একদল লোকের ধারণা, দুজনের মধ্যকার পুরোনো শত্রুতা ও সংঘাতের প্রতিক্রিয়া এটি। আর নয়তো নতুন করে এমন কোনো ত্রুটি খালিদ করেননি, যার কারণে তাকে বরখাস্ত করে মুসলিম উম্মাহকে তার শক্তি ও যুদ্ধদক্ষতা হতে বঞ্চিত করা যেতে পারে।
এ সম্পর্কে আমাদের কথা হলো, কেউ এ বিষয়ে বিরূপ ধারণা করতে চাইলে তার জন্য আশা করি এ তথ্যটিই যথেষ্ট হবে যে, খলিফা উমর রাযি. বরখাস্ত করার মতো উপযুক্ত কোনো ত্রুটি ছাড়াই খালিদকে বরখাস্ত করেছিলেন। স্বয়ং খলিফা উমর রাযি. তাকে বরখাস্ত করার পর প্রাথমিক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি শেষ হতেই সুস্পষ্টভাষায় জানিয়ে দেন যে, খালিদ আপন দায়িত্বে কোনো প্রকার অবহেলা করেননি; বরং তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। সুতরাং তার প্রতি কোনো প্রকার অপবাদ আরোপ করার বা সমালোচনা করার সুযোগ মোটেও নেই। খলিফা হজরত খালিদ রাযি.-কে খেয়ানত-অভিযোগ হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ঘোষণা করে ইসলামি রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বার্তা প্রেরণ করেন এবং সকলকে জানিয়ে দেন তিনি খালিদকে কোনো ক্রোধ-অসন্তোষ বা দায়িত্বে অবহেলার কারণে অব্যাহতিদান করেননি। বরং তাকে অব্যাহতিদানের কারণ হলো, মানুষ তার বিষয়ে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। খলিফা আরও লেখেন, আমি আশঙ্কা করেছি যে, মানুষ তার প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে এবং কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। তাই আমি চেয়েছি—সকলে মনে-প্রাণে এ কথা বিশ্বাস করুক যে, আল্লাহই সবকিছুর কর্তা। আমি চেয়েছি, মানুষ যেন ফিতনার শিকার না হয়।
শুধু তাই নয়, স্বয়ং খালিদ যখন খলিফার কাছে তাকে অব্যাহতিদানের কারণ জিজ্ঞেস করেন, তখন তিনি তাকে বলেন, 'মানুষ তোমার বিষয়ে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তাই আমি আশঙ্কা করেছি যে, তুমি মানুষের ফিতনার কারণ হয়ে যাবে।' (৮৯)
প্রফেসর আক্কাদের মন্তব্য শেষ হলো। আমাদের কথা হলো—প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি এর চেয়েও সরল ও সাদামাটা। আমরা ঘটনার প্রাথমিক অবস্থায় কোনো ধরনের 'অস্বস্তিকর পরিস্থিতি' তৈরি হওয়ার কথাও শুনিনি। খালিদের সেনাবাহিনীর কেউ বিদ্রোহ করেনি, স্বয়ং খালিদ রাযি.-ও কোনো ধরনের বিরোধিতা করেননি। কেননা, খালিদ খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত উমর রাযি.-এর প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল ছিলেন। এটি প্রথম লক্ষণীয় বিষয়।
অধিকন্তু হজরত উমর ছিলেন সমকালীন মুসলিম উম্মাহর প্রধান দায়িত্বশীল। গুনাহ নয়-এমন যেকোনো নির্দেশ প্রদানের অধিকার তার ছিল এবং তার নির্দেশ সকলে মানতে বাধ্যও ছিল। এটি দ্বিতীয় লক্ষণীয় বিষয়।
তা ছাড়া উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম কাফেলার উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হজরত খালিদ রাযি. দ্বীনের এই সুমহান অঙ্গনে কাজ করতেন পূর্ণ নিষ্ঠার সঙ্গে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। পদ ও পদমর্যাদা, নেতৃত্ব ও ক্ষমতালাভের জাগতিক চিন্তাধারা হতে 'তিনি' ও 'তারা' ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত। খালিদ রাযি.-সহ প্রত্যেক সাহাবির মনোভাব তো এই ছিল যে, আমাকে বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশে নিযুক্ত করা হোক বা পেছনের অংশে, দ্বিধাহীন চিত্তে প্রস্তুত আছি। সুতরাং আজ তাকে সেনাপতির দায়িত্ব প্রদানের পর কাল যদি তাকে সাধারণ সৈন্য গণ্য করা হয়, কী আসে যায়! প্রকৃতপক্ষে এটিই হলো ইখলাস ও নিষ্ঠা এবং জুহদ ও দুনিয়াবিরাগের নিদর্শন। এ বিষয়ে কারও সন্দেহ নেই যে, সুমহান সাহাবি খালিদ রাযি.-এর হৃদয়জগৎ এসব গুণ ও চিন্তাকেই ধারণ করত। তাই তো নিজের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কথোপকথনের একপর্যায়ে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বিষয়ের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'যে রাতে আমার কাছে কোনো প্রিয়তমা নববধূর আগমন ঘটবে, কিংবা আমাকে প্রদান করা হবে পিতৃত্বের সুসংবাদ, তা আমার কাছে ওই হিমশীতল বিপৎসংকুল রাত হতে অধিক প্রিয় নয়, যে রাতে আমি অবস্থান করি মুহাজির যোদ্ধাদের কোনো বাহিনীর সঙ্গে; প্রত্যুষে শত্রুর মোকাবিলার প্রস্তুতিতে। সুতরাং তোমরা জিহাদের সংগ্রামী জীবনকেই আঁকড়ে ধরো। (৯০)
কথিত মতবিরোধের এই বিষয়টি তাদের দৃষ্টিতে কত সাধারণ ও তুচ্ছ ছিল, তা বুঝতে আবদুল মালিক বিন উমায়র-এর সূত্রে ইমাম আহমাদ রহ.-এর নিম্নোক্ত বর্ণনাটি পাঠ করুন।
খলিফা উমর আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহকে শামের বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করলেন এবং খালিদকে অব্যাহতি দিলেন। সংবাদ পেয়ে খালিদ সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এই উম্মাহর বিশ্বস্ততম ব্যক্তিকে তোমাদের উদ্দেশে প্রেরণ করা হয়েছে। আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ কথা বলতে শুনেছি। তখন আবু উবায়দা রাযি. বললেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি-খালিদ হলো আল্লাহর একটি তরবারি এবং অতি উত্তম আত্মীয়-যুবক। (৯১)
ঐতিহাসিক ইবনে আসাকির রহ. বর্ণনা করেন-
হজরত আবু উবায়দা রাযি. আপন দায়িত্বলাভ ও খালিদ রাযি.-এর অব্যাহতি সংক্রান্ত পত্রটি হাতে পৌঁছার প্রায় বিশ দিন পর খালিদকে প্রদান করেন। খালিদ পত্র পাঠ করার পর (এত দিন দেরি করে তাকে পত্রটি দেওয়ায়) অবাক হন এবং আবু উবায়দার নিকট উপস্থিত হয়ে তাকে বলেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, আপনার কাছে আমিরুল মুমিনিনের পত্র এসেছে অথচ আপনি আমাকে অবগত করেননি! দায়িত্ব ও নেতৃত্ব আপনার হওয়া সত্ত্বেও আপনি আমার পেছনেই নামাজ আদায় করে গেছেন! উত্তরে আবু উবায়দা বলেন, আল্লাহ আপনাকেও ক্ষমা করুন। যতক্ষণ না আপনি বিষয়টি অন্যের কাছ থেকে অবহিত হয়েছেন, ততক্ষণ তো আমি আপনাকে তা জানাতেই চাইনি। আমি চাইনি বিজয়াভিযানের এই অগ্রযাত্রা সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই আপনার যুদ্ধগতি ব্যাহত হোক। আমার ইচ্ছা ছিল, আল্লাহ চাহে তো বিজয়াভিযান সমাপ্ত হলে আপনাকে বিষয়টি অবহিত করব। আর পার্থিব ক্ষমতা ও পদ, খ্যাতি ও সুখ্যাতি তো আমি চাই না, পার্থিব প্রাপ্তির আশায় কোনো আমলও করি না। এই দৃশ্যমান পৃথিবী তো শীঘ্রই ধ্বংস হয়ে যাবে। আমরা পরস্পর ভাই-ভাই, আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নে দায়িত্বশীল। ভাই পাশে থাকলে কোনো ব্যক্তি দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বরং দুজনের মধ্যে দায়িত্বশীল যিনি, তিনি জানেন যে, উভয়ের মধ্যে তিনিই হচ্ছেন ফিতনার অধিক নিকটবর্তী এবং ভুলের শিকার হওয়ার অধিক সম্ভাব্য ব্যক্তি। অবশ্য আল্লাহ যাকে ভুল হতে রক্ষা করেন, তার কথা ভিন্ন। আর এমন খুব কম ব্যক্তিই হয়ে থাকেন। (৯২)
আল্লাহু আকবার! অভিবাদন আপনায় হে খালিদ! আল্লাহু আকবার! অভিবাদন আপনায় হে আবু উবায়দা!
সমালোচনার তো প্রশ্নই আসে না, প্রকৃত পরিস্থিতি ও বাস্তবতা কারও সামনে থাকলে শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় হৃদয় সিক্ত হবে আর চক্ষু হবে অশ্রুসজল। এরাই তো উম্মাহর শ্রেষ্ঠতম পুরুষ! এরাই তো আমাদের গৌরব! আমরা তো তাদেরই উত্তরসূরি!
আজ আল্লাহর দুশমন ও ইসলামের শত্রুরা চাচ্ছে তাদের প্রতি আমাদের বিশ্বাস ও আস্থার জায়গাটি নড়বড়ে করে দিতে। আফসোস ও পরিতাপের বিষয়, ইসলামি পরিচয়ধারী কিছু লেখকও এ ক্ষেত্রে তাদের সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এসব লেখকের ইলমের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। আর তাই তাদের রচিত ইতিহাসে উম্মাহর এমন কিছু পাওয়ার নেই, যার অনুসরণ তারা করতে পারে, যা নিয়ে তারা গর্ব করতে পারে।
মোটকথা, আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি যে, হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে অব্যাহতিদানের পেছনে উমর রাযি.-কে যে বিষয়টি উদ্বুদ্ধ করেছিল তা হচ্ছে—খলিফা আশঙ্কা করছিলেন যে, ঈমানের দৃঢ়তা সত্ত্বেও উম্মাহ ফিতনার শিকার হতে পারে। এক মুহূর্তের জন্য হলেও তারা ধারণা করতে পারে যে, মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে যদি খালিদ না থাকতেন, তাহলে এই ধারাবাহিক বিজয় অর্জিত হতো না। অথচ এ ধরনের ধারণা ও বিশ্বাস সঠিক ও বিশুদ্ধ ইসলামি আকিদার সম্পূর্ণ বিরোধী। স্বভাবগতভাবেই খলিফা উমর রাযি. ঈমান-সংহারক কোনো বিষয়ে সামান্য ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিলেন না। আর তাই একেবারেই সরল ও সাদামাটাভাবে কোনো প্রকার সমস্যা সৃষ্টির আশঙ্কা ছাড়া তিনি খালিদকে অব্যাহতি দান করেন। খালিদের অব্যাহতির পরও অব্যাহত থাকে মুসলমানদের বিজয় ও বিজয়াভিযান। স্বয়ং খালিদ মুসলিম বাহিনীর একটি অংশের অধিনায়ক হিসেবে সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দার নেতৃত্বে আপন দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকেন। তিনি এ কারণে না কোনো নৈরাশ্যের শিকার হন, না বীরত্ব ও আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। বরং পরবর্তী প্রতিটি অভিযানে তিনি যে অনুপম বীরত্ব ও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন, তার বিবরণ সামনে আসছে।

টিকাঃ
৮৭. শাম অঞ্চলে বিভিন্ন নগরী জয়ের ধারাবাহিকতা নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কারও কারও মতে আজনাদাইন ও দামেশকের অভিযান ইয়ারমুক যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয়। বিপরীতে অন্য অনেক ঐতিহাসিকের মতে ইয়ারমুকের যুদ্ধ দামেশক বিজয়ের পরে সম্পন্ন হয়। এই গ্রন্থে আমরা দ্বিতীয় মতটি অগ্রগণ্য বিবেচনা অবলম্বন করেছি। মিশরীয় ঐতিহাসিক প্রফেসর আহমাদ আদিল কামাল এ বিষয়ে যথেষ্ট গবেষণার পর এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, আজনাদাইনের যুদ্ধের পর চতুর্দশ হিজরিতে দামেশক বিজিত হয়, আর ইয়ারমুকের যুদ্ধ পঞ্চদশ হিজরি সনে সংঘটিত হয়। যেহেতু খলিফা হওয়ার পর উমর রাযি.-এর প্রথম সিদ্ধান্তই ছিল খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে শাম অঞ্চলের বাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদ হতে অপসারণ, তাই অগ্রগণ্য মত এটিই যে, আজনাদাইন বিজয়ের পর দামেশক অবরোধকালেই এই সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়। দেখুন— https://bit.ly/2XHYwy5 |
৮. আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ প্রখ্যাত মিশরীয় সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও সাংবাদিক। জন্ম ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে মিশরের আসওয়ান প্রদেশে। তিনি মিশরের কায়রোর সুবিখ্যাত ভাষা গবেষণা ইনস্টিটিউট 'মুজাম্মাউল লুগালিত আরাবিয়া' (The Academy of the Arabic Language in Cairo) ও মিশরের বিধানসভা (The House of Representatives)-এর সদস্য ছিলেন। সমকালীন বিভিন্ন সাহিত্যিকদের সঙ্গে তার সাহিত্য-বিতর্ক আরবি সাহিত্যকে বহুগুণে সমৃদ্ধ করেছিল। শতাধিক গ্রন্থরচয়িতা আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ মার্চ কায়রোতে ইন্তেকাল করেন।
৮৯. আব্বাস মাহমুদ আল-আক্কাদ, আবক্বারিয়্যাতু উমার, পৃষ্ঠা: ১৬৪-১৬৫।
৯০. খালিদ রাযি.-এর আরেকটি ঐতিহাসিক উক্তি হলো—ওই রাতের আমলের চেয়ে কোনো আমল আমার কাছে অধিক প্রিয় নয়, যে রাতে আমি যুদ্ধের ঢাল সংগ্রহে ব্যস্ত থাকি এবং শত্রুদের ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ পরিচালনা করি। আর সকাল পর্যন্ত আকাশ বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে আমাকে স্বাগত জানাতে থাকে।
৯১. আহমাদ বিন হাম্বল, ফাজায়িলুস সাহাবা, বর্ণনা নং ১২৭৮-১২৭৯।
*. আবুল কাসিম ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ২/১২৬।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ফিহল (বায়সান)-এর অভিযান

📄 ফিহল (বায়সান)-এর অভিযান


দামেশক অবরোধ চলাকালেই মুসলিম বাহিনীর নতুন সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.-এর কাছে সংবাদ আসে যে, রোমানরা নতুন করে বিরাট সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়েছে এবং তারা ফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ তখন 'আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বে শামের দক্ষিণ অংশে অবস্থান করছিল। সেনাপতি আবু উবায়দা তখন দ্বিধায় পড়ে যান যে, দামেশকে অবরোধ অব্যাহত রেখে শামের কেন্দ্রস্থলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন, নাকি ফিহলে গিয়ে সংগঠিত হতে থাকা রোমান বাহিনীকে পর্যুদস্ত করবেন। তিনি বিস্তারিত পরিস্থিতি উল্লেখ করে আমিরুল মুমিনিন উমর রাযি.-এর কাছে পত্র প্রেরণ করেন। প্রত্যুত্তরে খলিফা যে পত্র প্রেরণ করেন, তার ভাষ্য নিম্নে উল্লেখ করা হলো। পত্রটি ইসলামি সাম্রাজ্য হতে বহু দূরে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর গতিবিধির প্রতি খলিফাতুল মুসলিমিনের সার্বক্ষণিক সতর্ক অনুসরণের একটি সুস্পষ্ট দলিল। খলিফা লেখেন—
প্রথমে দামেশকে অভিযান পরিচালনা করো। দামেশক হলো শামের দুর্গ ও মূল নগরী। সুতরাং দামেশক জয়ের চেষ্টা চালাও। আর ফিহলের বাহিনী যেন তোমাদের অগ্রযাত্রায় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে, তাই ফিহল অভিমুখে একটি অশ্বারোহী বাহিনী প্রেরণ করো। দামেশক বিজয়ের পূর্বেই যদি আল্লাহ তাআলা সেই অশ্বারোহী বাহিনীর হাতে ফিহলের বিজয় দান করেন, তাহলে তো আমাদের প্রত্যাশাই পূর্ণ হবে; আর ফিহল বিজয়ের পূর্বে যদি দামেশক বিজিত হয়, তাহলে দামেশকে অন্য কাউকে তোমার প্রতিনিধি নিযুক্ত করে তুমি সৈন্যদের নিয়ে ফিহল অভিমুখে যাত্রা করবে। এরপর আল্লাহ তাআলা যদি ফিহলের বিজয় দান করেন, তাহলে তুমি ও খালিদ হিমস অভিমুখে রওনা হয়ে যাবে আর জর্ডান ও ফিলিস্তিনের দায়িত্ব আমর ইবনুল আস ও শুরাহবিলকে দিয়ে যাবে।
নিঃসন্দেহে এটি এমন একটি পত্র, যা যুদ্ধক্ষেত্র সুবিশাল-সুবিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও খলিফাতুল মুসলিমিন ও তার পরামর্শ-পর্ষদের সূক্ষ্ম-সজাগ দৃষ্টিতে ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুদ্ধপরিকল্পনা প্রণয়ন ও সুগভীর পর্যবেক্ষণের সুস্পষ্ট দলিল।
খলিফার নির্দেশনা মোতাবেক মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ দামেশকে অবরোধ অব্যাহত রাখে, অপর একটি অংশ সংগঠিত হতে থাকা রোমানদের পর্যুদস্ত করার জন্য ফিহলে অভিযান পরিচালনা করে। ফিহলে সফল অভিযান শেষে তারা পুনরায় দামেশকে মূল বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়।
ফিহলের অভিযানে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-সহ মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ অনন্যসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দেয়। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর নেতৃত্বে দামেশক থেকে রওনা হওয়া দেড় হাজার সৈন্যবিশিষ্ট মুসলিম বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশ ঝড়ের বেগে দক্ষিণে অগ্রসর হয় এবং পথিমধ্যেই বিশ হাজার সৈন্যবিশিষ্ট খ্রিষ্টান বাহিনীর একটি অংশের নাগাল পেয়ে যায়। রোমান বাহিনীর এই অংশটি ছিল মূল বাহিনীর পেছনের অংশ। তারা বালাবাক্কু থেকে বায়সানে (Beit She'an) রোমান শিবিরে পৌঁছার জন্য রওনা হয়েছিল। খালিদের বাহিনী তাদেরকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করে এবং বহু সৈন্যকে হত্যা করার পাশাপাশি প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। রোমান বাহিনীর অবশিষ্ট সৈন্যরা কোনোমতে পালিয়ে তাদের শিবিরে পৌঁছায়। এরপর খালিদ তার বাহিনী নিয়ে ফিহলে আমর ইবনুল আস রাযি.-এর বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হন।
কিছুদিনের মধ্যেই আবু উবায়দা রাযি.-এর নেতৃত্বে দামেশক থেকে রওনা হওয়া অন্যান্য সৈন্যও ফিহলে পৌঁছে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়। সব মিলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় পঁচিশ হাজারে। এরপর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি. পুরো বাহিনীকে নতুন করে বিন্যস্ত করেন। (৯৩)
রোমান বাহিনী তখন বায়সানে ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত বায়সানে নৌপথে প্রতিদিন নতুন নতুন সৈন্যদল আসছিল এবং রোমান বাহিনীর আয়তন বৃদ্ধি করছিল। অবস্থাদৃষ্টে মুসলিম বাহিনী নিজেরাই অগ্রসর হয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালানোর মনস্থ করে। কিন্তু রোমানরা এ সময় কৌশল করে উভয় পক্ষের শিবিরের মাঝে অবস্থিত নদীতে বিদ্যমান বিভিন্ন বাঁধ কেটে দেয়। ফলে মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয় এবং পুরো এলাকা কাদায় ভরে যায়। এ কারণেই এ অভিযানকে ফিহলের অভিযান ও বায়সানের অভিযানের পাশাপাশি রাদগা (কাদামাটি)-এর অভিযানও বলা হয়। একপর্যায়ে রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা আশি হাজারে পৌঁছায়।
প্রথমে মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন অংশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটি আক্রমণ পরিচালনা করে এবং প্রতিটিতে বিজয় অর্জন করে। এরপর আবু উবায়দা রাযি. খালিদ বিন ওয়ালিদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন যে, এই বিশাল রোমান বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে হলে আগামীকাল প্রত্যুষেই তাদের ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ করতে হবে।
সেদিন ছিল ত্রয়োদশ হিজরি সনের ২৮ জিলকদ (৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জানুয়ারি)। প্রচণ্ড শীতের রাত। গরম আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা প্রচণ্ড শীতের মধ্যেই পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে ফজর নামাজ আদায় করে। এরপর তারা নদী পাড়ি দিয়ে রওনা হয় রোমান শিবিরের উদ্দেশে। এদিকে রোমান বাহিনীও তখন মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল—মুসলিম সৈন্যরা তখনও নিদ্রায় নিমগ্ন। হঠাৎ মুসলিম বাহিনীকে দেখে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে।
মুসলিম বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. রোমান বাহিনীর বিন্যাসের প্রতি লক্ষ করে দেখতে পান যে, প্রস্থে তাদের সারিগুলো দৃষ্টিসীমার চেয়েও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এ অবস্থায় তাদের সঙ্গে লড়াই শুরু হলে মুসলিম বাহিনী তিনদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে এবং সমূহ ক্ষতির শিকার হবে। পাশাপাশি তিনি লক্ষ করেন যে, রোমান বাহিনীর মূল অংশে অশ্বারোহী ও পদাতিক উভয় ধরনের সৈন্য থাকলেও ডান ও বামবাহুতে কেবল পদাতিক সৈন্যই আছে। খালিদ রাযি.-এর অভিজ্ঞ সামরিক দৃষ্টিতে এ বিষয়টিও ধরা পড়ে যে, রোমান বাহিনীর পেছনের দিক সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং তারা পরাজয়ের মুখোমুখি হলে প্রয়োজনে সহজেই পিছু হটতে পারবে। খালিদ রাযি. তৎক্ষণাৎ এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। পুরো মুসলিম বাহিনীকে আপন স্থানে স্থির থাকতে বলে তিনি মাত্র দেড় হাজার সৈন্য নিয়ে বিশাল রোমান বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন! সঙ্গে সঙ্গে রোমান বাহিনীও অগ্রসর হয়ে তাদেরকে সমূলে শেষ করে দিতে সচেষ্ট হয়। কিছুক্ষণ না যেতেই খালিদ তার সঙ্গীদের নিয়ে পরাজয়ের ভান করে পিছু হটেন। বিজয়ের ঘ্রাণ পেয়ে উন্মাদপ্রায় রোমান বাহিনী আগ-পিছ না ভেবে একযোগে তাদের পিছু নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। হঠাৎ করেই রোমান বাহিনী আবিষ্কার করে যে, তারা অগ্রসর হতে হতে এমন স্থানে পৌঁছে গেছে, যার পেছনে পানিতে পূর্ণ এক জলাভূমি! ফলে তারা পেছন দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পাশাপাশি স্থানটি পাশে সংকীর্ণ হওয়ায় রোমান বাহিনীর বিন্যাসও বদলে যায় এবং প্রস্থে তাদের সারিগুলো সংকীর্ণ হয়ে সামনে-পেছনে সারির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এখন উভয় বাহিনীর প্রস্থ প্রায় সমান। তাই মূল লড়াই শুরু হলে একজন মুসলিম সৈন্যকে একজন রোমান সৈন্যেরই মোকাবিলা করতে হবে।
এরপর খালিদ দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তার সঙ্গে থাকা দেড় হাজার সৈন্যকে তিনভাগে বিভক্ত করেন। তিনি নিজে গ্রহণ করেন বাম অংশের দায়িত্ব, কায়স বিন হুবায়রা রাযি.-কে প্রদান করেন ডান অংশের দায়িত্ব আর মায়সারা বিন মাসরুক রাযি.-কে প্রদান করেন মধ্য অংশের দায়িত্ব।
এরপর তিনি ও কায়স বিন হুবায়রা নিজ নিজ অংশ নিয়ে রোমান বাহিনীর পদাতিক ডানবাহু ও বামবাহুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুরু হয় প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। অশ্বারোহী মুসলিম সৈন্যগণ পদাতিক রোমান সৈন্যদের কচুকাটা করতে থাকে। অবস্থাদৃষ্টে রোমান বাহিনীর মূল অংশের অশ্বারোহী সৈন্যরা ডান ও বামবাহুর সহায়তা করতে অগ্রসর হয়। খালিদ রাযি.-ও এরই প্রতীক্ষায় ছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে বলে ওঠেন, 'আল্লাহু আকবার! আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য তাদের পদাতিক অংশকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন! দ্রুত তাদের ওপর হামলা চালাও।' খালিদের নির্দেশ পেতেই মায়সারা বিন মাসরূক রাযি. তার সৈন্যদের নিয়ে রোমান বাহিনীর মধ্য অংশের ওপর আক্রমণ চালান।
এ সবকিছু ঘটছিল আর মূল মুসলিম বাহিনী তখনও আপন স্থানে অবিচল দাঁড়িয়ে ছিল। যদিও আবু উবায়দা রাযি.-ই ছিলেন মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক; কিন্তু খালিদ রাযি.-ই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিলেন, রোমানদেরকেও নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালিত করছিলেন।
কিছুক্ষণ পর পুরো মুসলিম বাহিনী রোমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুসলিম সৈন্যদের প্রচণ্ড আক্রমণে সকল রোমান সৈন্য হয় মারা পড়ে কিংবা প্রচণ্ড আহত হয়। রাত নেমে আসতেই বেঁচে থাকা অবশিষ্ট রোমান সৈন্যরা পলায়নের পথ ধরে।
ফিহলের যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর অবিস্মরণীয় বীরত্ব প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে কোনো যুদ্ধে কোনো মুসলিম সৈন্য অনন্যসাধারণ রণকুশলতা প্রদর্শন করলে বলা হতো—সে তো বায়সান যুদ্ধের খালিদের ন্যায় যুদ্ধ করেছে। খালিদ ফিহলের যুদ্ধে একাই রোমান বাহিনীর এগারোজন সেনাপতিকে হত্যা করেন।
কায়স বিন হুবায়রা রাযি.-ও এ যুদ্ধে অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তাঁর হাতে এ যুদ্ধে তিনটি তরবারি ও এগারোটি বর্শা ভেঙে যায়।

টিকাঃ
১০. শাম অভিযানসংশ্লিষ্ট একটি পশ্চিমা স্বীকৃতি দেখুন। প্রখ্যাত ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ স্যার টমাস আরনল্ড তার The preaching of Islam : a history of the propagation of the Muslim faith গ্রন্থে লিখেছেন, মুসলিম বাহিনী যখন জর্ডান উপত্যকায় পৌঁছায় এবং আবু উবায়দা ফিহলে শিবির স্থাপন করেন, তখন সেখানকার খ্রিষ্টান অধিবাসীরা মুসলিম বাহিনীর কাছে প্রেরিত পত্রে উল্লেখ করে, হে মুসলিম সম্প্রদায়, যদিও রোমানরা আমাদের স্বধর্মীয়; কিন্তু আমাদের কাছে রোমানদের তুলনায় তোমরাই অধিক প্রিয়। তোমরাই আমাদের সঙ্গে অধিক প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী, অধিক কোমল আচরণকারী, নিপীড়ন হতে রক্ষাকারী এবং আমাদের প্রতি উত্তম দায়িত্ব পালনকারী। কিন্তু তারা জোরপূর্বক আমাদের এলাকা দখল করে রেখেছে।
অপরদিকে হিমসের অধিবাসীরা রোমান বাহিনীর সামনে নিজেদের নগরপ্রাচীরের দ্বার বন্ধ করে দেয় এবং মুসলিম বাহিনীর কাছে বার্তা পাঠায় যে, আমরা রোমানদের জুলুম ও কঠোরতার অধীনে থাকতে চাই না; বরং মুসলমানদের ন্যায়বিচারই আমাদের কাম্য। [মূল গ্রন্থের টীকা]

দামেশক অবরোধ চলাকালেই মুসলিম বাহিনীর নতুন সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.-এর কাছে সংবাদ আসে যে, রোমানরা নতুন করে বিরাট সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়েছে এবং তারা ফিলিস্তিনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ তখন 'আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বে শামের দক্ষিণ অংশে অবস্থান করছিল। সেনাপতি আবু উবায়দা তখন দ্বিধায় পড়ে যান যে, দামেশকে অবরোধ অব্যাহত রেখে শামের কেন্দ্রস্থলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন, নাকি ফিহলে গিয়ে সংগঠিত হতে থাকা রোমান বাহিনীকে পর্যুদস্ত করবেন। তিনি বিস্তারিত পরিস্থিতি উল্লেখ করে আমিরুল মুমিনিন উমর রাযি.-এর কাছে পত্র প্রেরণ করেন। প্রত্যুত্তরে খলিফা যে পত্র প্রেরণ করেন, তার ভাষ্য নিম্নে উল্লেখ করা হলো। পত্রটি ইসলামি সাম্রাজ্য হতে বহু দূরে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর গতিবিধির প্রতি খলিফাতুল মুসলিমিনের সার্বক্ষণিক সতর্ক অনুসরণের একটি সুস্পষ্ট দলিল। খলিফা লেখেন—
প্রথমে দামেশকে অভিযান পরিচালনা করো। দামেশক হলো শামের দুর্গ ও মূল নগরী। সুতরাং দামেশক জয়ের চেষ্টা চালাও। আর ফিহলের বাহিনী যেন তোমাদের অগ্রযাত্রায় কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে না পারে, তাই ফিহল অভিমুখে একটি অশ্বারোহী বাহিনী প্রেরণ করো। দামেশক বিজয়ের পূর্বেই যদি আল্লাহ তাআলা সেই অশ্বারোহী বাহিনীর হাতে ফিহলের বিজয় দান করেন, তাহলে তো আমাদের প্রত্যাশাই পূর্ণ হবে; আর ফিহল বিজয়ের পূর্বে যদি দামেশক বিজিত হয়, তাহলে দামেশকে অন্য কাউকে তোমার প্রতিনিধি নিযুক্ত করে তুমি সৈন্যদের নিয়ে ফিহল অভিমুখে যাত্রা করবে। এরপর আল্লাহ তাআলা যদি ফিহলের বিজয় দান করেন, তাহলে তুমি ও খালিদ হিমস অভিমুখে রওনা হয়ে যাবে আর জর্ডান ও ফিলিস্তিনের দায়িত্ব আমর ইবনুল আস ও শুরাহবিলকে দিয়ে যাবে।
নিঃসন্দেহে এটি এমন একটি পত্র, যা যুদ্ধক্ষেত্র সুবিশাল-সুবিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও খলিফাতুল মুসলিমিন ও তার পরামর্শ-পর্ষদের সূক্ষ্ম-সজাগ দৃষ্টিতে ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যুদ্ধপরিকল্পনা প্রণয়ন ও সুগভীর পর্যবেক্ষণের সুস্পষ্ট দলিল।
খলিফার নির্দেশনা মোতাবেক মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ দামেশকে অবরোধ অব্যাহত রাখে, অপর একটি অংশ সংগঠিত হতে থাকা রোমানদের পর্যুদস্ত করার জন্য ফিহলে অভিযান পরিচালনা করে। ফিহলে সফল অভিযান শেষে তারা পুনরায় দামেশকে মূল বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়।
ফিহলের অভিযানে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-সহ মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ অনন্যসাধারণ বীরত্বের পরিচয় দেয়। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর নেতৃত্বে দামেশক থেকে রওনা হওয়া দেড় হাজার সৈন্যবিশিষ্ট মুসলিম বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশ ঝড়ের বেগে দক্ষিণে অগ্রসর হয় এবং পথিমধ্যেই বিশ হাজার সৈন্যবিশিষ্ট খ্রিষ্টান বাহিনীর একটি অংশের নাগাল পেয়ে যায়। রোমান বাহিনীর এই অংশটি ছিল মূল বাহিনীর পেছনের অংশ। তারা বালাবাক্কু থেকে বায়সানে (Beit She'an) রোমান শিবিরে পৌঁছার জন্য রওনা হয়েছিল। খালিদের বাহিনী তাদেরকে চরমভাবে পর্যুদস্ত করে এবং বহু সৈন্যকে হত্যা করার পাশাপাশি প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। রোমান বাহিনীর অবশিষ্ট সৈন্যরা কোনোমতে পালিয়ে তাদের শিবিরে পৌঁছায়। এরপর খালিদ তার বাহিনী নিয়ে ফিহলে আমর ইবনুল আস রাযি.-এর বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হন।
কিছুদিনের মধ্যেই আবু উবায়দা রাযি.-এর নেতৃত্বে দামেশক থেকে রওনা হওয়া অন্যান্য সৈন্যও ফিহলে পৌঁছে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়। সব মিলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় পঁচিশ হাজারে। এরপর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি. পুরো বাহিনীকে নতুন করে বিন্যস্ত করেন। (৯৩)
রোমান বাহিনী তখন বায়সানে ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত বায়সানে নৌপথে প্রতিদিন নতুন নতুন সৈন্যদল আসছিল এবং রোমান বাহিনীর আয়তন বৃদ্ধি করছিল। অবস্থাদৃষ্টে মুসলিম বাহিনী নিজেরাই অগ্রসর হয়ে তাদের ওপর আক্রমণ চালানোর মনস্থ করে। কিন্তু রোমানরা এ সময় কৌশল করে উভয় পক্ষের শিবিরের মাঝে অবস্থিত নদীতে বিদ্যমান বিভিন্ন বাঁধ কেটে দেয়। ফলে মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয় এবং পুরো এলাকা কাদায় ভরে যায়। এ কারণেই এ অভিযানকে ফিহলের অভিযান ও বায়সানের অভিযানের পাশাপাশি রাদগা (কাদামাটি)-এর অভিযানও বলা হয়। একপর্যায়ে রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা আশি হাজারে পৌঁছায়।
প্রথমে মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন অংশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কয়েকটি আক্রমণ পরিচালনা করে এবং প্রতিটিতে বিজয় অর্জন করে। এরপর আবু উবায়দা রাযি. খালিদ বিন ওয়ালিদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেন যে, এই বিশাল রোমান বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে হলে আগামীকাল প্রত্যুষেই তাদের ওপর চূড়ান্ত আক্রমণ করতে হবে।
সেদিন ছিল ত্রয়োদশ হিজরি সনের ২৮ জিলকদ (৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জানুয়ারি)। প্রচণ্ড শীতের রাত। গরম আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা প্রচণ্ড শীতের মধ্যেই পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে ফজর নামাজ আদায় করে। এরপর তারা নদী পাড়ি দিয়ে রওনা হয় রোমান শিবিরের উদ্দেশে। এদিকে রোমান বাহিনীও তখন মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল—মুসলিম সৈন্যরা তখনও নিদ্রায় নিমগ্ন। হঠাৎ মুসলিম বাহিনীকে দেখে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে।
মুসলিম বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. রোমান বাহিনীর বিন্যাসের প্রতি লক্ষ করে দেখতে পান যে, প্রস্থে তাদের সারিগুলো দৃষ্টিসীমার চেয়েও বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এ অবস্থায় তাদের সঙ্গে লড়াই শুরু হলে মুসলিম বাহিনী তিনদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে এবং সমূহ ক্ষতির শিকার হবে। পাশাপাশি তিনি লক্ষ করেন যে, রোমান বাহিনীর মূল অংশে অশ্বারোহী ও পদাতিক উভয় ধরনের সৈন্য থাকলেও ডান ও বামবাহুতে কেবল পদাতিক সৈন্যই আছে। খালিদ রাযি.-এর অভিজ্ঞ সামরিক দৃষ্টিতে এ বিষয়টিও ধরা পড়ে যে, রোমান বাহিনীর পেছনের দিক সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং তারা পরাজয়ের মুখোমুখি হলে প্রয়োজনে সহজেই পিছু হটতে পারবে। খালিদ রাযি. তৎক্ষণাৎ এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। পুরো মুসলিম বাহিনীকে আপন স্থানে স্থির থাকতে বলে তিনি মাত্র দেড় হাজার সৈন্য নিয়ে বিশাল রোমান বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন! সঙ্গে সঙ্গে রোমান বাহিনীও অগ্রসর হয়ে তাদেরকে সমূলে শেষ করে দিতে সচেষ্ট হয়। কিছুক্ষণ না যেতেই খালিদ তার সঙ্গীদের নিয়ে পরাজয়ের ভান করে পিছু হটেন। বিজয়ের ঘ্রাণ পেয়ে উন্মাদপ্রায় রোমান বাহিনী আগ-পিছ না ভেবে একযোগে তাদের পিছু নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। হঠাৎ করেই রোমান বাহিনী আবিষ্কার করে যে, তারা অগ্রসর হতে হতে এমন স্থানে পৌঁছে গেছে, যার পেছনে পানিতে পূর্ণ এক জলাভূমি! ফলে তারা পেছন দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। পাশাপাশি স্থানটি পাশে সংকীর্ণ হওয়ায় রোমান বাহিনীর বিন্যাসও বদলে যায় এবং প্রস্থে তাদের সারিগুলো সংকীর্ণ হয়ে সামনে-পেছনে সারির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এখন উভয় বাহিনীর প্রস্থ প্রায় সমান। তাই মূল লড়াই শুরু হলে একজন মুসলিম সৈন্যকে একজন রোমান সৈন্যেরই মোকাবিলা করতে হবে।
এরপর খালিদ দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তার সঙ্গে থাকা দেড় হাজার সৈন্যকে তিনভাগে বিভক্ত করেন। তিনি নিজে গ্রহণ করেন বাম অংশের দায়িত্ব, কায়স বিন হুবায়রা রাযি.-কে প্রদান করেন ডান অংশের দায়িত্ব আর মায়সারা বিন মাসরুক রাযি.-কে প্রদান করেন মধ্য অংশের দায়িত্ব।
এরপর তিনি ও কায়স বিন হুবায়রা নিজ নিজ অংশ নিয়ে রোমান বাহিনীর পদাতিক ডানবাহু ও বামবাহুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুরু হয় প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। অশ্বারোহী মুসলিম সৈন্যগণ পদাতিক রোমান সৈন্যদের কচুকাটা করতে থাকে। অবস্থাদৃষ্টে রোমান বাহিনীর মূল অংশের অশ্বারোহী সৈন্যরা ডান ও বামবাহুর সহায়তা করতে অগ্রসর হয়। খালিদ রাযি.-ও এরই প্রতীক্ষায় ছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে বলে ওঠেন, 'আল্লাহু আকবার! আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য তাদের পদাতিক অংশকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন! দ্রুত তাদের ওপর হামলা চালাও।' খালিদের নির্দেশ পেতেই মায়সারা বিন মাসরূক রাযি. তার সৈন্যদের নিয়ে রোমান বাহিনীর মধ্য অংশের ওপর আক্রমণ চালান।
এ সবকিছু ঘটছিল আর মূল মুসলিম বাহিনী তখনও আপন স্থানে অবিচল দাঁড়িয়ে ছিল। যদিও আবু উবায়দা রাযি.-ই ছিলেন মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক; কিন্তু খালিদ রাযি.-ই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিলেন, রোমানদেরকেও নিজের ইচ্ছেমতো পরিচালিত করছিলেন।
কিছুক্ষণ পর পুরো মুসলিম বাহিনী রোমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুসলিম সৈন্যদের প্রচণ্ড আক্রমণে সকল রোমান সৈন্য হয় মারা পড়ে কিংবা প্রচণ্ড আহত হয়। রাত নেমে আসতেই বেঁচে থাকা অবশিষ্ট রোমান সৈন্যরা পলায়নের পথ ধরে।
ফিহলের যুদ্ধে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর অবিস্মরণীয় বীরত্ব প্রবাদবাক্যে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে কোনো যুদ্ধে কোনো মুসলিম সৈন্য অনন্যসাধারণ রণকুশলতা প্রদর্শন করলে বলা হতো—সে তো বায়সান যুদ্ধের খালিদের ন্যায় যুদ্ধ করেছে। খালিদ ফিহলের যুদ্ধে একাই রোমান বাহিনীর এগারোজন সেনাপতিকে হত্যা করেন।
কায়স বিন হুবায়রা রাযি.-ও এ যুদ্ধে অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তাঁর হাতে এ যুদ্ধে তিনটি তরবারি ও এগারোটি বর্শা ভেঙে যায়।

টিকাঃ
১০. শাম অভিযানসংশ্লিষ্ট একটি পশ্চিমা স্বীকৃতি দেখুন। প্রখ্যাত ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ স্যার টমাস আরনল্ড তার The preaching of Islam : a history of the propagation of the Muslim faith গ্রন্থে লিখেছেন, মুসলিম বাহিনী যখন জর্ডান উপত্যকায় পৌঁছায় এবং আবু উবায়দা ফিহলে শিবির স্থাপন করেন, তখন সেখানকার খ্রিষ্টান অধিবাসীরা মুসলিম বাহিনীর কাছে প্রেরিত পত্রে উল্লেখ করে, হে মুসলিম সম্প্রদায়, যদিও রোমানরা আমাদের স্বধর্মীয়; কিন্তু আমাদের কাছে রোমানদের তুলনায় তোমরাই অধিক প্রিয়। তোমরাই আমাদের সঙ্গে অধিক প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী, অধিক কোমল আচরণকারী, নিপীড়ন হতে রক্ষাকারী এবং আমাদের প্রতি উত্তম দায়িত্ব পালনকারী। কিন্তু তারা জোরপূর্বক আমাদের এলাকা দখল করে রেখেছে।
অপরদিকে হিমসের অধিবাসীরা রোমান বাহিনীর সামনে নিজেদের নগরপ্রাচীরের দ্বার বন্ধ করে দেয় এবং মুসলিম বাহিনীর কাছে বার্তা পাঠায় যে, আমরা রোমানদের জুলুম ও কঠোরতার অধীনে থাকতে চাই না; বরং মুসলমানদের ন্যায়বিচারই আমাদের কাম্য। [মূল গ্রন্থের টীকা]

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দামেশক বিজয়

📄 দামেশক বিজয়


ফিহলের অভিযান শেষে মুসলিম বাহিনীর সবকটি অংশ একত্রে দামেশক অবরোধ করে (৯৪) এবং কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে দামেশকের বিভিন্ন প্রবেশদ্বারে অবস্থান গ্রহণ করে।
দামেশক ছিল সুউচ্চ প্রাচীর-বেষ্টিত সুরক্ষিত এক নগরী। প্রাচীরগুলোর উচ্চতা ছিল প্রায় ছয় মিটার, প্রন্থ ছিল সাড়ে চার মিটার। প্রাচীরের ওপর পনেরো মিটার দূরত্ব পরপর ছিল পর্যবেক্ষণ-চৌকি। প্রাচীরের গায়ে বিভিন্ন স্থানে ছিল বিশালাকার সাতটি ফটক। এসব ফটক ব্যতীত অন্য কোনো স্থান দিয়ে নগরীতে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। নগরীর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে নগরপ্রাচীরের চারপাশ ঘিরে খনন করা হয়েছিল পানিতে পরিপূর্ণ তিন মিটার প্রন্থের গভীর পরিখা। এর ফলে দামেশক নগরী দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত হয়েছিল। এ কারণে অবরোধ দীর্ঘ কয়েক মাস স্থায়ী হওয়ার পরও দামেশকবাসীর মাঝে নতি স্বীকারের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল না।
দামেশক অবরোধ করার সময় মুসলিম বাহিনী কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে নগরীর সাতটি প্রবেশদ্বারে অবস্থান গ্রহণ করে। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. অবস্থান গ্রহণ করেন আশ-শারকি প্রবেশদ্বারে (The Eastern Gate)। আবু উবায়দা রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ অবস্থান গ্রহণ করে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে দামেশকের পশ্চিম প্রান্তে আল-জাবিয়া প্রবেশদ্বারে (Bab al-Jabiya)। ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান নেয় দক্ষিণ প্রান্তের আস-সাগির দ্বার (Bab al-Saghir) ও কীসান দ্বারে (Bab Kisan)। শুরাহবিল বিন হাসানা রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান গ্রহণ করে উত্তর পাশে আল-ফারাদিস প্রবেশদ্বারে (Bab al-Faradis)। আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান নেয় টুমা প্রবেশদ্বারে (Bab Tuma)। শুধু আস-সালাম প্রবেশদ্বারের অবস্থান দুর্গম অঞ্চলে হওয়ায় সেখানে কোনো বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করেনি।
একপর্যায়ে প্রচণ্ড শীতের মৌসুম শুরু হয়। ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে দামেশকবাসীর মজুত খাদ্যসরবরাহ। মুসলিম বাহিনীর সদস্যদের চোখে কিন্তু নিদ্রা নেই। বিশেষত একটি ইউনিটের অধিনায়ক হিসেবে খালিদ রাযি.-এর ছিল বিশেষ সতর্ক-দৃষ্টি ও শক্তিশালী গোয়েন্দা-তৎপরতা। এক রাতে তিনি সংবাদ পান—জনৈক রোমান সেনাপতির সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া উপলক্ষ্যে নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে ভোজসভা ও পানসভার আয়োজন করা হয়েছে এবং মদের নেশায় মাতাল রোমানরা অসতর্ক ও অরক্ষিত অবস্থায় আছে। খালিদ তো এ ধরনের সুবর্ণ সুযোগ হেলায় নষ্ট করার লোক নন! তিনি তৎক্ষণাৎ মুসলিম বাহিনীর অশ্বারোহী রেজিমেন্টের সাহসী সৈনিকদের তলব করেন। সকলে সঙ্গে নেন কিছু রশি ও মই; যা এ ধরনের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল।
খালিদ ও তার সঙ্গীগণ মই সঙ্গে নিয়ে সাঁতরে পরিখা পার হন। তারা প্রাচীরের মাথায় মই আটকাতে সক্ষম হন এবং শত্রুপক্ষের প্রহরীদের অপ্রস্তুত রেখেই প্রাচীরে চড়েন। এরপর তারা দ্রুত দ্বার-প্রহরীদের হত্যা করে আশ-শারকি ফটক উন্মুক্ত করে দেন। তাদের তাকবির-ধ্বনিতে দামেশকের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
খালিদ তার সঙ্গীদের নিয়ে নগরীতে প্রবেশ করেন। পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, খালিদ তাদের দফারফা করেন।
খালিদ রাযি. দামেশকের পূর্ব দিক থেকে প্রবেশ করে ঝড়ের গতিতে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু অন্যান্য প্রবেশদ্বারে অবস্থানরত সেনাপতিগণ এ বিষয়ে কিছু জানতেন না। দামেশকের রোমান সেনাপতি যখন উপলব্ধি করে যে, খালিদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী দামেশকে প্রবেশ করে অনেকটা পথ অতিক্রম করে ফেলেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দামেশক জয় করতে যাচ্ছে, তখন সে এক বিস্ময়কর কৌশল গ্রহণ করে। সে নগরীর অন্যান্য দ্বারে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর সেনাপতিদের কাছে সংবাদ পাঠায় যে, আপনারা ইতিপূর্বে আমাদেরকে আত্মসমর্পণের যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আমরা সবদিক বিবেচনা করে তা গ্রহণ করে নিয়েছি এবং আপনাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয়েছি। সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা তখন রোমানদের প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং তাদের সঙ্গে নিরাপত্তাদানের চুক্তি করেন। এরপর মুসলিম বাহিনীর অন্যান্য অংশ পশ্চিম, দক্ষিণ ও উত্তর দিক থেকে বিজয়ী হিসেবে দামেশকে প্রবেশ করে। সকলে যখন নগরীর মধ্যপ্রান্তে সমবেত হয়, তখন অবাক বিস্ময়ে জানতে পারে যে, খালিদ রাযি. যুদ্ধের মাধ্যমে দামেশকে প্রবেশ করেছেন। খালিদ রাযি.-ও জানতে পারেন যে, আবু উবায়দা রাযি. দামেশকবাসীকে নিরাপত্তা প্রদান করেছেন।
অবশেষে সকলের পরামর্শে সিদ্ধান্ত হয় যে, দামেশককে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত নগরী হিসেবেই বিবেচনা করা হবে এবং দামেশকবাসীর সঙ্গে যুদ্ধে বিজিত জাতির পরিবর্তে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত জাতির নীতি কার্যকর হবে। নিঃসন্দেহে এটি ইসলাম ও মুসলমানদের ন্যায় ও উদারতার এক অনন্যসাধারণ বহিঃপ্রকাশ।
দামেশকের মধ্যভাগে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ গির্জা ছিল 'ইউহান্না গির্জা'। গির্জার অর্ধেক যুদ্ধের মাধ্যমে এবং অর্ধেক সন্ধির মাধ্যমে বিজিত হয়েছিল। যে অংশ যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত হয়েছিল, সেখানে মুসলমানরা শরিয়তপ্রদত্ত অধিকারের ভিত্তিতে একটি মসজিদ নির্মাণ করে। সন্ধির মাধ্যমে বিজিত অপর অংশ গির্জা হিসেবেই রেখে দেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে উমাইয়া আমলে মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদের পরিসর বৃদ্ধির প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক গির্জার দায়িত্বশীলদেরকে ডেকে তাদেরকে গির্জার বাকি অর্ধেক ভূমি মুসলমানদের দিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন এবং বিনিময়ে দামেশক ও আশেপাশের যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত অঞ্চলের চারটি গির্জা না ভেঙে তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। খ্রিষ্টান নেতৃবৃন্দ স্বেচ্ছায় রাজি হলে খলিফা ওয়ালিদ উভয় অংশকে একত্র করে জামে উমাবি নির্মাণ করেন।

টিকাঃ
১৪. ইবনে কাছির রহ. বলেন, ‘অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে ফিহলের যুদ্ধ দামেশক বিজয়ের পূর্বে সংঘটিত হয়। তবে ইমাম আবু জাফর ইবনে জারির বলেন, তা দামেশক বিজয়ের পর সংঘটিত হয়।’ (ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/২৫)। আমরা এখানে প্রথম মতটি গ্রহণ করেছি। ড. রাগিব সারজানি লিখেছেন, শামের মুসলিম বাহিনী মোট চারবার দামেশক অবরোধ করে। প্রথম তিনবারের প্রত্যেকবারই দক্ষিণে রোমান সম্রাট কর্তৃক বিশাল সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনী দামেশকের চিন্তা বাদ দিয়ে সেদিকে অগ্রসর হতে বাধ্য হয়। প্রথমবার খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. শামে আগমনের পর বুছরা বিজয়ের পূর্বে দামেশক অবরোধ করেন। এরপর তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করে বুছরায় অভিযান পরিচালনা করেন। বুছরা বিজয়ের পর দ্বিতীয়বার দামেশক অবরোধ করা হয়। এবারও অবরোধ প্রত্যাহার করা হয় এবং আজনাদাইনে অভিযান পরিচালনা করা হয়। আজনাদাইন বিজয়ের পর তৃতীয়বার অবরোধ করা হয়। এ সময় ত্রয়োদশ হিজরি সনের জিলকদ মাসে ফিহলে রোমান সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি. ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান রাযি.-কে দামেশকে রেখে বাকিদেরকে নিয়ে ফিহলে অভিযান পরিচালনা করেন। ফিহলের সফল অভিযান শেষে ফিরে এসে চতুর্দশ হিজরি সনে মুসলিম বাহিনী চতুর্থবার দামেশক অবরোধ করে এবং দামেশক জয় করে। দেখুন-https://bit.ly/345dgJu |

ফিহলের অভিযান শেষে মুসলিম বাহিনীর সবকটি অংশ একত্রে দামেশক অবরোধ করে (৯৪) এবং কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে দামেশকের বিভিন্ন প্রবেশদ্বারে অবস্থান গ্রহণ করে।
দামেশক ছিল সুউচ্চ প্রাচীর-বেষ্টিত সুরক্ষিত এক নগরী। প্রাচীরগুলোর উচ্চতা ছিল প্রায় ছয় মিটার, প্রন্থ ছিল সাড়ে চার মিটার। প্রাচীরের ওপর পনেরো মিটার দূরত্ব পরপর ছিল পর্যবেক্ষণ-চৌকি। প্রাচীরের গায়ে বিভিন্ন স্থানে ছিল বিশালাকার সাতটি ফটক। এসব ফটক ব্যতীত অন্য কোনো স্থান দিয়ে নগরীতে প্রবেশ করা সম্ভব ছিল না। নগরীর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে নগরপ্রাচীরের চারপাশ ঘিরে খনন করা হয়েছিল পানিতে পরিপূর্ণ তিন মিটার প্রন্থের গভীর পরিখা। এর ফলে দামেশক নগরী দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত হয়েছিল। এ কারণে অবরোধ দীর্ঘ কয়েক মাস স্থায়ী হওয়ার পরও দামেশকবাসীর মাঝে নতি স্বীকারের কোনো লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছিল না।
দামেশক অবরোধ করার সময় মুসলিম বাহিনী কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে নগরীর সাতটি প্রবেশদ্বারে অবস্থান গ্রহণ করে। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. অবস্থান গ্রহণ করেন আশ-শারকি প্রবেশদ্বারে (The Eastern Gate)। আবু উবায়দা রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ অবস্থান গ্রহণ করে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে দামেশকের পশ্চিম প্রান্তে আল-জাবিয়া প্রবেশদ্বারে (Bab al-Jabiya)। ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান নেয় দক্ষিণ প্রান্তের আস-সাগির দ্বার (Bab al-Saghir) ও কীসান দ্বারে (Bab Kisan)। শুরাহবিল বিন হাসানা রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান গ্রহণ করে উত্তর পাশে আল-ফারাদিস প্রবেশদ্বারে (Bab al-Faradis)। আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ অবস্থান নেয় টুমা প্রবেশদ্বারে (Bab Tuma)। শুধু আস-সালাম প্রবেশদ্বারের অবস্থান দুর্গম অঞ্চলে হওয়ায় সেখানে কোনো বাহিনী অবস্থান গ্রহণ করেনি।
একপর্যায়ে প্রচণ্ড শীতের মৌসুম শুরু হয়। ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে দামেশকবাসীর মজুত খাদ্যসরবরাহ। মুসলিম বাহিনীর সদস্যদের চোখে কিন্তু নিদ্রা নেই। বিশেষত একটি ইউনিটের অধিনায়ক হিসেবে খালিদ রাযি.-এর ছিল বিশেষ সতর্ক-দৃষ্টি ও শক্তিশালী গোয়েন্দা-তৎপরতা। এক রাতে তিনি সংবাদ পান—জনৈক রোমান সেনাপতির সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া উপলক্ষ্যে নগরপ্রাচীরের অভ্যন্তরে ভোজসভা ও পানসভার আয়োজন করা হয়েছে এবং মদের নেশায় মাতাল রোমানরা অসতর্ক ও অরক্ষিত অবস্থায় আছে। খালিদ তো এ ধরনের সুবর্ণ সুযোগ হেলায় নষ্ট করার লোক নন! তিনি তৎক্ষণাৎ মুসলিম বাহিনীর অশ্বারোহী রেজিমেন্টের সাহসী সৈনিকদের তলব করেন। সকলে সঙ্গে নেন কিছু রশি ও মই; যা এ ধরনের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল।
খালিদ ও তার সঙ্গীগণ মই সঙ্গে নিয়ে সাঁতরে পরিখা পার হন। তারা প্রাচীরের মাথায় মই আটকাতে সক্ষম হন এবং শত্রুপক্ষের প্রহরীদের অপ্রস্তুত রেখেই প্রাচীরে চড়েন। এরপর তারা দ্রুত দ্বার-প্রহরীদের হত্যা করে আশ-শারকি ফটক উন্মুক্ত করে দেন। তাদের তাকবির-ধ্বনিতে দামেশকের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে।
খালিদ তার সঙ্গীদের নিয়ে নগরীতে প্রবেশ করেন। পথে যারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, খালিদ তাদের দফারফা করেন।
খালিদ রাযি. দামেশকের পূর্ব দিক থেকে প্রবেশ করে ঝড়ের গতিতে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু অন্যান্য প্রবেশদ্বারে অবস্থানরত সেনাপতিগণ এ বিষয়ে কিছু জানতেন না। দামেশকের রোমান সেনাপতি যখন উপলব্ধি করে যে, খালিদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী দামেশকে প্রবেশ করে অনেকটা পথ অতিক্রম করে ফেলেছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দামেশক জয় করতে যাচ্ছে, তখন সে এক বিস্ময়কর কৌশল গ্রহণ করে। সে নগরীর অন্যান্য দ্বারে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর সেনাপতিদের কাছে সংবাদ পাঠায় যে, আপনারা ইতিপূর্বে আমাদেরকে আত্মসমর্পণের যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, আমরা সবদিক বিবেচনা করে তা গ্রহণ করে নিয়েছি এবং আপনাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয়েছি। সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা তখন রোমানদের প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং তাদের সঙ্গে নিরাপত্তাদানের চুক্তি করেন। এরপর মুসলিম বাহিনীর অন্যান্য অংশ পশ্চিম, দক্ষিণ ও উত্তর দিক থেকে বিজয়ী হিসেবে দামেশকে প্রবেশ করে। সকলে যখন নগরীর মধ্যপ্রান্তে সমবেত হয়, তখন অবাক বিস্ময়ে জানতে পারে যে, খালিদ রাযি. যুদ্ধের মাধ্যমে দামেশকে প্রবেশ করেছেন। খালিদ রাযি.-ও জানতে পারেন যে, আবু উবায়দা রাযি. দামেশকবাসীকে নিরাপত্তা প্রদান করেছেন।
অবশেষে সকলের পরামর্শে সিদ্ধান্ত হয় যে, দামেশককে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত নগরী হিসেবেই বিবেচনা করা হবে এবং দামেশকবাসীর সঙ্গে যুদ্ধে বিজিত জাতির পরিবর্তে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত জাতির নীতি কার্যকর হবে। নিঃসন্দেহে এটি ইসলাম ও মুসলমানদের ন্যায় ও উদারতার এক অনন্যসাধারণ বহিঃপ্রকাশ।
দামেশকের মধ্যভাগে অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ গির্জা ছিল 'ইউহান্না গির্জা'। গির্জার অর্ধেক যুদ্ধের মাধ্যমে এবং অর্ধেক সন্ধির মাধ্যমে বিজিত হয়েছিল। যে অংশ যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত হয়েছিল, সেখানে মুসলমানরা শরিয়তপ্রদত্ত অধিকারের ভিত্তিতে একটি মসজিদ নির্মাণ করে। সন্ধির মাধ্যমে বিজিত অপর অংশ গির্জা হিসেবেই রেখে দেওয়া হয়।
পরবর্তীকালে উমাইয়া আমলে মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদের পরিসর বৃদ্ধির প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক গির্জার দায়িত্বশীলদেরকে ডেকে তাদেরকে গির্জার বাকি অর্ধেক ভূমি মুসলমানদের দিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন এবং বিনিময়ে দামেশক ও আশেপাশের যুদ্ধের মাধ্যমে বিজিত অঞ্চলের চারটি গির্জা না ভেঙে তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। খ্রিষ্টান নেতৃবৃন্দ স্বেচ্ছায় রাজি হলে খলিফা ওয়ালিদ উভয় অংশকে একত্র করে জামে উমাবি নির্মাণ করেন।

টিকাঃ
১৪. ইবনে কাছির রহ. বলেন, ‘অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে ফিহলের যুদ্ধ দামেশক বিজয়ের পূর্বে সংঘটিত হয়। তবে ইমাম আবু জাফর ইবনে জারির বলেন, তা দামেশক বিজয়ের পর সংঘটিত হয়।’ (ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/২৫)। আমরা এখানে প্রথম মতটি গ্রহণ করেছি। ড. রাগিব সারজানি লিখেছেন, শামের মুসলিম বাহিনী মোট চারবার দামেশক অবরোধ করে। প্রথম তিনবারের প্রত্যেকবারই দক্ষিণে রোমান সম্রাট কর্তৃক বিশাল সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনী দামেশকের চিন্তা বাদ দিয়ে সেদিকে অগ্রসর হতে বাধ্য হয়। প্রথমবার খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. শামে আগমনের পর বুছরা বিজয়ের পূর্বে দামেশক অবরোধ করেন। এরপর তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করে বুছরায় অভিযান পরিচালনা করেন। বুছরা বিজয়ের পর দ্বিতীয়বার দামেশক অবরোধ করা হয়। এবারও অবরোধ প্রত্যাহার করা হয় এবং আজনাদাইনে অভিযান পরিচালনা করা হয়। আজনাদাইন বিজয়ের পর তৃতীয়বার অবরোধ করা হয়। এ সময় ত্রয়োদশ হিজরি সনের জিলকদ মাসে ফিহলে রোমান সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি. ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান রাযি.-কে দামেশকে রেখে বাকিদেরকে নিয়ে ফিহলে অভিযান পরিচালনা করেন। ফিহলের সফল অভিযান শেষে ফিরে এসে চতুর্দশ হিজরি সনে মুসলিম বাহিনী চতুর্থবার দামেশক অবরোধ করে এবং দামেশক জয় করে। দেখুন-https://bit.ly/345dgJu |

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ইয়ারমুকের যুদ্ধ

📄 ইয়ারমুকের যুদ্ধ


দামেশক বিজয়ের পর আবু উবায়দা রাযি. মুসলিম বাহিনীর কয়েকজন সেনাপতিকে দামেশক, ফিলিস্তিন ও জর্ডানের প্রশাসক নিযুক্ত করেন এবং নিজে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে সঙ্গে নিয়ে হিমস অভিমুখে রওনা হন। পথিমধ্যে খালিদ বিন ওয়ালিদ সন্ধির মাধ্যমে বালাবাক্কু নগরী জয় করেন। মুসলিম বাহিনী হিমসে পৌঁছে নগরীটি অবরোধ করলে মাত্র আঠারো দিন পরই হিমসবাসী নতি স্বীকার করে এবং মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয়। এভাবে পঞ্চদশ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে হিমস বিজিত হয়।
এদিকে প্রথমে দামেশক, তারপর হিমসের পতনে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস চূড়ান্ত পর্যায়ের উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এ সময় ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস ও কায়সারিয়া অঞ্চলের অধিবাসীরাও হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার আবেদন জানায়। অবশেষে হিরাক্লিয়াস শাম অঞ্চলে চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনার জন্য ব্যাপক সৈন্যসমাবেশ ঘটান। তিনি রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্যের আশ্রিত প্রত্যেক অঞ্চলের প্রশাসকদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে সকল যুদ্ধসক্ষম পুরুষকে বাহিনীতে যোগ দিতে নির্দেশ দেন। ফলে রুশ, স্লাভ, ইংরেজ, রোমান, গ্রিক, জর্জিয়ান, আর্মেনিয়ান ও আরব খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার সৈন্যের বিরাট এক বাহিনী (৯৫) প্রস্তুত হয়ে যায়। পুরো বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করা হয় আর্মেনিয়ান শাসক বাহানকে। হিরাক্লিয়াসের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার— বিজয়ী হলে শাম অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার ও সুদৃঢ় হবে আর পরাজিত হলে চিরতরে শামের মায়া ত্যাগ করতে হবে। খ্রিষ্টান ধর্মযাজকরাও বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় এবং যোদ্ধাদেরকে ধর্মীয় বাণী শুনিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে।
শাম অঞ্চলে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি. যথাসময়ে গোয়েন্দা মারফত রোমানদের এই বিশাল সৈন্যসমাবেশ সম্পর্কে সংবাদ পেয়ে যান। তৎক্ষণাৎ তিনি তার সঙ্গে অবস্থানরত অন্যান্য মুসলিম সেনাপতি ও নেতৃস্থানীয় সাহাবিদের সঙ্গে করণীয় নির্ধারণে পরামর্শ করেন। পরামর্শে সিদ্ধান্ত হয় যে, মুসলমানরা আপাতত হিমসের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য ফ্রন্টে অবস্থানরত মুসলিম সেনাপতিদের সঙ্গে মিলিত হবে এবং সকলে মিলে রোমান বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য উপযুক্ত কোনো স্থান নির্বাচন করবে।
হিমস ত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা খলিফা উমর রাযি.-কে জানানো হলে তিনি প্রথমে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অবশ্য যখন তাকে জানানো হয় যে, এটি সকলের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, তখন তিনি তাদের সফলতা কামনা করেন।
বার্তাবাহক খলিফার কাছে মদিনা থেকে অতিরিক্ত সামরিক সাহায্য প্রেরণের অনুরোধ করলে তিনি সাইদ বিন আমির বিন হিযয়াম রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণের প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তী সময়ে সাইদ বিন আমির রাযি.-এর নেতৃত্বে এক হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী শামে মূল বাহিনীর সঙ্গে যোগদান করে। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় ছত্রিশ হাজার। মুসলিম বাহিনীতে প্রায় এক হাজার সাহাবি ছিলেন, যাদের মাঝে মহান বদরি কাফেলার একশ সদস্যও ছিলেন।
খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর পরামর্শে সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী জাবিয়া হতে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কয়েক মাইল অগ্রসর হয়ে ইয়ারমুক নদীর তীরে অবস্থিত (বর্তমান গোলান মালভূমির অন্তর্গত) ইয়ারমুক প্রান্তরের পূর্বপাশে শিবির স্থাপন করে। অপরদিকে হিরাক্লিয়াসের নির্দেশে রোমান বাহিনী শিবির স্থাপন করে ইয়ারমুকের সমতল ভূমির পশ্চিম প্রান্তে ওয়াদিউর রাক্কাদে। যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকার জন্য রোমান বাহিনীর ডানবাহুর ত্রিশ হাজার সৈন্য প্রতি দশজন পায়ে শিকল বেঁধে ময়দানে উপস্থিত হয়েছিল।
যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বেই সৈন্যসংখ্যা ও যুদ্ধসরঞ্জাম উভয় দিক থেকে রোমান বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিভাত হচ্ছিল। প্রায় আঠারো মাইল বিস্তৃত রোমানদের শিবির দেখে বিহ্বল জনৈক মুসলিম সৈনিক মন্তব্য করে, 'রোমান বাহিনী কত বিশাল! আর মুসলিম বাহিনী কত ক্ষুদ্র!' তার মন্তব্য শুনে হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন এবং চিৎকার করে বলেন, 'বরং রোমান বাহিনী কত ক্ষুদ্র! আর মুসলিম বাহিনী কত বিশাল! আরে! আল্লাহর সাহায্য সঙ্গে থাকলে কম সংখ্যক সৈন্যও বেশি সংখ্যক সৈন্যে পরিণত হয় আর লাঞ্ছনা ও অবমাননা এসে গেলে বেশি সংখ্যক সৈন্যও কম সংখ্যায় পরিণত হয়। আল্লাহর শপথ! আমি তো বরং এই কামনা করি যে, আমার 'আশকার' ঘোড়াটি পায়ের ব্যথা-মুক্ত হতো আর বিপরীতে রোমান সৈন্য যা আছে, তার দ্বিগুণ হতো!' উল্লেখ্য, শামের বিস্তীর্ণ এলাকায় পথ চলে খালিদের ঘোড়ার খুর ছিলে গিয়েছিল।
আল্লাহু আকবার! এমনই ছিল সাহাবায়ে কেরামের চিন্তা ও চেতনা! এমনই ছিল মুসলিম সেনাপতিদের ভাব ও ভাবনা! খালিদ রাযি. জানতেন ও বিশ্বাস করতেন যে, সংখ্যাধিক্যে কিছু আসে-যায় না; একটি সৈন্যদলের বিজয় ও সফলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য লাভ করা; হোক তারা সংখ্যায় অতি অল্প। বরং তিনি তো বলছেন যে, এই যুদ্ধে যদি শত্রুপক্ষের সৈন্যসংখ্যা বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণও হয়, সমস্যা নেই; প্রিয় অশ্ব 'আশকার' তার সঙ্গে থাকলেই হলো!
খালিদ রাযি. যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে সকলকে সুরা আনফাল তিলাওয়াতের নির্দেশ দেন। আবু হুরায়রা রাযি., আবু সুফিয়ান রাযি. প্রমুখ সাহাবিগণ নসিহতের মাধ্যমে সকলের মনোবল সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট হন।
এরই মধ্যে মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি.-এর কাছে খলিফা উমর রাযি.-এর প্রেরিত বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় খলিফা সকলকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন—
উমর আপনাদেরকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন, হে মুসলমানগণ! আপনারা নিষ্ঠার সঙ্গে লড়াই করুন, সিংহের ন্যায় তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন এবং তরবারি দ্বারা শত্রুপক্ষের মাথায় আঘাত করুন। তারা যেন আপনাদের কাছে ধূলিকণার চেয়েও তুচ্ছ বিবেচিত হয়। আমি নিশ্চিত করেই জানি যে, তাদের মোকাবিলায় আপনারা নুসরত ও সাহায্য লাভ করবেন। সুতরাং তাদের সংখ্যাধিক্য যেন আপনাদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে না পারে।
আবু উবায়দা রাযি. সকলকে খলিফার পত্র পাঠ করে শোনালে মুসলিম বাহিনীর মনোবল আরও বৃদ্ধি পায়।
যদিও আবু উবায়দা রাযি. ছিলেন মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক; কিন্তু তার অনুমতিতে মহাবীর খালিদ রাযি.-ই মুসলিম বাহিনীর বিন্যাস-সহ সবকিছু পরিচালনা করছিলেন আর আবু উবায়দা রাযি. মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন অংশে গিয়ে সকলকে উদ্বুদ্ধ করছিলেন।
খালিদ রাযি. মুসলিম বাহিনীর পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্যদের ছত্রিশটি পদাতিক ও তিনটি অশ্বারোহী দলে বিভক্ত করেন আর চার হাজার বিশেষ অশ্বারোহী যোদ্ধার একটি বাহিনীকে দুই ভাগে বিভক্ত করে একভাগের নেতৃত্ব নিজের কাছে রাখেন; অপরভাগের নেতৃত্ব কায়স বিন হুবায়রা রাযি.-কে প্রদান করেন। বীরত্ব ও রণকুশলতায় কায়স রাযি. ছিলেন খালিদ রাযি.-এর পর মুসলিম বাহিনীর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। খালিদ রাযি. এই দুই অংশের একটিকে মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর পেছনে এবং অপরটিকে বামবাহুর পেছনে মোতায়েন করেন। সিদ্ধান্ত হয় রোমান বাহিনীর প্রাথমিক হামলার তীব্রতা শেষ হওয়ার পর যখন তারা মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে মিশে যাবে, তখন খালিদ ও কায়স অশ্বারোহী যোদ্ধাদের নিয়ে ডান দিক ও বাম দিক থেকে এগিয়ে এসে রোমানদের কচুকাটা করবেন।
শুরুতে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং যুদ্ধ নিশ্চিত হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর ইয়ারমুকের প্রান্তরে উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হয়। প্রথমে উভয় বাহিনীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের মধ্যে সম্মুখ লড়াই সংঘটিত হয় এবং প্রতিটি লড়াইয়ে মুসলিম বীর যোদ্ধাগণ প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। এরপর শুরু হয় প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এক লড়াই; ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ.-এর ভাষায়-
যেন বিশাল অগ্নিকুণ্ড দাউ দাউ করে জ্বলছে, আগুনের তেজ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, তরবারিগুলো প্রাণ কেড়ে নেওয়ার এক অনিঃশেষ খেলায় মেতে উঠেছে। তরবারির আঘাতে ঝরে পড়ছে খণ্ডিত মস্তক, খণ্ডবিখণ্ড মানবদেহ।
জুরজা ইয়ারমুকের যুদ্ধেই শহিদ হন। তিনি এমন এক সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর ওয়াস্তে জীবনে মাত্র দু-রাকাত নামাজ আদায় করার পরই শহিদি মৃত্যুর দেখা পেয়েছেন। (৯৬)
একটানা কয়েক দিন প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী লড়াই চলার পর ষষ্ঠ দিন রোমান বাহিনীর সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং তারা পলায়নের পথ ধরে। খালিদ রাযি. পূর্বেই গোপনে রোমান বাহিনীর পেছনের সংকীর্ণ গিরিপথে পাঁচশ অশ্বারোহী সৈন্যের একটি বাহিনীকে মোতায়েন করে রেখেছিলেন। ফলে পলাতক রোমান সৈন্যরা দু-দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং মুসলিম সৈন্যদের আঘাতের পাশাপাশি গিরিখাত থেকে নিচে পড়ে গিয়ে মারা যেতে থাকে। ষষ্ঠ দিনের সূর্যাস্তের পূর্বেই বিজয় মুসলিম বাহিনীর পদচুম্বন করে।
পরদিন সকালে খালিদ রাযি. একদল অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে দামেশকের পথ ধরে পলায়নরত রোমান সেনাপতি বাহানের খোঁজে অগ্রসর হন এবং তার নাগাল পেয়ে তাকে হত্যা করেন।
ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিন হাজার মুসলিম যোদ্ধা শহিদ হয়। অপরদিকে রোমান বাহিনীর সত্তর হাজার মতান্তরে এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য নিহত হয়। ইয়ারমুকে পরাজয়ের ফলে শামে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং সম্রাট হiraক্লিয়াস ভগ্ন হৃদয়ে এন্টিয়ক (৯৭) ত্যাগ করে কনস্টান্টিনোপলে চলে যান। শাম ত্যাগ করার সময় তিনি বলছিলেন, 'বিদায়, হে শাম! বিদায় চিরকালের জন্য! আর কখনো ফিরে আসব না তোমার বুকে। হায়! সবুজ-শ্যামল, উর্বর ও কল্যাণে ভরপুর এক ভূখণ্ড শত্রুর হাতে ছেড়ে যাচ্ছি!'

টিকাঃ
৯৫. ইয়ারমুকের যুদ্ধে রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। আবু উবায়দা রাযি. কর্তৃক খলিফা উমর রাযি.-এর কাছে প্রেরিত একটি পত্রের বিবরণ দ্বারা অনুমিত হয় যে, রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় চার লক্ষ। ঐতিহাসিক আযদি-ও বিভিন্ন সূত্রের বরাতে চার লক্ষের কথা উল্লেখ করেছেন।
৯৬. জুরজার ইসলামগ্রহণের ঘটনা বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থে ভিন্নভাবেও বর্ণিত আছে। কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় এখানে তা উল্লেখ করা হলো না।
৯৭. এন্টিয়ক: ভূমধ্যসাগরের উপকূল হতে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পূর্বে আছি নদী (Orontes river)-এর তীরে অবস্থিত অতি প্রাচীন একটি নগরী এন্টিয়ক (Antioch)। আধুনিক তুরস্কের হাতায় প্রদেশ (Hatay Province)-এর অন্তর্গত নগরীটির বর্তমান নাম এন্টাকিয়া (Antakya)। আরবিতে নগরীটির নাম أُنْطَاكِيَة (আনতাকিয়া)।

দামেশক বিজয়ের পর আবু উবায়দা রাযি. মুসলিম বাহিনীর কয়েকজন সেনাপতিকে দামেশক, ফিলিস্তিন ও জর্ডানের প্রশাসক নিযুক্ত করেন এবং নিজে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে সঙ্গে নিয়ে হিমস অভিমুখে রওনা হন। পথিমধ্যে খালিদ বিন ওয়ালিদ সন্ধির মাধ্যমে বালাবাক্কু নগরী জয় করেন। মুসলিম বাহিনী হিমসে পৌঁছে নগরীটি অবরোধ করলে মাত্র আঠারো দিন পরই হিমসবাসী নতি স্বীকার করে এবং মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে সম্মত হয়। এভাবে পঞ্চদশ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে হিমস বিজিত হয়।
এদিকে প্রথমে দামেশক, তারপর হিমসের পতনে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস চূড়ান্ত পর্যায়ের উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এ সময় ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাস ও কায়সারিয়া অঞ্চলের অধিবাসীরাও হিরাক্লিয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার আবেদন জানায়। অবশেষে হিরাক্লিয়াস শাম অঞ্চলে চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনার জন্য ব্যাপক সৈন্যসমাবেশ ঘটান। তিনি রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্যের আশ্রিত প্রত্যেক অঞ্চলের প্রশাসকদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে সকল যুদ্ধসক্ষম পুরুষকে বাহিনীতে যোগ দিতে নির্দেশ দেন। ফলে রুশ, স্লাভ, ইংরেজ, রোমান, গ্রিক, জর্জিয়ান, আর্মেনিয়ান ও আরব খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন জাতির সমন্বয়ে দুই লক্ষ চল্লিশ হাজার সৈন্যের বিরাট এক বাহিনী (৯৫) প্রস্তুত হয়ে যায়। পুরো বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করা হয় আর্মেনিয়ান শাসক বাহানকে। হিরাক্লিয়াসের উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার— বিজয়ী হলে শাম অঞ্চলে রোমান সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার ও সুদৃঢ় হবে আর পরাজিত হলে চিরতরে শামের মায়া ত্যাগ করতে হবে। খ্রিষ্টান ধর্মযাজকরাও বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় এবং যোদ্ধাদেরকে ধর্মীয় বাণী শুনিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে।
শাম অঞ্চলে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি. যথাসময়ে গোয়েন্দা মারফত রোমানদের এই বিশাল সৈন্যসমাবেশ সম্পর্কে সংবাদ পেয়ে যান। তৎক্ষণাৎ তিনি তার সঙ্গে অবস্থানরত অন্যান্য মুসলিম সেনাপতি ও নেতৃস্থানীয় সাহাবিদের সঙ্গে করণীয় নির্ধারণে পরামর্শ করেন। পরামর্শে সিদ্ধান্ত হয় যে, মুসলমানরা আপাতত হিমসের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিয়ে অন্যান্য ফ্রন্টে অবস্থানরত মুসলিম সেনাপতিদের সঙ্গে মিলিত হবে এবং সকলে মিলে রোমান বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য উপযুক্ত কোনো স্থান নির্বাচন করবে।
হিমস ত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা খলিফা উমর রাযি.-কে জানানো হলে তিনি প্রথমে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। অবশ্য যখন তাকে জানানো হয় যে, এটি সকলের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, তখন তিনি তাদের সফলতা কামনা করেন।
বার্তাবাহক খলিফার কাছে মদিনা থেকে অতিরিক্ত সামরিক সাহায্য প্রেরণের অনুরোধ করলে তিনি সাইদ বিন আমির বিন হিযয়াম রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণের প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তী সময়ে সাইদ বিন আমির রাযি.-এর নেতৃত্বে এক হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী শামে মূল বাহিনীর সঙ্গে যোগদান করে। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় ছত্রিশ হাজার। মুসলিম বাহিনীতে প্রায় এক হাজার সাহাবি ছিলেন, যাদের মাঝে মহান বদরি কাফেলার একশ সদস্যও ছিলেন।
খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর পরামর্শে সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী জাবিয়া হতে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কয়েক মাইল অগ্রসর হয়ে ইয়ারমুক নদীর তীরে অবস্থিত (বর্তমান গোলান মালভূমির অন্তর্গত) ইয়ারমুক প্রান্তরের পূর্বপাশে শিবির স্থাপন করে। অপরদিকে হিরাক্লিয়াসের নির্দেশে রোমান বাহিনী শিবির স্থাপন করে ইয়ারমুকের সমতল ভূমির পশ্চিম প্রান্তে ওয়াদিউর রাক্কাদে। যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকার জন্য রোমান বাহিনীর ডানবাহুর ত্রিশ হাজার সৈন্য প্রতি দশজন পায়ে শিকল বেঁধে ময়দানে উপস্থিত হয়েছিল।
যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বেই সৈন্যসংখ্যা ও যুদ্ধসরঞ্জাম উভয় দিক থেকে রোমান বাহিনীর শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিভাত হচ্ছিল। প্রায় আঠারো মাইল বিস্তৃত রোমানদের শিবির দেখে বিহ্বল জনৈক মুসলিম সৈনিক মন্তব্য করে, 'রোমান বাহিনী কত বিশাল! আর মুসলিম বাহিনী কত ক্ষুদ্র!' তার মন্তব্য শুনে হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হন এবং চিৎকার করে বলেন, 'বরং রোমান বাহিনী কত ক্ষুদ্র! আর মুসলিম বাহিনী কত বিশাল! আরে! আল্লাহর সাহায্য সঙ্গে থাকলে কম সংখ্যক সৈন্যও বেশি সংখ্যক সৈন্যে পরিণত হয় আর লাঞ্ছনা ও অবমাননা এসে গেলে বেশি সংখ্যক সৈন্যও কম সংখ্যায় পরিণত হয়। আল্লাহর শপথ! আমি তো বরং এই কামনা করি যে, আমার 'আশকার' ঘোড়াটি পায়ের ব্যথা-মুক্ত হতো আর বিপরীতে রোমান সৈন্য যা আছে, তার দ্বিগুণ হতো!' উল্লেখ্য, শামের বিস্তীর্ণ এলাকায় পথ চলে খালিদের ঘোড়ার খুর ছিলে গিয়েছিল।
আল্লাহু আকবার! এমনই ছিল সাহাবায়ে কেরামের চিন্তা ও চেতনা! এমনই ছিল মুসলিম সেনাপতিদের ভাব ও ভাবনা! খালিদ রাযি. জানতেন ও বিশ্বাস করতেন যে, সংখ্যাধিক্যে কিছু আসে-যায় না; একটি সৈন্যদলের বিজয় ও সফলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহর নুসরত ও সাহায্য লাভ করা; হোক তারা সংখ্যায় অতি অল্প। বরং তিনি তো বলছেন যে, এই যুদ্ধে যদি শত্রুপক্ষের সৈন্যসংখ্যা বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণও হয়, সমস্যা নেই; প্রিয় অশ্ব 'আশকার' তার সঙ্গে থাকলেই হলো!
খালিদ রাযি. যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে সকলকে সুরা আনফাল তিলাওয়াতের নির্দেশ দেন। আবু হুরায়রা রাযি., আবু সুফিয়ান রাযি. প্রমুখ সাহাবিগণ নসিহতের মাধ্যমে সকলের মনোবল সুদৃঢ় করতে সচেষ্ট হন।
এরই মধ্যে মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক আবু উবায়দা রাযি.-এর কাছে খলিফা উমর রাযি.-এর প্রেরিত বার্তা এসে পৌঁছায়। বার্তায় খলিফা সকলকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন—
উমর আপনাদেরকে সালাম জানিয়েছেন এবং বলেছেন, হে মুসলমানগণ! আপনারা নিষ্ঠার সঙ্গে লড়াই করুন, সিংহের ন্যায় তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন এবং তরবারি দ্বারা শত্রুপক্ষের মাথায় আঘাত করুন। তারা যেন আপনাদের কাছে ধূলিকণার চেয়েও তুচ্ছ বিবেচিত হয়। আমি নিশ্চিত করেই জানি যে, তাদের মোকাবিলায় আপনারা নুসরত ও সাহায্য লাভ করবেন। সুতরাং তাদের সংখ্যাধিক্য যেন আপনাদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে না পারে।
আবু উবায়দা রাযি. সকলকে খলিফার পত্র পাঠ করে শোনালে মুসলিম বাহিনীর মনোবল আরও বৃদ্ধি পায়।
যদিও আবু উবায়দা রাযি. ছিলেন মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক; কিন্তু তার অনুমতিতে মহাবীর খালিদ রাযি.-ই মুসলিম বাহিনীর বিন্যাস-সহ সবকিছু পরিচালনা করছিলেন আর আবু উবায়দা রাযি. মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন অংশে গিয়ে সকলকে উদ্বুদ্ধ করছিলেন।
খালিদ রাযি. মুসলিম বাহিনীর পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্যদের ছত্রিশটি পদাতিক ও তিনটি অশ্বারোহী দলে বিভক্ত করেন আর চার হাজার বিশেষ অশ্বারোহী যোদ্ধার একটি বাহিনীকে দুই ভাগে বিভক্ত করে একভাগের নেতৃত্ব নিজের কাছে রাখেন; অপরভাগের নেতৃত্ব কায়স বিন হুবায়রা রাযি.-কে প্রদান করেন। বীরত্ব ও রণকুশলতায় কায়স রাযি. ছিলেন খালিদ রাযি.-এর পর মুসলিম বাহিনীর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। খালিদ রাযি. এই দুই অংশের একটিকে মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর পেছনে এবং অপরটিকে বামবাহুর পেছনে মোতায়েন করেন। সিদ্ধান্ত হয় রোমান বাহিনীর প্রাথমিক হামলার তীব্রতা শেষ হওয়ার পর যখন তারা মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে মিশে যাবে, তখন খালিদ ও কায়স অশ্বারোহী যোদ্ধাদের নিয়ে ডান দিক ও বাম দিক থেকে এগিয়ে এসে রোমানদের কচুকাটা করবেন।
শুরুতে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও সমঝোতার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং যুদ্ধ নিশ্চিত হয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর ইয়ারমুকের প্রান্তরে উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হয়। প্রথমে উভয় বাহিনীর শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাদের মধ্যে সম্মুখ লড়াই সংঘটিত হয় এবং প্রতিটি লড়াইয়ে মুসলিম বীর যোদ্ধাগণ প্রতিপক্ষকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। এরপর শুরু হয় প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী এক লড়াই; ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ.-এর ভাষায়-
যেন বিশাল অগ্নিকুণ্ড দাউ দাউ করে জ্বলছে, আগুনের তেজ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, তরবারিগুলো প্রাণ কেড়ে নেওয়ার এক অনিঃশেষ খেলায় মেতে উঠেছে। তরবারির আঘাতে ঝরে পড়ছে খণ্ডিত মস্তক, খণ্ডবিখণ্ড মানবদেহ।
জুরজা ইয়ারমুকের যুদ্ধেই শহিদ হন। তিনি এমন এক সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর ওয়াস্তে জীবনে মাত্র দু-রাকাত নামাজ আদায় করার পরই শহিদি মৃত্যুর দেখা পেয়েছেন। (৯৬)
একটানা কয়েক দিন প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী লড়াই চলার পর ষষ্ঠ দিন রোমান বাহিনীর সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং তারা পলায়নের পথ ধরে। খালিদ রাযি. পূর্বেই গোপনে রোমান বাহিনীর পেছনের সংকীর্ণ গিরিপথে পাঁচশ অশ্বারোহী সৈন্যের একটি বাহিনীকে মোতায়েন করে রেখেছিলেন। ফলে পলাতক রোমান সৈন্যরা দু-দিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং মুসলিম সৈন্যদের আঘাতের পাশাপাশি গিরিখাত থেকে নিচে পড়ে গিয়ে মারা যেতে থাকে। ষষ্ঠ দিনের সূর্যাস্তের পূর্বেই বিজয় মুসলিম বাহিনীর পদচুম্বন করে।
পরদিন সকালে খালিদ রাযি. একদল অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে দামেশকের পথ ধরে পলায়নরত রোমান সেনাপতি বাহানের খোঁজে অগ্রসর হন এবং তার নাগাল পেয়ে তাকে হত্যা করেন।
ইয়ারমুকের যুদ্ধে তিন হাজার মুসলিম যোদ্ধা শহিদ হয়। অপরদিকে রোমান বাহিনীর সত্তর হাজার মতান্তরে এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য নিহত হয়। ইয়ারমুকে পরাজয়ের ফলে শামে রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং সম্রাট হiraক্লিয়াস ভগ্ন হৃদয়ে এন্টিয়ক (৯৭) ত্যাগ করে কনস্টান্টিনোপলে চলে যান। শাম ত্যাগ করার সময় তিনি বলছিলেন, 'বিদায়, হে শাম! বিদায় চিরকালের জন্য! আর কখনো ফিরে আসব না তোমার বুকে। হায়! সবুজ-শ্যামল, উর্বর ও কল্যাণে ভরপুর এক ভূখণ্ড শত্রুর হাতে ছেড়ে যাচ্ছি!'

টিকাঃ
৯৫. ইয়ারমুকের যুদ্ধে রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। আবু উবায়দা রাযি. কর্তৃক খলিফা উমর রাযি.-এর কাছে প্রেরিত একটি পত্রের বিবরণ দ্বারা অনুমিত হয় যে, রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় চার লক্ষ। ঐতিহাসিক আযদি-ও বিভিন্ন সূত্রের বরাতে চার লক্ষের কথা উল্লেখ করেছেন।
৯৬. জুরজার ইসলামগ্রহণের ঘটনা বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থে ভিন্নভাবেও বর্ণিত আছে। কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় এখানে তা উল্লেখ করা হলো না।
৯৭. এন্টিয়ক: ভূমধ্যসাগরের উপকূল হতে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পূর্বে আছি নদী (Orontes river)-এর তীরে অবস্থিত অতি প্রাচীন একটি নগরী এন্টিয়ক (Antioch)। আধুনিক তুরস্কের হাতায় প্রদেশ (Hatay Province)-এর অন্তর্গত নগরীটির বর্তমান নাম এন্টাকিয়া (Antakya)। আরবিতে নগরীটির নাম أُنْطَاكِيَة (আনতাকিয়া)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00