📄 শামে প্রাথমিক অভিযান
মুসলিম বাহিনী প্রথমে ফিলিস্তিন অঞ্চলের 'আরাবা' নামক এলাকায় ছয়জন রোমান সেনাপতির নেতৃত্বাধীন তিন হাজার সদস্যবিশিষ্ট একটি বাহিনীর মুখোমুখি হয়। মুসলমানরা তাদেরকে পরাজিত করে এবং একজন সেনাপতিকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। পরাজিত রোমান সৈন্যরা দাছিনা নামক স্থানে পুনরায় সমবেত হলে মুসলিম বাহিনী সেখানেও তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে।
পরপর দুটি যুদ্ধে রোমান বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং মুসলিম বাহিনীর দফারফার জন্য ব্যাপক সৈন্যসমাবেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তখন খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি. খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. ও তার বাহিনীর একটি অংশকে ইরাকফ্রন্ট থেকে সরিয়ে শাম অঞ্চলে প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ! খালিদের মাধ্যমে আমি রোমানদেরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা ভুলিয়ে দেবো।'
এটি ত্রয়োদশ হিজরি সনের সফর মাসের (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের) ঘটনা।
খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর নির্দেশ পাওয়ামাত্র খালিদ রাযি. নয় হাজার সৈন্য নিয়ে শাম অভিমুখে রওনা হয়ে যান। দ্রুততম সময়ে শামে পৌঁছার জন্য তিনি সামাওয়া মরুভূমি নামে পরিচিত শামের মরু অঞ্চল পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পথের দুর্গমতা ও পানিস্বল্পতার কারণে খালিদের বাহিনীর পূর্বে কোনো বাহিনী এই পথ পাড়ি দেয়নি। কিন্তু শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শামে গমনের জন্য খালিদ এই দুর্গম পথটিই বেছে নেন। তিনি চাচ্ছিলেন দ্রুততম সময়ে শত্রুপক্ষের কাছে উপস্থিত হয়ে পেছন থেকে অতর্কিতে তাদের ওপর হামলা করতে।
সুদীর্ঘ ও সুকঠিন পথ পাড়ি দিয়ে খালিদ শামে পৌঁছান এবং ইতিপূর্বে খলিফা আবু বকর রাযি. কর্তৃক প্রেরিত চারটি বাহিনীর সেনাপতিদের সঙ্গে মিলিত হন। এ সময় খালিদ অনুভব করেন যে, সবগুলো বাহিনীকে এক নেতৃত্বের অধীনে নিয়ে এসে একটি বৃহৎ একক বাহিনী গঠন করা প্রয়োজন। কিন্তু এই সম্মিলিত বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্ধারণে সম্ভাব্য-সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে তিনি আশঙ্কা বোধ করছিলেন। অবশেষে খালিদ এমন চমৎকার একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেন, যার ফলে পূর্বে প্রেরিত চার বাহিনীর সেনাপতিগণসহ সকলে সন্তুষ্টচিত্তে একজন সর্বাধিনায়ককে মেনে নেয়। তিনি সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আসুন, আমরা বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব পালাক্রমে গ্রহণ করি। আজ একজনের দায়িত্ব থাকবে, আগামীকাল আরেকজনের, আগামী পরশু তৃতীয়জনের। এভাবে সকলেই এক-একদিন নেতৃত্বদান করবে। আর আজ আমাকেই দায়িত্ব দিন।
সকলে সেদিনের জন্য খালিদকেই সর্বাধিনায়ক হিসেবে মেনে নেয়। এরপর সকলেই উপলব্ধি করে যে, এই বিরাট বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন, নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ আর খালিদই এই দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। তখন সকলে খালিদকেই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে মেনে নেয়। (৮০) খালিদ পুরো বাহিনীকে এক হাজার সৈন্যবিশিষ্ট অনেকগুলো অংশে বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি অংশের প্রধান হিসেবে মুসলিম বাহিনীর শ্রেষ্ঠতম বীর-বাহাদুরদের নির্ধারণ করেন। এই নতুন বিন্যাসের ফলে মুসলিম বাহিনীকে তার স্বাভাবিক আকৃতির চেয়ে যথেষ্ট বড় মনে হচ্ছিল।
টিকাঃ
৮০. অবশ্য কোনো কোনো বর্ণনামতে স্বয়ং খliফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি.-ই খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে শামের মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করেছিলেন। দেখুন-ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৬।
মুসলিম বাহিনী প্রথমে ফিলিস্তিন অঞ্চলের 'আরাবা' নামক এলাকায় ছয়জন রোমান সেনাপতির নেতৃত্বাধীন তিন হাজার সদস্যবিশিষ্ট একটি বাহিনীর মুখোমুখি হয়। মুসলমানরা তাদেরকে পরাজিত করে এবং একজন সেনাপতিকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। পরাজিত রোমান সৈন্যরা দাছিনা নামক স্থানে পুনরায় সমবেত হলে মুসলিম বাহিনী সেখানেও তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে।
পরপর দুটি যুদ্ধে রোমান বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং মুসলিম বাহিনীর দফারফার জন্য ব্যাপক সৈন্যসমাবেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তখন খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি. খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. ও তার বাহিনীর একটি অংশকে ইরাকফ্রন্ট থেকে সরিয়ে শাম অঞ্চলে প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ! খালিদের মাধ্যমে আমি রোমানদেরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা ভুলিয়ে দেবো।'
এটি ত্রয়োদশ হিজরি সনের সফর মাসের (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের) ঘটনা।
খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর নির্দেশ পাওয়ামাত্র খালিদ রাযি. নয় হাজার সৈন্য নিয়ে শাম অভিমুখে রওনা হয়ে যান। দ্রুততম সময়ে শামে পৌঁছার জন্য তিনি সামাওয়া মরুভূমি নামে পরিচিত শামের মরু অঞ্চল পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পথের দুর্গমতা ও পানিস্বল্পতার কারণে খালিদের বাহিনীর পূর্বে কোনো বাহিনী এই পথ পাড়ি দেয়নি। কিন্তু শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শামে গমনের জন্য খালিদ এই দুর্গম পথটিই বেছে নেন। তিনি চাচ্ছিলেন দ্রুততম সময়ে শত্রুপক্ষের কাছে উপস্থিত হয়ে পেছন থেকে অতর্কিতে তাদের ওপর হামলা করতে।
সুদীর্ঘ ও সুকঠিন পথ পাড়ি দিয়ে খালিদ শামে পৌঁছান এবং ইতিপূর্বে খলিফা আবু বকর রাযি. কর্তৃক প্রেরিত চারটি বাহিনীর সেনাপতিদের সঙ্গে মিলিত হন। এ সময় খালিদ অনুভব করেন যে, সবগুলো বাহিনীকে এক নেতৃত্বের অধীনে নিয়ে এসে একটি বৃহৎ একক বাহিনী গঠন করা প্রয়োজন। কিন্তু এই সম্মিলিত বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্ধারণে সম্ভাব্য-সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে তিনি আশঙ্কা বোধ করছিলেন। অবশেষে খালিদ এমন চমৎকার একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেন, যার ফলে পূর্বে প্রেরিত চার বাহিনীর সেনাপতিগণসহ সকলে সন্তুষ্টচিত্তে একজন সর্বাধিনায়ককে মেনে নেয়। তিনি সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আসুন, আমরা বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব পালাক্রমে গ্রহণ করি। আজ একজনের দায়িত্ব থাকবে, আগামীকাল আরেকজনের, আগামী পরশু তৃতীয়জনের। এভাবে সকলেই এক-একদিন নেতৃত্বদান করবে। আর আজ আমাকেই দায়িত্ব দিন।
সকলে সেদিনের জন্য খালিদকেই সর্বাধিনায়ক হিসেবে মেনে নেয়। এরপর সকলেই উপলব্ধি করে যে, এই বিরাট বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন, নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ আর খালিদই এই দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। তখন সকলে খালিদকেই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে মেনে নেয়। (৮০) খালিদ পুরো বাহিনীকে এক হাজার সৈন্যবিশিষ্ট অনেকগুলো অংশে বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি অংশের প্রধান হিসেবে মুসলিম বাহিনীর শ্রেষ্ঠতম বীর-বাহাদুরদের নির্ধারণ করেন। এই নতুন বিন্যাসের ফলে মুসলিম বাহিনীকে তার স্বাভাবিক আকৃতির চেয়ে যথেষ্ট বড় মনে হচ্ছিল।
টিকাঃ
৮০. অবশ্য কোনো কোনো বর্ণনামতে স্বয়ং খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি.-ই খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে শামের মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করেছিলেন। দেখুন-ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৬।
📄 বুছরা বিজয়
এরপর খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে তৎকালীন শামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী বুছরা অবরোধ করেন। কঠিন অবরোধের একপর্যায়ে বুছরাবাসী নতি স্বীকার করে এবং জিজিয়ার বিনিময়ে সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব দেয়। হজরত খালিদ রাযি. তাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন।
ত্রয়োদশ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) বুছরা বিজিত হয়। বুছরা ছিল শাম অঞ্চলে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত প্রথম নগরী।
এরপর খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ নিয়ে তৎকালীন শামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী বুছরা অবরোধ করেন। কঠিন অবরোধের একপর্যায়ে বুছরাবাসী নতি স্বীকার করে এবং জিজিয়ার বিনিময়ে সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব দেয়। হজরত খালিদ রাযি. তাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করেন।
ত্রয়োদশ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) বুছরা বিজিত হয়। বুছরা ছিল শাম অঞ্চলে সন্ধির মাধ্যমে বিজিত প্রথম নগরী।
📄 আজনাদাইনের যুদ্ধ
বুছরা নগরীর পতনের পর রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস উপলব্ধি করেন যে, অতি শীঘ্র মুসলিম বাহিনীকে শাম থেকে বিতাড়িত করতে না পারলে অচিরেই শাম অঞ্চল রোমান সাম্রাজ্যের হাতছাড়া হয়ে যাবে। তিনি এবার নতুন করে রোমান বাহিনীকে সংগঠিত করেন এবং সত্তর হাজার সৈন্যের বিশাল এক বাহিনীকে ফিলিস্তিনের আজনাদাইন (Ajnadayn) অঞ্চলে প্রেরণ করেন। আরব উপদ্বীপ ও শামের বিভিন্ন খ্রিষ্টান গোত্রও রোমান বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। সব মিলিয়ে রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় এক লক্ষে।
মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক খালিদ বিন ওয়ালিদ বুছরা জয় করার পর তার নিজস্ব বাহিনী ও আবু উবায়দা রাযি.-এর বাহিনী নিয়ে দামেশকে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী তখন ফিলিস্তিনের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থান করছিল। প্রতিপক্ষের সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে খালিদ রাযি. শামে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর সকল ইউনিটকে আমর ইবনুল আস রাযি.-এর বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে নির্দেশ প্রেরণ করেন এবং নিজেও আবু উবায়দা রাযি.-কে সঙ্গে নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় ত্রিশ হাজার। শামের সকল মুসলিম ইউনিট একত্রিত হওয়ার পর সর্বাধিনায়ক খালিদ রাযি. নতুন করে মুসলিম বাহিনীকে বিন্যস্ত করেন। তিনি মুআয বিন জাবাল রাযি.-কে মুসলিম বাহিনীর ডানবাহু, সাইদ বিন আমির রাযি.-কে বামবাহু, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.-কে কেন্দ্রীয় অংশের পদাতিক বাহিনী এবং সাইদ বিন যায়দ রাযি.-কে অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেন।
ত্রয়োদশ হিজরি সনের ২৭ জুমাদাল উলা (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুলাই) দ্বিপ্রহরের পর উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হয়। জনবল ও অস্ত্রবলের কারণে প্রবঞ্চিত রোমান বাহিনী প্রথমেই মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু মুআয বিন জাবালের নেতৃত্বে মুসলিম সৈন্যরা অবিচলতার সঙ্গে তাদের আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয়। এরপর রোমান বাহিনী মুসলিম বাহিনীর বামবাহুর ওপর আক্রমণ চালালে তারাও দৃঢ়তার সঙ্গে রোমানদের প্রতিরোধ করে। এরপরই সেনাপতি খালিদ রাযি. মুসলিম অশ্বারোহী সৈন্যদেরকে প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দেন। মুসলমানদের প্রচণ্ড আক্রমণে মুহূর্তেই খ্রিষ্টান বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
মুসলিম সৈন্যগণ আজনাদাইনের যুদ্ধে অনন্যসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন। হজরত যিরার বিন আযওয়ার রাযি. একাই প্রতিপক্ষের ত্রিশজন অশ্বারোহী সৈন্যকে হত্যা করেন। বিশিষ্ট নারী সাহাবি উম্মে হাকিম রাযি. তাঁবুর খুঁটি দিয়ে প্রহার করে কুপোকাত করেন চারজন রোমান সৈন্যকে।
আজনাদাইনের যুদ্ধে কয়েক হাজার রোমান সৈন্য নিহত হয়। মুসলিম বাহিনীর প্রায় সাড়ে চারশ যোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন। বিজয় সমাপ্ত হওয়ার পর সেনাপতি খালিদ খলিফা আবু বকর রাযি.-এর কাছে বিজয়বার্তা প্রেরণ করেন। বার্তা পাঠ করার পর খলিফাতুল মুসলিমিন বলেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি মুসলমানদের বিজয় দান করেছেন এবং এর মাধ্যমে আমাকে চক্ষু-শীতলতা দান করেছেন।'
বুছরা নগরীর পতনের পর রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস উপলব্ধি করেন যে, অতি শীঘ্র মুসলিম বাহিনীকে শাম থেকে বিতাড়িত করতে না পারলে অচিরেই শাম অঞ্চল রোমান সাম্রাজ্যের হাতছাড়া হয়ে যাবে। তিনি এবার নতুন করে রোমান বাহিনীকে সংগঠিত করেন এবং সত্তর হাজার সৈন্যের বিশাল এক বাহিনীকে ফিলিস্তিনের আজনাদাইন (Ajnadayn) অঞ্চলে প্রেরণ করেন। আরব উপদ্বীপ ও শামের বিভিন্ন খ্রিষ্টান গোত্রও রোমান বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। সব মিলিয়ে রোমান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় এক লক্ষে।
মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক খালিদ বিন ওয়ালিদ বুছরা জয় করার পর তার নিজস্ব বাহিনী ও আবু উবায়দা রাযি.-এর বাহিনী নিয়ে দামেশকে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী তখন ফিলিস্তিনের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থান করছিল। প্রতিপক্ষের সৈন্যসমাবেশের সংবাদ পেয়ে খালিদ রাযি. শামে অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর সকল ইউনিটকে আমর ইবনুল আস রাযি.-এর বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে নির্দেশ প্রেরণ করেন এবং নিজেও আবু উবায়দা রাযি.-কে সঙ্গে নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়ায় ত্রিশ হাজার। শামের সকল মুসলিম ইউনিট একত্রিত হওয়ার পর সর্বাধিনায়ক খালিদ রাযি. নতুন করে মুসলিম বাহিনীকে বিন্যস্ত করেন। তিনি মুআয বিন জাবাল রাযি.-কে মুসলিম বাহিনীর ডানবাহু, সাইদ বিন আমির রাযি.-কে বামবাহু, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি.-কে কেন্দ্রীয় অংশের পদাতিক বাহিনী এবং সাইদ বিন যায়দ রাযি.-কে অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেন।
ত্রয়োদশ হিজরি সনের ২৭ জুমাদাল উলা (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুলাই) দ্বিপ্রহরের পর উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হয়। জনবল ও অস্ত্রবলের কারণে প্রবঞ্চিত রোমান বাহিনী প্রথমেই মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু মুআয বিন জাবালের নেতৃত্বে মুসলিম সৈন্যরা অবিচলতার সঙ্গে তাদের আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয়। এরপর রোমান বাহিনী মুসলিম বাহিনীর বামবাহুর ওপর আক্রমণ চালালে তারাও দৃঢ়তার সঙ্গে রোমানদের প্রতিরোধ করে। এরপরই সেনাপতি খালিদ রাযি. মুসলিম অশ্বারোহী সৈন্যদেরকে প্রতিপক্ষের ওপর আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দেন। মুসলমানদের প্রচণ্ড আক্রমণে মুহূর্তেই খ্রিষ্টান বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
মুসলিম সৈন্যগণ আজনাদাইনের যুদ্ধে অনন্যসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন। হজরত যিরার বিন আযওয়ার রাযি. একাই প্রতিপক্ষের ত্রিশজন অশ্বারোহী সৈন্যকে হত্যা করেন। বিশিষ্ট নারী সাহাবি উম্মে হাকিম রাযি. তাঁবুর খুঁটি দিয়ে প্রহার করে কুপোকাত করেন চারজন রোমান সৈন্যকে।
আজনাদাইনের যুদ্ধে কয়েক হাজার রোমান সৈন্য নিহত হয়। মুসলিম বাহিনীর প্রায় সাড়ে চারশ যোদ্ধা শাহাদাত বরণ করেন। বিজয় সমাপ্ত হওয়ার পর সেনাপতি খালিদ খলিফা আবু বকর রাযি.-এর কাছে বিজয়বার্তা প্রেরণ করেন। বার্তা পাঠ করার পর খলিফাতুল মুসলিমিন বলেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি মুসলমানদের বিজয় দান করেছেন এবং এর মাধ্যমে আমাকে চক্ষু-শীতলতা দান করেছেন।'
📄 ইয়াকুছা ও মারজুস সুফফার-এর যুদ্ধ
আজনাদাইনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই খালিদ রাযি. আবু উবায়দা রাযি.-এর বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে দামেশক অভিমুখে রওনা হন। রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের জামাতা টমাস এ সংবাদ জানতে পেরে একদল রোমান সৈন্যকে মুসলিম বাহিনীর প্রতিরোধের উদ্দেশে প্রেরণ করে। পথিমধ্যে (৮১) প্রথমে ইয়ারমুক নদীর নিকটে ইয়ারকুছায় এবং পরে মারজুস সুফফার এলাকায় রোমান বাহিনীর সঙ্গে মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধ হয় এবং উভয় যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। পরাজিত রোমান বাহিনীর জীবিত সৈন্যরা দামেশক নগরীর অভ্যন্তরে আশ্রয় নেয়; অনেকে চলে যায় হিমসে। এরপর মুসলিম বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে দামেশক অবরোধ করে।
খলিফা আবু বকর রাযি.-এর ইন্তেকালের মাত্র চারদিন পূর্বে ত্রয়োদশ হিজরির ১৮ জুমাদাল উখরা (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ আগস্ট) মারজুস সুফফারের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
টিকাঃ
৮১. অবশ্য কতক ঐতিহাসিকের মতে মুসলিম বাহিনী দামেশকে পৌঁছে দামেশক নগরী অবরোধ করার পর জানতে পারে যে, দামেশকবাসীর সহায়তায় প্রেরিত একটি রোমান বাহিনী দামেশকের কাছে পৌঁছে গেছে। তখন মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ মারজুস সুফফারে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং তাদেরকে পরাজিত করে।
আজনাদাইনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই খালিদ রাযি. আবু উবায়দা রাযি.-এর বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে দামেশক অভিমুখে রওনা হন। রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের জামাতা টমাস এ সংবাদ জানতে পেরে একদল রোমান সৈন্যকে মুসলিম বাহিনীর প্রতিরোধের উদ্দেশে প্রেরণ করে। পথিমধ্যে (৮১) প্রথমে ইয়ারমুক নদীর নিকটে ইয়ারকুছায় এবং পরে মারজুস সুফফার এলাকায় রোমান বাহিনীর সঙ্গে মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধ হয় এবং উভয় যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। পরাজিত রোমান বাহিনীর জীবিত সৈন্যরা দামেশক নগরীর অভ্যন্তরে আশ্রয় নেয়; অনেকে চলে যায় হিমসে। এরপর মুসলিম বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে দামেশক অবরোধ করে।
খলিফা আবু বকর রাযি.-এর ইন্তেকালের মাত্র চারদিন পূর্বে ত্রয়োদশ হিজরির ১৮ জুমাদাল উখরা (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ আগস্ট) মারজুস সুফফারের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
টিকাঃ
৮১. অবশ্য কতক ঐতিহাসিকের মতে মুসলিম বাহিনী দামেশকে পৌঁছে দামেশক নগরী অবরোধ করার পর জানতে পারে যে, দামেশকবাসীর সহায়তায় প্রেরিত একটি রোমান বাহিনী দামেশকের কাছে পৌঁছে গেছে। তখন মুসলিম বাহিনীর একটি অংশ মারজুস সুফফারে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং তাদেরকে পরাজিত করে।