📄 রোমান সাম্রাজ্য ও শাম পরিচিতি
রোমান সাম্রাজ্য পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সাম্রাজ্য। রোমান সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে খ্রিষ্টপরবর্তী পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বছর। রোমানদের উৎপত্তি যেহেতু ইতালির রোম নগরীতে, তাই তাদের নামকরণ করা হয়েছে রোমান।
রোমান সাম্রাজ্য ছিল বিভিন্ন নগর-রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রজাতন্ত্র। এর রাজধানী ছিল রোম। প্রথম পাঁচ শতক সাম্রাজ্যটি সিনেটর বা প্রতিনিধি পর্ষদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। খ্রিষ্টপূর্ব ২৩ সনে প্রতিনিধি পর্ষদের নির্ধারিত ডিক্টেটর অগাস্টাস (Augustus) রোম প্রজাতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘোষণা করে রাজতন্ত্রকেন্দ্রিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ কারণে তাকে রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট বিবেচনা করা হয়। ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে (৮৫৭ হিজরি সনে) উসমানি সাম্রাজ্যের হাতে চূড়ান্ত পতনের পূর্ব পর্যন্ত পরবর্তী প্রায় পনেরোশ বছর রোমান সাম্রাজ্য রাজতন্ত্রের অধীনেই পরিচালিত হয়।
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে রোমান সাম্রাজ্যের আয়তন বিশাল আকার ধারণ করায় শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তৎকালীন সম্রাট ডিয়োক্লেটিয়ান (Diocletian) সাম্রাজ্যকে পূর্ব-পশ্চিম দু-ভাগে বিভক্ত করেন। পরে সম্রাট কনস্টান্টাইন (Constantine the Great) রোম নগরীর নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতাসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে সাম্রাজ্যের রাজধানী রোম হতে বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত বাইজান্টিয়ামে (Byzantium) স্থানান্তরিত করেন। ৩৩০ খ্রিষ্টাব্দে বাইজান্টিয়ামের সংস্কারকাজ সমাপ্ত হওয়ার পর তার নামানুসারে নগরীটির নতুন নামকরণ করা হয় কনস্টান্টিনোপল। এ সময় কিছুদিন সাম্রাজ্যের উভয় অংশ একই সম্রাটের অধীনে শাসিত হলেও ৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট ১ম থিয়োডোসিয়াস (Theodosius I)-এর মৃত্যুর পর রোমান সাম্রাজ্য চিরস্থায়ীভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
পশ্চিম অংশের রাজধানী হয় রোম আর পূর্ব অংশের রাজধানী হয় কনস্টান্টিনোপল। মূল অংশ বা পশ্চিম অংশটি পরিচিত হয় পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য নামে আর নবগঠিত পূর্ব অংশটি পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য নামের পাশাপাশি রাজধানীর প্রাচীন নামানুসারে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য নামেও পরিচিতি লাভ করে।
যেহেতু ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেই পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে, তাই নবীযুগেও রোমান সাম্রাজ্য বলতে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকেই বোঝানো হতো। পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরিফে রোমান বলে বাইজান্টাইনদের এবং 'রোম'-ভূমি দ্বারা বাইজান্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপলকেই বোঝানো হয়েছে।(৭৪)
শুরুতে রোমান সাম্রাজ্যের পরিধি ইতালিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে ইতালির বাইরেও প্রসারিত হতে থাকে। কালক্রমে সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ভূমধ্যসাগরের ওপারে উত্তর আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং আধুনিক মরক্কো ও আলজেরিয়ার উত্তর উপকূল রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ডিক্টেটর জুলিয়াস সিজার-এর আমলে (শাসনকাল: খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯-৪৪ সন) মিশরও রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে রোমানরা পরিণত হয় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিপতিতে। রোমান সাম্রাজ্য আয়তনের দিক থেকে তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায় সম্রাট ট্রাজানের (Trajan) আমলে (শাসনকাল : ৯৮-১১৭ খ্রিষ্টাব্দ)। তার আমলে রোমান সাম্রাজ্যের আয়তন ছিল প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সম্রাটের আমলে সাম্রাজ্যের আয়তনে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটলেও ইসলামের আবির্ভাবের কয়েক দশক পূর্বে ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট ১ম জাস্টিনিয়ান (Justinian I)-এর সময় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য আবারও বিশালাকার ধারণ করে। এ সময় সাম্রাজ্যের আয়তন ছিল প্রায় পয়তাল্লিশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। ঐতিহাসিক শাম অঞ্চল, মিশর, এশিয়া মাইনর(৭৫) ও ইউরোপের বিশাল অঞ্চল তখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যেহেতু রোমান সাম্রাজ্য ও সাসানি সাম্রাজ্য ছিল তৎকালীন বিশ্বের মহাশক্তিধর দুই রাষ্ট্র, তাই রাজ্য বিস্তৃতি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সব সময় সংঘাত চলত এবং উভয় সাম্রাজ্যের আয়তনেও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটত। ইসলামের আবির্ভাবকালে রোমান সাম্রাজ্য ছিল পারসিক সাসানি সাম্রাজ্যের পর পৃথিবীর বৃহত্তম সাম্রাজ্য।
প্রাচীন রোমানরা ছিল প্যাগানিজম (Paganism) বা পৌত্তলিকতাবাদের অনুসারী। তারা বিভিন্ন দেবতার পূজা করত। রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম আটশ বছর প্যাগানিজমই ছিল সাম্রাজ্যের মূল ধর্ম। রোমান রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা অগাস্টাসের আমলে আল্লাহর নবী হজরত ঈসা আ.-এর আগমনের মাধ্যমে পৃথিবীতে খ্রিষ্টধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। যেহেতু একদিকে খ্রিষ্টধর্মের একত্ববাদের শিক্ষা ছিল রোমানদের পৌত্তলিকতাবাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক, অপরদিকে ঈসা আ.-এর প্রচারিত ন্যায় ও সাম্যের শিক্ষা ভোগবাদে বিশ্বাসী রোমান রাজপরিবারের অধীনস্থ জনগণের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তাই রোমান রাজপরিবার খ্রিষ্টধর্মকে গ্রহণ করার পরিবর্তে শত্রুতা ও দমনের নীতি অবলম্বন করে এবং খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের ওপর প্রচুর নির্যাতন চালায়। তবে কালের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে খ্রিষ্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের সর্বস্তরে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। চতুর্থ শতকের গোড়ার দিকে রোমান সম্রাট কনস্টান্টাইন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। তার আমল হতেই রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টধর্মের প্রতি কঠোরতা হ্রাস করে সহনশীলতা প্রদর্শন শুরু হয়। এরপর সম্রাট ১ম থিয়োডোসিয়াসের সময় খ্রিষ্টধর্মকে রোমান সাম্রাজ্যের একমাত্র বৈধ ধর্মের মর্যাদা প্রদান করা হয়। তখন থেকে পতনের পূর্ব পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর বুকে খ্রিষ্টধর্মের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও রক্ষক।
রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ ও সমৃদ্ধ অংশ ছিল শাম। বর্তমানে যদিও আধুনিক সিরিয়াও শাম নামে পরিচিত; কিন্তু প্রাচীন শাম একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলের নাম, যার বিস্তৃতি ছিল ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীর হতে মেসোপটেমিয়া (৭৬) অঞ্চল পর্যন্ত। বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন (৭৭) (ইসরাইল অধিকৃত অঞ্চলসহ পশ্চিম তীর ও গাজা) এবং আধুনিক সউদি আরবের আল-জাওফ প্রদেশ ও উত্তর সীমান্ত অঞ্চল শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়াও ১৯২১ সালে ফ্রান্স ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত আঙ্কারা চুক্তি অনুযায়ী বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের যেসব এলাকা তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত হয়, সেগুলোও ঐতিহাসিক শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তুরস্কের সানজাকে ইসকানদার (The Sanjak of Alexandretta) অঞ্চলও (৭৮) শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়াও বর্তমান মিশরের সিনাই উপদ্বীপ ও বর্তমান ইরাকের মসুল অঞ্চলের কিছু অংশ শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। একদল ঐতিহাসিকের মতে পুরো সিনাই উপদ্বীপ ও সাইপ্রাসও ঐতিহাসিক শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অবশ্য খ্রিষ্টপূর্ব ৬৪ সালে রোমানরা শাম অধিকার করার বহু পূর্বে মেসোপটেমিয়া অঞ্চল শাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের অধিকারে চলে যায় এবং পরবর্তীকালে পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের স্থলাভিষিক্ত সাসানি সাম্রাজ্যের হাতে আসে। এর ফলে শামের আয়তনে পরিবর্তন ঘটে এবং শাম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে ভূমধ্যসাগরের তীর হতে ফুরাত নদীর তীর পর্যন্ত এলাকায়। বর্তমান সউদি আরবের আল-জাওফ প্রদেশের অন্তর্গত দুমাতুল জান্দাল এলাকা ছিল তৎকালীন শামের দক্ষিণ সীমান্ত আর উত্তর সীমান্ত ছিল দক্ষিণ তুরস্কের তোরোস পবর্তমালা (The Taurus Mountains)। প্রাক-ইসলামি যুগ ও ইসলামি যুগে শাম বলে উল্লিখিত অঞ্চলকেই বোঝানো হতো।
ইসলামের আবির্ভাবের শতাধিক বছর পূর্বে গাসসানি সম্প্রদায় ইয়ামেন থেকে শামে এসে বসবাস শুরু করে। শামে আগমনের কিছুদিনের মধ্যেই তারা রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। রোমান রাজপরিবার গাসসানিদের সামরিক কুশলতা ও যুদ্ধ-মনোবল প্রত্যক্ষ করে তাদেরকে কিছুটা স্বাধিকার প্রদান করে করদরাজ্যের অধিপতি হিসেবে শামে বসবাসের অনুমতি প্রদান করে। এর ফলে গাসসানিরা রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাজবংশে পরিণত হয় এবং বুছরাকে রাজধানী করে শামের দক্ষিণাঞ্চল শাসন করতে থাকে। ইসলামের আবির্ভাবের সময়ও এ অঞ্চলে গাসসানি শাসন চলছিল।
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর বিভিন্ন শাসক ও রাজন্যবর্গের কাছে দাওয়াতি পত্রপ্রেরণের ধারাবাহিকতায় নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশিষ্ট সাহাবি দিহইয়াতুল কালবি রাযি. মারফত তৎকালীন রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস (Heraclius)-এর কাছেও পত্র প্রেরণ করেন। নবীজির পত্র পাঠ ও নবীজির বিস্তারিত বিবরণ জেনে হিরাক্লিয়াস ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলেও সাম্রাজ্যের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের প্রচণ্ড বিরোধিতার কারণে তা গোপন রাখেন।
পত্রপ্রেরণের ধারাবাহিকতায় নবীজি রোমান করদরাজ্য বুছরার গাসসানি প্রশাসক শুরাহবিল বিন আমর গাসসানির কাছে পত্র প্রেরণ করলে সে পত্রবাহক সাহাবি হারিস বিন উমায়র আজদি রাযি.-কে হত্যা করে। এর প্রতিকারবিধানে নবীজি মুসলিম বাহিনীকে উক্ত অঞ্চলে প্রেরণ করেন এবং সেখানে অষ্টম হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (৬২৯ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুতার যুদ্ধের মাধ্যমেই রোমান-মুসলিম সামরিক সংঘাতের সূচনা হয়। পরের বছর মুসলমানরা রোমানদের মোকাবিলায় তাবুকে সৈন্যসমাবেশ ঘটালেও রোমান বাহিনী অগ্রসর না হওয়ায় যুদ্ধের ঘটনা ঘটেনি। ইন্তেকালের কয়েকদিন পূর্বে নবীজি রোমান সাম্রাজ্যে অভিযান পরিচালনার জন্য উসামা বিন যায়দ রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। নবীজির ইন্তেকালের পর ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর রাযি. উসামার বাহিনীকে প্রেরণ করেন। উক্ত বাহিনী রোমান সাম্রাজ্যের শাম অঞ্চলের বালকা এলাকায় সফলতার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করে। এর কিছুদিন পর দ্বাদশ হিজরির রজব মাসে (সেপ্টেম্বর, ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) খলিফা আবু বকর রাযি. শাম অঞ্চলে বাহিনী প্রেরণের মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যে ইসলামি বিজয়াভিযানের ধারা শুরু করেন।
টিকাঃ
৭৩. 'রোমান সাম্রাজ্য ও শাম পরিচিতি' শিরোনামের অংশটুকু অনুবাদক কর্তৃক সংযোজন করা হয়েছে।
৭৪. হিজরি সপ্তম শতাব্দীর (খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর) প্রখ্যাত কবি ও সুফিসাধক মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহ. ছিলেন বর্তমান তুরস্কের কোনিয়া অঞ্চলের অধিবাসী। তিনিও এই ব্যাপকতর অর্থের ভিত্তিতেই রোমের অধিবাসী না হয়েও 'রুমি' নামে পরিচিতি লাভ করেন।
৭৫. এশিয়া মহাদেশের একটি বিশেষ অংশের নাম এশিয়া মাইনর। ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরের মধ্যে সীমাবদ্ধ অঞ্চলটি আনাতোলিয়া নামেও পরিচিত ছিল। এ অঞ্চলটিই বর্তমানে আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্র। অঞ্চলটির উত্তরে কৃষ্ণসাগর, পশ্চিমে এজিয়ান সাগর, দক্ষিণে আধুনিক সিরিয়া ও ভূমধ্যসাগর। আর পূর্ব সীমান্তে আছে বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চল, যা আধুনিক রাষ্ট্রসীমায় আর্মেনিয়া ও ইরানের মধ্যে পড়েছে।
৭৬. মেসোপটেমিয়া: দজলা ও ফুরাত নদীর মধ্যবর্তী সুবিস্তৃত একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলের নাম। আধুনিক ইরাক, সিরিয়ার উত্তরাংশ, তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল এবং ইরানের খুজেস্তান প্রদেশ মিলে ছিল তৎকালীন বিলাদুর রাফিদাইন বা মেসোপটেমিয়া (Mesopotamia)। মেসোপটেমিয়ার উত্তর অংশকে বলা হতো জাযিরাতুল ফুরাত (সংক্ষেপে জাযিরা) বা মেসোপটেমিয়া উচ্চভূমি (Upper Mesopotamia)। জাযিরার পরিচিতি সামনে যথাস্থানে উল্লেখ করা হবে।
৭৭. ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অঞ্চল মূলত শাম অঞ্চলেরই একটি অংশ। তবে ঐতিহাসিক পটভূমিসহ বিভিন্ন গুরুত্ব বিবেচনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকায় অঞ্চলটি আলাদাভাবেও আলোচিত হয়। অতীতে ফিলিস্তিন শব্দটি শাম অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের জন্য ব্যবহৃত হতো। শামের এ অংশটি এশিয়া মহাদেশের পশ্চিম অংশে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। সাধারণত ফিলিস্তিন বলে পশ্চিমের ভূমধ্যসাগর হতে পূর্বের মৃত সাগর ও জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী ভূখণ্ডকে বোঝানো হতো।
৭৮. সিরিয়া উক্ত অঞ্চলটিকে নিজেদের অংশ দাবি করে থাকে।
রোমান সাম্রাজ্য পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন সাম্রাজ্য। রোমান সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে খ্রিষ্টপরবর্তী পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বছর। রোমানদের উৎপত্তি যেহেতু ইতালির রোম নগরীতে, তাই তাদের নামকরণ করা হয়েছে রোমান।
রোমান সাম্রাজ্য ছিল বিভিন্ন নগর-রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রজাতন্ত্র। এর রাজধানী ছিল রোম। প্রথম পাঁচ শতক সাম্রাজ্যটি সিনেটর বা প্রতিনিধি পর্ষদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। খ্রিষ্টপূর্ব ২৩ সনে প্রতিনিধি পর্ষদের নির্ধারিত ডিক্টেটর অগাস্টাস (Augustus) রোম প্রজাতন্ত্রের বিলুপ্তি ঘোষণা করে রাজতন্ত্রকেন্দ্রিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এ কারণে তাকে রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট বিবেচনা করা হয়। ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দে (৮৫৭ হিজরি সনে) উসমানি সাম্রাজ্যের হাতে চূড়ান্ত পতনের পূর্ব পর্যন্ত পরবর্তী প্রায় পনেরোশ বছর রোমান সাম্রাজ্য রাজতন্ত্রের অধীনেই পরিচালিত হয়।
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকে রোমান সাম্রাজ্যের আয়তন বিশাল আকার ধারণ করায় শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তৎকালীন সম্রাট ডিয়োক্লেটিয়ান (Diocletian) সাম্রাজ্যকে পূর্ব-পশ্চিম দু-ভাগে বিভক্ত করেন। পরে সম্রাট কনস্টান্টাইন (Constantine the Great) রোম নগরীর নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতাসহ বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে সাম্রাজ্যের রাজধানী রোম হতে বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত বাইজান্টিয়ামে (Byzantium) স্থানান্তরিত করেন। ৩৩০ খ্রিষ্টাব্দে বাইজান্টিয়ামের সংস্কারকাজ সমাপ্ত হওয়ার পর তার নামানুসারে নগরীটির নতুন নামকরণ করা হয় কনস্টান্টিনোপল। এ সময় কিছুদিন সাম্রাজ্যের উভয় অংশ একই সম্রাটের অধীনে শাসিত হলেও ৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট ১ম থিয়োডোসিয়াস (Theodosius I)-এর মৃত্যুর পর রোমান সাম্রাজ্য চিরস্থায়ীভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
পশ্চিম অংশের রাজধানী হয় রোম আর পূর্ব অংশের রাজধানী হয় কনস্টান্টিনোপল। মূল অংশ বা পশ্চিম অংশটি পরিচিত হয় পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য নামে আর নবগঠিত পূর্ব অংশটি পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য নামের পাশাপাশি রাজধানীর প্রাচীন নামানুসারে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য নামেও পরিচিতি লাভ করে।
যেহেতু ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেই পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে, তাই নবীযুগেও রোমান সাম্রাজ্য বলতে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যকেই বোঝানো হতো। পবিত্র কুরআন ও হাদিস শরিফে রোমান বলে বাইজান্টাইনদের এবং 'রোম'-ভূমি দ্বারা বাইজান্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপলকেই বোঝানো হয়েছে।(৭৪)
শুরুতে রোমান সাম্রাজ্যের পরিধি ইতালিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে ইতালির বাইরেও প্রসারিত হতে থাকে। কালক্রমে সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ভূমধ্যসাগরের ওপারে উত্তর আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং আধুনিক মরক্কো ও আলজেরিয়ার উত্তর উপকূল রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ডিক্টেটর জুলিয়াস সিজার-এর আমলে (শাসনকাল: খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯-৪৪ সন) মিশরও রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে রোমানরা পরিণত হয় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিপতিতে। রোমান সাম্রাজ্য আয়তনের দিক থেকে তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায় সম্রাট ট্রাজানের (Trajan) আমলে (শাসনকাল : ৯৮-১১৭ খ্রিষ্টাব্দ)। তার আমলে রোমান সাম্রাজ্যের আয়তন ছিল প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সম্রাটের আমলে সাম্রাজ্যের আয়তনে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটলেও ইসলামের আবির্ভাবের কয়েক দশক পূর্বে ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট ১ম জাস্টিনিয়ান (Justinian I)-এর সময় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য আবারও বিশালাকার ধারণ করে। এ সময় সাম্রাজ্যের আয়তন ছিল প্রায় পয়তাল্লিশ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। ঐতিহাসিক শাম অঞ্চল, মিশর, এশিয়া মাইনর(৭৫) ও ইউরোপের বিশাল অঞ্চল তখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যেহেতু রোমান সাম্রাজ্য ও সাসানি সাম্রাজ্য ছিল তৎকালীন বিশ্বের মহাশক্তিধর দুই রাষ্ট্র, তাই রাজ্য বিস্তৃতি নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে সব সময় সংঘাত চলত এবং উভয় সাম্রাজ্যের আয়তনেও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটত। ইসলামের আবির্ভাবকালে রোমান সাম্রাজ্য ছিল পারসিক সাসানি সাম্রাজ্যের পর পৃথিবীর বৃহত্তম সাম্রাজ্য।
প্রাচীন রোমানরা ছিল প্যাগানিজম (Paganism) বা পৌত্তলিকতাবাদের অনুসারী। তারা বিভিন্ন দেবতার পূজা করত। রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম আটশ বছর প্যাগানিজমই ছিল সাম্রাজ্যের মূল ধর্ম। রোমান রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা অগাস্টাসের আমলে আল্লাহর নবী হজরত ঈসা আ.-এর আগমনের মাধ্যমে পৃথিবীতে খ্রিষ্টধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়। যেহেতু একদিকে খ্রিষ্টধর্মের একত্ববাদের শিক্ষা ছিল রোমানদের পৌত্তলিকতাবাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক, অপরদিকে ঈসা আ.-এর প্রচারিত ন্যায় ও সাম্যের শিক্ষা ভোগবাদে বিশ্বাসী রোমান রাজপরিবারের অধীনস্থ জনগণের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তাই রোমান রাজপরিবার খ্রিষ্টধর্মকে গ্রহণ করার পরিবর্তে শত্রুতা ও দমনের নীতি অবলম্বন করে এবং খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের ওপর প্রচুর নির্যাতন চালায়। তবে কালের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে খ্রিষ্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের সর্বস্তরে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। চতুর্থ শতকের গোড়ার দিকে রোমান সম্রাট কনস্টান্টাইন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। তার আমল হতেই রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিষ্টধর্মের প্রতি কঠোরতা হ্রাস করে সহনশীলতা প্রদর্শন শুরু হয়। এরপর সম্রাট ১ম থিয়োডোসিয়াসের সময় খ্রিষ্টধর্মকে রোমান সাম্রাজ্যের একমাত্র বৈধ ধর্মের মর্যাদা প্রদান করা হয়। তখন থেকে পতনের পূর্ব পর্যন্ত রোমান সাম্রাজ্য ছিল পৃথিবীর বুকে খ্রিষ্টধর্মের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও রক্ষক।
রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ ও সমৃদ্ধ অংশ ছিল শাম। বর্তমানে যদিও আধুনিক সিরিয়াও শাম নামে পরিচিত; কিন্তু প্রাচীন শাম একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলের নাম, যার বিস্তৃতি ছিল ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীর হতে মেসোপটেমিয়া (৭৬) অঞ্চল পর্যন্ত। বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন (৭৭) (ইসরাইল অধিকৃত অঞ্চলসহ পশ্চিম তীর ও গাজা) এবং আধুনিক সউদি আরবের আল-জাওফ প্রদেশ ও উত্তর সীমান্ত অঞ্চল শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়াও ১৯২১ সালে ফ্রান্স ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত আঙ্কারা চুক্তি অনুযায়ী বর্তমান দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের যেসব এলাকা তুরস্কের অন্তর্ভুক্ত হয়, সেগুলোও ঐতিহাসিক শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তুরস্কের সানজাকে ইসকানদার (The Sanjak of Alexandretta) অঞ্চলও (৭৮) শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়াও বর্তমান মিশরের সিনাই উপদ্বীপ ও বর্তমান ইরাকের মসুল অঞ্চলের কিছু অংশ শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। একদল ঐতিহাসিকের মতে পুরো সিনাই উপদ্বীপ ও সাইপ্রাসও ঐতিহাসিক শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অবশ্য খ্রিষ্টপূর্ব ৬৪ সালে রোমানরা শাম অধিকার করার বহু পূর্বে মেসোপটেমিয়া অঞ্চল শাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের অধিকারে চলে যায় এবং পরবর্তীকালে পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের স্থলাভিষিক্ত সাসানি সাম্রাজ্যের হাতে আসে। এর ফলে শামের আয়তনে পরিবর্তন ঘটে এবং শাম সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে ভূমধ্যসাগরের তীর হতে ফুরাত নদীর তীর পর্যন্ত এলাকায়। বর্তমান সউদি আরবের আল-জাওফ প্রদেশের অন্তর্গত দুমাতুল জান্দাল এলাকা ছিল তৎকালীন শামের দক্ষিণ সীমান্ত আর উত্তর সীমান্ত ছিল দক্ষিণ তুরস্কের তোরোস পবর্তমালা (The Taurus Mountains)। প্রাক-ইসলামি যুগ ও ইসলামি যুগে শাম বলে উল্লিখিত অঞ্চলকেই বোঝানো হতো।
ইসলামের আবির্ভাবের শতাধিক বছর পূর্বে গাসসানি সম্প্রদায় ইয়ামেন থেকে শামে এসে বসবাস শুরু করে। শামে আগমনের কিছুদিনের মধ্যেই তারা রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। রোমান রাজপরিবার গাসসানিদের সামরিক কুশলতা ও যুদ্ধ-মনোবল প্রত্যক্ষ করে তাদেরকে কিছুটা স্বাধিকার প্রদান করে করদরাজ্যের অধিপতি হিসেবে শামে বসবাসের অনুমতি প্রদান করে। এর ফলে গাসসানিরা রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী রাজবংশে পরিণত হয় এবং বুছরাকে রাজধানী করে শামের দক্ষিণাঞ্চল শাসন করতে থাকে। ইসলামের আবির্ভাবের সময়ও এ অঞ্চলে গাসসানি শাসন চলছিল।
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর বিভিন্ন শাসক ও রাজন্যবর্গের কাছে দাওয়াতি পত্রপ্রেরণের ধারাবাহিকতায় নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশিষ্ট সাহাবি দিহইয়াতুল কালবি রাযি. মারফত তৎকালীন রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস (Heraclius)-এর কাছেও পত্র প্রেরণ করেন। নবীজির পত্র পাঠ ও নবীজির বিস্তারিত বিবরণ জেনে হিরাক্লিয়াস ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হলেও সাম্রাজ্যের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের প্রচণ্ড বিরোধিতার কারণে তা গোপন রাখেন।
পত্রপ্রেরণের ধারাবাহিকতায় নবীজি রোমান করদরাজ্য বুছরার গাসসানি প্রশাসক শুরাহবিল বিন আমর গাসসানির কাছে পত্র প্রেরণ করলে সে পত্রবাহক সাহাবি হারিস বিন উমায়র আজদি রাযি.-কে হত্যা করে। এর প্রতিকারবিধানে নবীজি মুসলিম বাহিনীকে উক্ত অঞ্চলে প্রেরণ করেন এবং সেখানে অষ্টম হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (৬২৯ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) মুতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুতার যুদ্ধের মাধ্যমেই রোমান-মুসলিম সামরিক সংঘাতের সূচনা হয়। পরের বছর মুসলমানরা রোমানদের মোকাবিলায় তাবুকে সৈন্যসমাবেশ ঘটালেও রোমান বাহিনী অগ্রসর না হওয়ায় যুদ্ধের ঘটনা ঘটেনি। ইন্তেকালের কয়েকদিন পূর্বে নবীজি রোমান সাম্রাজ্যে অভিযান পরিচালনার জন্য উসামা বিন যায়দ রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। নবীজির ইন্তেকালের পর ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর রাযি. উসামার বাহিনীকে প্রেরণ করেন। উক্ত বাহিনী রোমান সাম্রাজ্যের শাম অঞ্চলের বালকা এলাকায় সফলতার সঙ্গে অভিযান পরিচালনা করে। এর কিছুদিন পর দ্বাদশ হিজরির রজব মাসে (সেপ্টেম্বর, ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) খলিফা আবু বকর রাযি. শাম অঞ্চলে বাহিনী প্রেরণের মাধ্যমে রোমান সাম্রাজ্যে ইসলামি বিজয়াভিযানের ধারা শুরু করেন।
টিকাঃ
৭৩. 'রোমান সাম্রাজ্য ও শাম পরিচিতি' শিরোনামের অংশটুকু অনুবাদক কর্তৃক সংযোজন করা হয়েছে।
৭৪. হিজরি সপ্তম শতাব্দীর (খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর) প্রখ্যাত কবি ও সুফিসাধক মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহ. ছিলেন বর্তমান তুরস্কের কোনিয়া অঞ্চলের অধিবাসী। তিনিও এই ব্যাপকতর অর্থের ভিত্তিতেই রোমের অধিবাসী না হয়েও 'রুমি' নামে পরিচিতি লাভ করেন।
৭৫. এশিয়া মহাদেশের একটি বিশেষ অংশের নাম এশিয়া মাইনর। ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরের মধ্যে সীমাবদ্ধ অঞ্চলটি আনাতোলিয়া নামেও পরিচিত ছিল। এ অঞ্চলটিই বর্তমানে আধুনিক তুরস্ক রাষ্ট্র। অঞ্চলটির উত্তরে কৃষ্ণসাগর, পশ্চিমে এজিয়ান সাগর, দক্ষিণে আধুনিক সিরিয়া ও ভূমধ্যসাগর। আর পূর্ব সীমান্তে আছে বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চল, যা আধুনিক রাষ্ট্রসীমায় আর্মেনিয়া ও ইরানের মধ্যে পড়েছে।
৭৬. মেসোপটেমিয়া: দজলা ও ফুরাত নদীর মধ্যবর্তী সুবিস্তৃত একটি ঐতিহাসিক অঞ্চলের নাম। আধুনিক ইরাক, সিরিয়ার উত্তরাংশ, তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল এবং ইরানের খুজেস্তান প্রদেশ মিলে ছিল তৎকালীন বিলাদুর রাফিদাইন বা মেসোপটেমিয়া (Mesopotamia)। মেসোপটেমিয়ার উত্তর অংশকে বলা হতো জাযিরাতুল ফুরাত (সংক্ষেপে জাযিরা) বা মেসোপটেমিয়া উচ্চভূমি (Upper Mesopotamia)। জাযিরার পরিচিতি সামনে যথাস্থানে উল্লেখ করা হবে।
৭৭. ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন অঞ্চল মূলত শাম অঞ্চলেরই একটি অংশ। তবে ঐতিহাসিক পটভূমিসহ বিভিন্ন গুরুত্ব বিবেচনায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকায় অঞ্চলটি আলাদাভাবেও আলোচিত হয়। অতীতে ফিলিস্তিন শব্দটি শাম অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের জন্য ব্যবহৃত হতো। শামের এ অংশটি এশিয়া মহাদেশের পশ্চিম অংশে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। সাধারণত ফিলিস্তিন বলে পশ্চিমের ভূমধ্যসাগর হতে পূর্বের মৃত সাগর ও জর্ডান নদীর মধ্যবর্তী ভূখণ্ডকে বোঝানো হতো।
৭৮. সিরিয়া উক্ত অঞ্চলটিকে নিজেদের অংশ দাবি করে থাকে।
📄 বিজয়াভিযানের সূচনা
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে—খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. তার ইরাক অভিযানে শেষ যুদ্ধটি করেছিলেন দ্বাদশ হিজরির জিলকদ মাসে। এর অল্প কিছুদিন পূর্বে খলিফা আবু বকর রাযি. রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত শাম অঞ্চলে ইসলামি বিজয়াভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। নিঃসন্দেহে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর রাযি.-এর গৃহীত এই সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত কার্যকরী ও ফলপ্রসূ। এর মাধ্যমে পারসিক-রোমান উভয় পক্ষের অন্তরে সৃষ্টি হয়েছিল প্রচণ্ড প্রভাব-ভীতি। আর প্রতিপক্ষের অন্তরে ভীতি সঞ্চার মুসলমানদের যুদ্ধজয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক একটি কার্যকারণ। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
أُعْطِيْتُ خَمْسًا لَمْ يُعْطَهُنَّ أَحَدٌ قَبْلِي : نُصِرْتُ بِالرُّعْبِ مَسِيْرَةً شَهْرٍ "
আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে অন্য কাউকে প্রদান করা হয়নি। এক. আমাকে এমন প্রভাব-ভীতি দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে, যা এক মাসের দূরত্বেও প্রতিফলিত হয়। (৭৯)
খলিফা আবু বকর রাযি. দ্বাদশ হিজরি সনের রজব মাসে শাম অভিমুখে পৃথক চারটি বাহিনী প্রেরণ করেন।
১. ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী দামেশকের উদ্দেশে প্রেরিত হয়।
২. শুরাহবিল বিন হাসানা রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী জর্ডানের উদ্দেশে প্রেরিত হয়।
৩. আবু উবায়দা ইবনুল জারাহ রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী হিমসের উদ্দেশে প্রেরিত হয়।
৪. আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী ফিলিস্তিনের উদ্দেশে প্রেরিত হয়।
টিকাঃ
৭৯. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৩৫।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে—খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. তার ইরাক অভিযানে শেষ যুদ্ধটি করেছিলেন দ্বাদশ হিজরির জিলকদ মাসে। এর অল্প কিছুদিন পূর্বে খলিফা আবু বকর রাযি. রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত শাম অঞ্চলে ইসলামি বিজয়াভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। নিঃসন্দেহে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর রাযি.-এর গৃহীত এই সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত কার্যকরী ও ফলপ্রসূ। এর মাধ্যমে পারসিক-রোমান উভয় পক্ষের অন্তরে সৃষ্টি হয়েছিল প্রচণ্ড প্রভাব-ভীতি। আর প্রতিপক্ষের অন্তরে ভীতি সঞ্চার মুসলমানদের যুদ্ধজয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক একটি কার্যকারণ। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন—
أُعْطِيْتُ خَمْسًا لَمْ يُعْطَهُنَّ أَحَدٌ قَبْلِي : نُصِرْتُ بِالرُّعْبِ مَسِيْرَةً شَهْرٍ "
আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় দান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে অন্য কাউকে প্রদান করা হয়নি। এক. আমাকে এমন প্রভাব-ভীতি দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে, যা এক মাসের দূরত্বেও প্রতিফলিত হয়। (৭৯)
খলিফা আবু বকর রাযি. দ্বাদশ হিজরি সনের রজব মাসে শাম অভিমুখে পৃথক চারটি বাহিনী প্রেরণ করেন।
১. ইয়াযিদ বিন আবু সুফিয়ান রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী দামেশকের উদ্দেশে প্রেরিত হয়।
২. শুরাহবিল বিন হাসানা রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী জর্ডানের উদ্দেশে প্রেরিত হয়।
৩. আবু উবায়দা ইবনুল জারাহ রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী হিমসের উদ্দেশে প্রেরিত হয়।
৪. আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী ফিলিস্তিনের উদ্দেশে প্রেরিত হয়।
টিকাঃ
৭৯. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৩৫।
📄 দ্রষ্টব্য: সাহাবায়ে কেরামের সৈনিকসুলভ মনোভাব
বিশিষ্ট সাহাবি আমর ইবনুল আস রাযি. এ সময় বনু কুযাআর জনপদে সদকা উসুলের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। খলিফা আবু বকর রাযি. তাকে শাম-অভিযানে প্রেরণের মনস্থ করে নিম্নোক্ত বার্তা প্রেরণ করেন—
আল্লাহর রাসুল আপনাকে যে দায়িত্ব (অর্থাৎ সদকা উসুলের দায়িত্ব) প্রদান করতে চেয়েছিলেন এবং আপন ইচ্ছার কথা পুনরাবৃত্তিও করেছিলেন, আমি আপনাকে সে দায়িত্বই প্রদান করেছি। তবে (হে আবু আবদুল্লাহ,) এখন আমি আপনাকে এমন একটি কাজে নিয়োজিত করতে চাচ্ছি, যা আপনার জন্য উভয় জগতে অধিক কল্যাণকর হবে। অবশ্য আপনি এখন যে দায়িত্বে আছেন, তা আপনার কাছে বেশি ভালো মনে হলে সেখানেও থাকতে পারেন।
উত্তরে আমর ইবনুল আস রাযি. লিখে পাঠান—
আমি ইসলামের একটি তির আর আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ইসলামের তিরসমূহ নিক্ষেপ ও সংগ্রহের দায়িত্বশীল। সুতরাং আপনার দৃষ্টিতে যেখানে তির নিক্ষেপ করা বেশি জরুরি ও বেশি কল্যাণকর এবং পরিস্থিতি যেখানে বেশি নাজুক ও গুরুতর, আপনি ‘আমি তির’কে সেখানেই নিক্ষেপ করুন।
বিশিষ্ট সাহাবি আমর ইবনুল আস রাযি. এ সময় বনু কুযাআর জনপদে সদকা উসুলের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। খলিফা আবু বকর রাযি. তাকে শাম-অভিযানে প্রেরণের মনস্থ করে নিম্নোক্ত বার্তা প্রেরণ করেন—
আল্লাহর রাসুল আপনাকে যে দায়িত্ব (অর্থাৎ সদকা উসুলের দায়িত্ব) প্রদান করতে চেয়েছিলেন এবং আপন ইচ্ছার কথা পুনরাবৃত্তিও করেছিলেন, আমি আপনাকে সে দায়িত্বই প্রদান করেছি। তবে (হে আবু আবদুল্লাহ,) এখন আমি আপনাকে এমন একটি কাজে নিয়োজিত করতে চাচ্ছি, যা আপনার জন্য উভয় জগতে অধিক কল্যাণকর হবে। অবশ্য আপনি এখন যে দায়িত্বে আছেন, তা আপনার কাছে বেশি ভালো মনে হলে সেখানেও থাকতে পারেন।
উত্তরে আমর ইবনুল আস রাযি. লিখে পাঠান—
আমি ইসলামের একটি তির আর আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ইসলামের তিরসমূহ নিক্ষেপ ও সংগ্রহের দায়িত্বশীল। সুতরাং আপনার দৃষ্টিতে যেখানে তির নিক্ষেপ করা বেশি জরুরি ও বেশি কল্যাণকর এবং পরিস্থিতি যেখানে বেশি নাজুক ও গুরুতর, আপনি ‘আমি তির’কে সেখানেই নিক্ষেপ করুন।
📄 শামে প্রাথমিক অভিযান
মুসলিম বাহিনী প্রথমে ফিলিস্তিন অঞ্চলের 'আরাবা' নামক এলাকায় ছয়জন রোমান সেনাপতির নেতৃত্বাধীন তিন হাজার সদস্যবিশিষ্ট একটি বাহিনীর মুখোমুখি হয়। মুসলমানরা তাদেরকে পরাজিত করে এবং একজন সেনাপতিকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। পরাজিত রোমান সৈন্যরা দাছিনা নামক স্থানে পুনরায় সমবেত হলে মুসলিম বাহিনী সেখানেও তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে।
পরপর দুটি যুদ্ধে রোমান বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং মুসলিম বাহিনীর দফারফার জন্য ব্যাপক সৈন্যসমাবেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তখন খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি. খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. ও তার বাহিনীর একটি অংশকে ইরাকফ্রন্ট থেকে সরিয়ে শাম অঞ্চলে প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ! খালিদের মাধ্যমে আমি রোমানদেরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা ভুলিয়ে দেবো।'
এটি ত্রয়োদশ হিজরি সনের সফর মাসের (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের) ঘটনা।
খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর নির্দেশ পাওয়ামাত্র খালিদ রাযি. নয় হাজার সৈন্য নিয়ে শাম অভিমুখে রওনা হয়ে যান। দ্রুততম সময়ে শামে পৌঁছার জন্য তিনি সামাওয়া মরুভূমি নামে পরিচিত শামের মরু অঞ্চল পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পথের দুর্গমতা ও পানিস্বল্পতার কারণে খালিদের বাহিনীর পূর্বে কোনো বাহিনী এই পথ পাড়ি দেয়নি। কিন্তু শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শামে গমনের জন্য খালিদ এই দুর্গম পথটিই বেছে নেন। তিনি চাচ্ছিলেন দ্রুততম সময়ে শত্রুপক্ষের কাছে উপস্থিত হয়ে পেছন থেকে অতর্কিতে তাদের ওপর হামলা করতে।
সুদীর্ঘ ও সুকঠিন পথ পাড়ি দিয়ে খালিদ শামে পৌঁছান এবং ইতিপূর্বে খলিফা আবু বকর রাযি. কর্তৃক প্রেরিত চারটি বাহিনীর সেনাপতিদের সঙ্গে মিলিত হন। এ সময় খালিদ অনুভব করেন যে, সবগুলো বাহিনীকে এক নেতৃত্বের অধীনে নিয়ে এসে একটি বৃহৎ একক বাহিনী গঠন করা প্রয়োজন। কিন্তু এই সম্মিলিত বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্ধারণে সম্ভাব্য-সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে তিনি আশঙ্কা বোধ করছিলেন। অবশেষে খালিদ এমন চমৎকার একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেন, যার ফলে পূর্বে প্রেরিত চার বাহিনীর সেনাপতিগণসহ সকলে সন্তুষ্টচিত্তে একজন সর্বাধিনায়ককে মেনে নেয়। তিনি সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আসুন, আমরা বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব পালাক্রমে গ্রহণ করি। আজ একজনের দায়িত্ব থাকবে, আগামীকাল আরেকজনের, আগামী পরশু তৃতীয়জনের। এভাবে সকলেই এক-একদিন নেতৃত্বদান করবে। আর আজ আমাকেই দায়িত্ব দিন।
সকলে সেদিনের জন্য খালিদকেই সর্বাধিনায়ক হিসেবে মেনে নেয়। এরপর সকলেই উপলব্ধি করে যে, এই বিরাট বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন, নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ আর খালিদই এই দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। তখন সকলে খালিদকেই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে মেনে নেয়। (৮০) খালিদ পুরো বাহিনীকে এক হাজার সৈন্যবিশিষ্ট অনেকগুলো অংশে বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি অংশের প্রধান হিসেবে মুসলিম বাহিনীর শ্রেষ্ঠতম বীর-বাহাদুরদের নির্ধারণ করেন। এই নতুন বিন্যাসের ফলে মুসলিম বাহিনীকে তার স্বাভাবিক আকৃতির চেয়ে যথেষ্ট বড় মনে হচ্ছিল।
টিকাঃ
৮০. অবশ্য কোনো কোনো বর্ণনামতে স্বয়ং খliফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি.-ই খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে শামের মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করেছিলেন। দেখুন-ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৬।
মুসলিম বাহিনী প্রথমে ফিলিস্তিন অঞ্চলের 'আরাবা' নামক এলাকায় ছয়জন রোমান সেনাপতির নেতৃত্বাধীন তিন হাজার সদস্যবিশিষ্ট একটি বাহিনীর মুখোমুখি হয়। মুসলমানরা তাদেরকে পরাজিত করে এবং একজন সেনাপতিকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। পরাজিত রোমান সৈন্যরা দাছিনা নামক স্থানে পুনরায় সমবেত হলে মুসলিম বাহিনী সেখানেও তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে।
পরপর দুটি যুদ্ধে রোমান বাহিনীর পরাজয়ের সংবাদ পেয়ে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন এবং মুসলিম বাহিনীর দফারফার জন্য ব্যাপক সৈন্যসমাবেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তখন খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি. খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. ও তার বাহিনীর একটি অংশকে ইরাকফ্রন্ট থেকে সরিয়ে শাম অঞ্চলে প্রেরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ! খালিদের মাধ্যমে আমি রোমানদেরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা ভুলিয়ে দেবো।'
এটি ত্রয়োদশ হিজরি সনের সফর মাসের (৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসের) ঘটনা।
খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর নির্দেশ পাওয়ামাত্র খালিদ রাযি. নয় হাজার সৈন্য নিয়ে শাম অভিমুখে রওনা হয়ে যান। দ্রুততম সময়ে শামে পৌঁছার জন্য তিনি সামাওয়া মরুভূমি নামে পরিচিত শামের মরু অঞ্চল পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পথের দুর্গমতা ও পানিস্বল্পতার কারণে খালিদের বাহিনীর পূর্বে কোনো বাহিনী এই পথ পাড়ি দেয়নি। কিন্তু শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও শামে গমনের জন্য খালিদ এই দুর্গম পথটিই বেছে নেন। তিনি চাচ্ছিলেন দ্রুততম সময়ে শত্রুপক্ষের কাছে উপস্থিত হয়ে পেছন থেকে অতর্কিতে তাদের ওপর হামলা করতে।
সুদীর্ঘ ও সুকঠিন পথ পাড়ি দিয়ে খালিদ শামে পৌঁছান এবং ইতিপূর্বে খলিফা আবু বকর রাযি. কর্তৃক প্রেরিত চারটি বাহিনীর সেনাপতিদের সঙ্গে মিলিত হন। এ সময় খালিদ অনুভব করেন যে, সবগুলো বাহিনীকে এক নেতৃত্বের অধীনে নিয়ে এসে একটি বৃহৎ একক বাহিনী গঠন করা প্রয়োজন। কিন্তু এই সম্মিলিত বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্ধারণে সম্ভাব্য-সৃষ্ট সমস্যা নিয়ে তিনি আশঙ্কা বোধ করছিলেন। অবশেষে খালিদ এমন চমৎকার একটি পদ্ধতি অবলম্বন করেন, যার ফলে পূর্বে প্রেরিত চার বাহিনীর সেনাপতিগণসহ সকলে সন্তুষ্টচিত্তে একজন সর্বাধিনায়ককে মেনে নেয়। তিনি সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আসুন, আমরা বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব পালাক্রমে গ্রহণ করি। আজ একজনের দায়িত্ব থাকবে, আগামীকাল আরেকজনের, আগামী পরশু তৃতীয়জনের। এভাবে সকলেই এক-একদিন নেতৃত্বদান করবে। আর আজ আমাকেই দায়িত্ব দিন।
সকলে সেদিনের জন্য খালিদকেই সর্বাধিনায়ক হিসেবে মেনে নেয়। এরপর সকলেই উপলব্ধি করে যে, এই বিরাট বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন, নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ আর খালিদই এই দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি। তখন সকলে খালিদকেই বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে মেনে নেয়। (৮০) খালিদ পুরো বাহিনীকে এক হাজার সৈন্যবিশিষ্ট অনেকগুলো অংশে বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি অংশের প্রধান হিসেবে মুসলিম বাহিনীর শ্রেষ্ঠতম বীর-বাহাদুরদের নির্ধারণ করেন। এই নতুন বিন্যাসের ফলে মুসলিম বাহিনীকে তার স্বাভাবিক আকৃতির চেয়ে যথেষ্ট বড় মনে হচ্ছিল।
টিকাঃ
৮০. অবশ্য কোনো কোনো বর্ণনামতে স্বয়ং খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি.-ই খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে শামের মুসলিম বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নির্বাচিত করেছিলেন। দেখুন-ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৬।