📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 পারস্য সাম্রাজ্য ও ইরাক পরিচিতি

📄 পারস্য সাম্রাজ্য ও ইরাক পরিচিতি


পারস্য ছিল তৎকালীন বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র। কালগত বিবেচনায় পারস্য সাম্রাজ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম সাম্রাজ্যগুলোর একটি। মাঝে গ্রিক বিজয়ের সময়কালটুকু বাদ দিয়ে এর ব্যাপ্তি খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী হতে শুরু করে খ্রিষ্টপরবর্তী সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত। অর্থাৎ সুদীর্ঘ প্রায় তেরো শতাব্দী পারস্য সাম্রাজ্য সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সামরিক শক্তিবলে পৃথিবীজুড়ে টিকে ছিল।
কালের পরিক্রমায় ২ ২৪ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যে পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের (The Parthian Empire) পতন ঘটে এবং সাসানি সাম্রাজ্য (The Sasanian Empire) প্রতিষ্ঠিত হয়। সাসানি সাম্রাজ্যের অধিপতিকে কিসরা বলা হতো। সাসানি রাজবংশের প্রথম কিসরা ছিলেন ১ম আর্দশির (Ardashir I)। ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান রাযি.-এর খিলাফত আমলে ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে (৩১ হিজরি সনে) শেষ সাসানি সম্রাট ৩য় ইয়াযদিগার্দ (Yazdegerd III)-এর মৃত্যুর মাধ্যমে পারস্যে চূড়ান্তভাবে সাসানি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। অবশ্য এর বছরদশেক পূর্বে দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযি.-এর খিলাফত আমলেই পুরো পারস্য অঞ্চলে মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
খ্রিষ্টপরবর্তী ষষ্ঠ শতাব্দীতে পারস্যের সাসানি সাম্রাজ্য আপন সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত হয়। এ সময় সম্রাট নওশেরওয়া বা প্রথম খসরু (Khosrow I) আপন কীর্তি ও যোগ্যতাবলে পারস্য সাম্রাজ্যকে খ্যাতি ও বিস্তৃতির শীর্ষ স্তরে উন্নীত করেন। তার শাসনামলেই বর্তমান সিরিয়া, ইয়ামেন ও মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের নয় বছর পর ৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম খসরু মৃত্যুবরণ করেন।
সাসানি শাসনামলে পারস্য সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল পশ্চিমে গ্রিসের উত্তরাংশ থেকে শুরু করে পূর্বে পাঞ্জাব পর্যন্ত। আরব উপদ্বীপের উত্তর সীমান্তের অংশবিশেষ, বর্তমান ইরান, ইরাক, আর্মেনিয়া ও আফগানিস্তানের বৃহদংশ, তুরস্কের পূর্ব অংশ এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশ পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অবশ্য আধুনিক যুগের ঐতিহাসিক ড. হুসাইন মুনিস (মৃত্যু: ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ) লিখেছেন, 'সাসানি আমলের পারস্য সাম্রাজ্যের আয়তন বর্ণনায় অতিরঞ্জন পাওয়া যায়। ইসলামপূর্ব পারস্য সাম্রাজ্য ইতিহাসের কোনো যুগেই সুনির্দিষ্ট সীমানার অধিকারী ছিল না। বরং শক্তিশালী শাসকের আমলে সাম্রাজ্যের পরিধি বৃদ্ধি পেত আর দুর্বল শাসকের আমলে হ্রাস পেত।'
তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল ইরাক। ইরাকও পৃথিবীর প্রাচীনতম জনপদসমূহের একটি। পারস্যে সাসানি রাজপরিবারের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক পূর্বে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ সনে আখমিনি শাসক কুরুশ (Cyrus the Great)-এর আমলে ইরাক পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। কালের পরিক্রমায় সাসানিরা যখন পারস্যের অধিকারী হয়, তখন ইরাকও তাদের অধিকারে আসে। সাসানি শাসনামলেই ইরাকে জরথুস্ত্রবাদ (Zoroastrianism), ইহুদিবাদ (Judaism) ও সবশেষে খ্রিষ্টধর্মের (Christianity) প্রসার ঘটে। অবশ্য সাসানি রাজপরিবার ও পারস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ জরথুস্ত্রবাদে বিশ্বাসী ছিল।
সাসানি আমলেই পারস্যের অভ্যন্তরে বিভিন্ন করদরাজ্যের আবির্ভাব ঘটে। করদরাজ্যগুলো সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা ভোগ না করলেও সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অধিক স্বাধীনতা ভোগ করত। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে ইরাকের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলকেন্দ্রিক আরব লাখমি রাজ্যের কথা। আরবরা সেখানে পারস্য কিসরার সামন্ত হিসেবে নিজেদের অঞ্চল শাসন করত। ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে (১২ হিজরি সনে) মুসলমানদের হাতে হিরা নগরীর পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় তিনশ বছর ইরাকে লাখমি রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিল।
সম্পদ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিবেচনায় ইরাকভূমি ছিল সাসানি রাজপরিবারের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। বর্তমান ইরাকের দুই বিখ্যাত নগরী কুফা ও বসরার তখন অস্তিত্বই ছিল না। বাগদাদ ছিল দজলা (The Tigris) তীরের ছোট একটি বসতি। তৎকালীন ইরাকের বিখ্যাত দুই নগরী ছিল মাদায়েন ও হিরা। বর্তমানে নগরীদুটির অস্তিত্বই নেই। মাদায়েন ছিল সাসানি আমলে পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী। দজলা নদীর উভয় তীর ঘেঁষে এর বিস্তৃতি ছিল। (৬৩) অপরদিকে হিরা নগরীর অবস্থান ছিল ফুরাত (The Euphrates) নদীর তীরে। হিরা ছিল লাখমি করদরাজ্যের রাজধানী। ইরাকের উবুল্লা (৬৪) ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের প্রধান বন্দর। ভারত ও চীনসহ প্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখানেই নোঙর করত।
পারস্য সাম্রাজ্যভুক্ত সাওয়াদ (৬৫) অঞ্চল ও আরব উপদ্বীপে বনু তাগলিব, বnu বকর, বনু শায়বান, বনু রাবিআ, বনু তাই-সহ বিভিন্ন আরব গোত্র বসবাস করত। এসব গোত্রের মধ্যে বনু তাগলিবসহ কিছু গোত্র ছিল খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির পর নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবের বাইরের বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অধিপতি ও বিভিন্ন করদরাজ্যের রাজন্যবর্গের কাছে ইসলামের দাওয়াত সংবলিত পত্র প্রেরণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় নবীজি সপ্তম হিজরি সনে বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ বিন হুযাফা রাযি.-এর মাধ্যমে তৎকালীন পারস্য অধিপতি পারভেজ বা দ্বিতীয় খসরুর কাছে পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু পত্রপাঠ শুরু করতেই পারভেজ নবীজির পত্র ছিঁড়ে ফেলেন এবং ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে ওঠেন, 'আমার এক তুচ্ছ প্রজা তার পত্রে আমার পূর্বে তার নাম লিখেছে!' নবীজি এ সংবাদ পাওয়ার পর বদদোয়া করেন, 'আল্লাহ তার রাজত্বকেও ছিন্নভিন্ন করে দিন।' এর অল্প কদিন পরই পারভেজ তার পুত্র শিরওয়াইহ-এর হাতে নিহত হন।
নবীজির জীবদ্দশায় পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে মুসলমানদের কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। পারস্যের সঙ্গে মুসলমানদের সশস্ত্র লড়াইয়ের সূত্রপাত হয় মুসান্না বিন হারিসা রহ। (৬৬)-এর মাধ্যমে। মুসান্না ছিলেন আরব উপদ্বীপের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল ও ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসকারী বনু শায়বান গোত্রের অন্যতম সর্দার ও দুঃসাহসী বীর সেনানী। ইয়ামামার যুদ্ধের পরই মুসান্না তার স্বগোত্রীয় অনুসারীদের নিয়ে উবুল্লার বিভিন্ন অংশে ঝটিকা হামলা শুরু করেন। প্রাথমিক সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ১১ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে) মদিনায় খলিফা আবু বকর রাযি.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ইরাকে পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নিয়মতান্ত্রিক অনুমতি প্রার্থনা করেন। খলিফা তাকে বনু বকরের মুসলমানদের সেনাপতি নির্ধারণ করে অভিযান পরিচালনার অনুমতিপত্র প্রদান করেন। মুসান্না ফিরে এসে তার গোত্রের আরও কিছু লোককে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত করতে সক্ষম হন এবং প্রায় দুই হাজার সদস্যের একটি বাহিনী তৈরি করে পারস্যের অভ্যন্তরে হামলা অব্যাহত রাখেন। তিনি তার বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন জনপদে হামলা চালিয়ে দ্রুত মরুভূমিতে ফিরে আসতেন। মুসান্নার সাক্ষাতের পরই মূলত খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি.-এর অন্তরে পারস্য অভিযানের চিন্তা জাগ্রত হয়। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে খলিফা গোটা পারস্য সাম্রাজ্য জয়ের পরিকল্পনা করার পরিবর্তে প্রথমে পারস্য সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র এবং আরব উপদ্বীপের তুলনামূলক নিকটবর্তী অঞ্চল ইরাকে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন।

টিকাঃ
৬২. ইসলামের প্রাথমিক যুগে সমকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল পারস্য (সাসানি) সাম্রাজ্য ও রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্য। যেহেতু ইতিহাসের পরবর্তী ধারাবর্ণনায় অনিবার্যভাবেই এই দুই সাম্রাজ্যের আলোচনা বারবার আসবে, তাই এখানে পারস্য সাম্রাজ্যের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হচ্ছে। সামনে যথাস্থানে রোমান সাম্রাজ্যের পরিচিতিও তুলে ধরা হবে। 'পারস্য সাম্রাজ্য ও ইরাক পরিচিতি' অংশটুকু অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত।
৬৩. মাদায়েন: বর্তমান বাগদাদ থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সালমান পাক (Salman Pak) নামক এলাকায় ছিল তৎকালীন মাদায়েন বা টেসিফোন নগরী।
৬৪. উবুল্লা: আধুনিক বসরার যে অংশটি 'আশার' নামে পরিচিত, সেখানেই ছিল উবুল্লার অবস্থান। ইবনে সিরিন রহ.-এর মতে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত মুসা আ. ও খিযির আ.-এর জনপদবাসীর কাছে খাবার প্রার্থনার ঘটনা উবুল্লাতেই সংঘটিত হয়।
৬৫. সাওয়াদ : ফুরাতের পূর্ব তীর ও দজলার পশ্চিম তীরের মধ্যে অবস্থিত সুবিস্তৃত সবুজ-শ্যামল গ্রামীণ ভূমিকে সাওয়াদ বলা হতো।
৬৬. মুসান্না বিন হারিসা শায়বানি নবম মতান্তরে দশম হিজরি সনে ইসলামগ্রহণ করেন। ইবনে হিব্বান রহ. তাকে সাহাবি গণ্য করলেও প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মতানুসারে তিনি ইসলামগ্রহণ করার পর নবীজির সাক্ষাৎ-সৌভাগ্য লাভ করেননি। যদিও তিনি আপন কওমের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন; কিন্তু তখন তিনি ইসলামগ্রহণ করেননি। পরবর্তী সময়ে তিনি মুসলমান হওয়ার পর মদিনায় আগমন করার পূর্বেই নবীজি ইন্তেকাল করেন।

পারস্য ছিল তৎকালীন বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্র। কালগত বিবেচনায় পারস্য সাম্রাজ্য পৃথিবীর প্রাচীনতম সাম্রাজ্যগুলোর একটি। মাঝে গ্রিক বিজয়ের সময়কালটুকু বাদ দিয়ে এর ব্যাপ্তি খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী হতে শুরু করে খ্রিষ্টপরবর্তী সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত। অর্থাৎ সুদীর্ঘ প্রায় তেরো শতাব্দী পারস্য সাম্রাজ্য সভ্যতা, সংস্কৃতি ও সামরিক শক্তিবলে পৃথিবীজুড়ে টিকে ছিল।
কালের পরিক্রমায় ২ ২৪ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যে পার্সিয়ান সাম্রাজ্যের (The Parthian Empire) পতন ঘটে এবং সাসানি সাম্রাজ্য (The Sasanian Empire) প্রতিষ্ঠিত হয়। সাসানি সাম্রাজ্যের অধিপতিকে কিসরা বলা হতো। সাসানি রাজবংশের প্রথম কিসরা ছিলেন ১ম আর্দশির (Ardashir I)। ইসলামের তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান রাযি.-এর খিলাফত আমলে ৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে (৩১ হিজরি সনে) শেষ সাসানি সম্রাট ৩য় ইয়াযদিগার্দ (Yazdegerd III)-এর মৃত্যুর মাধ্যমে পারস্যে চূড়ান্তভাবে সাসানি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। অবশ্য এর বছরদশেক পূর্বে দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযি.-এর খিলাফত আমলেই পুরো পারস্য অঞ্চলে মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
খ্রিষ্টপরবর্তী ষষ্ঠ শতাব্দীতে পারস্যের সাসানি সাম্রাজ্য আপন সমৃদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত হয়। এ সময় সম্রাট নওশেরওয়া বা প্রথম খসরু (Khosrow I) আপন কীর্তি ও যোগ্যতাবলে পারস্য সাম্রাজ্যকে খ্যাতি ও বিস্তৃতির শীর্ষ স্তরে উন্নীত করেন। তার শাসনামলেই বর্তমান সিরিয়া, ইয়ামেন ও মধ্য এশিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের নয় বছর পর ৫৭৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম খসরু মৃত্যুবরণ করেন।
সাসানি শাসনামলে পারস্য সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল পশ্চিমে গ্রিসের উত্তরাংশ থেকে শুরু করে পূর্বে পাঞ্জাব পর্যন্ত। আরব উপদ্বীপের উত্তর সীমান্তের অংশবিশেষ, বর্তমান ইরান, ইরাক, আর্মেনিয়া ও আফগানিস্তানের বৃহদংশ, তুরস্কের পূর্ব অংশ এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশ পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অবশ্য আধুনিক যুগের ঐতিহাসিক ড. হুসাইন মুনিস (মৃত্যু: ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ) লিখেছেন, 'সাসানি আমলের পারস্য সাম্রাজ্যের আয়তন বর্ণনায় অতিরঞ্জন পাওয়া যায়। ইসলামপূর্ব পারস্য সাম্রাজ্য ইতিহাসের কোনো যুগেই সুনির্দিষ্ট সীমানার অধিকারী ছিল না। বরং শক্তিশালী শাসকের আমলে সাম্রাজ্যের পরিধি বৃদ্ধি পেত আর দুর্বল শাসকের আমলে হ্রাস পেত।'
তৎকালীন পারস্য সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল ইরাক। ইরাকও পৃথিবীর প্রাচীনতম জনপদসমূহের একটি। পারস্যে সাসানি রাজপরিবারের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক পূর্বে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩৯ সনে আখমিনি শাসক কুরুশ (Cyrus the Great)-এর আমলে ইরাক পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। কালের পরিক্রমায় সাসানিরা যখন পারস্যের অধিকারী হয়, তখন ইরাকও তাদের অধিকারে আসে। সাসানি শাসনামলেই ইরাকে জরথুস্ত্রবাদ (Zoroastrianism), ইহুদিবাদ (Judaism) ও সবশেষে খ্রিষ্টধর্মের (Christianity) প্রসার ঘটে। অবশ্য সাসানি রাজপরিবার ও পারস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ জরথুস্ত্রবাদে বিশ্বাসী ছিল।
সাসানি আমলেই পারস্যের অভ্যন্তরে বিভিন্ন করদরাজ্যের আবির্ভাব ঘটে। করদরাজ্যগুলো সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা ভোগ না করলেও সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অধিক স্বাধীনতা ভোগ করত। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে ইরাকের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলকেন্দ্রিক আরব লাখমি রাজ্যের কথা। আরবরা সেখানে পারস্য কিসরার সামন্ত হিসেবে নিজেদের অঞ্চল শাসন করত। ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে (১২ হিজরি সনে) মুসলমানদের হাতে হিরা নগরীর পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় তিনশ বছর ইরাকে লাখমি রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিল।
সম্পদ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিবেচনায় ইরাকভূমি ছিল সাসানি রাজপরিবারের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। বর্তমান ইরাকের দুই বিখ্যাত নগরী কুফা ও বসরার তখন অস্তিত্বই ছিল না। বাগদাদ ছিল দজলা (The Tigris) তীরের ছোট একটি বসতি। তৎকালীন ইরাকের বিখ্যাত দুই নগরী ছিল মাদায়েন ও হিরা। বর্তমানে নগরীদুটির অস্তিত্বই নেই। মাদায়েন ছিল সাসানি আমলে পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী। দজলা নদীর উভয় তীর ঘেঁষে এর বিস্তৃতি ছিল। (৬৩) অপরদিকে হিরা নগরীর অবস্থান ছিল ফুরাত (The Euphrates) নদীর তীরে। হিরা ছিল লাখমি করদরাজ্যের রাজধানী। ইরাকের উবুল্লা (৬৪) ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের প্রধান বন্দর। ভারত ও চীনসহ প্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত বাণিজ্যিক জাহাজগুলো এখানেই নোঙর করত।
পারস্য সাম্রাজ্যভুক্ত সাওয়াদ (৬৫) অঞ্চল ও আরব উপদ্বীপে বনু তাগলিব, বnu বকর, বনু শায়বান, বনু রাবিআ, বনু তাই-সহ বিভিন্ন আরব গোত্র বসবাস করত। এসব গোত্রের মধ্যে বনু তাগলিবসহ কিছু গোত্র ছিল খ্রিষ্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির পর নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবের বাইরের বিভিন্ন সাম্রাজ্যের অধিপতি ও বিভিন্ন করদরাজ্যের রাজন্যবর্গের কাছে ইসলামের দাওয়াত সংবলিত পত্র প্রেরণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় নবীজি সপ্তম হিজরি সনে বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ বিন হুযাফা রাযি.-এর মাধ্যমে তৎকালীন পারস্য অধিপতি পারভেজ বা দ্বিতীয় খসরুর কাছে পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু পত্রপাঠ শুরু করতেই পারভেজ নবীজির পত্র ছিঁড়ে ফেলেন এবং ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলে ওঠেন, 'আমার এক তুচ্ছ প্রজা তার পত্রে আমার পূর্বে তার নাম লিখেছে!' নবীজি এ সংবাদ পাওয়ার পর বদদোয়া করেন, 'আল্লাহ তার রাজত্বকেও ছিন্নভিন্ন করে দিন।' এর অল্প কদিন পরই পারভেজ তার পুত্র শিরওয়াইহ-এর হাতে নিহত হন।
নবীজির জীবদ্দশায় পারস্য সাম্রাজ্যের সঙ্গে মুসলমানদের কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। পারস্যের সঙ্গে মুসলমানদের সশস্ত্র লড়াইয়ের সূত্রপাত হয় মুসান্না বিন হারিসা রহ। (৬৬)-এর মাধ্যমে। মুসান্না ছিলেন আরব উপদ্বীপের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল ও ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে বসবাসকারী বনু শায়বান গোত্রের অন্যতম সর্দার ও দুঃসাহসী বীর সেনানী। ইয়ামামার যুদ্ধের পরই মুসান্না তার স্বগোত্রীয় অনুসারীদের নিয়ে উবুল্লার বিভিন্ন অংশে ঝটিকা হামলা শুরু করেন। প্রাথমিক সফলতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ১১ হিজরি সনের জিলকদ মাসে (৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে) মদিনায় খলিফা আবু বকর রাযি.-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ইরাকে পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নিয়মতান্ত্রিক অনুমতি প্রার্থনা করেন। খলিফা তাকে বনু বকরের মুসলমানদের সেনাপতি নির্ধারণ করে অভিযান পরিচালনার অনুমতিপত্র প্রদান করেন। মুসান্না ফিরে এসে তার গোত্রের আরও কিছু লোককে ইসলামের পতাকাতলে সমবেত করতে সক্ষম হন এবং প্রায় দুই হাজার সদস্যের একটি বাহিনী তৈরি করে পারস্যের অভ্যন্তরে হামলা অব্যাহত রাখেন। তিনি তার বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন জনপদে হামলা চালিয়ে দ্রুত মরুভূমিতে ফিরে আসতেন। মুসান্নার সাক্ষাতের পরই মূলত খliফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি.-এর অন্তরে পারস্য অভিযানের চিন্তা জাগ্রত হয়। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে খলিফা গোটা পারস্য সাম্রাজ্য জয়ের পরিকল্পনা করার পরিবর্তে প্রথমে পারস্য সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র এবং আরব উপদ্বীপের তুলনামূলক নিকটবর্তী অঞ্চল ইরাকে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন।

টিকাঃ
৬২. ইসলামের প্রাথমিক যুগে সমকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য ছিল পারস্য (সাসানি) সাম্রাজ্য ও রোমান (বাইজান্টাইন) সাম্রাজ্য। যেহেতু ইতিহাসের পরবর্তী ধারাবর্ণনায় অনিবার্যভাবেই এই দুই সাম্রাজ্যের আলোচনা বারবার আসবে, তাই এখানে পারস্য সাম্রাজ্যের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হচ্ছে। সামনে যথাস্থানে রোমান সাম্রাজ্যের পরিচিতিও তুলে ধরা হবে। 'পারস্য সাম্রাজ্য ও ইরাক পরিচিতি' অংশটুকু অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত।
৬৩. মাদায়েন: বর্তমান বাগদাদ থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত সালমান পাক (Salman Pak) নামক এলাকায় ছিল তৎকালীন মাদায়েন বা টেসিফোন নগরী।
৬৪. উবুল্লা: আধুনিক বসরার যে অংশটি 'আশার' নামে পরিচিত, সেখানেই ছিল উবুল্লার অবস্থান। ইবনে সিরিন রহ.-এর মতে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত মুসা আ. ও খিযির আ.-এর জনপদবাসীর কাছে খাবার প্রার্থনার ঘটনা উবুল্লাতেই সংঘটিত হয়।
৬৫. সাওয়াদ : ফুরাতের পূর্ব তীর ও দজলার পশ্চিম তীরের মধ্যে অবস্থিত সুবিস্তৃত সবুজ-শ্যামল গ্রামীণ ভূমিকে সাওয়াদ বলা হতো।
৬৬. মুসান্না বিন হারিসা শায়বানি নবম মতান্তরে দশম হিজরি সনে ইসলামগ্রহণ করেন। ইবনে হিব্বান রহ. তাকে সাহাবি গণ্য করলেও প্রসিদ্ধ ও বিশুদ্ধ মতানুসারে তিনি ইসলামগ্রহণ করার পর নবীজির সাক্ষাৎ-সৌভাগ্য লাভ করেননি। যদিও তিনি আপন কওমের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন; কিন্তু তখন তিনি ইসলামগ্রহণ করেননি। পরবর্তী সময়ে তিনি মুসলমান হওয়ার পর মদিনায় আগমন করার পূর্বেই নবীজি ইন্তেকাল করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 বিজয়াভিযানের সূচনা

📄 বিজয়াভিযানের সূচনা


ধর্মত্যাগ-ফিতনা দমনে পরিচালিত অভিযানসমূহের মাধ্যমে আরব উপদ্বীপে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ফিতনা পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যায়। আরব ভূখণ্ড আবারও ফিরে আসে সরল-সঠিক দ্বীনের পথে। এবার খliফা আবু বকর রাযি. ইসলামি বিজয়াভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। দ্বাদশ হিজরি সনের শুরুতে তিনি প্রথমে ইরাক অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং এ উদ্দেশ্যে দুটি বাহিনী প্রস্তুত করেন।
প্রথম বাহিনীর সেনাপতি নির্ধারণ করা হয় খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে। খালিদ রাযি. তখন ইয়ামামায় ছিলেন। খলিফা বার্তা পাঠিয়ে তাকে ইরাকের দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে অভিযান শুরু করার নির্দেশ দেন এবং উবুল্লা থেকে শুরু করে ইরাকের নিম্নভূমি হয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে বলেন।
দ্বিতীয় বাহিনীর সেনাপতি নির্ধারণ করা হয় ইয়ায বিন গুনম রাযি.-কে। তিনি তখন মক্কা ও বসরার মধ্যবর্তী নিবাজ নামক এলাকায় ছিলেন। খলিফা তাকে ইরাকের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন এবং বার্তায় উল্লেখ করেন—মুছাইয়াখ পৌঁছে সেখান থেকে অভিযান শুরু করবে। এরপর ইরাকের উচ্চভূমি দিয়ে ইরাকে প্রবেশ করে খালিদের সঙ্গে মিলিত হবে। বাহিনীর কেউ যদি ফিরে আসতে চায়, তাকে ফিরে আসার অনুমতি দেবে। যার ইচ্ছা, অভিযানে শরিক হবে; যার ইচ্ছা, চলে আসবে। অনাগ্রহী ব্যক্তিদের নিয়ে বিজয়াভিযান শুরু করবে না।
খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রাযি. উভয় সেনাপতিকে দ্রুত ইরাকের হিরা অঞ্চলে পৌঁছতে চেষ্টা করার নির্দেশ দেন এবং জানিয়ে দেন যে, যিনি প্রথমে হিরা পৌঁছবেন, তিনি অপরজনের আমির বিবেচিত হবেন। তিনি আরও নির্দেশ দেন—তোমরা উভয়ে যখন আপন আপন দিক থেকে পেছনের পারসিক ঘাঁটিসমূহের পতন ঘটিয়ে হিরায় পৌঁছবে এবং পেছনের দিক থেকে মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তা সম্পর্কে পূর্ণ নিশ্চিত হবে, তখন একজন হিরায় থেকে মুসলিম বাহিনী ও হিরা অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধান করবে, অপরজন আল্লাহ ও মুসলমানদের দুশমন পারসিকদের গৌরবের প্রতীক (রাজধানী) মাদায়েন নগরীতে অভিযান পরিচালনা করতে অগ্রসর হবে।
খলিফা উভয়কে প্রত্যেক অঞ্চলের জনসাধারণের সঙ্গে কোমল আচরণ করার এবং তাদেরকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ দেন। খলিফা বার্তায় উল্লেখ করেন—তারা যদি তোমাদের দাওয়াত কবুল করে নেয়, তাহলে তো ভালো। অন্যথায় তাদের কাছ থেকে জিজিয়া গ্রহণ করবে। যারা জিজিয়া প্রদানেও রাজি হবে না, কেবল তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করবে।
পাশাপাশি খলিফা ইতিপূর্বে যারা একবার ইসলামগ্রহণ করার পর মুরতাদ হয়ে গেছে, তারা নতুন করে ইসলামে দীক্ষিত হলেও অভিযানে তাদের সাহায্য গ্রহণ করতে নিষেধ করেন।
খলিফা আবু বকর রাযি. এই দুই মহান সেনাপতিকে ইরাকে প্রেরণ করার আগে থেকেই খলিফার নির্দেশনায় শায়বান গোত্রের বিশিষ্ট সর্দার বিখ্যাত তাবেয়ি সেনাপতি মুসান্না বিন হারিসা রহ. তার সঙ্গীদের নিয়ে ইরাকে পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। খliফা এবার তাকে তার সৈন্যদের নিয়ে খালিদের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার নির্দেশ দেন। খলিফা তার কাছে নিম্নোক্ত বার্তা প্রেরণ করেন—
হামদ ও সালাতের পর, আমি খালিদ বিন ওয়ালিদকে তোমার কাছে ইরাক-ভূমিতে পাঠালাম। তোমার কওমের সঙ্গীদেরকে নিয়ে তাকে স্বাগত জানাবে। এরপর তাকে সর্বাত্মক সাহায্য-সহায়তা করবে, কোনো বিষয়ে কিছুতেই তার অবাধ্যতা করবে না এবং তার মতের বিরোধিতা করবে না। মনে রাখবে, খালিদ সেসব মহান ব্যক্তির একজন, যাদের পরিচয় দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ তার মহাগ্রন্থে বলেছেন—'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল। তার সঙ্গে যারা আছে, তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং আপসের মধ্যে একে অন্যের প্রতি দয়ার্দ্র।' সে যতদিন তোমার সঙ্গে থাকবে, ততদিন সে-ই আমির। যদি সে কখনো চলে আসে, তখন তুমি পূর্বের ন্যায় আপন দায়িত্বে থাকবে।
খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে একাদশ হিজরির রজব মাসে মতান্তরে দ্বাদশ হিজরির মুহাররম মাসে (৬৩২/৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইরাকে প্রেরণ করা হয়। তার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল আঠারো হাজার। তিনি ইরাক অভিযানে এগারোটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং মহান আল্লাহর অনুগ্রহে প্রতিটি যুদ্ধে জয়লাভ করেন।

ধর্মত্যাগ-ফিতনা দমনে পরিচালিত অভিযানসমূহের মাধ্যমে আরব উপদ্বীপে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ফিতনা পুরোপুরি নির্মূল হয়ে যায়। আরব ভূখণ্ড আবারও ফিরে আসে সরল-সঠিক দ্বীনের পথে। এবার খলিফা আবু বকর রাযি. ইসলামি বিজয়াভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। দ্বাদশ হিজরি সনের শুরুতে তিনি প্রথমে ইরাক অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং এ উদ্দেশ্যে দুটি বাহিনী প্রস্তুত করেন।
প্রথম বাহিনীর সেনাপতি নির্ধারণ করা হয় খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে। খালিদ রাযি. তখন ইয়ামামায় ছিলেন। খলিফা বার্তা পাঠিয়ে তাকে ইরাকের দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে অভিযান শুরু করার নির্দেশ দেন এবং উবুল্লা থেকে শুরু করে ইরাকের নিম্নভূমি হয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে বলেন।
দ্বিতীয় বাহিনীর সেনাপতি নির্ধারণ করা হয় ইয়ায বিন গুনম রাযি.-কে। তিনি তখন মক্কা ও বসরার মধ্যবর্তী নিবাজ নামক এলাকায় ছিলেন। খলিফা তাকে ইরাকের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন এবং বার্তায় উল্লেখ করেন—মুছাইয়াখ পৌঁছে সেখান থেকে অভিযান শুরু করবে। এরপর ইরাকের উচ্চভূমি দিয়ে ইরাকে প্রবেশ করে খালিদের সঙ্গে মিলিত হবে। বাহিনীর কেউ যদি ফিরে আসতে চায়, তাকে ফিরে আসার অনুমতি দেবে। যার ইচ্ছা, অভিযানে শরিক হবে; যার ইচ্ছা, চলে আসবে। অনাগ্রহী ব্যক্তিদের নিয়ে বিজয়াভিযান শুরু করবে না।
খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রাযি. উভয় সেনাপতিকে দ্রুত ইরাকের হিরা অঞ্চলে পৌঁছতে চেষ্টা করার নির্দেশ দেন এবং জানিয়ে দেন যে, যিনি প্রথমে হিরা পৌঁছবেন, তিনি অপরজনের আমির বিবেচিত হবেন। তিনি আরও নির্দেশ দেন—তোমরা উভয়ে যখন আপন আপন দিক থেকে পেছনের পারসিক ঘাঁটিসমূহের পতন ঘটিয়ে হিরায় পৌঁছবে এবং পেছনের দিক থেকে মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তা সম্পর্কে পূর্ণ নিশ্চিত হবে, তখন একজন হিরায় থেকে মুসলিম বাহিনী ও হিরা অঞ্চলের নিরাপত্তা বিধান করবে, অপরজন আল্লাহ ও মুসলমানদের দুশমন পারসিকদের গৌরবের প্রতীক (রাজধানী) মাদায়েন নগরীতে অভিযান পরিচালনা করতে অগ্রসর হবে।
খলিফা উভয়কে প্রত্যেক অঞ্চলের জনসাধারণের সঙ্গে কোমল আচরণ করার এবং তাদেরকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ দেন। খলিফা বার্তায় উল্লেখ করেন—তারা যদি তোমাদের দাওয়াত কবুল করে নেয়, তাহলে তো ভালো। অন্যথায় তাদের কাছ থেকে জিজিয়া গ্রহণ করবে। যারা জিজিয়া প্রদানেও রাজি হবে না, কেবল তাদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করবে।
পাশাপাশি খliফা ইতিপূর্বে যারা একবার ইসলামগ্রহণ করার পর মুরতাদ হয়ে গেছে, তারা নতুন করে ইসলামে দীক্ষিত হলেও অভিযানে তাদের সাহায্য গ্রহণ করতে নিষেধ করেন।
খলিফা আবু বকর রাযি. এই দুই মহান সেনাপতিকে ইরাকে প্রেরণ করার আগে থেকেই খলিফার নির্দেশনায় শায়বান গোত্রের বিশিষ্ট সর্দার বিখ্যাত তাবেয়ি সেনাপতি মুসান্না বিন হারিসা রহ. তার সঙ্গীদের নিয়ে ইরাকে পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলেন। খলিফা এবার তাকে তার সৈন্যদের নিয়ে খালিদের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার নির্দেশ দেন। খলিফা তার কাছে নিম্নোক্ত বার্তা প্রেরণ করেন—
হামদ ও সালাতের পর, আমি খালিদ বিন ওয়ালিদকে তোমার কাছে ইরাক-ভূমিতে পাঠালাম। তোমার কওমের সঙ্গীদেরকে নিয়ে তাকে স্বাগত জানাবে। এরপর তাকে সর্বাত্মক সাহায্য-সহায়তা করবে, কোনো বিষয়ে কিছুতেই তার অবাধ্যতা করবে না এবং তার মতের বিরোধিতা করবে না। মনে রাখবে, খালিদ সেসব মহান ব্যক্তির একজন, যাদের পরিচয় দিতে গিয়ে মহান আল্লাহ তার মহাগ্রন্থে বলেছেন—'মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল। তার সঙ্গে যারা আছে, তারা কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর এবং আপসের মধ্যে একে অন্যের প্রতি দয়ার্দ্র।' সে যতদিন তোমার সঙ্গে থাকবে, ততদিন সে-ই আমির। যদি সে কখনো চলে আসে, তখন তুমি পূর্বের ন্যায় আপন দায়িত্বে থাকবে।
খaliদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-কে একাদশ হিজরির রজব মাসে মতান্তরে দ্বাদশ হিজরির মুহাররম মাসে (৬৩২/৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইরাকে প্রেরণ করা হয়। তার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল আঠারো হাজার। তিনি ইরাক অভিযানে এগারোটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং মহান আল্লাহর অনুগ্রহে প্রতিটি যুদ্ধে জয়লাভ করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ইরাকে পরিচালিত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর অভিযানসমূহ

📄 ইরাকে পরিচালিত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর অভিযানসমূহ


📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 শিকলের যুদ্ধ

📄 শিকলের যুদ্ধ


খলিফার নির্দেশনা মোতাবেক খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. তার বাহিনী নিয়ে উবুল্লা রওনা হয়ে যান। প্রথমে তিনি ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত পারস্য সাম্রাজ্যের সীমান্তনগরী উবুল্লার গভর্নর হরমুষের কাছে নিম্নোক্ত বার্তা প্রেরণ করেন—
হামদ ও সালাতের পর, ইসলামগ্রহণ করো, তাহলে নিরাপদ থাকবে। অথবা নিজের ও আপন কওমের জন্য নিরাপত্তাচুক্তি করে নাও এবং জিজিয়া প্রদান করো। দুটির একটিও গ্রহণ না করলে পরিণতির জন্য নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে দায়ী করতে পারবে না। কারণ, আমি এমন একদল সৈন্য নিয়ে তোমাদের উদ্দেশ্যে এসেছি, যারা মৃত্যুকে ততটাই ভালোবাসে, যতটা তোমরা ভালোবাসো জীবনকে।
খালিদ বিন ওয়ালিদ তার বাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করেন। তিনি অগ্রবর্তী অংশের নেতৃত্ব প্রদান করেন মুসান্না বিন হারিসা রহ.-কে, মধ্যবর্তী অংশের নেতৃত্ব প্রদান করেন আদি বিন হাতিম তাঈ রাযি.-কে আর শেষ অংশটির নেতৃত্ব রাখেন নিজের হাতে। তিনি নির্দেশ জারি করেন যে, প্রতিটি অংশ ভিন্ন ভিন্ন পথে সামনে অগ্রসর হবে।
উবুল্লার গভর্নর ও শত্রুবাহিনীর প্রধান হরমুয খালিদের বাহিনীর আগমন-সংবাদ এবং খালিদের বার্তা পেয়ে মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলায় নিজেই অগ্রসর হয়। যুদ্ধ শুরু হলে আল্লাহর অনুগ্রহে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। পারস্য-সেনাপতি হরমুয খালিদকে হত্যা করার জন্য শঠতা ও প্রতারণার আশ্রয় নিলেও মহান আল্লাহর অনুগ্রহে কা'কা' বিন আমর রাযি. তার কূটকৌশল ধরে ফেলেন এবং খালিদকে উদ্ধার করেন। এরপর হরমুয খালিদের হাতে নিহত হয়।
পারসিক বাহিনী এ যুদ্ধে এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছিল। সৈন্যরা যেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে না যায়, এজন্য তারা পরস্পরকে শিকল দ্বারা বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু তাদের এই কৌশল তাদের কাছেই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। এ কারণেই এ যুদ্ধের নামকরণ করা হয় ‘যাতুস সালাসিল’ বা শিকলের যুদ্ধ। (৬৭)

টিকাঃ
৬৭. নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়ও যাতুস সালাসিল নামে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে নবীজির প্রেরিত মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন হজরত আমর ইবনুল আস রাযি।

খলিফার নির্দেশনা মোতাবেক খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. তার বাহিনী নিয়ে উবুল্লা রওনা হয়ে যান। প্রথমে তিনি ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত পারস্য সাম্রাজ্যের সীমান্তনগরী উবুল্লার গভর্নর হরমুষের কাছে নিম্নোক্ত বার্তা প্রেরণ করেন—
হামদ ও সালাতের পর, ইসলামগ্রহণ করো, তাহলে নিরাপদ থাকবে। অথবা নিজের ও আপন কওমের জন্য নিরাপত্তাচুক্তি করে নাও এবং জিজিয়া প্রদান করো। দুটির একটিও গ্রহণ না করলে পরিণতির জন্য নিজেকে ছাড়া অন্য কাউকে দায়ী করতে পারবে না। কারণ, আমি এমন একদল সৈন্য নিয়ে তোমাদের উদ্দেশ্যে এসেছি, যারা মৃত্যুকে ততটাই ভালোবাসে, যতটা তোমরা ভালোবাসো জীবনকে।
খালিদ বিন ওয়ালিদ তার বাহিনীকে তিন ভাগে বিভক্ত করেন। তিনি অগ্রবর্তী অংশের নেতৃত্ব প্রদান করেন মুসান্না বিন হারিসা রহ.-কে, মধ্যবর্তী অংশের নেতৃত্ব প্রদান করেন আদি বিন হাতিম তাঈ রাযি.-কে আর শেষ অংশটির নেতৃত্ব রাখেন নিজের হাতে। তিনি নির্দেশ জারি করেন যে, প্রতিটি অংশ ভিন্ন ভিন্ন পথে সামনে অগ্রসর হবে।
উবুল্লার গভর্নর ও শত্রুবাহিনীর প্রধান হরমুয খালিদের বাহিনীর আগমন-সংবাদ এবং খালিদের বার্তা পেয়ে মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলায় নিজেই অগ্রসর হয়। যুদ্ধ শুরু হলে আল্লাহর অনুগ্রহে মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। পারস্য-সেনাপতি হরমুয খালিদকে হত্যা করার জন্য শঠতা ও প্রতারণার আশ্রয় নিলেও মহান আল্লাহর অনুগ্রহে কা'কা' বিন আমর রাযি. তার কূটকৌশল ধরে ফেলেন এবং খালিদকে উদ্ধার করেন। এরপর হরমুয খালিদের হাতে নিহত হয়।
পারসিক বাহিনী এ যুদ্ধে এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছিল। সৈন্যরা যেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে না যায়, এজন্য তারা পরস্পরকে শিকল দ্বারা বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু তাদের এই কৌশল তাদের কাছেই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। এ কারণেই এ যুদ্ধের নামকরণ করা হয় ‘যাতুস সালাসিল’ বা শিকলের যুদ্ধ। (৬৭)

টিকাঃ
৬৭. নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়ও যাতুস সালাসিল নামে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উক্ত যুদ্ধে নবীজির প্রেরিত মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন হজরত আমর ইবনুল আস রাযি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00