📄 আবু বকর রাযি.-এর খিলাফতকালে কুরআনের প্রথম সংকলন
ইমাম বুখারি রহ. ওহি-লিপিকার বিশিষ্ট সাহাবি যায়দ বিন ছাবিত রাযি.-এর সূত্রে কুরআন সংকলনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন। নিম্নে রেওয়ায়েতটি উল্লেখ করা হলো।
যায়দ বিন ছাবিত রাযি. বলেন, ইয়ামামার যুদ্ধে বহু লোক শহিদ হওয়ার পর আবু বকর আমাকে ডেকে পাঠালেন। এ সময় উমরও তার কাছে উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর আমাকে বললেন, উমর এসে আমাকে বলেছেন, 'ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাতপ্রাপ্তদের মধ্যে কারিদের সংখ্যা অনেক। আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, এভাবে যদি কারিগণ শহিদ হয়ে যায়, তাহলে কুরআনের বহু অংশ হারিয়ে যাবে। অতএব আমি মনে করি যে, আপনার কুরআন সংকলনের নির্দেশ দান করা উচিত।' উত্তরে আমি উমরকে বলেছি, 'যে কাজ স্বয়ং আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি, আমি কীভাবে তা করতে পারি?' প্রত্যুত্তরে উমর আমাকে বলেছেন, 'আল্লাহর শপথ! এটি কল্যাণকর হবে।' উমর আমাকে বারবার একই অনুরোধ করেছেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে আমিও বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হই। এ বিষয়ে এখন আমার অভিমত উমরের মতোই।
উমর সেখানে নীরব বসে ছিলেন, কোনো কথা বলছিলেন না। এরপর আবু বকর আমাকে বললেন, দেখো, তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক ও জ্ঞানী ব্যক্তি। তোমার ব্যাপারে আমাদের কোনো সংশয় নেই। অধিকন্তু তুমি রাসুলের নির্দেশে ওহি লিপিবদ্ধ করতে। সুতরাং তুমি কুরআন শরিফের বিক্ষিপ্ত আয়াতগুলোকে সংগ্রহ করে একত্রিত করো।
যায়দ বিন ছাবিত রাযি. বলেন, আল্লাহর শপথ! তিনি যদি আমাকে একটি পাহাড় স্থানান্তরিত করার নির্দেশ দিতেন, তাহলে তা-ও আমার কাছে কুরআন সংকলনের নির্দেশের চেয়ে কঠিন বলে মনে হতো না। আমি তখন বললাম, যে কাজ আল্লাহর রাসুল করেননি, আপনারা সে কাজ কীভাবে করবেন? উত্তরে আবু বকর বললেন, আল্লাহর শপথ! এটি একটি কল্যাণকর কাজ হবে। এ কথাটি আবু বকর আমাকে বারবার বলতে থাকেন। অবশেষে আল্লাহ পাক আমার বক্ষকেও সেই কাজের জন্য প্রসন্ন ও প্রশস্ত করে দেন, যে কাজের জন্য তিনি আবু বকর ও উমরের বক্ষকে প্রসন্ন ও প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন। (৫৯)
খলিফার নির্দেশ মোতাবেক যায়দ বিন ছাবিত রাযি. কাজ শুরু করেন। অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার জন্য তিনি হাফেজ সাহাবিগণের সহায়তা গ্রহণ করেন এবং নিখুঁতভাবে কাজটি সম্পাদনের জন্য অতি সূক্ষ্ম ও আদর্শ একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন।
তিনি নিজে যদিও কুরআনের হাফেজ ছিলেন; কিন্তু কুরআন সংকলনের ক্ষেত্রে তিনি আপন স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করেননি। এমনকি এ কাজে তিনি যাদের সহায়তা গ্রহণ করেছিলেন, তাদের স্মৃতিশক্তির ওপরও নির্ভর করেননি। অথচ হজরত যায়দ বিন ছাবিত রাযি. ও সহযোগী সকল সাহাবিই ছিলেন বিশ্বস্ত হাফেজে কুরআন। এর পরিবর্তে তিনি নির্ভর করেন সাহাবায়ে কেরামের কাছে সংরক্ষিত কুরআন-লিপির ওপর। লিপি গ্রহণ করার জন্য তিনি দুটি শর্ত আরোপ করেন—
১. সাহাবায়ে কেরাম নবীযুগে যেসব আয়াত লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করেছেন, তিনি তা স্বচক্ষে দেখবেন।
২. কমপক্ষে দুজন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে যে, তারা নবীযুগে এই লিখিত অংশটি দেখেছেন এবং তা স্বয়ং নবীজি লিখিয়েছেন।
হজরত যায়দ বিন ছাবিত রাযি. এই পদ্ধতিতে একটি একটি করে আয়াত যাচাই করে লিপিবদ্ধ করতে থাকেন। সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়-পিঞ্জরে সংরক্ষিত থাকার পাশাপাশি আয়াতগুলো খেজুর-বাকল, প্রস্তর-ফলক, চামড়া, হাড় ইত্যাদিতে লিপিবদ্ধ ছিল।
কুরআন সংকলন করতে গিয়ে যায়দ বিন ছাবিত রাযি. দুটি আয়াতের ক্ষেত্রে নবীযুগে লিপিবদ্ধ হওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী দুজন সাক্ষী পাননি। বরং একমাত্র খুযায়মা বিন ছাবিত আনসারি রাযি. আয়াতদুটি সম্পর্কে নবীযুগে লিপিবদ্ধ হওয়ার পক্ষে সাক্ষ্যদান করেন। তারপরও যায়দ রাযি. আয়াতদুটি লিপিবদ্ধ করে নেন। কারণ, স্বয়ং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুযায়মা রাযি.-কে বিশেষ মর্যাদা দান করে ইরশাদ করেছিলেন, তোমার একার সাক্ষ্য দুজনের সাক্ষ্যের সমকক্ষ হবে। নবীজির এই শাশ্বত বাণীর ভিত্তিতে উক্ত আয়াতদুটিও (৬০) যায়দ রাযি.-এর নির্ধারিত শর্তের মানদণ্ডে উন্নীত হয়।
যায়দ রাযি.-এর কুরআন সংকলন সমাপ্ত হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম তা নিরীক্ষণ করেন এবং সকলের ঐকমত্যে উক্ত সংকলন গৃহীত হয়। সুতরাং লিপিবদ্ধ কুরআন হৃদয়ে সংরক্ষণের দিক থেকে যেমন মুতাওয়াতির (৬১) স্তরের, লিপির দিক থেকেও মুতাওয়াতির স্তরের। পৃথিবীতে কুরআন ব্যতীত অন্য কোনো গ্রন্থের এই বিশুদ্ধ-মর্যাদা নেই। আল্লাহ তাআলা আপন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তার পবিত্র কালামকে এভাবেই হেফাজত করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحْفِظُونَ
বস্তুত এ উপদেশবাণী (কুরআন) আমিই অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর রক্ষাকর্তা। [সুরা হিজর : ০৯]
পবিত্র কুরআনের রক্ষাকর্তা একমাত্র আল্লাহ তাআলা। অবশ্য তিনি এর মাধ্যম হিসেবে এমন এক মোবারক কাফেলাকে কাজে লাগিয়েছেন, যাদের জীবনমরণ এবং জীবনের প্রতিটি স্পন্দন ছিল আল্লাহ ও তার দ্বীনের তরে নিবেদিত। তাদের কর্মপ্রচেষ্টায়ই সম্পন্ন হয়েছে কুরআনের প্রথম সংকলন। সকল অনুগ্রহ ও প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর।
টিকাঃ
৫৯. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪৬৭৯।
৬০. আয়াতদুটি ছিল সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াত। দ্রষ্টব্য: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪৬৭৯ ও জালালুদ্দিন সুযুতি, আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন, ১/২০৩।
৬১. সনদের প্রতি স্তরে নিরবচ্ছিন্ন সংখ্যাধিক্য হেতু যে বর্ণনা সুনিশ্চিতরূপে বক্তার সঙ্গে সংযুক্ত বলে সুপ্রমাণিত হয়, তাকে মুতাওয়াতির বলে। অর্থাৎ যদি কোনো একটি বাণী বা কর্ম মূল বর্ণনাকারী হতে এত অধিক পরিমাণ ব্যক্তি বর্ণনা করে, যাদের একজোট হয়ে মিথ্যা বর্ণনা করা বিবেকের দৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হয়, আর পরিমাণের এই আধিক্য বর্ণনা পরম্পরার পরবর্তী প্রত্যেক স্তরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায়, শাস্ত্রীয় পরিভাষায় তাকে 'মুতাওয়াতির' বলা হয়। মুতাওয়াতির স্তরের বর্ণনাসমূহে বর্ণিত মর্ম শরিয়ত ও বিবেকের দৃষ্টিতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত। পবিত্র কুরআনের মুখস্থকরণ প্রথম যুগ হতে নিয়ে প্রতি যুগে যেরূপ অধিক পরিমাণ মুসলমানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, লিপিবদ্ধ কুরআনও লিপিবদ্ধ হওয়ার যুগ থেকে নিয়ে প্রতি যুগে সেরূপ অধিক পরিমাণ মুসলমানের শুদ্ধতা-স্বীকৃতি নিয়ে প্রচার-প্রসার লাভ করেছে। পৃথিবীর আর কোনো গ্রন্থের এরূপ বিশুদ্ধতা-মর্যাদা নেই।