📄 ইরতিদাদ ও ধর্মত্যাগের ফিতনা
নবীজির জীবদ্দশায়ই ইরতিদাদ ও ধর্মত্যাগের অশুভ ফিতনার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। ইয়ামামায় মুসায়লামা বিন হাবিব আল-কাজ্জাব মুরতাদ হয়ে যায়। ইয়ামেনে ধর্মত্যাগ করে আসওয়াদ আল-আ'নাসি। বনু আসাদের তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদ এবং বনু তামিমের সুজা নাম্নী জনৈকা নারীও মুরতাদ হয়ে যায়। নবীজি তাদের সকলকে দমন করার জন্য বাহিনী প্রেরণের মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু এর পূর্বেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
আপন আপন কওমের নেতৃত্বধারী এসব লোক মূলত নিজেদের নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতেই মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। তাদের ধর্মত্যাগ করতে দেখে তাদের কওমের লোকেরাও কোনো প্রকার চিন্তাভাবনা ব্যতিরেকে মুরতাদ হয়ে যায়। আবু বকর রাযি. খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর আরব উপদ্বীপের প্রতিটি প্রান্তে ধর্মত্যাগের ফিতনা ছড়িয়ে পড়ে। (৫০) নিঃসন্দেহে এটি ছিল আবু বকর রাযি.-এর খিলাফতকালের সবচেয়ে বড় সংকট। বরং বলা ভালো, মুসলিম উম্মাহ তার সুদীর্ঘ ইতিহাসে কখনো এ ধরনের ভয়াবহ ফিতনার সম্মুখীন হয়নি।
টিকাঃ
৫০. কেবল মক্কা, মদিনা ও আধুনিক বাহরাইন রাষ্ট্রের অন্তর্গত 'হাজার' নামক ছোট্ট একটি জনপদ বাদে সর্বত্রই ইরতিদাদের ফিতনা ছড়িয়ে পড়েছিল।
📄 উসামা রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে অভিযানে প্রেরণ
এই ভয়াবহ ফিতনার মধ্যেও খলিফা আবু বকর রাযি. প্রথমেই প্রিয় নবীজির অসিয়ত বাস্তবায়নের সংকল্প করেন। প্রথমেই তিনি উসামার নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে অভিযানের উদ্দেশে প্রেরণ করেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, স্বয়ং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার জন্য এ বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন।
বিস্ময়ের বিষয় হলো, আবু বকর রাযি.-এর গৃহীত এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কেবল নবীজির অসিয়ত বাস্তবায়নই হয়নি; বরং ধর্মত্যাগ-ফিতনার ভয়াবহতা হ্রাসকরণেও এই সিদ্ধান্ত বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা রাযি.-এর এক বর্ণনা দ্বারা বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।
আবু হুরায়রা রাযি. বলেন- মহান আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই! যদি আবু বকর খলিফা নিযুক্ত না হতেন, তাহলে (পৃথিবীতে) আল্লাহর ইবাদত করার মতো অবস্থা থাকত না। এ কথা তিনি পরপর তিনবার বলেন। তখন তাকে বলা হয়, থামুন! হে আবু হুরায়রা। এরপর তিনি বলেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাতশ সৈন্যের এক বাহিনী গঠন করে উসামা বিন যায়দের নেতৃত্বে শামের উদ্দেশে প্রেরণ করেন। বাহিনী যুখুশুব এলাকায় (মদিনা হতে এক দিন দূরত্বের পথে অবস্থিত একটি উপত্যকা) পৌঁছতেই সংবাদ আসে যে, নবীজি ইন্তেকাল করেছেন। নবীজির ইন্তেকালের পরই মদিনার চারপাশের আরব গোত্রগুলো মুরতাদ হয়ে যায়। তখন সাহাবিগণ হজরত আবু বকরের কাছে সমবেত হয়ে নিবেদন করে, 'আবু বকর, আপনি উসামার বাহিনীকে ফিরিয়ে আনুন। মদিনার চারপাশে আরব গোত্রগুলো মুরতাদ হয়ে গেছে আর আপনি রোমান সাম্রাজ্য অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করতে চাচ্ছেন!' তখন আবু বকর উত্তর দেন, 'ওই সত্তার শপথ, যিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই! কুকুরপাল এসে নবীপত্নীগণের পা টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো ভয়াবহ ও প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও আমি সেই বাহিনীকে ফিরিয়ে আনব না, যা স্বয়ং নবীজি প্রেরণ করেছেন; আমি সেই ঝান্ডার বাঁধন খুলব না, যা স্বয়ং নবীজি বেঁধেছেন।' তারপর তিনি উসামার বাহিনীকে প্রেরণ করেন। উসামার বাহিনী যখনই কোনো মুরতাদ কওমের জনপদ অতিক্রম করত, তারা বলাবলি করত-দেখো, মুসলমানদের যদি শক্তি ও প্রতাপ না-ই থাকত, তাহলে তারা এমন একটি বাহিনী অভিযানে পাঠাতে পারত না। আমরা তাদের প্রতিরোধ না করে বরং তাদেরকে রোমানদের জন্য ছেড়ে দিই। মুসলিম বাহিনী রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদেরকে পরাজিত করে, অনেককে হত্যা করে। এরপর নিরাপদে মদিনায় ফিরে আসে। রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের এই বিজয় ও শক্তির পরিচয় পেয়ে সেসব গোত্র ধর্মত্যাগ পরিহার করে ইসলামের ওপর অটল থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। (৫৪)
এভাবেই আল্লাহ তাআলা হজরত আবু বকর রাযি.-এর সিদ্ধান্তে কল্যাণ ও বরকত দান করেন। কারণ, প্রকৃতপক্ষে এটি আবু বকর রাযি.-এর একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না। তিনি ভালো করেই জানতেন যে, এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থতামুক্ত নববি নিদের্শনা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় ইজতিহাদ ও ব্যক্তিগবেষণা কিংবা মোশাওয়ারা ও সামষ্টিক সিদ্ধান্তের চিন্তা করার কোনো অবকাশ নেই।
অল্পবয়সী তরুণ উসামা বিন যায়দ রাযি.-এর বাহিনীকে বিদায় জানাতে খলিফা হজরত আবু বকর রাযি. নিজেই বেরিয়ে আসেন এবং তাদেরকে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন। সেনাপতি উসামা রাযি. ছিলেন বাহনে উপবিষ্ট আর খলিফা পায়ে হেঁটে কাফেলাকে এগিয়ে দিচ্ছিলেন। বিব্রত উসামা রাযি. খলিফাকে অনুরোধ করেন—আল্লাহর রাসুলের খলিফা! হয় আপনি আরোহণ করুন, নয়তো আমি নেমে আসি। আবু বকর রাযি. উত্তর দেন, আল্লাহর শপথ! না তুমি নামবে, আর না আমি আরোহণ করব! কিছু সময়ের জন্য হলেও আল্লাহর রাস্তার ধুলায় পদযুগলকে ধূসর করা আমার কর্তব্য। এরপর হজরত আবু বকর রাযি. সেনাপতি উসামা রাযি.-এর কাছে হজরত উমর রাযি.-কে নিজের সঙ্গে রাখার অনুমতি চান। উমর রাযি.-ও উসামার বাহিনীতে শামিল ছিলেন। সেনাপতি উসামা রাযি. অনুমতি প্রদান করেন।
পুনরায় ধর্মত্যাগ-ফিতনা সংক্রান্ত আলোচনায় ফিরে আসছি। খলিফা আবু বকর রাযি.-এর খিলাফতকালে দু-ধরনের ইরতিদাদি ফিতনার আবির্ভাব হয়েছিল। বনু তাঈ, বনু হানিফা, বনু আসাদ, বনু তামিম ও ইয়ামেনের একদল লোক ইসলাম ধর্ম পুরোপুরি ত্যাগ করে বিভিন্ন মিথ্যা নবী-দাবিদারদের অনুসরণ করছিল। অপরদিকে আরেক দল সরাসরি ইসলাম ত্যাগ না করলেও ইসলামের একটি অকাট্য বিধানকে অস্বীকার করছিল। তাদের দাবি ছিল—ইসলামের জাকাত-বিধান কেবল নবীযুগেই কার্যকর ছিল; নবীজির ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে জাকাতের বিধানও রহিত হয়ে গেছে। যুক্তি হিসেবে তারা কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত পেশ করত—
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ হে নবী, তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং যা তাদের পক্ষে বরকতের কারণ হবে। আর তাদের জন্য দোয়া করুন। [সুরা তাওবা: ১০৩]
তারা এই আয়াত হতে এই ভুল মর্ম উদ্ধার করে যে, আয়াতে কেবল নবীজিকেই জাকাত গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এখন নবী নেই, তো জাকাতও নেই!
এই অপব্যাখ্যার ভিত্তিতে তারা নবীজির ইন্তেকালের পর খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি.-কে জাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়। এই দ্বিতীয় প্রকারের ধর্মত্যাগীদের সম্পর্কেই হজরত উমর রাযি. খলিফা আবু বকর রাযি.-কে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন।
উমর রাযি. খলিফাতুল মুসলিমিনকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি কীভাবে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন? অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُوْلُوْا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، فَإِذَا قَالُوْهَا عَصَمُوْا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقَّهَا» আমি ততক্ষণ পর্যন্ত লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি, যতক্ষণ না তারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই) বলবে। আর যখন তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে, তখন তারা আমার কাছ থেকে তাদের জানমালের নিরাপত্তা লাভ করবে। তবে আল্লাহর কোনো হক পরিত্যাগ করলে ভিন্ন কথা। আর তাদের হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে। (৫৫)
তখন হজরত আবু বকর রাযি. উত্তর দেন, আল্লাহর শপথ! তারা নবীযুগে প্রদান করত, এমন (সামান্য) একটি বকরির বাচ্চাও যদি আমাকে প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। জাকাত তো সম্পদের হক। আল্লাহর শপথ! যারা সালাত ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, আমি তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করব। (৫৬)
উমর রাযি. বলেন, আল্লাহর শপথ! নিঃসন্দেহে স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই আবু বকরের অন্তরে বিষয়টির সুস্পষ্ট উপলব্ধি দান করেছেন। পরে আমি বুঝতে পারি যে, এটিই (আবু বকর রাযি.-এর সিদ্ধান্তই) সঠিক। আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য খলিফা আবু বকর রাযি. এগারোটি ক্ষুদ্র বাহিনী গঠন করেন।
১. খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী। খালিদ রাযি.-কে প্রথমে নজদের মুযার গোত্রের উপকণ্ঠে গমন করে বনু আসাদের মিথ্যা-নবী তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদের বিরুদ্ধে, তারপর সেখান থেকে বুতাহ অঞ্চলে গিয়ে বনু তামিমের সর্দার মালিক বিন নুওয়াইরা-এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
২. আবু জাহল-পুত্র ইকরিমা রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন একটি বাহিনী বনু হানিফা অধ্যুষিত এলাকায় মিথ্যা-নবী মুসায়লামাতুল কাজ্জাবের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ইয়ামামা গমন করে।
৩. শুরাহবিল বিন হাসানা রাযি.-এর নেতৃত্বে আরও একটি বাহিনী ইয়ামামা গমন করে।
৪. তারিফা বিন হাজিয রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী বনু সালিমের জনপদ এবং তাদের সঙ্গে অবস্থানকারী হাওয়াযিন গোত্রের মুরতাদদের দমনে গমন করে।
৫. আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী উত্তরে কুযাআ, ওয়াদিআ ও হারিস গোত্রের দমনে গমন করে।
৬. খালিদ বিন সাইদ রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী গমন করে শামের উচ্চভূমিতে।
৭. আলা ইবনুল হাযরামি রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী বাহরাইনে বনু আবদুল কায়স ও বনু রবিআ'র ধর্মত্যাগীদের সঙ্গে অবস্থানকারী হাতাম বিন যাবিআকে দমনের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়।
৮. হুযায়ফা বিন মিহছান রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী গমন করে আম্মানের দাবা অঞ্চলে।
৯. আরফাজা বিন হারছামা রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী গমন করে মাহরাবাসীর উদ্দেশে।
১০. মুহাজির বিন উমাইয়া রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী মিথ্যা-নবী আসওয়াদ আল-আ'নাসিকে দমনের উদ্দেশ্যে ইয়ামেনের সানআ'য় এবং সেখান থেকে হাযারামাওতে প্রেরিত হয়।
১১. সুওয়াইদ বিন মুকাররিন রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী গমন করে ইয়ামেনের তিহামা অঞ্চলে।
আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে প্রতিটি বাহিনীই সফলভাবে ধর্মত্যাগ-ফিতনা দমন করতে সক্ষম হয়। এসব অভিযানের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলো খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর বাহিনীর অভিযান। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. দশ হাজার সৈন্য নিয়ে মিথ্যা নবী-দাবিদার তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদের নেতৃত্বাধীন চল্লিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ইতিহাসে এ যুদ্ধ বুযাখার যুদ্ধ (৫৭) নামে খ্যাত। যুদ্ধে তুলায়হা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে (দ্বিতীয় খলিফা উমর রাযি.-এর খিলাফতকালে) তিনি তাওবা করে পুনরায় ইসলামে দীক্ষিত হন এবং শাম ও ইরাকে বিভিন্ন অভিযানে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর নিহাবন্দের যুদ্ধে শহিদ হন।
হযরত আবু বকর রাযি.-এর খিলাফতকালের আরেকটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হলো ইয়ামামার যুদ্ধ। অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী ও কঠিন এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন ইকরিমা বিন আবু জাহল। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়ামামার উদ্দেশে দুটি বাহিনী প্রেরিত হয়েছিল। খলিফা আবু বকর রাযি. ইকরিমা রাযি.-কে শুরাহবিল বিন হাসানা রাযি.-এর সহায়ক বাহিনী পৌঁছার পূর্বে সংঘর্ষ এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু অনিবার্য কোনো কারণে ইকরিমা রাযি. খলিফার নির্দেশ রক্ষা করতে পারেননি। ফলে প্রথম দিকের লড়াইয়ে তিনি পরাভূত হন। পরবর্তী সময়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. তার সঙ্গে যোগ দেন এবং সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। যুদ্ধে ধর্মত্যাগীদের নেতা মিথ্যা-নবী মুসায়লামাসহ বিশ হাজার মুরতাদ ইহধাম ত্যাগ করে। মুসলিম বাহিনীর বারোশ যোদ্ধা শহিদ হন, যাদের মাঝে চারশ ছিলেন কুরআনের হাফেজ মুহাজির-আনসার সাহাবি। ইতিপূর্বে কোনো যুদ্ধে এত সাহাবি শহিদ হননি।
ইয়ামামার যুদ্ধে বীরত্ব ও সাহসিকতা এবং ত্যাগ ও আত্মনিবেদনের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত প্রকাশ পায়। যেমন:
• প্রচণ্ড যুদ্ধ চলাকালে রণক্ষেত্রে অটল-অবিচল থাকতে সাহাবায়ে কেরাম একে অপরকে উৎসাহ জোগাচ্ছিলেন এবং পরস্পরকে 'হে (সুরা) বাকারাওয়ালা' বলে আহ্বান করছিলেন।
• আনসারি সৈনিকদের ঝান্ডাবাহী ছাবিত বিন কায়স রাযি. কপূরমাখা কাফনের কাপড় পরিধান করে ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং মাটিতে গর্ত খুঁড়ে দু-পায়ের অর্ধেক নলা মাটিতে প্রোথিত করে যুদ্ধক্ষেত্রে দণ্ডায়মান ছিলেন। শহিদ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এভাবেই আপন স্থানে অবিচল থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যান।
• যুদ্ধে হজরত যায়দ বিন খাত্তাব রাযি.-এর শাহাদাতের পর আবু হুযায়ফা রাযি.-এর আজাদকৃত দাস সালিম মুসলিম বাহিনীর ঝান্ডা তুলে নেন। তখন মুহাজিরগণ তাকে বলে, সালিম! আমরা তোমার দিক থেকে কাফিরদের আক্রমণের আশঙ্কা করছি। উত্তরে সালিম বলেন, (যদি আমার দিক থেকে কাফিররা আক্রমণ করতে সক্ষম হয়) তাহলে তো আমি কুরআনের নিকৃষ্ট বাহক সাব্যস্ত হব।
• যুদ্ধ চলাকালে আবু হুযায়ফা রাযি. সঙ্গীদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেন, 'হে কুরআনের ধারকগণ, নিজেদের কীর্তি দ্বারা কুরআনকে সজ্জিত করো।' এরপর তিনি মুরতাদদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং শহিদ হয়ে যান।
• যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত দেখে মুরতাদ-বাহিনী একটি প্রাচীরবেষ্টিত বাগানে (৫৮) আশ্রয় নেয় এবং প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেয়। তখন বারা বিন মালিক রাযি. মুসলিম সৈন্যদের বলেন, তোমরা আমাকে উঠিয়ে বাগানের ভেতর ফেলে দাও। তার বারংবারের অনুরোধে সহযোদ্ধারা তাকে বর্শার সাহায্যে উঁচু করে প্রাচীরের ওপর দিয়ে ভেতরে ফেলে দেয়। তিনি একাই প্রাচীরদ্বারের সম্মুখে মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়াই করে দরজা খুলে দেন। ফলে মুসলিম বাহিনীর ভেতরে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত হয়।
• ইয়ামামার যুদ্ধে মুহাজির সাহাবি আবু হুযায়ফা বিন উতবা রাযি. ও আনসারি সাহাবি আব্বাদ বিন বিশর রাযি. একই দিন শহিদ হন। নবীজি ইতিপূর্বে তাদের দুজনের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জুড়ে দিয়েছিলেন।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলা ইবনুল হাযরামি রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী বাহরাইনে প্রেরিত হয়েছিল। এই মহান বুজুর্গ সেনাপতি শত্রুবাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করতে গিয়ে তার বাহিনী নিয়ে নির্দ্বিধায় সাগরবক্ষে নেমে গিয়েছিলেন।
বিশিষ্ট সাহাবি আবু হুরায়রা রাযি. উক্ত অভিযানে শরিক ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন— মুরতাদ-বাহিনী নৌযানের মাধ্যমে সাগর পাড়ি দিয়ে পালিয়ে গেল। এদিকে আমরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে সাগর পাড়ি দেওয়ার জন্য কোনো নৌযান খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন সেনাপতি আলা ইবনুল হাযরামি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন এবং বাহিনীকে সমুদ্রে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি দোয়া করেছিলেন,
يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ يَا حَكِيمُ يَا كَرِيمُ يَا أَحَدًا يَا صَمَدُ يَا حَيُّ يَا محني يَا قَيُّوْمُ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ. يَا رَبَّنَا أَجِزْنَا مِنْ هَذَا الْبَحْرِ».
হে মহান দয়াময়! হে প্রজ্ঞার আধার! হে করুণাময়! হে একক-অমুখাপেক্ষী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা! হে চিরঞ্জীব! হে জীবনদাতা! হে চিরস্থায়ী! হে মহা সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী! আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। হে আমাদের রব! আমাদেরকে এ সমুদ্র পার করিয়ে দিন।
তিনি সৈন্যদেরকেও এ দোয়া পড়ার নির্দেশ দিলেন এবং সবাইকে সাগরে নেমে যেতে আদেশ করলেন। সকলে তার নির্দেশ পালন করল। আমরা পানির ওপর দিয়ে চলতে লাগলাম। আল্লাহর শপথ! আমাদের কারও পা বা ঘোড়ার খুর পর্যন্ত পানিতে ভেজেনি।
একাদশ হিজরি সনের বাকি অংশ মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেই অতিবাহিত হয়। সাহাবায়ে কেরাম এ সময় মোট এগারোটি বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করেন। আল্লাহর দ্বীনের হেফাজতের পথে তারা কোনো প্রকার ক্লান্তি বা অবসাদের শিকার হননি। পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছিল খলিফা আবু বকর রাযি., উমর রাযি., আলি রাযি. ও খলিফার পরামর্শশুরার সুদক্ষ তত্ত্বাবধানে। মহান আল্লাহ তাদের সকলের প্রতি দয়ার আচরণ করুন, তাদেরকে আপন রহমতে সিক্ত করুন।
এরপর শুরু হয় দ্বাদশ হিজরি সন। বিশেষ করে ইয়ামামার যুদ্ধসহ ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে বহু সংখ্যক কুরআনের হাফেজ-কারি সাহাবি শহিদ হওয়ায় হজরত উমর রাযি. অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তখনও পুরো কুরআন একত্রে সংকলিত হয়নি; বরং সাহাবায়ে কেরামের কাছে লিখিত বিভিন্ন অংশ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল। সাহাবিদের অনেকের পূর্ণ কুরআন মুখস্থ থাকলেও লিপিবদ্ধ ছিল না। আর নবীজি যাদেরকে ওহি লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তারা যদিও যথাযথভাবে এ দায়িত্ব আদায় করেছিলেন; কিন্তু পুরো কুরআন তাদের কারও কাছে একত্রে সংরক্ষিত ছিল না; বরং বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। এ কারণে হজরত উমর রাযি. তার সংশয় ও দুশ্চিন্তার কথা খলিফা আবু বকর রাযি.-কে অবগত করেন।
টিকাঃ
৫৪. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬/২৯৪।
৫৫. সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং ৩০৯৩।
৫৬. হজরত উমর রাযি.-এর উল্লেখকৃত হাদিসের প্রত্যুত্তরে আবু বকর রাযি.-এর প্রদত্ত এই উত্তর কুরআন-সুন্নাহর মর্মজ্ঞান ও শরিয়ত সম্পর্কে তার অনন্যসাধারণ জ্ঞানের উৎকৃষ্ট এক দলিল। আবু বকর রাযি. উমর রাযি.-কে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, নবীজির বর্ণিত 'আল্লাহর হক পরিত্যাগ' কথাটির অর্থগত ব্যাপকতায় নামাজ ও জাকাত উভয়টি অন্তর্ভুক্ত। কারণ, নামাজ হলো দৈহিক হক আর জাকাত হলো আর্থিক হক। আবু বকর রাযি. নামাজের যুক্তি দিয়ে উমর রাযি.-কে বুঝিয়েছেন যে, নামাজ পরিত্যাগকারীর ক্ষেত্রে তো তুমি-আমি সকলেই মানি যে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। আর জাকাত তো নামাজের মতোই আল্লাহর হক। সুতরাং উভয়টি পরিত্যাগের বিধান একই হবে। পবিত্র কুরআনের এক আয়াতেও হজরত আবু বকর রাযি.-এর এই দাবির সমর্থন পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
(فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَتُوا الزَّكُوةَ فَخَلُوا سَبِيْلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ) তারা যদি তাওবা করে, নামাজ কায়েম করে এবং জাকাত আদায় করে, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দেবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা তাওবা: ০৫]
৫৭. বুযাখা : নজদের বনু তাঈ বা বনু আসাদের একটি জলাধারের নাম।
৫৮. বাগানটির অভ্যন্তরে প্রচুর সৈন্য নিহত হওয়ায় বাগানটিকে 'মৃত্যুর বাগিচা' নামকরণ করা হয়।
📄 আবু বকর রাযি.-এর খিলাফতকালে কুরআনের প্রথম সংকলন
ইমাম বুখারি রহ. ওহি-লিপিকার বিশিষ্ট সাহাবি যায়দ বিন ছাবিত রাযি.-এর সূত্রে কুরআন সংকলনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন। নিম্নে রেওয়ায়েতটি উল্লেখ করা হলো।
যায়দ বিন ছাবিত রাযি. বলেন, ইয়ামামার যুদ্ধে বহু লোক শহিদ হওয়ার পর আবু বকর আমাকে ডেকে পাঠালেন। এ সময় উমরও তার কাছে উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর আমাকে বললেন, উমর এসে আমাকে বলেছেন, 'ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাতপ্রাপ্তদের মধ্যে কারিদের সংখ্যা অনেক। আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, এভাবে যদি কারিগণ শহিদ হয়ে যায়, তাহলে কুরআনের বহু অংশ হারিয়ে যাবে। অতএব আমি মনে করি যে, আপনার কুরআন সংকলনের নির্দেশ দান করা উচিত।' উত্তরে আমি উমরকে বলেছি, 'যে কাজ স্বয়ং আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি, আমি কীভাবে তা করতে পারি?' প্রত্যুত্তরে উমর আমাকে বলেছেন, 'আল্লাহর শপথ! এটি কল্যাণকর হবে।' উমর আমাকে বারবার একই অনুরোধ করেছেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে আমিও বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে সক্ষম হই। এ বিষয়ে এখন আমার অভিমত উমরের মতোই।
উমর সেখানে নীরব বসে ছিলেন, কোনো কথা বলছিলেন না। এরপর আবু বকর আমাকে বললেন, দেখো, তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক ও জ্ঞানী ব্যক্তি। তোমার ব্যাপারে আমাদের কোনো সংশয় নেই। অধিকন্তু তুমি রাসুলের নির্দেশে ওহি লিপিবদ্ধ করতে। সুতরাং তুমি কুরআন শরিফের বিক্ষিপ্ত আয়াতগুলোকে সংগ্রহ করে একত্রিত করো।
যায়দ বিন ছাবিত রাযি. বলেন, আল্লাহর শপথ! তিনি যদি আমাকে একটি পাহাড় স্থানান্তরিত করার নির্দেশ দিতেন, তাহলে তা-ও আমার কাছে কুরআন সংকলনের নির্দেশের চেয়ে কঠিন বলে মনে হতো না। আমি তখন বললাম, যে কাজ আল্লাহর রাসুল করেননি, আপনারা সে কাজ কীভাবে করবেন? উত্তরে আবু বকর বললেন, আল্লাহর শপথ! এটি একটি কল্যাণকর কাজ হবে। এ কথাটি আবু বকর আমাকে বারবার বলতে থাকেন। অবশেষে আল্লাহ পাক আমার বক্ষকেও সেই কাজের জন্য প্রসন্ন ও প্রশস্ত করে দেন, যে কাজের জন্য তিনি আবু বকর ও উমরের বক্ষকে প্রসন্ন ও প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন। (৫৯)
খলিফার নির্দেশ মোতাবেক যায়দ বিন ছাবিত রাযি. কাজ শুরু করেন। অত্যন্ত জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়ার জন্য তিনি হাফেজ সাহাবিগণের সহায়তা গ্রহণ করেন এবং নিখুঁতভাবে কাজটি সম্পাদনের জন্য অতি সূক্ষ্ম ও আদর্শ একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন।
তিনি নিজে যদিও কুরআনের হাফেজ ছিলেন; কিন্তু কুরআন সংকলনের ক্ষেত্রে তিনি আপন স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করেননি। এমনকি এ কাজে তিনি যাদের সহায়তা গ্রহণ করেছিলেন, তাদের স্মৃতিশক্তির ওপরও নির্ভর করেননি। অথচ হজরত যায়দ বিন ছাবিত রাযি. ও সহযোগী সকল সাহাবিই ছিলেন বিশ্বস্ত হাফেজে কুরআন। এর পরিবর্তে তিনি নির্ভর করেন সাহাবায়ে কেরামের কাছে সংরক্ষিত কুরআন-লিপির ওপর। লিপি গ্রহণ করার জন্য তিনি দুটি শর্ত আরোপ করেন—
১. সাহাবায়ে কেরাম নবীযুগে যেসব আয়াত লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করেছেন, তিনি তা স্বচক্ষে দেখবেন।
২. কমপক্ষে দুজন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করতে হবে যে, তারা নবীযুগে এই লিখিত অংশটি দেখেছেন এবং তা স্বয়ং নবীজি লিখিয়েছেন।
হজরত যায়দ বিন ছাবিত রাযি. এই পদ্ধতিতে একটি একটি করে আয়াত যাচাই করে লিপিবদ্ধ করতে থাকেন। সাহাবায়ে কেরামের হৃদয়-পিঞ্জরে সংরক্ষিত থাকার পাশাপাশি আয়াতগুলো খেজুর-বাকল, প্রস্তর-ফলক, চামড়া, হাড় ইত্যাদিতে লিপিবদ্ধ ছিল।
কুরআন সংকলন করতে গিয়ে যায়দ বিন ছাবিত রাযি. দুটি আয়াতের ক্ষেত্রে নবীযুগে লিপিবদ্ধ হওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী দুজন সাক্ষী পাননি। বরং একমাত্র খুযায়মা বিন ছাবিত আনসারি রাযি. আয়াতদুটি সম্পর্কে নবীযুগে লিপিবদ্ধ হওয়ার পক্ষে সাক্ষ্যদান করেন। তারপরও যায়দ রাযি. আয়াতদুটি লিপিবদ্ধ করে নেন। কারণ, স্বয়ং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুযায়মা রাযি.-কে বিশেষ মর্যাদা দান করে ইরশাদ করেছিলেন, তোমার একার সাক্ষ্য দুজনের সাক্ষ্যের সমকক্ষ হবে। নবীজির এই শাশ্বত বাণীর ভিত্তিতে উক্ত আয়াতদুটিও (৬০) যায়দ রাযি.-এর নির্ধারিত শর্তের মানদণ্ডে উন্নীত হয়।
যায়দ রাযি.-এর কুরআন সংকলন সমাপ্ত হওয়ার পর সাহাবায়ে কেরাম তা নিরীক্ষণ করেন এবং সকলের ঐকমত্যে উক্ত সংকলন গৃহীত হয়। সুতরাং লিপিবদ্ধ কুরআন হৃদয়ে সংরক্ষণের দিক থেকে যেমন মুতাওয়াতির (৬১) স্তরের, লিপির দিক থেকেও মুতাওয়াতির স্তরের। পৃথিবীতে কুরআন ব্যতীত অন্য কোনো গ্রন্থের এই বিশুদ্ধ-মর্যাদা নেই। আল্লাহ তাআলা আপন প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তার পবিত্র কালামকে এভাবেই হেফাজত করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحْفِظُونَ
বস্তুত এ উপদেশবাণী (কুরআন) আমিই অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর রক্ষাকর্তা। [সুরা হিজর : ০৯]
পবিত্র কুরআনের রক্ষাকর্তা একমাত্র আল্লাহ তাআলা। অবশ্য তিনি এর মাধ্যম হিসেবে এমন এক মোবারক কাফেলাকে কাজে লাগিয়েছেন, যাদের জীবনমরণ এবং জীবনের প্রতিটি স্পন্দন ছিল আল্লাহ ও তার দ্বীনের তরে নিবেদিত। তাদের কর্মপ্রচেষ্টায়ই সম্পন্ন হয়েছে কুরআনের প্রথম সংকলন। সকল অনুগ্রহ ও প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর।
টিকাঃ
৫৯. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪৬৭৯।
৬০. আয়াতদুটি ছিল সুরা তাওবার শেষ দুই আয়াত। দ্রষ্টব্য: সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪৬৭৯ ও জালালুদ্দিন সুযুতি, আল-ইতকান ফি উলুমিল কুরআন, ১/২০৩।
৬১. সনদের প্রতি স্তরে নিরবচ্ছিন্ন সংখ্যাধিক্য হেতু যে বর্ণনা সুনিশ্চিতরূপে বক্তার সঙ্গে সংযুক্ত বলে সুপ্রমাণিত হয়, তাকে মুতাওয়াতির বলে। অর্থাৎ যদি কোনো একটি বাণী বা কর্ম মূল বর্ণনাকারী হতে এত অধিক পরিমাণ ব্যক্তি বর্ণনা করে, যাদের একজোট হয়ে মিথ্যা বর্ণনা করা বিবেকের দৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হয়, আর পরিমাণের এই আধিক্য বর্ণনা পরম্পরার পরবর্তী প্রত্যেক স্তরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায়, শাস্ত্রীয় পরিভাষায় তাকে 'মুতাওয়াতির' বলা হয়। মুতাওয়াতির স্তরের বর্ণনাসমূহে বর্ণিত মর্ম শরিয়ত ও বিবেকের দৃষ্টিতে অকাট্যভাবে প্রমাণিত। পবিত্র কুরআনের মুখস্থকরণ প্রথম যুগ হতে নিয়ে প্রতি যুগে যেরূপ অধিক পরিমাণ মুসলমানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে, লিপিবদ্ধ কুরআনও লিপিবদ্ধ হওয়ার যুগ থেকে নিয়ে প্রতি যুগে সেরূপ অধিক পরিমাণ মুসলমানের শুদ্ধতা-স্বীকৃতি নিয়ে প্রচার-প্রসার লাভ করেছে। পৃথিবীর আর কোনো গ্রন্থের এরূপ বিশুদ্ধতা-মর্যাদা নেই।