📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্য

📄 কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্য


নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত আবু বকর রাযি.- সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন-
مَا لِأَحَدٍ عِنْدَنَا يَدٌ إِلَّا وَقَدْ كَافَيْنَاهُ مَا خَلَا أَبَا بَكْرٍ؛ فَإِنَّ لَهُ عِنْدَنَا يَدًا يُكَافِئُهُ اللهُ بِهِ يَوْمَ القِيَامَةِ ، وَمَا نَفَعَنِي مَالُ أَحَدٍ قَطُّ مَا نَفَعَنِي مَالُ أَبِي بَكْرٍ»
আবু বকর ব্যতীত এমন কারও অনুগ্রহ আমার ওপর নেই, যা আমি পরিশোধ করিনি। আবু বকরের অনুগ্রহ আমার ওপর এমন, যার বদলা আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন নিজে প্রদান করবেন। আর কারও সম্পদ দ্বারা আমার ততটুকু উপকার হয়নি, যতটুকু উপকার আবু বকরের সম্পদ দ্বারা আমার হয়েছে। (৪৭)
আবু বকর রাযি. নবীজির সঙ্গে সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তাবুকের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর মূল ঝান্ডা তার হাতেই ন্যস্ত করা হয়েছিল। আশারায়ে মুবাশশারার (পৃথিবীতেই জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবি) পাঁচজন তার হাতে ইসলামগ্রহণ করেছেন। পবিত্র কুরআনের প্রথম সংকলন তার তত্ত্বাবধানেই সম্পন্ন হয়। তিনি বিলাল রাযি., আমির বিন ফুহাইরা রাযি., যিন্নিরা রুমিয়া রাযি., উম্মে উবায়স রাযি. ও নাহদিয়া রাযি.-সহ সাতজন নির্যাতিত সাহাবি-সাহাবিয়াকে ক্রয় করে মুক্ত করে দিয়েছিলেন।

টিকাঃ
৪৭. সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৩৬৬১।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর নির্বাচন

📄 ইসলামের প্রথম খলিফা হিসেবে আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর নির্বাচন


রাসুলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরামের অনেকে শোক ও ভালোবাসার আতিশয্যে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে, নবীজির ইন্তেকাল হয়েছে। কেউ বলছিলেন, নবীজি ইন্তেকাল করেছেন; কেউ বলছিলেন, নবীজি মারা যাননি। সংবাদ পেয়ে হজরত আবু বকর রাযি. নবীজির হুজরায় উপস্থিত হন এবং কাপড় সরিয়ে নবীজির চেহারা মোবারকে চুম্বন করেন। নবীজির ইন্তেকাল সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং সমবেত সকলের উদ্দেশে বলেন—
হামদ ও সালাতের পর, কেউ যদি মুহাম্মাদের উপাসনা করে থাকে, তাহলে তার জন্য সংবাদ হলো—মুহাম্মাদ ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করে, তাদের মনে রাখতে হবে—আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। আল্লাহ তাআলা তো ইরশাদ করেছেন—
وَ مَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَأَبِنْ مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ
আর মুহাম্মাদ একজন রাসুলমাত্র। তাঁর পূর্বে বহু রাসুল গত হয়েছে। তাঁর যদি মৃত্যু হয়ে যায় কিংবা তাঁকে হত্যা করে ফেলা হয়, তবে কি তোমরা উল্টো পথে ফিরে যাবে? [সুরা আলে ইমরান : ১৪৪]
উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে হজরত উমর রাযি.-ও ছিলেন। হজরত আবু বকর রাযি.-এর মুখে এ আয়াত শুনে সকলের মনে হচ্ছিল, আয়াতটি বুঝি আজই তারা প্রথম শুনছেন। আবু বকর রাযি.-এর কথায় সকলের মন শান্ত-প্রশান্ত হয় এবং দ্বিধা-সংশয় দূর হয়ে যায়। এরপর সকলে বনু সাইদার ছায়া-ছাউনিতে সমবেত হয় এবং নবীজির অবর্তমানে কে মুসলমানদের নেতৃত্ব দেবেন, এ বিষয়ে পরামর্শ করে। মতবিনিময়ের পর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, হজরত আবু বকর রাযি.-ই হবেন নবীজির খলিফা। সকলে এ সিদ্ধান্তে ঐকমত্য পোষণ করে। এ ধারণা মোটেও সঠিক নয় যে, হজরত আলি রাযি. আবু বকর রাযি.-এর হাতে বায়আত গ্রহণে বিলম্ব করেছিলেন। বরং তিনিও সকলের সঙ্গে শুরুতেই বায়আত গ্রহণ করেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক হাফেজ ইবনে কাছির রহ. লিখেছেন—
হজরত আলি রাযি. নবীজির ওফাতের পর প্রথম বা দ্বিতীয় দিনই আবু বকর রাযি.-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। তিনি কখনোই আবু বকর রাযি.-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি এবং তাঁর খিলাফতকালের কোনো অংশেই তাঁর পেছনে কোনো সালাতে অনুপস্থিত থাকতেননি। আবু বকর রাযি. (খিলাফতের শুরুর দিকে) ধর্মত্যাগীদের বিদ্রোহদমন অভিযানে কোষমুক্ত তরবারি নিয়ে যুলকাসসা অভিমুখে রওনা হলে আলি রাযি.-ও তার সহযোদ্ধা হয়েছিলেন। উক্ত অভিযানের বিশদ আলোচনা পরে আসছে। তবে আবু বকর রাযি.-এর সঙ্গে ফাতিমা রাযি.-এর মনোমালিন্য দেখা দিলে আলি রাযি.। নবী-তনয়ার খাতিরে সাময়িকভাবে বাহ্যত সম্পর্কহীনতার ভাব অবলম্বন করেছিলেন।
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ-ফাতেমা রাযি.-এর ধারণা ছিল যে, তিনি কন্যা হিসেবে নবীজির (ব্যক্তি-অধিকারে সংরক্ষিত খাস ভূমির) মিরাসপ্রাপ্তির অধিকার রাখেন। (৪৮) তিনি আবু বকর রাযি. কর্তৃক অবহিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এ কথা জানতেন না যে, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'আমরা (নবী-রাসুলরা) মিরাসরূপে কোনো কিছু রেখে যাই না; আমরা যা রেখে যাই, তা সদকা।'(৪৯) ফাতেমা রাযি. আপন ধারণার ভিত্তিতে মিরাস দাবি করলে আবু বকর রাযি. উক্ত সুস্পষ্ট নববি নির্দেশনার আলোকে তা প্রদানে অস্বীকৃতি জানান। এ বিধানবলেই তিনি নবীজির স্ত্রীগণ ও তার চাচা (আব্বাস রাযি.)-কেও কোনোরূপ অধিকার বা মিরাস প্রদান করেননি। (৫০) এরপর ফাতেমা রাযি. আবু বকর রাযি.-এর কাছে খায়বার ও ফাদাক (৫১)-এর (সদকার) ভূ-সম্পত্তিতে হজরত আলি রাযি.-কে তত্ত্বাবধায়করূপে দায়িত্বপ্রদানের আবেদন জানান। কিন্তু আবু বকর রাযি. এ আবেদন গ্রহণেও সম্মত হননি। তার যুক্তি ছিল, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করতেন এবং যেসব অধিকার সংরক্ষণ করতেন, রাসুলের খলিফা হিসেবে সেসব দায়িত্ব-কর্তব্য ও অধিকার তার নিজের ওপরই বর্তায়। হজরত আবু বকর রাযি.-এর উক্ত সিদ্ধান্তের কারণে হজরত ফাতেমা রাযি.-এর মনে (স্বভাবজাত) উষ্মা ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এসব কারণে আলি রাযি. কিছু ক্ষেত্রে ফাতেমা রাযি.-এর মনস্তুষ্টি প্রয়োজনীয় মনে করেন। নবীজির ইন্তেকালের ছয়মাস পর হজরত ফাতেমা রাযি.-এর ইন্তেকাল হয়। ইতিপূর্বে আলি রাযি. আবুবকর রাযি.-এর হাতে বায়আত গ্রহণ করে থাকলেও এ সময় তিনি বায়আতের নবায়ন সমীচীন মনে করেন। (৫২)
খলিফা নির্ধারিত হওয়ার পর হজরত আবু বকর রাযি. তার প্রথম ভাষণে উপস্থিত সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন-
হামদ ও সালাতের পর, উপস্থিত লোকসকল, যদিও আমাকে তোমাদের ওপর কর্তৃত্ব প্রদান করা হয়েছে; কিন্তু বাস্তব কথা হলো, আমি তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি নই। সুতরাং আমি যদি কল্যাণ আচরণ করি, তবে তোমরা আমার সহযোগিতা করবে, আর মন্দ করলে আমাকে সোজা করে দেবে। (মনে রেখো) সত্যবাদিতা হচ্ছে আমানত ও বিশ্বস্ততা আর মিথ্যাচার হচ্ছে খেয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা। তোমাদের দুর্বলতম ব্যক্তি আমার কাছে সবল, যতক্ষণ না আমি তার দুর্বলতার সমাধান করে দিই আর তোমাদের সবলতম ব্যক্তি আমার কাছে দুর্বল, যতক্ষণ না আল্লাহর ইচ্ছায় আমি তার নিকট হতে হক ও প্রাপ্য উসুল করে নিই। যখনই কোনো জাতি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা পরিত্যাগ করবে, তখনই আল্লাহ তাদের জন্য লাঞ্ছনা অবধারিত করে দেবেন। যখনই কোনো জাতি অশ্লীলতার বিস্তার ঘটাবে, আল্লাহ তাদেরকে ব্যাপক দুর্যোগ ও মহাবিপদে আক্রান্ত করবেন। আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করব, ততক্ষণ তোমরা আমার অনুগত থাকবে। আর যদি আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের অবাধ্যতা করি, তাহলে তোমাদের ওপর আমার কোনো অধিকার থাকবে না।

টিকাঃ
৪৮. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিরাস হিসেবে দিনার-দিরহাম, দাস-দাসী, বকরি-উট বা অন্য কিছুই রেখে যাননি। তিনি কিছু জমি রেখে গিয়েছিলেন; যার পুরোটাই তিনি আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে গিয়েছিলেন। এমনকি ইন্তেকালের সময় নবীজির বর্মটি জনৈক ইহুদির কাছে ত্রিশ দিনারে বন্ধক রাখা ছিল।
৪৯. তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস নং ৪৫৭৮।
৫০. হজরত ফাতেমা রাযি.-এর পাশাপাশি উম্মাহাতুল মুমিনিন নবী-পত্নীগণ ও নবীজির চাচা আব্বাস রাযি.-ও খলিফা আবু বকর রাযি.-এর কাছে একই দাবি জানিয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ফাতেমা রাযি.-সহ তারা সকলে নবীদের মিরাস সংক্রান্ত হাদিসটি জানতেন; তবে তাদের ধারণা ছিল—খায়বারের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ এর অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং নবীজি যেমন জীবদ্দশায় সেখান থেকে উৎপাদিত ফসলের অংশ তাদেরকে প্রদান করতেন, তারা নবীজির মৃত্যুর পরও তা লাভ করবেন। পরে আবু বকর রাযি. সকলকে আশ্বস্ত করতে সক্ষম হন যে, নবীজির হাদিসটি ব্যাপক এবং খায়বার ও ফাদাক-ভূমিও এর অন্তর্ভুক্ত। এরপর ফাতেমা রাযি.-সহ সকলে আপন আপন দাবি প্রত্যাহার করে নেন। সুতরাং শিয়াদের এ দাবি মোটেও সঠিক নয় যে, আবু বকর রাযি. ফাতেমা রাযি.-কে ফাদাকের ভূসম্পদের অধিকার হতে বঞ্চিত করেছেন।
৫১. ফাদাক: খায়বারের নিকটবর্তী একটি সবুজ-শ্যামল এলাকার নাম।
৫২. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৫/২৬৩।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ইরতিদাদ ও ধর্মত্যাগের ফিতনা

📄 ইরতিদাদ ও ধর্মত্যাগের ফিতনা


নবীজির জীবদ্দশায়ই ইরতিদাদ ও ধর্মত্যাগের অশুভ ফিতনার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। ইয়ামামায় মুসায়লামা বিন হাবিব আল-কাজ্জাব মুরতাদ হয়ে যায়। ইয়ামেনে ধর্মত্যাগ করে আসওয়াদ আল-আ'নাসি। বনু আসাদের তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদ এবং বনু তামিমের সুজা নাম্নী জনৈকা নারীও মুরতাদ হয়ে যায়। নবীজি তাদের সকলকে দমন করার জন্য বাহিনী প্রেরণের মনস্থ করেছিলেন। কিন্তু এর পূর্বেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
আপন আপন কওমের নেতৃত্বধারী এসব লোক মূলত নিজেদের নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতেই মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। তাদের ধর্মত্যাগ করতে দেখে তাদের কওমের লোকেরাও কোনো প্রকার চিন্তাভাবনা ব্যতিরেকে মুরতাদ হয়ে যায়। আবু বকর রাযি. খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর আরব উপদ্বীপের প্রতিটি প্রান্তে ধর্মত্যাগের ফিতনা ছড়িয়ে পড়ে। (৫০) নিঃসন্দেহে এটি ছিল আবু বকর রাযি.-এর খিলাফতকালের সবচেয়ে বড় সংকট। বরং বলা ভালো, মুসলিম উম্মাহ তার সুদীর্ঘ ইতিহাসে কখনো এ ধরনের ভয়াবহ ফিতনার সম্মুখীন হয়নি।

টিকাঃ
৫০. কেবল মক্কা, মদিনা ও আধুনিক বাহরাইন রাষ্ট্রের অন্তর্গত 'হাজার' নামক ছোট্ট একটি জনপদ বাদে সর্বত্রই ইরতিদাদের ফিতনা ছড়িয়ে পড়েছিল।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উসামা রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে অভিযানে প্রেরণ

📄 উসামা রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে অভিযানে প্রেরণ


এই ভয়াবহ ফিতনার মধ্যেও খলিফা আবু বকর রাযি. প্রথমেই প্রিয় নবীজির অসিয়ত বাস্তবায়নের সংকল্প করেন। প্রথমেই তিনি উসামার নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে অভিযানের উদ্দেশে প্রেরণ করেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, স্বয়ং নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোমান সাম্রাজ্যভুক্ত অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার জন্য এ বাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন।
বিস্ময়ের বিষয় হলো, আবু বকর রাযি.-এর গৃহীত এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কেবল নবীজির অসিয়ত বাস্তবায়নই হয়নি; বরং ধর্মত্যাগ-ফিতনার ভয়াবহতা হ্রাসকরণেও এই সিদ্ধান্ত বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা রাযি.-এর এক বর্ণনা দ্বারা বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।
আবু হুরায়রা রাযি. বলেন- মহান আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই! যদি আবু বকর খলিফা নিযুক্ত না হতেন, তাহলে (পৃথিবীতে) আল্লাহর ইবাদত করার মতো অবস্থা থাকত না। এ কথা তিনি পরপর তিনবার বলেন। তখন তাকে বলা হয়, থামুন! হে আবু হুরায়রা। এরপর তিনি বলেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাতশ সৈন্যের এক বাহিনী গঠন করে উসামা বিন যায়দের নেতৃত্বে শামের উদ্দেশে প্রেরণ করেন। বাহিনী যুখুশুব এলাকায় (মদিনা হতে এক দিন দূরত্বের পথে অবস্থিত একটি উপত্যকা) পৌঁছতেই সংবাদ আসে যে, নবীজি ইন্তেকাল করেছেন। নবীজির ইন্তেকালের পরই মদিনার চারপাশের আরব গোত্রগুলো মুরতাদ হয়ে যায়। তখন সাহাবিগণ হজরত আবু বকরের কাছে সমবেত হয়ে নিবেদন করে, 'আবু বকর, আপনি উসামার বাহিনীকে ফিরিয়ে আনুন। মদিনার চারপাশে আরব গোত্রগুলো মুরতাদ হয়ে গেছে আর আপনি রোমান সাম্রাজ্য অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করতে চাচ্ছেন!' তখন আবু বকর উত্তর দেন, 'ওই সত্তার শপথ, যিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই! কুকুরপাল এসে নবীপত্নীগণের পা টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো ভয়াবহ ও প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও আমি সেই বাহিনীকে ফিরিয়ে আনব না, যা স্বয়ং নবীজি প্রেরণ করেছেন; আমি সেই ঝান্ডার বাঁধন খুলব না, যা স্বয়ং নবীজি বেঁধেছেন।' তারপর তিনি উসামার বাহিনীকে প্রেরণ করেন। উসামার বাহিনী যখনই কোনো মুরতাদ কওমের জনপদ অতিক্রম করত, তারা বলাবলি করত-দেখো, মুসলমানদের যদি শক্তি ও প্রতাপ না-ই থাকত, তাহলে তারা এমন একটি বাহিনী অভিযানে পাঠাতে পারত না। আমরা তাদের প্রতিরোধ না করে বরং তাদেরকে রোমানদের জন্য ছেড়ে দিই। মুসলিম বাহিনী রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে তাদেরকে পরাজিত করে, অনেককে হত্যা করে। এরপর নিরাপদে মদিনায় ফিরে আসে। রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের এই বিজয় ও শক্তির পরিচয় পেয়ে সেসব গোত্র ধর্মত্যাগ পরিহার করে ইসলামের ওপর অটল থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। (৫৪)
এভাবেই আল্লাহ তাআলা হজরত আবু বকর রাযি.-এর সিদ্ধান্তে কল্যাণ ও বরকত দান করেন। কারণ, প্রকৃতপক্ষে এটি আবু বকর রাযি.-এর একান্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না। তিনি ভালো করেই জানতেন যে, এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থতামুক্ত নববি নিদের্শনা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় ইজতিহাদ ও ব্যক্তিগবেষণা কিংবা মোশাওয়ারা ও সামষ্টিক সিদ্ধান্তের চিন্তা করার কোনো অবকাশ নেই।
অল্পবয়সী তরুণ উসামা বিন যায়দ রাযি.-এর বাহিনীকে বিদায় জানাতে খলিফা হজরত আবু বকর রাযি. নিজেই বেরিয়ে আসেন এবং তাদেরকে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন। সেনাপতি উসামা রাযি. ছিলেন বাহনে উপবিষ্ট আর খলিফা পায়ে হেঁটে কাফেলাকে এগিয়ে দিচ্ছিলেন। বিব্রত উসামা রাযি. খলিফাকে অনুরোধ করেন—আল্লাহর রাসুলের খলিফা! হয় আপনি আরোহণ করুন, নয়তো আমি নেমে আসি। আবু বকর রাযি. উত্তর দেন, আল্লাহর শপথ! না তুমি নামবে, আর না আমি আরোহণ করব! কিছু সময়ের জন্য হলেও আল্লাহর রাস্তার ধুলায় পদযুগলকে ধূসর করা আমার কর্তব্য। এরপর হজরত আবু বকর রাযি. সেনাপতি উসামা রাযি.-এর কাছে হজরত উমর রাযি.-কে নিজের সঙ্গে রাখার অনুমতি চান। উমর রাযি.-ও উসামার বাহিনীতে শামিল ছিলেন। সেনাপতি উসামা রাযি. অনুমতি প্রদান করেন।
পুনরায় ধর্মত্যাগ-ফিতনা সংক্রান্ত আলোচনায় ফিরে আসছি। খলিফা আবু বকর রাযি.-এর খিলাফতকালে দু-ধরনের ইরতিদাদি ফিতনার আবির্ভাব হয়েছিল। বনু তাঈ, বনু হানিফা, বনু আসাদ, বনু তামিম ও ইয়ামেনের একদল লোক ইসলাম ধর্ম পুরোপুরি ত্যাগ করে বিভিন্ন মিথ্যা নবী-দাবিদারদের অনুসরণ করছিল। অপরদিকে আরেক দল সরাসরি ইসলাম ত্যাগ না করলেও ইসলামের একটি অকাট্য বিধানকে অস্বীকার করছিল। তাদের দাবি ছিল—ইসলামের জাকাত-বিধান কেবল নবীযুগেই কার্যকর ছিল; নবীজির ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে জাকাতের বিধানও রহিত হয়ে গেছে। যুক্তি হিসেবে তারা কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত পেশ করত—
خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ হে নবী, তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং যা তাদের পক্ষে বরকতের কারণ হবে। আর তাদের জন্য দোয়া করুন। [সুরা তাওবা: ১০৩]
তারা এই আয়াত হতে এই ভুল মর্ম উদ্ধার করে যে, আয়াতে কেবল নবীজিকেই জাকাত গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এখন নবী নেই, তো জাকাতও নেই!
এই অপব্যাখ্যার ভিত্তিতে তারা নবীজির ইন্তেকালের পর খলিফাতুল মুসলিমিন আবু বকর রাযি.-কে জাকাত প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়। এই দ্বিতীয় প্রকারের ধর্মত্যাগীদের সম্পর্কেই হজরত উমর রাযি. খলিফা আবু বকর রাযি.-কে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন।
উমর রাযি. খলিফাতুল মুসলিমিনকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি কীভাবে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন? অথচ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُوْلُوْا لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ، فَإِذَا قَالُوْهَا عَصَمُوْا مِنِّي دِمَاءَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقَّهَا» আমি ততক্ষণ পর্যন্ত লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি, যতক্ষণ না তারা 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' (আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই) বলবে। আর যখন তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে, তখন তারা আমার কাছ থেকে তাদের জানমালের নিরাপত্তা লাভ করবে। তবে আল্লাহর কোনো হক পরিত্যাগ করলে ভিন্ন কথা। আর তাদের হিসাব আল্লাহর দায়িত্বে। (৫৫)
তখন হজরত আবু বকর রাযি. উত্তর দেন, আল্লাহর শপথ! তারা নবীযুগে প্রদান করত, এমন (সামান্য) একটি বকরির বাচ্চাও যদি আমাকে প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়, তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। জাকাত তো সম্পদের হক। আল্লাহর শপথ! যারা সালাত ও জাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে, আমি তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করব। (৫৬)
উমর রাযি. বলেন, আল্লাহর শপথ! নিঃসন্দেহে স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই আবু বকরের অন্তরে বিষয়টির সুস্পষ্ট উপলব্ধি দান করেছেন। পরে আমি বুঝতে পারি যে, এটিই (আবু বকর রাযি.-এর সিদ্ধান্তই) সঠিক। আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য খলিফা আবু বকর রাযি. এগারোটি ক্ষুদ্র বাহিনী গঠন করেন।
১. খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী। খালিদ রাযি.-কে প্রথমে নজদের মুযার গোত্রের উপকণ্ঠে গমন করে বনু আসাদের মিথ্যা-নবী তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদের বিরুদ্ধে, তারপর সেখান থেকে বুতাহ অঞ্চলে গিয়ে বনু তামিমের সর্দার মালিক বিন নুওয়াইরা-এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
২. আবু জাহল-পুত্র ইকরিমা রাযি.-এর নেতৃত্বাধীন একটি বাহিনী বনু হানিফা অধ্যুষিত এলাকায় মিথ্যা-নবী মুসায়লামাতুল কাজ্জাবের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ইয়ামামা গমন করে।
৩. শুরাহবিল বিন হাসানা রাযি.-এর নেতৃত্বে আরও একটি বাহিনী ইয়ামামা গমন করে।
৪. তারিফা বিন হাজিয রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী বনু সালিমের জনপদ এবং তাদের সঙ্গে অবস্থানকারী হাওয়াযিন গোত্রের মুরতাদদের দমনে গমন করে।
৫. আমর ইবনুল আস রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী উত্তরে কুযাআ, ওয়াদিআ ও হারিস গোত্রের দমনে গমন করে।
৬. খালিদ বিন সাইদ রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী গমন করে শামের উচ্চভূমিতে।
৭. আলা ইবনুল হাযরামি রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী বাহরাইনে বনু আবদুল কায়স ও বনু রবিআ'র ধর্মত্যাগীদের সঙ্গে অবস্থানকারী হাতাম বিন যাবিআকে দমনের উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়।
৮. হুযায়ফা বিন মিহছান রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী গমন করে আম্মানের দাবা অঞ্চলে।
৯. আরফাজা বিন হারছামা রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী গমন করে মাহরাবাসীর উদ্দেশে।
১০. মুহাজির বিন উমাইয়া রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী মিথ্যা-নবী আসওয়াদ আল-আ'নাসিকে দমনের উদ্দেশ্যে ইয়ামেনের সানআ'য় এবং সেখান থেকে হাযারামাওতে প্রেরিত হয়।
১১. সুওয়াইদ বিন মুকাররিন রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী গমন করে ইয়ামেনের তিহামা অঞ্চলে।
আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে প্রতিটি বাহিনীই সফলভাবে ধর্মত্যাগ-ফিতনা দমন করতে সক্ষম হয়। এসব অভিযানের মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য হলো খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর বাহিনীর অভিযান। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. দশ হাজার সৈন্য নিয়ে মিথ্যা নবী-দাবিদার তুলায়হা বিন খুওয়াইলিদের নেতৃত্বাধীন চল্লিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ইতিহাসে এ যুদ্ধ বুযাখার যুদ্ধ (৫৭) নামে খ্যাত। যুদ্ধে তুলায়হা পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে (দ্বিতীয় খলিফা উমর রাযি.-এর খিলাফতকালে) তিনি তাওবা করে পুনরায় ইসলামে দীক্ষিত হন এবং শাম ও ইরাকে বিভিন্ন অভিযানে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর নিহাবন্দের যুদ্ধে শহিদ হন।
হযরত আবু বকর রাযি.-এর খিলাফতকালের আরেকটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হলো ইয়ামামার যুদ্ধ। অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী ও কঠিন এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন ইকরিমা বিন আবু জাহল। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইয়ামামার উদ্দেশে দুটি বাহিনী প্রেরিত হয়েছিল। খলিফা আবু বকর রাযি. ইকরিমা রাযি.-কে শুরাহবিল বিন হাসানা রাযি.-এর সহায়ক বাহিনী পৌঁছার পূর্বে সংঘর্ষ এড়িয়ে চলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু অনিবার্য কোনো কারণে ইকরিমা রাযি. খলিফার নির্দেশ রক্ষা করতে পারেননি। ফলে প্রথম দিকের লড়াইয়ে তিনি পরাভূত হন। পরবর্তী সময়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. তার সঙ্গে যোগ দেন এবং সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী জয়লাভ করে। যুদ্ধে ধর্মত্যাগীদের নেতা মিথ্যা-নবী মুসায়লামাসহ বিশ হাজার মুরতাদ ইহধাম ত্যাগ করে। মুসলিম বাহিনীর বারোশ যোদ্ধা শহিদ হন, যাদের মাঝে চারশ ছিলেন কুরআনের হাফেজ মুহাজির-আনসার সাহাবি। ইতিপূর্বে কোনো যুদ্ধে এত সাহাবি শহিদ হননি।
ইয়ামামার যুদ্ধে বীরত্ব ও সাহসিকতা এবং ত্যাগ ও আত্মনিবেদনের বিভিন্ন দৃষ্টান্ত প্রকাশ পায়। যেমন:
• প্রচণ্ড যুদ্ধ চলাকালে রণক্ষেত্রে অটল-অবিচল থাকতে সাহাবায়ে কেরাম একে অপরকে উৎসাহ জোগাচ্ছিলেন এবং পরস্পরকে 'হে (সুরা) বাকারাওয়ালা' বলে আহ্বান করছিলেন।
• আনসারি সৈনিকদের ঝান্ডাবাহী ছাবিত বিন কায়স রাযি. কপূরমাখা কাফনের কাপড় পরিধান করে ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং মাটিতে গর্ত খুঁড়ে দু-পায়ের অর্ধেক নলা মাটিতে প্রোথিত করে যুদ্ধক্ষেত্রে দণ্ডায়মান ছিলেন। শহিদ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এভাবেই আপন স্থানে অবিচল থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যান।
• যুদ্ধে হজরত যায়দ বিন খাত্তাব রাযি.-এর শাহাদাতের পর আবু হুযায়ফা রাযি.-এর আজাদকৃত দাস সালিম মুসলিম বাহিনীর ঝান্ডা তুলে নেন। তখন মুহাজিরগণ তাকে বলে, সালিম! আমরা তোমার দিক থেকে কাফিরদের আক্রমণের আশঙ্কা করছি। উত্তরে সালিম বলেন, (যদি আমার দিক থেকে কাফিররা আক্রমণ করতে সক্ষম হয়) তাহলে তো আমি কুরআনের নিকৃষ্ট বাহক সাব্যস্ত হব।
• যুদ্ধ চলাকালে আবু হুযায়ফা রাযি. সঙ্গীদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেন, 'হে কুরআনের ধারকগণ, নিজেদের কীর্তি দ্বারা কুরআনকে সজ্জিত করো।' এরপর তিনি মুরতাদদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং শহিদ হয়ে যান।
• যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত দেখে মুরতাদ-বাহিনী একটি প্রাচীরবেষ্টিত বাগানে (৫৮) আশ্রয় নেয় এবং প্রবেশদ্বার বন্ধ করে দেয়। তখন বারা বিন মালিক রাযি. মুসলিম সৈন্যদের বলেন, তোমরা আমাকে উঠিয়ে বাগানের ভেতর ফেলে দাও। তার বারংবারের অনুরোধে সহযোদ্ধারা তাকে বর্শার সাহায্যে উঁচু করে প্রাচীরের ওপর দিয়ে ভেতরে ফেলে দেয়। তিনি একাই প্রাচীরদ্বারের সম্মুখে মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়াই করে দরজা খুলে দেন। ফলে মুসলিম বাহিনীর ভেতরে প্রবেশের পথ উন্মুক্ত হয়।
• ইয়ামামার যুদ্ধে মুহাজির সাহাবি আবু হুযায়ফা বিন উতবা রাযি. ও আনসারি সাহাবি আব্বাদ বিন বিশর রাযি. একই দিন শহিদ হন। নবীজি ইতিপূর্বে তাদের দুজনের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন জুড়ে দিয়েছিলেন।
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আলা ইবনুল হাযরামি রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি বাহিনী বাহরাইনে প্রেরিত হয়েছিল। এই মহান বুজুর্গ সেনাপতি শত্রুবাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করতে গিয়ে তার বাহিনী নিয়ে নির্দ্বিধায় সাগরবক্ষে নেমে গিয়েছিলেন।
বিশিষ্ট সাহাবি আবু হুরায়রা রাযি. উক্ত অভিযানে শরিক ছিলেন। তিনি বর্ণনা করেন— মুরতাদ-বাহিনী নৌযানের মাধ্যমে সাগর পাড়ি দিয়ে পালিয়ে গেল। এদিকে আমরা তাদের পশ্চাদ্ধাবন করতে সাগর পাড়ি দেওয়ার জন্য কোনো নৌযান খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন সেনাপতি আলা ইবনুল হাযরামি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন এবং বাহিনীকে সমুদ্রে নেমে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি দোয়া করেছিলেন,
يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ يَا حَكِيمُ يَا كَرِيمُ يَا أَحَدًا يَا صَمَدُ يَا حَيُّ يَا محني يَا قَيُّوْمُ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ. يَا رَبَّنَا أَجِزْنَا مِنْ هَذَا الْبَحْرِ».
হে মহান দয়াময়! হে প্রজ্ঞার আধার! হে করুণাময়! হে একক-অমুখাপেক্ষী ও স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা! হে চিরঞ্জীব! হে জীবনদাতা! হে চিরস্থায়ী! হে মহা সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী! আপনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। হে আমাদের রব! আমাদেরকে এ সমুদ্র পার করিয়ে দিন।
তিনি সৈন্যদেরকেও এ দোয়া পড়ার নির্দেশ দিলেন এবং সবাইকে সাগরে নেমে যেতে আদেশ করলেন। সকলে তার নির্দেশ পালন করল। আমরা পানির ওপর দিয়ে চলতে লাগলাম। আল্লাহর শপথ! আমাদের কারও পা বা ঘোড়ার খুর পর্যন্ত পানিতে ভেজেনি।
একাদশ হিজরি সনের বাকি অংশ মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেই অতিবাহিত হয়। সাহাবায়ে কেরাম এ সময় মোট এগারোটি বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করেন। আল্লাহর দ্বীনের হেফাজতের পথে তারা কোনো প্রকার ক্লান্তি বা অবসাদের শিকার হননি। পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছিল খলিফা আবু বকর রাযি., উমর রাযি., আলি রাযি. ও খলিফার পরামর্শশুরার সুদক্ষ তত্ত্বাবধানে। মহান আল্লাহ তাদের সকলের প্রতি দয়ার আচরণ করুন, তাদেরকে আপন রহমতে সিক্ত করুন।
এরপর শুরু হয় দ্বাদশ হিজরি সন। বিশেষ করে ইয়ামামার যুদ্ধসহ ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধে বহু সংখ্যক কুরআনের হাফেজ-কারি সাহাবি শহিদ হওয়ায় হজরত উমর রাযি. অত্যন্ত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তখনও পুরো কুরআন একত্রে সংকলিত হয়নি; বরং সাহাবায়ে কেরামের কাছে লিখিত বিভিন্ন অংশ বিক্ষিপ্ত অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল। সাহাবিদের অনেকের পূর্ণ কুরআন মুখস্থ থাকলেও লিপিবদ্ধ ছিল না। আর নবীজি যাদেরকে ওহি লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তারা যদিও যথাযথভাবে এ দায়িত্ব আদায় করেছিলেন; কিন্তু পুরো কুরআন তাদের কারও কাছে একত্রে সংরক্ষিত ছিল না; বরং বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। এ কারণে হজরত উমর রাযি. তার সংশয় ও দুশ্চিন্তার কথা খলিফা আবু বকর রাযি.-কে অবগত করেন।

টিকাঃ
৫৪. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৬/২৯৪।
৫৫. সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং ৩০৯৩।
৫৬. হজরত উমর রাযি.-এর উল্লেখকৃত হাদিসের প্রত্যুত্তরে আবু বকর রাযি.-এর প্রদত্ত এই উত্তর কুরআন-সুন্নাহর মর্মজ্ঞান ও শরিয়ত সম্পর্কে তার অনন্যসাধারণ জ্ঞানের উৎকৃষ্ট এক দলিল। আবু বকর রাযি. উমর রাযি.-কে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, নবীজির বর্ণিত 'আল্লাহর হক পরিত্যাগ' কথাটির অর্থগত ব্যাপকতায় নামাজ ও জাকাত উভয়টি অন্তর্ভুক্ত। কারণ, নামাজ হলো দৈহিক হক আর জাকাত হলো আর্থিক হক। আবু বকর রাযি. নামাজের যুক্তি দিয়ে উমর রাযি.-কে বুঝিয়েছেন যে, নামাজ পরিত্যাগকারীর ক্ষেত্রে তো তুমি-আমি সকলেই মানি যে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। আর জাকাত তো নামাজের মতোই আল্লাহর হক। সুতরাং উভয়টি পরিত্যাগের বিধান একই হবে। পবিত্র কুরআনের এক আয়াতেও হজরত আবু বকর রাযি.-এর এই দাবির সমর্থন পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
(فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَتُوا الزَّكُوةَ فَخَلُوا سَبِيْلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ ) তারা যদি তাওবা করে, নামাজ কায়েম করে এবং জাকাত আদায় করে, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দেবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [সুরা তাওবা: ০৫]
৫৭. বুযাখা : নজদের বনু তাঈ বা বনু আসাদের একটি জলাধারের নাম।
৫৮. বাগানটির অভ্যন্তরে প্রচুর সৈন্য নিহত হওয়ায় বাগানটিকে 'মৃত্যুর বাগিচা' নামকরণ করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00