📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উসামা বিন যায়দ রাযি.-এর নেতৃত্বে বাহিনী প্রেরণ

📄 উসামা বিন যায়দ রাযি.-এর নেতৃত্বে বাহিনী প্রেরণ


হজ সমাপ্ত করে মদিনায় ফিরে আসার পরই নবীজি সকলকে রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। তিনি আসন্ন অভিযানের জন্য সেনাপতি নির্ধারণ করেন উসামা বিন যায়দ রাযি.-কে। নবীজি তাকে তার পিতা যায়দ বিন হারিসা রাযি.-এর শাহাদাতের স্থানে যাওয়ার এবং বালকা ও ফিলিস্তিনভূমির দারুম অঞ্চলে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। অথচ ততদিনে নবীজির অন্তিম রোগযন্ত্রণা শুরু হয়ে গিয়েছিল।
যেহেতু উসামা বিন যায়দ রাযি. ছিলেন নবীন-যুবক সাহাবি (৪৪), তাই কেউ কেউ তাকে সেনাপতি নির্ধারণ করায় সমালোচনা করে মন্তব্য করে, প্রবীণ মুহাজির ও আনসার সাহাবিগণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও নবীজি একজন অল্প বয়সী ছেলেকে সেনাপতি নির্ধারণ করলেন! সমালোচনার কথা শুনে নবীজি তীব্র শিরপীড়া সত্ত্বেও মাথায় পট্টি বেঁধে মসজিদে উপস্থিত হন এবং সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'এখন যদি তোমরা উসামা বিন যায়দের নেতৃত্বের বিষয়ে সমালোচনা ও আপত্তি করো (তাহলে আশ্চর্যের কী আছে), ইতিপূর্বে তো তোমরা তার পিতার নেতৃত্ব নিয়েও সমালোচনা করেছিলে। আল্লাহর শপথ! সে অবশ্যই নেতৃত্বদানের উপযুক্ত ছিল। লোকজনের মধ্যে সে আমার সর্বাধিক প্রিয়পাত্র ছিল। তার অবর্তমানে উসামাও আমার সর্বাধিক প্রিয়পাত্র।'
এরপর সকলে দ্বিধাহীন চিত্তে উসামার নেতৃত্বে সমবেত হয়। মুসলিম বাহিনী রওনা হয়ে মদিনা হতে এক ফারসাখ দূরে জারফ নামক স্থানে পৌঁছার পর নবীজির রোগযন্ত্রণা বৃদ্ধি পাওয়ার সংবাদ আসায় অভিযান স্থগিত হয়। আল্লাহ পাকের ইচ্ছা ছিল, উসামার নেতৃত্বাধীন এ অভিযান হবে ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর খিলাফত আমলে প্রেরিত প্রথম অভিযান।

টিকাঃ
৪৪. উসামা বিন যায়দ রাযি. হিজরতের সাত বছর পূর্বে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। নবীজি যখন তাকে আসন্ন অভিযানের সেনাপতি নির্ধারণ করেন, তখন তার বয়স ছিল বিশ বছর।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 নবীজির ইন্তেকাল, পরম বন্ধুর সান্নিধ্যে গমন

📄 নবীজির ইন্তেকাল, পরম বন্ধুর সান্নিধ্যে গমন


হজ সম্পন্ন করে মদিনায় প্রত্যাবর্তনের দু-মাস পরই নবীজি অসুস্থতা অনুভব করতে থাকেন। মাঝেমধ্যেই তিনি প্রচণ্ড শিরপীড়া অনুভব করতেন এবং বলতেন, আহ! মাথাব্যথা! অসুস্থতার প্রথম দিকে নবীজি প্রচন্ড কষ্ট করে মসজিদে উপস্থিত হতেন এবং নামাজে ইমামতি করতেন। এরপর রোগযন্ত্রণা আরও বৃদ্ধি পেলে নবীজি আবু বকর রাযি.-কে ইমামতি করার নির্দেশ দেন।
ধীরে ধীরে নবীজির রোগযন্ত্রণা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অবশেষে উপস্থিত হয় পার্থিব জীবনের শেষ দিন। একাদশ হিজরি সনের ১২ রবিউল আউয়াল (৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাস) সোমবার। সকলে মসজিদে আবু বকর রাযি.-এর পেছনে ফজর নামাজে দণ্ডায়মান। সবার অগোচরে নবীজি আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাযি.-এর কামরার পর্দা সরিয়ে সারিবদ্ধ সাহাবিদের দিকে তাকান এবং মৃদু হাসেন। নবীজির উপস্থিতি অনুভব করে আবু বকর রাযি. ইমামের স্থান ছেড়ে পেছনে কাতারের দিকে সরে আসতে উদ্যত হন। তিনি ভেবেছিলেন, নবীজি জামাতে শরিক হতে চাচ্ছেন। আনাস রাযি. বলেন, সাহাবায়ে কেরাম নবীজিকে দেখে নামাজের মধ্যেই আনন্দিত হয়ে পড়েন। নবীজি হাতের ইশারায় তাদেরকে নামাজ সমাপ্ত করতে বলেন। এরপর নবীজি পর্দা ছেড়ে দিয়ে কামরায় ফিরে যান। নবীজির জীবদ্দশায় এরপর আর কোনো নামাজের ওয়াক্ত আসেনি।
চাশতের সময় নবীজির মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হয়। আম্মাজান আয়েশা রাযি. নবীজিকে তাঁর শরীরের সঙ্গে হেলান দিয়ে শোয়ান। এ সময় আবদুর রহমান বিন আবু বকর রাযি. মিসওয়াক হাতে কামরায় প্রবেশ করেন। আয়েশা রাযি. বর্ণনা করেন-
আমি নবীজিকে (আমার শরীরে) ভর দিয়ে রেখেছিলাম। আমি দেখলাম, তিনি মিসওয়াকের দিকে তাকিয়ে আছেন। বুঝতে পারলাম, তিনি মিসওয়াক করতে চাচ্ছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, মিসওয়াকটি আপনার জন্য নেব? নবীজি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। আমি মিসওয়াকটি নবীজির হাতে দিলে তার কাছে মিসওয়াকটি শক্ত মনে হলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমি চিবিয়ে নরম করে দেবো? নবীজি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালে আমি মিসওয়াকটি চিবিয়ে নরম করে নবীজির হাতে দিলাম। নবীজির সামনে একটি পাত্রে পানি রাখা ছিল। তিনি পানিতে হাত ভিজিয়ে চেহারায় বোলাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। নিঃসন্দেহে মৃত্যুর যন্ত্রণা বড় কঠিন! (৪৫)
মিসওয়াক শেষ করেই নবীজি তার আঙুল উত্তোলন করেন এবং ছাদের দিকে তাকান। নবীজির ঠোঁট মোবারক নড়ছিল। আম্মাজান আয়েশা রাযি. কান পেতে শুনতে পান যে, নবীজি বলছেন, 'নবী, সিদ্দিক, শহিদ ও সৎকর্মশীল—যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন, তাদের সঙ্গে (আমাকে মিলিত করুন)। হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়ার আচরণ করুন। আমাকে পরম বন্ধুর সঙ্গে মিলিত করুন। হে আল্লাহ, আমাকে পরম বন্ধুর সঙ্গে মিলিত করুন।'
নবীজি শেষ বাক্যটি তিনবার বলেন। এরপর নবীজির হাত ঝুঁকে পড়ে, তিনি পরম বন্ধুর সঙ্গে মিলিত হন।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য, আর আমরা তার কাছেই প্রত্যাবর্তন করব।
ইন্তেকালের সময় প্রিয় নবীজির বয়স ছিল তেষট্টি বছর।

টিকাঃ
৪৫. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪৪৪৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00