📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 অভিযানের প্রেক্ষাপট

📄 অভিযানের প্রেক্ষাপট


নবম হিজরির রজব মাসে (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে) তাবুক অভিযান সংঘটিত হয়। মদিনায় তখন চলছিল গ্রীষ্মের মৌসুম। গরমও ছিল প্রচণ্ড।
নবীজি সংবাদ পান যে, রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতিগণ মদিনায় হামলা চালাতে বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়েছে এবং আরব ভূখণ্ডের যেসব খ্রিষ্টান গোত্র তাদের অধীনস্থ ছিল, তারাও তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। মদিনার বাতাসে রোমানদের আসন্ন হামলার নানা সংবাদ উড়ে বেড়াতে থাকে। নবীজি সাহাবায়ে কেরামকে যুদ্ধে বের হতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং সকলে যেন যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারে, এ উদ্দেশ্যে আপন নীতির ব্যতিক্রম করে ঘোষণার মাধ্যমে গন্তব্যের কথা জানিয়ে দেন।
তখন ছিল ফল পাকার মৌসুম, কিছুদিন পরই পাকা ফল সংগ্রহ করতে হবে। গরমও ছিল প্রচণ্ড। মদিনায় তখন প্রচণ্ড অভাব ও দুর্ভিক্ষ। বাহনজন্তুরও বড় অভাব। এমন সময় সবাই ফল-ফসল ও ছায়ার মাঝেই থাকতে চাচ্ছিল। তাৎক্ষণিকভাবে কেউ যুদ্ধে যেতে চাচ্ছিল না। তদুপরি ছিল পথের দূরত্ব ও দুর্গমতা।
অভিযান-প্রস্তুতির জন্য নবীজি সকলকে ত্যাগ-কুরবানি ও দানের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন। ফলে মুমিনগণ আপন আপন সম্পদ ব্যয়ে অগ্রগামী হতে সচেষ্ট হয়। হজরত উসমান বিন আফফান রাযি., আবদুর রহমান বিন আওফ রাযি., আবু বকর সিদ্দিক রাযি., উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি., আব্বাস রাযি., তালহা রাযি., মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাযি. প্রমুখ শ্রেষ্ঠ সাহাবিগণ এ ক্ষেত্রে অগ্রগামী ছিলেন। প্রত্যেকেই আল্লাহর কাছে আজর ও প্রতিদান প্রাপ্তির আশায় সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দান করে দেন।
মদিনার মুনাফিকরা গরমের অজুহাত দেখিয়ে সুস্পষ্ট ভাষায় যুদ্ধ হতে দূরে থাকার কথা ঘোষণা করে এবং অন্যদেরকেও অভিযানে যোগ না দিতে প্ররোচিত করে। বিপরীতে নিষ্ঠাবান অনেক মুসলমান প্রচণ্ড দরিদ্রতা সত্ত্বেও নবীজির সঙ্গে জিহাদে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা নবীজির দরবারে যুদ্ধযাত্রার জন্য সাওয়ারির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আবেদন জানায়।
নবীজি অপারগতা প্রকাশ করলে তারা যখন বিফল মনোরথে ফিরে যাচ্ছিল, তখন দুঃখে তাদের দু-চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। বস্তুত তাবুক অভিযান ছিল মুনাফিকদের কপটতা ও মুখলিস-একনিষ্ঠ মুমিনদের ঈমানি পরিচয় যুগপৎ উন্মোচনকারী।
ত্রিশ হাজার সৈন্যের বাহিনী নিয়ে নবীজি রওনা হন। প্রতি দু-তিনজনের জন্য পালাক্রমে আরোহণের জন্য একটি করে উট ছিল। মুসলিম বাহিনীর মূল ঝান্ডা ছিল আবু বকর সিদ্দিক রাযি.-এর হাতে। মুহাজিরদের পতাকা ছিল যুবায়র ইবনুল আওয়াম রাযি.-এর হাতে, আওস গোত্রের পতাকা ছিল উসায়দ বিন হুযায়র রাযি.-এর হাতে এবং খাযরাজ গোত্রের পতাকা ছিল হুবাব ইবনুল মুনযির রাযি.-এর হাতে। বাহিনীর সেনাপতি নিযুক্ত করা হয় আব্বাদ বিন বিশর রাযি.-কে।
মুসলিম বাহিনী তাবুকে পৌঁছার পর রোমানদের সৈন্যসমাবেশের কোনো লক্ষণ দেখতে না পেয়ে দশ-বারো দিন সেখানে অবস্থান করে। এরই মধ্যে (রোমান করদরাজ্য) আয়লা অঞ্চলের প্রশাসক ইউহান্না এবং জারবা ও আযরুহ-এর অধিবাসীগণ নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জিজিয়া প্রদানের শর্তে সন্ধি করে। নবীজি তাদেরকে সন্ধিনামা প্রদান করেন।
মদিনা হতে তায়েফ গমন, তায়েফ হতে মদিনায় প্রস্থান এবং তায়েফে অবস্থান—সবমিলিয়ে তাবুক অভিযানে পঞ্চাশ দিন সময় লেগেছিল। মুসলিম বাহিনী নবম হিজরির রমজান মাসে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 নবম হিজরিতে আবু বকর রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলমানদের হজ সম্পাদন

📄 নবম হিজরিতে আবু বকর রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলমানদের হজ সম্পাদন


তাবুক অভিযান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর নবীজি হজ আদায়ের মনস্থ করেন। কিন্তু পরে নবীজি ইরশাদ করেন, হজের সময় মুশরিকরাও • (মসজিদে হারামে) উপস্থিত হবে এবং বিবস্ত্র হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করবে। এ অবস্থার নিরসন না হওয়া পর্যন্ত আমি হজ করতে চাচ্ছি না। নবীজি আবু বকর রাযি.-কে হজে প্রেরণ করেন। এরপর আলি রাযি.-কে এই মর্মে প্রেরণ করেন যে, তিনি ও আবু বকর রাযি. যেন ঘোষণা করে দেন—আগামী বছর থেকে মুশরিকরা হজ করতে পারবে না। আর মুশরিকদের ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার জন্য চার মাসের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। চারমাস শেষ হওয়ার পর মুশরিকদের সঙ্গে লড়াই ব্যতীত ভিন্ন কোনো পথ থাকবে না।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আরবের বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের আগমন ও ইসলামগ্রহণ

📄 আরবের বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের আগমন ও ইসলামগ্রহণ


মক্কাবিজয় ও তাবুক অভিযানের পর ছাকিফ গোত্র ঈমান আনে এবং নবীজির হাতে বায়আত গ্রহণ করে। এরপর আরবের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একে একে প্রতিনিধিদল নবীজির দরবারে আগমন করতে থাকে। মূলত পুরো আরব ইসলামের অনুপম আদর্শের সামনে মাথা নত করতে আরও আগ থেকেই উন্মুখ ছিল। কুরাইশরা কী করে, তারা তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল। কারণ, কুরাইশ সম্প্রদায় ছিল আরবের নেতৃত্বের আসনে, তারাই ছিল বায়তুল্লাহ ও হারামের তত্ত্বাবধায়ক। যখন মক্কা বিজিত হয় এবং কুরাইশ গোত্র ইসলামের বশীভূত হয়, তখন সমগ্র আরব উপলব্ধি করে যে, ইসলামের নবীর সঙ্গে শত্রুতা বা যুদ্ধ করার শক্তি তাদের নেই। তাই তারা দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে সমবেত হতে থাকে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللهِ وَ الْفَتْحُ وَ رَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِيْنِ اللَّهِ أَفْوَاجًا فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং আপনি মানুষকে দেখবেন আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে, তখন আপনি আপন প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তার পবিত্রতা ঘোষণা করুন এবং তার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল। [সুরা নাসর : ১-৩]

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 বিদায় হজ

📄 বিদায় হজ


দশম হিজরি সনে (৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে) নবীজি ঘোষণা করেন—তিনি এ বছর হজে গমন করবেন। ফলে মদিনায় এক লক্ষের অধিক মুসলমানের সমাবেশ ঘটে। সকলেই চাচ্ছিলেন নবীজির অধীনে হজ করে নবীজির হজকর্ম অনুসরণ করতে। নবীজি ২৫ জিলকদ মদিনা হতে রওনা হন এবং যুলহুলায়ফা হতে হজ ও উমরার ইহরাম করেন।
“বড় চিত্তাকর্ষক ও গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং মর্মস্পর্শী ও আবেগপূর্ণ এক দৃশ্য! হৃদয় যেন খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়, নয়নযুগল অশ্রুতে সিক্ত হয়! ইতিহাস যেন থমকে দাঁড়ায়, শ্রদ্ধায় ও মর্যাদায় অবনত হয়ে যায়! তিনিই তো সেই ব্যক্তি, যিনি তার দাওয়াতের মিশন শুরু করেছিলেন সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ-একা কী, পুরো আরব দাঁড়িয়েছিল তার বিরুদ্ধে। সবাই তার বিরুদ্ধে লড়েছে সামর্থ্য ও শক্তির সবটুকু দিয়ে। আজ তারাই সকলে তার পেছনে সমবেত হয়েছে এবং তার অনুসরণ করছে! আর সেদিনের সেই নিঃসঙ্গ ‘তিনি’ আজ আপন রবের সামনে বিনয়ে অবনত হয়ে, দয়া ও প্রীতির বন্ধনে সকলকে আবদ্ধ করে চলছেন সকলকে নেতৃত্ব দিয়ে।”
ইহরাম শেষে নবীজি পুনরায় পথ চলা শুরু করেন। তিনি সকলকে হজের বিধিবিধান, সুন্নাহ ও করণীয় শিখিয়ে দেন। নবীজি আরাফার দিন সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুসমৃদ্ধ এক ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণে তিনি ইসলামের ভিত্তি ও বিধানসমূহ বর্ণনা করেন, শিরক ও জাহিলিয়াতের ভিত্তি ও প্রথাসমূহ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং অন্যের জানমাল, ইজ্জত-আবরুসহ যেসব বিষয়ের মর্যাদারক্ষার বিধান সকল আসমানি ধর্মে ছিল, সেগুলোর মর্যাদা সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করেন।
নবীজি জাহিলি যুগের সকল কুপ্রথার মূলোৎপাটন করেন, নারীদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেন এবং বিভিন্ন ফিতনা সম্পর্কে সকলকে সতর্ক করেন। সবশেষে নবীজি সকল মুসলমানকে কুরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার আহ্বান জানান। কেননা, এ দুটিই হলো ভ্রষ্টতা ও বিপথগামিতা থেকে উম্মাহর নিষ্কৃতির প্রকৃত অবলম্বন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00