📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 অভিযানের প্রেক্ষাপট

📄 অভিযানের প্রেক্ষাপট


মক্কাবিজয়ের দু-সপ্তাহেরও কম সময় পর নবীজির কাছে সংবাদ পৌঁছায় যে, হাওয়াযিন ও ছাকিফ গোত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সৈন্য সমবেত করেছে এবং বলাবলি করছে যে, মুসলমানরা আমাদের ওপর আক্রমণ করার পূর্বে আমরাই তাদের ওপর হামলা চালাব।
পথিমধ্যে তাদের সঙ্গে কায়স ও আয়লান গোত্রের কিছু শাখাও মিলিত হয়েছে এবং ইতিমধ্যে তারা হুনায়ন প্রান্তরে পৌঁছে গেছে। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে মালিক বিন আওফ নাছরি। সংবাদ পেয়ে নবীজি সিদ্ধান্ত নেন— কাফির বাহিনী মক্কায় আকস্মিক হামলা চালিয়ে পবিত্র মক্কা নগরীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার পূর্বেই তিনি তাদের ওপর আক্রমণ চালাবেন।
ন নবীজি বারো হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে রওনা হন। তাদের মধ্যে দু-হাজার ছিলেন নওমুসলিম, যাদের ইসলামগ্রহণের পর হাতেগোনা মাত্র কয়েকদিন অতিবাহিত হয়েছে। বিশাল মুসলিম বাহিনীর কেউ কেউ স্বগতোক্তি করে বলে ওঠে, আজ আর যাই হোক, সংখ্যাস্বল্পতার কারণে আমরা পরাভূত হব না।
হাওয়াযিন বাহিনী মুসলিম বাহিনীর পূর্বেই হুনায়ন প্রান্তরে পৌঁছে যায় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করে। তারা হুনায়ন প্রান্তরের বিভিন্ন গিরিপথ, বাঁকা মোড় ও গাছপালার পাশে সৈন্যদল মোতায়েন করে এবং অগ্রবর্তী মুসলিম বাহিনীকে ফাঁদে ফেলার জন্য উপত্যকার সম্মুখ অংশে এবং বিভিন্ন ঝোপের আড়ালে গুপ্তবাহিনী মোতায়েন করে। মুসলিম বাহিনীর অশ্বারোহী অংশ হুনায়ন প্রান্তরে প্রবেশ করতেই শত্রুপক্ষের তীব্র তিরবৃষ্টির মুখোমুখি হয়। আকস্মিক এই হামলায় মুসলিম বাহিনী আতঙ্কিত হয়ে বিক্ষিপ্ত ও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। নবীজি ও তার সঙ্গে আশিজন মুহাজির ও আনসারি সাহাবি শত্রুপক্ষের প্রবল হামলার মুখে রণক্ষেত্রে অটল-অবিচল থেকে লড়াই চালিয়ে যান। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—আবু বকর রাযি., উমর রাযি., আলি রাযি., আব্বাস রাযি., উসামা বিন যায়দ রাযি. ও আবু সুফিয়ান বিন হারিস রাযি.। নবীজি তখন বলছিলেন,
أَنَا النَّبِيُّ لَا كَذِبُ * أَنَا ابْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبْ»
আমিই সত্য নবী, মিথ্যাবাদী নই আমি। (বীর) আবদুল মুত্তালিবের পুত্র (বংশধর) আমি।
নবীজি তার চাচা আব্বাস রাযি.-কে উচ্চ আওয়াজে মুসলিম বাহিনীকে আহ্বান করতে নির্দেশ দেন। আব্বাস রাযি. ছিলেন দরাজ কণ্ঠের অধিকারী। তিনি উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে বলতে থাকেন, হে আনসার, হে রিজওয়ানের বায়আতকারীগণ, ছুটে এসো। তার আহ্বান শুনে সকলে পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে আসে। আল্লাহ তাআলা সকলের অন্তরে প্রশান্তি সঞ্চার করেন এবং মুসলিম বাহিনীর সহায়তায় তাঁর অদৃশ্য বাহিনী অবতীর্ণ করেন। মুসলিম বাহিনী একযোগে হামলা চালিয়ে মুশরিকদের পরাভূত করে। মুশরিক বাহিনী এবার তাদের নারী, শিশু, ধনসম্পদ ও যুদ্ধসামগ্রী সব ফেলে ময়দান থেকে পলায়ন করে। মুসলমানরা লাভ করে প্রভূত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ।
শত্রুবাহিনীর একটি অংশ আওতাস উপত্যকায় পুনরায় সমবেত হলে নবীজি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আবু আমির আশআরি রাযি.-এর নেতৃত্বে একটি ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করেন। অভিযান চলাকালে আবু আমির আশআরি রাযি. শহিদ হলে তার ভ্রাতুষ্পুত্র আবু মুসা আশআরি রাযি. তার স্থলাভিষিক্ত হন। উক্ত বাহিনী শত্রুপক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 তায়েফ অবরোধ

📄 তায়েফ অবরোধ


হাওয়াযিন গোত্রপতি মালিক বিন আওফ ও তাঁর কিছু সঙ্গী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে তায়েফে পৌঁছে যায় এবং সেখানে দুর্গে আশ্রয় নেয়। দুর্গের ভেতরে তারা প্রচুর খাদ্যদ্রব্যও মজুত করে নেয়। মুসলিম বাহিনী তাদের অবরোধ করলে তারা দুর্গের ভেতর থেকে বৃষ্টির ন্যায় তির নিক্ষেপ করতে থাকে। তিরের আঘাতে সাইদ বিন সাইদ ইবনুল আস রাযি. ও নবীজির ফুফাতো ভাই আবদুল্লাহ বিন আবু উমাইয়া রাযি. শহিদ হন, আহত হন আবু বকর রাযি.-এর পুত্র আবদুল্লাহ রাযি.।
মুসলিম বাহিনী আঠারো দিন তায়েফ দুর্গ অবরোধ করে রাখে। এরপর নবীজি অবরোধ প্রত্যাহার করে প্রস্থানের সিদ্ধান্ত নেন এবং ঘোষণা করেন, ইনশাআল্লাহ! (আগামীকাল) আমরা চলে যাব।
তখন কতক সাহাবি প্রশ্ন করেন, তায়েফ জয় না করেই আমরা ফিরে যাব?!
তাদের কথা শুনে নবীজি বলেন, ঠিক আছে; তাহলে কাল সকালে আমরা যুদ্ধ করব। পরদিন যুদ্ধে অনেকে আহত হয়। দিন শেষে নবীজি পুনরায় ঘোষণা করেন, আগামীকাল আমরা ফিরে যাব। এবার সকলে সন্তুষ্টচিত্তে নবীজির ঘোষণা মেনে নেয়। নবীজি তাদের অবস্থা দেখে মৃদু হাসেন।
কতক সাহাবি নবীজিকে বনু ছাকিফের বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে অনুরোধ করলে নবীজি দোয়া করেন,
«اللَّهُمَّ اهْدِ ثَقِيفًا وَائْتِ بِهِمْ مُسْلِمِينَ»
হে আল্লাহ, বনু ছাকিফকে হেদায়েত দান করো। তাদেরকে মুসলমান বানিয়ে দাও।
বছর না ঘুরতেই আল্লাহ তাআলা বনু ছাকিফকে হেদায়েত দান করেন। নিজেদের ইসলামগ্রহণের কথা ঘোষণা করতে মদিনায় তারা একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। (৪৩)

টিকাঃ
৪৩. বনু ছাকিফের প্রতিনিধিদল নবম হিজরির রমজান মাসে নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্রষ্টব্য: নবীজির আনসারপ্রীতি

📄 দ্রষ্টব্য: নবীজির আনসারপ্রীতি


নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হুনায়ন যুদ্ধে প্রাপ্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মক্কার কুরাইশ সম্প্রদায় ও অন্যান্য নওমুসলিম গোত্রকে বণ্টন করে দিলেন; আনসারদের কিছুই দিলেন না, তখন আনসাররা মন খারাপ করল এবং বলল, আল্লাহ তার রাসুলকে ক্ষমা করুন, তিনি কুরাইশদের দিলেন, আমাদের দিলেন না। অথচ আমাদের তরবারি এখনো তাদের রক্তে রঞ্জিত!
নবীজির কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি আনসারদের সমবেত হতে বললেন। সকলে নির্ধারিত স্থানে সমবেত হলো, সেখানে তারা ব্যতীত অন্য কেউ ছিল না। নবীজি তাদের সামনে দণ্ডায়মান হয়ে প্রথমে আল্লাহ তাআলার যথোপযুক্ত প্রশংসা করলেন। এরপর বললেন, হে আনসারগণ, তোমরা এরূপ মন্তব্য করেছ কি? এটা কি সত্য নয় যে, আমি যখন তোমাদের কাছে উপস্থিত হয়েছি, তখন তোমরা ছিলে পথভ্রষ্ট; অনন্তর আল্লাহ তোমাদেরকে আমার মাধ্যমে পথপ্রদর্শন করেছেন। তোমরা কি পরস্পরে বিচ্ছিন্ন ছিলে না; অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদের মাঝে প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি নিঃস্ব ও পরমুখাপেক্ষী ছিলে না, অতঃপর আল্লাহ আমার মাধ্যমে তোমাদেরকে সচ্ছল জীবন দান করেছেন।
নবীজি যে প্রশ্নই করছিলেন, আনসারি সাহাবিরা উত্তর দিচ্ছিল, অবশ্যই! আমাদের ওপর আল্লাহ ও তার রাসুলের অপার দয়া, অগুনতি অনুগ্রহ। এরপর নবীজি বললেন, হে আনসারগণ, তোমরা কি আমাকে জবাব দেবে না? আনসারগণ বললেন, আল্লাহর রাসুল, আমরা কী জবাব দেবো? যাবতীয় করুণা ও অনুগ্রহ-দান তো আল্লাহ ও তার রাসুলেরই।
নবীজি বললেন, আল্লাহর শপথ! তোমরা চাইলে এ কথা বলতে পার যে, (মক্কাবাসী) আপনাকে অবিশ্বাস করার পর আপনি যখন আমাদের কাছে এসেছিলেন, তখন আমরাই তো আপনাকে সত্যায়ন করেছি। আপনি নিঃসঙ্গ অবস্থায় এসেছিলেন, আমরাই আপনার প্রতি সহায়তার হাত প্রসারিত করেছি। আপনাকে উপেক্ষা করা হয়েছিল, তখন আমরাই আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি। আপনি নিঃস্ব ছিলেন, আমরাই আপনার প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করেছি।
হে আনসারগণ, তোমরা পার্থিব তুচ্ছ কিছু সম্পদের জন্য আল্লাহর রাসুলের প্রতি মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছ! আমি তো এ সম্পদ দ্বারা কিছু লোককে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে চেয়েছি, যেন তারা নিষ্ঠাবান মুসলমানে পরিণত হয়। আর তোমাদেরকে তোমাদের (মহাসম্পদ) ইসলামের ওপর সোপর্দ করেছি।
হে আনসাররা, তোমরা কি এতে খুশি নও যে, অন্যরা উট-বকরি নিয়ে বাড়ি ফিরবে আর তোমরা বাড়ি ফিরবে আল্লাহর রাসুলকে সঙ্গে নিয়ে? ওই মহান সত্তার শপথ, যার কুদরতি হাতে আমার প্রাণ! যদি হিজরত না হতো, তবে আমিও একজন আনসার হতাম (আমার জন্ম হতো আনসারদের মধ্যেই)। মনে রেখো, যদি সকল মানুষ এক পথে চলে আর আনসাররা চলে অন্য পথে, তাহলে আমি আনসারদের পথেই চলব। হে আল্লাহ, আপনি আনসারদের রহম করুন, আনসার-সন্তানদের প্রতি দয়ার আচরণ করুন এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মদের প্রতিও দয়া ও করুণা করুন।
নবীজির বক্তব্য শেষ হতে উপস্থিত আনসারি সাহাবিরা কান্নায় ভেঙে পড়ল। অশ্রুতে তাদের মুখমণ্ডল ও দাড়ি সিক্ত হয়ে গেল। তারা সমস্বরে বলল, বণ্টনে আল্লাহ ও তার রাসুলকে পেয়ে আমরা সন্তুষ্ট।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00