📄 মক্কাবিজয়ের প্রেক্ষাপট
হাফেজ ইবনুল কায়্যিম রহ. লিখেছেন,
এটি সেই মহান বিজয়, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আপন দ্বীন ও রাসুলকে এবং তার বিশ্বস্ত বাহিনী ও জামাতকে মর্যাদাশীল করেছেন। এ মহান বিজয়ের মাধ্যমেই তিনি কাফির-মুশরিকদের থেকে দখলমুক্ত করেছেন তাঁর পবিত্র নগরীকে এবং তাঁর সেই মোবারক গৃহকে; যাকে তিনি পৃথিবীবাসীর জন্য হেদায়াতের মাধ্যম বানিয়েছেন। এটিই সেই মহান বিজয়, যার কারণে আকাশের অধিবাসীদের মাঝে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গিয়েছিল। সুউচ্চ-সমুজ্জ্বল আর্দ্রা তারকার কক্ষপথে যেন এ বিজয়ের মর্যাদা- তাঁবু প্রোথিত! এ বিজয়ের ফলেই মানুষ দলে দলে আল্লাহ পাকের দ্বীনে প্রবেশ করতে শুরু করে এবং ভূপৃষ্ঠ যেন আনন্দ ও চমকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। (৪২)
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে—হুদায়বিয়া সন্ধির পর খুযাআ গোত্র নবীজির সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেছিল আর বনু বকর মিত্রতা স্থাপন করেছিল কুরাইশ গোত্রের সঙ্গে। কিছুদিন পর পুরোনো শত্রুতার জের ধরে বনু বকর খুযাআ গোত্রের ওপর হামলা চালায়। তখন কুরাইশরাও তাদের মিত্র বনু বকরের সঙ্গে মিলে বনু খুযাআর ওপর হামলায় অংশ নেয়, যা ছিল হুদায়বিয়া সন্ধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। হুদায়বিয়ার সন্ধিতে এই শর্ত উল্লেখ ছিল যে, কুরাইশরা মুসলমানদের বা মুসলমানদের মিত্রদের ওপর আক্রমণ করবে না। মিত্রতার দাবিতে বনু খুযাআ নবীজির কাছে সাহায্যের আবেদন জানালে নবীজি তাদেরকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন এবং মক্কাবিজয়ের প্রস্তুতি শুরু করেন। নবীজি বিশিষ্ট কয়েকজন সাহাবিকেও তার মক্কা-অভিযানের সংকল্পের কথা জানান এবং তাদেরকে প্রস্তুতি নিতে বলেন। নবীজি দোয়া করেন-
«اللَّهُمَّ خُذِ الْعُيُونَ وَالْأَخْبَارَ عَنْ قُرَيْشٍ حَتَّى نَبْغَتَهَا فِي بِلَادِهَا»
হে আল্লাহ, যতক্ষণ না আমরা কুরাইশদের ভূমিতে (তাদের অগোচরে) হঠাৎ উপস্থিত হই, ততক্ষণ পর্যন্ত গুপ্তচর ও যুদ্ধবার্তা তাদের কাছে পৌঁছতে দেবেন না।
টিকাঃ
৪২. ইবনুল কায়্যিমিল জাওযিয়্যা, যাদুল মাআদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ, ৩/৩৪৭।
📄 কৃতকর্মের জন্য কুরাইশদের অনুতাপ
এদিকে কুরাইশরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে যে, গোত্রের অবিবেচক কিছু লোক কী মারাত্মক ভুল করে ফেলেছে। তারা এর প্রতিকারবিধানের মনস্থ করে এবং চুক্তি নবায়নের জন্য নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আবু সুফিয়ানকে মদিনায় প্রেরণ করে। কিন্তু নবীজি আবু সুফিয়ানের কৈফিয়ত গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান।
দশ হাজার সৈন্যের বাহিনী নিয়ে নবীজি মক্কার উদ্দেশে রওনা হন। রাবিগের নিকটবর্তী জুহফা নামক স্থানে পৌঁছে নবীজি হজরত আব্বাস রাযি.-এর সঙ্গে মিলিত হন। আব্বাস রাযি. তখন হিজরত করে মদিনায় যাচ্ছিলেন। মাররায যাহরান-এ পৌঁছে নবীজি যখন অস্থায়ী ছাউনি স্থাপন করেন, তখন আবু সুফিয়ান নবীজির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য উপস্থিত হন। আব্বাস রাযি. তাকে দেখতে পেয়ে নবীজির দরবারে নিয়ে আসেন। আবু সুফিয়ান নবীজির সামনে উপস্থিত হয়ে ইসলামগ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। এরপর আবু সুফিয়ান রাযি. মক্কায় ফিরে যান এবং মক্কাবাসীকে মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হতে বারণ করেন।
📄 দ্রষ্টব্য : বদরি সাহাবিগণের অত্যুচ্চ মর্যাদা-বৈশিষ্ট্য
সাহাবি হাতিব বিন আবু বালতাআ রাযি. জানতেন যে, নবীজি মক্কায় অভিযান পরিচালনার সংকল্প করেছেন। তিনি নবীজির সংকল্পের সংবাদ জানিয়ে মক্কাবাসীর উদ্দেশে একটি পত্র লেখেন এবং মুযায়না গোত্রের এক নারীর মাধ্যমে তা মক্কায় প্রেরণ করেন। মহিলাটি চুলের গোছার মধ্যে পত্রটি লুকিয়ে মক্কায় রওনা হয়। নবীজি ওহির মাধ্যমে বিষয়টি অবগত হয়ে হজরত আলি রাযি. ও হজরত যুবায়র রাযি.-কে পত্রটি উদ্ধারের জন্য প্রেরণ করেন। সাহাবিদ্বয় নবীজির নির্দেশনা মোতাবেক নির্ধারিত স্থানে গিয়ে মহিলার কাছ থেকে পত্রটি উদ্ধার করে নবীজির দরবারে ফিরে আসেন। এরপর নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতিবকে ডেকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেন, 'আল্লাহর রাসুল, অনুগ্রহ করে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যাবেন না। আল্লাহর শপথ! আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাসী। আমি মুরতাদও হইনি, আমার ঈমানে কোনো পরিবর্তনও আসেনি। বিষয় হলো—আমি মক্কায় বসবাস করলেও কুরাইশ বংশীয় নই (তিনি ইয়ামেনি বংশোদ্ভূত ছিলেন)। আমার পরিবার বর্তমানে মক্কায় আছে; কিন্তু সেখানে আমার কোনো আত্মীয়স্বজন নেই, যারা আমার পরিবারের দেখাশোনা করবে। আপনার সঙ্গে অন্য যারা আছে, তাদের পরিবারের দেখাশোনার জন্য তো তাদের আত্মীয়স্বজন মক্কায় আছে। আমি চেয়েছিলাম, এই উপকারটুকুর বিনিময়ে আমি কুরাইশদের আস্থা লাভ করব এবং তারা আমার পরিবার-সন্তানদের দেখাশোনা করবে।'
এ সময় দরবারে উপস্থিত হজরত উমর রাযি. আরজ করেন, 'আল্লাহর রাসুল, আমাকে অনুমতি দিন, আমি এর শিরশ্ছেদ করি। এ তো আল্লাহ ও রাসুলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে! এ তো মুনাফিক হয়ে গেছে!' তখন নবীজি উমরকে উত্তর দেন, 'উমর, হাতিব বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তুমি কি জানো, আল্লাহ তাআলা বদরিদের অন্তরের নিষ্ঠার বিষয়ে অবগত হয়েই তাদেরকে বলেছেন, 'যা ইচ্ছা করতে পারো, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।'
নবীজির কথা শুনে উমরের দু-চোখ বেয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে থাকে। তিনি বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই সর্বজ্ঞ।