📄 মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ও সেনাপতি নির্বাচন
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই অভিযানের জন্য তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। তিনি বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেন যায়দ বিন হারিসা রাযি.-কে। এরপর বলেন, যদি যায়দ নিহত হয়, তাহলে জাফর নেতৃত্ব গ্রহণ করবে। জাফরও নিহত হলে নেতৃত্ব গ্রহণ করবে আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা। নবীজি মুসলিম বাহিনীকে হারিস বিন উমায়র রাযি.-এর শহিদ হওয়ার এলাকায় গমনের এবং সেখানকার অধিবাসীদের ইসলামের দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ দেন। নবীজি বলেন, তারা যদি দাওয়াত কবুল করে, তাহলে তো ভালো; অন্যথায় আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে।
মুসলিম বাহিনী সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে শামের বালকা অঞ্চলের মুতা নামক এলাকায় পৌঁছার পর শত্রুবাহিনী কর্তৃক পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ার আশঙ্কায় সেখানেই শিবির স্থাপন করে। মুসলমানরা সেখানে পৌঁছার পর সংবাদ পায় যে, রোমানরা মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য দুই লক্ষের অধিক সৈন্য সমবেত করেছে। এ সংবাদ পেয়ে মুসলিম বাহিনী নিজেদের করণীয় নির্ধারণ করতে পরামর্শে বসে। পরামর্শের বিষয় ছিল-বিশাল শত্রুবাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য মদিনা থেকে সাহায্য তলব করা হবে, নাকি উপস্থিত প্রস্তুতি নিয়েই শত্রুর মোকাবিলা করা হবে। যুদ্ধ তো সৈন্যসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। মুসলিম বাহিনী অতিরিক্ত সাহায্যের অপেক্ষায় থাকলে শত্রুবাহিনী তাদেরকে সে অবকাশ না-ও দিতে পারে। পরামর্শসভায় আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা রাযি. সকলকে উদ্দেশ্য করে বলেন-
আরে! যে শাহাদাতের মৃত্যুকে তোমরা আজ এড়িয়ে যেতে চাইছ, তার অন্বেষণেই তো বের হয়েছিলে! আমরা মুসলমানরা তো কারও বিরুদ্ধে সংখ্যা ও শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে যুদ্ধ করি না। আমরা যুদ্ধ করি কেবল এই দ্বীনের বলে বলীয়ান হয়ে, যা দ্বারা আল্লাহ আমাদের মর্যাদাবান করেছেন। আল্লাহর শপথ! আমি বদর যুদ্ধের দিন দেখেছি, আমাদের মাত্র দুটি ঘোড়া ছিল, উহুদ যুদ্ধে ছিল মাত্র একটি ঘোড়া। সুতরাং (সব ধরনের অমূলক চিন্তা বাদ দিয়ে) সকলে সামনে অগ্রসর হও। আমাদের সামনে দুই নিশ্চিত সুপরিণতির একটি প্রতীক্ষা করছে-হয় শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে বিজয়; আমাদের নবী তো আমাদের এর প্রতিশ্রুতিই দিয়েছেন আর তার প্রতিশ্রুতি কক্ষনো ভুল হয় না, অথবা (চির আরাধ্য) শাহাদাতের মৃত্যু; তাহলে তো আমরা জান্নাতে আমাদের ভাইদের সঙ্গে মিলিত হব।
আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহার বক্তব্য শুনে সকলেই নবোদ্যমে বলীয়ান হয়ে ওঠে এবং শত্রুর মোকাবিলায় অগ্রসর হয়।
শুরু হয় দীর্ঘ সাতদিনব্যাপী এক প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী লড়াই। যেন এক অনিঃশেষ যুদ্ধ! মাত্র তিন হাজার সৈন্য মুখোমুখি হয়েছে দুই লক্ষ সৈন্যের! পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করছে এক বিস্ময়কর ঘটনা। সকলে হতবাক! এ-ও কি সম্ভব! কিন্তু ঈমানের পুষ্পিত বসন্ত যখন আগমন করে, তখন তো এমন বিস্ময়ই উপহার দেয়!
একটানা যুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধের পাল্লা কখনো এদিকে হেলে পড়ে, কখনো ওদিকে। ষষ্ঠ দিনে এসে যুদ্ধ যেন চরমে পৌঁছায়। মুসলিম সেনাপতি যায়দ বিন হারিসা রাযি. শহিদ হয়ে যান। পতাকা তুলে নেন জাফর বিন আবু তালিব রাযি.। প্রবল বিক্রমে লড়াই করতে করতে কিছুক্ষণ পর তিনিও শহিদ হয়ে যান। এরপর পতাকা তুলে নেন আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা রাযি.। লড়াই করতে করতে তিনিও যায়দ ও জাফরের সঙ্গী হন। তখন আজলান গোত্রের ছাবিত বিন আকরাম নামক জনৈক সাহাবি মুসলিম বাহিনীর ঝান্ডা তুলে নিয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর হাতে সোপর্দ করেন। সেদিনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাতে খালিদ বিন ওয়ালিদ রোমান সৈন্যদের বিভ্রান্ত করতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মুসলিম বাহিনীর ডান বাহুর সৈন্যদের বাম বাহুতে, বাম বাহুর সৈন্যদের ডান বাহুতে, সামনের অংশের সৈন্যদের পেছনের অংশে এবং পেছনের অংশের সৈন্যদের সামনের অংশে বিন্যস্ত করেন। পাশাপাশি তিনি অশ্বারোহী বাহিনীর একটি অংশকে মুতার পেছনে সঙ্গোপনে লুকিয়ে থাকতে এবং পরের দিন প্রচণ্ড যুদ্ধ চলাকালে উচ্চৈঃস্বরে তাকবির-ধ্বনি দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে নির্দেশ দেন। খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর প্রত্যাশা ছিল, এসব কৌশলের কারণে শত্রুপক্ষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে এবং মনে করবে যে, মুসলমানদের সহায়তায় মদিনা থেকে তাজাদম সৈন্যবাহিনী এসে পড়েছে। এর ফলে তাদের লড়াই-স্পৃহা ও মানসিক শক্তি ভেঙে পড়বে। বাস্তবেও তাই ঘটে। সপ্তম দিনের যুদ্ধ শেষে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. রোমান বাহিনীর মানসিক অবসন্নতার সুযোগ নিয়ে ধীরে ধীরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে আসতে সক্ষম হন। রোমান বাহিনী মনে করে, এটি তাদেরকে ফাঁদে ফেলার জন্য মুসলিম বাহিনীর কোনো কৌশল! তাই তারা সভয়ে মুসলিম বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন থেকে বিরত থাকে।
এ বিষয়টি এখনো উল্লেখ করা হয়নি যে, দুই লক্ষ বনাম তিন হাজারের রক্তক্ষয়ী ও ঐতিহাসিক যে যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর তিন-তিনজন সেনাপতি শহিদ হয়েছিলেন, সে যুদ্ধে কতজন সাহাবি শহিদ হন। মুতার যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর মাত্র বারোজন সাহাবি শহিদ হয়েছিলেন। বিপরীতে রোমান বাহিনীর নিহত হয়েছিল অনেক অনেক গুণ বেশি সৈন্য। আশ্চর্য ও বিস্ময়ের কিছু নেই! এরই নাম ঈমান ও ঈমানি শক্তি! প্রথমে ঈমান, তারপর ঈমান, তারপরও ঈমান!