📄 অটল-অবিচল মুসলিম বাহিনীর জন্য গায়বি সাহায্য
সময়টি ছিল মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত সঙ্গিন। শীত ও ক্ষুধা, ভয় ও শঙ্কা, হামলা ও অবরোধ—সবকিছু মিলে তখন কঠিন দুর্যোগময় পরিস্থিতি। এমন সময় আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে গাতফান গোত্রের শাখা বনু আশজা'-এর জনৈক ব্যক্তি ইসলামগ্রহণ করেন। তিনি নবীজির দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলামগ্রহণের সংবাদ দেন এবং এ কথাও জানান যে, তার ইসলামগ্রহণের কথা কেউ জানে না। নবীজি তাকে বলেন, তুমি তো একজনমাত্র ব্যক্তি (তোমার পক্ষে দলবল নিয়ে আমাদেরকে সাহায্য করা সম্ভব নয়)। তুমি শত্রুপক্ষের লোকদের যথাসম্ভব যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে প্ররোচিত করবে। যুদ্ধ তো কৌশলেরই নাম। নবীজির নির্দেশনা মোতাবেক নওমুসলিম নুআইম আশজায়ি রাযি. তৎক্ষণাৎ কাজে নেমে পড়েন। তিনি প্রথমে (বনু কুরায়যার) ইহুদিদের কাছে যান এবং তাদেরকে বোঝান যে, মুশরিকরা তো যুদ্ধ শেষে নিজেদের এলাকায় চলে যাবে আর তোমরা মদিনাতেই থেকে যাবে। তখন তো মুহাম্মাদের রোষানলে তোমরাই পড়বে। সুতরাং তোমরা বনু গাতফান ও কুরাইশদের বলো, তারা যেন তাদের সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে তোমাদের কাছে জামানতস্বরূপ রাখে। তাহলে ভবিষ্যতে তোমরা আক্রান্ত হলে বনু গাতফান ও কুরাইশ সম্প্রদায় তোমাদেরকে সহায়তা করবে। বনু কুরায়যা নুআইম রাযি.-এর পরামর্শ গ্রহণ করে নেয়।
এরপর তিনি একে একে গাতফান ও কুরাইশ গোত্রের নেতৃবৃন্দের কাছেও যান এবং তাদেরকে বলেন, ইহুদিরা তো মুহাম্মাদের সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করায় অনুতপ্ত হয়ে পড়েছে। তারা এখন পূর্বের ভুলের প্রতিকারবিধান করতে চাচ্ছে। ভবিষ্যতে মুসলমানদের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি বজায় রাখার নিশ্চয়তাস্বরূপ তারা তোমাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মুহাম্মাদের হাতে তুলে দিতে চায়।
নুআইম রাযি.-এর প্রচেষ্টা সফল হয়। কুরাইশ ও মিত্রবাহিনী যখন ইহুদিদেরকে যুদ্ধ শুরু করার অনুরোধ করে, তখন ইহুদিরা মুশরিক বাহিনীর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদেরকে জামানত হিসেবে তাদের হাতে তুলে দিতে বলে। মুশরিকরা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ফলে কুরাইশ, গাতফান ও ইহুদি—তিন পক্ষই বিশ্বাস করে যে, নুআইমের কথাই ঠিক। এভাবে বহুজাতিক বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাস তৈরি হয় এবং মুশরিক সৈন্যদের মন হতাশায় ছেয়ে যায়।
📄 দ্রষ্টব্য : একটি সুসংক্ষিপ্ত দোয়া
খন্দক যুদ্ধের কঠিনতম পরিস্থিতিতে সাহাবায়ে কেরাম নবীজির কাছে সমবেত হয়ে নিবেদন করে, আল্লাহর রাসুল, আমাদের প্রাণ তো ওষ্ঠাগত প্রায়! এমন কোনো দোয়া-বাক্য আছে কি, যা আমরা এ সময় পাঠ করতে পারি? নবীজি বললেন, হ্যাঁ, (তোমরা বলো)—
«اللَّهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَاتِنَا، وَآمِنْ رَوْعَاتِنَا» হে আল্লাহ, আপনি আমাদের গোপন ত্রুটিসমূহ ঢেকে রাখুন এবং আমাদের উদ্বিগ্নতাকে নিরাপত্তায় রূপান্তরিত করুন।
এরপর নবীজি বহুজাতিক বাহিনীর জন্য বদদোয়া করে বলেন— «اللَّهُمَّ مُنَزَّلَ الْكِتَابِ، سَرِيعَ الْحِسَابِ، اللَّهُمَّ اهْزِمُ الْأَحْزَابَ اللَّهُمَّ اهْزِمْهُمْ وَزَلْزِلْهُمْ»
হে আল্লাহ, হে কুরআন অবতরণকারী, দ্রুত হিসাবগ্রহণকারী, হে আল্লাহ, আপনি বহুজাতিক বাহিনীকে পরাভূত করুন। হে আল্লাহ, আপনি তাদেরকে পরাভূত করুন, প্রকম্পিত করুন।
আল্লাহ পাক তার নবীর দোয়া কবুল করেন। মুসলমানদের জন্য স্বস্তি ও শান্তির শুভবার্তা এসে যায়। আল্লাহ তাআলা আপন কুদরতি ক্ষমতাবলে কাফির বাহিনীকে ফিরিয়ে দেন। তাদের দেহ-আত্মা-হৃদয় প্রকম্পিত হয়ে পড়ে এবং পারস্পরিক মতবিরোধের কারণে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর আল্লাহ তাআলা শত্রুশিবিরের ছাউনিতে প্রচণ্ড শীতল ঝঞ্চাবায়ু প্রেরণ করেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করেন। আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীর সহায়তায় তার অদৃশ্য সৈন্যদের প্রেরণ করেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَ كَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا 4
হে মুমিনগণ, আল্লাহ তোমাদের প্রতি ওই সময় কীরূপ অনুগ্রহ করেছিলেন তা স্মরণ করো, যখন বহু সৈন্য তোমাদের প্রতি চড়াও হয়েছিল, তারপর আমি তাদের বিরুদ্ধে এক ঝড়ো হাওয়া প্রেরণ করি এবং এক বাহিনী, যা তোমরা দেখতে পাওনি। আর তোমরা যা করছিলে, আল্লাহ তা দেখছিলেন। [সুরা আহযাব: ০৯]
📄 শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে হুযায়ফা রাযি.
নবীজি এ সময় শত্রুপক্ষের মতিগতি পর্যবেক্ষণের জন্য হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযি.-কে প্রেরণ করেন। নবীজি হুযায়ফাকে বলে দেন, শত্রুশিবিরে নিজের উপস্থিতি ও পরিচয় গোপন রাখতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই অস্ত্রধারণ বা কাউকে হত্যা করা যাবে না। হুযায়ফা রাযি. গোপনে মুশরিক-শিবিরে প্রবেশ করেন। তিনি জানতে পারেন যে, মুশরিক বাহিনীর প্রধান আবু সুফিয়ান ময়দান ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং অশ্বারোহী বাহিনীকে নিরাপদে প্রস্থানের নির্দেশ দিয়েছেন। পরদিন ভোর হওয়ার পূর্বেই কুরাইশ ও গাতফান গোত্র পলায়ন করে এবং অশ্বারোহী বাহিনী তাদের অনুসরণ করে। বহুজাতিক শিবির শূন্য হয়ে যাওয়ার পর মুসলমানগণ অস্ত্র ত্যাগ করে মদিনায় ফিরে আসে।
খন্দক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নবীজি সাহাবিদের বলেন, এখন থেকে আমরাই তাদের ওপর হামলা করব; তারা আর আমাদের ওপর হামলা করতে পারবে না। নবীজির উক্তিতে এই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল যে, ইতিমধ্যে পরিস্থিতি মুসলমানদের অনুকূলে চলে এসেছে এবং শক্তির পাল্লা এখন তাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কুরাইশরা আজকের পর থেকে আর কখনো মুসলমানদের ওপর হামলা চালাতে সাহস করবে না।
📄 বনু কুরায়যার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক অভিযান
খন্দক যুদ্ধের সময় বনু কুরায়যার ইহুদি সম্প্রদায় যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তা ছিল নবীজির সঙ্গে ইহুদিদের কৃত সন্ধিচুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ও অবমাননা। মুসলমানদের চরম দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে তারা কুরাইশ ও গাতফান গোত্রের সঙ্গে মিত্রতা করে মুসলমানদের সমূলে বিনাশ করার ঘৃণ্য তৎপরতায় মেতে উঠেছিল। এর মাধ্যমে মূলত মুসলমানদের প্রতি তাদের অন্তরে সুপ্ত বিদ্বেষ ও অনিষ্ট চিন্তা ফাঁস হয়ে যায়।
খন্দকের যুদ্ধ শেষে মদিনায় প্রত্যাবর্তন করে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম যুদ্ধাস্ত্র ত্যাগ করামাত্র আল্লাহ পাকের নির্দেশে হজরত জিবরাইল আ. সেখানে উপস্থিতি হন এবং নবীজিকে প্রশ্ন করেন, 'আল্লাহর রাসুল! আপনি যুদ্ধসাজ ত্যাগ করেছেন?!' নবীজি হ্যাঁ-সূচক উত্তর দিলে জibrail বলেন, 'ফিরেশতারা তো যুদ্ধাস্ত্র পরিত্যাগ করেননি। আল্লাহ তাআলা আপনাকে বনু কুরায়যায় অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি এখনই সেখানে যাচ্ছি। আমি তাদেরকে প্রকম্পিত করে তুলব।' তখন নবীজির নির্দেশে ঘোষণা করা হয়—যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি নিঃশর্ত অনুগত, তারা যেন বনু কুরায়যার জনপদে পৌঁছেই আছর নামাজ আদায় করে।
নবীজি আবদুল্লাহ বিন উম্মে মাকতুম রাযি.-কে মদিনার দেখাশোনার দায়িত্ব প্রদান করেন। মূল বাহিনী পৌঁছার পূর্বেই যেন বাহিনীর একটি অংশ দ্রুত সেখানে পৌঁছে যায়, এ উদ্দেশ্যে নবীজি আলি বিন আবু তালিব রাযি.-কে পতাকা বহনের দায়িত্ব দিয়ে তাকে দ্রুত অগ্রবর্তী বাহিনীর সঙ্গে রওনা হওয়ার নির্দেশ দেন। মুসলিম বাহিনী বনু কুরায়যার জনপদে পৌঁছে অবরোধ করে। পঁচিশ দিন স্থায়ী অবরোধের একপর্যায়ে যখন বনু কুরায়যার প্রতিরোধক্ষমতা, মানসিক শক্তি ও রসদব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তারা এই শর্তে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয় যে, আল্লাহর রাসুল হজরত সাদ বিন মুআয রাযি.-কে তাদের বিষয়ে ফয়সালাকারী নির্ধারণ করবেন। তারা ভেবেছিল, বনু কুরায়যার মিত্র আনসারি আওস গোত্রের সর্দার হিসেবে সাদ বিন মুআয তাদের বিষয়ে কোমল ও সহনীয় কোনো ফয়সালা করবেন।