📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 শত্রুবাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ও নেতৃত্ব

📄 শত্রুবাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ও নেতৃত্ব


কুরাইশ বাহিনী আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মদিনার উদ্দেশে রওনা হয়। গাতফানের শাখা-গোত্র বনু ফাযারার নেতৃত্বভার ছিল উয়াইনা বিন হিসন-এর হাতে। বনু মুররার নেতৃত্ব দিচ্ছিল হারিস বিন আওফ আর বনু আশজা'-এর নেতৃত্বে ছিল মুসইর বিন রুহায়লা। এ ছাড়াও বনু কিনানা ও বনু তিহামাও বহুজাতিক এ বাহিনীতে যোগদান করে। সব মিলিয়ে দশ হাজার সৈন্যের এই বাহিনী মুসলমানদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে মদিনা অভিমুখে রওনা হয়। কিন্তু মদিনায় পৌঁছেই তারা কল্পনাতীত এক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়। তারা দেখতে পায়—মদিনার প্রবেশপথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুদীর্ঘ পরিখা! শত্রুপক্ষকে বাধা দিতে পরিখা খননের পদ্ধতি মূলত পারস্যে প্রচলিত ছিল। বালুকাময় পাথুরে-ভূমির অধিবাসী আরবজাতি এর সঙ্গে মোটেও পরিচিত ছিল না। অবস্থাদৃষ্টে বহুজাতিক বাহিনী কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও নিরাশ হয়ে পড়ে। কেউ কেউ পরিখা অতিক্রমের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়, মারাও যায় অনেকে। (৩৭)
মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল তিন হাজার। নবীজি মদিনার মুসলিম নারী, শিশু-কিশোর ও বয়োবৃদ্ধদের শত্রুর আক্রমণ হতে নিরাপদে রাখতে বনু হারিসার দুর্গে আশ্রয় গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
পরিখার কারণে যদিও মুসলমানরা মুশরিক বাহিনীর আক্রমণ হতে আপাতত নিরাপদ ছিল; কিন্তু কঠিন ক্ষুধা ও প্রচণ্ড শীতের পাশাপাশি সর্বক্ষণ সুবিশাল বহুজাতিক বাহিনীর আক্রমণ-শঙ্কা ও প্রবল ভীতির কারণে মুসলমানদের জন্য সময়টা ছিল বড়ই কঠিন। পবিত্র কুরআনে সেই কঠিনতর পরিস্থিতিকে এভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে—
إِذْ جَاءُوكُم مِّن فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ الْقُلُوبُ الْحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللهِ الظُّنُونَا ۚ هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْنَالًا شَدِيدًا
স্মরণ করো, যখন তারা তোমাদের ওপর চড়াও হয়েছিল ওপর দিক থেকে এবং নিচের দিক থেকেও এবং যখন চোখ বিস্ফারিত হয়েছিল, কলিজা মুখের কাছে এসে পড়েছিল আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে নানারকমের ভাবনা ভাবতে শুরু করেছিলে। তখন মুমিনগণ কঠিনভাবে পরীক্ষিত হয়েছিল এবং তাদেরকে তীব্র প্রকম্পনে কাঁপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। [সুরা আহযাব: ১০-১১]
ঠিক একই সময়ে সংবাদ আসে যে, মদিনায় বসবাসরত ইহুদি গোত্র বনু কুরায়যা মুসলমানদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বহুজাতিক বাহিনীকে সহায়তা করতে সম্মত হয়েছে। এ সংবাদ ছিল মুসলমানদের জন্য বজ্রপাতের ন্যায়। মুসলিম বাহিনী তখন বাইরের শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধেই প্রচণ্ড রকম ব্যস্ত ছিল। ভেতর থেকে এমন আঘাত তারা মোটেও আশা করেনি। অবস্থাদৃষ্টে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং মুসলমানদের উদ্যম টিকিয়ে রাখতে শত্রুপক্ষের বিষয়ে নমনীয় হওয়ার চিন্তা করেন। তিনি মদিনায় উৎপাদিত খেজুরের এক-তৃতীয়াংশ প্রদানের বিনিময়ে বনু গাতফানের সঙ্গে সন্ধি করার বিষয়ে আনসার-সরদার সাদ বিন মুআয ও সাদ বিন উবাদার সঙ্গে পরামর্শ করেন। কিন্তু আনসারি সাহাবিদ্বয় দৃঢ়তার সঙ্গে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং নবীজিকে নিশ্চিন্ত করেন যে, তারা কোনো পরিস্থিতিতেই হতোদ্যম হবেন না। সাহাবিদ্বয়ের মতানুসারে নবীজি বনু গাতফানের সঙ্গে সমঝোতার চিন্তা পরিহার করেন।

টিকাঃ
৩৭. বহুজাতিক বাহিনী মদিনায় পৌঁছে পরিখা দেখে প্রথমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও হতোদ্যম হয়ে পড়লেও এরপর পরিখা অতিক্রম বা পরিখা ভরাট করে রাস্তা তৈরি করার উপর্যুপরি চেষ্টা চালায়। ফলে সাহাবায়ে কেরামকে প্রতিমুহূর্ত সতর্ক ও পূর্ণ প্রস্তুত থাকতে হচ্ছিল। এ সময় বিস্তৃত এলাকাজুড়ে সার্বক্ষণিক প্রহরায় ব্যস্ত থাকার কারণে মুসলমানদের কয়েক ওয়াক্ত নামাজও কাজা হয়ে যায়। পরিখার দু-পাশ থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে তির নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে এবং এতে ছয়জন সাহাবি শহিদ হন; মুশরিক পক্ষের নিহত হয় দশজন। বিখ্যাত আনসারি সাহাবি সাদ বিন মুআয রাযি.-ও এ সময় আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং পরে এ আঘাতের কারণেই ইন্তেকাল হন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 অটল-অবিচল মুসলিম বাহিনীর জন্য গায়বি সাহায্য

📄 অটল-অবিচল মুসলিম বাহিনীর জন্য গায়বি সাহায্য


সময়টি ছিল মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত সঙ্গিন। শীত ও ক্ষুধা, ভয় ও শঙ্কা, হামলা ও অবরোধ—সবকিছু মিলে তখন কঠিন দুর্যোগময় পরিস্থিতি। এমন সময় আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে গাতফান গোত্রের শাখা বনু আশজা'-এর জনৈক ব্যক্তি ইসলামগ্রহণ করেন। তিনি নবীজির দরবারে উপস্থিত হয়ে ইসলামগ্রহণের সংবাদ দেন এবং এ কথাও জানান যে, তার ইসলামগ্রহণের কথা কেউ জানে না। নবীজি তাকে বলেন, তুমি তো একজনমাত্র ব্যক্তি (তোমার পক্ষে দলবল নিয়ে আমাদেরকে সাহায্য করা সম্ভব নয়)। তুমি শত্রুপক্ষের লোকদের যথাসম্ভব যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে প্ররোচিত করবে। যুদ্ধ তো কৌশলেরই নাম। নবীজির নির্দেশনা মোতাবেক নওমুসলিম নুআইম আশজায়ি রাযি. তৎক্ষণাৎ কাজে নেমে পড়েন। তিনি প্রথমে (বনু কুরায়যার) ইহুদিদের কাছে যান এবং তাদেরকে বোঝান যে, মুশরিকরা তো যুদ্ধ শেষে নিজেদের এলাকায় চলে যাবে আর তোমরা মদিনাতেই থেকে যাবে। তখন তো মুহাম্মাদের রোষানলে তোমরাই পড়বে। সুতরাং তোমরা বনু গাতফান ও কুরাইশদের বলো, তারা যেন তাদের সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় কিছু লোককে তোমাদের কাছে জামানতস্বরূপ রাখে। তাহলে ভবিষ্যতে তোমরা আক্রান্ত হলে বনু গাতফান ও কুরাইশ সম্প্রদায় তোমাদেরকে সহায়তা করবে। বনু কুরায়যা নুআইম রাযি.-এর পরামর্শ গ্রহণ করে নেয়।
এরপর তিনি একে একে গাতফান ও কুরাইশ গোত্রের নেতৃবৃন্দের কাছেও যান এবং তাদেরকে বলেন, ইহুদিরা তো মুহাম্মাদের সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করায় অনুতপ্ত হয়ে পড়েছে। তারা এখন পূর্বের ভুলের প্রতিকারবিধান করতে চাচ্ছে। ভবিষ্যতে মুসলমানদের সঙ্গে মৈত্রীচুক্তি বজায় রাখার নিশ্চয়তাস্বরূপ তারা তোমাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মুহাম্মাদের হাতে তুলে দিতে চায়।
নুআইম রাযি.-এর প্রচেষ্টা সফল হয়। কুরাইশ ও মিত্রবাহিনী যখন ইহুদিদেরকে যুদ্ধ শুরু করার অনুরোধ করে, তখন ইহুদিরা মুশরিক বাহিনীর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদেরকে জামানত হিসেবে তাদের হাতে তুলে দিতে বলে। মুশরিকরা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ফলে কুরাইশ, গাতফান ও ইহুদি—তিন পক্ষই বিশ্বাস করে যে, নুআইমের কথাই ঠিক। এভাবে বহুজাতিক বাহিনীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাস তৈরি হয় এবং মুশরিক সৈন্যদের মন হতাশায় ছেয়ে যায়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্রষ্টব্য : একটি সুসংক্ষিপ্ত দোয়া

📄 দ্রষ্টব্য : একটি সুসংক্ষিপ্ত দোয়া


খন্দক যুদ্ধের কঠিনতম পরিস্থিতিতে সাহাবায়ে কেরাম নবীজির কাছে সমবেত হয়ে নিবেদন করে, আল্লাহর রাসুল, আমাদের প্রাণ তো ওষ্ঠাগত প্রায়! এমন কোনো দোয়া-বাক্য আছে কি, যা আমরা এ সময় পাঠ করতে পারি? নবীজি বললেন, হ্যাঁ, (তোমরা বলো)—
«اللَّهُمَّ اسْتُرْ عَوْرَاتِنَا، وَآمِنْ رَوْعَاتِنَا» হে আল্লাহ, আপনি আমাদের গোপন ত্রুটিসমূহ ঢেকে রাখুন এবং আমাদের উদ্বিগ্নতাকে নিরাপত্তায় রূপান্তরিত করুন।
এরপর নবীজি বহুজাতিক বাহিনীর জন্য বদদোয়া করে বলেন— «اللَّهُمَّ مُنَزَّلَ الْكِتَابِ، سَرِيعَ الْحِسَابِ، اللَّهُمَّ اهْزِمُ الْأَحْزَابَ اللَّهُمَّ اهْزِمْهُمْ وَزَلْزِلْهُمْ»
হে আল্লাহ, হে কুরআন অবতরণকারী, দ্রুত হিসাবগ্রহণকারী, হে আল্লাহ, আপনি বহুজাতিক বাহিনীকে পরাভূত করুন। হে আল্লাহ, আপনি তাদেরকে পরাভূত করুন, প্রকম্পিত করুন।
আল্লাহ পাক তার নবীর দোয়া কবুল করেন। মুসলমানদের জন্য স্বস্তি ও শান্তির শুভবার্তা এসে যায়। আল্লাহ তাআলা আপন কুদরতি ক্ষমতাবলে কাফির বাহিনীকে ফিরিয়ে দেন। তাদের দেহ-আত্মা-হৃদয় প্রকম্পিত হয়ে পড়ে এবং পারস্পরিক মতবিরোধের কারণে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর আল্লাহ তাআলা শত্রুশিবিরের ছাউনিতে প্রচণ্ড শীতল ঝঞ্চাবায়ু প্রেরণ করেন এবং তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করেন। আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীর সহায়তায় তার অদৃশ্য সৈন্যদের প্রেরণ করেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়—
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودٌ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَ كَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا 4
হে মুমিনগণ, আল্লাহ তোমাদের প্রতি ওই সময় কীরূপ অনুগ্রহ করেছিলেন তা স্মরণ করো, যখন বহু সৈন্য তোমাদের প্রতি চড়াও হয়েছিল, তারপর আমি তাদের বিরুদ্ধে এক ঝড়ো হাওয়া প্রেরণ করি এবং এক বাহিনী, যা তোমরা দেখতে পাওনি। আর তোমরা যা করছিলে, আল্লাহ তা দেখছিলেন। [সুরা আহযাব: ০৯]

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে হুযায়ফা রাযি.

📄 শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে হুযায়ফা রাযি.


নবীজি এ সময় শত্রুপক্ষের মতিগতি পর্যবেক্ষণের জন্য হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযি.-কে প্রেরণ করেন। নবীজি হুযায়ফাকে বলে দেন, শত্রুশিবিরে নিজের উপস্থিতি ও পরিচয় গোপন রাখতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই অস্ত্রধারণ বা কাউকে হত্যা করা যাবে না। হুযায়ফা রাযি. গোপনে মুশরিক-শিবিরে প্রবেশ করেন। তিনি জানতে পারেন যে, মুশরিক বাহিনীর প্রধান আবু সুফিয়ান ময়দান ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং অশ্বারোহী বাহিনীকে নিরাপদে প্রস্থানের নির্দেশ দিয়েছেন। পরদিন ভোর হওয়ার পূর্বেই কুরাইশ ও গাতফান গোত্র পলায়ন করে এবং অশ্বারোহী বাহিনী তাদের অনুসরণ করে। বহুজাতিক শিবির শূন্য হয়ে যাওয়ার পর মুসলমানগণ অস্ত্র ত্যাগ করে মদিনায় ফিরে আসে।
খন্দক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর নবীজি সাহাবিদের বলেন, এখন থেকে আমরাই তাদের ওপর হামলা করব; তারা আর আমাদের ওপর হামলা করতে পারবে না। নবীজির উক্তিতে এই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল যে, ইতিমধ্যে পরিস্থিতি মুসলমানদের অনুকূলে চলে এসেছে এবং শক্তির পাল্লা এখন তাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কুরাইশরা আজকের পর থেকে আর কখনো মুসলমানদের ওপর হামলা চালাতে সাহস করবে না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00