📄 অভিযানের প্রেক্ষাপট
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার কয়েকজন সাহাবিকে নিয়ে মদিনার বনু নাযিরের ইহুদি-পল্লিতে গমন করেন। আমর বিন উমাইয়া নামক জনৈক সাহাবি ভুলক্রমে দুজন ব্যক্তিকে হত্যা করায় নিহতদের রক্তপণ আদায় অপরিহার্য ছিল। তাই মিত্র ইহুদিদের সহযোগিতা গ্রহণে নবীজি সেখানে গিয়েছিলেন। পূর্বে সম্পাদিত মুসলিম-ইহুদি মৈত্রীচুক্তির ভিত্তিতে ইহুদিরা রক্তপণে শরিক হতে বাধ্য ছিল। নবীজি উপস্থিত হওয়ার পর বনু নাযিরের ইহুদিরা স্বভাব-বহির্ভূতভাবে নবীজিকে উষ্ণ স্বাগত জানায় এবং রক্তপণ আদায়ে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা নবীজিকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলায় নবীজি একটি দেয়ালের পাশে বসে থাকেন। ইত্যবসরে ইহুদিরা গোপনে পরামর্শ করে ওপর থেকে বিশাল একটি পাথর ফেলে বিশ্রামরত নবীজিকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। আমর বিন জাহহাশ নামক জনৈক দুরাচার এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের আগ্রহ প্রকাশ করে।
তৎক্ষণাৎ জিবরাইল আ. উপস্থিত হয়ে নবীজিকে ইহুদিদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত করেন। নবীজি সঙ্গে সঙ্গে সে স্থান ত্যাগ করে মদিনায় রওনা হয়ে যান। নবীজির এলাকা ত্যাগ করার সংবাদ পেয়ে নবীজির সঙ্গী সাহাবিগণও চলে আসেন এবং নবীজির সঙ্গে মিলিত হন। নবীজি তাদেরকে ইহুদিদের প্রতারণা সম্পর্কে অবহিত করেন এবং বনু নাযিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিতে আদেশ করেন।
নবীজি প্রথমে মুহাম্মাদ বিন মাসলামাকে বনু নাযিরের কাছে পাঠান এবং তাকে বলে দেন যে, তুমি বনু নাযিরের ইহুদিদের কাছে গিয়ে তাদেরকে বলো, আল্লাহর রাসুল আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা আমাদের দেশ থেকে বের হয়ে যাও। কারণ, তোমরা প্রতারণা করার মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছ। আমি তোমাদেরকে দশ দিন সময় দিচ্ছি। এরপর তোমাদের যাকেই পাওয়া যাবে, হত্যা করা হবে।
মুহাম্মাদ বিন মাসলামার ঘোষণা শোনার পর বনু নাযির মদিনাত্যাগের প্রস্তুতি শুরু করে। কিন্তু মুনাফিক-সর্দার ইবনে সালুল লোক পাঠিয়ে তাদেরকে নিষেধ করে এবং প্রয়োজনে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়। ইবনে সালুলের আশ্বাস পেয়ে ইহুদিরা নিজ জনপদেই অবস্থান করে এবং মুসলমানদের সাফ জানিয়ে দেয়—আমরা কোথাও যাচ্ছি না।
এরপর নবীজির নির্দেশে মুসলমানরা বনু নাযিরের জনপদ অবরোধ করে। ইহুদিরা তাদের দুর্গের অভ্যন্তরে আশ্রয় নেয়। এ অবরোধ পনেরো দিন স্থায়ী হয়েছিল।
নবীজি বনু নাযিরের জনপদের চারপাশের খেজুর গাছ কেটে ফেলার এবং জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। এরপর আল্লাহ তাআলা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করে দেন। তারা নবীজির কাছে প্রস্তাব পাঠায়—আমরা মদিনা ছেড়ে চলে যাব; তবে আমাদেরকে অস্ত্রশস্ত্র বাদে অন্যান্য সবকিছু সঙ্গে নেওয়ার অনুমতি দিন। নবীজি তাদের প্রস্তাবে রাজি হলে তারা তাদের আসবাবপত্র উটের পিঠে তুলে নেয়। কেউ কেউ নিজের ঘর ভেঙে ঘরের দরজাও নিয়ে যায়। এরপর তাদের একদল শামে চলে যায় আর সালাম বিন আবুল হাকিক, কিনানা বিন রাবি' ও হুয়াই বিন আখতাব প্রমুখ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিসহ অধিকাংশ চলে যায় খায়বারে।
নবীজি বনি নাযিরের রেখে যাওয়া সম্পদ মুহাজিরদের মাঝেই বণ্টন করে দেন। আনসারদের মধ্যে অতি দরিদ্র হওয়ায় কেবল আবু দুজানা রাযি. ও সাহল বিন হানিফ রাযি. কিছু সম্পদ লাভ করেন। বনু নাযিরের অভিযানের প্রেক্ষিতেই পবিত্র কুরআনের সুরা হাশর অবতীর্ণ হয়। এ কারণেই এই সুরার আরেক নাম 'সুরা বনু নাযির'।