📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 রণাঙ্গনের পট পরিবর্তন, নিশ্চিত বিজয় পরাজয়ে রূপান্তর

📄 রণাঙ্গনের পট পরিবর্তন, নিশ্চিত বিজয় পরাজয়ে রূপান্তর


মুসলিম বাহিনীর আসন্ন বিজয় উপলব্ধি করে পাহাড়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনরত তিরন্দাজ বাহিনীর অনেকে গনিমত (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) কুড়াতে পাহাড় থেকে নেমে আসে। বাহিনীর প্রধান আবদুল্লাহ বিন জুবায়র রাযি. বারবার তাদেরকে সতর্ক করতে থাকেন এবং নবীজির নির্দেশ অমান্য করে পাহাড় হতে অবতরণ করতে নিষেধ করেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে মনে করে দশজন বাদে বাকি সকলে তার নির্দেশ অমান্য করে।
মুশরিক বাহিনীর অশ্বারোহী অংশের প্রধান খালিদ বিন ওয়ালিদ পাহাড়ে দায়িত্বপালনরত তিরন্দাজদের অবতরণ করতে দেখে দ্রুত দুইশ অশ্বারোহী সৈনিক নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে সটকে পড়েন এবং পেছন দিক থেকে পাহাড়ে আরোহণ করেন। পাহাড়ে অবস্থানরত অবশিষ্ট মুসলিম সৈনিকগণ আবদুল্লাহ বিন জুবায়রের নেতৃত্বে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুললেও একপর্যায়ে খালিদ-বাহিনীর হাতে শহিদ হয়ে যায়। এরপর খালিদের বাহিনী পেছন দিক থেকে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
পেছন থেকে হঠাৎ আক্রমণে মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। এ সময় মুসলিম বাহিনীর সদস্যগণ লক্ষ্যহীনভাবে লড়াই করতে থাকে। একের পর এক মুসলিম শহিদের লাশ ভূপাতিত হতে থাকে। মুসআব বিন উমায়র, হামজা বিন আবদুল মুত্তালিব, আনাস বিন নাযার, সাদ বিন রাবি'সহ অনেক সাহাবি শহিদ হয়ে যান।
মুসআব বিন উমায়র রাযি. দৈহিক গড়নে অনেকটা নবীজির সদৃশ ছিলেন। ইবনে কুমআ নামক জনৈক দুরাচার তাকে শহিদ করার পর মনে করেছিল যে, সে—নাউজুবিল্লাহ—নবীজিকেই হত্যা করেছে। সে চিৎকার করে বলতে থাকে, আমি মুহাম্মাদকে হত্যা করেছি। এ কথা শুনে মুসলিম বাহিনীর অনেকেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করে, আবার অনেকে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু নবীজি তৎক্ষণাৎ আওয়াজ দিয়ে সকলকে নিজের উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। নবীজির মোবারক আওয়াজ শুনে সাহাবিদের হৃদয়-মন প্রশান্ত হয় এবং মানসিক শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়। এবার জীবিত সকলে নবীজির পাশে সমবেত হয়। মুশরিক বাহিনীর লক্ষ্য ছিল যেকোনো মূল্যে নবীজিকে হত্যা করা। তাই নবীজির চারপাশে তীব্র লড়াই চলতে থাকে। সাহাবায়ে কেরাম নবীজির চারপাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে লড়াই অব্যাহত রাখেন। নবীজিকে রক্ষার জন্য বীর যোদ্ধাদের একটি দল নবীজির চারপাশে প্রাচীর তৈরি করে কাফিরদের হামলা প্রতিরোধ করে যাচ্ছিল।
এরপর নবীজি অবশিষ্ট মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে আসেন এবং উহুদের একটি গিরিপথে আশ্রয় নিয়ে মুসলমানদের পুনঃবিন্যস্ত করেন। মুসলিম বাহিনীর অনবরত তির নিক্ষেপের কারণে মুশরিক বাহিনী নিরাশ হয়ে পড়ে এবং যুদ্ধ শেষ করে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আত্মপ্রবঞ্চিত কুরাইশরা এতটুকু সাফল্যকেই নিজেদের বিজয় হিসেবে বিবেচনা করছিল।
উহুদ যুদ্ধে মুশরিক বাহিনীর বাইশজন সৈন্য নিহত হয়। অপরদিকে মুসলিম বাহিনীর সত্তরজন সাহাবি শহিদ হয়। মুশরিকরা নবীজির চাচা হামজা বিন আবদুল মুত্তালিবসহ অনেক শহিদের লাশ বিকৃত করে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হামরাউল আসাদের অভিযান

📄 হামরাউল আসাদের অভিযান


উহুদ প্রান্তর থেকে নবীজি শনিবার সন্ধ্যায় মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। নবীজি ও সাহাবিগণ মদিনাতেই রাত্রিযাপন করেন এবং আহতদের চিকিৎসা ও শুশ্রূষায় অতিবাহিত করেন। পরদিন রবিবার ফজর নামাজের পর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত বিলাল রাযি.-কে এই ঘোষণা প্রদানের নির্দেশ দেন যে, আল্লাহর রাসুল তোমাদেরকে শত্রু বাহিনীর অন্বেষণের নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের সঙ্গে শুধু তারাই বের হবে, যারা গতকাল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে।
এরপর নবীজির নির্দেশে মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধপতাকা নিয়ে আসা হয়। নবীজি হজরত আলি রাযি.-কে পতাকা প্রদান করেন। এরপর আহত ও ক্লান্ত-শ্রান্ত মুসলিম বাহিনী বেরিয়ে পড়ে এবং হামরাউল আসাদে(৩৪) শিবির স্থাপন করে। মুসলমানরা সেখানে বিশাল আগুন প্রজ্বলিত করে। বহু দূর থেকে আগুন দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল এবং মনে হচ্ছিল, প্রচুর সৈন্যের সমাবেশ ঘটেছে।
মক্কার মুশরিকরা তখন উহুদেই অবস্থান করে অর্জিত বিজয় উদ্যাপন করছিল এবং আনন্দে কোরাস গাইছিল। এ সময় তারা মুসলমানদের সমূলে শেষ করতে মদিনায় হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছিল। অবশ্য সাফওয়ান বিন উমাইয়া এরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে তাদেরকে নিষেধ করছিল।
খুযাআ গোত্রের সর্দার মা'বাদ আল-খুযায়ি তখনও মুসলমান হননি। তিনি সে পথেই কোথাও যাচ্ছিলেন। তিনি মুসলিম বাহিনীর শিবিরের পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করে মুশরিক বাহিনীর কাছে পৌঁছান। মা'বাদ আল-খুযায়িকে দেখতে পেয়ে কুরাইশ বাহিনীর প্রধান আবু সুফিয়ান জিজ্ঞেস করেন, 'মা'বাদ, পেছনে কী অবস্থা দেখে এলে?' মা'বাদ উত্তর দেন, 'ধিক তোমাকে! মুহাম্মাদ তো তোমাদের খোঁজে তার সঙ্গীদের নিয়ে রওনা হয়ে গেছে। এত বিশাল বাহিনী আমি জীবনেও দেখিনি। মুসলমানরা তোমাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভে টগবগ করছে। এমন ক্রোধ ও ক্ষোভ আমি কখনো দেখিনি।'
মা'বাদের কথা শুনে মুশরিক বাহিনী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা দ্রুত পলায়ন করে এবং মক্কার পথ ধরে।
নবীজি রবি হতে বুধবার চারদিন হামরাউল আসাদে অবস্থান করার পর মদিনায় প্রত্যাবর্তন করেন। উল্লেখ্য, সুরা আলে ইমরানে এই যুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ আলোচিত হয়েছে।

টিকাঃ
৩৪. হামরাউল আসাদ: মদিনা হতে প্রায় বারো কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি শহরতলির নাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00