📄 বনু কায়নুকার যুদ্ধ
বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় মদিনায় বসবাসরত ইহুদিদের অন্তরে ইসলাম-বিদ্বেষ ও হিংসার আগুন নতুন করে উসকে দেয়। তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে শত্রুতা ও অনিষ্টমূলক আচরণ করতে শুরু করে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে নবীজি ও মুসলমানদেরকে কষ্ট দিতে থাকে। বাধ্য হয়ে নবীজি তাদেরকে কায়নুকা গোত্রের বাজারে সমবেত করে বলেন, 'হে ইহুদি সম্প্রদায়, কুরাইশদের ওপর যেমন দুর্যোগ আপতিত হয়েছে, তেমন দুর্যোগ তোমাদের ওপর আপতিত হওয়ার পূর্বেই সাবধান হও এবং ইসলামগ্রহণ করো। তোমরা তো নিশ্চিত জানো যে, আমি আল্লাহর প্রেরিত নবী। তোমরা তোমাদের ধর্মগ্রন্থে এবং আল্লাহ তাআলা কর্তৃক তোমাদেরকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিতে আমার নবুওয়তের স্বীকৃতি পাবে।'
ইহুদিরা নবীজিকে উত্তর দেয়, 'মুহাম্মাদ, তুমি আমাদেরকে তোমার কওমের ন্যায় মনে করেছ! প্রবঞ্চনার শিকার হয়ো না। তুমি তো এমন এক কওমের মোকাবিলা করেছ, যাদের কোনো যুদ্ধ-জ্ঞানই নেই। ফলে তুমি সুযোগে দান মেরেছ। আল্লাহর শপথ! আমাদের সঙ্গে যদি লড়তে আসো, তাহলে নিশ্চিত বুঝবে, আমরা বীর জাতি।'
নবীজির সতর্কবাণীতে সতর্ক হওয়া দূরে থাক; ইহুদিরা বরং তাদের অবাধ্যতায় অবিচল থেকে বিভিন্নভাবে মুসলমানদের ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। একদিন জনৈকা মুসলিম নারী বনু কায়নুকার বাজারে তার পণ্য বিক্রি করার পর এক ইহুদি স্বর্ণকারের দোকানে বসেন। দুষ্ট ইহুদিরা তার সঙ্গে অসদাচরণ করে এবং বারবার তাকে চেহারা উন্মোচিত করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। মুসলিম নারীটি দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করার পর ইহুদি স্বর্ণকার কুবুদ্ধি এঁটে মহিলার অগোচরে তার পরিচ্ছদের একটি অংশ পিঠের সঙ্গে বেঁধে দেয়। ফলে তিনি যখন উঠে দাঁড়ান, তার নিম্নাংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। মুসলিম নারীকে লাঞ্ছিত করে উপস্থিত ইহুদিরা উল্লাস করতে থাকে। মহিলার চিৎকারে জনৈক সাহাবি বিষয়টি অবগত হন এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে ইহুদি স্বর্ণকারকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেন। তখন উপস্থিত ইহুদিরা সকলে মিলে উক্ত সাহাবিকে হত্যা করে। নিহতের পরিবার মুসলমানদের কাছে অভিযোগ করলে মুসলমানগণ সবকিছু শুনে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। ফলে মুসলমানদের সঙ্গে ইহুদি বনু কায়নুকা গোত্রের যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে। মদিনার ইহুদিদের মধ্যে বনু কায়নুকাই প্রথম নবীজির সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করেছিল।
নবীজি সাহাবায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে বনু কায়নুকার দুর্গের উদ্দেশে রওনা হন। মুসলিম বাহিনীকে দেখতে পেয়ে বnu কায়নুকার লোকেরা দুর্গদ্বার বন্ধ করে দুর্গের ভেতরেই আশ্রয় নেয়। নবীজি দুর্গের চতুর্দিকে কঠোর অবরোধ আরোপ করেন। দ্বিতীয় হিজরি সনের ১৫ শাওয়াল শনিবার বনু কায়নুকার দুর্গ অবরোধ করা হয়। এরপর (বনু কায়নুকার মিত্র) মুনাফিক-সর্দার ইবনে সালুলের পীড়াপীড়িতে নবীজি অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন। ইবনে সালুল এ ঘটনার এক মাসেরও কম সময় পূর্বে বাহ্যিকভাবে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিল।
এরপর নবীজি বনু কায়নুকার ইহুদিদের মদিনা হতে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তারা মদিনা থেকে শামের আযরাআ'ত এলাকায় চলে যায়। অবশ্য কিছুদিনের মধ্যে তাদের অধিকাংশই সেখানে মারা যায়।
📄 দ্বিতীয় হিজরির উল্লেখযোগ্য আরও কিছু ঘটনা
* নবীজির দুধভাই উসমান বিন মাযউন রাযি. ইন্তেকাল করেন। তিনিই ছিলেন মদিনায় মৃত্যুবরণকারী প্রথম মুহাজির সাহাবি। তাকে জান্নাতুল বাকিতে সমাধিস্থ করা হয়। নবীজি তার কবরের ওপর একটি পাথর স্থাপন করেন এবং বলেন, 'এর দ্বারা আমি আমার ভাইয়ের কবর চিনতে পারব।'
* রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হয় এবং ঈদের নামাজ ও সদকায়ে ফিতরের বিধান চালু হয়।
* সম্পদের জাকাত ফরজ করা হয় এবং জাকাতের নেসাব ও বিধিবিধান বর্ণিত হয়।
'কুরাইশ শয়তান' নামে খ্যাত উমায়র বিন ওয়াহাব আল-জুমাহি ইসলামগ্রহণ করেন। তিনি নবীজিকে হত্যা করার লক্ষ্যে মদিনায় এসেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তার হৃদয়জগৎ ইসলামের জন্য প্রসারিত করে দেন এবং তিনি ইসলামগ্রহণে ধন্য হন।
নবী-তনয়া ও উসমান-পত্নী রুকাইয়া রাযি. ইন্তেকাল করেন। বদর যুদ্ধ চলাকালে তার ইন্তেকাল হয়। রুকাইয়া রাযি. অসুস্থ থাকায় নবীজি হজরত উসমান রাযি.-কে যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে অসুস্থ স্ত্রীর পাশে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন।
রুকাইয়া রাযি.-এর মৃত্যুর পর উসমান রাযি. নবীজির আরেক কন্যা উম্মে কুলসুমকে বিয়ে করেন।
আলি বিন আবু তালিব রাযি. নবীকন্যা ফাতিমা রাযি.-কে বিয়ে করেন।
নবীকন্যা যায়নাব রাযি.-কে তার মুশরিক স্বামী আবুল আস বিন রাবি' অনুমতি দেওয়ায় তিনি মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় চলে আসেন। আবুল আস বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে বন্দি হওয়ার পর নবীজি তাকে এই শর্তে মুক্তি দিয়েছিলেন যে, বিনিময়ে সে যায়নাবকে মদিনায় হিজরতের অনুমতি দেবে।