📄 সাদ বিন মুআযের প্রস্তাব
মুসলমানদের ছাউনি স্থাপন শেষে সাদ বিন মুআয রাযি. যুদ্ধক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক নজর রাখতে নবীজির জন্য একটি আরিশ (মোর্চা) নির্মাণের প্রস্তাব রাখেন। নবীজি সাদের প্রস্তাবে খুশি হন এবং তার জন্য দোয়া করেন। সাহাবায়ে কেরাম নবীজির জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি ছোট টিলার ওপর একটি আরিশ নির্মাণ করেন। নবীজির নিরাপত্তায় সাদ বিন মুআযের নেতৃত্বে আনসারি যুবকদের একটি দলকে আরিশের চারপাশে মোতায়েন করা হয়।
📄 যুদ্ধপূর্ব রজনীতে
যুদ্ধের আগের পুরো রাত নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন রবের কাছে দোয়া ও অনুনয়-বিনয় করে অতিবাহিত করেন। নবীজি দোয়া করেন, হে আল্লাহ, যদি এ জামাতটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে আজকের পর পৃথিবীতে আর আপনার ইবাদত হবে না।
একপর্যায়ে হজরত আবু বকর রাযি. এগিয়ে এসে নবীজিকে বলেন, 'আল্লাহ অবশ্যই আপনার দোয়া কবুল করবেন।' এরপর নবীজি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণ পর জাগ্রত হয়ে বলেন, 'আবু বকর! সুসংবাদ গ্রহণ কর; আল্লাহর সাহায্য এসে গেছে। এই তো জিবরাইল ঘোড়ার লাগাম ধরে সম্মুখে ধুলা উড়িয়ে এগিয়ে আসছেন।'
যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে নবীজি সাহাবায়ে কেরামকে সুসংবাদ প্রদান করে বলেন,
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا يُقَاتِلُهُمُ الْيَوْمَ رَجُلٌ فَيُقْتَلُ صَابِرًا مُحْتَسِبًا مُقْبِلًا غَيْرَ مُدْبِرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ»
ওই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! আজ যে ব্যক্তিই সাওয়াবের আশায় সবরের সঙ্গে (পিছু না হটে) সম্মুখপানে অগ্রসর হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এবং শাহাদাত বরণ করবে, আল্লাহ পাক তাকে জান্নাত দান করবেন। (৩২)
টিকাঃ
৩২. ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৬২৭, ইবনু সায়্যিদিন-নাস, উয়ুনুল আছার, ১/৩৩৮, ইবনে কাছির, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৪২০ ও সুহায়লি, আর-রাওফুল উনুফ, ৩/৭১।
📄 যুদ্ধের সূচনা ও মুশরিকদের পরাজয়
দ্বিতীয় হিজরির সতেরো রমজান প্রত্যুষে যুদ্ধ শুরু হয়। মুশরিক বাহিনীর আসওয়াদ বিন আবদুল আসাদ মাখযুমি শপথ করেছিল—সে যেকোনো মূল্যে মুসলমানদের হাউজের পানি পান করবে, তা ধ্বংস করে ছাড়বে, অথবা এর জন্য জীবন দিয়ে দেবে। সে হাউজের দিকে অগ্রসর হতেই হামযা রাযি. তার দফারফা করেন। এরপর কুরাইশ কাফিরদের মধ্য হতে রাবিয়ার দুই পুত্র উতবা ও শায়বা এবং উতবার পুত্র ওয়ালিদ মল্লযুদ্ধের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে আসে। নবীজি তাদের মোকাবিলার জন্য তার চাচা হামযা বিন আবদুল মুত্তালিব এবং দুই চাচাতো ভাই আলি বিন আবু তালিব ও উবায়দা বিন হারিসকে এগিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। হামযা রাযি. ও আলি রাযি. শায়বা ও ওয়ালিদকে হত্যা করেন। অপরদিকে উবায়দা রাযি. ও উতবার মধ্যে প্রচণ্ড লড়াই হয়। ইতিমধ্যে হামযা ও আলি এগিয়ে এসে উতবার ইহলীলা সাঙ্গ করেন এবং আহত উবায়দা রাযি.-কে নবীজির কাছে নিয়ে আসেন।
এরপর দু-পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সাহাবায়ে কেরাম অটলতা ও অবিচলতার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। মুসলিম বাহিনীর নিরঙ্কুশ বিজয় এবং কাফির-মুশরিকদের চূড়ান্ত পরাজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়। কাফিরপক্ষের সত্তরজন নিহত হয়, বন্দী হয় সমসংখ্যক। মুসলিম বাহিনীর চৌদ্দজন সদস্য বদর যুদ্ধে শহিদ হয়।
📄 যুদ্ধবন্দি বিষয়ে সাহাবিদের সঙ্গে নবীজির পরামর্শ
যুদ্ধশেষে নবীজি যুদ্ধবন্দিদের সম্পর্কে করণীয় নির্ধারণ করতে সাহাবায়ে কেরামের মতামত জানতে চান। তিনি আবু বকর ও উমরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এসব যুদ্ধবন্দীদের বিষয়ে তোমাদের মতামত কী?’ উত্তরে আবু বকর রাযি. বলেন, ‘আল্লাহর নবী! তারা তো আপনার পিতৃবংশীয় আত্মীয়স্বজন। আমার মত হলো, মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদেরকে মুক্ত করে দিন। এর ফলে একদিকে আমাদের কাফিরদের বিরুদ্ধে শক্তি অর্জিত হবে, অপরদিকে ভবিষ্যতে হয়তো আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ইসলামের নিয়ামত দান করবেন।’ নবীজি উমর রাযি.-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘ইবনুল খাত্তাব! তোমার কী মত?’ হজরত উমর রাযি. বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর শপথ করে বলছি—আমি আবু বকরের সঙ্গে একমত নই। আমার মত হলো, আমরা তাদের হত্যা করব। আলির হাতে আকীলকে তুলে দিন, সে তাকে হত্যা করবে। আমার হাতে অমুককে (উমরের জনৈক নিকটাত্মীয়) তুলে দিন, আমি তাকে হত্যা করি। কারণ, এরা হলো কাফিরদের নেতৃস্থানীয় লোক।'
নবীজি আবু বকরের মত গ্রহণ করেন এবং মুক্তিপণ গ্রহণের ফয়সালা করেন। পরবর্তী সময়ে হজরত উমর রাযি.-এর মত সমর্থন করে পবিত্র কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত নাজিল হয়-
مَا كَانَ لِنَبِي أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّى يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
কোনো নবীর পক্ষে এটা শোভনীয় নয় যে, জমিনে যতক্ষণ পর্যন্ত (শত্রুদের) রক্ত ব্যাপকভাবে প্রবাহিত না করা হবে, (যাতে তাদের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে শেষ হয়ে যায়,) ততক্ষণ পর্যন্ত তার কাছে কয়েদি থাকবে। তোমরা দুনিয়ার সম্পদ কামনা করো আর আল্লাহ (তোমাদের জন্য) আখিরাত (-এর কল্যাণ) চান। আল্লাহ ক্ষমতারও মালিক, হিকমতেরও মালিক।
[সুরা আনফাল : ৬৭]