📄 হুবাব ইবনুল মুনযির রাযি.-এর পরামর্শ
এরপর নবীজি মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের নিয়ে সামনে অগ্রসর হন এবং বদর প্রান্তরে পৌঁছে জলাশয়ের নিকটে উপত্যকার বালুকাময় নিম্নভূমিতে অবস্থান গ্রহণ করেন। তখন হুবাব ইবনুল মুনযির রাযি. নবীজিকে জিজ্ঞেস করেন, 'আল্লাহর রাসুল, এই অবতরণস্থল আল্লাহ তাআলাই ওহির মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন (তাহলে তো তাতে পরিবর্তনের সুযোগ নেই), নাকি এটা আপনার নিজস্ব অভিমত ও রণকৌশল?' নবীজি উত্তর দেন, 'এটা নিছক নিজস্ব অভিমত ও রণকৌশল।' তখন হুবাব রাযি. বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, (রণকৌশল বিবেচনায়) এটা উপযুক্ত স্থান নয়। আমার মত হলো, আপনি সকলকে নিয়ে আরও সামনে চলুন, যেন আমরা শত্রুপক্ষের তুলনায় পানির তুলনামূলক বেশি কাছে থাকতে পারি। আমরা সেখানে ছাউনি স্থাপন করব, এরপর পেছনের অন্যান্য কূপ নষ্ট করে দেবো। আর আমরা সেখানে একটি হাউজ তৈরি করে তা পানি দ্বারা পূর্ণ করে রাখব। তাহলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমাদের পানির ব্যবস্থা থাকলেও তাদের থাকবে না।' নবীজি হুবাব রাযি.-এর পরামর্শ পছন্দ করেন এবং সামনে অগ্রসর হয়ে শেষ কূপটির কাছে ছাউনি স্থাপন করেন। নবীজির নির্দেশে পেছনের কূপগুলো নষ্ট করে দেওয়া হয় এবং মুসলিম বাহিনীর অবস্থানস্থলের কাছের কূপটির পাশে একটি হাউজ তৈরি করে পানি দ্বারা পূর্ণ করা হয়। এ সময় সাহাবিগণ নিজেদের পাত্রগুলো পূর্ণ করে নেন।
📄 উভয় বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ও সেনাবিন্যাস
মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল তিনশ চৌদ্দজন। (৩১) এর মধ্যে তিরাশিজন ছিলেন মুহাজির, একষট্টিজন আওস গোত্রীয় এবং একশ সত্তরজন খাযরাজ গোত্রীয়। মুসলিম বাহিনীর কাছে মাত্র দুটি ঘোড়া ছিল-একটি যুবায়র ইবনুল আওয়াম রাযি.-এর, অপরটি মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ রাযি.-এর। উটের সংখ্যা ছিল সত্তরটি; প্রতি দু-তিনজন একটি উটে পালাক্রমে আরোহণ করতেন। মুসলিম বাহিনীর মূল ঝান্ডা ছিল মুসআব বিন উমায়র রাযি.-এর হাতে, মুহাজির অংশের পতাকা ছিল আলি রাযি.-এর হাতে আর আনসারিদের পতাকা ছিল সাদ বিন মুআয রাযি.-এর হাতে। মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর নেতৃত্বে ছিলেন যুবায়র ইবনুল আওয়াম রাযি., বামবাহুর নেতৃত্বে মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ রাযি. এবং মধ্যবর্তী অংশের নেতৃত্বে কায়স বিন আবু সা'সাআ'হ রাযি.। আর পুরো বাহিনীর পরিচালন-দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ছিল।
অপরদিকে মুশরিক বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল নয়শ পঞ্চাশ। তাদের সঙ্গে ছিল একশ ঘোড়া, সাতশ উট ও ছয়শ বর্ম। বাহিনীর নেতৃত্ব ছিল আবু জাহলের হাতে।
টিকাঃ
৩১. বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা সম্পর্কে ৩১৩, ৩১৪, ৩১৫, ৩১৯-বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। গবেষক আলিমগণ এসব বর্ণনার মাঝে এভাবে সামঞ্জস্যবিধান করেন যে, মুসলিম বাহিনী রওনা হওয়ার কিছুক্ষণ পর নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেলার সদস্যসংখ্যা গণনা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন মোট ৩১৪ জন হয়েছিল। এরপর নবীজি পুনরায় গণনা করার নির্দেশ দেন। এ সময় দূর থেকে এক সাহাবি উটে আরোহণ করে কাফেলায় শরিক হওয়ার জন্য আসছিলেন। তাকে সহ গণনা করায় এবার মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১৫ জন। সুতরাং যদি উক্ত শেষ ব্যক্তিকে এবং স্বয়ং নবীজিকে-সহ হিসাব করা হয়, তাহলে মোট সংখ্যা হয় ৩১৫ জন, কোনো একজনকে বাদ দিলে ৩১৪ জন আর উভয় জনকে গণনায় না ধরলে ৩১৩ জন। আর কাফেলায় চারজন অল্পবয়স্ক সাহাবিও (হজরত বারা বিন আযিব রাযি., আবদুল্লাহ বিন উমর রাযি., আনাস বিন মালিক রাযি. ও জাবির বিন আবদুল্লাহ রাযি.) ছিলেন, যাদের যুদ্ধ করার অনুমতি ছিল না। তাদেরকেও যোগ করা হলে কাফেলার মোট সদস্যসংখ্যা হয় ৩১৯ জন। দ্রষ্টব্য: সাইদ আহমদ পালনপুরি রহ., তুহফাতুল কারি, ৮/৫৩।
📄 সাদ বিন মুআযের প্রস্তাব
মুসলমানদের ছাউনি স্থাপন শেষে সাদ বিন মুআয রাযি. যুদ্ধক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক নজর রাখতে নবীজির জন্য একটি আরিশ (মোর্চা) নির্মাণের প্রস্তাব রাখেন। নবীজি সাদের প্রস্তাবে খুশি হন এবং তার জন্য দোয়া করেন। সাহাবায়ে কেরাম নবীজির জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি ছোট টিলার ওপর একটি আরিশ নির্মাণ করেন। নবীজির নিরাপত্তায় সাদ বিন মুআযের নেতৃত্বে আনসারি যুবকদের একটি দলকে আরিশের চারপাশে মোতায়েন করা হয়।
📄 যুদ্ধপূর্ব রজনীতে
যুদ্ধের আগের পুরো রাত নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন রবের কাছে দোয়া ও অনুনয়-বিনয় করে অতিবাহিত করেন। নবীজি দোয়া করেন, হে আল্লাহ, যদি এ জামাতটি ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে আজকের পর পৃথিবীতে আর আপনার ইবাদত হবে না।
একপর্যায়ে হজরত আবু বকর রাযি. এগিয়ে এসে নবীজিকে বলেন, 'আল্লাহ অবশ্যই আপনার দোয়া কবুল করবেন।' এরপর নবীজি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন এবং কিছুক্ষণ পর জাগ্রত হয়ে বলেন, 'আবু বকর! সুসংবাদ গ্রহণ কর; আল্লাহর সাহায্য এসে গেছে। এই তো জিবরাইল ঘোড়ার লাগাম ধরে সম্মুখে ধুলা উড়িয়ে এগিয়ে আসছেন।'
যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার পূর্বে নবীজি সাহাবায়ে কেরামকে সুসংবাদ প্রদান করে বলেন,
وَالَّذِي نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لَا يُقَاتِلُهُمُ الْيَوْمَ رَجُلٌ فَيُقْتَلُ صَابِرًا مُحْتَسِبًا مُقْبِلًا غَيْرَ مُدْبِرٍ إِلَّا أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ»
ওই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে মুহাম্মাদের জীবন! আজ যে ব্যক্তিই সাওয়াবের আশায় সবরের সঙ্গে (পিছু না হটে) সম্মুখপানে অগ্রসর হয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এবং শাহাদাত বরণ করবে, আল্লাহ পাক তাকে জান্নাত দান করবেন। (৩২)
টিকাঃ
৩২. ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৬২৭, ইবনু সায়্যিদিন-নাস, উয়ুনুল আছার, ১/৩৩৮, ইবনে কাছির, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৪২০ ও সুহায়লি, আর-রাওফুল উনুফ, ৩/৭১।