📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সাহাবিদের সঙ্গে নবীজির পরামর্শ

📄 সাহাবিদের সঙ্গে নবীজির পরামর্শ


কুরাইশ বণিক-কাফেলার প্রস্থান এবং যুদ্ধ-বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে নবীজি করণীয় ঠিক করতে বিশিষ্ট সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শে বসেন। বিশেষ করে আনসারি সাহাবিদের মতামত জানা জরুরি ছিল। কারণ, ইতিপূর্বে তারা কেবল মদিনার অভ্যন্তরে নবীজিকে নিরাপত্তা প্রদানের বায়আত গ্রহণ করেছিল। এখন যেহেতু নবীজি মদিনার বাইরে বেরিয়ে এসেছেন, তাই তাদের মতামত জানা অপরিহার্য ছিল। নবীজি সমবেত সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।
নবীজির আহ্বান শুনে প্রথমে আবু বকর রাযি. দাঁড়িয়ে নির্ভীক চিত্তে আপন মনোভাব প্রকাশ করেন। এরপর উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. দাঁড়ান এবং তিনিও উত্তম পরামর্শ প্রদান করেন। এরপর দণ্ডায়মান হন মিকদাদ বিন আমর রাযি। (৩০)। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার প্রতিপালক আপনাকে যে পথ দেখিয়েছেন, আপনি তাতে অবিচল থাকুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আল্লাহর শপথ! বনি ইসরাইল মুসা আ.-কে যেমন জবাব দিয়েছিল, আমরা আপনাকে সেরূপ জবাব দেবো না। তারা বলেছিল, 'মুসা, তুমি ও তোমার রব যাও এবং যুদ্ধ করো। আমরা এখানেই বসে থাকব।' কিন্তু আমরা বলব, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি ও আপনার রব যুদ্ধ করুন; আমরাও আপনাদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করব।' ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন! আপনি যদি আমাদেরকে নিয়ে (ইয়ামেনের দিকে আরব উপদ্বীপের শেষ প্রান্তে অবস্থিত) বারকুল গিমাদ পর্যন্তও অগ্রসর হন, আমরা আপনার সঙ্গেই থাকব।
মিকদাদ রাযি.-এর মতামত শুনে নবীজি অত্যন্ত খুশি হন। তিনি মিকদাদের প্রশংসা করেন এবং তার জন্য দোয়া করেন। এরপর নবীজি পুনরায় বলেন, 'তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।' তখন আওস গোত্রপ্রধান ও আনসারদের নেতা সাদ বিন মুআয রাযি. দাঁড়িয়ে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর শপথ! সম্ভবত আপনি আমাদের মতামত জানতে চাচ্ছেন?' নবীজি উত্তর দেন, 'হ্যাঁ।' তখন সাদ বিন মুআয রাযি. বলেন, 'আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্যায়ন করেছি। আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনি যে দ্বীন নিয়ে আগমন করেছেন, তা হক ও সত্য। আপনার নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রতি আমরা স্বতঃস্ফূর্ত অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছি। সুতরাং আপনি যা কল্যাণকর মনে করছেন, সে পথে অগ্রসর হোন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। ওই মহান সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন! আপনি যদি আমাদের নিয়ে অগ্রসর হয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন, আমরাও আপনার সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আমাদের একজনও তাতে সামান্য দ্বিধা করবে না। আগামীকাল আপনি আমাদের নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করলেও আমরা অপছন্দ করব না। আমরা তো যুদ্ধক্ষেত্রে অটল-অবিচল, শত্রুর মোকাবিলায় নিষ্ঠাবান। হয়তো আল্লাহ পাক আমাদের দ্বারা এমন কর্ম সম্পাদন করাবেন, যা আপনার চক্ষু শীতল করবে। সুতরাং আল্লাহর রহমত ও বরকতকে সঙ্গী করে আপনি আমাদের সঙ্গে নিয়ে চলুন।'
সাদ রাযি.-এর বক্তব্য শুনে নবীজি অত্যন্ত খুশি হন এবং বলেন, 'চলো, আনন্দের সঙ্গে চলো। আল্লাহ তাআলা আমাকে দু-দলের (বণিক-কাফেলা ও যুদ্ধ-বাহিনী) কোনো একটির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহর শপথ! আমি যেন এখন (কুরাইশ) কওমের বধ্যভূমি দেখতে পাচ্ছি।'

টিকাঃ
৩০. তিনি মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ নামেও প্রসিদ্ধ ছিলেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হুবাব ইবনুল মুনযির রাযি.-এর পরামর্শ

📄 হুবাব ইবনুল মুনযির রাযি.-এর পরামর্শ


এরপর নবীজি মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের নিয়ে সামনে অগ্রসর হন এবং বদর প্রান্তরে পৌঁছে জলাশয়ের নিকটে উপত্যকার বালুকাময় নিম্নভূমিতে অবস্থান গ্রহণ করেন। তখন হুবাব ইবনুল মুনযির রাযি. নবীজিকে জিজ্ঞেস করেন, 'আল্লাহর রাসুল, এই অবতরণস্থল আল্লাহ তাআলাই ওহির মাধ্যমে নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন (তাহলে তো তাতে পরিবর্তনের সুযোগ নেই), নাকি এটা আপনার নিজস্ব অভিমত ও রণকৌশল?' নবীজি উত্তর দেন, 'এটা নিছক নিজস্ব অভিমত ও রণকৌশল।' তখন হুবাব রাযি. বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, (রণকৌশল বিবেচনায়) এটা উপযুক্ত স্থান নয়। আমার মত হলো, আপনি সকলকে নিয়ে আরও সামনে চলুন, যেন আমরা শত্রুপক্ষের তুলনায় পানির তুলনামূলক বেশি কাছে থাকতে পারি। আমরা সেখানে ছাউনি স্থাপন করব, এরপর পেছনের অন্যান্য কূপ নষ্ট করে দেবো। আর আমরা সেখানে একটি হাউজ তৈরি করে তা পানি দ্বারা পূর্ণ করে রাখব। তাহলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আমাদের পানির ব্যবস্থা থাকলেও তাদের থাকবে না।' নবীজি হুবাব রাযি.-এর পরামর্শ পছন্দ করেন এবং সামনে অগ্রসর হয়ে শেষ কূপটির কাছে ছাউনি স্থাপন করেন। নবীজির নির্দেশে পেছনের কূপগুলো নষ্ট করে দেওয়া হয় এবং মুসলিম বাহিনীর অবস্থানস্থলের কাছের কূপটির পাশে একটি হাউজ তৈরি করে পানি দ্বারা পূর্ণ করা হয়। এ সময় সাহাবিগণ নিজেদের পাত্রগুলো পূর্ণ করে নেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উভয় বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ও সেনাবিন্যাস

📄 উভয় বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ও সেনাবিন্যাস


মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল তিনশ চৌদ্দজন। (৩১) এর মধ্যে তিরাশিজন ছিলেন মুহাজির, একষট্টিজন আওস গোত্রীয় এবং একশ সত্তরজন খাযরাজ গোত্রীয়। মুসলিম বাহিনীর কাছে মাত্র দুটি ঘোড়া ছিল-একটি যুবায়র ইবনুল আওয়াম রাযি.-এর, অপরটি মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ রাযি.-এর। উটের সংখ্যা ছিল সত্তরটি; প্রতি দু-তিনজন একটি উটে পালাক্রমে আরোহণ করতেন। মুসলিম বাহিনীর মূল ঝান্ডা ছিল মুসআব বিন উমায়র রাযি.-এর হাতে, মুহাজির অংশের পতাকা ছিল আলি রাযি.-এর হাতে আর আনসারিদের পতাকা ছিল সাদ বিন মুআয রাযি.-এর হাতে। মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর নেতৃত্বে ছিলেন যুবায়র ইবনুল আওয়াম রাযি., বামবাহুর নেতৃত্বে মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ রাযি. এবং মধ্যবর্তী অংশের নেতৃত্বে কায়স বিন আবু সা'সাআ'হ রাযি.। আর পুরো বাহিনীর পরিচালন-দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ছিল।
অপরদিকে মুশরিক বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল নয়শ পঞ্চাশ। তাদের সঙ্গে ছিল একশ ঘোড়া, সাতশ উট ও ছয়শ বর্ম। বাহিনীর নেতৃত্ব ছিল আবু জাহলের হাতে।

টিকাঃ
৩১. বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা সম্পর্কে ৩১৩, ৩১৪, ৩১৫, ৩১৯-বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। গবেষক আলিমগণ এসব বর্ণনার মাঝে এভাবে সামঞ্জস্যবিধান করেন যে, মুসলিম বাহিনী রওনা হওয়ার কিছুক্ষণ পর নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেলার সদস্যসংখ্যা গণনা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন মোট ৩১৪ জন হয়েছিল। এরপর নবীজি পুনরায় গণনা করার নির্দেশ দেন। এ সময় দূর থেকে এক সাহাবি উটে আরোহণ করে কাফেলায় শরিক হওয়ার জন্য আসছিলেন। তাকে সহ গণনা করায় এবার মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১৫ জন। সুতরাং যদি উক্ত শেষ ব্যক্তিকে এবং স্বয়ং নবীজিকে-সহ হিসাব করা হয়, তাহলে মোট সংখ্যা হয় ৩১৫ জন, কোনো একজনকে বাদ দিলে ৩১৪ জন আর উভয় জনকে গণনায় না ধরলে ৩১৩ জন। আর কাফেলায় চারজন অল্পবয়স্ক সাহাবিও (হজরত বারা বিন আযিব রাযি., আবদুল্লাহ বিন উমর রাযি., আনাস বিন মালিক রাযি. ও জাবির বিন আবদুল্লাহ রাযি.) ছিলেন, যাদের যুদ্ধ করার অনুমতি ছিল না। তাদেরকেও যোগ করা হলে কাফেলার মোট সদস্যসংখ্যা হয় ৩১৯ জন। দ্রষ্টব্য: সাইদ আহমদ পালনপুরি রহ., তুহফাতুল কারি, ৮/৫৩।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সাদ বিন মুআযের প্রস্তাব

📄 সাদ বিন মুআযের প্রস্তাব


মুসলমানদের ছাউনি স্থাপন শেষে সাদ বিন মুআয রাযি. যুদ্ধক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক নজর রাখতে নবীজির জন্য একটি আরিশ (মোর্চা) নির্মাণের প্রস্তাব রাখেন। নবীজি সাদের প্রস্তাবে খুশি হন এবং তার জন্য দোয়া করেন। সাহাবায়ে কেরাম নবীজির জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত একটি ছোট টিলার ওপর একটি আরিশ নির্মাণ করেন। নবীজির নিরাপত্তায় সাদ বিন মুআযের নেতৃত্বে আনসারি যুবকদের একটি দলকে আরিশের চারপাশে মোতায়েন করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00