📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

📄 যুদ্ধের প্রেক্ষাপট


নবীজি সংবাদ পেয়েছিলেন-কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশদের একটি বণিক-কাফেলা প্রচুর সম্পদসহ শাম থেকে মক্কায় ফিরে যাচ্ছে। কুরাইশরা মুহাজির মুসলমানদের যেসব সম্পদ কুক্ষিগত করেছিল, প্রিয়নবী এই বণিক-কাফেলার ওপর হামলা চালিয়ে তার কিয়দংশ পুনরুদ্ধার করার মনস্থ করেন। নবীজি সাহাবিদের বলেন, 'কুরাইশদের বণিক-কাফেলা প্রভূত সম্পদ নিয়ে ফিরছে। এই কাফেলার উদ্দেশে তোমরা বেরিয়ে পড়ো। এমনও হতে পারে যে, আল্লাহ পাক সমুদয় সম্পদ তোমাদেরকে গনিমত হিসেবে প্রদান করবেন।'
নবীজির ঘোষণার পর কিছু সংখ্যক সাহাবি মুজাহিদ কাফেলায় যোগদান করলেও অনেকেই মদিনায় থেকে যান। তারা মনে করেছিলেন, (অতীত অভিযানগুলোর মতো) এবারও প্রত্যক্ষ লড়াই সংঘটিত হবে না। অধিকন্তু কুরাইশকাফেলার সদস্যসংখ্যা ছিল মাত্র চল্লিশজন। দ্বিতীয় হিজরি সনের ৮ রমজান (৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে) নবীজি মুসলিম বাহিনীকে নিয়ে মদিনা থেকে রওনা হন। নবীজি মদিনার ব্যবস্থাপনা-দায়িত্ব আবু লুবাবা রাযি.-কে এবং ইমামতির দায়িত্ব আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম রাযি.-কে প্রদান করে যান।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আবু সুফিয়ানের মক্কায় সংবাদ প্রেরণ

📄 আবু সুফিয়ানের মক্কায় সংবাদ প্রেরণ


মুসলিম বাহিনী মদিনা ত্যাগ করতেই কুরাইশপ্রধান আবু সুফিয়ান গুপ্তচর মারফত এ সংবাদ পেয়ে যান। তিনি এ সংবাদ মক্কার কুরাইশদেরকে জানাতে তৎক্ষণাৎ আমর বিন যামযাম গিফারিকে মক্কায় প্রেরণ করেন। মক্কায় পৌঁছেই আমর বিন যামযাম (তৎকালীন রীতি অনুযায়ী) আপন বাহনজন্তুর মুখমণ্ডলে আঘাত করে রক্তাক্ত করে। এরপর সে বাহনের মুখ ঘুরিয়ে দেয়, নিজের পরিচ্ছদ ছিঁড়ে ফেলে এবং চিৎকার করে বলতে থাকে, কুরাইশ সম্প্রদায়, শোনো! কাফেলা! কাফেলাকে রক্ষা করো! তোমাদের যে সম্পদ আবু সুফিয়ানের কাছে আছে, মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীরা তার ওপর হামলা করতে যাচ্ছে। আমার মনে হয় না, বিলম্ব করলে তোমরা তা রক্ষা করতে পারবে। সাহায্য! দ্রুত সাহায্য নিয়ে চলো।
আসন্ন বিপদের সংবাদ পেয়ে কুরাইশরা দ্রুত যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণ করে এবং বণিক-কাফেলার নিরাপত্তারক্ষায় একটি বাহিনী গঠন করে। কুরাইশদের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আবু লাহাব ব্যতীত সবাই বাহিনীতে শরিক হয়। এই বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল নয়শ পঞ্চাশ, ঘোড়ার সংখ্যা ছিল একশ আর উট সাতশ।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 বণিক-কাফেলার নিরাপদ প্রস্থান

📄 বণিক-কাফেলার নিরাপদ প্রস্থান


এদিকে আবু সুফিয়ান মক্কায় সংবাদ পাঠিয়ে নিশ্চিন্ত না থেকে নিজেও আত্মরক্ষার চেষ্টা চালান। তিনি মক্কায় ফেরার প্রচলিত পথ ছেড়ে সমুদ্র উপকূলের পথ ধরে তার কাফেলা নিয়ে পালাতে সক্ষম হন। এরপর তিনি কুরাইশদের কাছে সংবাদ পাঠান যে, এখন আর কোনো আশঙ্কা নেই, কুরাইশ রণ-কাফেলা ফিরে যেতে পারে। কিন্তু কুরাইশ-নেতা আবু জাহল মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ ব্যতীত ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলে, আমি শপথ করছি—বদর প্রান্তরে পৌঁছে সেখানে তিন দিন অবস্থান না করে আমরা ফিরব না। আমরা সেখানে উট জবাই করব, আহার-উৎসব করব, মদ পান করব এবং দাসীদের গীতি-নৃত্য উপভোগ করব। সারা আরবে আমাদের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে এবং আরববাসী চিরদিন আমাদের কীর্তি নিয়ে গৌরব করবে। সুতরাং চলো সবাই বদরপানে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সাহাবিদের সঙ্গে নবীজির পরামর্শ

📄 সাহাবিদের সঙ্গে নবীজির পরামর্শ


কুরাইশ বণিক-কাফেলার প্রস্থান এবং যুদ্ধ-বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে নবীজি করণীয় ঠিক করতে বিশিষ্ট সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শে বসেন। বিশেষ করে আনসারি সাহাবিদের মতামত জানা জরুরি ছিল। কারণ, ইতিপূর্বে তারা কেবল মদিনার অভ্যন্তরে নবীজিকে নিরাপত্তা প্রদানের বায়আত গ্রহণ করেছিল। এখন যেহেতু নবীজি মদিনার বাইরে বেরিয়ে এসেছেন, তাই তাদের মতামত জানা অপরিহার্য ছিল। নবীজি সমবেত সাহাবিদের উদ্দেশে বলেন, তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।
নবীজির আহ্বান শুনে প্রথমে আবু বকর রাযি. দাঁড়িয়ে নির্ভীক চিত্তে আপন মনোভাব প্রকাশ করেন। এরপর উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. দাঁড়ান এবং তিনিও উত্তম পরামর্শ প্রদান করেন। এরপর দণ্ডায়মান হন মিকদাদ বিন আমর রাযি। (৩০)। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, আপনার প্রতিপালক আপনাকে যে পথ দেখিয়েছেন, আপনি তাতে অবিচল থাকুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আল্লাহর শপথ! বনি ইসরাইল মুসা আ.-কে যেমন জবাব দিয়েছিল, আমরা আপনাকে সেরূপ জবাব দেবো না। তারা বলেছিল, 'মুসা, তুমি ও তোমার রব যাও এবং যুদ্ধ করো। আমরা এখানেই বসে থাকব।' কিন্তু আমরা বলব, 'হে আল্লাহর রাসুল, আপনি ও আপনার রব যুদ্ধ করুন; আমরাও আপনাদের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করব।' ওই সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন! আপনি যদি আমাদেরকে নিয়ে (ইয়ামেনের দিকে আরব উপদ্বীপের শেষ প্রান্তে অবস্থিত) বারকুল গিমাদ পর্যন্তও অগ্রসর হন, আমরা আপনার সঙ্গেই থাকব।
মিকদাদ রাযি.-এর মতামত শুনে নবীজি অত্যন্ত খুশি হন। তিনি মিকদাদের প্রশংসা করেন এবং তার জন্য দোয়া করেন। এরপর নবীজি পুনরায় বলেন, 'তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।' তখন আওস গোত্রপ্রধান ও আনসারদের নেতা সাদ বিন মুআয রাযি. দাঁড়িয়ে বলেন, 'আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর শপথ! সম্ভবত আপনি আমাদের মতামত জানতে চাচ্ছেন?' নবীজি উত্তর দেন, 'হ্যাঁ।' তখন সাদ বিন মুআয রাযি. বলেন, 'আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্যায়ন করেছি। আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনি যে দ্বীন নিয়ে আগমন করেছেন, তা হক ও সত্য। আপনার নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রতি আমরা স্বতঃস্ফূর্ত অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছি। সুতরাং আপনি যা কল্যাণকর মনে করছেন, সে পথে অগ্রসর হোন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। ওই মহান সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন! আপনি যদি আমাদের নিয়ে অগ্রসর হয়ে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়েন, আমরাও আপনার সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আমাদের একজনও তাতে সামান্য দ্বিধা করবে না। আগামীকাল আপনি আমাদের নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করলেও আমরা অপছন্দ করব না। আমরা তো যুদ্ধক্ষেত্রে অটল-অবিচল, শত্রুর মোকাবিলায় নিষ্ঠাবান। হয়তো আল্লাহ পাক আমাদের দ্বারা এমন কর্ম সম্পাদন করাবেন, যা আপনার চক্ষু শীতল করবে। সুতরাং আল্লাহর রহমত ও বরকতকে সঙ্গী করে আপনি আমাদের সঙ্গে নিয়ে চলুন।'
সাদ রাযি.-এর বক্তব্য শুনে নবীজি অত্যন্ত খুশি হন এবং বলেন, 'চলো, আনন্দের সঙ্গে চলো। আল্লাহ তাআলা আমাকে দু-দলের (বণিক-কাফেলা ও যুদ্ধ-বাহিনী) কোনো একটির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহর শপথ! আমি যেন এখন (কুরাইশ) কওমের বধ্যভূমি দেখতে পাচ্ছি।'

টিকাঃ
৩০. তিনি মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ নামেও প্রসিদ্ধ ছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00